সম্ভবত সৌন্দর্য ও প্রেমের দেবী আফ্রোদিতিই ইতিহাসের প্রথম ব্রহ্মাণ্ড-সুন্দরী যাকে নির্বাচন করে ট্রয়-রাজকুমার প্যারিস এত বড় একটা যুদ্ধের ভিত্তি রচনা করে ফেলেছিলেন। দেবীরা সেকালে অমর হলেও তাদের সৌন্দর্য-বিচার করবার ভার নশ্বর মানুষের বা আরো সঠিক বলতে চাইলে পুরুষের হাতেই ন্যস্ত হয়েছিল, যে-কানুন আজও পরিবর্তিত হয়নি। আজকের বিশ্বসুন্দরী বা ব্রহ্মাণ্ড-সুন্দরীরা কালে মিডিয়ার এক একজন দেবী বা গডেসে পরিণত হলেও তাঁদের নির্বাচক অতি-অবশ্য পুরুষই হয়ে থাকেন, কেননা সৌন্দর্য বা রূপ বা আকর্ষণীয়তার মাপকাঠি পুরুষের দ্বারাই চিরকাল নির্মিত ও বর্ণিত হয়ে আসছে, আর নারীরাও নিজেদের সেই মাপকাঠিতেই বিচার করতে ভালোবাসেন। ট্রয়ের রাজকুমার একটি আপেল পুরস্কার দিয়ে দেবী আফ্রোদিতিকে নির্বাচন করার মাধ্যমে ইতিহাসে বিউটি কনটেস্টের সূচনা করেন। সাহিত্যের এই মিথের বাইরে আদতে বিউটি কনটেস্ট বা সৌন্দর্য-প্রতিযোগিতার জন্ম ব্রাজিলে, যেখানে ১৮৮৮ সালের আগস্ট মাসে স্পা নগরীতে অনুষ্ঠিত হয়ে যায় বিশ্বের প্রথম ও আদি বিউটি কনটেস্ট। রেনেসাঁসকালীন ইউরোপে শিল্পভিত্তিক সমৃদ্ধি ও উৎপাদন-ব্যবস্থায় কেবল নারী নয় সকল মানুষই যখন ক্রমে পণ্যে পরিণত হতে থাকে সেই সমাজে বিউটি কনটেস্টের কদর ক্রমশ বাড়বেই, এতে সন্দেহ কী? ইউরোপীয় নারীরা তাই দ্রুতই ফিগার-সচেতন ও মেকআপ-সমৃদ্ধ হয়ে উঠছিলেন, নগরগুলোতে ক্রমশ বাড়ছিল বিউটি-সেলুন ও ডায়েট- বিশেষজ্ঞের কদর, আর দেশে দেশে রীতিমতো প্রেস্টিজের ব্যাপারই হয়ে দাঁড়াচ্ছিল যে, কে বেশি সুন্দরী – ইতালিয় না ডাচ, নাকি পর্তুগিজ না ব্রিটিশ? আমাদের এশিয়ার নারীরা বহুদিন পর্যন্ত এ-ব্যাপারে পিছিয়েই ছিলেন নানা ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ট্যাবুর কারণে। বিংশ শতাব্দীতে এসে সে-দুঃখ অবশ্য পুরোটাই পুষিয়ে নিতে সচেষ্ট হলেন তারা, যখন প্রাচ্য-সৌন্দর্য পাশ্চাত্যকে মুগ্ধ করতে শুরু করল। এশিয় নারীর চাপা রং, সুডৌল লাবণ্য, কালো চুলের সঙ্গে পাশ্চাত্য-নারীর কোমরের চিকন মাপ, ভঙ্গিমা আর সংক্ষিপ্ত পোশাক মিলিয়ে একের পর এক ভারতীয় নারী জয় করে নিতে থাকলেন বিশ্বসুন্দরীর শিরোপা। প্রাচ্যে নারীদের পণ্যায়নের সেটি শুরুর দিক – তখনো হয়তো গ্লোবালাইজেশন, করপোরেট বাণিজ্য ইত্যাদি শব্দের আমদানি ঘটেনি। কমিউনিজমের পতনের পর সোভিয়েত-নারীরা পূর্ণ উদ্যমে এই ‘ইঁদুর-বেড়াল দৌড়ে’ নামতে দেরি করলেন না। নতুন চীনেও নাকি আজকাল কসমেটিক সার্জারির এতই কদর যে, রীতিমতো সিরিয়াল ধরতে হয়। তাহলে এই গরিব দেশের মিস বাংলাদেশও সানসিটির রৌদ্রোজ্জ্বল সৈকতে পা ফেলার ‘সৌভাগ্য’ অর্জন করছেন বলে আমরা পত্রপত্রিকা-মারফত জানতে পাই। কিন্তু এহেন আকর্ষণীয় ও উদ্দীপক ‘খেলা’ নিয়ে প্রাচ্যে তো বটেই পাশ্চাত্যেও বিতর্কের শেষ নেই। একশ্রেণির নারীবাদী গোটা বিষয়টিকে নারীকে কমোডিটি বা পণ্যে এবং দেহসর্বস্ব যৌন-সামগ্রীতে পরিণত করার ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেন। আরেক শ্রেণি একে নয়া সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী সমাজের আগ্রাসনরূপে দেখতে পছন্দ করেন। আর প্রাচীনপন্থিরা নিজ নিজ মূল্যবোধের আলোকে ‘সংস্কৃতি গেল গেল’ রব তুলে চেঁচান। এই তিন শ্রেণিই আবার বিশ্বাস করেন ও করতে ভালোবাসেন যে, ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কারই নারী-স্বাধীনতার প্রধান অন্তরায় এবং পাশ্চাত্যই হচ্ছে নারীবাদের সূতিকাগার। কৃষিভিত্তিক সমাজে নারীর ভূমিকা শ্রম, উৎপাদন ও সন্তানধারণ বা লালন-পালনের সঙ্গে যতখানি সম্পৃক্ত, বিনোদন ও যৌনতার বেলায় ততটা নয়। কিন্তু শিল্পোন্নত সমাজে বিষয়টি আলাদা। কৃষিভিত্তিক ও শিল্পোন্নত সমাজে নারীর পৃথক ভূমিকা ও অবস্থান নিয়ে তুলনামূলক কোনো গবেষণা না হওয়ায় এ-নিয়ে মন্তব্য করা কঠিন ও অযৌক্তিক। তবে উদাহরণ হিসেবে যদি প্রান্তিক গোষ্ঠীর কথা আনা হয় তবে দেখা যাবে যে, বাংলাদেশের খাসিয়া বা সাঁওতাল সমাজে পরিবারের প্রধান হিসেবে নারীর ভূমিকা ও গুরুত্ব সেইসব সমাজের সামাজিক বা সাংস্কৃতিক সংস্কার দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়নি। একই কথা পৃথিবীর বহু ‘অনুন্নত’ জাতি বা গোষ্ঠী সম্পর্কে প্রযোজ্য। কাজেই উন্নয়নের ও শিক্ষার তথাকথিত পাশ্চাত্য-মডেল যে নারী-স্বাধীনতার ও নারীমুক্তির একমাত্র উপায়, তা মানা কঠিন। পাশ্চাত্য-নারীবাদও এডওয়ার্ড সাঈদ-বর্ণিত ‘অপর’ করে তোলার ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত নয়। তৃতীয় বিশ্বের নারীর দুঃখ-মূল্যবোধ-জীবনদর্শন বা ভাবনাচিন্তার কথা এখানে কখনোই প্রতিফলিত হতে দেখা যায় না, বরং সর্বদাই তাদের দেখা হয়েছে অবগুণ্ঠিত, পিছিয়ে পড়া, সংস্কারাচ্ছন্ন ও নির্যাতিতের ভূমিকায়। প্রাচ্য, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের নারীদের জীবনযাত্রা, হারেম-সংস্কৃতি ও অন্দরমহল সম্পর্কে পশ্চিমের কল্পিত চিত্র উন্মোচিত হয়েছে জুডি মাবরোর গবেষণায়। তালেবান-শাসনে নারীকে জোরপূর্বক পর্দা করতে বাধ্য করা এবং ফ্রান্সে মুসলিম বালিকাকে মাথায় স্কার্ফ পরার অপরাধে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া – দুইই নারীর অধিকারের ওপর সমান আঘাত বলে বিবেচ্য হওয়া উচিত। এ-প্রসঙ্গে কানাডার এক মুসলিম কিশোরী সুলতানা ইউসুফালির বয়ান বেশ চমকপ্রদ – ‘যখনই আমি নিজেকে ঢেকে ফেলি তখন অন্যের পক্ষে চেহারা দেখে আমাকে বিচার করার পথ সত্যিকার অর্থে অসম্ভব হয়ে পড়ে। আকর্ষণী-ক্ষমতা বা তার কমতি দিয়ে আমার মান বিচার করা সম্ভব হয় না। আমার শরীর আমার নিজস্ব ব্যাপার। কেউই বলতে পারে না আমার চেহারা কেমন হওয়া উচিত অথবা আমি সুন্দরী নাকি সুন্দরী নয়। আমি জানি আমি আসলে এর চেয়ে বড় কিছু।’ দুই পুঁজিবাদী সমাজে নারীর ভূমিকা ও ক্ষমতায়নের মূল্যায়নে এইসব উপকরণের কথা মনে রাখতে হবে। প্রসঙ্গত আমরা বর্তমানকালে বিজ্ঞাপনে নারীর অবস্থান সম্পর্কে উদাহরণ টানতে পারি। অবসরপ্রাপ্ত পিতা একটা অবলম্বনের অভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললে তার কালো ও অসুন্দর কন্যাটি প্রাণপণে নিজেকে যোগ্য করে তোলার প্রয়াসে রং ফর্সা করার ক্রিমের ম্যাজিকের শরণাপন্ন হয়। এর ফলাফলে অর্জিত আকর্ষণীয় চেহারা দিয়ে অবশেষে সে বিমানবালার মোহনীয় চাকরি জুটিয়ে নিতে সমর্থ হয় এবং বিজ্ঞাপনের শেষে দেখা যায় গর্বিত পিতা-মাতা কন্যার টাকায় তারকা হোটেলে ডিনার খেতে গেছেন। এ-ই হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়নের নমুনা! আবার বিজ্ঞাপনে প্রেমিক বা স্বামী প্রায়ই অন্য নারীর প্রতি আকৃষ্ট হলে নারীকে দেখা যায় এ-জাতীয় সৌন্দর্য-উপকরণ ব্যবহার করে স্বামীকে আবার নিজের দিকে ফিরিয়ে আনছেন। এটা হচ্ছে পুরুষের চোখে নারীকে ‘দেখা’র চিরাচরিত রূপ। ‘দেখা’র এই ভূমিকা সবচেয়ে প্রকটভাবে ফুটে ওঠে বিউটি কনটেস্টের মাধ্যমে। এ-ব্যাপারে ক্যানডেস স্যাভেজের বিউটি কুইনস : আ প্লেফুল হিস্ট্রি বইটি থেকে কিছু অংশ স্মরণ করি : “সমুদ্র-সৈকতে পুরুষ বিচারকদের সম্মুখে সর্বস্ব তুলে ধরার ব্যাপারে প্রতিযোগিনীদের কোনো ওজর-আপত্তি কখনো শোনা যায়নি। সম্ভবত তাদের কখনো প্রশ্নই করা হয়নি যে, এ-ব্যাপারে তাদের অনুভূতি কী বা কোনো মতামত আছে কিনা। অথবা তারা পুরুষকর্তৃক মূল্যায়িত হতে হতে এতই অভ্যস্ত যে, আপত্তি করার কথা কারো মাথায়ই আসেনি। গৃহে এবং কর্মক্ষেত্রে – জীবনের সব জায়গায় একজন নারীর জীবন প্রতি মুহূর্তে একটি বিউটি কনটেস্টের মতো – যেখানে পুরুষ তাকে…