বিজ্ঞান

  • আমাদের সর্বজয়ী মস্তিষ্ক ও চেতনার স্বরূপ

    আমাদের সর্বজয়ী মস্তিষ্ক ও চেতনার স্বরূপ

    প্রায় দেড় কোটি বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা লক্ষ করল যে, তাদের জীবনধারণের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে – গাছপালা ও বনজঙ্গলের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে আসছে। শিম্পাঞ্জি, গরিলা, গিবন, ওরাংওটান ইত্যাদি প্রাণী তাতে কষ্ট করে হলেও টিকে রইল; কিন্তু আমরা আমাদের ‘স্বর্গোদ্যান’ থেকে অভিশপ্ত হয়ে রূঢ় পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই বাধ্য হলাম জঙ্গলের রাজত্ব ত্যাগ করে সাভানাচারী হয়ে খোলা ময়দানে আসতে। এর ফলে আমাদের দেহকাঠামোতেও দেখা দিলো পরিবর্তন – আমরা আরো সোজা হয়ে হাঁটতে ও দ্রুত দৌড়াতে সমর্থ হলাম, হাতদুটো শরীরের ভারমুক্ত হয়ে শিকার ও অন্যান্য কাজের উপযুক্ত হলো, আর একসময়ে আমরা হলাম ‘হাতিয়ারধারী প্রাণী’ – মানুষ। বেশি ছোটাছুটি করার ফলে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে হ্রাস করার উপায় হিসেবেই সম্ভবত আমরা আমাদের গাত্রলোম হারালাম, কারণ প্রাইমেটকুলে ১৯৩টি প্রজাতির মধ্যে সব এখনো দেহলোমাবৃত থাকলেও একমাত্র আমরাই হচ্ছি নগ্ন – অর্থাৎ গাত্রলোমহীন। আমাদের পূর্বপুরুষেরা যদিও ফলমূল ও মৃত জীবজন্তুর মাংস খেয়েই জীবনধারণ করত, কিন্তু নতুন পরিবেশ আমাদের বাধ্য করল অপেক্ষাকৃত নিরীহ জীবজন্তু শিকার ও হিংস্র জীবজন্তুকে তাড়ানোর উপায় অবলম্বনে ‘দলবদ্ধ শিকারি’ (co-operative pack Hunter)-এর জীবন বেছে নিতে।  আমরা ছিলাম প্রকৃতির অপেক্ষাকৃত দুর্বল, খুবই সাধারণ মানের একটি নিরীহ প্রজাতি। আমাদের দাঁত-মুখ-নখ ইত্যাদির কিছুই ভয়ংকর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উপযোগী না হওয়ায় আমরা হাতে তুলে নিলাম চারদিকে ছড়ানো ভোঁতা পাথর, যা দিয়েই আমরা যৌথ কৌম জীবনের শক্তিতে হিংস্র জীবজন্তুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালাম। ধীরে ধীরে আমরা শিখলাম পাথরের অস্ত্রকে সুঁচালো ও তীক্ষ্ণধার করার পদ্ধতি, আয়ত্ত করলাম তাকে লাঠির আগায় বেঁধে লম্বা বর্শার মতো মারাত্মক অস্ত্র বানিয়ে দূর থেকে জন্তু-জানোয়ার ঘায়েল করার বুদ্ধি। আমাদের শিকারি পূর্বপুরুষদের দল প্রধানত পুরুষ শিকারিদের নিয়ে গঠিত ছিল বলে তাদের নারীরা সন্তান প্রতিপালন এবং অন্যান্য কাজের ফাঁকে একসময় আবিষ্কার করে কৃষিপদ্ধতি। এর ওপর ভিত্তি করেই আমরা একসময় আমাদের পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল যাযাবর জীবন ত্যাগ করে বেছে নিলাম স্থায়ী জীবন। এরপর আমাদের সমাজজীবনে এত দ্রুত পরিবর্তন আসে যে, মাত্র কয়েক হাজার বছর আগেও যে হাত চকমকি ঠুকে আগুন জ্বালাত, সে-হাত মহাকাশে রকেট পাঠানোর সলতেয় আগুন জ্বেলে দেওয়ার শক্তি অর্জন করেছে। আমরা হলাম Homo sapiens বা জ্ঞানী মানব। আমাদের এই অগ্রযাত্রায় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে যে-অঙ্গটি, তা হচ্ছে আমাদের দেড় কেজি ওজনের শক্তিকেন্দ্র বা Power House বলে পরিচিত মস্তিষ্ক। আমাদের এই অঙ্গটি আমাদের হৃদপিণ্ডের মতোই রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টা বিশ্রামহীনভাবে আমাদের সচল রাখতে কাজ করে, যা তার মাঝে সঞ্চিত রাখে বিলিয়ন বিলিয়ন তথ্য – আমাদের স্মৃতি, অভ্যাস, সহজাত প্রবৃত্তি, দক্ষতা, আশা, নিরাশা, ভয় ইত্যাদি সবকিছুই। আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলো তাদের বিশাল সংযোগ-সূত্র (neural connections) দিয়ে সঞ্চিত করে রাখতে সক্ষম অর্ধশতাব্দী আগে শোনা কোনো অজানা শব্দ, সেতারের তারে ঠিক নির্দিষ্ট পরিমাণ টোকা দেওয়ার ক্ষমতা, দাবা খেলার কয়েক হাজার চাল, কোনো প্রিয়জনের ঠোঁটের নির্দিষ্ট পরিমাণ হাসির বক্রতা, দিগন্তরেখায় পাহাড়ের উপস্থিতি, পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের আলাদা মুখচ্ছবি, বিভিন্ন ফুলের গন্ধের বিভিন্নতা, বাল্যকালে স্কুলে পড়া নামতা কিংবা কবিতার পঙ্ক্তিমালা, দীর্ঘদিন আগে শোনা নরকের শাস্তি বা স্বর্গের মধুর দৃশ্য বর্ণনা কিংবা সুদূর অতীতে মাথা উঁচু করে দেখা রাতের তারাভরা আকাশের ছবি –…

  • কসমস : পৃথিবী দর্শনের আলোকবর্তিকা

    কসমস : পৃথিবী দর্শনের আলোকবর্তিকা

    বিংশ শতাব্দীতে এসে প্রথম মানুষ অনুভব করল, এত অর্জন আর সমৃদ্ধি সবকিছু জলাঞ্জলি হতে পারে মহাবিশ্ব বিকাশের সঙ্গে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করতে ব্যর্থ হলে এবং মানবসমাজে নিজেরা পরস্পরকে বুঝতে অসমর্থ হলে।এ-অবস্থান থেকেই কার্ল সাগান তাঁর অসাধারণ গ্রন্থ কসমস লিখলেন। কসমস-এ তিনি বললেন, বিশ্বের শুধু বিকাশোন্মুখ সৌন্দর্য রয়েছে বা এটি মানুষের পক্ষে শুধু অনুধাবন করাই সম্ভব নয়,…

  • বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ২০২৫

    বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ২০২৫

    ২০২৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন ক্লার্ক(John Clarke), ইয়েল এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিশেল হেনরি দ্যুভরে (Michel H. Devoret) এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন ম্যাথিউ মার্টিনিস (John M. Martinis)।  রাজকীয় বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি তাদের ৭ই অক্টোবর ২০২৫ সালের প্রেস রিলিজে উল্লেখ করে যে ‘for the discovery of macroscopic quantum mechanical tunnelling…

  • আইনস্টাইন ও বোরের উত্তরাধিকার আমরা কি কখনো বুঝতে পারব যে কোয়ান্টাম তত্ত্ব কী বোঝায়?

    আইনস্টাইন ও বোরের উত্তরাধিকার আমরা কি কখনো বুঝতে পারব যে কোয়ান্টাম তত্ত্ব কী বোঝায়?

    আলবার্ট আইনস্টাইন ও নিলস বোর, বিশ শতকের পদার্থবিদ্যার এই দুই দিকপাল প্রায় সারাজীবন ধরে সম্পূর্ণ বিপরীত দুই বিশ্বদৃষ্টি পোষণ করে গেছেন। প্রথমজনের কাছে জগৎ ছিল চূড়ান্ত বিচারে যৌক্তিক, যেখানে সবকিছুরই যথার্থ একটি অর্থ রয়েছে। আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রাপ্ত বাস্তবতার গভীর অভ্যন্তরে কার্যকারণ সম্পর্কের যৌক্তিক শৃঙ্খল দিয়ে এটি পরিমাপযোগ্য ও প্রকাশযোগ্য। কিন্তু দ্বিতীয়জনের মতে, এরকম…

  • অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন : কেন কিছুই না থেকে কিছু রয়েছে?

    অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন : কেন কিছুই না থেকে কিছু রয়েছে?

    বিশাল এই মহাবিশ্বে আমাদের এখন পর্যন্ত জানামতে মানুষ হচ্ছে একমাত্র প্রজ্ঞাবান প্রাণী। জগৎ সম্পর্কে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে শিশুরা যেমন তাদের পিতা-মাতার কাছে কিছু সরল প্রশ্ন উত্থাপন করে, তেমনি আমাদের দার্শনিক-বৈজ্ঞানিকরাও সেরকম কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন – আমরা কারা? আমরা কোথায় আছি? আমরা কি একা? কেন আমরা এখানে? আমাদের ভবিষ্যৎ কী? অস্তিত্ব কাঁপানো এ-প্রশ্নগুলো আমাদের স্নায়ুতে…

  • শতবর্ষে বোস সংখ্যায়ন

    শতবর্ষে বোস সংখ্যায়ন

    কানন পুরকায়স্থ বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে-সমস্ত তত্ত্ব মৌলিকতা, গুরুত্ব এবং গভীরতায় বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে বোস সংখ্যায়ন সেগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু ১৯২৪ সালে এই সংখ্যায়ন ফোটন কণার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। পরবর্তীকালে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন ১৯২৪-২৫ সালের দিকে বোস সংখ্যায়নকে সাধারণভাবে পরমাণুর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন, যাকে আমরা বলি বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন। এ-সম্পর্কে আলোচনার আগে…

  • আমরা কেন মারা যাই

    আমরা কেন মারা যাই

    মৃত্যু একটি ধ্রুব সত্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বার্ধক্য এক অনিবার্য যাত্রা। প্রতিটি জীবন্ত প্রাণী জন্মের পর জীবনের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে। যৌবনের উচ্ছ্বাস থেকে বার্ধক্যের প্রশান্তি পর্যন্ত এই যাত্রা চলে। এই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত নিশ্চিততায় শেষ হয় – মৃত্যুতে। এ আমরা সবাই কমবেশি জানি। দুটি ধ্রুব সত্যের একটি এই মৃত্যু। আরেকটি আমাদের জন্ম। কেবল আমরা নই,…

  • পারভেজ হুদভয়

    পারভেজ হুদভয়

    প্রগতিশীল, উদারপন্থি ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার অধিকারী পাকিস্তানি পদার্থবিদ পারভেজ আমিরালি হুদভয়কে প্রখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী দি নিউ সায়েন্টিস্ট আখ্যায়িত করেছে The Voice of Reason in Pakistan – এই নামে। তিনি তাঁর নিজ দেশ পাকিস্তানের পশ্চাৎপদ সমাজে যে সমস্ত বিষয় নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, বিজ্ঞানের ইসলামীকরণ, পাকিস্তানের ব্লাসফেমি আইন, সেনাবাহিনীর রাজনীতিতে…

  • জামাল নজরুল ইসলাম : বাস্তবতা গল্পের চেয়েও অদ্ভুত

    জামাল নজরুল ইসলাম : বাস্তবতা গল্পের চেয়েও অদ্ভুত

    ১৯৮৮ সালের কথা। কৃষ্ণবিবর বা ব্ল্যাকহোল নিয়ে আমাদের দারুণ আগ্রহ। এ-সম্পর্কে টুকরো টুকরো লেখা পড়েছি। দ্রুত কোনো কিছু পাওয়ার জন্য ইন্টারনেট ব্যবস্থা ছিল না তখন। ব্রিটিশ কাউন্সিল, জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও ভারতীয় হাইকমিশন এবং ব্যান্সডকের মতো গ্রন্থাগারগুলো একমাত্র সহায়। এরকম একটি সময়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলে কৃষ্ণবিবর নিয়ে লেখা একটি বই পেয়ে যাই। এ-বিষয়ে এত বড় একটি…

  • তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী পিটার হিগস : জীবন ও গবেষণা – (১৯২৯-২০২৪)

    তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী পিটার হিগস : জীবন ও গবেষণা – (১৯২৯-২০২৪)

    গত ৮ই এপ্রিল ২০২৪ সালে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক পিটার হিগস ৯৪ বছর বয়সে এডিনবরায় তাঁর নিজ বাসভবনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। হিগসের পুরো নাম পিটার ওয়ার হিগস (Peter Ware Higgs)। ১৯২৯ সালের ২৯শে মে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসেল আপন টাইনের এলসউইকে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বাবা টমাস হিগস ছিলেন বিবিসির একজন শব্দ-প্রকৌশলী। পিটার ছোটবেলায়…

  • মহাবিশ্বের জন্ম, মহাবিশ্বের মৃত্যু

    মহাবিশ্বের জন্ম, মহাবিশ্বের মৃত্যু

    মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। এই মহাবিশ্বে কতগুলি তারা আছে? বিজ্ঞানীরা তো এত তারা গুনতে পারবেন না, তার পরও একটি আন্দাজ আছে। কিন্তু কেমন করে সে-আন্দাজ করেন বিজ্ঞানীরা? এমনসব প্রশ্ন নিশ্চয়ই মাথায় আসে আমাদের। মহাবিশ্ব বা ইউনিভার্সে প্রায় ১০০ বিলিয়নের মতো গ্যালাক্সি আছে। আমরা, মানে পৃথিবী, এরকম একটি গ্যালাক্সির মধ্যে আছে। এর নাম মিল্কিওয়ে। এটি…

  • বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ুর পরিবর্তন

    বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ুর পরিবর্তন

    জলবায়ুর অবস্থা নির্ভর করে বায়ুমণ্ডল, সাগর, ভূমি, বরফ, পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য এবং সৌরমণ্ডলের কেন্দ্রে অবস্থিত সূর্যের গতিপ্রকৃতির ওপর। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল তুলনামূলকভাবে অনেকটা আপেলের খোসার মতো পুরু। এর রাসায়নিক উপাদান নাইট্রোজেন, অক্সিজেন এবং স্বল্পমাত্রায় অন্যান্য গ্যাসীয় পদার্থ। এই গ্যাসীয় পদার্থে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্রিনহাউস গ্যাস, যা আমাদের জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু এই গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ,…