তারাপদ রায়

  • একটি কবিতা

    এবার একটি কবিতা দিতে একটু দেরি হল। খুব দেরি হয়তো নয়,                       তবুও তো। আসলে আমার কোনো দোষ নেই। কবিতাটি এসে গিয়েছিল,                আশেপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। কখনো পাখির পালকের মতো উড়তে উড়তে, কখনো ঝিঁঝির ডাকের মতো ক্রমাগত, কখনো জানলার খড়খড়ির ফাঁকে আলো, কবিতাটি এদিক ওদিক ঘুরপাক খাচ্ছিল। এর মধ্যে কয়েকদিন খুব ঠান্ডা পড়ল, একদিন…

  • হচ্ছে-হবে

    ইলিশ, ইলিশ ‘মানুষের মধ্যে পুলিশ মাছের মধ্যে ইলিশ।’ সম্প্রতি দূরদর্শনে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে কথায় কথায় আমি আবিষ্কার করলাম ইলিশ মাছ সম্পর্কে আমি কিছু কম জানি না। প্রথমে আমি নানা জায়গার ইলিশ মাছের গুণাগুণ, স্বাদ ইত্যাদির তুলনামূলক আলোচনা একবাক্যে সেরে নিচ্ছি।  ভালো ইলিশের চেয়ে ভালো মাছ কোথাও পাওয়া যায় না। ভালো ইলিশই পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু মাছ। সম্প্রতি একটি প্রবন্ধে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. অমিয়কুমার বাগচী এই অভিমত দিয়েছেন। আসলে প্রশ্নটা সবসময়েই ওঠে, পদ্মা নদীর ইলিশ ভালো, না গঙ্গার ইলিশ ভালো? এদিক থেকে ড. বাগচী এই প্রশ্নের বিচার করার যোগ্য ব্যক্তি। কারণ তিনি বহরমপুরের লোক। গঙ্গা ও পদ্মা – দুই নদীর মাছই আবাল্য খেয়েছেন। এ-বিষয়ে অবশ্য মনীষী কমলকুমার মজুমদারের একটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। কমলকুমার বলেছিলেন, ‘কলকাতার গঙ্গার ইলিশই ভালো, কারণ এই মাছগুলো দুশো বছর ধরে কোম্পানির তেল খেয়ে আসছে।’  কোম্পানির তেল মানে গঙ্গার দুইধারে বিভিন্ন রকম কলকারখানার বর্জ্য তেল। এ-বিষয়ে আমার নিজস্ব একটি বক্তব্য আছে। সেটি অবশ্য গঙ্গার ইলিশ বনাম পদ¥ার ইলিশ নিয়ে নয়। সেটি আরো ভারী ব্যাপার। ভাষাতত্ত্বের ব্যাপার। কলকাতার ইলিশ ইংরেজদের কাছে ‘হিল্সা’ (ঐরষংধ) হয়েছে। এই হিল্সা কিন্তু পূর্ববঙ্গীয় ইল্শার ইংরেজি। পূর্ববঙ্গে ইলিশ মাছ নেই। তার নাম ইল্শা। সেদিক থেকে বলা যায়, পূর্ববঙ্গের ইলিশ মাছই ফিরিঙ্গিদের প্রভাবান্বিত করেছিল। স্টিমারে, নৌকোয় বাদল আবহাওয়ায় ইলিশ মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাওয়া বাঙালির চিরদিনের স্বপ্ন। কিন্তু আজকাল জলযাত্রা কোথায় হয়? বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন ইলিশ সম্বন্ধে, ‘জলের উজ্জ্বল শস্য’। তারও আগে আমরা পেয়েছিলাম ইল্শেগুড়ি নিয়ে সেই অসামান্য কাব্য, ‘ইলশেগুড়ি ইলশেগুড়ি, ইলিশ মাছের ডিম।’ সমস্ত রকম লোভনীয় খাদ্যের মধ্যে এখনো রয়েছে ইলিশ মাছের ডিম। ডিম হলে মাছের স্বাদ নাকি একটু কম হয়। তা হোক। ইলিশ মাছ দিয়ে ঝাল হবে, ঝোল হবে, সেদ্ধ হবে, সর্ষেবাটা হবে, পাতুরি হবে। তার আগে পাতে পড়বে দু চামচ ইলিশ মাছের তেল। আর সেই সঙ্গে একটি বড় দেখে মাছভাজা। সঙ্গে ডিমভাজা। ইলিশ মাছের ল্যাজা আর পাকা তেঁতুল দিয়ে টক হবে। এছাড়া ইলিশ মাছের মাথাও অপূর্ব। আলাদা খাওয়া যায়, আবার বেগুন, পটল দিয়ে চচ্চড়ি অথবা চালকুমড়োর ইলিশঘণ্ট। কচুশাক দিয়েও ইলিশমাছ অপূর্ব হয়। ইলিশ মাছের সূত্রে একটি বাংলা প্রবাদের গল্প বলে শেষ করি। প্রবাদটি হলো, ‘ভাজা মাছটি উলটিয়ে খেতে জানে না’। ব্যাপারটা এইরকম : ভাতের হোটেলে খদ্দের খেতে বসেছে। এক থালা ভাত, সঙ্গে একটি কাঁচালঙ্কা, একটু নুন এবং একটি ভাজামাছ। এইবার লোকটি ভাজামাছটি কলাপাতার যে-জায়গায় রাখা হয়েছে, সেখান থেকে ঘুরিয়ে অন্যদিকে রাখল। আগে যেদিকে ছিল, সেদিকের পাতায় একটু মাছভাজার গায়ের তেল লেগে রয়েছে। নুন দিয়ে একমুঠো ভাত সেই তেল দিয়ে মেখে খদ্দেরের কিছুটা খাওয়া হলো। এবার মাছভাজাটি কলাপাতার এপাশে নিয়ে এসে একই পদ্ধতিতে ওদিকের পাতায় লেগে থাকা তেল দিয়ে আবার ভাত মেখে খাওয়া হলো। এইরকমভাবে ভাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত খদ্দের মাছভাজাটি অক্ষত রেখে নুন-লঙ্কা দিয়ে সবটা খেয়ে নিল। এবং অবশেষে মাছভাজাটি দোকানদারকে ফেরত দিয়ে মাত্র তিন পয়সা ভাতের দামবাবদ এবং আরেক পয়সা নুন-লঙ্কা-কলাপাতা বাবদ মিটিয়ে খদ্দের বিদায় হলেন।এরই নাম, ভাজা মাছ উলটে খাওয়া।

  • হচ্ছে-হবে

    বিষে বিষক্ষয়গল্পটা ফরাসি দেশীয়। বছর চল্লিশ আগের খুশবন্ত সিংহ-সম্পাদিত বিশালাকার ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অফ ইন্ডিয়াতে পড়েছিলাম (পাঠক-পাঠিকা জেনে আশ্বস্ত হবেন যে আমার বিদ্যের দৌড় ওই পর্যন্তই)। সে যা হোক, আমার যা নীতি, ‘যদ্দৃষ্টং তল্লিখিতং’ অর্থাৎ যা দেখি তাই লিখি, সেই নীতি-অনুসারে গল্পটা বাংলায় লিখে ফেললাম তখনকার বাগবাজারের যুগান্তর-গোষ্ঠির অমৃত সাপ্তাহিকে আমার ‘কথায়-কথায়’ কলমে। গল্পটা স্বামী-স্ত্রীর বাঁকাচোরা…

  • হচ্ছে-হবে

    হচ্ছে-হবে

    মদ ও গঙ্গারাম গঙ্গারাম আমার বৃদ্ধকালের অসমবয়সী বন্ধু। বুঝে না বুঝে, সে আমাকে অনেক সময়েই সাহায্য করে, আমার রচনার রসদ যোগায়। কালি ও কলমের পাঠক-পাঠিকারা গঙ্গারামকে চেনেন না। সে আমার মতো ওপারের লোক নয়, সে খাঁটি এপারের লোক, রাঢ়ভূমির নৈকষ্যকুলীন ঘটি। এখন অবশ্য ‘ঘটি’ কথাটা প্রায় উঠেই গেছে, ঘটি-বাঙালের ভেদাভেদ এখন আর নেই। কিন্তু গঙ্গারাম…

  • চলছে-চলবে

    চলছে-চলবে

    জানা-অজানা দক্ষিণ কলকাতার গোলপার্কে ‘মৌচাক’ নামে বিখ্যাত একটি মিষ্টির দোকান আছে। এই দোকানের ওপরেই সপ্তর্ষি হোটেল। ছিমছাম এবং অভিজাত। এই হোটেলেরই দোতলায় সমকাল আর্ট গ্যালারি। সেখানে প্রায় নিয়মিত চিত্রপ্রদর্শনীর সঙ্গে কবিতাপাঠের আসর বসছে। সেই আসরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, নবনীতা দেব সেন থেকে শুরু করে আরো অনেকেই যোগদান করেন। আমিও যাই। ‘মৌচাক’ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কর্মকর্তা…

  • হচ্ছে-হবে

    হচ্ছে-হবে

     বেড়াল অথবা বিড়াল যা বিড়াল তাই বেড়াল। স্থানভেদে, জিহ্বাভেদে বেড়াল বিড়াল হয়ে যায়। কোথাও-কোথাও এই বিড়াল ভাষাতত্ত্বের রহস্যময় কারণে বিলাই নামে পরিচিত। এর চেয়েও বড় কথা, খাঁটি বাঙাল দেশে এই বেড়াল কিংবা বিড়াল কী করে মেকুর হয়েছিল? অনেকদিন আগে আমি একটা গল্প বলেছিলাম আপনাদের, মনে আছে কি-না বলতে পারব না, সেই জন্যে আপনাদের অনুমতি নিয়েই…

  • হচ্ছে-হবে

    হচ্ছে-হবে

    মুখবন্ধ হচ্ছে-হবে। হচ্ছে এবং হবে, হচ্ছে ও হবে, হচ্ছে কিংবা হবে। চমৎকার দ্বন্দ¡ সমাস। আমার অভিমত শুনে ব্যাকরণবিদ ভ্রƒকুঞ্চন করলেন। আমি বাধ্য হয়ে বললাম, ‘তাহলে তোমাদের এখনকার কালের ভঙ্গিতে বলা যেতে পারে, ‘ব্যতিক্রমী দ্বন্দ¡ সমাস। যেমন, চলছে-চলবে।’ ব্যাকরণবিদ বললেন, ‘চলছে-চলবে চলবে না।’ ‘চলবে না, মানে? তুমি কি কোনো কল-কারখানার মালিকানা নিয়েছ? শ্রমিক-আন্দোলনের ভয়ে আছো?’            …

  • একটি কবিতা

    এবার একটি কবিতা দিতে একটু দেরি হল। খুব দেরি হয়তো নয়,                     তবুও তো। আসলে আমার কোনো দোষ নেই। কবিতাটি এসে গিয়েছিল,            আশেপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। কখনো পাখির পালকের মতো উড়তে উড়তে, কখনো ঝিঁঝির ডাকের মতো ক্রমাগত, কখনো জানালার খড়খড়ির ফাঁকে আলো, কবিতাটি এদিক ওদিক ঘুরপাক খাচ্ছিল। এর মধ্যে কয়েকদিন খুব ঠান্ডা পড়ল, একদিন ভীষণ…