কবিতা
-
মনাভিমন্যু
রণে পার্থ কাঁদে একা, সখা দেখা দাও,গাণ্ডীব লাগছে ভার, পরান অসাড়! যুযুমান এ জীবন, আর কত বই!সংসার জতুগৃহ, নিষ্কৃতি মিলাও। রথ তুমি বয়ে চলো, পিছে আমি রই,পথের দিশারী তুমি, অনুগামী হই। কুরুক্ষেত্র দূরে নয়, হৃদি যুদ্ধাক্রান্ত,নিজের বিরুদ্ধে যুঝে, শোকাতুর পার্থ। এ জীবন চক্রব্যুহ, মন অভিমন্যু,ঢুকেছে শিবিরে একা, না জেনে কৌশল। শরীরে রয়েছে লেখা, শরীরের ঋণ,হৃদয়ে…
-
অস্থায়ী ঠিকানা
ভাড়াবাড়ির দেয়ালে পেরেকের পুরনো দাগচিঠির বাক্সে জমে থাকে চিরচেনা ধুলো।নাম বদলাই, স্থান বদলাই,মোবাইলের সিম কার্ডের মেয়াদ ফুরোয়।বারান্দায় শুকোতে রাখা শার্টের মতোদুপুরের রোদে ঝুলে থাকে পরিচয়।একসময় যে উঠোনে ডাক পড়তো নামে,সেখানে এখন আগাছা ও নীরবতা।নদী বদলেছে পাড়, শহর বদলেছে মানচিত্র,আমিও বদলেছি ঠিকানা অগণনবার।না-খোলা চিঠিতে জমে থাকে পুরনো দেশ,অপঠিত কিছু আহ্বান, কিছু অনুতাপ।যে ঘর ছেড়েছি, সে-ঘরও কি…
-
দ্বৈত
এই যে এখানে এলে বাদামের খোসা পেলে অবশিষ্ট হাতে যাকে ভাবলে বাওবাব সে একটি নৈশ ক্লাব ফুরায় প্রভাতে সকালে এমনই তোর তৈরি হয়েছিল ঘোর কীভাবে বেরোবি নতুন বর্ষ আসে ডোবা তাতে পোকা ভাসে বিধ্বস্ত ছবি পদ্ম যে অবিচল তোর কী হয়েছে বল্ কালো দেখছিস পিরিচে সাজানো বেল নাগলিঙ্গমে উদ্বেল …
-
আমার মৃত্যু হবে, তবু বেঁচে থাকবো
আমার মৃত্যু হলে ভাববে সব চুকেবুকে গেল আমি আর থাকবো না কোথাও, কিন্তু আমি তো যাবো না এই লোকালয় ছেড়ে – শূন্য কফিন নিয়ে আমাকে গোর দিতে যাবে তোমরা অঝোরধারায় বৃষ্টি ঝরবে তোমাদের চোখের অশ্রু আর বৃষ্টির জলের মিলিত ধারায় সহস্র চাতক তৃষ্ণা মেটাবে, পিপাসার্ত আমি কোথাও জল খুঁজে পাবো না, কোথায় সে অবিরল ঝরনাধারা…
-
কফি কাপ
অবহেলায় পড়ে থাকা কফি-কাপ আমাকে নাড়িয়ে দিলো তা শুধু স্মৃতি নয়, বরং এমন গল্প যা ফুরায় না কোনোদিন – আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম এত নিঃসঙ্গ পড়ে আছো কেনো কাপ নড়েচড়ে বসলো – আর শুরু করলো অবরুদ্ধ সময়ের গল্প : সেই নারী যে ভালোবাসতো তোমাকে – সে তার ঠোঁটের তুলিতে রংধনু এঁকে ছিল কপালে ধূসর আকাশ…
-
আলাপ
– সীমাবদ্ধ গল্পের ভেতরে থেকে জীবনের মহিমা বুঝবে না। এর জন্যে প্রয়োজন উড্ডয়ন, প্রতিকারহীন সর্বজাল ছিন্ন করা অহমিকারিক্ত এক নম্র অভিযান, অভিমান-পরিত্যাগী বেদুইনের পরম যাত্রা-পথ – বৃত্তভাঙা চাঁদের আলোর নিচে চোখ বন্ধ রাখা এক ধীমান প্রতিজ্ঞা, শূন্য হাতে শূন্য ক্রোধ শূন্য মুঠি শূন্য শোক-জাল আর বিস্তারিত অসীমের অবাধ ঠিকানা – আলো জ্বালো, আলো ফেলো…
-
বসন্তের উদার সৌন্দর্য
ইটবাঁধানো কষ্ট নিয়ে বসন্ত এলো, কাঁচামাটি দিয়ে তৈরি ঘরে! বসন্তের অন্তরা খুলে ঘনিষ্ঠ হবো অন্তরাত্মা শান্তি পাবে বলে আমিও সবুজের মূলধন নিয়ে নিজের হৃদয়ে সম্পাদকীয় লিখতে চেয়েছিলাম! কিন্তু এবারের বসন্তে – যে কুঁড়ি ফুটতে চাইছিল, তা আর ফুটল না – পুষ্পবাগানও হতবাক হলো! বসন্তের দিনেও আত্মকলহ ও আত্মকর্তৃত্বে…
-
ভালোবাসা নিঃশর্ত হোক
ভালোবাসা নিঃশর্ত হোক যেমন নিঃশর্ত হয় ভোর জলপতনের ধ্বনি। সবাই নিসর্গে যাবে যেমন নিঃশর্ত যায় নদী বীজপাতা খুলে দিয়ে যেমন উদ্ভিদ হৃদয়ে ধরিত্রী মাখে। যেটুকু ধরেছো তুমি লুকোছাপা-খেলা দুই হাতে তারও বেশি ঝরে পড়ে নীল নীলাকাশ হতে পাখিদের মৌনতা ভাঙে রাতভোর, প্রাতে। ভালোবাসা নিঃশর্ত হোক যেমন নিঃশব্দ বাড়ায় হাত ঘুমছায়া বট গোধূলির আঙুল ছুঁয়ে চুপে ঘন হয়ে নামে রাত আমাদের ঘরে যেমন নিঃশর্ত ছড়ানো এই ট্রপোস্ফিয়ার হিরণ ধূলির পথ, পলি সমতল আর আলো ফুটলেই আয়নায় অবলীলায়িত কারো ছায়াপাত – আমাদের বোধের ভেতরে বীজফোটা দিন, ছায়াময় ব্যাকুলতা নদী ও প্রভাত …
-
ঈশ্বরীয় বিশ্বাস ও অবিশ্বাস
ঈশ্বর আছেন অথবা ঈশ্বর নেই – এ দুই এর মধ্যে ঝুলে আছি ঘড়ির পেন্ডুলাম হয়ে অথচ নিতান্ত মূর্খ এক হাটুরে বললো, দৃষ্টিগ্রাহ্য সবকিছুই বিশ্বাস করতে নেই, তেমনি অদৃশ্য যা কিছু, সবটুকু মিথ্যাও নয় আছেন অথবা নেই এর মধ্যেও ঈশ্বর খুঁজেছি, বিশ্বাসের মজবুত রজ্জুতে বন্দি ঈশ্বরের কালো চশমাটা খুলে দেখি আমারই প্রতিবিম্ব
-
জীবন বুনে
কোথাও বোমা পড়লে কেঁপে উঠি, মনে হয়, তোমার কাছে যাওয়ার পথ কি ভেঙে পড়লো আগুনের ধাক্কায়! পথ ভরে আছে মিছিল আর মিছিলে, ক্রোধের বাইরে নয় এতটুকু জায়গাও যেখান দিয়ে আমরা হাত ধরে যাব পরস্পর। গোলাপ চাষ হচ্ছে না, চাষ হচ্ছে হত্যার, চাপাতির আঘাতে টুকরো টুকরো বিকাল তার ভেতর রান্না হয় শিশুদের আর্তনাদ। ভেঙে পড়া রাস্তা…
-
কপোতাক্ষপাড়ে গিয়ে
কপোতাক্ষপাড়ে গিয়ে শীতের রোদ্দুর গায়ে মাখি। তারপর ফিরে আসি কাঠবাদাম গাছের নিচে। মিষ্টি বউদি এসে কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে আমাকে দেখেন। যেন আমি কোনোদিন একা একা কপোতাক্ষপাড়ে আসতে পারি না। যেন আমি রাজনারায়ণ দত্ত আর জাহ্ণবী দেবীর নামটা শুনিনি। যেন আমি মাইকেল মধুসূদন দত্তের টানে কখনো আসিনি সাগরদাঁড়িতে। যেন আমি কলকাতা আর ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে গিয়ে…
