ফনেচাচা

আমার বাবা ছিলেন আট ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। পুত্রসন্তান হিসেবে এক নম্বর। বড়ফুপু বা পিসির নাম ছিল আনোয়ারা। তিনি পূর্ণবয়স্কা হলে বিয়েও হয়, কিন্তু বিয়ের অল্প কিছুদিন পর মারা যান। আটজনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন আমার একমাত্র ছোটচাচা শেখ গোলাম জিলানী। তার ওপরে এক ফুপু ছিলেন আমিনা বেগম। বাবা ও এই দুজন, এঁদের সঙ্গেই আমার বেড়ে ওঠা।

জিলানীচাচার ডাকনাম ফনে। এই ডাকনাম রাখার পেছনে এক মজার ঘটনা লুকিয়ে আছে।

আমাদের বাড়িতে ফণীন্দ্র নামে এক মুচি আসতেন। এই ফণীন্দ্রবাবু এত ভদ্র ও নম্র ছিলেন যে, সবাই তাঁকে খুব ভালোবাসতেন। তার মধ্যে আমার বাবা অন্যতম। তাঁর ভালোবাসাটা ছিল অনেক বেশি। যেন নিজের ভাই। তাই তিনি ছোট ভাইয়ের নাম রাখতে চেয়েছিলেন ফণীন্দ্র। তো মুসলিম পরিবারে এ নিয়ে বাদ-বিবাদ চলতে থাকে। শেষে জিলানী জায়গা পায়। তবে সমঝোতাস্বরূপ ডাকনাম রাখা হয় ফনে। ফণীন্দ্র থেকে ফনে।

বাবা আবার ছোটভাইকে আদর করে ডাকতেন ফনু বলে। ফণী, ফনে, ফনু এইভাবে চলে আসে ডাকনাম।

মা’র মুখে শুনেছি তাঁর বিয়ের সময় ফনেচাচা ছিলেন

চার-পাঁচ বছরের। শীর্ণ। নাতিউচ্চতা – অর্থাৎ বয়স অনুযায়ী বাড় নেই এবং ঘনকৃষ্ণ বর্ণ। মা একটুুও বাড়িয়ে বলেননি। ব্যাপারটা তাই ছিল। চাচা উচ্চতায় বেশ কম ছিলেন। দাদির চেহারা ছিল একহারা। আর শেষ সন্তান সুতরাং এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। অথচ আমার ফুপু আমিনা ছিলেন স্বাভাবিক উচ্চতার এবং বেশ ফর্সা। পেয়েছিলেন বাবার জিন অর্থাৎ আমার দাদার জিন। তাই স্বাভাবিক – সবদিক থেকে। বাবা দাদির দিকে যাওয়ায় শ্যামলা এবং চোখ-মুখ তীক্ষè। পরবর্তী জীবনে যাঁর মধ্যে আমরা জ্যোতি দেখতে পেতাম। যদিও তিনি ছিলেন খুব স্নেহপরায়ণ ব্যক্তি। অনেকটা দাদির মতো। দাদি ছিলেন খুব স্নেহপ্রবণ।

দাদির ডাকটা কানে বাজে, এখনো মনে হয় সেদিনের কথা : হ্যাঁ দাদা … এটাই ছিল তাঁর সম্বোধন। অন্য ভাইদের নাম ধরে ডাকতেন। আমি কেবল মর্যাদা পেয়ে এসেছি যুবরাজ হিসেবে।

তো চাচার কথা। ছোটচাচা বলার দরকার নেই। কারণ চাচা তো কুল্লে একজনই।

ওদিকে মেজদাদার ছোট ছেলে শেখ মোজাম্মেল হক চাচাকে বলতাম, মজুদাদা। তাঁর ওপরে লালুচাচা। যেমন দেখতে লালচে, তেমনি সুন্দর সুগঠিত চেহারা। বড় সুন্দর ছিলেন। আর এঁদের সবচেয়ে বড় যিনি, তিনি সাদিমানিচাচা। তাঁকে আবার পুরোনাম ধরেই ডাকা হতো। সাদিমানিচাচা ছিলেন ঢ্যাঙা … পাতলা … ঢ্যাঙা বলে আরো দীর্ঘকায় মনে হতো। রং কালো বলতে হবে। অথচ মেজদাদি ছিলেন ফর্সা-দীর্ঘদেহী – গলার স্বরও ভারি। এই দাদির চেহারাটা খুব মনে পড়ে। নতুন পুকুরের উত্তর-পুব কোনায় একটা ঘাট ছিল। ঘাটের ওপরে একটা বড় কদমগাছ। বর্ষায় ফুলে ফুলে ছেয়ে যেত। আর ফল পাকলে রাতে বাদুড়ের ঝগড়া-মারামারি, চিল্লান ক্যাঁচক্যাঁচ করে। পুকুরঘাট বাদুড়ের বিষ্ঠায় ভরে যেত। আমরা এখান দিয়ে পার হয়ে রায়মণির ডাঙ্গায় যেতে না ডিঙিয়ে যেতে পারতাম না। গা ঘিনঘিন করত। এটা ছিল প্রতি বর্ষার চিত্র।

মজুচাচা ফনেচাচার থেকে দু-এক বছরের ছোট ছিলেন। উজ্জ্বল শ্যামলা, কিন্তু উচ্চতা ফনেচাচার মতোই। এরা দুজনই ছোট আর নাতিউচ্চতার। মোজাম্মেলচাচা একটু কম কথা বলতেন। মুখে একটা মিষ্টি হাসি থাকত। অনেক সময় গম্ভীর। মানুষ হিসেবে পরবর্তী সময়ে চাচা বেশ উন্নতি করেছিলেন। ব্যবসা করতেন। ডেকোরেটর ব্যবসা। উৎসববাড়ি সাজাতেন তাঁর কর্মচারীরা। রান্নার লোকও ছিল। সুনাম ছিল তাঁর সংস্থার। পরবর্তী সময়ে তাঁর ও তাঁদের সম্বন্ধে লিখব।

ফনেচাচা সম্বন্ধে ধারাবাহিক লেখার অসুবিধা হলো, আমি তো সবলসিংহপুরে বছরে গড়ে থেকেছি তিন মাস। তাই চাচার সঙ্গে অভিযানের বড় ছেদ পড়ে যেত। মাঝে মাঝে তিনি স্মরণ থেকে হারিয়ে যেতেন … ঝামটিয়ার মামাবাড়ির সব বাগ্দি ছেলের সঙ্গে খেলায় মেতে। মামাবাড়ি দক্ষিণপাড়ায় ছোট ছেলের খুব অভাব ছিল। ঝামটিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় পাশ করেই সবাই বাধ্যতামূলকভাবে চলে যেত কলকাতায়। আর সবাই ভর্তি হতো কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায়। এটা ছিল কলকাতার সেরা মাদ্রাসা শুধু নয়, সেরা বিদ্যালয়ের মধ্যে একটি। শুধু কলকাতা বা বাংলায় কেন, সারা ভারতবর্ষের সেরা দশটি বিদ্যালয়ের একটি। দৃষ্টিনন্দন ভবন, অনেকটা জায়গা নিয়ে এর অবস্থান। গ্রিল দেওয়া দেয়াল। নয়নতারা ফুলে ভরা বাগান। বড় মনোরম পরিবেশ।

যা মনে পড়ছে তার একটা হলো, ফনেচাচা ছিলেন চিড়িমার। মানে পাখি মারতে ওস্তাদ। তার বাঁটুল বা গুলতির তাক ছিল খুব ভালো। যে-কোনো পাখি বেচারা চাচার হাতে প্রাণ দিত। বিশেষ করে শালিক আর চড়ুই। ঘুঘু বা অন্য যেসব পাখি খাওয়া যায়, তেমন কোনো পাখি মারা পড়ত না। কাক খুব চালাক পাখি। গুলতি তাক করলেই ফুড়ুত। খুব সচেতন। আর বাংলার কাক দুনিয়ার মধ্যে মনে হয় সবচেয়ে সচেতন ও চতুর পাখি হবে। কারণ বাঙালি জাতির সঙ্গে থেকে ওদের চালাক না হয়ে উপায় ছিল না। বাঙালিকে চালাকের চেয়ে চতুর বলা ভালো। গোটা বাংলায় কত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আছে, কিন্তু বাঙালি তার চাতুর্যের জোরে, কনুই মারতে মারতে প্রায় সবাইকে বঙ্গভূমির প্রান্তে পাঠিয়ে দিয়েছে। তোরা থাক ঝোপঝাড়ে – জঙ্গলে, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে। সমতল ভূমি আমাদের। বাঙালি উন্নতি করে আর এগোতে পারেনি, যেখানের সেখানেই রয়ে গেছে, কোনোমতে প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবন কাটায়। দলবদ্ধভাবে কাজ করতে পারে না।

 ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মতো জ্ঞান ফনেচাচার মধ্যে ছিল প্রবল। মাটির গুলি বানিয়ে রোদে শুকিয়ে নিত। এক-একটা গুলি ভাটার মতো। বেশ শক্ত। এছাড়া আমাদের নতুন পুকুরপাড়ে পাওয়া যেত চুনাপাথরের টুকরো – আমরা বলতাম ঘোসিং – এই ঘোসিংও গুলির কাজ করত – কারণ এটা ছিল চুনাপাথরের। খুব শক্ত। এটা পুকুরপাড়ের ঘাট ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যেত না। বাঁটুলের তাক ফনেচাচার খুব ভালো ছিল। চাচার কাছ থেকে আমিও অভ্যাস করতাম। চাচার মতো ভালো হতো না, তবে ক্রমশ পাকা হয়ে উঠতে থাকি।

গুলি তৈরি করতে যে-কোনো মাটি হলে হতো না, লাগত এঁটেল মাটি। কালো রঙের। রোদে পুড়েও কালো থাকত। আর বেলেমাটি লালচে, আর শুকোলে সুন্দর একটা লালচে রং হতো। পোড়ালে এই গুলিই পুরো লাল রং ধারণ করত। তবে পোড়ানোর চুলো কেবল কুমোরদের থাকে। আমরা কোথায় পাব। আর আমাদের গ্রামে কোনো পালপাড়া ছিল না।

ঘুঘুর মাংস লোকে খায়। কিন্তু ঘুঘু আমাদের পাড়ার পেছনে ধানক্ষেতে ছাড়া দেখা যেত না। ঘুঘু কম দেখেছি। কারণ ভিটেয় ঘুঘু চরবে তেমন কোনো ফাঁকা ভিটে ছিল না। সবলসিংহপুরে লোক গিজগিজ করছে। খুবই জনবহুল গ্রাম। গ্রামের পুবপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মুণ্ডেশ^রী নদী ওর বড় কারণ হতে পারে। নদীর পাশের জমি খুব উর্বর হয়। ফলে ধান-পাট, খেসারি, মুগ-মসুর, সর্ষে, পাট … সবই হয় প্রচুর পরিমাণে। আর মাছের অভাব নেই। অনেক পুকুর আর দিঘি ছাড়া নদীটা ছিল মাছে ভরা। বর্তমানে ভাটিতে বাঁধ দেওয়ায় জল অনেক ভরা থাকে। আমার শৈশবে মুণ্ডেশ^রী ছিল একেবারে রবীন্দ্রনাথের আমাদের ছোট নদী। পাড় ছিল অনেক দূর থেকে ঢালু। গরু ও গরুর গাড়ি পার হতে পারত। আর চিকচিকে বালি ছিল। কাদা ছিল না। এখন নদীর ওপর কাঠের সাঁকো হয়েছে। রিকশা ছাড়া গাড়িও চলাচল করে। হরিশচকের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আমার এক পিসির বিয়ে হয়েছিল হরিশচকে। অবশ্য তিনি বেশিদিন বাঁচেননি। কিন্তু ওই পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের বাঁধন কোনোদিন আলগা হয়নি।

আমার পিসির জায়গায় যে-ফুপুমা আসেন, তিনি খুব অমায়িক মানুষ ছিলেন। আমাদের খুব ভালোবাসতেন। এই ফুপুর এক মেয়ে ছিল … আজমা … সবাই ডাকতো আজো বলে। ফুপার যক্ষ্মা হয়েছিল। দেশভাগের জন্য আমি আর জানতে পারিনি তাঁদের খবর। শুধু শৈশবস্মৃতি হয়ে আমার স্মৃতিতে এখনো জ¦লজ¦ল করছে। নতুন ফুপু একহারা ফর্সা মানুষ। বড় ভালো ছিলেন। তাঁর সুন্দর মুখশ্রী মনের গভীরে এখনো সেঁটে আছে। ওঁদের কথা মনে পড়লে আনন্দের সঙ্গে বেদনাও হানা দেয়। এটাই জীবনের ধর্ম। কান্না-হাসির দোল-দোলান পৌষ-ফাগুনের পালা। রবীন্দ্রনাথ আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছেন। তিনি একাই একশ। আর আজকের সংস্কৃতি সিনেমা-সংস্কৃতিকে বাদ দিলে তিনি বাঙালি সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্ব। অবশ্য বলিউডের সৌজন্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সারা ভারতে বাঙালিকে ও তার সংস্কৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করে চলেছেন। বলিউডের সংগীতজগতে ও চলচ্চিত্রজগতে একসময় বাঙালির একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। বর্মণ পরিবার সংগীতে রাজা-মহারাজা। কিশোরকুমার ও অশোককুমার মহাদিকপাল। অনুজ অনুপকুমার ছিলেন বাংলায়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, সলিল চৌধুরী – এঁরা সুরকার ও গায়ক হিসেবে মহাজন, যাঁরা ভারতের প্রতিনিধি।

এখনো বাংলা বলিউডে অনেকটা জুড়ে আছে সংগীতজগতে।

হরিশচকের উত্তরে লতিফপুর। এটিও আমাদের গ্রামের পাশে পড়ে – উত্তর-পূর্ব কোনায়। এই গ্রামের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়নি। এই গ্রামের ভূমিপুত্র মানিক পণ্ডিত আমার জীবনের শেষপ্রান্তে তাঁর কাব্যচর্চা, আলোকচিত্র, প্রবন্ধ ও বামপন্থী ঘরানার একজন প্রধান কর্মী হিসেবে আমার অনুজবৎ হয়ে দাঁড়ায়। উপলক্ষ ছিল বাবা সাহিত্যিক শওকত ওসমানের শতবার্ষিকী অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে গিয়ে। এখানে দুই মানিকের খোঁজ পাই। সবলসিংহপুর গ্রামের শওকত ওসমান স্মৃতি-কমিটির সভাপতি সাহিত্যিক প্রশান্ত মানিক ও সাধারণ সম্পাদক মানিক পণ্ডিত। দুজনই সবলসিংহপুরের দুপাশের গ্রামের। ছোটবেলায় বাবা যে-গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতেন, তার নাম নন্দনপুর। প্রশান্ত, মানিক এই গ্রামের বাসিন্দা। ওটা পড়ে পশ্চিমদিকে – আর পুবে লতিফপুরের মানিক পণ্ডিত। গ্রামের সবলসিংহপুর ইয়ুথ রিং ক্লাব এই শতবার্ষিকী পালনের উদ্যোগ নেয়। এরা খুব জমজমাট আয়োজন করে দুদিন ধরে। আলোচনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জমাট আসর। বর্তমানে মানিক পণ্ডিত ‘সবলসিংহপুর শওকত ওসমান কালচারাল অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ নামে একটি সংস্থা রেজিস্টার্ড করেছে। রেজি নং ০০২৬৫৫০/২০২২-২৩ (একটি বেসরকারি এবং অলাভজনক সমাজ-সংস্কৃতিমূলক সংগঠন) ঠিকানা : গ্রাম ও ডাকঘর সবলসিংহপুর, থানা : খানাকুল, ব্লক : খানাকুল ২, জেলা : হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ ভারত, ডাকসূচক : ৭১২৪১৭ – এই ঠিকানায় মানিক পণ্ডিতের নেতৃত্বে একটি আর্কাইভ গড়ে তোলার কাজ চলছে। সবলসিংহপুর গ্রামের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া ১২ ফুট প্রশস্ত কংক্রিট-রাস্তার পাশে ২৬ শতাংশ জায়গার ওপর আর্কাইভ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। সবটাই করছে মানিক পণ্ডিত।

ফনেচাচার কথায় আসি। চাচা যেমন ভালো বাঁটুল চালাতে পারতেন, তেমনি ছিলেন ছিপ দিয়ে মাছ ধরার ওস্তাদ। আর খুব ভালো দৌড় দিতে পারতেন। বিশেষ করে চিকে খেলা – বাংলাদেশে যাকে বলে দাড়িয়াবান্ধা খেলা – এই খেলায় চাচা ছিলেন ওস্তাদ। পাতলা চেহারা বলে তাঁকে সহজে কেউ ছুঁয়ে আউট করতে পারত না। পাকা ঘরে পৌঁছে চাচা হাঁক দিতেন : গুজুত। মানে একটা পয়েন্ট হলো। গুজুত মানে ফুটবলের গোলের সমতুল্য। এখানে বল নেই – মানুষটাই বল। ফনেচাচার মতো মোজাম্মেল বা মজুচাচাও ছোটখাটো চেহারা বলে ভালো ‘গুজুত’ করতে পারত। দুই ভাইকে দলে নেওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে যেত। আমি নেহাত ছোট বলে পাশে বসে খেলা উপভোগ করতাম। ‘গুজুত’ হলে দিতাম হাততালি। এই গুজুত শব্দটি কোথা থেকে এলো, বসে বসে ভাবতাম। আজো ভাবি। ঠিকানা পাই না। গুঁজে দেওয়া অর্থে হতে পারে।

এখন বুঝি এটা সম্পূর্ণ আঞ্চলিক শব্দ। এই শব্দের সঙ্গে আর একটা শব্দ আসে আমাদের গ্রামের নাম নিয়ে।

সবলসিংহপুরের আর একটা আঞ্চলিক নাম আছে : হুড়মো।

এই হুড়মো শব্দের একটা ছোট ইতিহাস আছে। একবার রকিবপাড়ার মাঠে সবলসিংহপুর ও অন্য একটি গ্রামের ফুটবল প্রতিযোগিতা হচ্ছে। মাঠের চারদিকে সবলসিংহপুরের লোকজন। খেলা চলছে … সবলসিংহপুর একের পর এক গোল খেয়ে যাচ্ছে … রেফারি খেলা শেষের বাঁশি বাজানোর আগেই গ্রামের লোকজন হুমমুড় করে মাঠে ঢুকে পড়ে, খেলা পণ্ড করে দেয়, সেই থেকে পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকেরা আমাদের গ্রামের নতুন নামকরণ করে : হুড়মো। এখনো এই নাম চালু আছে। নতুনরা জানে কি না জানি না। তবে আমি এখনো সাক্ষী। বাংলার সব জায়গায় এভাবে নিয়ম ভাঙার একটা সংস্কৃতি আছে।

প্রার্থনায় কি কিছু হয়? হয়তো হয়, হয়তো হয় না : জানি না। তবু প্রার্থনা করা ছাড়া আর কি-ই বা করার আছে। সুমতি তো সহজে আসে না। ঈর্ষা-দ্বেষ-বিদ্বেষ নিমেষে ফুঁসে ওঠে।

ভালো-চিন্তা অবদমিত থাকে। তাকে শিক্ষা-সংস্কৃতি দিয়ে জাগাতে হয়। অনেক সাধনার ব্যাপার থাকে। অনেক ত্যাগ, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবে অর্জন করতে হয়। সহজে অর্জন করা যায় না।

আমাদের গ্রামে কয়েকটা গাছ ছিল খুব এলামদা। এই এলামদা শব্দটি এই অঞ্চলে এমনকি মামাবাড়ি ঝামটিয়াতেও মুসলিম সম্প্রদায়ে ব্যবহার হয় প্রাচুর্য হিসেবে। এলামদা অর্থ অনেক।

সবলসিংহপুর বাঁশঝাড়ে ভরপুর। বন্যাতল বলে বাঁশের ঝাড়ে উঁচু ঢিবি করে গাছ লাগানো হয়। সুতরাং বান তেমন ক্ষতি করতে পারে না। আর তিন-চারদিন বান থাকলে কোনো ঝামেলা হওয়ার কথাও নয়। বাঁশঝাড় ঘরের পাশে নিচু জায়গায়, এমনকি পেছনে আর পশ্চিম-উত্তর কোনায় কবরস্থান বাঁশঝাড়ে ছাওয়া। মাঝে মাঝে কবর। পেছনে একটা নালার মতো ছিল। তার ওপর ছিল পাড়ার খাটা পায়খানা। বাঁশের বেড়া। সামনে আগল ছিল সম্ভবত টিনের। ঠিক মনে পড়ছে না। কেননা ওই বারোয়ারি টাট্টিখানা আমি কোনোদিন ব্যবহার করিনি। ওই জায়গায় গদগাছের ঝোপ ছিল, তার মধ্যে কাজ সারতাম। এই গদগাছ খুব সুন্দর। গাঢ় বেগুনি রঙের পাতা। সাদা কালচে দুলের মতো ফুল আর মধুতে ভরপুর। পায়খানা করতে করতে চলত মধু পান। কোনো কোনো ফুলে মধু পাওয়া যেত না। মৌমাছি সাবাড় করে গেছে বলে। এই গদগাছ শহরে সীমানায় বেড়া দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হতে দেখেছি। খুব চমৎকার ঝোপ। সারা বছর পাতা থাকে। ঝোপ শুধু পাশে বাড়ে। সুতরাং ঝোপ থেকে হয় ঝোপাল। এখন মাঝে মাঝে কারো কারো বাড়ির সীমানায় দেখি। খুব বেশি একটা দেখা যায় না। বিশ্বশিল্পীর আশীর্বাদধন্য এই গদগাছ। ভালো নামটা জানার চেষ্টা করা হয়নি। সচেতনভাবে এবার খোঁজ করতে হবে। আজকাল গাছপালার ভেষজ গুণ নিয়ে খুব চর্চা চলছে। এসে গেছে ছাদবাগান। ব্যাবিলন ফিরে এসেছে। গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার তীরে এখন চলছে গাছ লাগানোর সচেতনতা। প্রকৃতিকে আমরা যথেচ্ছ ব্যবহার করে এর প্রাণশক্তি শেষ করে এনেছি … এখন মরার সময় অক্সিজেন খুঁজছি। ব্রাজিলে আমাজন বনের মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণের তথ্যটি খুব পীড়া দিচ্ছে। আমাজন অববাহিকা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বনাঞ্চল। কত বৃক্ষ যে নিধন হবে ভাবলেও খারাপ লাগে। মানুষ এখন উন্নয়ন-রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। বরং অবনয়ন আন্দোলনে নামা উচিত। ধনসম্পদ সমবণ্টনের মাধ্যমে। তাছাড়া ধ্বংস খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসবে। এর প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। উন্নত দেশগুলো তা দেখেও না দেখার ভান করছে। শুধু ধনসম্পদের জোরে পৃথিবীর গরিব দেশের ওপর রাজত্ব করার জন্য।

ফনেচাচাকে বাবা ডাকতেন ফনু বলে। আদরের ডাক। দুই ভাইয়ের বয়সের পার্থক্য অনেক। তাই এই এক ডাকই শুনতাম। একভাই তাই ফনেচাচা বাবার খুব আদরের ছিলেন।

আমাদের গ্রামের পশ্চিমে প্রায় চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরে রাজহাটি বন্দর। এটির নাম বন্দর হলেও নদী উধাও। একসময় বন্দর ছিল। তাই লোকে এখন শুধু রাজহাটি বলে। রাজা মানে সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। আমাদের এই রাজহাটি তাই বেশ বড় বাজার। পাকা বড় বড় বাড়িও আছে হাট ঘিরে। কোনো কোনো বাড়ির ছাদে পরীর মূর্তি বা কোনো ঠাকুরের মূর্তি করা হতো। আমি চাচার সঙ্গে যে-ক’বার রাজহাটি গেছি, অবাক হয়ে দেখেছি সিমেন্টের তৈরি সেই পরীমূর্তি। মনে হতো এখনি বুঝি ডানা মেলে উড়ে যাবে। রাজহাটি একটা রহস্যময় জগৎ ছিল আমার কাছে। অনেক লোকের সমাগম। দূর থেকে বাজারের আওয়াজ পাওয়া যেত। মনে হতো একটা শহরের টুকরো। কেটে এনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কখনো কখনো আমার মনে হতো রূপকথার পুরী। ঠাকুরমার ঝুলি বই পড়েছি তখন। তাই হয়তো রূপকথার রাজ্যে চলে যেতাম। রাক্ষস-খোক্কসের গল্পের জগৎ চোখের সামনে ভাসত। গাছে গাছে হীরেমতির ফুল। সামনে সরোবরে লাল-নীল পদ্ম ফুটে আছে।

এই ছিল বাল্যে দেখা আমার রাজহাটি বন্দর।

এ এক মজার ব্যাপার। বয়সকালে মানুষ শৈশবের সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পায়। অথচ গতকালের কথা আজ মনে করতে পারে না। মাঝে মাঝে বন্ধুর নামও মনে আসে না। আর বাস্তবতা হলো, যত মনে করার চেষ্টা চালানো হয়, ততো হারিয়ে যায়। আবার যে-কোনো সময় এমনিতে মনে এসে যায়। তখন মানুষ হাসতে থাকে – মনে মনে। নিজেকে অচেনা মানুষ মনে হয়।

একবার রাজহাটি যাওয়ার সময় খুব মজার এক দৃশ্য দেখেছিলাম মনে পড়ে।

বাঁধের পাশে একটি ছোট জমিতে জমে থাকা জল সেচন চলেছে। উদ্দেশ্য বর্ষার পর ওই জলা-জায়গাটায় কিছু মাছ পাওয়া যেতে পারে। বালকটি ছোট বালতি করে জল সেচন করছে পাশের আলবাঁধা জমিতে। আর গান জুড়েছে। একই কথা বারবার আওড়ে চলেছে :

হরে মুরারে হরে মুরারে …

পরের সর্বনাশ ভালো করে করো রে …

আমার খুব হাসি পায়। আমরা তো সবসময় এর উল্টোটা শুনে এসেছি যে, পরের উপকার করবে। এটাই মানবধর্ম। কিন্তু ছেলেটি বলে কী?

মহাজনদের আপ্তবাক্য একসময় হাসির খোরাকে রূপান্তরিত হয়। আমরা সবাই স্থান-কাল-পাত্রে বাঁধা। সময় বদলাবে, মত পাল্টাবে। অন্তর্নিহিত বার্তা বহমান। রূপান্তরের মাধ্যমে। দোষ কারো নয় গো মা … শ্যামাসংগীতে উচ্চরব। কেউ বলছেন পুতুল নাচের ইতিকথা, কেউ বলছেন কাঁদো নদী কাঁদো। কারণ সব নদী বেঁচে থাকে না। তিতাস এখনো জীবিত একটি নদীর নাম। বগুড়ায় বাঙালি নদীটি মরমর। বুড়িগঙ্গা জরাগ্রস্ত। গঙ্গা বর্জ্য বহন করে টিকে আছে। আড়িয়াল খাঁ সাহেবের সেই তেজ নেই। রূপসার রূপ এখনো রুপোলি। বিষখালি আর বিষমুক্ত নয়। কর্ণফুলীর কানের দুল হারিয়ে গেছে। মা মাছেরা হালদায় এসে বিপাকে পড়ে। কোথায় ডিম ছাড়বে? যারা ছড়াবে লাখ লাখ মৎস্যপ্রাণ।

শুধু সবলসিংহপুরের পাশ দিয়ে বহতা মুণ্ডেশ^রী দামোদর প্রকল্পের সৌজন্যে যৌবনে ফিরেছে। জল ভরাট থাকে। টলটলে। ধীরগতি। সাঁকোর ওপর দিয়ে লোক চলাচল – সঙ্গে গাড়িও আছে। ওপাশে হরিশচক আর উত্তরে লতিফপুর। বাবলার সার দুপাশে সবুজের ঠিকানা। গ্রীষ্মে হলুদ ফুলে ছেয়ে যায়। বাবলাসুঁটিও ঝুলন্ত ওষুধের শিশির গায়ের লেবেলের মতো খাঁজকাটা। গরু-ছাগলের প্রিয় ফলার। বান এলে এটাই সহায়। জাবর কেটে দ্বিতীয়বার গেলা। ছাগলের তাই নাদি হয়। চর্বিত চর্বণের অনুষঙ্গ। গরুও জাবর কাটে, তবে তার বিশাল পেট থেকে সোজা গোবর নির্গত। তবে খেয়াল করলে দেখা যাবে খাঁজকাটা আছে গোবরের গায়ে। এটাও জাবরকাটার অনুষঙ্গ। এক একটা দলা পৃথকভাবে পৌঁছে জোড়া লেগেছে।

খুব ছোটখাটো বাজার হলে আমি আর ফনেচাচা দক্ষিণে অবস্থিত বাজারতলায় যেতাম। বাজারটা আমাদের পাড়ার দক্ষিণ দিকে আধা কিলোমিটার দূরে। সপ্তাহে দুদিন হাট বসত। শনি আর মঙ্গল। বেশ কিছু ছাউনি দেওয়া ভিটের মতো করে মাটির বাঁধান জায়গা। উপরে খড়ের ছাউনি।

হাটবার হলে দূর থেকে একটা গুঞ্জন শোনা যেত। দরকারি সবকিছু পাওয়া যেত।

সপ্তাহে দুদিন হাট হলে বেশ জনসমাগম হতো।

কাঁচা বাজারে থাকত শাকসবজি আর আলু-পেঁয়াজ। থাকত ছোট মাছের বহর। চুনো-চানা, কুঁচো চিংড়ি, ট্যাংরা, পাবদা, কই-সিং-মাগুর সব সময় থাকত। এই জিওল মাছ রোগীর পথ্য। তাই থাকবেই। আর দামও অন্য মাছের তুলনায় দ্বিগুণ।

রুই-কাতলা উঠত কম। বোয়াল-ফলুই-বানমাছ মাঝে মাঝে উঠত। আর চুনোচানা থাকত। গরিবের জন্য এগুলো বরাদ্দ। যদিও কাঁটাসমেত খাওয়া যায় বলে এর খাদ্যগুণ বেশি। বেশি করে পেঁয়াজ দিলে খেতেও স্বাদ। তবে গ্রামে পেঁয়াজ খুব হিসাব করে খরচ করা হতো। দুটো পেঁয়াজের বেশি প্রায় কোনো গিন্নির হাতে উঠত না। এমনকি এটা ছিল সর্বজনীন।

পরবর্তী জীবনে আমি আমার মাকে দেখেছি এক সের কিনে দিলেও তিনি দুটি পেঁয়াজের বেশি তরকারিতে দিতেন না। আমি অনেক সময় মাকে সচেতন করে বলেছি, বেশি করে পেঁয়াজ দেবেন। কার্পণ্য করবেন না। কিন্তু আমার সতর্কবাণী বিফলে যেত। মা’র সেই একই ধারা। বরাদ্দ দুটি পেঁয়াজ। একে নৃতত্ত্বে বলে ফোকওয়েজ বা লোজজীবনধারা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গ্রামজীবনে এটা চলতে থাকে। এমনকি শহরেও এই ধারা সাধারণের জীবনে বহাল। ধনীদের কথা আলাদা। তাদের কোর্মা-পোলাওর জীবন। সেখানে পেঁয়াজের একচ্ছত্র রাজত্ব।

ফনেচাচাকে নিয়ে একটা অঘটনের কথা মনে আসে।

বাবা মাকে একটা পার্কার কলম উপহার দিয়েছিলেন। কেমন করে জানি সেটা চাচার নজরে পড়ে এবং কার কাছে যেন বিক্রি করে দেন, পাঁচ সিকেয়। মানে আজকের এক টাকা পঁচিশ পয়সা।

খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে বেরিয়ে পড়ে যে, ফনেচাচা ওটা কাউকে বিক্রি করে দিয়েছেন।

মা তো খুব রাগ। কারণ একে তো উপহারের বস্তু, তাছাড়া দামি কলম। দশ-বিশ টাকার কম হবে না। ওটা শেষ পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি। চাচা সবার কাছে বকুনি খেয়েছেন।

জানি না এই ঘটনার অভিঘাত কি না, পরবর্তী জীবনে চাচাকে পরহেজগার মানুষ হিসেবে দেখেছি। মিতভাষী, নিরহংকার, সত্যবাদী … যত ভালো গুণ একজন মুসলমান বা যে-কোনো ধর্মের মানুষের হয়, তিনি ছিলেন সেই গুণের অধিকারী। জিলানী নামের সার্থক রূপকার। এই উপমহাদেশে হজরত আবদুল কাদের জিলানী একজন সর্বমান্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। আজমির শরিফে যাঁর অবস্থান, যা সর্বভারতীয় মানবকুলের শ্রদ্ধা প্রদর্শনের স্থান। আজমির শরিফে যাওয়া অনেকটা মক্কা-মদিনা দর্শনের মতো। যাঁরা দীন-দরিদ্র, হজে যেতে পারেন না তাঁরা নিয়ত করেন একবার আজমির শরিফ দর্শন করবেন। এরপর আসেন দিল্লিতে নিজামুদ্দিন আউলিয়ায়। আর সারা বাংলায় ছেয়ে আছেন এইসব মহৎপ্রাণ ধর্মপ্রচারকগণ। ইসলাম প্রচারে এঁরা সুদূর ইয়েমেন, আরব, তুরস্ক থেকে এদেশে এসেছেন সেই মধ্যযুগে। কী অপূর্ব সব প্রাণ। মানবজাতিকে সাম্যের বাণী শোনানো তাঁদের ফরজ কর্ম ছিল। ইসলাম ধর্ম সেই সাম্যের বাণী প্রচার করেছে। আজকে অনেক রূপান্তর ঘটেছে।

বাংলায় শাহজালাল, শাহ পরান, শাহ মখদুম, বদর শাহ, বায়েজিদ বোস্তামী, শাহ ফরিদ, মদন শাহ … শাহ নিয়ামত … মাইজভাণ্ডারী – অসংখ্য মাজার গড়ে ওঠে এঁদের কর্মস্থলকে কেন্দ্র করে। বাংলার মাটিতে তাই মাজার শরিফকে কেন্দ্র করে একটি সাংস্কৃতিক মণ্ডল গড়ে ওঠে। এঁদের সবার একই চিন্তা ছিল : সাম্যবাদ। জাগতিকভাবে ধনী-গরিব থাকলেও মানুষের মানদণ্ডে সবাই সমান। স্রষ্টার সৃষ্টি, একসূত্রে গাঁথা। বাংলায় এভাবে মুসলিমগরিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। এর পেছনে আর একটি উপাদানের কথা বলতে হয়।

বাংলায় ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে প্রায় চারশো বছর পালযুগের সময়কাল – বৌদ্ধধর্ম কোনো গোত্রে বিভক্ত ছিল না। বুদ্ধ ঈশ^^র ধারণার ব্যাপারে কিছু নির্দেশ না দেওয়ায় বৌদ্ধদের মধ্যে শ্রেণিবিভক্তি কঠোরতা ছিল না, ফলে একাদশ শতকে সেন যুগে কৌলীন্য প্রথা জোরদার করায় বৌদ্ধরা নির্যাতিত হন। ত্রয়োদশ শতকে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রবর্তনার দরুন বৌদ্ধগণ ইসলামের সাম্যবাদী দর্শনে আকৃষ্ট হয়ে মুসলিম হতে থাকেন। এভাবে কাস্ট সিস্টেম বা বর্ণবাদী বিভক্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নিম্নবর্ণীয় হিন্দু সম্প্রদায়ও ধর্মান্তরিত হতে থাকে। এভাবে বাংলায় সুলতানি আমলে (১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দ-১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দ) আলাউদ্দিন হুসেন শাহী আমলে গৌর-নিতাইয়ের বৈষ্ণববাদ নিম্নবর্ণকে আকর্ষণ করে। ফলে বর্ণবাদী হিন্দুধর্ম আর একটি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। মাঝখান থেকে ইসলাম ধর্ম সবকিছুকে ছাপিয়ে যেতে থাকে এবং ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে আদমশুমারিতে দেখা যায়, বাংলায় মুসলিম জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই ব্যাপারটি তৎকালীন ব্রিটেনে বেশ আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এটাই ঐতিহাসিক ঘটনা, যা পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে মূল উপাদান। চিরকালীন বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে মুসলিম জীবনাচার বিভেদকে উসকে দেয় শাসক ব্রিটিশ। বিভেদকারী ব্রিটিশ খুব ভালোভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের মস্তিষ্ক ধৌত করে। আর শাসনকার্যের সুবিধা দেখিয়ে ১৯০৫ সালে বাংলাকে বিভক্ত করে। পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে ভিন্ন প্রদেশ। রাজধানী ঢাকা। এই বিভাগ এলিট হিন্দু গ্রুপ বাঙালিদের কারণে রদ হয়ে যায় – ১৯১১ সালে। এই আন্দোলনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি প্রবর্তন করেন হিন্দু-মুসলিম রাখিবন্ধন আন্দোলন। এই সময় বাংলাকে কেন্দ্র করে তিনি অনেক গান রচনা করেন।

ছোটচাচা জিলানী ছোটবেলা থেকে আঁকাআঁকি করতেন। খাতায় নানা রকম নকশা ও পাখির ছবি আঁকতেন। আমরা খুব আগ্রহ নিয়ে তাঁর অঙ্কন দেখতাম, আর অবাক হতাম।