রাস্তার পাশে ফ্ল্যাট বলে এমনিতে গাড়ির শব্দ যন্ত্রণা দেয়। তার ওপর কয়েকদিন ধরে একটি তীক্ষ্ণ-কর্কশ-বামা কণ্ঠ ভুগিয়ে চলেছে ফজলকে। তাঁর লেখার টেবিলটা ঠিক জানালার পাশে। রাস্তার ওপারে একটি অফিস – ওদের ক্রিয়াকাণ্ড সব সময় দফতর কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। মাঝে মধ্যে সেলিব্রেটি বদমাশরা এলে তার চেল্লা-চামুণ্ডারা অঞ্চলে শোরগোল পাকিয়ে একটা জলসাকেন্দ্র বানিয়ে তোলে।
এরকম হরসঙ-মার্কা ঘটনা প্রায়ই ঘটে। ফজল অতিষ্ঠ। আবার ভাবে, এমন দৃশ্য কজন দেখতে পায় – এসব ভেবে মনকে সান্ত্বনা দেয়।
বাঙালি এমনিতে হুজুগে জাতি। তার মাঝখান থেকে দু-একজন মহারথী বলে বাঙালিদের সবাই সমীহ করে। কিন্তু ভালোভাবে দেখলে এর আনাড়িপনা নাসিরুদ্দিন হোজ্জার কাহিনির মতো মনে হবে।
মোল্লা নাসিরুদ্দিনের কথা মনে পড়ায় আপনা-আপনি ফজলের মুখে একটা হাসির রেখা জাগে। মনে পড়ে নাসিরুদ্দিনের প্রিয় গাধাটির কথা। একদিন মোল্লার মনে হলো, গাধার জন্য তার বেশ খরচ হয়। সংসার চলে না আবার গাধার খাবারের বন্দোবস্ত করা। তাই তার মাথায় একটা ভাবের উদয় হলো। ভাবল : আচ্ছা, গাধাটিকে না খাইয়ে রাখলে হয় না? খরচ কমে।
ভাবে, হঠাৎ করে তো আর খাবার বন্ধ করা যায় না! তাহলে তো দুদিনেই শেষ।
যেই ভাবা সেই কাজ।
নাসিরুদ্দিন গাধার বরাদ্দ ছোলা কমাতে থাকল। দিন যায়। এভাবে চলছে। একদিন সকালে গোয়ালে ঢুকে নাসিরুদ্দিন দেখে গাধা চার পা আকাশের দিকে তুলে মরে পড়ে আছে।
নাসিরুদ্দিনের বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। বেশ কিছুক্ষণ যায় ব্যাপারটা সামাল দিতে। তারপর সে আওয়াজ করেই বলে ওঠে, প্রায় নিজেকে শুনিয়ে : আহারে, গাধাটা যখন না খেয়ে থাকতে শিখল, তখনই মরে গেল।
ফজল একা একা হাসে।
তার মনে হলো, বাঙালি সেই নাসিরুদ্দিন মোল্লার সহোদর যেন। যখনি সে স্বাধীনতা পেল, তখনি পরাধীন হয়ে গেল।
যাকগে এসব গল্প।
ফজল তার ড্রাইভার হারুন মোল্লাকে জিজ্ঞেস করে, তোমাদের এই উন্মাদিনীর বাড়ি কোথায়?
জানি না স্যার।
কোনোদিন জিজ্ঞেস করোনি?
না স্যার।
আচ্ছা, এই পৃথিবীতে কত কী ঘটে যাচ্ছে তোমার চোখের সামনে, কিছু জানতে ইচ্ছা করে না?
হারুন মোল্লা নিরুত্তর। ভাবলেশহীন।
ফজল বললেন, দু-চারটে কথা জিজ্ঞেস করতেও তো পারো! আচ্ছা, কারো সঙ্গে কথা হলো?
হ্যাঁ স্যার। অনেকের সঙ্গে কথা হলো।
কী কথা?
তা শুনিনি স্যার।
ভেতরে ভেতরে রাগ হলেও ফজল চেপে যায়। লোকচরিত্র বড় বিচিত্র। এই লোকটাকে তিরস্কার বা উপদেশ দিয়ে লাভ কী! এসবের ঊর্ধ্বে ওরা। কার্ল মার্কস কি এদেরই লুম্পেন প্রলেতারিয়েত বলেছিলেন? যারা কোনোমতে খাবারটুকু পেলেই দুনিয়াদারির কিছু জানতে চায় না!
ফজল অনেকক্ষণ ভাবতে থাকে।
এদিকে রাস্তা থেকে উন্মাদিনীর চিৎকার ভেসে আসছে অনবরত।
কান খাড়া করে ফজল শোনার চেষ্টা চালায়। কিন্তু ব্যর্থ। তার কথা এত দ্রুত যে, শুধু একটা ধ্বনিতে রূপান্তরিত। অর্থ বের করার ইন্টেলিজেন্স তার নেই। তাহলে আর্টিফিশিয়াল ব্রেন এত শিগগির লিখে চলে কী করে? বা প্রশ্নের জবাব দেয় কী করে? ওর নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয়। দুনিয়া কোথায়, আর সে
কোথায়। দুই হাজার সালের আগে যারা জন্মেছে তারা তো সব বাতিল! হাতের লেখা, ভাবা, চিন্তা করা – এসব তো এখন সব অচল। সে নিজের অবস্থানটা বুঝতে পারে। সে বাতিল হয়ে গেছে। এমেরিটাস প্রফেসররাও বাতিল। তাঁরা সব বিংশ শতাব্দীর মানুষ। নোবেল লরিয়েট অমর্ত্য সেন, মুহাম্মদ ইউনূস এঁরাই শুধু ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে। শিল্পকলার লোক বলে
রবি-নজরুল-জয়নুল বেঁচে গেছেন। মরে গিয়ে বেঁচেছেন।
পরদিন সকালে হাঁফাতে হাঁফাতে হারুন মোল্লা হাজির।
স্যার, ৩২ নং ভেঙে ফেলছে!
কী বলছ!
দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা অভ্যাস, ফজলের তখনো ঘুমের ঘোর কাটেনি।
আজকাল ফজল অবাক হওয়া ভুলে গেছে। মনে হলো মাথাটা ঘুরছে। হাই ব্লাড-প্রেসারকে দুষল। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকবার চোখেমুখে জল ছিটাল।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে ঢুকে দেখে হারুন তখনো উত্তেজনা প্রশমন করতে পারেনি। কাঁপছে। ওর বাড়ি গোপালগঞ্জ।
ফজলের মনে পড়ে, বেশ কয়েক বছর আগে পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বাসার সামনে ছিল ব্যারিকেড। তিনি বাড়ির বাইরে যেতে গেলে মেয়ে-পুলিশ বাধা দেয়।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন ছোড়েন বেশ রাগত স্বরে।
বাড়ি কোথায়?
তরুণী-পুলিশ বলে : গোপালগঞ্জ।
: ও গোপালি।
কথাটা শুনে ফজল হাসি চেপে রাখতে পারে না। কী চমৎকার বিশেষণ।
তার সামনে দাঁড়িয়ে ড্রাইভার মোল্লা হারুন এক গোপাল!
তার ভেতরের হাসিটা চেপে রাখতে পারে না।
স্যার, আপনি হাসছেন?
না হারুন, বাড়ি ভাঙছে বলে হাসছি না। এটা একটা অন্য প্রসঙ্গ। তুমি ধানমণ্ডি গিয়েছিলে নাকি!
গিয়েছিলাম স্যার। আর্মির চোখের সামনে বুলডোজার দিয়ে ভাঙছে। হাজার হাজার লোক দাঁড়িয়ে দেখছে, ঘরের আসবাবপত্র লুট করছে। কেউ কিছু বলছে না। আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। পালিয়ে এলাম স্যার।
হারুন তো বাড়ি ভাঙা দেখছে। ফজল মনে মনে বলে, আমরা দেখেছি শেখ সাহেবের নিথর দেহ সিঁড়িতে পড়ে থাকতে।
ফজল তার গৃহকর্মী আলোর মাকে বললো, হারুনকে একটু চা করে দাও।
আমি খেতে পারব না স্যার।
প্রায় কাঁদো কাঁদো স্বরে বলতে বলতে সে বেরিয়ে গেল।
ফজল মনে করে, তাকে ডাকাটা উচিত হবে না। অন্য সগোত্রদের সঙ্গ পেলে ও সহজ হতে পারবে। যেতে দিলো।
লেখার টেবিলে বসে ফজল দিনলিপির ডায়েরিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে রেখে দিলো। বাঘ সম্বন্ধে কী রচনা লিখবে, বাঘ তো পেছনে শ্বাস ফেলছে।
নিচে উন্মাদিনীর হাততালির শব্দ ভেসে আসে। ফজল ওর তালি দেওয়ার কারণ উদ্ঘাটনের চিন্তা করে। তা-ও বাদ দেয়। পাগলের পাগলামির কোনো ধরাবাঁধা যুক্তি নেই। তাই তো বলে উন্মাদ। ডিটেকটিভ বা মনোবিদরা কিছুটা ধারণা করতে পারেন। তার অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী হয়ে যাবে।
সারা শহরের উত্তেজনা সে টের পায়। নিচে গাড়ির আওয়াজ তীব্র। মিরপুর সরণি বন্ধ হলে এদিকটায় খুব চাপ পড়ে। এমনকি তাদের ভবন থেকে গাড়ি বেরোতে পারছে না। রাস্তা পুরো জ্যাম। নড়ন-চড়ন নেই। ভবনের মধ্যে যাত্রী চুপচাপ গাড়িতে বসে অপেক্ষমাণ। এই ছাড়ে এই ছাড়ে করে আধঘণ্টাও পার হয়ে যায়।
ফজল মেয়েটির কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, কিন্তু চেহারা দেখেনি। যা ধারণা তা মনে মনে, তা-ও ঘোলাটে। পরিপূর্ণ বা সঠিক রূপ ভাবতে পারে না। ওর সম্বন্ধে জানার একমাত্র মাধ্যম ড্রাইভার হারুন।
পরদিন খুব বিষণ্নমুখে হারুনের প্রবেশ।
তাকে চিন্তামুক্ত করার জন্য ফজল বলে – হারুন, পাগলি মেয়েটা দেখতে কেমন?
স্যার, ফর্সাই ছিল। তবে তামাটে হয়ে গেছে। বয়স
পঁচিশ-ছাব্বিশ। মধ্য উচ্চতা।
পরনে কী আছে?
প্যান্ট আর চুড়িদার ফতুয়া পরে। আধুনিকা স্যার।
স্মিত হাসি ফজলের।
উন্মাদিনী আধুনিকা … বিড়বিড় করে চলে সে। ভাবে, কোনো ভদ্রঘরের মেয়ে নয় তো! আবার ভাবে, তাহলে তো চিকিৎসা করাতো। আর আজকাল তো মানসিক চিকিৎসার উন্নত জ্ঞান ও ক্লিনিক্যাল পদ্ধতি আছে। আছে গ্রুপ থেরাপি। কয়েকজন মানসিক রোগীকে একসঙ্গে বসিয়ে বাক্যালাপ করতে দেওয়া হয়। অদৃশ্য জায়গা বা সঙ্গে চিকিৎসকও থাকেন। যেন তিনিও রোগী। বা বন্ধু। বা চিকিৎসক। নানা রূপে অবস্থান।
কয়েকদিন পর ফজল গাড়ি নিয়ে ভবন থেকে বেরোচ্ছে সামনে ওই অফিসের দেওয়ালের নিচে গাঁথুনিতে হেলান দিয়ে বসে থাকতে দেখল মেয়েটিকে।
সোজা পাশ কাটিয়ে যেতে হবে তাকে।
সে ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলে। মেয়েটিকে ডাক দেয় : এই যে মা, একটু শোনো!
মেয়েটি চাইল, কিন্তু কোনো আগ্রহ দেখাল না।
তাড়া ছিল ফজলের, তাই আর দাঁড়াল না।
চলো হারুন, মেয়েটিকে তো দেখলাম। পরে কথা হবে। চলে যাই।
মেয়েটি শুধু প্যান্ট আর কুর্তাই নয়, মাথায় দিয়েছে অপারেশন টেবিলে ডাক্তাররা যেমন প্লাস্টিক কভার পরে, তেমনি মাথায় প্লাস্টিকের কভার। ওকে মানিয়েছে। পাগলিদের ছন্নছাড়া চেহারা নয়, বেশ স্মার্ট বলতে হবে। তবে অপরিচ্ছন্নতা লুকোতে পারেনি।
পরদিন ফজল হারুনকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, মেয়েটা যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকে চলে … ও কী নিয়ে এত কথা বলে?
খুব ভালো ভালো কথা বলে স্যার! বেশিরভাগ গরিব-দুঃখী মানুষের কথা বলে। কেন দেশের মানুষের এত কষ্ট, কেন কেউ খেতে পায়, কেউ পায় না … এইসব নিয়েই বেশি কথা বলে।
ফজলের মনে সাড়া পড়ে যায়। এমন কথা! একজন উন্মাদ মেয়ের মুখে! সুস্থ মস্তিষ্কের লোকেরাই এসব কথা বলতে ভয় পায়, আর এই মেয়েটি ওই অফিসের দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে এসব বলে চলেছে! তবে ওর পক্ষেই বলা সম্ভব। সুস্থ লোক বললে তো সমাজপতিরা সহ্য করবেন না। ফাটকে পুরবে। বা অদৃশ্য করে দেবে। যাকে বলে গুম।
মেয়েটি এখনো যে গুম হয়নি হয়তো তার কারণ ও উন্মাদ। বেঁচে গেছে।
ইতিহাস মনে পড়ে তার। কার্ল মার্কসকে জার্মানি থেকে লন্ডন পালিয়ে যেতে হয়েছিল। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার প্রায়ই লন্ডনে গা-ঢাকা দিতেন। সময়ে আবার দেশে ফেরত আসতেন। আবার সটকে পড়তেন। এটা তাঁর জীবনে অনেকবার ঘটেছে। ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়াটা সহজ ছিল। আন্দামান হলে পারতেন না। ভারতবাসী অনেক ত্যাগের মাধ্যমে ব্রিটিশ বিতাড়ন করেছে। তার নেতৃত্বে ছিল বাঙালি জাতি। বাঙালি যেমনি নরম, তেমনি চরম। কোনো কিছু ধরে রাখতে পারে না। এটাই তার জাতিগত দুর্বলতা। কাজী নজরুল চপল, রবীন্দ্রনাথ ক্যালকুলেটিভ, কিন্তু জাতি দ্বিতীয় ধারণাটি গ্রহণ করেনি।
কেমন যেন এক গয়ংগাচ্ছ ভাব এই জাতির। পরের দাসত্বে পড়ার পরে চেতনা হয়, আরে আমি তো ফাঁদে পড়ে গেছি! শুরু হলো লড়াই। পেল স্বাধীনতা। আবার ঘুমোতে শুরু করল পরবর্তী পরাধীনতার জন্যে … এ যেন মিথ অফ সিসিফাস। সারারাত দেয়াল কেটে শেষ করে এনে আবার ঘুমিয়ে পড়া। পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে দেয়াল আবার পুরু হয়ে গেছে। নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে। আবার শেষ রাত্রিতে ঘুমিয়ে পড়ে … এভাবে মনে হয় অনন্তকাল চলবে। এ-গল্পের শেষ নেই। এ-গল্প যেন আরব্য উপন্যাসের হাজার ও এক রাত্রি।
ফজল শিক্ষক হিসেবে তার পেশার পর্যালোচনা করে চলে। কলেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেকচার দিতে হয়। কোনো কষ্ট হয় না। কিন্তু যেদিন পরপর দুটো ক্লাস থাকত, ক্লাস শেষে খুব ক্লান্ত লাগত। তাহলে এই মেয়েটি অনর্গল গলা ফাটিয়ে কথা বলে কী করে? ফ্রয়েডের কথা মনে পড়ে। রিলিজ অফ ইড – অর্থাৎ পাশব শক্তির উন্মোচন … এর জোরেই সে সারাক্ষণ চিৎকার করতে পারে। সুস্থ মানুষ যা পারে না।
কয়েকদিন পর ফজল ভবন থেকে বেরোবার মুখে মেয়েটিকে দেখতে পেল। একই জায়গায়। একই পোশাক। সে গাড়ি
থামাতে বলে। হারুন, মেয়েটাকে ডাক দাও তো!
হারুন ইতস্তত করতে থাকে।
কী বলে ডাকবে।
হারুন বুদ্ধি করে গাড়ি রাস্তার পাশে রেখে এগিয়ে যায়।
বলে, শুনছেন … আপনাকে স্যার ডাকছেন।
কোন স্যার? মেয়েটির উত্তর।
আমার স্যার। কলেজে চাকরি করতেন। প্রফেসর।
ফজল স্যার!
হারুন অবাক। ও স্যারের নাম জানল কী করে!
কিছুক্ষণ বিহ্বলতায় তাকিয়ে বলে, হ্যাঁ, ফজল স্যার।
মেয়েটি কোনো কথা না বলে হারুনকে অনুসরণ করে।
মেয়েটিকে আসতে দেখে ফজল গাড়ি থেকে নেমে ফুটপাতে দাঁড়ায়।
আমাকে ডেকেছেন স্যার?
হ্যাঁ।
পেছন থেকে হারুন বলে, স্যার ও আপনাকে চেনে। এমনকি নাম পর্যন্ত জানে।
ফজল অবাক। তার নাম জানে, তাকে চেনে, এ-মেয়ে গোয়েন্দা বিভাগের লোক নয়তো! আবার ভাবে, তার মতো নিরীহ লোকের পেছনে গোয়েন্দা লাগতেই বা যাবে কেন!
সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে ফজল সহজ হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে বলে, বলো মা তোমার বাড়ি কোথায়।
স্যার, ডাস্টবিনে।
মানে?
মানে ডাস্টবিনে। আপনি তো গল্প লেখেন, ডাস্টবিনে কারা জন্মায় জানেন না!
জানে ফজল। শুধু সে কেন তার বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষ জানে ডাস্টবিনে কারা জন্মায়।
ডাস্টবিনটা কোন জেলার?
ডাস্টবিনের কোনো জেলা থাকে না স্যার। ডাস্টবিন বিশ্বজুড়ে।
বলেই সে নাচতে শুরু করল।
নাচটা প্রায় নিখুঁত ফ্লেমিঙ্গো নাচ। স্পেনের নাচ এটি।
তুমি ফ্লেমিঙ্গো নাচ শিখলে কী করে?
স্যার, বড় বড় হোটেলে আমাকে বিদেশিরা পছন্দ করে নিয়ে যায়। নানা রকম নাচ শেখায়। তবে স্যার হোটেলের বাথরুমগুলো আমার ভালো লাগে না। এত যে আমার কোনো কিছু ছুঁতেই ভয় করে। তাই আমি হোটেলে বেশিক্ষণ থাকতে পারি না।
আচ্ছা, বলো তো, তুমি আমার নাম জানলে কী করে?
কেন স্যার, স্থানীয় লোকদের জিজ্ঞেস করে। তারা জানায়, আমাদের এখানে একজন নামকরা লেখক থাকেন।
না, না, আমি নামকরা নই, বাধা দিয়ে বলে ফজল – খুব সাধারণ। অতি সাধারণ। যে ফ্ল্যাট দেখছ এটা আমার মায়ের ফ্ল্যাট। তিনি মারা যাওয়ার সময় আমাকে দান করে গেছেন। আমি তোমার মতোই গরিব।
মেয়েটা হঠাৎ ফুঁসে উঠল।
নিজেকে গরিব বলবেন না স্যার। যারা ফাটকা বাজারি করে ধনী হয়েছে, মানুষ হিসেবে তারা গরিব। আপনি অনেক ধনী, অনেক ধনী … বলতে বলতে রাস্তা পার হয়ে চলে গেল।
পিছু ডেকেছিল ফজল, কিন্তু মেয়েটি শোনেনি।
অগত্যা তার উন্মাদিনী দর্শন হলো – কিছু জানা গেল। তবে অজানা রইল বেশি। সে হারুনকে তার গন্তব্যে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
যাত্রা তার ব্যাহত হয় শাহবাগ মোড়ে নবীন ডাক্তারদের দাবি-দাওয়ায়।
সময় কাটে না। বসে থাকে। ফিরবে যে তারও উপায় নেই। পেছনে গাড়ির সার।
উত্তপ্ত বেলা। বৈশাখ। রুদ্ররূপ। সেনা অফিসাররা কী যেন বললেন ডাক্তারদের, তারা জমায়েত ভাঙে। সামনে না এগিয়ে ফিরে আসে ফজল। এখন কোথাও কোনো কাজ করতে ইচ্ছা করছে না। বাড়ি ফিরে পান করবে শুধু এক গ্লাস জল। সঙ্গে জলের বোতলটা নেই। অন্যদিন থাকে।
ঘরে ফিরে ঢকঢক করে দু-গ্লাস জলপান। তার কানে যেন নিচ থেকে ভেসে আসছে উন্মাদিনীর তীব্র স্বর। ভরা দুপুর তাকে আরো উত্তপ্ত করেছে। যেমন করেছে সারা শহর।
হারুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেয়েটি দেশের লোকের কথা বলে, গরিবদের কথা বলে … শোনার চেষ্টা বৃথা। শহর তার নাগরিক দায়িত্বে ব্যস্ত। যানজট ছাড়াতে ছাড়াতে ক্লান্ত নগরবাসী। একজন মেয়ের কণ্ঠস্বর তাতে ঐকতান হয়ে যায়। পৃথক করার কোনো যন্ত্র এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। শরীরে ক্লান্তি। বার্ধক্য ধীরে ধীরে গ্রাস করছে। ওষুধ কত সামাল দেবে! যন্ত্র যখন পুরনো। এইসব ভেবে চলে ফজল।
সোফায় গা এলিয়ে দেয়। মাথার ওপর পাখার ক্রন্দন। ওটাও পুরনো হয়েছে। বেচারা কবে থেকে ঘুরছে। এখন কর্মের সঙ্গে যাতনা জানায়।
আবার একদিন বাইরে যাওয়ার মুখে পেয়ে গেল মেয়েটিকে।
আচ্ছা স্যার, আমি যে চিৎকার করি, চেঁচামেচি করি, আপনার লেখায় ডিস্টার্ব হয় না তো?
না … তেমন …
হয় তো স্যার। সামনাসামনি বলতে পারছেন না। লেখক মানুষ। মুখের ওপর কী করে বলেন।
একটু দম নেয়। মুখটা মলিন। চলে যাব স্যার। এখান থেকে সরে যাব। আপনার কাজের অসুবিধা করব না।
আরে না! চারদিকে এত আওয়াজ আমি কি কিছু আটকাতে পারি? তার মধ্যে তুমি এমন কিছু না …
সে আপনি ভদ্রতা করে বলছেন স্যার। সবই তো বুঝি স্যার।
আচ্ছা, তোমার যখন এমন সুন্দর চিন্তাভাবনা … মানুষের মঙ্গল চাও … কোনো একটা কাজ করলে তো পারো।
না স্যার, তা হবে না। এই যে ফ্রি আছি, যেখানে খুশি যেতে পারি … যা খুশি বলতে পারি … কেউ বাধা দেয় না … আমার কথা আপনি বলে দেখুন না, হাজতবাস। দেশ ছাড়তেও হতে পারে। এই যে কবি দাউদ হায়দার দেশ ছাড়লেন, মানে ছাড়াল, তারপর আর দেশে ফিরতে পারলেন না … এই তো গতকাল মারা গেলেন … দেশে ফেরার কি ইচ্ছা ছিল না?
চমকে ওঠে ফজল। কী কঠিন বাস্তবের মুখে দাঁড় করাল মেয়েটি। আমরা তাকে পাগলি বলি। ভালো বাংলায় উন্মাদিনী। নিজের প্রতি তার করুণা হচ্ছিল। সে আর দাঁড়ায় না। দাউদের কথা কি সে কখনো বলেছে? বলে – চলি, একটা কাজ আছে, জানো তো কনট্রাক্টে একটা কলেজে এখনো পড়াই।
ফজল গন্তব্যে রওনা দেয়।
পরদিন থেকে ফজল গাড়ির আওয়াজের সঙ্গে একটি মেয়ে কণ্ঠের ধ্বনি আর শুনতে পেল না। সারাদিন গেল … রাত গেল … মেয়েটির কর্কশ স্বর অশোনা।
কয়েকদিন পর সে হারুনকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা মেয়েটার আওয়াজ পাচ্ছি না যে!
ও স্যার এখান থেকে সরে গেছে। পাশে যে ক্যান্টিনটা আছে ওর পাশে একটা গ্যারেজমতো আছে, ওখানে বসে।
আমার না কেমন জানি ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তুমি ওকে বলো তো আগের জায়গায় আসতে। বলো আমি বলেছি।
ঠিক আছে স্যার। বলব।
পরদিন সকালে ফজলের মনে হলো একটা কর্কশ বামাধ্বনি শুনছে। নাগরিক জীবনের ধ্বনি-অর্কেস্ট্রা পূর্ণতা পেয়েছে। যেন চেলোটা ছিল না। তার কথাটা মেয়েটি শুনেছে ভেবে সে একটু আত্মতৃপ্ত হয়।
কাজে বেরোবার মুখে সে মেয়েটিকে পেয়ে যায়।
সে কিছু বলার আগে মেয়েটি বলে, স্যার, আমার চিৎকার শোনার জন্য আবার ডাকলেন কেন?
তুমি তো নিজেই উত্তর দিলে, চিৎকার শোনার জন্য।
জানি স্যার, আপনি লেখক তো, মনটা খারাপ হয়েছে। এখানে ছিলাম, প্রকারান্তরে বোঝালেন, তুমি আমাকে ডিস্টার্ব করো।
আরে না। এ তুমি কী বলছ!
স্যার, আমার প্রেমে পড়ে গেলেন নাকি?
কী যে বলো। বয়স নেই।
প্রেমের আবার বয়স লাগে নাকি! মেয়েটি হাসতে থাকে উচ্চৈঃস্বরে। ফজল এই প্রথম তাকে হাসতে দেখল।
সে বলে, একটা কথা বলো, বাংলাদেশকে তুমি ভালোবাসো?
না স্যার।
পষ্ট জবাব মেয়েটির।
কেন?
ডাস্টবিনকে কে ভালোবাসে?
সেটা তো একটা দুর্ঘটনা।
বাংলাদেশ আমাকে কী দিয়েছে বলেন তো স্যার?
ফজল চমকে যায়। চুপসে যায়। তাই তো, এ-দেশ তাকে কী দিয়েছে! আচ্ছা ধরো, এ-দেশ থেকে তোমাকে কোনো উন্নত দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। তুমি যাবে?
হঠাৎ ও মুষড়ে পড়ল। মনে হলো কী যেন খুঁজছে।
এদিক-ওদিক চায়।
কী হলো বলো?
হঠাৎ মেয়েটা ফুঁপিয়ে উঠল। বললো, আমি ডাস্টবিনটাকে ভালোবাসি স্যার! তার দু-চোখ বেয়ে জলের ধারা। ফজল হকচকিয়ে যায়। সে মেয়েটিকে ভালো করে দেখতে পাচ্ছে না। তার চশমাটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গেছে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.