জীবনানন্দ-ভূমেন্দ্র গুহ পুরস্কার ২০১৭ প্রদান

 

জীবনানন্দ গবেষণায় পথিকৃত ভূমেন্দ্র গুহ স্মরণে প্রবর্তিত ‘জীবনানন্দ-ভুমেন্দ্র গুহ পুরস্কার’ পেলেন সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। তার গবেষণা গ্রন্থ নতুন চর্যাপদ- এর জন্য এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন তিনি। গত ৩১ জানুয়ারি লালমাটিয়ার বেঙ্গল বই প্রাঙ্গণে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। সাহিত্য ক্ষেত্রে গবেষণার স্বীকৃতি দিতে বেঙ্গল পাবলিকেশন্্স ১০১৮ সাল থেকে এ পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়।

প্রথমবারের মতো এবছর প্রদান করা হচ্ছে ‘জীবনানন্দ-ভুমেন্দ্র গুহ পুরস্কার’। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে ড. আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ মার্টিন কেম্পশেন। এ ছাড়াও মঞ্চে বিশেষ অতিথি হিসেব মঞ্চে ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জনাব আবুল খায়ের এবং কালি ও কলম সম্পাদক জনাব আবুল হাসনাত। শুরুতেই পুরস্কার প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী এবং মার্টিন কেম্পশেনকে পরিচয় করিয়ে দেন জনাব আবুল হাসনাত।

অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে একক বক্তৃতা প্রদান করেন জার্মান বংশোদ্ভুত রবীন্দ্র গবেষক মার্টিন কেম্পশেন। তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণায় রত আছেন, অনুবাদ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ রবীন্দ্র-সাহিত্য। তার রচিত জধনরহফৎধহধঃয ঞধমড়ৎব ধহফ এবৎসধহু বইটি বিশেষভাবে পরিচিত। বক্তৃতায় রবীন্দ্র গবেষণায় কীভাবে জড়িয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন মার্টিন কেম্পশেন। তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি পাঠ করে আমি বিমুগ্ধ হয়ে যাই। তখনও বুঝতে পারিনি যে রবীন্দ্র-সাহিত্য আমার জীবনের এত বড় অংশ হয়ে উঠবে। পরে রবীন্দ্রনাথের বাংলা কবিতা ও তার অনুবাদ পড়ে আমি বাংলা পঙক্তি ও ছন্দের শক্তির জায়গাটা অনুধাবন করতে পারি।’ অনুবাদক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। ‘রবীন্দ্রকাব্যের একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে অনুবাদ করতে গিয়েও জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছে। বাংলা ভাষা ও ছন্দ যুগপদভাবে ইউরোপিয় ভাষায় অনুবাদ করা কঠিন ছিলো। অনুবাদ করতে গিয়ে আমিও নিজের মধ্যে সত্যিকারের কবিত্ব অনুভব করি’, বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিবৃন্দ। পুরস্কার হিসেবে এক লাখ টাকা, স্মারক ও একটি সনদ প্রদান করা হয়। সম্মাননা স্বীকৃতি পেয়ে মোহাম্মদ শাহেদ বলেন, গত আট বছর ধরে গবেষণার ফল এই বই। এধরণের বইয়ের প্রকাশক পাওয়া কঠিন। তাই প্রকাশক কথাপ্রকাশ প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার জসিম উদ্দিনকেও ধন্যবাদ জানান।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ড. আনিসুজ্জামান বলেন, মার্টিন কেম্পশেন নিজে কবি না হলেও তার মধ্যে একজন কবি লুকিয়ে আছে। তিনি আরও বলেন, সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদের বই নতুন চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের বিশেষ কাজে আসবে। কেননা এ ধরণের গবেষণা বাংলা সাহিত্যে বিরল।

উল্লেখ্য, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে ২০১৬ সালে জীবনানন্দ সমগ্র প্রকাশিত হয়েছে। সম্পাদনা করেছেন জীবনানন্দ-গবেষক ভূমেন্দ্র গুহ। তিনি ১৯৩১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যুবরণ করেন ২৪ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে। কলকাতায় তিনিই একমাত্র গবেষক ছিলেন, যিনি জীবনানন্দের হাতের লেখা যথাযথভাবে পাঠোদ্ধার করতে পারতেন। তিনি কলকাতা জাতীয় গ্রন্থাগার ও অন্যান্য পাঠাগারে গিয়ে প্রায় তিন বছর ধরে এই সমগ্র সম্পাদনার কাজটি করেছেন। তাঁকে সম্পাদনা, কম্পোজ, প্রুফ ও কলকাতা জাতীয় গ্রন্থাগারে রক্ষিত মূলানুগ পাঠের কাজের জন্য সম্মানী গ্রহণের অনুরোধ জানালে তিনি বৃহত্তর গবেষণায় এই অর্থ ব্যয়ের সুপারিশ করেন। যদিও তাঁর অর্থের প্রয়োজন ছিল। তিনি খ্যাতনামা হৃদরোগ ও শল্য বিশেষজ্ঞ এবং ভারতবর্ষের প্রথম ওপেন হার্ট সার্জারি টিমের সদস্য ছিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অধ্যয়নকালে তিনি জীবনানন্দের কবিতার মুগ্ধ পাঠক ছিলেন। অবসরগ্রহণের পর তিনি জীবনানন্দ গবেষণা ছাড়া অন্য কোনো কাজে নিজেকে আর ব্যাপৃত করেননি। এ প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে কথোপকথন চলাকালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়। আমরা তাঁর মৃত্যুর পর বাংলাদেশের অনাদৃত গবেষণাকর্মকে সঞ্জীবিত করার লক্ষ্যে ও উদ্দেশ্যে বেঙ্গল পাবলিকেশন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক ও কালি ও কলমের সম্পাদকম-লীর সভাপতি ড. আনিসুজ্জামান ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে এক বৈঠক করার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, এক বছরে প্রকাশিত গবেষণা ক্ষেত্রে একটি গ্রন্থকে জীবনানন্দ-ভূমেন্দ্র গুহ পুরস্কার প্রদান করা হবে। এই পুরস্কার প্রবর্তনের মাধ্যমে আমাদের লক্ষ্য ছিল জীবনানন্দ-ভূমেন্দ্র গুহকে যথাযথ সম্মান জানানো। এবং গবেষণা কর্মকে আরো সঞ্জীবিত করা। পুরস্কারের অর্থমূল্য হবে এক লক্ষ টাকা।

এই সিদ্ধান্তের আলোকে ড. আনিসুজ্জামান, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ ও বেঙ্গল পাবলিকেশন্সের নির্বাহী পরিচালক আবুল হাসনাত ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে এক বৈঠকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত ও সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ-লিখিত অন্যতম গবেষণা গ্রন্থ নতুন চর্যাপদকে নির্বাচিত করেন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: