আমাদের সর্বজয়ী মস্তিষ্ক ও চেতনার স্বরূপ

প্রায় দেড় কোটি বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা লক্ষ করল যে, তাদের জীবনধারণের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে – গাছপালা ও বনজঙ্গলের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে আসছে। শিম্পাঞ্জি, গরিলা, গিবন, ওরাংওটান ইত্যাদি প্রাণী তাতে কষ্ট করে হলেও টিকে রইল; কিন্তু আমরা আমাদের ‘স্বর্গোদ্যান’ থেকে অভিশপ্ত হয়ে রূঢ় পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই বাধ্য হলাম জঙ্গলের রাজত্ব ত্যাগ করে সাভানাচারী হয়ে খোলা ময়দানে আসতে। এর ফলে আমাদের দেহকাঠামোতেও দেখা দিলো পরিবর্তন – আমরা আরো সোজা হয়ে হাঁটতে ও দ্রুত দৌড়াতে সমর্থ হলাম, হাতদুটো শরীরের ভারমুক্ত হয়ে শিকার ও অন্যান্য কাজের উপযুক্ত হলো, আর একসময়ে আমরা হলাম ‘হাতিয়ারধারী প্রাণী’ – মানুষ। বেশি ছোটাছুটি করার ফলে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে হ্রাস করার উপায় হিসেবেই সম্ভবত আমরা আমাদের গাত্রলোম হারালাম, কারণ প্রাইমেটকুলে ১৯৩টি প্রজাতির মধ্যে সব এখনো দেহলোমাবৃত থাকলেও একমাত্র আমরাই হচ্ছি নগ্ন – অর্থাৎ গাত্রলোমহীন। আমাদের পূর্বপুরুষেরা যদিও ফলমূল ও মৃত জীবজন্তুর মাংস খেয়েই জীবনধারণ করত, কিন্তু নতুন পরিবেশ আমাদের বাধ্য করল অপেক্ষাকৃত নিরীহ জীবজন্তু শিকার ও হিংস্র জীবজন্তুকে তাড়ানোর উপায় অবলম্বনে ‘দলবদ্ধ শিকারি’ (co-operative pack Hunter)-এর জীবন বেছে নিতে। 

আমরা ছিলাম প্রকৃতির অপেক্ষাকৃত দুর্বল, খুবই সাধারণ মানের একটি নিরীহ প্রজাতি। আমাদের দাঁত-মুখ-নখ ইত্যাদির কিছুই ভয়ংকর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উপযোগী না হওয়ায় আমরা হাতে তুলে নিলাম চারদিকে ছড়ানো ভোঁতা পাথর, যা দিয়েই আমরা যৌথ কৌম জীবনের শক্তিতে হিংস্র জীবজন্তুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালাম। ধীরে ধীরে আমরা শিখলাম পাথরের অস্ত্রকে সুঁচালো ও তীক্ষ্ণধার করার পদ্ধতি, আয়ত্ত করলাম তাকে লাঠির আগায় বেঁধে লম্বা বর্শার মতো মারাত্মক অস্ত্র বানিয়ে দূর থেকে জন্তু-জানোয়ার ঘায়েল করার বুদ্ধি। আমাদের শিকারি পূর্বপুরুষদের দল প্রধানত পুরুষ শিকারিদের নিয়ে গঠিত ছিল বলে তাদের নারীরা সন্তান প্রতিপালন এবং অন্যান্য কাজের ফাঁকে একসময় আবিষ্কার করে কৃষিপদ্ধতি। এর ওপর ভিত্তি করেই আমরা একসময় আমাদের পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল যাযাবর জীবন ত্যাগ করে বেছে নিলাম স্থায়ী জীবন। এরপর আমাদের সমাজজীবনে এত দ্রুত পরিবর্তন আসে যে, মাত্র কয়েক হাজার বছর আগেও যে হাত চকমকি ঠুকে আগুন জ্বালাত, সে-হাত মহাকাশে রকেট পাঠানোর সলতেয় আগুন জ্বেলে দেওয়ার শক্তি অর্জন করেছে। আমরা হলাম Homo sapiens বা জ্ঞানী মানব।

আমাদের এই অগ্রযাত্রায় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে যে-অঙ্গটি, তা হচ্ছে আমাদের দেড় কেজি ওজনের শক্তিকেন্দ্র বা Power House বলে পরিচিত মস্তিষ্ক। আমাদের এই অঙ্গটি আমাদের হৃদপিণ্ডের মতোই রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টা বিশ্রামহীনভাবে আমাদের সচল রাখতে কাজ করে, যা তার মাঝে সঞ্চিত রাখে বিলিয়ন বিলিয়ন তথ্য – আমাদের স্মৃতি, অভ্যাস, সহজাত প্রবৃত্তি, দক্ষতা, আশা, নিরাশা, ভয় ইত্যাদি সবকিছুই। আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলো তাদের বিশাল সংযোগ-সূত্র (neural connections) দিয়ে সঞ্চিত করে রাখতে সক্ষম অর্ধশতাব্দী আগে শোনা কোনো অজানা শব্দ, সেতারের তারে ঠিক নির্দিষ্ট পরিমাণ টোকা দেওয়ার ক্ষমতা, দাবা খেলার কয়েক হাজার চাল, কোনো প্রিয়জনের ঠোঁটের নির্দিষ্ট পরিমাণ হাসির বক্রতা, দিগন্তরেখায় পাহাড়ের উপস্থিতি, পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের আলাদা মুখচ্ছবি, বিভিন্ন ফুলের গন্ধের বিভিন্নতা, বাল্যকালে স্কুলে পড়া নামতা কিংবা কবিতার পঙ্ক্তিমালা, দীর্ঘদিন আগে শোনা নরকের শাস্তি বা স্বর্গের মধুর দৃশ্য বর্ণনা কিংবা সুদূর অতীতে মাথা উঁচু করে দেখা রাতের তারাভরা আকাশের ছবি – ইত্যাদি।

প্রখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী হ্যারি জ্যারিসন মস্তিষ্কের বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস ঘেঁটে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণিদেহে মস্তিষ্কের আয়তন বৃদ্ধি বা encephalization-এর রহস্যাটি উদ্ঘাটন করেছেন। যেমন, প্রথম প্রাচীন স্তন্যপায়ীদের (mamels) উদ্ভব ঘটেছে প্রায় ২৩০ মিলিয়ন বছর আগে, যাদের মস্তিষ্কের আয়তন তাদের পূর্বপুরুষ সরীসৃপদের চেয়ে চার-পাঁচগুণ বড় হয়েছে। প্রায় ৫০ মিলিয়ন বছর স্তন্যপায়ী জীবেদের উৎপত্তিকালে তা আরো বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে। আবার স্তন্যপায়ী প্রাণীদের থেকে প্রাইমেটদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের আয়তন বৃদ্ধি ঘটেছে প্রায় দ্বিগুণ। প্রাইমেটদের মধ্যে এপ্ বা নরবানরেরা সবচেয়ে বড় মস্তিষ্কের অধিকারী, যা অন্যদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। আর 
 এ-শৃঙ্খলে সবার ওপরে রয়েছে মানুষের মস্তিষ্ক, যার আয়তন যে-কোনো নরবানরের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি।

আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রাণী-আচরণ বা animalism থেকেই কালক্রমে জন্ম নিয়েছে আমাদের humanity বা মানবতা – যা এসেছে শিক্ষা, শিক্ষা এবং ক্রমাগত শিক্ষার মধ্য দিয়ে। এর মধ্যে রয়েছে পাথরের টুকরোকে নিপুণভাবে ভেঙে সূক্ষ্ম বা তীক্ষ্ণধার অস্ত্র তৈরি করতে শেখা, আগুনের আবিষ্কার ও তাকে বশে রাখার কৌশল শেখা, কৃষিকাজ ও পশুপাখিকে গৃহপালিত করার কৌশল করায়ত্ত করা, সামান্য মৃত্তিকাকে ছাঁচে ঢেলে ও পুড়িয়ে মৃৎপাত্র প্রস্তুত করতে শেখা, পরবর্তীকালে ধাতুবিদ্যা, গৃহনির্মাণ, চাকার ব্যবহার ও শকট চালনা ইত্যাদি নানা ধরনের শিক্ষালাভ। আমরা যা খাই ও পরি, তার প্রায় সবকিছুই – চাল-ডাল, গম-চিনি, ফলমূল, তামাক, তুলা – ইত্যাদির গুণাগুণ আমাদের পূর্বপুরুষেরা আবিষ্কার করে সেগুলোর চাষ-বাসের পদ্ধতি শিখেছে, দিনের পর দিন নানা উপায়ে সেগুলোর জাতি নির্বাচন করে উন্নততর করতে শিখেছে। এভাবে ধীরে ধীরে মানুষ এসব গাছপালাকে উন্নত করেছে এবং তারাও উন্নত করেছে মানুষকে। মানুষ প্রথমে তার বাসস্থানের আশেপাশে উচ্ছিষ্ট খাদ্যের লোভে ঘোরাঘুরি করতে থাকা কুকুর-বিড়াল শাবকদের ধরে তাদের গৃহপালিত করেছে, যারা শিকারে তাদের সহযোগী হয়েছে। পরে এভাবেই তারা গৃহপালিত করেছে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, ঘোড়া ইত্যাদি প্রাণিকুলকে। এদের সাহায্য নিয়েই পরবর্তীকালে সে করেছে কৃষিকাজের পত্তন। ধীরে ধীরে সে আবিষ্কার করেছে প্রকৃতির নিয়মকানুন, উন্মোচন করেছে নানা রহস্য – ঋতুবৈচিত্র্য ও বর্ষপঞ্জি, মহাকাশের রহস্য, ধরা দিয়েছে ধর্ম ও বিজ্ঞান। এভাবেই পথ চলে একসময়ে মানুষ উঠে এসেছে প্রাণিজগতের শীর্ষে, পরিণত হয়েছে অত্যন্ত ক্ষমতাধর সভ্য মানুষে।

মানুষের আদি সভ্যতার পীঠস্থানগুলো পৃথিবীর নানা স্থানে ছড়ানো রয়েছে, যা বিভিন্ন যুগে দেখা দিয়েছে এবং একসময় নানা কারণে অন্তর্হিত হয়েছে – যেমন প্রাচীন মিশর, আসিরিয়া, ব্যাবিলন, চীন, পারস্য, ভারত উপমহাদেশের হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো কিংবা মধ্য আমেরিকার ওমেক সভ্যতা। তবে নানা কারণে সেসব সভ্যতাকে ছাড়িয়ে আধুনিক যুগে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব হাজার বছর আগে শুরু হওয়া গ্রিক সভ্যতা। অবশ্যই এর আগে সভ্যতার ঊষালগ্নে পৃথিবীর বুকে অনেক সভ্যতাই দেখা দিয়েছে, কিন্তু গ্রিক সভ্যতা তাদের চেয়ে স্বাতন্ত্র্যের দাবি করতে পারে একটা কারণে – তারাই প্রথম প্রকৃতির নিয়মগুলোকে আবিষ্কার করে সেগুলোর মাধ্যমে জগৎকে বিশ্লেষণ করতে উদ্যোগী হয়েছে – কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির খেয়ালখুশিতে চলা বিশ্বের ব্যাখ্যা নিয়ে তারা সন্তুষ্ট হয়ে থাকেনি। অন্যদের মতো গ্রিকরাও জীবনকে সর্বাংশে উপভোগ করার চেষ্টা করতো তাদের নৃত্যগীত, থিয়েটার, ক্রীড়া, সংগীত, নারীসঙ্গ ও মদ্যপানের মাধ্যমে। তবে তারা শুধু এসব লঘু বিষয় নিয়ে মেতে না থেকে এমন কিছু আলোড়নকারী প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল, যে-প্রশ্নগুলো আমাদের অস্তিত্বের গভীরে বাস করা গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা। হোমার, এস্কাইলাম, এরিস্টোফেনেস, থুসিডিডেস, জেনোফেন, সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টোটল হচ্ছেন এমনই কয়েকজন মনীষী, যাঁরা আমাদের আত্মার চিকিৎসক। তাঁরা যে-অমর বাণী নিজেরা শুনেছেন এবং আমাদের শুনিয়েছেন, তা হচ্ছে – আমরা কে, আমরা কী চাই, আমাদের কেমন হওয়া উচিত – এরকম কিছু বিস্ময়কর প্রশ্ন। এসব প্রশ্ন সুদূর অতীত থেকে এসেও আমাদের বর্তমানের ওপর প্রভাব রাখে, যেমন আমেরিকান সংবিধানে শক্তির ভারসাম্য হিসেবে যা কাজ করে, তার মূল প্রোথিত রয়েছে গ্রিক মহাপুরুষদের চিন্তায় – যা হচ্ছে মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ। 

এটি আমাদের জানা যে, গ্রিকদের পারস্পরিক অনৈক্য একসময়ে তাদের অবনতির দিকে নিয়ে যায়। ফলে তারা একসময় পরাজিত হয় প্রবল পরাক্রান্ত বিজয়ী রোমানদের দ্বারা। কিন্তু অচিরেই দেখা গেল যে, বিজয়ী রোমানরা হয়ে পড়লো পরাজিত গ্রিকদেরই ছাত্র। গ্রিকরা রোমানদের শিক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হতে পেরেছে যে কারণে সেটি হলো, রোমান সেনাদল, রোমান রাস্তা, রোমান আইনকানুন ইত্যাদি অনেক কিছু থাকলেও তাদের ছিল না উল্লেখযোগ্য কোনো রোমান দর্শন-বিজ্ঞান-সাহিত্য। এর ফলে পরবর্তীকালে ইতালিতে দেখা দিলো সভ্যতার আরেকটি নতুন গ্রিক বাগান – যার নাম গ্রেকো-রোমান সভ্যতা। এই গ্রেকো-রোমান সভ্যতা কী করে একদিন ধসে পড়ল, তা কেউই সঠিকভাবে জানে না। তবে দেখা গেল যে, এর রোমান অংশটির ধস নামল প্রথমে, যখন পূর্বাংশের গ্রিকভাষী সাম্রাজ্য বাইজেনটিয়াম আশপাশের প্রবল শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আরো হাজার বছর ধরে টিকে রইল। পতনের এই পার্থক্যের একটি কারণ এখানে স্পষ্ট যে, পশ্চিম সাম্রাজ্য যখন ব্যস্ত ছিল সম্পদ আহরণ ও ভোগবিলাসে, তখন পূর্ব সাম্রাজ্য ব্যস্ত ছিল চিন্তাচর্চায়।

তারপর এলো দীর্ঘ এক সহস্রাব্দব্যাপী সূচিভেদ্য অন্ধকার – ইতিহাসে যা অন্ধকার মধ্যযুগ বলে পরিচিত। 
 এ-অন্ধকার সময়টিতে অনেক দর্শনবিদ্যার স্কুল, হাসপাতাল, লাইব্রেরি ইত্যাদি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে – জ্ঞানচর্চাকে নিরুৎসাহিত করে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে ধর্মীয় শিক্ষাকে। সাক্ষরতার হার এ-সময়ে এমন স্তরে নেমে এসেছে যে, কোনো যাজক বা কোনো নৃপতি তার নিজের নামটি স্বাক্ষর করতে সক্ষম, এমনটা পাওয়াই ছিল দুষ্কর। সহস্র বছর পেরিয়ে এ-অবস্থার ধীরে ধীরে উন্নতি হতে থাকে এবং পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এসে ধ্রুপদী 
 গ্রেকো-রোমান সভ্যতার মহিমা ও আদর্শ আবার তার পূর্বগৌরব অর্জন করে। এরপর আধুনিক সভ্যতার ঊষালগ্নে যে শিল্পবিপ্লব শুরু হয়, তার সূচনাকারী প্রত্যেক মহান চিন্তার চিন্তাশীল মানুষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রোম ও গ্রিসের কাছে ঋণী। কীভাবে বিভিন্ন নির্জন স্থানে, বর্বর সমাজে সংঘাত ও উৎপীড়নের কঠোরতাকে উপেক্ষা করে তাঁরা এই শিক্ষা ও সভ্যতার মশাল এগিয়ে নিয়ে গেছেন, পেছনপানে তাকিয়ে দেখলে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ি আমরা। কীভাবে মধ্যযুগের নিরস, দুর্বোধ্য মন্ত্রোচ্চারণ থেকে বেরিয়ে এসেছে কবিতা; ঝাড়-ফুঁক, জাদু-টোনা থেকে বিজ্ঞান এবং স্থবির, ঘুণেধরা সমাজ থেকে আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার প্রাণচাঞ্চল্য – তা ভাবলে বিস্ময়ে অবাক হতে হয় আমাদের।

এমনই একজন ব্যক্তি ছিলেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, এক গরিব পল্লিবালার অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান, যিনি সম্ভবত অগ্নিসংযোগ করেছিলেন রেনেসাঁস বা পুনর্জাগরণের বারুদের সলতেয়। তিনি একবার বলেছিলেন – ‘হঠাৎ করেই আমি নিদ্রা থেকে জেগে উঠলাম, আর দেখতে পেলাম যে সমস্ত জগৎ ঘুমিয়ে রয়েছে।’ ছিলেন গ্রেগর মেন্ডেল, শান্তশিষ্ট যে মঠবাসী সাধু তাঁর নিজের বাগানে শিমগাছের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কোনো যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই আবিষ্কার করেছিলেন সৌজাত্যবিদ্যার মৌলিক নিয়মসমূহ। এরকমই আরেকজন ছিলেন আমেরিকার চেরোকি রেড ইন্ডিয়ান বংশোদ্ভূত সেক্যুইয়া নামে এক বহুশাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত, যিনি ১৮২১ সালে তাঁর নিজ গোত্রের মৌলিক ভাষা লেখার জন্য, একাই একটি লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। আইজাক নিউটন ছিলেন ল্যাঙ্কাশায়ারের এক কৃষকপুত্র, যিনি তাঁর বাল্যকালে খুব একটা ভালো ছাত্র বলে পরিচিত ছিলেন না। কিন্তু ক্যামব্রিজে পড়তে যাওয়ার কিছুদিন পরই তাঁর মেধার জগতে যেন ঘটল বিস্ফোরণ – তাঁর হাত ধরে একে একে উন্মোচিত হলো পদার্থবিদ্যার নানা রহস্য ও প্রকৃতির স্বরূপ। আইনস্টাইনের পিতা স্কুল থেকে ‘মধুবাক্য’মাখা একটি চিঠি পেয়েছিলেন – ‘আপনার পুত্রের মূর্খতাপূর্ণ উপস্থিতি ক্লাসের জন্য ক্ষতিকর এবং তা অন্য ছাত্রদের মেধার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাকে অন্যত্র সরিয়ে নিলে স্কুল উপকৃত হবে।’ এ-ঘটনার মাত্র ১১ বছর পরই তরুণ পদার্থবিদ আলবার্র্ট আইনস্টাইন আবিষ্কার করলেন আপেক্ষিকতাসহ এমন আরো কিছু, পৃথিবীর চিরাচরিত বিজ্ঞানকেই যা চ্যালেঞ্জ করে সবকিছু নতুন করে দেখার ক্ষেত্র প্রস্তুত করল। এ-সম্পর্কে আইনস্টাইন নিজেই বলেছিলেন – ‘আমার বাল্যজীবনে আমি আমার মানসিক বিকাশে পিছিয়ে ছিলাম, তাই যেসব প্রশ্ন শিশুদের মনে উদয় হয়, সে-প্রশ্নগুলো আমার মনে দেখা দিয়েছে বয়ঃপ্রাপ্তির পর। সম্ভবত এজন্যই আমি পরবর্তীকালে সাধারণ লোকের চেয়ে অনেক গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছি।’ ঊনবিংশ শতকের এক কৃষকপুত্র জেরাই কোলবার্ন গণিতে অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন – একদল বিশেষজ্ঞের সামনে ৮ সংখ্যাটিকে তার ষোলোতম শক্তিমাত্রায় (৮১৬) উন্নীত করে মুখে মুখে যখন তার সঠিক উত্তরটি (২৮১, ৪৭৪, ৯৭৬, ৭১০, ৬৫৬) দিয়েছিলেন, তখন উপস্থিত দর্শকরা সবাই কাঁদতে শুরু করেছিল। তখন কোলবার্নের বয়স ছিল মাত্র আট বছর। একইভাবে ১৮৪৬ সালে দশ বছর বয়সী হেনরি সাফোর্ডকে বলা হয়েছিল ৩৬৫, ৩৬৬, ৩৬৫, ৩৬৫ সংখ্যাটি ৩৬৫, ৩৬৫ দিয়ে গুণ করতে, যার সঠিক উত্তরটি তিনি এক মিনিটের মধ্যে দিয়েছিলেন। দুজন ভারতীয়, গত শতাব্দীর প্রথমদিকে রামানুজন এবং শেষদিকে শকুন্তলা দেবী, গণিতে তাঁদের মেধা দিয়ে সারা পৃথিবীকেই চমৎকৃত করেছিলেন।

মেধার জগতে বিস্ময়বালক বা Child Prodigies অনেকের কথাই আমরা জানি। জন স্টুয়ার্ট মিল, পরবর্তী জীবনে যিনি একজন নামকরা দার্শনিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ হয়েছিলেন, তিনি তাঁর ছ-বছর বয়সেই গ্রিক ধ্রুপদী সাহিত্যে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। মোজার্ট তাঁর চার বছর বয়সেই পিয়ানো বাজাতে পারতেন ওস্তাদের মতো, পাঁচ বছর বয়সে তিনি সিম্ফনি বা ঐকতান কম্পোজ করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে সংগীতে জগৎজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন। একইভাবে অ্যান্ড্রু নাস্টেল তাঁর দুই বছর বয়সেই সংগীতে প্রতিভার পরিচয় দেন, জুন মাস্টার্স পাঁচ বছর বয়সে অর্কেস্ট্রা পরিচালনা করেছেন। আর শুধু সংগীত নয়, দাবার জগতেও এমন অনেক বিস্ময়বালকের দেখা পাওয়া যায়। আমাদের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদও তো এমন একজন বিস্ময়বালক হিসেবেই দাবার জগতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এমনই আরেকজন বিস্ময়বালক হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, বাঙালি গণিতবিদ ও পদার্থবিদ অধ্যাপক সুবর্ণ বারী আইজাক, যিনি তাঁর তিন বছর বয়স থেকেই পিএইচ.ডি সমমানের অংক করতে সমর্থ ছিলেন। বর্তমানে আট বছর বয়সী সুবর্ণ স্বীকৃতি পেয়েছেন ‘আমাদের সময়ের আইনস্টাইন’ হিসেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার কাছ থেকে বিশেষ অভিনন্দনপত্র লাভ করেছেন। হার্ভার্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তিনি তাঁর অসাধারণ মেধার স্বীকৃতি পেয়েছেন।

প্রতিভাবানরা কীভাবে তাঁদের আইডিয়াগুলো পান? ফরাসি বিজ্ঞানী ফেহর তাঁর সমসাময়িকদের কাজের অভ্যাস নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন যে, ৭৫ শতাংশ বিজ্ঞানীর ক্ষেত্রে তাঁদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলো এসেছে অবসর-মুহূর্তে – যখন তাঁরা তাঁদের কাজ বা চিন্তায় সক্রিয় ছিলেন না। মনে করা হয়ে থাকে যে, এসব আবিষ্কার তাঁদের অবচেতন মনের আবিষ্কার, কারণ বিশ্রাম হচ্ছে অবচেতনে ঢোকার সিংহদ্বার। অক্টোবর ১৯২০ সালের এক রাতে ফ্রেডারিখ গ্রান্ট বান্টিং নামে এক তরুণ কানাডিয়ান শল্যবিদ তাঁর ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর জন্য পরবর্তী দিনের ক্লাসের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁর পড়ার বিষয়বস্তু ছিল বহুমূত্র রোগ। সারা সন্ধ্যারাত এ-রোগের বিষয়ে নানা বইপত্র ঘেঁটে মাঝরাতে তিনি ঘুমাতে গেলেন, কিন্তু রাত দুটোয় তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠে আলো জ্বালালেন এবং তাঁর নোটবুকে লিখলেন মাত্র তিনটি বাক্য – ‘কুকুরের অগ্ন্যাশয় নালি বেঁধে বন্ধ করে দাও। এরপর ছয় থেকে আট সপ্তাহ সেটিকে সেরে উঠতে দাও। তারপর কোষকলা পরীক্ষা করে দেখো, কী পাওয়া যায়।’ এরপর তিনি আবার ঘুমাতে গেলেন। এই তিনটি লাইন থেকেই মানবজাতি পেল জীবনদায়িনী একটি আবিষ্কার – ইনসুলিন। বান্টিংয়ের সচেতন মন যা নিয়ে দিনের পর দিন চিন্তা করছিল, তাঁর অবচেতন মন মাত্র কয়েক মিনিটেই তা সম্পন্ন করে দিলো। প্রখ্যাত জার্মান পদার্থবিদ ভন হেল্মহোল্জ বলেছিলেন – ‘সবকিছু নিয়ে চিন্তা করার পর কোনো অবসর মুহূর্তে একটি সুখী আইডিয়া কোনো চেষ্টা ছাড়াই মনে চলে আসে, তবে সেগুলি কখনোই আমার কাজের টেবিলে আমার কাছে আসেনি।’ পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত মার্কিন লেখক থর্নটন ওয়াইল্ডার স্বীকার করেছেন যে, তাঁর আইডিয়াগুলো তাঁর কাছে আসে ‘বেড়াতে গিয়ে এবং স্নানাগারে।’ বিখ্যাত ফরাসি গণিতবিদ ও দার্শনিক দেকার্তে বলতেন যে, তাঁর আবিষ্কারসমূহ সবসময়ই তাঁর কাছে ধরা দিয়েছে ভোরে বিছানায় অলসভাবে শুয়ে থাকার সময়। সম্ভবত এজন্যই রাজনীতিবিদ, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী এন্ড্রু মেলন বলেছেন – ‘অবসরেই বাঁধা আছে আমাদের সৌভাগ্য।’

প্রতিভাবানের সঙ্গে আইকিউ বা বুদ্ধ্যাঙ্কের কী সম্পর্ক রয়েছে? আমরা দেখতে পেয়েছি যে, পৃথিবীর বহু মনীষীর ক্ষেত্রে বুদ্ধ্যাঙ্ক সাধারণ মানুষের গড় বুদ্ধ্যাঙ্কের চেয়ে বেশি নয়। এঁদের মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিবিদ ক্রমওয়েল, জন এডামস, আব্রাহাম লিংকন; সমরনায়ক নেপোলিয়ান, নেলসন, ড্রেক; লেখক গোল্ডস্মিথ, থ্যাকারে, এমার্সন প্রমুখ। স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. ক্যাথারিন মরিস কক্সও গবেষণা করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, বুদ্ধ্যাঙ্কের সঙ্গে প্রতিভার সম্পর্কটি খুব গভীর নয়। খুব কম মনীষীই উচ্চ বুদ্ধ্যাঙ্কের অধিকারী ছিলেন – যেমনটি ছিল লাইবনিজ কিংবা গে্যঁটের ক্ষেত্রেও, যাঁদের বুদ্ধ্যাঙ্ক ছিল ১৯০-এর অধিক। অন্যদের বুধ্যাঙ্ক পাওয়া গেছে খুবই সাধারণ মানের – যেমন সার্ভেন্ডেস ১১০, কোপার্নিকাস ১৩০, রেমব্রান্ড ১৩৫, বাখ্ এবং ডারউইন ১৪০, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ১৫০। বংশগতি ও প্রতিভার মধ্যে কিছুটা সম্পর্ক থাকলেও তাও সবসময় অবধারিত নয়। মোজার্ট, বাখ্ ও মেন্ডেলসন এসেছিলেন সাংগীতিক পটভূমি থেকে, হাক্সলি ও ডারউইন প্রতিভাশালী পূর্বপুরুষদের থেকে। কিন্তু অনেক মনীষীই খুব সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছেন – শেক্সপিয়রের পিতামাতা ছোট একটি শহরের সাধারণ নাগরিক, স্তাঁদাল এসেছিলেন অপরিচিত, গ্রাম্য পটভূমি থেকে। লিওনার্দো ছিলেন ফ্লোরেন্সের এক আইনজীবী পিতার ঔরসে জন্ম নেওয়া গরিব এক কৃষক রমণীর অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তান।

কীভাবে একজন মহান চিন্তাবিদের আবির্ভাব ঘটে? তাঁরা কেউ গাছপালার মতো জন্মান না, কিংবা প্রাণিকুলের নির্বাচিত প্রজননের মধ্য দিয়েও নয়। তবে দুটো পদ্ধতির কথা আমরা জানি – প্রথমটি হচ্ছে তাঁদের ওপর অবিরাম প্রণোদনা, চাপ বা চ্যালেঞ্জ প্রয়োগ করা, যাতে তাঁরা সবসময় নির্দিষ্ট কিছু সমস্যা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। দ্বিতীয় পথটি হচ্ছে, তাঁদের সমমনা আরো চিন্তাবিদের সঙ্গে মিশতে দেওয়া এবং মতবিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়া। আমরা সারাজীবন ধরে যত কাজ করি, আমাদের মস্তিষ্ক তার চেয়েও অনেক বেশি কাজ করার ক্ষমতা রাখে। একজন মানুষ সারাজীবন ধরে তার সমস্ত মাংসপেশিকে ব্যবহার করে থাকে, কিন্তু তার মস্তিষ্ক কোষগুলোর এক বিশাল অংশ অব্যবহৃতই থেকে যায়। তবে আমাদের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, যেগুলোকে মোকাবিলা করা না গেলে আমরা আর কোনো মহান চিন্তাবিদ পাবো না। এর একটি হচ্ছে আলস্য, দ্বিতীয়টি যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতা, তৃতীয়টি হচ্ছে একনায়কত্ব ও জুলুমবাজির ফলে সৃষ্ট সামাজিক স্থবিরতা।

অবশ্য সবধরনের একনায়কেরাই একসময় না একসময় পরাজিত হয় এবং সমাজে আবার চিন্তাশীল, স্বাধীন মানুষেরা প্রভাব বিস্তার করেন। নতুন একটি প্রজন্মের জন্ম হয় এবং শিশুদের মাঝ থেকে নতুন চিন্তাশীল মানুষেরা উঠে আসে। প্রাণঘাতী জীবাণু, গণধ্বংসী অস্ত্রের বিস্ফোরণ ও অন্যান্য উপায়ে মানুষকে শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করাটা যতটা সহজ, মানসিকভাবে পরাজিত করাটা ততোটাই কঠিন। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তাঁর কালজয়ী উপন্যাস দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সিতে যেমনটি বলেছেন – ‘মানুষ ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু পরাজিত হতে পারে না।’ মানুষ খুবই সহনশীল প্রাণী, যে দ্রুতই যে-কোনো পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এ-পৃথিবীতে মানুষ যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন সব ধরনের নিষ্ঠুরতা এবং অত্যাচারকে উপেক্ষা করেই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখবে। এটাই হচ্ছে মানুষের এক বিশেষ ক্ষমতা, যা আমাদের বর্বর, বন্যা জীবন থেকে নিয়ে এসেছে প্রজ্ঞা, সভ্যতা ও মানবতার মহাসড়কে। আমাদের ভবিষ্যৎ আরো দূরদিগন্তে প্রসারিত, যার কোনো সীমা আমরা চোখে দেখতে পাই না।