সকলের আশ্রয়-মা

লেখক: সোমা সেন

তিনি ছিলেন সকলের মা। পরম আশ্রয়স্থল। মদিনা বেগম, মদনিন্নিসা, মদ্যইনা – মদনমঞ্জুরী – বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের স্ত্রী। বাবাও যেমন শুধু ছাত্রছাত্রীদের বাবা ছিলেন না – সারাদেশই তাঁকে বাবা বলে জানে, মাও তেমনি সকলের মা। বাবা ছিলেন আশুতোষ, রুদ্র। ক্ষণে রুষ্ট ক্ষণে তুষ্ট। মা ছিলেন মেদিনীর প্রতিমূর্তি, সর্বংসহা মা অন্নপূর্ণা। বাবা দিতেন শিক্ষা – মা ছিলেন আশ্রয়। তাঁরা দুজনে ছিলেন এক রূপে দুই অথবা দুই রূপে এক। পরস্পরের পরিপূরক স্বভাবে এবং আচরণে। দুজনেই ছিলেন সত্যের প্রতি নিবেদিত। যে সংসারী মেয়েরা বাবার কাছে গান-বাজনা শিখতে আসতেন, তাঁদের তিনি সস্নেহে বলতেন – ‘তোমরা মায়ের জাত … সংসার করে যতটুকু হবে ততটুকুই করা চাই। ফকির হয়ে ফকিরি করা, সে তো বেশি কথা নয় মা, সংসারে থেকে ফকিরি করাই বাহাদুরি।’ মা ছিলেন সেরকম ফকির, যিনি সংসারে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে অদৃশ্য বন্ধনে তাকে ধরে ছিলেন। আছেন, কিন্তু বোঝা যায় না তাঁর উপস্থিতি। মনকে নির্লিপ্ত রেখে তিনি সংসারের হাল ধরে রেখেছিলেন বলেই না তাঁর সুরসাধক স্বামী আপন ভাবে বিভোর হয়ে সংগীতশিক্ষা দিতে পেরেছেন সারা দেশকে। তাঁর সামান্য অনুপস্থিতি সংসারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত।
বাবা তাঁর ছাত্রদের নাড়া বেঁধে শিক্ষা শুরুর আগে প্রথম তাঁর গুরু উজির খাঁ, দেবী সারদা, পরমহংসদেব এবং শ্রীমা সারদা মণিকে প্রণামের পর নিজের স্ত্রী মদিনা বেগমের চরণ-বন্দনা করে শিক্ষারম্ভ করার নির্দেশ দিতেন। বাবা তাঁর স্ত্রীকে বলতেন রতœগর্ভা। শুধু অন্নপূর্ণা দেবী, আলি আকবর খাঁ নয়, সব ছাত্রেরই তিনি মা ছিলেন – আসল মা। বাড়ি ছেড়ে ছাত্ররা এত দূরে বাজনা শিখতে আসত, মা তাদের পক্ষছায়ায় আগলে রাখতেন। বাবার রাগ আর প্রহার থেকে রক্ষা করতেন, পরামর্শ দিতেন।
স্বামীর সংগীতসাধনাই ছিল তাঁর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা। তাই বাবা বাজাতে বসার আগে মা জায়গা সাফ করে মশামাছি তাড়িয়ে ধূপধুনো দিয়ে আয়োজন করে রাখতেন। আবার বাজাবার সামান্য ভুল হলে বাবা লাঠি দিয়ে নাতিদের প্রচ- মারতেন, তখন আর কেউ সামনে যেতে সাহস করত না, শুধু মা সামনে পড়ে বলতেন – ‘আরে কী করো, আরে কী করো; নাতিটা যে মরে যাবে।’ বাবা তখন নাতিদের যেমন বকতেন, মাকেও ধমক দিতে ছাড়তেন না – ‘চোপরাও শুয়ার কে বাচ্চে! তোমাদের আদরেই খারাপ হয়ে যাচ্ছে।’ তবে তখনই মার বন্ধ হতো। মা চেরাপুঞ্জির মানুষ – বর্ষণ আর দুর্যোগে অভ্যস্ত। বাবার রাগ সামলে চলা তাঁর পক্ষেই সম্ভব হতো। গালমন্দ নিঃশব্দেই হজম করতেন মা।
মদিনা বেগমের যখন জন্ম হয় বাবার তখন সাত বছর বয়স। সেই সময়েই বিয়ে ঠিক হয়েছিল আলাউদ্দিনের অগোচরে ঢাকা জেলার বাসপুর গ্রামের বসির খাঁর সর্বকনিষ্ঠ কন্যা মদনিন্নিসার সঙ্গে। আট বছর বয়সেও একবার দীর্ঘদিনের জন্য বাড়ি ছেড়েছিলেন আলাউদ্দিন। ছোটভাইয়ের গান-বাজনার প্রতি আগ্রহ দেখে তাঁর মেজদাদা আপ্তাবুদ্দিন বলেন – আমাদের বাবা বিয়ের কথা দিয়েছেন। তাই শুভ কাজ হয়ে গেলে তবেই আবার কলকাতা যাবার ব্যবস্থা হবে। দাদার কথায় আশা দেখতে পেয়ে বিয়েতে বসলেন আলাউদ্দিন প্রায় পনেরো বছর বয়সে আর মায়ের বয়স তখন আট। বাবার নিজের লেখা সংক্ষিপ্ত জীবনী থেকে জানা যায় – ‘আমি যখন ফুলশয্যার ঘরে যাই, তখন আমার স্ত্রীর দুই পাশে তার বৌদিরা শুয়ে আছে। আমি যখন ঘরে যাই তখন বৌদিরা চলে গেলেন। তখন স্ত্রীর কাছে যেয়ে দেখি সে অচৈতন্য হয়ে ঘুমিয়ে আছে। তখন ঘরের কেওরার বন্ধ করে তার গলার হার, হাতের বাজুবন্ধ, সোনার অনন্ত যা কিছু অলংকার ছিল সব খুলে নিলাম। বিবাহের সময় আত্মীয় সকলে নমস্কারী দিয়েছিল, এবং আমার স্ত্রীকে প্রণামি দিয়েছিল, অলংকার ও প্রণামির টাকা দুইজনের যা ছিল সব মিলিয়ে একটা পুটলা বেন্ধে নিয়ে ফুলশয্যার ঘর বন্ধ করে নরস্যিবদী চলে যাই। নরস্যিবদীতে স্টিমার স্টেশনে গিয়ে স্টিমারে চড়ে নারায়ণগঞ্জে যেয়ে পৌঁছি। তারপর রেলে চড়ে শিয়ালদা।’ – এই বিবরণে বাবার কোনো সংকোচ দেখা গেল না। এরপর যে সংগীতজীবন বাবা যাপন করেছেন – সে আরেক যুদ্ধ।
মদিনা বেগম আট বছরের মেয়ে শিবপুর গ্রামে শ্বশুরঘর করতে এলেন। তাঁর বাবা বসির আহমেদ বেশ ধার্মিক প্রকৃতির লোক ছিলেন। তাই বিবাহিত মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতেই পাঠালেন। যেইখানে তাঁর স্বামী ফুলশয্যার রাতেই গয়নাগাটি, টাকা-পয়সা নিয়ে দেশান্তরী হয়েছেন। ছোট্ট মেয়ে শাশুড়ির সঙ্গে ঘরকন্না করতেন, আর বাবা, মা, দাদাদের জন্য মন কেমন করত বলে কাঁদতেন। তাই তাঁকে মাঝে মাঝেই বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হতো। কিছুদিন পর থেকে আলাউদ্দিন বাড়িতে যাতায়াত করতেন। প্রথম সন্তান হবার সময় একদিন ঘড়া নিয়ে জল আনতে যাবার সময় মা পড়ে যান। ফলে অজাত শিশুটির মৃত্যু হয়। কয়েকদিনের জন্য তাঁকে আবার বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিছুদিন পর বাবার বড়ভাই ছমিরুদ্দিন মাকে আনতে গেলেন। বসির আহমেদ তখন বাড়ি ছিলেন না। মেয়েকে পাঠাতে গেলে শাড়ি, মিষ্টি দিয়ে পাঠাতে হবে। তাই তাঁর মা বললেন – তাঁর স্বামী আর ছেলে এলে মেয়েকে পাঠাবেন। কারণ তাঁর হাতে টাকা ছিল না। কিন্তু সে-কথায় ছমিরুদ্দিন অপমানিত হয়ে ফিরে এলেন। তারপর কৌশলে বাবাকে ডেকে এনে এক সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলেন। মনে করলেন, এতে বাবার বাড়ির প্রতি টান হবে। দ্বিতীয় পতœী অল্পদিনের মধ্যেই মারা যান। সেই সময় মায়ের দাদারা জোর করে তাঁর বিয়ে দিতে চান। একে তো স্বামী পরিত্যক্তা। তার ওপর বিয়ের রাতেই গয়নাগাটি, টাকা নিয়ে বাড়ি ছেড়েছেন যে-স্বামী তাঁর জন্যই কিছুতেই বিয়েতে রাজি হলেন না সেই গ্রাম্যবালিকা। বলেছিলেন, আমার বিয়ে হয়ে গেছে, দ্বিতীয়বার হতে পারে না। বাড়ির লোকেরা জেদ করলে আত্মহত্যাও করতে যান তিনি। সেই সময় বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী গত হলে শ্বশুরবাড়ি থেকে মদনিন্নিসাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সারাদিন খাটতে হতো। বাবা বাড়িতে এলে সেবা করা, ধান ভানা, কাপড় কাচা, বাসন মাজা সবই করতে হতো। এর মধ্যেই জন্ম হয়েছে সুরিজা, জাহানারা, আলি আকবর আর অন্নপূর্ণার। বাড়ির সব ছেলেমেয়ের ভার পড়ল মায়ের ওপর।
বাবার মতন মাও ধার্মিক ছিলেন। দিনে পাঁচবার নামাজ পড়তেন। বাবার নামাজ পড়ার ব্যবস্থাও করে রাখতেন নিখুঁতভাবে। তেত্রিশ বছর শিক্ষা করে, সারা ভারতের গুণিজনের সামনে বাজনা বাজিয়ে সকলকে মুগ্ধ করে শেষে মধ্যপ্রদেশের মাইহারের রাজসভায় চাকরি নেন বাবা। জনকোলাহলের বাইরে সাধনা-সংসার শুরু হলো। স্ত্রীকে নিয়ে এলেন নিজের কাছে। আপন সংসারে।
ভোর থেকে রাত্রি পর্যন্ত মায়ের বিশ্রাম ছিল না। ঘড়ির কাঁটার মতো নিয়ম মেনে চলতেন। বাবার মতোই দিনে পাঁচবার নামাজ পড়তেন। আবার রোজ দুপুরে নিয়ম করে হারমোনিয়াম বাজাতেন। মা কারো কাছে বাজনা বাজাতে শেখেননি। সংগীত পরিবারে সহজেই হাতে উঠে এসেছে বাজনা – সহজাতভাবেই। ছোট একটা সেতারও ছিল মার। মা শুদ্ধস্বর কোমল স্বরের তত্ত্ব বুঝতেন না। বাবা ছাত্রদের কিছু শেখালে অথবা নিজে বাজালে তা শুনে শুনেই মা সেই রাগের একটা রূপ খাড়া করতেন। নিজের মনেই দুপুরে কি রাতে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে বাজাতেন।
রাত্রি এগারোটার সময় সবার খাওয়া হলে বাবাকে তামাক সেজে দিয়ে ম্যাসাজ করতে বসতেন। বাদ্যযন্ত্রশিল্পী স্বামীর হাত-পা টিপে দিয়ে যথাসাধ্য আরাম দেবার চেষ্টা করতেন। বাজনা বাজিয়ে অনুষ্ঠানশেষে অনেক রাতে বাড়ি ফিরলে সঙ্গে সঙ্গে চা, জল, তামাক নিয়ে মা প্রস্তুত থাকতেন।
বাবার দেহান্তের পর কোনো ছাত্র অন্নপূর্ণা দেবীর কাছে শিখতে চাইলে বলতেন – আগে মায়ের কাছে গা-া বেঁধে আসুক তবে শেখাবো। মা তো গুরুপত্নী। আলি আকবরকে সুরশৃঙ্গার শেখাবার আগে বাবা বলেছিলেন মাকে প্রণাম করে আসতে।
মা সাধারণত মাইহারেই থাকতেন। কয়েকবার আলি আকবরের সঙ্গে লখনৌ, যোধপুর, বম্বে, কলকাতায় গেছেন। আর অন্নপূর্ণার বিয়ের সময় আলমোড়া গিয়েছিলেন। বাবার দেহান্তের পর আলি আকবরের কলকাতার বাড়িতে ছিলেন। স্বামীর শিক্ষাশ্রমে জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কাটিয়েছেন সারাদিন মুখ বুজে পরিশ্রম করে। মায়ের মতন কৃচ্ছ্রসাধন কেউ করতে পারবে না – এই ছিল সকলের মত। মায়ের ধৈর্য ও সহনশীলতা কথায় প্রকাশ করা অসম্ভব। অসাধারণ বুদ্ধিমতী এবং স্থিতধী ছিলেন তিনি।
সারা পরিবারের খাওয়া-দাওয়ার ভার মায়ের ওপর। তাঁর হাতের রান্নাও ছিল অসাধারণ। সামান্য উপকরণ দিয়ে সুস্বাদু রান্না করতেন। হাতের গুণে রসনা তৃপ্ত হতো। মার রান্না ডাল, বেগুনের ভর্তা, মাছের হালুয়া (গাড্ডা), ডিমের পরোটা, মাংস যাঁরা খেয়েছেন – সারাজীবনেও ভোলেননি। মা প্রশংসা শুনে বলতেন – আল্লাহ যা দেখিয়ে দেন তা-ই করি। শিল্পী শরণ রানি মায়ের রান্নাগুলো শিখে নিয়েছিলেন। বিশেষ করে ডাল। আর অন্নপূর্ণা দেবীও মায়ের মতোই সবার রান্না নিজ হাতে করতেন। বাবা বলতেন, তোমাদের বুড়োমা তো কোথাও কিছু শেখেনি। নিজের মন থেকে যা ভাবে তাই করে। ডাক্তার গোবিন্দ সিং বাবাকে বলতেন – ‘মার হাতের এত ভালো খাওয়ার জন্যই আপনার শরীর এতো ভালো আছে।’ রান্না সব ঘিতেই হতো, এমনকি করলা ভাজাও ঘিতে। শুধু মাছ ভাজা হতো সরষের তেলে। মাছ আনা হলে বাবা তেল কিনে আনতেন। বাবার জন্মদিনে মা নিয়মিত পায়েস করতেন। মার সেতারটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সেটা সারিয়ে আনতে মা খুশি হয়ে সকলকে দইবড়া খাওয়ালেন। সকলকে খাইয়েই তাঁর তৃপ্তি। কেউ তাঁদের কাছে এলে না খেয়ে ফিরত না।
বাবা যখন রোজা রাখতেন, সারাদিন নিজেকে নানা কাজে ব্যস্ত রাখতেন। তবে তাঁর মেজাজের ভয়ে সকলে তটস্থ থাকত। মা চুপচাপ রোজা রাখতেন। শেষরাতে কিছু ফল মিষ্টি খেয়ে সারাদিন সংসারের কাজকর্ম, রান্নাবান্না, সকলকে খেতে দেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে বাবার উপবাস ভঙ্গের ব্যবস্থা করে তবে সন্ধ্যার সময় শরবত খেয়ে রোজা রক্ষা করতেন। কেউ কোনো গোলমাল দেখেনি।
বাবার স্বাস্থ্য নিয়েও মা যথেষ্ট চিন্তা করতেন। সামান্য সর্দিজ্বর বা পেটের অসুখ হলে লঙ্কা পোড়া দিয়ে নজর লাগা কাটাতেন। বলতেন, খারাপ লোকের নজর লেগে গেছে। মা পায়ের ব্যথার একটা টোটকা ওষুধ জানতেন। একটা বাদুড়ের হাড় পায়ের গোড়ালিতে বেঁধে দিতেন। বাবা পায়ের ব্যথায় কষ্ট পেতেন, তাই বাজার থেকে বাদুড়ের হাড় কিনিয়ে আনিয়ে বাবার পায়ে জোর করে বেঁধে দিলেন একবার। নিজেও একটা ধারণ করলেন। বাবার কষ্ট না কমিয়ে নিজের দিকে দৃষ্টি দিলেন না। বাবা বলতেন – আল্লাহ জানে কী হয়। তোমাদের মা যদি পরিয়ে নিশ্চিন্ত হন তাই পরলাম। মুখে বলতেন কুসংস্কার। কিন্তু কয়েকদিন পর বলেন – ‘আরে, আরে! তোমাদের মায়ের ওষুধে সত্যই ব্যথাটা কমেছে।’ বহুদিন এই বাদুড়ের হাড় তাঁর পায়ে বাঁধা ছিল। যখন কুমিল্লায় গেছেন, মায়ের ওই ওষুধ অনেককে দিয়েছেন। মাকে চিঠিতে লিখেছেন –
কল্যাণীয়বর
শ্রীমতিজি, তুমার পত্র পাইলাম, ঐদ্য মঙ্গলবার, তুমার ঔষধ ধারণ করিলাম। নায়েবালিকে দিয়েছি, তুমার মামাকে একটা দিলেম। এখানে বেস আছি, তুমাদের কুশল কামনা করি একপ্রকার। এখানে রূজায় আছি, বেসি লিখবার সময় নেই। বিশ্রাম করে রান্না করিব। ইতি
স্যামি আলাউদ্দিন
মায়ের অসাক্ষাতে বলতেন – তোমাদের মা অনেক টোটকা জানেন। তোমাদের মায়ের একবার মাথা খারাপের ভাব হয়েছিল, অর্থাৎ পাগলের মতো। দেশের একজন কবিরাজ ভালো করে দেয়। সেই কবিরাজের কাছে উনি অনেক টোটকা শিখেছিলেন। আর একবার মা পড়ে গেছেন, মুখে শুধু বললেন – ‘হায় আল্লাহ।’ বাবা শুনে বললেন – ‘নখরা করছে।’ মানে ন্যাকামি করছে। সন্ধ্যাবেলা খবর নিলেন মার ব্যথা কেমন আছে। মাকে একবার কাঁকড়াবিছে কামড়ে ছিল। বাবার কাছে তখন বেশ কিছু অতিথি আছেন। মা কষ্ট সহ্য করে সব কাজ করে যাচ্ছেন। অতিথিরা চলে যেতে বাবা সব অবস্থা দেখে আবার বললেন – ‘নখরা করছে।’ অনেক রাতে কষ্ট বাড়ায় ওষুধ আনা হলো। ভোরবেলায় মা আবার বাবাকে রোজার জোগাড় করে দিলেন। মা আর বাবার মধ্যে এরকম সহোদরসুলভ ভাব ছিল। সকালে বাবা শুধু জিজ্ঞাসা করলেন – ‘এখন কেমন আছস?’ মা বললেন – ‘ভালো।’ ব্যস এইটুকুই। বাবাকেও একবার কাঁকড়াবিছে কামড়েছিল। বাবা কিছুতেই ওষুধ খেতে রাজি হলেন না। কিন্তু বললেন – সত্যিই কাঁকড়াবিছে কামড়ালে কষ্ট হয়! মার কষ্টটা নিজে অনুভব করলেন। কিন্তু মা কিছু বলতে গেলে বললেন – ‘তোর পাপে হয়েছে, তোর অভিমানে বিছে কামড়েছে!’ এই রকম ছেলেমানুষি করতেন বাবা – শুধু মার সঙ্গে।
বাবা যখন বাইরে থাকতেন তখন ভোরবেলায় অথবা রাত্রিবেলায় মা নিয়মিত বাবার ঘরে বসে সেতার বাজাতেন। ছাত্রদের বলতেন – তোমাদের বাবার ঘরে বাজনা বাজছে না, তাই এখানে বসে বাজাই। বাবার বাজনার প্রতি ছিল গভীর শ্রদ্ধা। কোনো অভিযোগ ছিল না এই জীবনের জন্য। পরনিন্দা পরচর্চা বিলাসিতার স্থান ছিল না তাঁর জীবনে। বাবার জীবনের সুখশান্তির জন্যই নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তারই মধ্যে কখনো হারমোনিয়ামে, কখনো সেতারে তুলে নিতেন বাবার শেখানো রাগ-রাগিণী। সারাদিন কর্মব্যস্ততার মধ্যেও জেগে থাকে শিল্পীমন মণিমুক্তা আহরণ করতে। শুধু অভিমান ছিল মনে। বাবা কুমিল্লায় গিয়েছিলেন। ফিরতে অনেকদিন দেরি হওয়ায় মা বলেছিলেন – ‘তোমার বাবাকে লিখে দাও, সারা জীবন কষ্ট দিয়েছেন, শেষ জীবনেও দেবেন। শীঘ্র চলে আসতে বল। যদি না আসেন তা হলে মৈহারে এসে আমাকে আর দেখতে পাবেন না।’
মিথ্যাচার মা সহ্য করতে পারতেন না। বলতেন – ‘দুদিনের বৈরাগী, ভাতেরে কয় অন্ন।’ মা বলতেন, তোমাদের বাবা লোক চিনতে পারেন না। যারা ভেক ধরে, তোমাদের বাবার কাছে তারা প্রিয়। আর যারা প্রাণ দিয়ে সেবা করে তারা বকুনি খায়।
মায়ের নাম মদনিন্নিসা (মদন উন্নিসা)। বাবা নামকরণ করেছিলেন ‘মদনমঞ্জুরী’ রাগের নামে। এটুকু ছিল বাবার ভালোবাসার প্রকাশ। বাবার গৈরিক সন্ন্যাসজীবনে মা ছিলেন রঙের আবরণ। তিনি বাবার বোঝা ছিলেন না। সংসারজীবনে ধরা দিলে বাজনা শেখা বন্ধ হবে – সেই ভয়ে মাকে তিনি ছেড়ে এসেছিলেন, মায়েরই সম্বল পাথেয় করে। মা কিন্তু বাবার পথ রোধ করেননি। তিনি ছিলেন বাবার জীবনের নবরসের উৎসস্থল। বাবা যৎসামান্য যে আত্মজীবনী লিখেছিলেন তার ভেতরে অল্প পরিসরে মায়ের বিষয়ে বলিষ্ঠ উল্লেখ করতে কার্পণ্য করেননি।
বাবা পছন্দ করতেন না, মা বাইরে এসে সংগীত অনুষ্ঠান শোনেন। কিন্তু বাবার শতবর্ষ উপলক্ষে যতক্ষণ বাবা অর্কেস্ট্রাতে বেহালা বাজিয়েছিলেন, ততক্ষণ মা বসে শুনেছিলেন। তারপর চলে আসেন। সংবর্ধনার সময় বাবার সঙ্গে মাও স্টেজে বসেছিলেন। যখন ফটো তোলা হচ্ছিল হঠাৎ বাবা হাসতে হাসতে মাকে বললেন – ‘আরে, একটু কাছে এসে বসো, তোমার আমার ফটো ওঠাচ্ছে।’ মা ঘোমটা টেনে খুব ধীরে বললেন, ‘লজ্জা-শরমের মাথা খেয়েছ।’ এই কথাটা মাইকে ধরা পড়ে গেল। পরে মা বলেছিলেন – এই প্রথম তোমাদের বাবার সঙ্গে একসঙ্গে বসলাম। মা খুব খুশি হয়েছিলেন।
অন্নপূর্ণা দেবীর কাছে কেউ বাজনা শিখতে এলে তিনি বলতেন – মায়ের কাছে গা-া বেঁধে এসো। বাবার জীবনের শেষ পর্যায়ে মা রবিশঙ্করের হাত ধরে বলেছিলেন – অন্নপূর্ণাকে তুমি কষ্ট দিও না। সে তোমার বাবা আর আমার কাছে প্রাণের চেয়ে বড়। সে বাজনা ছাড়া আর কিছু বোঝে না। রবিশঙ্কর কথা দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত রাখেননি।
রবিশঙ্কর তাঁর রাগ অনুরাগ বইয়ে মার কথা কিছুই লেখেননি। শুধু দুটি ছবি আছে। বাবার কাছে সিমকি রবিশঙ্করের জন্য অন্নপূর্ণা দেবীকে প্রার্থনা করেন। বাবা মত দিতে পারেননি নিঃসংকোচে। বলেছিলেন – ‘ওর মাকে বল।’ তাঁরা মায়ের সম্মুখীন হতে পারেননি। মা খোলা চোখে জগৎটা দেখতেন। রবিশঙ্কর কষ্টকর একা থাকার বিবরণ দিয়েছেন; কিন্তু মায়ের আশ্রয়ে আসার কথা বলেননি।
মা লেখাপড়া বেশি শেখেননি। কিন্তু নিজের মনে অনেক বয়েৎ আর গ্রাম্য ছড়া বলতেন। গানের বন্দিশও আওড়াতেন। এই প্রবচন বা ছড়াগুলি গ্রামবাংলার প্রাণের কথা, দু-একটি ছড়া যেমন তিনি বলতেন –
১। মনের মানুষ পাই না বলে
আমি সদাই কেঁদে মরি,
মরি, মরি।
২। গাঁজার নিশা, মদের নিশা
কোন নিশাতে হইলি ভুল
ভাবের নিশায় হইলে পাগল
দিশা নাই, না মুলে।
২। নয়ন হল জলের ভা-
চিত্ত হল অগ্নিকু-
মন হল সমুদ্রের মত
বালুর বাঁধে রাখব কত?
৪। বিন্দে তোর কপাল ভালো
পুষ্প তুলতে কৃষ্ণ পেলে
আন গো ছুরি কপাল চিরি
বিধি কি লিখে গেছে আমার কপালে
৫। কোথায় রে তোর জমিদারি
কোথায় রে টাকা-পয়সা
কোথায় তোর নীল ঘোড়া
একদিন দেখবি রে মন কবরে ঘোর
অন্ধকার।
৬। জী-তে যখন অনেক পিরিতি
মরলে কি সঙ্গে যাইবে মন
কার লাগি বানাইলাম সোনার ঘর?
৭। যতক্ষণ থাকে কায়া
ততক্ষণ থাকে মায়া।
কি করব স্ত্রী পুত্র; কি করব ভাই
মন উইরা গেলে সঙ্গে কেহই নাই।
৮। পুত বিয়োলাম বউকে দিলাম
ঝি বিয়োলাম জামাইকে দিলাম
আমি হলাম বাঁদি, পা ছড়িয়ে কাঁদি।
৯। পেট! তোর জন্য মাথা হেঁট।

এরকম নানা ছড়া নাতি-নাতনি আর ছাত্রদের সামনে বলতেন। সবগুলোতেই গ্রামজীবনের দুঃখ জড়িয়ে আছে।
বাবার মৃত্যুর পর, মাইহারে এক মৌলভি রোজ মাজারে এসে ধূপ জ্বালিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন। একদিন তিনি বলেন – আল্লাহকে দোয়া জানাই, ‘আল্লাহ নূর এ ইলাহি’ – বাবার মাধ্যমে আলো পাঠিয়েছেন। এই আলো জ্বালিয়ে রাখতে মায়ের যে নিরলস কাজ করে যাওয়ার শক্তি – তাও আল্লাহই দিয়েছেন।
মায়ের জন্ম ১৮৮৯ সালে। ১৯৮৯ সালের ১২ নভেম্বর শতবর্ষপূর্ণা মায়ের মহাজীবন পূর্ণ বিরাম লাভ করে। তাঁর অস্তিত্বকে মর্যাদা না দিলে বাবার ব্যক্তিসত্তা পূর্ণতা পাবে না।

Leave a Reply