জাহিদ হায়দার
-
একশ দিন নিয়েছি আকাশের সাক্ষাৎকার
(সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর গোধূলিস্বরে আকাশ বলেছিল, ‘ছাপাবার আগে দেখিয়ে নিতে হবে।’ শীতার্ত স্বরের নির্দেশনা : ‘নীল কাগজে স্তম্ভিত সাদা মেঘ, পাশে প্রথম সকালের সূর্য, মাঝখানে স্বাধীনতাস্তম্ভে উড়ন্ত ডানা, আর নক্ষত্রের সামাজিকতার ইম্প্রেশন হবে।’ ক’দিন পর হাতে নিতেই ধ্রুবতারা জানালো, মহাকাশ প্রশ্ন ও উত্তরের সিংহভাগ কালপুরুষের আর্কাইভে রেখে দিয়েছে।) চল্লিশ শ্রাবণ গেছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে। গিয়েছি কবেকার…
-
কবিতা-কোলাজ
(শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের জন্য) পড়ো, কবিতা-কোলাজ। বোধের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে রাত্রিদিন। সুগন্ধী আঠাদের বন্ধনরীতি বহুমাত্রিক। দৃশ্যেরা নগ্ন। ধাতুগুচ্ছ নীরব আর কথা বলা অনন্ত তিমির। শাদাকবিতা : সূর্যালোকেও কুয়াশা তোমার জানালায়, লালের কোলাজ : অন্য এক আলোর খোঁজে ক’জন পড়ছে মাও সে তুং, নীলকবিতা : বেদনাবাহিত ঝরনা। পদাবলিপাড়ে আসে না সমদর্শিতা। হাত কুড়ায় অপস্রিয়মাণের বর্ণনা। হলুদকবিতা :…
-

নাদিয়ার দিনকাল
একটা ছোট তেলাপোকাকে হত্যা করে – এই রাজধানীর বা দেশের বিচিত্ররকমের তথাকথিত আধুনিক + পশ্চিমা ধাঁচের কাছাকাছি যাওয়ার সম-অসম প্রতিযোগিতায় রত আপাত শিক্ষিত কিছু নাগরিক, যারা কেবল ছায়ার ফিতে + লুঙ্গির গিট দেওয়ার পর্ব থেকে ট্রাউজারে বেল্ট লাগানো বা চেইন টানা শিখছে + প্রায়শই অমার্জিত মেজাজমর্জিতে সিদ্ধ হওয়া নানান সমাজ + ২২-২৩ রকম শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে…
-
জেন-জি
বেলা অবেলা নেই, যেন অন্বেষণ ঘূর্ণমান সিঁড়িতে উঠছে নামছে, পাশের বাসার মেয়েটি, কী রূপকথা সে, কখনো দেখিনি, পূর্ব-পশ্চিমের মিউজিক আর গানে নিজেকে বারবার রচনা করে উপসংহারহীন। আমার ঘরের নীরব শূন্যতায় উড়ে আসে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’র ডানা। দিগন্তে কোন অচেনা উড়ে গেল? পর্দা তুলে ঢুকে পড়ে : ‘ইউ ও’ন্ট ব্রেক মাই সোল’। কে তুমি রাখবে…
-
নারী ও সংগীত
বেহাগে প্রিয়তমা শুদ্ধউত্তম, দিয়েছে শ্রবণে সফল বিস্তৃতি। ভাবছি নিষ্কৃতি, কিছুতে দোষ নেই। নারী ও সংগীত যমজ সহোদরা, হঠাৎ দ্বিধারী, এবং দূরতিথি। গ্রীবায় বিব্রত হেলানো তানপুরা। কাহারবা হতে পারে মুহূর্তেই, অথবা গায়নে স্পর্শী ভৈরবী। মৌনরাত্রির ক্লান্ত দুঃখ বাজলো কেদারায়। পলাশ হাতে নিয়ে মেজাজে দাদরা, পাথর পথে কবি সমুখে দেখছে পৃথিবী কাঁদছে, ভিতরে আমরা। যখন ডাক দিই…
-
স্মৃতির কলহ
কী কী থাকে ঠোঁটস্থ? তোমার আনন কুশল কথা চলানন্দন চোখের ভিতর নদীকান্ত। কিন্তু আমি যাচ্ছি ভুলে যখন আবার দেখছি : বেশি মাত্রায় শহরিকা, বসনপ্রভা লোকরঞ্জন, এলোমেলো ভ্রামণিকা, অস্থিরতার প্রতিনিধি। নতুন পাঠ করতে গিয়ে ছাইদীপ্তি ঠোঁটের কাহন, চর্চানিধি ভ্রষ্ট। ঘটক সময় প্রতিযোগে, কষ্টরেখা বহুরূপী। ভেবেছিলাম আটপৌরে…
-

খুলির আকৃতি
চুল কাটা শেষ হলে নাপিত যখন মাথার পেছনে ও দুই পাশে আয়না ধরেছিল, তখন একত্রিশ বছর বয়সী নওশাদ হাফিজের চিন্তায় একটা খটকা ধাক্কা দেয়, ‘অন্যরকম লাগছে। খুলির শেইপ কি বদলে যাচ্ছে?’ পেছনের দেয়ালে ঝোলানো মেসির ড্রিবলিং, সামনের আয়নায় মাথার সঙ্গে ফুটবল এবং কয়েকটা লাল হলুদ বুট পরা পা মাথার পাশে, দেখা গেলেও নাপিতকে নওশাদ আরো…
-
অশেষ উপসংহার
১ আমি কি এক অচেনা জলবায়ু? স্তম্ভিত ভাঙার অন্তঃপটরেখা। যদি তাই … আমি কি ছিলাম তোমার নিদ্রাহীনতা? যে তোমাকে প্রত্নসত্য বলে দিত। ঋতু এলোমেলো, কখন হেমন্ত গেছে, বৃষ্টি অন্য চলনে এলো, শীতে অনেক শালিক মরে গেছে। যদি তাই … নীরবে বাড়াই হাত কাদা থেকে তুলতে বেড়ালের শাবক। উড়ে যায় অন্ধকার ফুটিয়ে জীবন্ত জীবাশ্ম-স্মৃতি।…
-

না-আসা চিঠি
উনিশশো একাত্তরের ২৪শে মার্চ বেলা এগারোটার দিকে, এক ঘণ্টা পর মাথার ওপরে আসবে চৈত্রের সূর্য, মানুষের চলাফেরায় আতঙ্ক এবং স্বাধীন দেশ পাওয়ার স্বপ্ন, ফারহানা, পরনে ছিল তাঁতের শাড়ি, শান্তিনগর পোস্ট অফিসের বাক্সে এ-ফোর সাইজের কষি টানা কোড়া কাগজে, সাদা কাগজে লিখতে গেলে ওর লেখা লাইনের শেষে গিয়ে চলে যায় ওপরের দিকে, কখনো নিচে, নিজের লেখার…
-

যুদ্ধ ও মধুবালা
যুদ্ধের দিনে বাড়িতে ফিরে এসে খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ হাসিবউদ্দিন দেখলেন, ঘরের দেয়ালে মধুবালার ছবি নেই। দরজা বন্ধ থাকলে সেগুন কাঠের দুটো পাল্লার ওপর খোদাই করা দুটো ময়ূরের দুটো চঞ্চু বন্ধ পাল্লার দাগের সামনে বাধা পায়। ময়ূরের পাখায়, গলায়, নেচে-ওঠা পেখমে ধুলো জমেছে। অনেকদিন হলো হাসিবউদ্দিনের বউ কানিজ দরজা মোছেন না। এপ্রিল মাসের ১৪-১৫…
-

শিশুকে খাওয়াবার কৌশল
(জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ শিশুচরিত্র সম্পর্কে লিখেছিলেন : শারদ্বত ও শার্ঙ্গরবের বয়স যখন দশ-বারো ছিল তখন তাঁহারা কেবলই বেদমন্ত্র উচ্চারণ করিয়া অগ্নিতে আহূতিদান করিয়াই দিন কাটাইয়াছেন, এ-কথা যদি কোনো পুরাণ লেখে তবে তাহা আগাগোড়াই আমরা বিশ^াস করিতে বাধ্য নই – কারণ, শিশুচরিত্র নামক পুরাণটি সকল পুরাণের অপেক্ষা পুরাতন।) সিনথির দ্বিতীয় জন্মদিনের আগের দিন সকালে তার মা রাবেয়া…
-

জীবন মাঝির নৌকায়
কর্তার মেয়ে গয়না নৌকায় উঠলো। পাবনা মেন্টাল হাসপাতালের ঘাট। কেউ কেউ বলে, অনুকূল ঠাকুরের ঘাট। তাল ও খেজুর গাছের আট-দশ ফুট লম্বা কয়েকটা কাণ্ড একসঙ্গে শেকল দিয়ে বেঁধে আপাতত ব্যবহারের জন্য, ছোট পদ্মার একটু উঁচু শুকনো পাড়ে, মাঝিরাই ঘাট তৈরি করেছে। আসল ঘাট ভেঙে গেছে। বন্যা বাড়তে পারে। দেশে যুদ্ধ হচ্ছে। শ্রাবণ মাস। এখন মেঘ…
