বুলবন ওসমান
-

উন্মাদিনী আধুনিকা
রাস্তার পাশে ফ্ল্যাট বলে এমনিতে গাড়ির শব্দ যন্ত্রণা দেয়। তার ওপর কয়েকদিন ধরে একটি তীক্ষ্ণ-কর্কশ-বামা কণ্ঠ ভুগিয়ে চলেছে ফজলকে। তাঁর লেখার টেবিলটা ঠিক জানালার পাশে। রাস্তার ওপারে একটি অফিস – ওদের ক্রিয়াকাণ্ড সব সময় দফতর কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। মাঝে মধ্যে সেলিব্রেটি বদমাশরা এলে তার চেল্লা-চামুণ্ডারা অঞ্চলে শোরগোল পাকিয়ে একটা জলসাকেন্দ্র বানিয়ে তোলে। এরকম হরসঙ-মার্কা…
-

কলকাতায় দাঙ্গা, ঝামটিয়ায় মায়ের টাইফয়েড
১৯৪৬ সাল। অকুস্থল কলকাতা। হিন্দু-মুসলিম ‘মহাদাঙ্গা’ নামে ইতিহাসে পরিচিত। এটা ভাবচক্ষে দেখছি –হিন্দু-মুসলিম ভদ্রলোক বা গুন্ডা ছুরি হাতে ঘুরছে। প্রকাশ্যে দিবালোকে এবং এই রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ইরানি চেহারা। দীর্ঘাঙ্গ, লম্বা-চওড়া মানুষ। বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চেহারায় বেমানান।অবশ্য তাঁর আগে ছিলেন এ. কে. ফজলুল হক। তিনিও ছিলেন বিরাট বপুর মানুষ, শুধু রংটি বাঙালির – শ্যামলা –…
-

বাবার যত বাণী
বাণী একটা ভারি পদ। আবার মানুষের সৃষ্টির সঙ্গে এর জন্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মুখের কথা বাণী। বাণী বিদ্যাদেবী সরস্বতী। যাকে আমরা বীণাপাণিও বলে থাকি। বাণী বলতে সাধারণত বুঝি কোনো গুণীজন বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তির আশীর্বাদ বা জ্ঞানমূলক বক্তব্য। আর একটি প্রধান অর্থ, একজনের সারা জীবনের সারকথা, যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। যেমন সক্রেটিসের উক্তি : নিজেকে…
-

সবলসিংহপুর : খণ্ডচিত্র
মামাবাড়ি ঝামটিয়া আমার ব্রজভূমি হলেও অস্বীকার করতে পারব না যে সবলসিংহপুর ছিল মথুরা। এটা রাজধানী। ওটা বাগানবাড়ি বা বৃন্দাবন। ঝামটিয়ায় খেলার সাথি সারাক্ষণের জন্য ছিল ছোট ভাইয়েরা। আর কলকাতা যাওয়ার আগে পেয়েছি মামাতো ভাই রেজাউল করিমকে। তিনি আমাদের কানাই। দলপতি। তিনি কলকাতা মাদ্রাসায় পড়তে চলে গেলে আমরা হয়ে পড়লাম দলপতি ছাড়া। পরে আমার স্থান। কিন্তু…
-

অনুজের জন্য শোক
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিল অনুজপ্রতিম। ১৯৫১ সালে তার জন্ম, সিলেটে। আমি তখন চট্টগ্রামে। দেশ ভাগ হয়ে গেছে। ১৯৫০ সালে চট্টগ্রামে স্থিতি। সরকারি এম. ই. স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি। এক যুগের ছোট। বাকি জীবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজনই সহকর্মী। অনুজ ছিল তাই সব সময় অগ্রজের সম্মান দিয়ে কথা বলত। বন্ধু হওয়ার সুযোগ বাস্তবে ছিল না। মানসে সহোদরপ্রতিম।…
-

আমিনা ফুপু ও বোন
আমার বাপ-দাদার পরিবারে ছেলের সংখ্যা খুব বেশি। তুলনায় মেয়েরা বড় সংখ্যালঘু। বড়দাদা ইরশাদ আলীর এক ছেলে ২৪-২৫ বছর বয়সে যক্ষ্মায় মারা যান। বাবার সমবয়সী ছিলেন। তার আগেই বড়দাদি মারা গেছেন, ফলে তাঁকে পুত্রশোক পোহাতে হয়নি। বড়দাদা একা সব দুঃখ বুকে নিয়ে জীবন কাটিয়ে গেছেন। দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। সন্তানহারা হয়ে তিনি আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে যান।…
-

আমিনা ফুপু
আমার বাবার মোট ভাইবোন ছিল আটজন। বড় পিসি বা ফুপু আনোয়ারা। তিনি বিবাহিত জীবনে বাইশ বছর বয়সে মারা যান। বাবা ছিলেন দাদা শেখ মোহম্মদ এহিয়া ও দাদি গুলেজান বেগমের দ্বিতীয় সন্তান। পুত্রসন্তান হিসেবে প্রথম। আনোয়ারা পিসিকে আমি দেখিনি। অর্থাৎ আমি জন্ম নেওয়ার আগেই তিনি ইহকাল ত্যাগ করেন। বাকি যাঁদের আমি দেখেছি ও জীবন কাটিয়েছি তাঁরা…
-

ফনেচাচা : দ্বিতীয় পর্ব
আমাদের গ্রামে কোনো শিক্ষালয় ছিল না। তাই বাবাকে (শওকত ওসমান) ছোটবেলায় কাদামাটি ভেঙে পাশের গ্রাম নন্দনপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে হতো। নন্দনপুর আমাদের ঘর থেকে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার তো হবেই। সম্ভবত ১৯২৬ সালে আমাদের পাড়ার অদূরে পুবদিকে স্থাপিত হয় সবলসিংহপুর জুনিয়র মাদ্রাসা, অর্থাৎ প্রথম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি। বাবা তাঁর লেখাপড়ার শেষের দিকে এই সুযোগ পেয়েছিলেন। আমাদের এই…
-

ফনেচাচা
আমার বাবা ছিলেন আট ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। পুত্রসন্তান হিসেবে এক নম্বর। বড়ফুপু বা পিসির নাম ছিল আনোয়ারা। তিনি পূর্ণবয়স্কা হলে বিয়েও হয়, কিন্তু বিয়ের অল্প কিছুদিন পর মারা যান। আটজনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন আমার একমাত্র ছোটচাচা শেখ গোলাম জিলানী। তার ওপরে এক ফুপু ছিলেন আমিনা বেগম। বাবা ও এই দুজন, এঁদের সঙ্গেই আমার বেড়ে ওঠা।…
-

প্রসঙ্গ নন্দনতত্ত্ব
নন্দন – পুত্রসন্তান। রঘুনন্দন – শ্রীরামচন্দ্র। চট্টগ্রাম শহরে রিয়াজুদ্দিন বাজারের পাশে অবস্থিত ছিল – নন্দনকানন। মেয়েদের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও আছে ওই নামে। স্বর্গের-উদ্যান যার অধিপতি দেবরাজ ইন্দ্র : নন্দনকানন। নন্দনের সঙ্গে সুন্দরের একটা সংযুক্ততা আছে। আছে ভিন্ন অর্থও। সন্তানলাভ ভাবগত অর্থে আনন্দ-সংবাদ। এসব উচ্চমানের জায়গা ছেড়ে আমরা মানুষের জীবনের যাত্রাবিন্দুতে পৌঁছতে চাই। সেখানে নন্দন ছিল না।…
-

দাদা-দাদি
তৎকালীন যুগে আমরা সবাই ছিলাম গ্রামের ছেলে। আর জন্ম নিই মামার বাড়িতে। কারণ মায়ের বাবার বাড়িতে মায়ের যত্নটা ভালো হয়। অবশ্য এর ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। তবে এটাই ছিল বিংশ শতাব্দী ও তার আগের সময়ের ধারা। আজ অবশ্য গ্রামেও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে গেছে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কথা। এই মহান শিল্পী গ্রামীণ…
-

হরিশচকে যাত্রাপালা
সবলসিংহপুরের পুবদিক দিয়ে ছোট নদী মুণ্ডেশ্বরী বয়ে চলেছে। এপারে সবলসিংহপুর, ওপারে সরাসরি হরিশচক। আর উত্তরের শেষ দিকে পড়ে লতিফপুর। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর জায়গার নামে অনেক অদল-বদল ঘটে।হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায় জায়গার নাম বদল করে। কোথাও আবার সংক্ষেপে লিখে। যেমন বাংলাদেশে নারায়ণগঞ্জ হলো এন.গঞ্জ। তেমনি আমাদের মুণ্ডেশ্বরীর ওপারে হরিশচকের উত্তরের গ্রাম লতিফপুর হয়ে গেছে নতিবপুর।…
