কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০১৭ পেলেন ছয় তরুণ

গত ৩০ জানুয়ারি ২০১৮, মঙ্গলবার, শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে প্রদান করা হয় ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০১৭’। দশমবারের মতো প্রদানকৃত এ পুরস্কারের পাঁচটি বিভাগে এবার বিজয়ী হয়েছেন ছয়জন। তাঁরা হলেন Ñ কবিতা বিভাগে যৌথভাবে নিশিন্দা পাতার ঘ্রাণ গ্রন্থের জন্য হোসনে আরা জাহান ও জুমজুয়াড়ি গ্রন্থের জন্য মিজানুর রহমান বেলাল; কথাসাহিত্যে এই বেশ আতঙ্কে আছি গ্রন্থের জন্য তাপস রায়; প্রবন্ধ গবেষণা ও নাটক বিভাগে আলতাফ শাহনেওয়াজ তাঁর নৃত্যকী গ্রন্থের জন্য, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাহিত্য বিভাগে মুক্তিযুদ্ধের অজানা ভাষ্য গ্রন্থের জন্য মামুন সিদ্দিকী এবং শিশু-কিশোর সাহিত্যে হরিপদ ও গেলিয়েন গ্রন্থের জন্য রাজীব হাসান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। সম্মানীয় অতিথির আসন অলংকৃত করেন প্রখ্যাত রবীন্দ্র-গবেষক ও প্রাবন্ধিক-অনুবাদক ড. মার্টিন কেম্পশেন। তিনি মূলত জার্মানির নাগরিক হলেও রবীন্দ্র-গবেষণায় মনোনিবেশ করে গত চল্লিশ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে অবস্থান করছেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট শিল্প-সমালোচক, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। কালি ও কলমের সম্পাদকম-লীর সভাপতি এমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান মঞ্চে আরো উপস্থিত ছিলেন কালি ও কলমের প্রকাশক আবুল খায়ের এবং পত্রিকাটির সম্পাদক আবুল হাসনাত। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ও কালি ও কলম সম্পাদকম-লীর সদস্য লুভা নাহিদ চৌধুরী।
তরুণদের সাহিত্যচর্চাকে উজ্জীবিত ও গতিশীল করার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে প্রবর্তন করা হয় কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার। সে-বছর দুটি বিভাগে এ-পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০০৯ সালে বিভাগ বেড়ে দাঁড়ায় তিনটি। ২০১০ সালে যোগ করা হয় আরো দুটি বিভাগ। ফলে ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাঁচটি বিভাগেই বই চাওয়া হয়। মাঝে ২০১৪ সালে তিনটি বিভাগে বই চাওয়া হলেও ২০১৫ সালে ফের পাঁচটি বিভাগেই পুরস্কার প্রবর্তন করে কালি ও কলম।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই উপস্থিত সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন লুভা নাহিদ চৌধুরী। তিনি কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কারের বিচারকম-লী অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ, কবি ও অধ্যাপক মাহবুব সাদিক এবং কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনকে সবিশেষ ধন্যবাদ জানান। লুভা নাহিদ চৌধুরীর বক্তব্য শেষে ২০১৭ সালে পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। পরে ২০০৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেওয়া এ-পুরস্কার নিয়ে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়। ২০১৭ সালের বিজয়ীদের উদ্দেশে শংসাবচন পাঠ করেন যথাক্রমে অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ, অধ্যাপক মাহবুব সাদিক এবং ইমদাদুল হক মিলন। শংসাবচন পাঠশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, প্রত্যেক বিজয়ীর হাতে একটি ক্রেস্ট, এক লাখ টাকার চেক ও শংসাবচন তুলে দেন মঞ্চে উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা।
এরপর প্রথমে বক্তৃতা করেন কালি ও কলমের প্রকাশক আবুল খায়ের তিনি বলেন, আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান যে গত ১৫ বছর ধরে কালি ও কলম নিয়মিত প্রকাশ হয়ে আসছে। এজন্য তিনি কালি ও কলমের সম্পাদকম-লীর সভাপতি আনিসুজ্জামান ও পত্রিকাটির সম্পাদক আবুল হাসনাতকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের স্বপ্ন ছিল কালি ও কলম।
বিশেষ অতিথি সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, আজকে যারা পুরস্কার পেল, তাদের কাছ থেকেও আরো বেশি ভালো লেখা প্রত্যাশা করব।
সম্মানীয় অতিথি মার্টিন কেম্পশেন তাঁর শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলেন, আজকের তরুণরা লেখালেখির মাধ্যমে সমাজসেবা করতে চাইছে, সেটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। সমাজের জন্য সে কঠিন কাজটির বড় প্রয়োজন রয়েছে।
এরপর প্রধান অতিথি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বক্তব্য রাখার পালা থাকলেও তিনি পুরস্কৃতদের অনুভূতি শুনে বক্তব্য রাখার মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করেন। সে অনুযায়ী একে বক্তব্য রাখেন পুরস্কারপ্রাপ্ত ছয়জন তরুণ কবি ও লেখক।
প্রধান অতিথি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তাঁর বক্তব্যের শুরু রবীন্দ্র-গবেষক মার্টিন কেম্পশেনকে বাংলাদেশে স্বাগত জানান। তিনি পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, সমাজে আলোর পথে জঞ্জাল রয়ে গেছে এখনো। রাজনীতিকরা ক্ষমতা ও অর্থের সমীকরণ মিলিয়ে চলেন। কবি-সাহিত্যিকরা মানুষের হৃদয় বুঝে চলেন। তাঁদের সান্নিধ্যে এলে হৃদয় প্রসারিত হয়। চীনাপ্রবাদ আছে, কবি-সাহিত্যিকরা ফুলের মতো। আমি ফুলের বাগানে এসেছি। এখান থেকে আমি ফুলের সৌরভ নিয়ে ফিরে যাব। তথ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা বাংলার চার হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ধারণ করছি। সেই সমৃদ্ধ জনপদের উত্তরসূরি আজকের পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকরা। চার হাজার বছরের আশা, সুখ, দুঃখ, বেদনাকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন তাঁরা, তুলে এনেছেন বাংলার উত্থানপতনের কথা।
সবশেষে বক্তব্য রাখেন অনুষ্ঠানটির সভাপতি আনিসুজ্জামান। পুরস্কৃতদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, একটি সত্যের মুখোমুখি হতে চাই, লেখক সাহিত্যিকের কাছে পাঠকের কী প্রত্যাশা? প্রত্যাশা দুটো, পাঠক সাহিত্যের মধ্যে সৌন্দর্য ও সত্য খোঁজ করেন। আর এ দুটোর মেলবন্ধন ঘটানো সাহিত্যিকের প্রধান কাজ। তিনি বিচ্যুত হলে সাহিত্যিকের পদবাচ্য থাকেন না। আমরা আশা করব, আজকের তরুণ লেখকরা সৌন্দর্য্য ও সত্যের মেলবন্ধন ঘটাবেন।
সভাপতির বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব। এরপর মঞ্চে আসেন লাইসা আহমেদ লিসা। বিশিষ্ট এ রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী তাঁর সুললিত কণ্ঠে মোহিত করে রাখেন উপস্থিত সবাইকে। সুরেরর মাধুরী যখন শেষ হলো, ঘড়ির কাঁটা তখন রাত আটটার ঘর পেরিয়ে গেছে।
ধীরে-ধীরে নিজ গন্তব্য-অভিমুখে ফিরতে শুরু করেন সবাই। সে-সময় হয়তো অনেক তরুণ কবি-সাহিত্যিকের মনে এ-স্বপ্নই বাসা বেঁধেছে, আগামী বছর হয়তো এ স্বীকৃতি আমিও অর্জন করতে পারবো!

Leave a Reply

%d bloggers like this: