বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ২০১৯

২০১৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত জেমস পিবল্স (James Peebles), সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত মিশেল মাইয়ো (Michel Mayor) এবং জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ডিডিয়ার কিলোজ (Didier Queloz)। পিবল্স ১৯৩৫ সালে কানাডার উইনিপেগে, মাইয়ো ১৯৪২ সালে সুইজারল্যান্ডের লুসানে এবং কিলোজ ১৯৬৬ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জন্মগ্রহণ করেন। রাজকীয় সুইডিশ বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি তাদের ৮ অক্টোবর ২০১৯ তারিখের প্রেস রিলিজে উল্লেখ করে যে, ‘for contributions to our understanding of the evolution of the universe and Earth’s place in the cosmos’-এর জন্য এই তিন পদার্থবিজ্ঞানীকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। সুইডিশ বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি আরো উল্লেখ করে যে, জেমস পিবল্স ‘for theoretical discoveries in physical cosmology’-র জন্য পুরস্কারের অর্ধেক অর্থ অর্থাৎ চার দশমিক পাঁচ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার এবং মিশেল মাইরো ও ডিডিয়ার কিলোজ ‘for the discovery of an exoplanet orbiting a solar-type star’-এর জন্য পুরস্কারের বাকি অর্ধেক অর্থ সমানভাবে ভাগ করে নেবেন। ২০১৯ সালে রসায়নবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত জন বি. গুডএনাফ (John B. Goodenough), যুক্তরাষ্ট্রের বিনিংহাম এবং স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কে কর্মরত এম. স্ট্যানলি উইটিংহাম (M. Stanley Whittingham) এবং জাপানের মিজো ইউনিভার্সিটি ও আশাই কাসি করপোরেশনে কর্মরত আকিরা ইয়োশিনো। গুডএনাফ ১৯২২ সালে জার্মানির জেনা শহরে, উইটিংহাম ১৯৪১ সালে ইংল্যান্ডের নটিংহামে এবং ইয়োশিনো ১৯৪৮ সালে জাপানের সুইটা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। রাজকীয় সুইডিশ বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি তাদের ৯ অক্টোবর ২০১৯ তারিখের প্রেস রিলিজে উল্লেখ করে যে, ‘for the development of
lithium-ion batteries’-এর জন্য এই তিন রসায়নবিজ্ঞানীকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কারের নয় মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার এই তিন বিজ্ঞানী সমানভাবে ভাগ করে নেবেন।
২০১৯ সালের জন্য, শারীরবৃত্ত বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলে কর্মরত উইলিয়াম জি. কেইলিন (William G. Kaelin), ফ্রান্সিস ক্রিক ইনস্টিটিউট ও টার্গেট ডিসকভারি ইনস্টিটিউটে কর্মরত স্যার পিটার জে. র‌্যাটক্লিফ (Sir Peter J. Ratcliffe) এবং জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত গ্রেগ এল সিমেনজা (Gregg L. Semenza)। কেইলিন ১৯৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে, র‌্যাটক্লিফ ১৯৫৪ সালে ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ারে এবং সিমেনজা ১৯৫৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন। সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি তাদের ৭ অক্টোবর ২০১৯ তারিখের প্রেস রিলিজে উল্লেখ করে যে, ‘for their discoveries of how cells sense and adapt to Oxygen availability’-এর জন্য এই তিন বিজ্ঞানীকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কারের নয় মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার এই তিন বিজ্ঞানী সমানভাবে ভাগ করে নেবেন। এই প্রবন্ধে উপরোল্লিখিত নোবেল পুরস্কার স্বীকৃত গবেষণার ওপর বিশদ আলোচনা করব।

পদার্থবিজ্ঞান
আধুনিক মহাবিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্ব আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্বের শুরু এক মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের লেখক এডগার অ্যালান পো ১৮৪৭ সালে প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থ Eureka : A Prose Poem-এ প্রথম উল্লেখ করেন যে, মহাবিশ্বের শুরু একটি বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে। তাঁর এই কল্পনাপ্রসূত উক্তিই এখন বিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে মেনে নেওয়া হয়। ১৯২২ সালে রাশিয়ার পদার্থবিজ্ঞানী আলেক্সান্ডার ফ্রিডম্যান (Friedmann) আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রয়োগ করে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ সম্পর্কে এক গাণিতিক তত্ত্ব প্রকাশ করেন। তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী, আমরা যেদিকেই দৃষ্টিপাত করি না কেন, মহাবিশ্বের গঠন একই রকম দেখাবে। ১৯২৯ সালে এডউইন হাব্ল দেখান যে, তারকামণ্ডলীগুলো ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে এবং দূরগমনের গতিবেগ তারকামণ্ডলীর মধ্যে দূরত্বের সমানুপাতিক। এর অর্থ হলো, মহাবিশ্ব স্থিতাবস্থায় নেই। মহাবিশ্ব আসলে প্রসারমান। তাই ছায়াপথগুলির অন্তর্বর্তী দূরত্ব সবসময়ই বেড়ে চলেছে এবং বস্তুর ঘনত্ব সময়ের সঙ্গে কমছে। যদি তাই হয় তাহলে তো শুরুতে মহাবিশ্বের সব পদার্থ এক জায়গায় ছিল এবং পদার্থের ঘনত্ব ছিল অসীম। তখন এক মহাবিস্ফোরণের ফলেই মহাবিশ্ব প্রসারণশীল হয়। আলফার, বেথে এবং গ্যামো ১৯৪৬ সালে এই তত্ত্বকে বিগ ব্যাং তত্ত্ব নামে অভিহিত করেন। ১৯৪৮ সালে হয়েল, বন্ডি এবং গোল্ড এক বিকল্প মডেলের প্রস্তাব করেন, যার নাম স্থিরাবস্থা মডেল। এই মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বে সবসময়ই নতুন পদার্থের সৃষ্টি হচ্ছে ও মহাবিশ্বের পদার্থের ঘনত্ব কমছে বা বাড়ছে না, বরং স্থিতাবস্থায় আছে। এই দুই মডেল নিয়ে বিতর্ক চলেছে বহুদিন। ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বেল ল্যাবরেটরিতে মাইক্রো তরঙ্গ নিয়ে কাজ করার সময় আর্নো পেনজিয়াস এবং রবার্ট উইলসন তাঁদের ব্যবহৃত শনাক্তকারী যন্ত্রে এক ধরনের শব্দ শুনতে পান। এই শব্দ কোনো বিশেষ দিক থেকে আসছে বলে তাঁদের মনে হয়নি। কারণ গ্রাহকযন্ত্রের অ্যান্টেনা যে-অভিমুখেই রাখা হয় সে-অভিমুখেই শব্দ পাওয়া গেল। প্রায় একই সময়ে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজন পদার্থবিজ্ঞানী বব ডিক এবং জেমস পিবল্স মাইক্রোতরঙ্গবিষয়ক জর্জ গ্যামোর একটি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছিলেন। এই গবেষকদলের সঙ্গে যোগাযোগ করে পেনজিয়াস এবং উইলসন জানতে পারেন যে, পিবল্স ও তাঁর সহযোগীরা মহাবিশ্বের তাপীয় স্বাভাবিক বিকিরণের (Thermal background radiation) গণনা-সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র ১৯৬৫ সালের ৭ মে অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটারসে প্রকাশ করেছেন। যদিও ওই গবেষণাপত্রেও পিবল্স মহাজাগতিক বিকিরণের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছু উল্লেখ করেননি; কিন্তু পেনজিয়াস ও উইলসন তাঁদের পরীক্ষণলব্ধ ফলাফলের এক মহাজাগতিক ব্যাখ্যা সেই পত্রে পান। পেনজিয়াস ও উইলসন এভাবেই শনাক্ত করেন মহাজাগতিক বিকিরণের অস্তিত্ব। এবং এজন্য ১৯৭৮ সালে তাঁদের নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই বিকিরণ সবদিকেই প্রায় সমান, যা ফ্রিডম্যানের অনুমানের সত্যতা প্রমাণ করে। ১৯৬৫ সালের ১৩ মে অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটারসে তাঁদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।
এদিকে পিবল্স ১৯৬৫ সালের ৪ মার্চ অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নালে ‘The black-body radiation content of the universal and the formation of galaxies’ শীর্ষক আরেকটি প্রবন্ধ পাঠান, যা ওই বছরের ১৫ নভেম্বর প্রকাশিত হয়। ওই প্রবন্ধে পিবল্স মহাবিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্বের একটি গাণিতিক কাঠামো উপস্থাপন করেন এবং মহাজাগতিক সাধারণ বিকিরণের (cosmic background radiation) অস্তিত্ব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেন। পিবল্স উল্লেখ করেন যে, বিকিরণের তাপমাত্রা থেকে জানা যাবে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের পর কী পরিমাণ বস্তুকণা সৃষ্টি হয়েছিল এবং তা থেকে কীভাবে অন্যান্য ছায়াপথ সৃষ্টি হলো। পিবল্স তাঁর গাণিতিক কাঠামো ব্যবহার করে মহাবিশ্বের আকার এবং এতে বস্তু ও শক্তির পরিমাণ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেন। তাঁর গণনা অনুযায়ী, মহাবিশ্বে শতকরা পাঁচ ভাগ বস্তু, ২৬ শতাংশ কৃষ্ণবস্তু (Dark Matters) এবং ৬৯ শতাংশ কৃষ্ণশক্তি (Dark Energy) রয়েছে। ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কোব উপগ্রহ (Cosmic Background Explorer – COBE) মহাবিশ্বের একটি চিত্র ধারণা করে। পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রেরিত উইলকিনসন মাইক্রোওয়েভ অ্যানিসোট্রপি প্রোব বা WMAP এবং ইউরোপের প্ল্যাংক উপগ্রহ মহাবিশ্বের একটি চিত্র গ্রহণ করে, যার সঙ্গে পিবল্‌সের গণনার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মহাজাগতিক মাইক্রোতরঙ্গের সাধারণ বিকিরণ পরিমাপের মাধ্যমে মহাবিশ্বের গঠন নিরূপণ, চিত্র : ১ দ্রষ্টব্য, যা WMAP থেকে প্রাপ্ত। পিবল্সের গাণিতিক কাঠামো ব্যবহার করে মহাকাশবিজ্ঞানীরা এখন মহাজাগতিক বিকিরণের তারতম্য এবং বস্তু ও শক্তির ওপর প্রভাব ইত্যাদি বিষয় নির্ভুলভাবে গণনা করতে পারেন। পিবল্‌সের Physical Cosmology গ্রন্থ, যা ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয়, তা মহাকাশবিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত। তাঁর নামে একটি গ্রহাণুর নাম করা হয়েছে ‘Asteroid 18242 Peebles’।
কৃষ্ণবস্তু ও কৃষ্ণশক্তি মহাকাশবিজ্ঞানীদের কাছে একটি বিস্ময়কর বিষয়। ১৯১৫ সালে আইনস্টাইন যখন সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব আবিষ্কার করেন, তখন তিনি তাঁর সমীকরণে একটি ধ্রুবক, যাকে বলা হয় কসমোলজিক্যাল ধ্রুবক, ব্যবহার করেছিলেন। আইনস্টাইন মনে করতেন, স্থান-কালের ভেতরে এক ধরনের অন্তর্নিহিত প্রসারণ প্রবণতা রয়েছে। এর ফলে স্থির মহাবিশ্ব। কিন্তু পরে দেখা গেল মহাবিশ্ব স্থির নয়, বরং সম্প্রসারণশীল। কিন্তু পিবল্স ১৯৮৪ সালে দেখান যে, আইনস্টাইনের কসমোলজিক্যাল ধ্রুবককে শূন্যস্থানের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় এবং ৬৯ শতাংশ শূন্য স্থান হচ্ছে
কৃষ্ণশক্তি। ১৯৯৮ সালে পার্লমুটার, স্মিথ এবং রিজের গবেষণা থেকে জানা গেল যে, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের মধ্যে এক ধরনের ত্বরণ রয়েছে। এই ত্বরণ কৃষ্ণশক্তির কারণে হয় বলে ধারণা করা হয়। এখানে উল্লেখ্য, মহাবিশ্বে বিদ্যমান কৃষ্ণবস্তু ও কৃষ্ণশক্তি নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে এবং এর রহস্য উদ্ঘাটন অত্যন্ত জরুরি।
অপরদিকে মিশেল মাইয়ো এবং ডিডিয়ার কিলোজ ১৯৯৫ সালের ৬ অক্টোবর ইতালির ফ্লোরেন্সে অনুষ্ঠিত মহাকাশবিজ্ঞানীদের এক সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে, তাঁরা ছায়াপথে (Milky Way), একটি বহির্গ্রহের (Exoplanet) স্থান পেয়েছেন, যা আমাদের সৌরমণ্ডলীর বাইরে সূর্যের মতো একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। তাঁদের এই আবিষ্কৃত গ্রহের নাম ৫১ পেগাসাই বি (51 Pegasi b)। এটি ৫১ পেগাসাই নক্ষত্রকে প্রতি চারদিনে একবার প্রদক্ষিণ করছে। এই বহির্গ্রহটি পৃথিবী থেকে ৫০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এবং কেন্দ্র থেকে এর দূরত্ব ৮ মিলিয়ন কিলোমিটার। তাছাড়া তাপমাত্রা প্রায় ১০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এই গ্রহের আকার বৃহস্পতি গ্রহের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ছায়াপথে এই বহির্গ্রহ এবং নক্ষত্রের অবস্থান চিত্র ২-এ দেখা যায়। এই আবিষ্কারের পর জ্যোতির্বিদরা আরো প্রায় চার হাজার বহির্গ্রহের সন্ধান পেরেছেন। কিন্তু আমাদের এই মহাজাগতিক প্রতিবেশীদের মাইয়ো ও কিলোজ কীভাবে আবিষ্কার করলেন তা দেখা যাক। বহির্গ্র্রহকে শনাক্ত করতে হলে প্রয়োজন অত্যন্ত আধুনিক পদ্ধতি। তার কারণ গ্রহ নিজে কোনো আলো বিকিরণ করে না, শুধু আলো প্রতিফলিত হয়। এই অবস্থায় মাইয়ো ও কিলোজ যে-পদ্ধতি ব্যবহার করেন তার নাম Radial Velocity Method বা অরীয় বেগ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ধারক নক্ষত্রের চলাচলের ওপর বহির্গ্রহের মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়। বহির্গ্রহ যখন তার কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করে, তখন ধারক নক্ষত্রও মাধ্যাকর্ষণের সাধারণ কেন্দ্রের চারপাশে স্থানান্তরিত হয়। পৃথিবীর পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে মনে হবে নক্ষত্র সামনে এবং পেছনে নড়াচড়া করছে। এই অবস্থায় নক্ষত্রের অরীয় বেগ ডপলার অভিক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ণয় করা যায়। নক্ষত্র থেকে আলোকরশ্মি পর্যবেক্ষকের কাছে এলে দেখা যাবে নীল এবং পর্যবেক্ষক থেকে দূরে চলে গেলে দেখা যাবে লাল রং। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অরীয় বেগ নির্ণয় করা, কারণ অরীয় বেগ অত্যন্ত কম। যেমন আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত সূর্যের ওপর পৃথিবীর প্রভাব প্রতি সেকেন্ডে ০.০৯ মিটার। সুতরাং অরীয় বেগ পদ্ধতি ব্যবহার করে পৃথিবীর মতো গ্রহ আবিষ্কার করতে হলে যে-যন্ত্র ব্যবহার করা প্রয়োজন, তা হতে হবে অত্যন্ত সুবেদী। ১৯৭৭ সালে মাইয়ো দুরবিন যন্ত্রের সঙ্গে সংবেদনশীল স্পেক্ট্রোগ্রাফ ব্যবহার শুরু করেন। পরবর্তীকালে নব্বইয়ের দশকে জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইয়োর অধীনে পিএইচ.ডি করতে আসা ডিডিয়ার কিলোজ তৈরি করেন অত্যন্ত সংবেদনশীল স্পেক্ট্রোগ্রাফ। তিনি তাঁর যন্ত্রে ব্যবহার করেন অপটিক্যাল ফাইবার এবং সিসিডি। এই যন্ত্রের মাধ্যমে মাইয়োর এবং কিলোজ ৫১ পেগাসাই বি-এর চিত্র ধারণ করতে সমর্থ হন। তাঁদের ব্যবহৃত যন্ত্রের বিন্যাস চিত্র ৩-এ দ্রষ্টব্য। বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেন যে, এ-পর্যন্ত যত বহির্গ্রহ আবিষ্কার হয়েছে তাদের আকার এবং কক্ষপথ ভিন্ন ভিন্ন। তাই মনে করা হয়, যে-ভৌত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রহসমূহের জন্ম হয়েছে তা সম্পর্কে আমাদের জানার ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ এ-বিষয়ে যে তাত্ত্বিক ও গাণিতিক ধারণা রয়েছে তা আবার পুনর্নিরীক্ষণের প্রয়োজন।

রসায়নবিজ্ঞান
বৈদ্যুতিক শক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য। ১৭৯৯ সালে ইতালির বিজ্ঞানী অ্যালেসেন্ড্রো ভোল্টা (Alessandro Volta) জিংক ও কপার ব্যবহার করে প্রথম বৈদ্যুতিক ব্যাটারি তৈরি করেন, যার নাম ‘Alessandro Volta’ (চিত্র ৪ দ্রষ্টব্য)। ভোল্টার নামানুসারেই বৈদ্যুতিক বিভবের পার্থক্যের একক হচ্ছে ভোল্ট। এ-ধরনের ব্যাটারি আকারে বড়, বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা কম (০.৮-১.১ ভোল্ট) এবং পুনঃচার্জযোগ্য (Rechargeable) নয়। তারপর লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি আবিষ্কার হয় এবং এ নিয়ে গবেষণার জন্য রসায়নবিজ্ঞানে ‘ইলেকট্রোকেমিস্ট্রি’ নামে একটি শাখা চালু হয়। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পেট্রলচালিত গাড়ি ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। এতে দুটি সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমত, বায়ুদূষণ এবং দ্বিতীয়ত, পেট্রল নবায়নযোগ্য জ্বালানি নয়, তাই এই সম্পদ সীমিত। বৃহৎ তেল কোম্পানি এক্সসন (Exxon) অদূরভবিষ্যতে তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে বলে ধারণা করে। তাই পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানির সন্ধান এবং বিকল্প প্রযুক্তির আবিষ্কার-সংক্রান্ত গবেষণায় বড় বড় কোম্পানি অর্থায়নকল্পে এগিয়ে আসে। এক্সসন বিকল্প জ্বালানি-সংক্রান্ত গবেষণা কাজ শুরু করলে স্ট্যানলি উইটিংহাম স্ট্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে এক্সসন কোম্পানিতে যোগদান করেন। উইটিংহাম লক্ষ করেন, সে-সময় ভারি লেড ব্যাটারি এবং নিকেল-ক্যাডমিয়াম ব্যাটারি ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি গবেষণাগারে অতিপরিবাহী পদার্থ টেনটেলাম ডাই সালফাইড নিয়ে কাজ করতে গিয়ে লক্ষ করেন, এর অভ্যন্তরে পারমাণবিক স্থানে কোনো আয়ন প্রবেশ করলে সেই পদার্থের পরিবাহকত্ব বৃদ্ধি পায়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘Intercalation’ বা আন্তঃস্থাপন পদ্ধতি। উইটিংহাম প্রথমে পটাশিয়াম আয়ন ব্যবহার করে লক্ষ করেন, টেনটেলাম ডাই সালফাইডের পরিবাহকত্বের পরিবর্তন ঘটে এবং এর শক্তির ঘনত্ব অনেক বেশি। তারপর উইটিংহাম চিন্তা করলেন যে, একটি ব্যাটারিতে ঋণাত্মক ইলেকট্রোড বা অ্যানোড থেকে ইলেকট্রন ধনাত্মক ইলেকট্রোড বা ক্যাথোডের দিকে গমন করে। সুতরাং অ্যানোড সেই পদার্থের হওয়া উচিত, যে-পদার্থ সহজে ইলেকট্রন অবমুক্ত করতে পারে।
১৮১৭ সালে সুইডিশ রসায়নবিদ আর্ফউয়েডসন (Arfwedson) এবং বার্জিলিয়াস (Berzelius) স্টকহোমের অনতিদূরে ওটো (Oto) খনিতে এক ধরনের খনিজ পদার্থের সন্ধান পান। এই পদার্থকে বিশুদ্ধ করার পর এক নতুন মৌলের সন্ধান পেলেন, যার নাম দেওয়া হলো লিথিয়াম। গ্রিক ভাষায় পাথরকে বলা হয় ‘litho’। তা থেকেই নামকরণ। পর্যায় সারণিতে যেসব কঠিন মৌল রয়েছে তার মধ্যে লিথিয়ামই সবচেয়ে হালকা মৌল। এর পারমাণবিক ধর্ম পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এই মৌলের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি প্রোটন এবং বাইরের বিভিন্ন বলয়ে রয়েছে তিনটি ইলেকট্রন। এই ইলেকট্রনগুলোর মধ্যে ভেতরের বলয়ে দুটি এবং বাইরের বলয়ে একটি ইলেকট্রন রয়েছে। বাইরের বলয়ের একটি ইলেকট্রন সহজে অবমুক্ত হয়ে লিথিয়াম, লিথিয়াম আয়নে রূপান্তরিত হতে পারে বলে লিথিয়ামের সক্রিয়তা অনেক বেশি। স্ট্যানলি উইটিংহাম লিথিয়াম মৌলের এই ধর্ম সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। উইটিংহাম নিউইয়র্কে অবস্থিত এক্সসনের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে তাঁর গবেষণা প্রকল্পের প্রস্তাব উপস্থাপন করলেন। কোম্পানি তাঁর গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়নে রাজি হলো। শুরু হলো লিথিয়াম নিয়ে কাজ। অল্প কিছুদিনের মধ্যে উইটিংহাম তৈরি করলেন পুনঃচার্জযোগ্য লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি। ব্যাটারিতে অ্যানোড হিসেবে ব্যবহার করেন লিথিয়াম এবং ক্যাথোড হিসেবে ব্যবহার করেন টাইটেনিয়াম ডাই সালফাইড। টেনটেলামের চেয়ে টাইটেনিয়াম হালকা এবং হালকা ব্যাটারির চাহিদা বেশি হবে বলে তিনি মনে করেন। তাছাড়া তড়িৎ বিশ্লেষ্য (Electrolyte) হিসেবে ব্যবহার করেন লিথিয়াম হেক্সা ফ্লোরো ফসফেইট (LiPF6) এবং দ্রাবক হিসেবে ব্যবহার করেন প্রোপাইলিন কার্বোনেট। এই পুনঃচার্জযোগ্য ব্যাটারির তড়িৎচালিত শক্তি ২ ভোল্টের কিছু বেশি পাওয়া গেল। এটিই প্রথম হালকা লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি, যা বারবার চার্জ করে ব্যবহার করা সম্ভব হলো। এই ব্যাটারির বিভিন্ন অংশের বিন্যাস চিত্র ৫-এ দেখা যায়। কিন্তু সমস্যা দাঁড়ালো এই যে, দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে এই ব্যাটারিতে লিথিয়াম ডেনড্রাইট নামক যৌগ তৈরি হয়, যা থেকে আগুন ধরে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। সত্তরের দশকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত জন গুডএনাফ উইটিংহামের আবিষ্কৃত ব্যাটারির উন্নয়নকল্পে কাজ শুরু করেন। তিনি লক্ষ করেন, ব্যাটারির ক্যাথোডে ধাতুর ডাই সালফাইডের পরিবর্তে যদি ধাতব অক্সাইড ব্যবহার করা যায় তাহলে উচ্চ তড়িৎশক্তি পাওয়া সম্ভব। সুতরাং গুডএনাফ ক্যাথোড হিসেবে ব্যবহার করেন লিথিয়াম কোবাল্ট অক্সাইড এবং দেখা গেল তড়িৎশক্তি বৃদ্ধি পেয়ে ৪ ভোল্ট হয়েছে। গুডএনাফের ব্যাটারির বিভিন্ন অংশের বিন্যাস চিত্র ৬ দ্রষ্টব্য। গুডএনাফ দেখান যে, ব্যাটারিকে চার্জ অবস্থায় তৈরি করার প্রয়োজন নেই বরং একে পরে চার্জ দেওয়া সম্ভব। ১৯৮০ সালে গুডএনাফের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় এবং একে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের চিন্তাভাবনা শুরু হয়।
এদিকে জাপানের ইলেকট্রনিক কোম্পানিগুলো হালকা পুনঃচার্জযোগ্য ব্যাটারি তৈরির নানা চেষ্টা চালিয়ে যায় এবং তারা চেষ্টা করে কীভাবে পুনঃচার্জযোগ্য ব্যাটারি কম্পিউটার, টেলিফোন এবং ভিডিও ক্যামেরায় ব্যবহার করা যায়। সে-সময় আশাই কাসি করপোরেশনে কর্মরত আকিরা ইয়োশিনো লিথিয়াম কোবাল্ট অক্সাইডের ক্যাথোড এবং বিভিন্ন কার্বনগঠিত যৌগের তৈরি অ্যানোড দিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন। ইয়োশিনোর ইউরেকা মুহূর্ত আসে তখন, যখন তিনি পেট্রোলিয়ামজাত কোক অ্যানোড হিসেবে ব্যবহার করেন, যাতে আন্তঃস্থাপন করা হয় লিথিয়াম। এভাবেই আকিরা ইয়োশিনো প্রথম বাণিজ্যিকভাবে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি তৈরি করেন। এই ব্যাটারির বিভিন্ন অংশের বিন্যাস চিত্র ৭-এ দ্রষ্টব্য। ১৯৯১ সাল থেকে জাপানের ইলেকট্রনিক কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিকভাবে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি বাজারজাত শুরু করে। পরবর্তীকালে জন গুডএনাফ কোবাল্ট অক্সাইডের পরিবর্তে আরেকটি পরিবেশবান্ধব যৌগ আয়রন ফসফেট ক্যাথোড হিসেবে ব্যাটারিতে ব্যবহার করেন।

শারীরবৃত্ত বা চিকিৎসাবিজ্ঞান
আমাদের বায়ুমণ্ডলের শতকরা প্রায় ২১ ভাগ অক্সিজেন। ১৭৭০-এর দশকে সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল শিল (Carl Scheele) এক গণনার মাধ্যমে দেখান যে, বায়ুমণ্ডলে এমন এক পদার্থ আছে যা অন্য পদার্থকে দহন করতে সহায়তা করে। এজন্য শিল এই পদার্থের নাম দেন ‘Fire air’। প্রায় একই সময়ে ইংল্যান্ডে জোসেফ প্রিস্টলি বাতাসকে বিশুদ্ধ করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। অন্যদিকে ১৭৭৭ সালে ল্যাঁভয়েসিয়ার প্যারিসের ল্যাবরেটরিতে শিল এবং প্রিস্টলির সহায়তায় একটি গ্যাসীয় পদার্থ বাতাস থেকে পৃথক করতে সমর্থ হন। এই গ্যাসীয় পদার্থকেই আমরা অক্সিজেন বলে জানি, যার রাসায়নিক সংকেত O2।
অক্সিজেন প্রাণীদেহের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি উপাদান। এটি জারণ ক্রিয়ার মাধ্যমে খাদ্যের পুষ্টিকারককে এডিনোসিন ট্রাই ফসফেইডে (এটিপি) রূপান্তরিত করে। এটিপি কোষের মধ্যে শক্তি সরবরাহ করে, যার মাধ্যমে কোনো প্রাণীর দেহে বিপাকক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এই কাজ সম্পাদন করতে প্রাণীকোষে অক্সিজেনের প্রাপ্যতা একটি অন্যতম বিষয়। ১৮৫৮ সালে লুই পাস্তুর দেখান যে, প্রাণীকোষে অক্সিজেন বিভিন্ন পথের মাধ্যমে শক্তির রূপান্তরের কাজটি সম্পন্ন করে। প্রাণীকোষে, অক্সিজেনের ভূমিকা এবং এর কলাকৌশল আবিষ্কারের জন্য ইতিপূর্বে ১৯৩১ সালে অটো ওয়ারবার্গ (Otto Warburg) এবং ১৯৩৮ সালে করনেলি হেমেনকে (Corneille Heymans) চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।
অক্সিজেনের তারতম্যের মধ্যে বিপাকক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য দেহকোষে এক ধরনের অভিযোজন প্রক্রিয়া রয়েছে। যেমন অতি উচ্চতায় মানবদেহের রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণের তারতম্যকে উপলব্ধি করার জন্য কিডনিতে এক ধরনের বিশেষ কোষ রয়েছে, যা হরমোন, ইরিথ্রোপোটিন (EPO) অবমুক্ত করে। এই হরমোন রক্তে লোহিত কণিকা তৈরি করতে সহায়তা করে। প্রাণীদেহ কোষেও অক্সিজেনের তারতম্যের মধ্যে বেঁচে থাকার জন্য অভিযোজনের কলাকৌশল রয়েছে। আণবিক পর্যায়ে এই কলাকৌশল কী – তা আবিষ্কার করা, এ-বছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ীদের কাজ।
প্রাণীকোষের আশেপাশে অক্সিজেনের পরিমাণে তারতম্য ঘটলে তাদের জিনের অভিব্যক্তির মধ্যে পরিবর্তন দেখা যায়। এর ফলে কোষের বিপাকক্রিয়ার মধ্যে পরিবর্তন সূচিত হয়। তাছাড়া কোষকলার পুনর্বিন্যাস হতে পারে এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বৃদ্ধি পেতে পারে। ১৯৯০-এর দশকে গ্রেগ সিমেনজা কোষে অক্সিজেনের তারতম্যের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণকারী উপাদান, যাকে বলা হয় ‘Transcription factor’ তা শনাক্ত করেন। তিনি এই উপাদানের নাম দেন HIF বা Hypoxia-inducible factor। এই উপাদানের দুটি অংশ রয়েছে। একটি হচ্ছে অক্সিজেনের তারতম্যে প্রতিক্রিয়াশীল অংশ HIF-1 আলফা এবং অপর অংশ অক্সিজেন নিয়ন্ত্রণকারী নয় এমন প্রোটিন, যার নাম ARNT অর্থাৎ Aryl Hydrocarbon Receptor Nuclear Translocator। যখন প্রাণীকোষের মধ্যে অক্সিজেনের পরিমাণ বেশি হয়, তখন কোষে HIF-1 আলফা-এর পরিমাণ কম হয় এবং অক্সিজেনের পরিমাণ যখন কম হয় তখন HIF-1 আলফা-এর পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এভাবেই ঊচঙ জিন নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু ক্ষুদ্র পেপটাইড ইউবিকুটিন (Ubiquitin) কীভাবে অক্সিজেনের তারতম্যের মধ্যে কাজ করে তা ছিল মূল প্রশ্ন।
ক্যান্সার গবেষক উইলিয়াম কেইলিন জিনেটিক রোগ ‘Von Hippel-Lindau’ সংক্ষেপে বলা হয় VHL নিয়ে কাজ করার সময় লক্ষ করেন, VHL জিন কোষে অক্সিজেনের তারতম্যের প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ১৯৯৯ সালে পিটার র‌্যাটক্লিফ দেখান যে, VHL এবং HIF-1 আলফা-এর মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। VHL-এর জিন, HIF-1 আলফাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং অক্সিজেনের তারতম্যে প্রতিক্রিয়াশীল। কেইলিন এবং র‌্যাটক্লিফের গবেষক দল যৌথভাবে দেখান যে, VHL-এর জিন দ্বারা HIF-1 আলফার নিয়ন্ত্রণ HIF-1 আলফা-এর হাইড্রোক্সিলেশনের ওপর নির্ভর করে এবং এই প্রক্রিয়া কোষের অক্সিজেনের ওপর নির্ভরশীল। সিমেনজা, কেইলিন এবং র‌্যাটক্লিফের গবেষণা কাজ থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, প্রাণীকোষে অক্সিজেনের পরিমাণের তারতম্যের সঙ্গে জিনের অভিব্যক্তি সম্পর্কিত এবং HIF ট্রান্সক্রিপশন উপাদান প্রাণীদেহে বিপাক প্রক্রিয়া সম্পাদনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

পরিশেষে, এ-বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার-স্বীকৃত গবেষণা মহাবিশ্বে আমাদের প্রতিবেশী অন্যান্য গ্রহের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত করেছে এবং মহাবিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্বের গাণিতিক কাঠামোর মাধ্যমে সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের গঠনের রহস্য উদ্ঘাটনে সহায়তা করেছে। এ-বছর রসায়নবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানিবিহীন সমাজ গঠনে বলিষ্ঠ অবদান রেখেছে। মোবাইল ফোন এবং কম্পিউটার থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণ প্রকল্পে এর অবদান সর্বজনস্বীকৃত। এ-বছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার-স্বীকৃত গবেষণা জানিয়েছে, প্রাকৃতিক অভিযোজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কীভাবে প্রাণীদেহ কোষে অক্সিজেনের তারতম্যের মধ্যেও বিপাকক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে। বিজ্ঞানীদের এই গবেষণা ও আবিষ্কার আগামীদিনে মানবকল্যাণে আরো সুফল বয়ে আনবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সহায়ক তথ্যপঞ্জি ও চিত্রঋণ
পদার্থবিজ্ঞান
১. The Royal Swedish Academy of Sciences Press Release dated 8 October 2019 on ‘The Nobel Prize in Physics 2019’ (Accessed at http:www.nobelprize.org on 2 January 2020).
২. The Nobel Committee for Physics (2019) Physical Cosmology and an Exoplanet Orbiting a solar-type star (Accessed at http:www.nobelprize.org on 2 January 2020).
৩. E. A. Poe (1847), Eureka : A Prose Poem, GEO. P. PUTNAM, New York.
৪. Peebles, P. J. E (1965), ‘The black-body radiation content of the Universe and the formation of galaxies’, Astrophysical Journal, 142, 1317.
৫. Mayor, M and Queloz, D (1995), ‘A Jupiter-mass companion to a solar-type star’, Nature, 378, 355.

রসায়নবিজ্ঞান
৬. The Royal Swedish Academy of Sciences Press Release dated 9 October 2019 on ‘The Nobel Prize in Chemistry 2019’ (Accessed at http:www.nobelprize.org on 5 January 2020).
৭. Ramstrom, Olof (2019), Lithium ion Batteries, The Royal Swedish Academy of Sciences, Stockholm (Accessed at http:www.nobelprize.org on 5 January 2020).
৮. Whittingham, M. S (1978), ‘Chemistry of Intercalation Compounds : Metal Guests in Chalcogenide Hosts’, Progress in Solid State Cheistry., 12 (1), p 41-99.

চিকিৎসাবিজ্ঞান
৯. The Nobel Assembly at Karolinska Institute Press Release dated 7 October 2019 on ‘The 2019 Nobel Prize in Physiology or Medicine’ (Accessed at http:www.nobelprize.org on 10 January 2020)
১০. Johnson, R. S (2019), ‘Scientific Background: Haw cells sense and adapt to oxygen availability’, The Nobel Assembly at Karolinska Institute, Stockholm (Accessed at http:www.nobelprize.org on 10 January 2020).

চিত্রঋণ
চিত্র : ১ ন্যাশনাল অ্যারোনটিকস অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নাসা)।
চিত্র : ২-৩ রাজকীয় সুইডিশ বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি।
চিত্র : ৪ উইকিপিডিয়া।
চিত্র : ৫-৭ রাজকীয় সুইডিশ বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি।

অন্যান্য ছবি নোবেল মিডিয়া, দ্য নোবেল ফাউন্ডেশন থেকে প্রাপ্ত।

Leave a Reply