April
-

শিরোনামহীন
হাশেম খান বাংলাদেশের চিত্রকলার সৃজনধারায় এক সমাজমনস্ক চিত্রকর। তাঁর ক্যানভাসে ধরা আছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন-অভিজ্ঞতার নানা রূপ। প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষ তাঁর চিত্রের মুখ্য বিষয়।
-

অসম্পূর্ণ মধুসূদন
আশা আর নিরাশার দোলাচলে দোদুল্যমান ছিল মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন। প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মধ্যে পার্থক্য ছিল বিস্তর। প্রস্ফুটনের কালে অবিকশিত থেকে গেছে তাঁর অনেক স্বপ্ন।
-

কাজী আবদুল ওদুদের ‘সৃষ্টিধর্ম’
পাশ্চাত্যে প্রাচ্যদেশীয় সমাজ বিশ্লেষণে একটি মডেল বিদ্যমান। মডেলটি হলো, প্রথাগত বা সনাতন ধর্মব্যবস্থা – পুনর্জাগরণ বা রেনেসাঁস – আধুনিকতা। শাহাদাত এইচ খান তাঁর ‘Th e Freedom of Intellect Movement (Budhir Mukti Andolan) (1926-1938) in Bengali Muslim Thought’(Ph.D dissertation, University of Toronto, 1997)’ শীর্ষক গবেষণাকর্মে এই চিন্তা ছকেই বাঙালি মুসলমান লেখকদের জীবনজিজ্ঞাসার স্বরূপ আলোচনা করেছেন। তবে এক্ষেত্রে তাঁর স্বতন্ত্র অনুসন্ধানও লক্ষণীয়। তিনি আজিজ আহমেদের Islamic Modernism in India and Pakistan 1857-1964 (London, Oxford University Press, 1967), এইচ. এ. আর. গিবের Modern Trends in Islam (London, Victor Gollancz Ltd. 1946) এবং ডব্লিউ. সি. স্মিথের Islam in Modern History(London, Oxford University Press, 1966) প্রভৃতি গ্রন্থে বাঙালি মুসলমানের চিন্তা ও কর্ম না থাকার কারণ চিহ্নিত করেছেন। পাশ্চাত্যে উপমহাদেশের মানববিদ্যা চর্চায় ভারতের আধুনিকতাবাদী মুসলমানদের মধ্যে শুধু উর্দুভাষী মুসলমান বুদ্ধিজীবীর প্রসঙ্গ এসেছে। যদিও কোনো কোনো রচনায় বাঙালি মুসলমানের প্রসঙ্গ আসে, তবে তা বিচার ও বিশ্লেষণ ব্যতীত শুধু উল্লেখ করা হয়েছে। শাহাদাত পাশ্চাত্য চিন্তার মডেল অস্বীকার করেননি। তবে বাঙালি মুসলমানের মুক্তচিন্তাপ্রসূত সমন্বয়ধর্মী, যুক্তিবাদী ধারাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। উপমহাদেশের মুসলমানরা পাশ্চাত্য থিসিস অনুসারে সনাতনপন্থী কিংবা আধুনিক উদারনৈতিক – এমন ধারণার সঙ্গে তিনি দ্বিমত পোষণ করেছেন। শাহাদাত বিশ শতকের প্রথমার্ধের বাঙালি মুসলমান চিন্তকদের তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন – নব্য গোড়াপন্থী, উদারপন্থী ইসলামি বুদ্ধিজীবী,…
-

‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের শতবর্ষে আবদুল কাদির
উনিশ শতকে নবযুগের নতুন সূর্যের নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে মহানগর কলকাতা, সূচিত হয় এক নতুন যুগের, ঐতিহাসিকরা যার নাম দেন বেঙ্গল রেনেসাঁস বা নবজাগৃতি। নতুন যুগের ভোরে রামমোহন, দ্বারকানাথ, দেবেন্দ্রনাথ, কেশব সেন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখের মননচর্চার হাত ধরে হিন্দুসমাজের যখন ঘুম ভাঙছে, বাঙালি মুসলমান সমাজে তখন গভীর রাত। এরা তখনো উনিশ শতকের মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি, যেন কোনো প্রাচীন কৌমের সদস্য। তখনো তারা পাশ্চাত্য শিক্ষা, মননচর্চা ও সিভিল সমাজ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। সংগত কারণেই বাঙালি মুসলমান সমাজে উনিশ শতকীয় রেনেসাঁসের আলো ঢুকতে পারেনি, যেমন ঢুকেছিল ওপরতলার শিক্ষিত বর্ণহিন্দু ও ব্রাহ্ম সমাজে। উনিশ শতকের প্রথমদিকেই রাজা রামমোহন বাঙালির ভাবজগতে ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্তিবাদের মেলবন্ধন রচনা করে এক নতুন ধারা প্রবর্তনে সচেষ্ট হন। হিন্দু ধর্ম, ক্রিশ্চিয়ানিটি ও ইসলামের শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্য ও সুকৃতিসমূহ আত্মস্থ করে হিন্দুধর্মকে তিনি নতুনভাবে নির্মাণ করতে ব্রতী হলেন। বাইবেল, কোরআন ও শঙ্করের অদ্বৈতবাদের পাঠ গ্রহণ করে ভারতবাসী তথা বাঙালি সমাজকে জানিয়ে দিলেন, বিশ্বের প্রতিটি ধর্মের লক্ষ্য অভিন্ন। মানবজাতির নৈতিক উৎকর্ষ সাধন এবং মানুষের ভেতর শ্রেয়োবোধ জাগাতে যুগের প্রয়োজনে প্রতিটি ধর্মের পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্ব্যাখ্যা হওয়া আবশ্যক। তিনি বললেন, আত্মিক মুক্তির জন্য স্বধর্ম বা স্ব-সম্প্রদায় ত্যাগের কোনো প্রয়োজন নেই। বরং অন্ধত্ব, গোঁড়ামি, কূপমণ্ডূকতা ও কুসংস্কার ত্যাগ করে প্রতিটি ধর্মের ভিতর যে মানবিক ও নৈতিক দিকগুলো রয়েছে সেইগুলো গ্রহণ করা জরুরি। ধর্ম সম্পর্কে রামমোহনের মতামত ভারতীয় হিন্দু সমাজকে দারুণভাবে নাড়া দিয়ে যায়, যদিও সমকালে তাঁর মতামত সেইভাবে গৃহীত হয়নি, আবার খাটো করার স্পর্ধাও কেউ দেখাতে পারেনি। রামমোহনের সমসময়ে বাঙালি মুসলিম সমাজের চিন্তাজগতে পরিবর্তনের তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না। কোনো চিন্তক যুক্তির সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসের মিলন রচনার চেষ্টা করেছিলেন কি না, তারও সন্ধান পাওয়া যায় না। বাঙালি মুসলমানের চিন্তাজগতে অগ্রগামী ও মিলনধর্মী চিন্তার আভাস পাওয়া যায় অনেক পরে, আজ থেকে একশ বছর আগে (১৯২৬) ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজ তথা শিখাগোষ্ঠীর চিন্তানায়কদের মাধ্যমে। শিখাগোষ্ঠীর অভ্যুদয়কালে বিদ্রোহী কবি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর কবিতা-গান-গজল বাংলার তরুণচিত্তে উন্মাদনা সঞ্চার করেছে, প্রেম ও দ্রোহের এক অমোঘ আবর্তনে দলে দলে মানুষ, বিশেষত তরুণ সমাজ নজরুলকে ঘিরে অনুপ্রাণিত ও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু বাঙালি মুসলমান প্রভাবশালীরা তাকে আন্তরিক আবেগে সেইভাবে বরণ করে নিতে পারেননি। সেই দ্বন্দ্বমুখর সময়ে শিখাগোষ্ঠীর তরুণ চিন্তক-সংগঠকরা বাঙালি মুসলমান সমাজের জ্ঞানের দীপশিখা জ্বালাতে চেয়েছিলেন। তরুণ তুর্কিদের ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর শিখার আলো জ্বলেছিল ক্ষণকালের তরে, মাত্র পাঁচ বছর। ফলে চারদিকের প্রগাঢ় অন্ধকার দূর করা সম্ভব হয়নি। যুগের প্রয়োজনে ধর্ম, সাহিত্য ও সাহিত্য-ব্যক্তিত্বদের তাঁরা পুনর্মূল্যায়ন করতে চেয়েছিলেন। আবুল হুসেন (১৮৯৭-১৯৩৮), কাজী আব্দুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), কাজী আনোয়ারুল কাদির (১৮৮৭-১৯৪৮), কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শ্রেণির ছাত্র আবুল ফজল (১৯০৩-৮৩), ঢাকা কলেজের ইন্টারমিডিয়েট শ্রেণির ছাত্র আবদুল কাদির (১৯০৬-৮৪) প্রমুখ তরুণ চিন্তক ১৯২৬ সালে ঢাকা শহরে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে যে সাহিত্য-সংগঠনটি গড়ে তোলেন, তার মূলমন্ত্র ছিল বুদ্ধির মুক্তি। সংগঠনের মুখপত্র শিখার প্রথম সংখ্যায় প্রকাশকের নিবেদনে বলা হয় : ‘শিখার প্রধান উদ্দেশ্য বর্তমান মুসলমান সমাজের জীবন ও চিন্তাধারার গতির পরিবর্তন সাধন।’ শিখা ও মুসলিম সাহিত্য সমাজের সংগঠকরা বিশ্বাস করতেন, বুদ্ধির মুক্তি ভিন্ন বাঙালি মুসলমান সমাজের চলার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। এ-প্রসঙ্গে শিখাগোষ্ঠীর প্রাণপুরুষ আবুল হুসেনের মন্তব্য : ‘মুসলমান জগৎ বুদ্ধির ঘরে তালা লাগিয়ে কেবল শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে মুসলমানের চলার পথে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।’১ আবদুল কাদির ছিলেন ঢাকার বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় উদ্যোগী ও অগ্রণী ব্যক্তিত্ব; অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। শিখা গোষ্ঠী কিংবা মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তাচর্চা তৎকালীন বাঙালি মুসলমান সমাজে কী ধরনের প্রভাব বিস্তার করেছিল, কোন ভাবকল্প নিয়ে শিখাগোষ্ঠী আবির্ভূত হয়েছিল, তাদের বৌদ্ধিক তৎপরতার অনুগামী কারা ছিলেন – আজ শতবর্ষ পরে সেসব জিজ্ঞাসার উত্তর পাওয়ার জন্য আবদুল কাদিরকে মূল্যায়ন খুবই জরুরি। দুই নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শিখা সমকালে বাঙালি মুসলমান শিক্ষিত সমাজে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, যদিও সাধারণ জনমানুষের সঙ্গে পত্রিকাটির কোনো সম্পর্ক ছিল না। ডিরোজিওর ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্টের সঙ্গে তুলনা করে শিবনারায়ণ রায় শিখাগোষ্ঠীর তৎপরতাকে চিহ্নিত করেন ‘আ নিউ রেনেসাঁস’ হিসেবে। শিখার যে প্রথম সংখ্যা (চৈত্র, ১৩৩৩) প্রকাশিত হয় তার সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক আবুল হুসেন আর প্রকাশকের দায়িত্ব পালন করেন আবদুল কাদির। কাদির ছিলেন একাধারে কবি,…
-

আবু ইসহাক : গ্রামীণ জীবনের রূপকার
আবু ইসহাকের (১৯২৬-২০০৩) প্রথম উপন্যাস সূর্য-দীঘল বাড়ী প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। তিনি পাঁচ দশকের বেশি সময় সাহিত্যজগতে বিচরণ করলেও তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা মাত্র আটটি। এ-লেখকের গ্রন্থসংখ্যা কম হওয়ার একটি প্রধান কারণ পেশাগত জীবনের ব্যস্ততা। আবু ইসহাক যথেষ্ট লিখতে পারেননি বলে তাঁর মধ্যে ‘আক্ষেপ’১ ছিল। উপরন্তু জীবনের শেষ এক যুগেরও বেশি সময় তিনি প্রধানত অভিধান সংকলনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন বলে সৃজনশীল সাহিত্য রচনায় মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। আবার কিছু বাস্তব কারণে তিনি কখনো হয়তো সাহিত্য রচনার উৎসাহ হারিয়েছিলেন, তার কিছু দিকও লেখক উল্লেখ করে গিয়েছেন একটি নিবন্ধে।২ ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফল প্রকাশের পূর্বেই মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৪৪ সালের মে মাসে বেসামরিক সরবরাহ বিভাগে যোগ দিয়ে আবু ইসহাক তাঁর কর্মজীবনের সূচনা করেন। সিভিল সাপ্লাই বিভাগে কর্মকালে আবু ইসহাক নারায়ণগঞ্জ, পাবনা, ঢাকা ও কলকাতায় দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তবে ওই পদে অধিকাংশ সময় তাঁর নারায়ণগঞ্জেই কাটে।৩ নারায়ণগঞ্জে অবস্থানকালেই তিনি সূর্য-দীঘল বাড়ী লেখা শুরু করেন – তরুণ চোখে দেখা অভিজ্ঞতার নিবিড় রূপায়ণ চলে লেখার খাতায়। তখনো বাংলায় দুর্ভিক্ষের প্রভাব কাটেনি। সূর্য-দীঘল বাড়ীতে তিনি যে জয়গুন, হাসু, শফির মা, লালুর মাকে এঁকেছেন সেই শ্রেণির অন্ত্যজ মানুষকে তিনি কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ট্রেনে চলার পথে। ওই সময়ই আবু ইসহাক জয়গুনের মতো সংগ্রামী নারী ও তার সাথিদের দেখেছেন ট্রেনে করে ময়মনসিংহ যেতে আবার থলিভরা চাল নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে ফিরতে। ফতুল্লা, চাষাঢ়া প্রভৃতি স্টেশনে পৌঁছার আগেই চালের থলিগুলো দুপদাপ পড়তো রেলরাস্তার পাশে। আরো দেখেছেন নারায়ণগঞ্জ রেল ও স্টিমার স্টেশনে হাসুর মতো নম্বরবিহীন ক্ষুদে কুলিদের।৪ ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি সূর্য-দীঘল বাড়ী লেখা শুরু করেন। ‘হামিদা কুটির’ নামক বাড়ির মেসে থাকাকালে সূর্য-দীঘল বাড়ীর প্রথম অর্ধেকটা রচিত হয়। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে আবু ইসহাক বদলি হন পাবনায়। পাবনা শহরে প্রথমে একটি মেসে উঠলেও সে-জায়গাটি লেখালেখির জন্য অনুকূল মনে হয়নি; তাই তিনি পাবনা শহরের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত এক পণ্ডিতের বাড়ি ‘সপ্ততীর্থকুটিরে’ ওঠেন মাসিক ৫০ টাকা ভাড়ায়। সে-বাড়ির অনুকূল নির্জন দোতলায় বসে ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে সূর্য-দীঘল বাড়ী লেখার কাজ শেষ করেন।৫ অবশ্য উপন্যাস লেখার ফাঁকে নারায়ণগঞ্জ, কলকাতায় বসে তিনি একাধিক গল্প লেখেন। কিন্তু সূর্য-দীঘল বাড়ী উপন্যাসটি বই আকারে প্রকাশের জন্য প্রায় সাত বছর অপেক্ষা করতে হয়। ইতোমধ্যে আবু ইসহাক ১৯৪৯ সালে পুলিশ বিভাগে চাকরি নিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য সারদা পুলিশ ট্রেনিং কলেজে যোগদান করেন। প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে শিক্ষানবিশ সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে ঢাকার তেজগাঁও থানায় যোগদান করেন। কবি গোলাম মোস্তফার আগ্রহে সূর্য–দীঘলবাড়ী উপন্যাসটি নওবাহার পত্রিকায় ১৯৫১-৫২ সালে প্রকাশ পায়। পরবর্তীকালে ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে (১৩৬২ বঙ্গাব্দ) এ-উপন্যাস কলকাতার নবযুগ প্রকাশনী থেকে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়।৬ উপন্যাসটি প্রকাশের পর আবু ইসহাক বাংলা সাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসেবে বিবেচিত হন। মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-৭১) বাংলাদেশের যে তিনটি উপন্যাসকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করতেন সূর্য-দীঘল বাড়ী সেগুলোর অন্যতম।৭ আবু ইসহাকের কাহিনি নিয়ে মসিউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী নির্মাণ করেন সূর্য-দীঘল বাড়ী নামক চলচ্চিত্র। ছবিটির মুক্তিকাল ৩০শে ডিসেম্বর ১৯৭৯। এটি ছিল সরকারি অনুদানে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র। তবে প্রদর্শকদের অনীহার কারণে ছবিটিকে প্রথমে ঢাকায় মুক্তি দেওয়া যায়নি। ১৯৭৯ সালের ৩০শে ডিসেম্বর নাটোরের গীত সিনেমা হলে প্রথম প্রদর্শিত হয়।৮ পরে ১৯৮০ সালে ঢাকার পাঁচ-ছয়টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন শুরু হয়। সিনেমাটি সাধারণ দর্শকদের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়ায় ব্যবসাসফল হয়নি। তবে কাহিনি ও নির্মাণশৈলীগুণে চলচ্চিত্রটি এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে নির্মিত অন্যতম শিল্পসফল চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছবিটি বহু পুরস্কার লাভ করে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এ-চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে বলেন : ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী আমাদের চলচ্চিত্রে একচ্ছত্র দাপটে প্রতিষ্ঠিত ন্যাকা, ছ্যাবলা ও নকলবাজে গিজগিজ করা বাড়িঘর কাঁপাবার জন্য প্রথম প্রকৃত আঘাত। … এই ছবি বাংলাদেশের গরিব ও শোষিত গ্রামবাসীর জীবনযাপনের একটি অন্তরঙ্গ পরিচয়।’৯ আবু ইসহাকের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফল সমকালীন বাংলাভাষার অভিধান (স্বরবর্ণ অংশ) বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশ পায় ১৯৯৩ সালে। অভিধান প্রণয়নের জন্য তিনি ১৯৯৩-৯৪ সালে মানিক মিয়া গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। অভিধানটি রচনার জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেন। সত্তরোর্ধ্ব বয়সে তিনি এই কাজে প্রতিদিন ১২-১৪ ঘণ্টাও ব্যয় করেছেন। দুই আবু ইসহাক প্রকৃতপক্ষে নিরীক্ষাপ্রবণ সাহিত্যিক নন। তিনি মূলত realism ধারার লেখক। এই ধারার একজন শিল্পস্রষ্টা বিশেষ জটিলতায় না গিয়ে বাস্তব মানুষ, সমাজ ও প্রকৃতিকে স্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে যেভাবে দেখেন, সেভাবেই তুলে আনেন। অন্যদিকে নন-রিয়েলিস্টিক শিল্প-সাহিত্যকে সমালোচকেরা বিকৃত আয়নায় দেখা পৃথিবী বলে মনে করেন।১০ অবশ্য শিল্প-সাহিত্যে বাস্তব জগতের অনুকৃতি হলেও সেখানে হুবহু অনুকরণ করা হয় না, বাস্তববিশ্ব লেখকের চেতনা ও শিল্পীসত্তা দ্বারা জারিত হলে তবেই শিল্পসৃষ্টি সম্ভব হয়। আবু ইসহাক যখন তাঁর প্রথম উপন্যাস সূর্য-দীঘল বাড়ী প্রকাশ করেন ততদিনে বিশ্বসাহিত্যে গল্প-উপন্যাসের শিল্পগত দিক ও অঙ্গপ্রকরণ নিয়ে বহুবিধ পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ সাধিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, অমিয়ভূষণ মজুমদার, কমলকুমার মজুমদার, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ প্রমুখ ঔপন্যাসিক ভাব, আঙ্গিক ও ভাষাশৈলীর দিক থেকে নানা দুঃসাহসী পথে অগ্রসর হয়েছেন। সে-সকল নিরীক্ষার পথ আবু ইসহাককে তেমন আকৃষ্ট করেনি। অবশ্য শুধু নতুন আঙ্গিক বা নিরীক্ষা-বৈশিষ্ট্য দ্বারা সাহিত্যের উৎকর্ষ বা আধুনিকতা বিচার করা সংগত নয়। উপরন্তু আবু ইসহাকের এই শিল্পপ্রয়াসকে ক্ষেত্রবিশেষে উত্তর-আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও মূল্যায়ন করা যেতে পারে। পাশ্চাত্যের অনুকরণে যে-আধুনিকতা তাকে প্রত্যাখ্যান করে হয়তো কলকাতা থেকে বহুদূরে সন্ধ্যায় মনসামঙ্গল বা ইউসুফ জুলেখা পুথির ঘরোয়া আসর বসেছে খোলা উঠানে। ইংরেজ-সৃষ্ট নকশার সকল চাপ সহ্য করে দিন শেষে অদ্ভুত পুথির আনন্দে মেতেছে তারা। অন্য একটি পক্ষ বাঙালির হৃদয়কে আরোপিত আধুনিকতা থেকে রক্ষা করে সঞ্জীবিত রেখেছিলেন, এরাই বাংলার প্রথম উত্তর-আধুনিক। এক্ষেত্রে নর্দমার মধ্যে মাথা গোঁজা’ বা ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ অথবা নানাবিধ যৌনগন্ধী সংলাপ ওই আধুনিকতার অনেকটা ব্যর্থ অনুকরণ বলে উত্তর-আধুনিকগণ মনে করেন। তাঁদের বিচারে যে-সূত্রে গোবিন্দচন্দ্র দেব, যতীন্দ্রমোহন বাগাচী, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, ফররুখ আহমদকে ঈষৎ আধুনিক ভাবা হয়েছে, সেই সূত্রেই তাঁরা ‘উত্তর-আধুনিক’।১১ বাংলার গ্রামীণ ও লোকজীবন অংকনে সিদ্ধহস্ত কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের দুটি উপন্যাস মূল্যায়নেও ক্ষেত্রবিশেষে তাঁকে ‘উত্তর-আধুনিক’ বলে মনে করা অবান্তর নয়। আবু ইসহাক তাঁর তিনটি উপন্যাসেই কাহিনি উপস্থাপনের প্রথানুগ বৃত্তবদ্ধ রীতিটি গ্রহণ করেছেন। তিনি direct method ধরেই অগ্রসর হন, এ-পদ্ধতিতে লেখক সর্বজ্ঞ,…
-

রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি শিরাতোরি সেইগো
জাপানি থেকে বাংলায় ভাবানুবাদ : প্রবীর বিকাশ সরকার তাইশোও যুগে (১৯১২-২৬) দু’বার জাপানে আগমন করা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিগুলি আজ অনেকটাই দূরের হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ যে একজন অসাধারণ কবি এবং দেশপ্রেমিক ছিলেন একথা যথার্থই; কিন্তু তিনি যে এমন একজন ব্যক্তি তা প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর ধরে খুব একটা পরিচিত ছিল না। এই মহান কবি বিশ্বে পরিচিত হয়ে ওঠেন, যার সূচনা হয় ১৯১২ সালের গ্রীষ্মকালে, যখন আইরিশ কবি ইয়েটস তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন। এর পরের বছর শীতকালে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করে কবি হিসেবে আরো বিখ্যাত হন। এরও তিন বছর পর (১৯১৬) শীতে তিনি প্রথমবার জাপানে আগমন করেন। জাপানের সমাজ ও সাহিত্যজগতে রবীন্দ্রনাথ আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেন। এরপর তাঁর কাব্য গীতাঞ্জলি, দ্য গার্ডেনার, সমালোচনা দ্য রিয়ালাইজেশন অফ লাইফ (সাধনা) প্রভৃতি জাপানি ভাষায় অনূদিত হলে পাঠকদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। কিন্তু প্রাচ্যের এই মহান কবি আমাদের দেশে তেমনভাবে গৃহীত হননি এবং তাঁর প্রভাবও প্রায় ছিল না। দুঃখের বিষয়, এই অনুবাদগুলো কেবল সাময়িক আলোচনামূলক প্রকাশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যাঁরা তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে য়োশিদা গেনজিরোও, মাশিনো সাবুরোও এবং মিউরা সেকিজোওর নাম আমি স্মরণ করতে পারি। নির্মল আস্থাভাজন এই কবিকে কেন জাপানের কাব্যজগৎ গ্রহণ করেনি? সে-সময়ে আমাদের কাব্যজগতে একদিকে ফরাসি প্রতীকবাদী কবিতাকে পুষ্টিস্রোত হিসেবে গ্রহণ করে গড়ে ওঠা কবিতা সমৃদ্ধ হচ্ছিল; অন্যদিকে য়োরোপীয় মহাযুদ্ধ-পরবর্তী চিন্তাধারার প্রভাবে অ্যাংলো-আমেরিকান ধারার জনপ্রিয় কবিতাও বিকাশ লাভ করছিল। রবীন্দ্রনাথ পুনরায় জাপান সফরে এলে তখনো এই প্রবণতাই প্রভাবশালী ছিল। নথিপত্র অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথ ১৯১২ সালের শরৎকাল থেকে পরবর্তী বছরের বসন্তকাল পর্যন্ত আমেরিকায় অবস্থান করেছিলেন। তবে এই বিষয়টি প্রায় কোনো গুরুত্বই পায়নি। এমনকি, এমন উদাহরণও আছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, তিনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরেই বিখ্যাত হন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম জাপান ভ্রমণ সম্পর্কে বলতে গেলে, তাইশোও ত্রয়োদশ বর্ষের (১৯২৪) আগস্ট মাসের আসাহি শিম্বুন পত্রিকায় প্রকাশিত আমার নিজের লেখা নিবন্ধগুলোর মধ্যে ‘কবিতা-জগতের বর্তমান অবস্থা’ শীর্ষক রচনার একটি অংশ নিম্নরূপ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপানে আগমন করলেও চার-পাঁচটি সংবাদপত্রের মাধ্যমে ভূমিকাসুলভ পরিচিতিই ছিল সর্বস্ব। সাধারণের কাছে তাঁর কবিতা ও গদ্য রচনা অনেকাংশেই অপঠিত ছিল। রবীন্দ্রনাথও আমাদের সাহিত্য সম্পর্কে জানার অনাগ্রহ নিয়ে ধূমকেতুর মতো চলে গেছেন। এখানেই রাষ্ট্রদূত ক্লোডেল (ফরাসি কবি, নাট্যকার, কূটনীতিক পল ক্লোডেল, একদা জাপানে ও আমেরিকায় রাষ্ট্রদূত) প্রমুখের সঙ্গে তফাৎ বিদ্যমান। একই প্রাচ্যের মানুষ হয়েও আমাদের মধ্যে আন্তরিক ঘনিষ্ঠতা নেই। অবশ্য কেবল আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার মাধ্যমে আত্মার গভীর মিলন সম্ভব – এমনটা ভাবাও যায় না। কিন্তু কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্বাগত জানানোর নেতৃত্ব সাহিত্যিকরা নন, বরং শিল্পপতি ও শিক্ষাবিদদের মতো ব্যক্তিরাই গ্রহণ করেছিলেন। এই ঘটনাটি সেই সময়ে জাপানের বাস্তব অবস্থা, যেখানে সাহিত্যিক সমাজ ও বৃহত্তর সমাজের মধ্যে একধরনের দূরত্ব বিদ্যমান ছিল, সেই দৃষ্টিতে দেখলে বরং আশ্চর্যজনক বলেই মনে হয়। ভেবে দেখলে, বৈপরীত্যে পরিপূর্ণ কোনো জাতির পক্ষে এর ব্যতিক্রম হওয়াই কঠিন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও প্রবন্ধ, সেই নীরব মহাজাগতিক চেতনার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও, জাতীয় স্বাধীনতার জন্য উচ্চারিত এক উষ্ণ ও তীব্র আহ্বান সেখানে বিদ্যমান এবং তাঁর রচনায় এমন এক সামাজিক চেতনা আছে, যা আমাদের দেশের সাহিত্যিকদের মধ্যে দেখা যায় না। সেই কবিতাও গদ্যের মতো একধরনের স্বাধীনতা ও সরলতা ধারণ করে। রবীন্দ্রনাথ কেবল উপরিভাগের অভ্যর্থনার মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে থাকার কবি নন, বরং তিনি এমন একজন কবি, যাঁকে আমাদের দেশের মানুষের আরো গভীরভাবে আস্বাদন করা উচিত। এ ধরনের গুণসম্পন্ন সাহিত্যিক আমাদের দেশে অতীতে প্রায় ছিলই না। সমাজসমস্যার স্পন্দন ধারণ করে এমন রচনা সম্প্রতি এর অঙ্কুরোদ্গম দেখাতে শুরু করেছে মাত্র …। আর যাই হোক, কবি যে সামাজিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আধা-রাষ্ট্রীয় অতিথিরূপে বরণীয় হবেন – এমন দৃষ্টান্ত তখনো দেখা যায়নি। রবীন্দ্রনাথকে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে একধরনের পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল; এর পেছনে জাপানে নারীশিক্ষার অগ্রদূত নারুসে জিনজোওর প্রচেষ্টার প্রভাব কাজ করেছিল বলে মনে করা হয়। সেই সময়ে জাপানে কোনো সাহিত্যিক গোষ্ঠী আজকের পেন-ক্লাবের মতো সংগঠিত সাহিত্যসমাজ ছিল না তাঁকে গ্রহণ করার জন্য, এমন পরিস্থিতি মোটেই ছিল না;…
-

গোলাপ তুমি সুন্দর হয়ে উঠলে…
যা কিছু সুন্দর আমি তাদের আরো সুন্দর করে তুলতে চাই। পাহাড়, নদী কিংবা পাতা-ঝরার সিম্ফনি আমার কাছে সুন্দর। বুদ্ধদেব বসু খুব তীব্রভাবে বহুকিছু সুন্দর করে তোলেন। বিস্ময়কর তাঁর, কালিদাস-বিবরণী – বিশেষত মেঘদূত। যা হোক, প্লেটো তাঁর ‘অনুকরণ-তত্ত্ব’, সেটি খুব মজার ও উপভোগ্য বলেই শিরোধার্য। নির্বাসিত কবিদের গালাগালি দিয়েও সর্বোচ্চ সুন্দরের তত্ত্ব তিনিই দিতে পেরেছিলেন। ওতে অনেকরকম করে সুন্দরের নিহিতার্থ ব্যাখ্যাত হয়েছে। বলতে ভয় নেই, ‘শিল্পের ন্যায়’ ধারণাটি দিয়ে তিনি সর্বোচ্চ শিল্পের প্রণোদনাটি সাহিত্যে অত্যুচ্চ করে তুলেছিলেন। কীভাবে? একালে এসেও যখন ‘রিপাবলিক’ পড়ি, সেটি ন্যায়, সাম্য, সত্যের সাবলিমিটি বা ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ সবটাই সাহিত্যিক সম্বন্ধে নিপুণ – তারই দার্শনিক ধারণার উপলক্ষে, যেখানে সৌন্দর্য ব্যক্তিনিরপেক্ষতা চরমভাবে মূর্তমান। বেনজামিন জয়েট ইংরেজি অনুবাদ করেছেন (কারণ আমার গ্রিক জানা নেই) তাতেই যদি ঠিকরে থাকি, বিস্তর এক সমাপতনের ভাবনা প্রতিশ্রুত হয়। সে ভাবনায় জগৎ-জীবন-দর্শন সবটাই মোড়ানো থাকে সৌন্দর্যের বিদ্যুৎপ্রভায়। যেটি পরবর্তীকালে সেঁধিয়ে রয়, অ্যরিস্টটলের ট্র্যাজেডিতত্ত্বের ভেতরে। জীবনের ক্লাইমেক্স তখন ততোধিক উপভোগ্য – যা সবটাকে প্রবল উল্লাসে পৃথিবীর যা শ্রেষ্ঠ তার মুখোমুখি করায়। এভাবে গোড়ার দিকে নন্দনতত্ত্ব বা সমালোচনার একটি পর্যায়-ধারণার বৃত্ত গড়ে ওঠে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নান্দনিক ধারণাসমূহ পাল্টায়। রুচিবিচারেও তৈরি হয় নতুন দৃষ্টিকোণ। পাশ্চাত্য নন্দনতত্ত্বের অভিমুখসমূহ রচিত হয়, নতুন ধারাপাতে – রেনেসাঁসের ভেতরে। এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক লক্ষণীয় প্রবণতাসমূহ উল্লেখ করার মতো। অ্যাংলো স্যাংসন প্রিয়ডের শেষে লিওনার্দো চিত্রকর হিসেবে পৃথিবীবাসীকে নতুন মেসেজ দেন। তারপর পুঁজি ও বাণিজ্যের সম্প্রসারণে ক্রমশ পাশ্চাত্য জীবনধারা টেম্পোরাল ও সেক্যুলার অনুসন্ধিৎসায় সম্মুখগামী গতি লাভ করে। সেখানে গতির সৌন্দর্যে অনেক নতুন মনীষার জন্ম হয়। নিয়তি বা দুর্ভোগ অস্বীকার করে পরিশ্রম-কর্তৃক ভাগ্য-বিনির্মাণের বিশ্বাস সৃষ্টি হয়। তখন প্রচলিত মূল্যবোধ বা সামাজিক অনুশাসনের আচরণসমূহ বাতিল করে সভ্যতানির্ভর অভিপ্রায় গড়ে ওঠে। দূরে কোনো এক স্থলে উপনিবেশ গড়ে ওঠে। তিনভাগ জলের বিপরীতে একভাগ স্থল অনুসন্ধানের চেষ্টা চলে। যে একভাগের ভেতরে খনি-ধনরত্ন-মণিমুক্ত বেশি সেখানে ব্যবসায়ীর চোখ আকৃষ্ট হয়। এ আকর্ষণ সম্পদের। পুঁজির। সামন্তসমাজ ক্রমশ ভেঙে পড়ে। ক্লাসিক যুগের অবসান ঘটতে শুরু করে। বিপরীতে রোমান্টিকতার উত্থান। রোমান্টিক উত্থানের তাৎপর্যেও ভেতরে ব্যক্তির বিকাশ, পুঁজির সঞ্চলন, দ্বন্দ্ব ও অধিকারের আকাঙ্ক্ষা সামনে আসে। অ্যাডভেঞ্চার, সাহস, রোমান্সরসে ভেসে যায় অনেককিছু। ব্যক্তির আনন্দ ও জয়োল্লাসের মধ্য দিয়ে কেনাবেচা, বিনিময়, সম্পদের অধিকার ও বণ্টননীতি চালু হয়। ম্যাকায়েভেলি, লক, বার্কলে, হিউম, কান্ট, স্পিনাজো, লাইবোনিজ, হেগেল তাদের দার্শনিক ভিত্তিতে মানুষের চাহিদা আকাঙ্ক্ষার মধ্যে স্বপ্ন, মনুষ্যত্ব, সৌন্দর্যবোধের দর্শন তৈরি হয়। এসব মনীষী সময়েরই সৃষ্টি। ফলে সাহিত্য-শিল্পে মূল্যবোধসমূহ নতুন অভিধা পায়। শিল্পের মর্মকথা আগের মতো আর থাকে না। তার বাস্তবতা, সার্বিকতা, অধিকারভেদ, বৈরাগ্য বা আনন্দ পাল্টায়। শিল্প ও আনন্দ, শিল্প ও কল্পনা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণে প্রসারতা পায় এবং গৃহীত হয়। বলছিলাম, পাশ্চাত্য রেনেসাঁসের উত্তরাধিকার রোমান্টিক দর্শনচিন্তার কথা। সেখানে শেলি, কিটস, ওয়ার্ডসওয়ার্থ বায়রন স্ত্রোত্র রচনা করে গোলাপের সৌন্দর্য বিচার করলেন। ‘নেগেটিভ ক্যাপাবিলিটি’র ভেতরে আত্মমুগ্ধতায় ব্যক্তির বিলোপনীতির এসেন্স তৈরি হলো। এই আত্মমুগ্ধতা কী? রবীন্দ্রনাথ বলেন ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ’, চেতনার রংটুকু সৌন্দর্যের অভিপ্রেত রূপ। তার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রস, উপলব্ধির আনুগত্য, অনুভবের গভীরতা বোধের সূক্ষ্মতায় নতুন অবভাসে উন্মোচিত হলো। এই উন্মোচন এক গভীর আনন্দপ্রয়াস। প্রথমে তা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, ভাবের আনুকূল্যে অনুভাব্য, বিস্মমুগ্ধতার প্রলাপে জড়ানো, ক্রমশ তা চিত্তে প্রসারিত হয়ে, এক পুলকানন্দে ঘোর সত্যরূপে উদ্ভাসিত হলো। সকলেই তা গ্রহণ করল। অভিযানে নামল, সুন্দর তার সৌন্দর্যের পেখম মেলিয়ে ধরল। এই আনন্দ উপভোগের মাত্রা এক একরকম। কবিরা তার রূপ নির্ণয় করেছেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। সে-আনন্দে পশ্চিমা বাতাস কিংবা সমুদ্রের কল্লোল, কিংবা উঁচু পাহাড় তার চিত্তে ধরা দিয়েছে বিরল প্রলাপনে। মনের মানুষরূপে তা ইন্দ্রিয়ের গোচরে এসেছে। ইন্দ্রিয়াতীত উপলভ্যতায় সম্পূর্ণ সত্য হয়ে সারার্থ খুঁজেছে। টেনিসনের লেখায় রবীন্দ্রনাথ অধ্যাত্মরসের আখররূপে প্রকৃতির গভীর অনুভবকেই উপলব্ধিতে এনেছেন। ষোড়শ শতকে মিল্টনের কবিতা, শেক্সপিয়রের সনেটগুচ্ছ সর্বদা প্রকৃতির ও নিয়তির অনুভাবে বিমূর্ত রহস্যময়তার অমোঘ আহ্বানকে সান্নিধ্য করেছে। শুধু চিত্রকলায় বা পেইন্টিংয়ের জগতে নয়,…
-

কাঁটা
শুক্তি হাতিরপুল বাজার থেকে যে মাছটা এনেছিল, সেটা খেতে গিয়ে দুপুরে কাঁটা ফুটল বাহারুলের গলায়। দিন গেল। রাত গেল। সকালও যায় যায়। কাঁটা যায় না। বাহারুল চা খেতে বসে খকখকিয়ে কাশছেন দেখে শুক্তি অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি কী বাবু নাকি? বুড়ো বয়সে খোকাদের মতো মাছ খেয়ে গলায় কাঁটা বেঁধে, আশ্চর্য!’ একটু লজ্জার ছায়া পড়ল মানুষটার মুখে। দুই মুহূর্ত নীরব থেকে বিব্রত গলায় বললেন, ‘এজন্য আমাকে দায়ী করতে পারো। কিন্তু এটা তো ইচ্ছে করে করিনি। চেষ্টা করেছি কাঁটা বেছে খেতে। কিন্তু এটা এমন হিডেন ছিল যে সহজে চোখে পড়েনি। অথচ খোঁচাটা ঠিকই টের পাচ্ছি। ওটা আছে এবং বিশ্রীরকমভাবে আটকে আছে গলায়।’ মেহজাবিন আফরোজ শুক্তি কলেজে যুক্তিবিদ্যা পড়ায় বলে একটা দার্শনিক যুক্তি দাঁড় করাল একটু প্যাঁচানো কথায়, ‘এই যেমন তোমার প্রমোশনটা আটকে গেল আনসিন কাঁটার কারণে। কাঁটাটা আমরা দেখছি না বটে, কিন্তু কাঁটাটা ঠিকই আছে। শুধু সাদা চোখে এটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। তোমার মতো অনেস্ট সিনসিয়ার অফিসারের প্রমোশন কেন আটকে গেল! এটা ইনজাস্টিস। অন্যায়।’ শুক্তির গলায় ক্রোধের আগুন ফুঁসে উঠল। বাহারুল কাশিটা সামাল দিয়ে শান্ত গলায় বললেন, ‘সেটা ভালো বলতে পারবেন পিডি কাদেরি সাহেব। সোনাখালি ব্রিজের কাজটা টেককেয়ার করেছেন ইঞ্জিনিয়ার মহসিন সাহেব। উনি বদলি হওয়ার পর রুটিনওয়ার্ক হিসেবে অ্যাডিশনাল দায়িত্ব পড়ল আমার কাঁধে। দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজের ল্যাকনেস নিয়ে যা বলার অফিসিয়ালি বলেছি। কাজও বন্ধ করে দিয়েছি বারদুয়েক। কিন্তু পাবলিক ফাংশনের অজুহাতে চক্রান্তের তীর বুমেরাং হলো আমার বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ করে সরে এলাম কাজ থেকে। লাভ হলো না। কাঁটাটা ঠিকই আটকে গেল গলায়।’ শুক্তি চায়ে চুমুক দিয়ে মজার মুখ করে বলল, ‘তাহলে মাছের কাঁটাটা ঠিকই লুকিয়ে আছে খাবারের আড়ালে। যতই বেছে খাও না কেন, সুযোগমতো ঠিকই আটকে যাবে গলার নালিতে।’ ‘ঠিক। আমাদের মতো হাঁদারামদের মাছ খেতে যাওয়াই বোকামি। অথচ করমোরেন্ট টাইপের লম্বা গলার লোকগুলো আস্ত মাছ গিলে খেলেও সমস্যা নেই। সমস্যাটা কাঁটার নয়, মানুষের…।’ গুরুগম্ভীর কথার ফাঁকে সহসা দোতলার কায়সার সাহেবের বাসা থেকে দড়াম দড়াম আওয়াজ ভেসে এলো। বিষয়টা কী! শুক্তির বিষম খাবার অবস্থা হলো। সে চায়ের কাপ গুছিয়ে উঠে গেল বারান্দার কাছে। গ্রিল বেয়ে ওঠা বোগেনভেলিয়ার ডাল সরিয়ে উঁকি দিলো নিচে। হ্যাঁ, ঠিকই শীলা ভাবির গলা। কি হলো সাত সকালে! দেয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে দারোয়ান রবিউল কি যেন দেখছে জানালায় উঁকিঝুঁকি মেরে। ডাকাডাকিতে সাড়া দিলো না। ব্যাপারটা খটকা লাগছে দেখে কাজের মেয়ে জয়গুনকে নিয়ে শুক্তি নিচে গেল। আসলে এখন সাত সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া ছাড়া গতি নেই। গলার কাঁটার খোঁচাটা পুনরায় ফিরে আসায় অসহ্য এক যন্ত্রণায় মুখ বেঁকিয়ে বাহারুল বসে থাকলেন সোফার ওপর। শীলা ভাবির দরজায় পুনরায় দড়াম দড়াম আওয়াজ উঠল। মনে হলো সাত রিখটার স্কেলে ভূমিকম্প শুরু হলো বুঝি! কদিন আগে যে-কঠিন ভূমিকম্পটি হয়েছিল সেই স্মৃতি মুছে যায়নি এখনো। মোটামুটি বড় ধাক্কাই বলতে হবে। শুয়ে একটু আরাম করছিলেন। হঠাৎ শুরু হলো কেয়ামতি ধাক্কা। সুরা-কালাম আওড়াতে আওড়াতে হাঁকডাক শুরু করলেন সবার নাম ধরে। ভেবেছিলেন এটাই শেষ। মরতে হয় একসঙ্গেই মরবেন। কিন্তু মরতে হলো না শেষতক। কম্পন থেমে গেল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। সবাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল পরস্পরের মুখের দিকে। শুক্তির মুখখানা ফ্যাকাসে। দুই মুহূর্ত নীরব থেকে সে উদাস গলায় বলল, ‘দরকার নেই এই পোড়া শহরে থেকে। এটা তো এমনিতে গার্বেজ হয়ে গেছে। চলো, আমরা ধানসাগরে ফিরে যাই। ওখানে একটা মাটির ঘর বানিয়ে থাকব। কি পারবে না?’ ‘কেন পারব না! আগে অবসরটা নিয়েনি। তখন দেখা যাবে।’ ‘তাহলেই হয়েছে! মধ্যবিত্তের এটাই বড় সমস্যা। তাদের এক পা মাটিতে। আরেক পা কার্পেটে। এরা না পারে মরতে। না বাঁচতে। মাঝখান থেকে জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যায়।’ শুক্তি নিচতলা থেকে কাঁপতে কাঁপতে এসে ধপাস করে বসে পড়ল চেয়ারে, ‘ওহ মাই গড, দেখা যায় না! কী ভয়ংকর! হায় আল্লাহ, কী হলো জমানা?’ বাহারুল চোখ কপালে তুলে বলল, ‘কী ব্যাপার বলো তো, অমন করছ কেন? একটু শান্ত হও। ফ্যান চালিয়ে দেব?’ ‘না, না, লাগবে না। আমাকে একটু পানি দাও। গলা শুকিয়ে গেছে।’ ‘দিচ্ছি। তার আগে তুমি আরাম করে সোফায় বসে সামান্য জিরিয়ে নাও।’ বারান্দা থেকে তেরচা রোদ পিচকারি দিয়ে আলো করে দিলো ভেতরটা। বোগেনভেলিয়ার ডালে আগুন হয়ে ফুটেছে লাল ফুলের থোকা। একটা চড়ুই খুব মন খারাপ করে সেখানে দু-দণ্ড বসে সহসা উড়ে গেল ব্যস্ত ডানায়। শুক্তি এক চুমুকে পানিটুকু শেষ করে স্থির হয়ে বসল। দুই মুহূর্ত নির্বাক থেকে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘নীলু কোথায়?’ ‘ঘুমোচ্ছে।’ ‘এতো বেলা হলো এখনো ঘুমিয়ে কেন?…
-

হৃদয়ের জলছবি
শাবল, গাঁইতি, কোদাল, কুড়াল কোনোটাই বাদ যায়নি। সঙ্গে হাতুড়ি, বাটাল, দা-কাঁচি, কুর্নিসহ দরকারি-অদরকারি এমন কোনো সরঞ্জাম নেই, যা ওদের আয়োজনে যুক্ত হয়নি। লটবহরে ঠাসা লাল পিকআপ। ডাক বিভাগের গাড়ি ওটা। সারা গা ধুলোয় মাখামাখি। রাষ্ট্রীয় ডাক অথচ দেখতে কী কদাকার! জায়গায় জায়গায় রং চটে গেছে। বিভাগের ‘বি’ নেই। ডাকের নেই ‘ক’। বাংলাদেশের ‘একার’ নেই। নেই ‘শ’। সব মিলিয়ে ডাক বিভাগের মতোই ত্রাহি-ত্রাহি অবস্থা পিকআপের। ওদিকে ডাকহরকরা ঠিকই ছুটছে বল্লম হাতে। কাঁধে ঝোলা। পায়ে ক্ষিপ্রগতি। সামনে গন্তব্য। চোখে যেন ঘড়ির কাঁটার লাগাম টেনে ধরা। রাষ্ট্রীয় ডাকের তকমা আঁটা পিকআপের গায়ে। শরীরজুড়ে ওর এবড়ো-খেবড়ো গর্ত। কোথাও ধেবড়ে গেছে, কোথাও ট্যামা হয়ে আছে। শরীরের লেখাজোখারাও ফোকলা বুড়ির মতো মাড়ি বের করে হাসছে। যক্ষ্মারোগীর মতো হাড় খিঁচিয়ে পিকআপটি প্রধান বিচারপতির বাংলোর সামনে সবুজ চত্বরে এসে সাইড করে দাঁড়ায়। দমকে দমকে কাশির রোগীর যেমনি বুক ভেঙে আসে ব্যথায়, তেমনি গিয়ারের চাপে উটকো দমকে পিকআপ কাঁপছিল। ঝ্যারেঝ্যার একঘেয়ে বিরক্তিকর এক শব্দ। সেইসঙ্গে মাঝেমধ্যেই বুকফাটা আর্তনাদ। কখনো গোঁ-গোঁ করে বিকট শব্দে কঁকিয়ে উঠছে। গলগল করে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে তখন গাড়ির হাঁপর ছেড়ে। কী এক অস্থির পায়চারি। একটু পরপরই আগুপিছু করছে পিকআপটি। ওর শক্তিমত্তা আর উপস্থিতি জানান দিতে বোধহয় মরিয়া হয়ে উঠেছে পিকআপটি। এবার অনেকটা সময় ধরে টপ গিয়ার চেপে ধরেছে ড্রাইভার। ফুটপাত ডিঙিয়ে উঁচু চাতালে ওঠার চেষ্টা ওর। পিকআপজুড়ে গরগর-গরগর শব্দ। এ-শব্দ যেন বুকভরে উপভোগ করছে ড্রাইভার। মোটা গোঁফ ওর দু-গালের অনেকখানি ছুঁয়েছে। মুখে পান। লাল চিপটি ঠোঁটের কষ বেয়ে পড়ছে। চোখদুটোও নির্ঘুম। কেমন যেন ঢুলুঢুলু ভাব। পড়ন্ত বেলার লালচে আভা ওর দুচোখ জুড়ে। তাকালে বুকে কাঁপন ধরে। সবমিলিয়ে ডাকাবুকো চেহারা ড্রাইভারের। কী এক মাদকতা ওর চোখেমুখে! ও আচ্ছা করে গিয়ার চাপছে আর পিকআপে কাঁপুনি ধরলে মাথা বের করে পেছনের চাকার দিকে খেয়াল রাখছে। মহাবিরক্ত! না, চাকার কোনো হেলদোল নেই। একেবারে নড়ছে না। একটু দোল খাচ্ছে শুধু। কাজের কাজ তেমন কিছুই হলো না। সামান্য দম নিয়ে ফের টপ গিয়ার চেপে ধরেছে ড্রাইভার। ভাবগতিক এমন, যেন কারো গলা বুঝি চেপে ধরেছে। এতে কাজ হলো না। ওদিকে কিম্ভুতকিমাকার গাড়ির উটকো আচরণে বিচারপতির বাড়ির বেশ কজন মালি, আর্দালি, চৌকিদার, পাঁচিলের ফাঁক গলে চারপাশ দেখে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিল। ও-বাড়ির দোতলার লনেও দু-চারজন করে ভিড় করছিল। কারো চোখে-মুখে বিরক্তি। কারো আবার বিস্ময়! তবে পিকআপের চাকার ঘষায় চাতালের অনেকখানি জায়গার ঘাস ধেবড়ে গেছে, ছড়ে গেছে, কোথাও একেবারে উঠে গেছে। সেইসঙ্গে ধুলোর ওড়াউড়ি। মুহূর্তে চাতালের বৃষ্টিধোয়া সবুজ লাবণ্যটুকু কে যেন খামচে ছিবড়ে একেবারে ত্যানা করে দিয়েছে। বিবর্ণতার ছাপ ঘাসজুড়ে। রাস্তাটি এমনিতেই বেশ নীরব। বিচারপতির বাংলো মাঝখানে রেখে দুদিক থেকে দুটো রাস্তা এসে মিশেছে ওখানে। এতে ‘ইউ’ আকৃতির একটা দ্বীপ মাথা উঁচিয়েছে। বেশকিছু গাছ খানিক দূরে-দূরে দাঁড়িয়ে। কোনো-কোনো গাছ আবার গায়ে-গায়ে জড়িয়ে। ফলফলাদির গাছই বেশি। গাছগুলোর গুঁড়ির চারপাশে নিচুমতো বেদি গড়া। ফাঁকে-ফাঁকে ঘাসে মোড়া চাতাল। জায়গাটি ছায়াছায়া। বেশ নিরিবিলিও বটে। মাঝেমধ্যে চড়ুই এসে ঘাস খোঁটে। শালিক লাফিয়ে লাফিয়ে এদিক-ওদিক যায়। কখনো বুলবুলি লেজ তুলে এ-ডাল ও-ডাল করে। সবমিলিয়ে পাখির মৃদু কিচিরমিচির চারপাশে মায়া ছড়ায়। অদ্ভুত এক ভালোলাগায় ভরিয়ে রাখে সারাক্ষণ। সেখানেই তিনটে ডাকবাক্স দাঁড়িয়ে আছে – অ্যাটেনশন ভঙ্গিতে। একটি নীল, একটি লাল, অন্যটি হলুদ। ডাকবাক্সগুলো অনেকদিনের চেনা অঙ্কনের। বাক্সগুলোর বয়সও ম্যালা। সেই থেকে ওদের সঙ্গে একধরনের নীরব সখ্য অঙ্কনের। এর আগে ডাকবাক্সের কোনো ভাগ ছিল না। একটি মাত্র লালবাক্স ছিল। তাতে সাদা অক্ষরে লেখা ছিল ডাক খোলার সময়সূচি। হঠাৎ একদিন বাক্সটি উধাও। তার বদলে তিনটি বাহারি বাক্স এসে বসেছে। তিনটি তিন রঙের। তাতে ডাক খোলার সময়সূচি লেখা আছে। লেখা আছে ওদের পরিচয়। লালবাক্স – বিদেশবিভুঁইয়ে পাঠাতে হলে এ-বাক্সে ফেলতে হবে চিঠি। হলুদ বাক্স – সারা বাংলাদেশে ওর গন্তব্য। নীল বাক্সের চিঠির দৌড় শুধু ঢাকা শহর পর্যন্ত। যখন থেকে তিনরঙা তিন ভাই এসে দাঁড়িয়েছে এ-চাতালে, তখন থেকেই ওদের সঙ্গে ভাব অঙ্কনের। এর আগে যখন লাল বাক্সটি একা-একা দাঁড়িয়ে থাকত উদাস ভঙ্গিতে, তখন ওদিকে ফিরেও তাকাত না অঙ্কন। মনে হতো বাক্সটি বোবা। কোনো বোধশক্তি নেই। প্রয়োজন নেই বলে তেমন কোনো ভ্রূক্ষেপও ছিল না তখন। অথচ সময়ের হাত ধরে মানুষের মনও কেমন বদলে যায়, ভেবে অবাক হয় অঙ্কন। আসলে নীলিমার সঙ্গে সম্পর্ক বাঁধার পর থেকেই ডাকবাক্সর সঙ্গেও কেমন এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে ওর। প্রায় প্রতিদিনই নীলিমাকে চিঠি না লিখলেই নয়। শুধু কি চিঠি! শুধুই ঈদকার্ড! ঈদকার্ড ছাড়াও নববর্ষের কার্ড না হয় জন্মদিনের শুভেচ্ছা কার্ড। এর বাইরেও কতশত ভিউকার্ড! নানা দেশের কত বর্ণের, কত ধরনের ভিউকার্ড। মনকাড়া সব কার্ড। অনেক খুঁজে পেতে কার্ডগুলো কিনত অঙ্কন। তাতে মনের মাধুরী মিশিয়ে লেখা থাকত দু-চারটে লাইন। কার্ড বাছাই করতে করতে গুনগুনিয়ে গান করার মতো কথাগুলো সাজিয়ে নিত মুখে মুখে। তারপর পার্কে, কোনো গাছতলায় কিংবা কোনো উঁচু ভবনের ছায়ায় বসে মনের কথাগুলো কার্ডে লিখে পাঠিয়ে দিত নীলিমার ঠিকানায়। যখন নীলিমা ছিল না, তখন এলেবেলে লাল বাক্সটির দিকে ওর কোনো চোখও ছিল না। বাক্সটির কোনো প্রয়োজনও ছিল না। ফলে বাক্স খোলার সময়সূচি নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথাও ছিল না ওর। নীলিমার জন্য এ-চাতালের সবকিছু কেমন যেন বদলে গেছে। ডাকবাক্স ছাড়াও চারপাশের গাছ, নিবিড় ছায়া, আশপাশের ঘরবাড়ি, রাস্তার ব্যস্ততা – সবই প্রিয় এখন অঙ্কনের। এ-গাছ এ-ঘাস এ-ছায়া এ-পাখির কিচিরমিচির এবং ওদের ঘিরে তিনরঙা তিনটে বাক্স, সব মিলিয়ে, জায়গাটি কখন যেন এত মায়াময় হয়ে উঠেছে তা একটুও টের পায়নি অঙ্কন। নীলিমাকে ভালোবেসে চোখের সঙ্গে ওর মনের চোখও বুঝি বদলে গেছে অবাক রকম। মনের গভীরে গাঢ় রং ধরেছে। মনের সে-রঙে চোখের রং মেখে একটু একটু করে কখন যেন এ-জায়গাটির ভীষণরকম প্রেমে পড়ে গেছে অঙ্কন। সে-প্রেম এখন ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশের সবকিছুতে। প্রিয় ডাকবাক্সগুলোকে আজ উপড়ে ফেলতে এসেছে ডাকবিভাগের লোকজন। ওরা বলছে, বাক্সগুলো এখন অকেজো। কেউ আর চিঠি ফেলে না। কেউ চিঠির জন্য অপেক্ষাও করে না। সবমিলিয়ে বেহাল অবস্থা। বাক্সগুলোর গোড়ার দিকে মরচে ধরেছে। উঁচু ঢিবির মতো মাটি জমেছে। ঘাস গজিয়েছে বেয়াড়ারকম। উইয়েরাও উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে আজকাল। সে-কারণে কি না জানি না,…
-

সাদা মেঘ
বাইরে কাচের মতো স্বচ্ছ প্রকৃতি। আকাশে তুলার মতো মেঘ ভাসছে। খাঁচার ময়নাটি শবনমকে দেখেই একটানা বলে যাচ্ছে, সাদা মেঘ, সাদা মেঘ – ময়নাটির কণ্ঠস্বরে শবনম আঙুল বাঁকিয়ে বলে, এই দুষ্ট কী বলছিস? – সাদা মেঘ, সাদা মেঘ। – সাদা মেঘ নয়, বল, ‘ও মেঘ পান করো মানসহ্রদজল, স্বর্ণকমলের প্রসূতি।’ মেঘদূত কাব্যের এই লাইনটুকু বলে সহসা নিজের ভেতর প্রগাঢ় চাঞ্চল্য অনুভব করে শবনম। ভাবে, এই নির্লিপ্ত নীলাকাশের সাদা সাদা মেঘপুঞ্জ নিয়ে ওর গান গাওয়া উচিত। কিন্তু মেঘগুলো সামনের উঁচু উঁচু অ্যাপার্টমেন্টের আড়ালে চলে গেলে শবনমের মনটা বেশ খারাপ হয়ে যায়। শহরের আকাশটা আরো ছোট হয়ে আসে। কে যেন থেমে থেমে দরজায় কড়া নাড়ছে। দরজা খুলতেই দেখা গেল, যুবক বয়সী একজন ভিক্ষুক দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা অদ্ভুত রকমের বিষণ্ন। দেহ এতটাই শুকনো, চামড়ায় আবৃত হাড়গুলি স্পষ্ট চোখে ঠেকে। একটি পায়ের গোড়ালিতে কাটা দাগ। গা শিউরে ওঠে শবনমের। ততক্ষণে ছেলেটির নিষ্প্রভ চোখ দুটি কি এক প্রত্যাশায় জ্বলজ্বল করে ওঠে, বলে, আপা একমুঠ খাবার দিবেন। – নেই। – কিছু ট্যাকা দেন তাইলে। কথার সঙ্গে কাটা পা একটু একটু উঠে যাচ্ছে। পিঠও কুঁজো হয়ে যাচ্ছে নির্বোধের মতো। এমন ভয়ংকর ভিক্ষুক তো আগে চোখে পড়েনি। একশ টাকা দিয়ে দরজা বন্ধ করে পেছনের বারান্দায় আসতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। উঁচু উঁচু অ্যাপার্টমেন্টগুলি আকাশটাকে কেমন ঢেকে রেখেছে। একটু আগে হেলে পড়া সাদা মেঘ কেমন আছে এখন? বড় নিঃসঙ্গ লাগতে থাকে। স্বামীর কাছে এই দমবন্ধ জীবনের সীমিত গণ্ডি নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে হলো। এভাবে প্রকৃতি ও আকাশকে ঢেকে একেকটি ইমারত লাফিয়ে ওঠার কোনো মানে হয়! শবনম মোবাইলে কল করতেই রাশেদ বলল, কী ব্যাপার? – একটা কাজ করে দেবে? – একটা না, হাজারটা, এক এক করে বলো। – হাউজিং এস্টেটের বড় অ্যাপার্টমেন্টগুলোর জন্য আমি ঠিকমতো সাদা মেঘ দেখতে পারি না, তুমি ডেভেলপারদের আমার সমস্যাটার কথা গিয়ে বলবে। – হা হা হা … – ওভাবে হাসছ কেন? – শিল্পীদের নানারকম অবসেশন নিয়ে হঠাৎ ভাবনা এলো কি না তাই। – আমি আর কি এমন শিল্পী বলো। – মন্দই-বা কি, রুচিশীল শ্রোতারা তোমার গান বেশ ভালোই তো চুজ করে, আমি বরং এক কাজ করি, ওসব ডেভেলপারের কাছে না গিয়ে তোমাকে সেইন্টমার্টিনে একটা বাড়ি করে দিই। সমুদ্র আর আকাশের সাদা মেঘ দেখে গান করবে। – তাই, কিন্তু … ইতস্তত শবনমের ভেতরটা সহসা খলবল করে ওঠে। কিছু বলতে পারে না। অথচ একসঙ্গে কত কথা যেন মোচড় দিয়ে উঠল বুকের ভেতর। অপ্রকাশের দহন কিংবা চেতনার অর্ধবিলুপ্তি নিয়ে ঠোঁট কামড়ে নীরবে কেবল হাঁপাতে থাকে। – শবনম। – হুঁ। – কিছু ভাবছ? – তুমি কি যেন বললে, ও হ্যাঁ সেইন্টমার্টিন। আচ্ছা দ্বীপাঞ্চলে কি কোনো রাখাল থাকে? যেমন ধরো, মিথ্যাবাদী রাখালের মতো বাঘ বাঘ চিৎকার করে আমাদের ভয় ধরিয়ে দিলো। – রাখাল আছে কি না জানি না, তবে জেলে আছে। তোমাকে সৈকতে দেখে সবাই হয়তো একসঙ্গে গেয়ে উঠবে, খেলিছে জলদেবী, সুনীল সাগর জলে – – বেশ বলেছ তো,…
-

সুলতান মিয়ার ছুরি
ভূতের গলি এলাকার বাসিন্দারা কমবেশি সবাই সুলতানের নামটির সঙ্গে পরিচিত। সুলতান মিয়া, তার নিজস্ব ভঙ্গিমায় হাতে একগাদা আংটি, বালা, ব্রেসলেট পরে প্রতিদিন বসে থাকে, আর হাতে থাকে একটা সুদৃশ্য ছুরি। কবে থেকে সুলতান প্রথম ভূতের গলিতে এলো বা তখন তার বেশভূষা ইত্যাদি কী ছিল সে-বিষয়ে এলাকার পুরনো বাসিন্দারাও একমত হতে পারেন না। তবে একটা ব্যাপারে তারা একমত, আসার পর থেকে তার বসার জায়গায় তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি, প্রায় একই জায়গায় সে তখন থেকে ঘাঁটি গেড়েছে। তার বসার জায়গার বিস্তার মোটামুটি হাক্কানি মসজিদের আশেপাশে, পুরনো কলাবাগান থানার বেশ খানিকটা আগে। কলাবাগান থানাটা কলাবাগান নামে পরিচিত এলাকা থেকে এত দূরে কেন ছিল – সেই বিস্ময়সূচক প্রশ্নের উত্তর এলাকাবাসী পাওয়ার আগেই, থানাটা সরে কারওয়ান বাজারের কাছাকাছি এক জায়গায় চলে গেছে। যদিও থানার অবস্থান কলাবাগান বলে জনমনে থাকা মানসিক মানচিত্রের বাইরের জায়গাতেই কেন হতে হবে – এ-প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। ভূতের গলি এমনই এক জায়গা, এখানকার বাসিন্দারা স্বতন্ত্র কোনো পরিচয়ের জন্য লালায়িত নন। কলাবাগান থানা পাশে থাকায় কলাবাগানের বাসিন্দা বলে পরিচিত হওয়া যাবে, মানুষ ধানমন্ডির লোক বলে তোয়াজ করবে – এমন খায়েশ তাদের মধ্যে দেখা যায় না। বরং সুদূর বসিলা ব্রিজের আশেপাশে একদল লোক পশ্চিম ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা খুলে নিজেদের বেশ সম্ভ্রান্ত ভাবছে বলে জানা যায়। সুতরাং কলাবাগান থানাটি বসিলা ব্রিজের কাছাকাছি কোথাও নতুন অবস্থান নিলে, ওই এলাকার বাসিন্দাদের জন্য সেটি বেশ আনন্দের উপলক্ষ হতে পারতো। ভূতের গলি স্বয়ংসম্পূর্ণ তো বটেই, বরং জায়গাটাকে একটা প্রহেলিকাময় স্থান বললে যথার্থ হয়। নতুন লোকজনের কাছে, নর্থ রোডটাকেই আসল ভূতের গলি বলে মনে হয়। কিন্তু কিছুদিন বা কিছুদূর গেলেই, বা এদিক-সেদিক নজর রেখে হাঁটলেই সার্কুলার রোড, নর্থ সার্কুলার রোড, ওয়েস্ট এন্ড স্ট্রিট এমনকি ক্রিসেন্ট রোড পর্যন্ত চোখে পড়ে ভূতের গলির বিস্তার। সেন্ট্রাল রোডের অবস্থান নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক না থাকলেও (যদিও নামকরণ নিয়ে আছে, সাবেকি আমলের হাতি সম্পর্কিত পিলখানা, এলিফ্যান্ট রোড, হাতিরপুল বা হাতিরঝিলের মতো নামগুলোর পেছনের গল্পের মতো এত অবশ্যম্ভাবী না হওয়ায়, কোনো কোনো সৃজনশীল মানুষের ধারণা, দক্ষিণ ঢাকার বেশিরভাগ পুরনো ও বনেদি ঘরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থানের কারণেই এ-নামকরণ), সেখান থেকে চট করে ডানে ঢুকে পড়া মাংসের দোকানের গলি বা আরেক মাথায় গ্রিন কর্নার, আল-আমিন রোডও আদৌ ভূতের গলিরই অংশ কি না, তা নিয়ে সবার মধ্যেই একধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। নানা রোড মিলেমিশে একটা গোলকধাঁধা তৈরি করলেও আসল প্রহেলিকা শুরু হয় ফ্রি স্কুল স্ট্রিট থেকে। এই ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের শুরুর বা শেষের হদিস নতুন আসা মানুষের পক্ষে করা সম্ভব হয় না। হাতিরপুল বাজার থেকে শুরু করে পুকুরপাড় থেকে বাউলি কেটে বা কাঁঠালবাগানের দিকে এগিয়ে গেলে সামনে-পিছনে, হয়তো বা উপরে-নিচেও চোখে পড়বে ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। বাড়িগুলোর নামফলকে কখনো সার্কুলার রোড, কখনো ক্রিসেন্ট রোড কিংবা কাঁঠালবাগান বা গ্রিন রোড লেখার ফাঁকে ফাঁকে মাঝেই মাঝেই নিজের উপস্থিতি জানান দেয় ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। প্রায় সমস্ত আর্থ-সামাজিক বা সাংস্কৃতিক বর্গের প্রতিনিধিত্ব করে চলা এই গলি-উপগলি ধরে চোখে পড়ে চৌধুরীর বাড়ির মতো সামন্ততান্ত্রিক অস্তিত্ব থেকে শুরু করে নিরালা কুটিরের মতো ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী ইমারতও। গলিগুলো ধরে চরকির মতো ঘুরে বেড়ালে, একপর্যায়ে কারো কারো মনে হতে থাকে, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ঢাকা শহরের এলিটদের হারিয়ে যাওয়া ওয়ান্ডারল্যান্ড। এখানে অন্যমনস্ক হয়ে ঘুরে বেড়ানো একজন পরিব্রাজক যেমন বেরিয়ে আসতে পারে হাতিরপুল কাঁচাবাজারের সামনে, আরেকজন আবার নিজেকে আবিষ্কার করতে পারে মেরাক্কেশের কোনো প্রাচীন মসজিদ বা স্কটিশ হাইল্যান্ডের কোনো মন-খারাপ করা পাহাড়চূড়ায়। ভূতের গলির বৈশিষ্ট্যই হলো, যেকোনো আলাপই সে তার রাস্তাঘাটের ভুলভুলাইয়ার মধ্যে গিলে খেয়ে ফেলে। তাই সুলতান মিয়ার ছুরির গল্প বলতে গিয়ে, আমরাও খেই হারিয়ে পৌঁছে গেছি এ-অঞ্চলের এক বদ্ধগলির শেষ মাথায়। গলি ধরে একটু পিছনে এসে, ফের যদি গল্পের খেই ধরতে যাই, তাহলে যে-প্রশ্নের মাধ্যমে শুরু করা যেতে পারে তা হলো, সুলতান কেন ভূতের গলিতে এলো, বা এর পেছনের ইতিহাস কী? তুলনামূলক পরিষ্কার জামাকাপড় পরা ছোটখাটো সুলতানের অতীত নিয়ে জল্পনা-কল্পনা কম নেই। পথচলতি ভাসমান নাগরিক, এলাকাবাসী বা নিয়মিত রিকশাওয়ালা, প্রত্যেকের কাছ থেকেই জানা যায় নানা রকম কিচ্ছা। এসব আলাপের ফাঁকেই পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সুলতানকে গালি দেয় কোনো রিকশাওয়ালা, আর প্রত্যুত্তরে ছুরি নাচিয়ে পাল্টা খিস্তিখেউড় শুরু করে সে। এই দৃশ্য নৈমিত্তিক হলেও কেউ তাকে জায়গা ছেড়ে কাউকে তাড়া করতে দেখেনি। সময়ের পরিক্রমায় ভূতের গলির জ্যাম ও রাস্তার জটিলতায় চিন্তামগ্ন নারী ও শিশুরা একপর্যায়ে কিছুটা নিস্পৃহ হয়ে পড়ে, সুলতানকে নিয়ে তারা ঠিক চিন্তিত হতে গিয়েও হতে পারে না। তাই বলে জল্পনা-কল্পনা থেমে থাকে না। হাতিরপুলের ফেসবুক গ্রুপগুলোতে সুলতান মিয়া থ্রেডের প্রচলিত অনেক গল্পের একটির সঙ্গে মিল রেখে, এক গম্ভীর রিকশাওয়ালা বিস্তারিত কাহিনি তুলে ধরেন এবং নিজেকে দাবি করেন সবচেয়ে বিশ্বস্ত সূত্র হিসেবে। রংপুরের এক ধনী কৃষক হিসেবে সুলতানের বাবা ও তার ছোটভাইয়ের নাম, এমনকি তাদের জমির পরিমাণ ও প্রতিচাষে ধানের ফলনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার মাধ্যমে নিজের দাবির সত্যতার পক্ষে বেশ শক্ত প্রমাণও হাজির করেন তিনি। জানা যায়, সুলতান ভালোবেসে বিয়ে করেছিল সোনাভান নামে শ্যামল সুন্দরীকে। তাদের সুখের সংসার আলো করে জন্ম নেয় একটি সন্তানও। তারপর কোনো এক পূর্ণিমায় বা অমাবস্যায়, আপনারা জানেন যে, চাঁদের অবস্থানের সঙ্গে মানুষের জীবনের জোয়ার-ভাটার সম্পর্ক খুব সামান্যই, এক অজানা কারণে সোনাভান ছেড়ে চলে যায় সুলতানকে। অন্যসব তাৎক্ষণিক কারণ ও তার ফলে সৃষ্ট চিরস্থায়ী ফলের সঙ্গে যথাযথ সাযুজ্য রেখেই, সোনাভানের ছেড়ে যাওয়ার কারণটিও সুলতানের ক্রমশ পাকতে থাকা চুলদাঁড়ি বা ঘোলা হয়ে আসা চোখের দৃষ্টির মতোই ম্লান হয়ে আসে, আর ফলটি তার হাতের আংটি বা ছুরির ফলার মতো ঝকঝকে হয়ে আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান থাকে। সোনাভানের খোঁজে ঢাকায় আসা সুলতান এলিসের মতোই কোনো এক ভুল দরজার ফেরে এসে পড়ে এই ভূতের গলিতে। দিনের সবটুকু সময় সুলতানকে দেখা যায় এমন নয়, কালেভদ্রে রংপুরের বাড়িতেও তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলে গুজব শোনা যায়;…
-

গোলামালির রস-কিচ্ছা
আশ্বিনের অপেক্ষা শেষে কার্তিক পড়তেই মন চনমনিয়ে ওঠে। মনের মধ্যে দোলা লাগে। সে-দোলায় বাকবাকুম-বাকবাকুম ডাকটা বেশ টের পায় গোলামালি। কার্তিক-অঘ্রানে হালকা শীত-শীত একটা আমেজ শরীর-মনকে ঠান্ডা রাখে। পৌষ, মাঘ, ফাল্গুনে তো শীতের জেরবারে কাহিল দশা। ঋতুর এই চড়কানাচন বড় বিচিত্র। লোকমানপুরের আকাশে ভাতের মাড়ের মতো মেঘ লেপ্টে থাকে। গোলামালি হলদিগাছি-চারঘাট-আড়ানী-পিরিজপুর-নন্দনগাছির দিকের প্রায় সব খেজুরগাছের গাছি। তার সাগরেদ আছে দশ-বারোজন। দিন দিন তারাও পাকা শিউলী বা গাছি হয়ে উঠেছে। ওস্তাদকে মান্যও করে বটে তারা। কর্মঠ-ক্লান্তিহীন গোলামালির মতো তারাও পরিশ্রমী। এবার কার্তিক পড়তেই শীত বেশ জাপটে বসেছে, শীতের কামড় বাঘের দাঁতের চেয়েও মারাত্মক মনে হয়। দুপুরের পরপর শরীরটাকে আর বিছানায় গড়ান না দিয়ে বাপেকার মাডগার্ডহীন ভাঙা সাইকেল নিয়ে বের হতে হয় গোলামালিকে। অনেক-অনেক দূরে যেতে তার এতটুকু ক্লান্তি লাগে না। সাইকেলের দুই হ্যান্ডেলে এবং পেছনের ক্যারিয়ারে পেল্লাই সাইজের অ্যালুমিনিয়ামের কেতলি। সঙ্গে দু-চার রকমের হেঁসো, সান দেওয়ার পাতলা পাথর, কোমরে হেঁসো রাখার চোঙা। একগাছা পাকানো দড়াগাছা, লোহার সরু চোঙা, আরো নানা খুঁটিনাটি সরঞ্জাম, একজন পাকা শিউলীর যা লাগে। সাগরেদরাও এদিক-ওদিক ছড়িয়ে যায়, রসের যত জোগান, গুড়ের তত বাড়বাড়ন্ত। গুড় বেশি-বেশি মানে হলো ব্যবসার উন্নতি। বাতাসে যখন গুড়ের সুঘ্রাণ মিলেমিশে একাকার হয়ে মাতামাতি করতে থাকে, তখন গোলামালির মনটাও কেমন আইঢাই করে ওঠে। রসের জ্বাল যত সুনিপুণ হয়, মনটা তখন হারিয়ে যায় কোথায়। ফাল্গুন মাসের একটা হালকা ছোঁয়া এভাবে তাকে উচাটন করে কেন বোঝে না কিছুই সে। পড়ন্ত রেশমি বিকেলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গোলামালি ভাবে, এবার আরেকটা বিয়ে করবে। ভাবনাটা দীর্ঘদিনের, কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হচ্ছে না। বিয়ে মানে আরেকটা বিয়ে, আরেকটা বউ। নতুন বউ ঘরে এলে তার ভাগ্যের সঙ্গে বউয়ের ভাগ্য এক হলে ব্যবসার উন্নতি হবে। নতুন-পুরনো দুজনে একসঙ্গে কাজ করলে মন্দ কি! আগেরটা পরিশ্রমী। নতুনটাও তার দেখাদেখি পরিশ্রমী হয়ে উঠতে কদিন আর লাগবে। অতএব বিয়ে তাকে করতেই হবে। সেদিন কথাটা জরিনাকে বলতেই গোখরা সাপের মতো ফণা তোলে। চোখে বিষ থাকলে হবে কী, কাজ তো হয় না। গোলামালি আলগোছে নিজেকে সংবরণ করে। মনে-মনে বলে, যে সাপের বিষ নেই, তার আবার কুলোপনা … অমন সাপের ছোবল কত সে খেয়েছে জন্ম থেকে। কী হয়েছে? মরেনি আজো। কেন মরবে? ইচ্ছা করলেই কি মানুষ মরতে পারে? মরা তো কারো হাতের মোয়া নয় যে, মরতে ইচ্ছা হলো আর মরে গেলাম। ওপরওয়ালার মর্জি না হলে কেউ মরতে পারে না। সবই তার কারসাজি, দাবা খেলার আসল রহস্য তো তার নিজের হাতে। সে যা করে, তাই হয়। ফাল্গুন মাস এলেই মনটা কেমন উড়ুউড়ু করতে থাকে। কী যেন চাই, কী চাই, তা সে নিজেই জানে না। জরিনার মধ্যে আর সেরকম স্বাদ নেই, দিন দিন কেমন পানসে-পানসে একঘেয়ে লাগে সবসময়। তারপরও মুখ ফুটে তো কিছুই বলা যায় না। বিষ খেয়ে বিষ হজম আর কি! টাকা-পয়সা যতই আসুক না কেন, মনে তৃপ্তি বা শান্তি না হলে তো জীবন বিষণ্ন-বিপন্ন হবেই। জীবনে সখ-সাধ বলে তো একটি বিষয় আছে, জীবন মানে তো শুধু টাকা রোজগার করা নয়, একটু সুখ, একটু আনন্দ, বাকিটা হয়তো গল্পের। সে-সুখ তো জরিনা দিতে পারে না। আগের মতো আর নেই সেই মজা-আনন্দ। লোকমানপুরের স্টেশনের কাছাকাছি এসে পশ্চিমের ঘন সবুজের দিকে একবার তাকিয়ে মন হারিয়ে যায়। একদিন এখানে কত ট্রেন থামতো, আজ সবই পুরনো গল্পকেচ্ছা, মানে ইতিহাস। নামমাত্র স্টেশন, কাঠামো ভেঙে-ভেঙে একশেষ অবস্থা। প্ল্যাটফর্ম-চাতাল সবই ইট বের হওয়া ঘেয়ো নেড়ি কুকুরের দশা। বাদুর-কাকের বাসা, আরো কত কী রয়েছে তার ফিরিস্তি দিতে গেলে বিশাল ফর্দ করতে হবে। রাজ্যের বেজি-শেয়াল আর সব সাপখোপের আস্তানা। কোনো ট্র্রেন আর থামে না। মানুষ যতই এগিয়ে যাচ্ছে সময়ও যেন কেমন ছোট হয়ে আসছে। এপাশে আড়ানী ওপাশে আবদুলপুর, মাঝে লোকমানপুর। কেন থামবে আর আন্তঃনগর, মেইল-কমিউটার ট্রেন। লোকাল ছোটখাটো মাঝারি ট্রেন কি থামে দু-একটা! গোলামালি অনেক চেষ্টা করে দেখার, নিশ্চয়ই কোনো সাক্ষী থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু না, অন্বেষণ করেও কোনো লাভ হয় না। বুকের মধ্যে কেমন একটা হ্যাচড়প্যাচড় শুরু হয় একসময়। বাপজানের মুখে শুনেছে এককালে দূর-দূর শহরের ক্রেতা-বিক্রেতা, ফরিয়া-পাইকাররা শুধু খেজুর গুড়ের বায়না করতে ভাদ্র-আশ্বিন থেকে কার্তিক-অঘ্রান মাস অবধি আসতেই থাকতো লোকমানপুরে। সে-সময় শত-শত গেরস্তবাড়ির গুড়ের জ¦ালে মোহিত হতো আকাশ-বাতাস। সেই সুঘ্রাণে দূর-দূর অঞ্চলের মানুষ কী এক শিহরণে-উত্তেজনায় ছুটে আসতো এই হদ্দগাঁয়ে। অথচ আজ সেই স্টেশনটাই হারিয়ে যেতে বসেছে, কোনোদিন বা মাটির সঙ্গে মিশে যাবে ওর সর্বশেষ স্মৃতিচিহ্নটুকু। তখন কেউ জানবে না,…
