মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। শীতের শেষবেলার বিষাদমাখা সময়ে রত্নাবলীর তাই মনে হয়। এই অশ্রুজল, বুক মন্থন করা দীর্ঘশ্বাস – সব তো সৌমেনের জন্য।

একত্রিশ বছর আগে যার হাত ধরে শ্বশুরবাড়িতে এসেছিলেন, তিনি পৃথিবীর কোথাও নেই। রত্নাবলী শুনেছেন, আত্মা অবিনশ্বর, অজেয়, অমর।

রত্নার বুকের ভেতরে কলরোল জাগে – তাহলে কি তিনি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন? অনুভব করতে পারছেন আমার বুকের ভেতরের তীব্র হাহাকার? আমার চারপাশে কি ক্লাউড স্টর্ম ধেয়ে এসেছে। মেঘভাঙা বৃষ্টি বুঝি এমনই হয়। নেপাল আর পাকিস্তানের মুলতানে যে মেঘের ঝড় নেমে এসেছিল, রত্নাকে ঘিরে তেমনই যেন উত্তাল ঝড় নেমে এসেছে।

অবসর নেওয়ার পর সৌমেনের খুসখুসে কাশি হলো। এ আর এমন কী? যতই নিয়ম করে থাকো না কেন, অসুখ এসে জাপটে ধরবেই।

সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অবসর নিয়েছেন, রত্নাবলীরও চাকরির সময়সীমা ফুরিয়ে এসেছে। নির্বিবাদী পরিবার। মেয়ে পেখমের বিয়ে হয়েছে, স্বামী ইঞ্জিনিয়ার। অস্ট্রেলিয়ায় সেটল হয়েছে ওরা। ছেলে বুবাই ক্যালগেরি ভার্সিটিতে। বাড়িতে দুজন ছাড়া কেউ নেই। তবে অসুবিধা বিন্দুমাত্র নেই, দুজনেই সচল।

ব্যালকনিতে বসে চায়ের পেয়ালায় রেলিশ করে চুমুক দিয়ে সৌমেন ভাবেন, জীবন বড় আনন্দমাখা। রত্না মুখে কিছু না বললেও ছন্দময় জীবনটা বেশ উপভোগ করেন।

সাত সকালে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো তাড়া নেই। রিকশা, ক্যাব, অটো – এসবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছোটাছুটি করতে হয় না।

ভোরবেলা দুজনেই হাঁটতে বের হন, পার্কে চক্কর দিয়ে ঘাম ঝরিয়ে পাথরের বেঞ্চিতে বসেন। চেনাজানা অনেকের সঙ্গে কথা হয়, ভোরবেলা হাঁটার উছিলায় পরিচয় হয় অনেকের সঙ্গে।

বাড়ি ফিরে এসে ধীরেসুস্থে চা তৈরি করেন রত্না। বুবাইয়ের ফোন এলে বেশ খোশমেজাজে থাকেন সৌমেন। – চায়ে সুগার দিও না, ঠিক আছে – তবে দুধ দেবে কিন্তু। ছেলের সঙ্গে কথা বলেছি, একটু সেলিব্রেশন করি।

হ্যাঁ, দুজনের মনটা আজ ভালো। অদ্ভুত এই পৃথিবীর নিয়ম। আমাদের সকাল, ওদের সন্ধে। রেলিশ করে পেয়ালায় চুমুক দিতে গিয়ে কত কথা –

– বুবাই আমাদের কাছে থাকুক আমরা চেয়েছিলাম।

– সব কি আর নিজের ইচ্ছামতো হয়? অদৃশ্য এক করুণাময়ের ইচ্ছাতে পৃথিবীর মানুষগুলোর ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হয়। যাকে আমরা ঈশ্বর বলি।

রত্না উঠে দাঁড়ান।

এত উচ্চমাপের কথা শুনে কাজ নেই। রান্নাঘরে যেতে হবে।

এ-গল্পটি এক মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প, মা-বাবা, দুটি ছেলেমেয়ে। সৌমেন আর রত্নাবলী। মেয়ে পেখম – ডাকনাম খুকু, ছেলে পারিজাত – ডাকনাম বুবাই। ছোট পরিবার, সুখী পরিবার। আসলেই সুখ-শান্তিতে ভরা ছিল তাদের জীবন। স্নেহশীল বাবার আদুরে দুই ছেলেমেয়ে। মাকে একটু শাসন করতে হতো, কিন্তু অপার স্বপ্ন ছিল দুটি সন্তানকে ঘিরে।

মেয়ে বিয়ের পর অস্ট্রেলিয়া যায় স্বামীর ঘর করতে। এরপরও মাঝেমধ্যে আক্ষেপ করেন রত্না।

– কাছে থাকলে হুট করে চলে আসতে পারত, তা আর হলো না।

এ-পৃথিবীতে সবকিছু মেনে নিতে হয়। একমাত্র ছেলে পারিজাতকে নিয়ে শান্তিতে ছিলেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই উপলব্ধি করেছেন, ইনস্ট্যান্ট কফি, ইনস্ট্যান্ট নুডলসের মতো জীবন এত সরলরেখায় চলে না।

ক্যামারোল থেকে গরম রুটি প্লেটে দিতেই ছেলে বলল, আমার ক্লাসমেটরা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে মা।

চামচে তোলা পাঁচমিশালি সবজি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন রত্না। সেই দুঃসহ রাতের কথা আজো ভোলেননি। সৌমেন বলেন, সবে বিবিএ করেছ, এমবিএটা কমপ্লিট করো।

– এমবিএ, আমি কানাডার আলবার্টা ইউনিভার্সিটি, ক্যালগেরি ভার্সিটি, নয়তো ইংল্যান্ডের গ্রিনউইচয়েও পড়তে পারি। আশিক, অপু, রাজীব ওরা প্রিপারেশন শুরু করে দিয়েছে বাবা।

সুজির পায়েস খুব রেলিশ করে খেতে থাকে বুবাই।

মা-বাবাকে বলা হয়ে গেছে, এবার নিজেকে নির্ভার মনে হয় বুবাইয়ের।

আমরা একা হয়ে যাব, পাশে কেউ থাকবে না – এরকম অনুভূতিতে লোমকূপগুলো শিরশিরিয়ে ওঠে। সৌমেন বরাভয় দিলেন, এত ভাবনার কী আছে? জন্ম থেকে ওরা কম্পিউটার দেখেছে, ক্যালকুলেটর, মোবাইল ওদের সর্বক্ষণের সঙ্গী। বাধা দেওয়ার তুমি-আমি কে? ওরা শুনবেই বা কেন? এই প্রজন্ম তো ছুটতেই শিখেছে।

এরপর থেকেই যুগল জীবন। ভালোই হলো। সদ্য বিয়ের পরের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। রত্নার কলিগরা আসেন মাঝেমধ্যে। চায়ে চুমুক দিয়ে বলেন, কপোত-কপোতী যথা উচ্চবৃক্ষচূড়ে বাঁধে নীড়, থাকে সুখে।

সৌমেন শান্ত হেসে বলেন, হ্যাঁ সুখেই আছি, বলতে পারেন।

খুসখুসে কাশিটা হঠাৎ করেই জাপটে ধরে সৌমেনকে আদা-চা, মধু, তুলসী পাতার রস – এসব টোটকা চলতে থাকে। তবু সারে না কাশি।

রত্নার বুকের ভেতরে ভয় দানা বাঁধতে থাকে। মধ্যবিত্তের সংসারে নিয়ম করে হোল বডি চেকআপ কোনোদিন করা হয়নি। অসুখ হলে তবেই ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা।

কত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখন। রক্তে হিমোগ্লোবিন কম, ফ্যাটি লিভার। বুকের এক্স-রে, ইসিজি। পরীক্ষার তো শেষ নেই।

ডাক্তারের কাছে গেলে অ্যাসিন্ট্যান্ট একজন প্রেসার দেখল। ডাক্তার বলেন, প্রেসার তো খুব হাই। রত্না হালকাভাবে বলেন, আপনাদের চেম্বারে এলে আমাদের প্রেসার বেড়ে যায়। টেনশনে হয়তো। স্টেথিস্কোপ বুকে বসিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন।

– জোরে জোরে শ্বাস নিন, শ্বাস ছাড়ুন।

ডা. ইমতিয়াজের আঙুল থেকে ঠিকরে পড়ছে হিরের দ্যুতি। স্বাস্থ্য-সৌন্দর্যে ভরপুর ডাক্তারকে দেখে দুচোখ জুড়িয়ে যায়।

বুবাই চলে যাওয়ার পর থেকে স্বামী যে ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে গেছেন তা অনুভব করেছেন রত্না। তিনি নিজেও কি ভেঙে পড়েননি? দুর্বল শরীরে রোগ এসে বাসা বাঁধে। বুকের এক্স-রে করানো। কিন্তু সন্ধ্যা আটটায় রিপোর্ট আনবে কে? ইসস্ – ছেলেটা যদি আমাদের সঙ্গে থাকত। রাতে একেবারেই ঘুম আসে না রত্নার। সুস্থ-সবল মানুষটির হঠাৎ করে কী হয়ে গেল? ডাক্তারের পরামর্শে ভর্তি হতে হলো হাসপাতালে।

আচমকা শরীর খারাপ হতে থাকে সৌমেনের। ঘরবাড়ি থেকে ক্লিনিকে ছোটাছুটি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েন রত্না।

ছেলেমেয়ে দুজনে ফোন করে বলে, হঠাৎ কি হলো মা! বাবা তো ভালোই ছিল।

লাং ইনফেকশন! কন্ডিশন ভালো নয়। ডাক্তারের মুখ থেকে কথাটি শোনেন রত্না ভাবলেশহীন মুখে। পায়ের নিচে কেবিনের ঝকঝকে ফ্লোর যেন কেঁপে ওঠে। শিরদাঁড়ায় অসহনীয় বরফের ধারা বয়ে যায়। এ-পৃথিবীতে সুখ-শান্তি বড় দুর্লভ, ধেয়ে আসে শুধু জরা আর মৃত্যু।

প্রতিমুহূর্তে রত্না আশায় আশায় থাকেন, হয়তো বাবাকে দেখতে ছুটে আসবে ছেলে। প্রতীক্ষায় প্রতীক্ষায় দিন-রাত কেটে যায়। ছেলের ওপর বড্ড অভিমান হয়।

একা বিছানায় শুয়ে মোবাইলটা কাছে রাখেন। স্বামী একবার বলেছিলেন, বিদেশে তিনটে ড-এর কোনো ভরসা নেই।

– তিনটা W মানে?

– Work, Women, Weather.

এবার ভাবতে থাকেন রত্না – ছেলের কি কাজের কোনো সমস্যা হয়েছে? দেশে আসতে গেলে ভাড়ার জন্য অনেক ডলার গুনতে হয়। ছাঁটাই হয়নি তো বুবাই! কী জানি!

সারারাত স্বামী-সন্তানের ভাবনায় ঘুম হয় না এতটুকু। ভোরে উঠে এক পেয়ালা চা সবে নিয়েছেন, হাসপাতাল থেকে ফোন এলো – ৪৬নং বেডের রোগীর অবস্থা ভালো নয়। স্যালাইন চলছে, অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে।

কীভাবে ছুটে গেলেন রত্না নিজেও জানেন না। কেবিনের মাখনরঙা দেয়াল, গুটিকয় ওয়ার্ডবয়, নার্সের সামনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রধান মানুষটি নিঃশব্দে চলে গেলেন। রত্নাবলী নিঃসঙ্গ, ভাবনাই তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী।

প্রায় মধ্যবয়সে এসে কত নতুন নতুন কথা শিখেছেন রত্নাবলী। ছেলেমেয়েরা অমনোযোগী হলে, হোমওয়ার্ক না করলে, কিংবা ক্লাসের পড়া না শিখে এলে, তেমন কোনো শাস্তির কথা ভাবাই যায় না।

নিজের স্কুলজীবনের কথা ভাবতে গিয়ে হাসিও পায় এখন। নিলডাউন, স্ট্যান্ডআপ – বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে থাকো, পড়া শিখে আসোনি কেন? যাও – ক্লাসের বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো।

এ সমস্ত শাস্তিতে ভালো ফল পাওয়া যেত। স্কুলের সবাই আমাকে দেখছে, আমি পড়া শিখে আসিনি – তাই শাস্তি পেয়েছি।

কী লজ্জা, কী লজ্জা! আর এখন? দূর বোকা – নিজের ছেলেকেও নাকি এমন কথা বলা ঠিক নয়। এসব কথা নাকি child abuse-এর পর্যায়ে পড়ে।

মায়েরা মারবে, বকাঝকা করবে – তাদের সময় এ ছিল অলিখিত নিয়ম; বিণুনি ধরে টানা, হাতা-খুন্তি হাতে যা থাকত তা দিয়ে মা পিঠে বসিয়ে দিতেন। বকুনির ঝড় তো ছিলই।

খুকুকে মাঝেমধ্যেই ছোটখাটো কারণে শাসন করেছেন কিন্তু বুবাইকে তেমনভাবে কিছুই বলতে পারেনি। কত ভাবনার পর বুবাই-এর নাম দিয়েছেন পারিজাত – স্বর্গীয় ফুল।

অঙ্কে কম নম্বর পেলে কিংবা খেলা থেকে ফিরতে দেরি করলে রত্না মৃদু ধমক দিতেন।

মুখে কিছু বলত না, তবে ছেলে তেরছা চোখে তাকাত, যেন বুনো ষাঁড়। তাকে সেই কিশোরবেলা থেকে তেমনভাবে শাসন করা যায়নি।

সৌমেন ছিলেন স্নেহশীল পিতা। খুকু কিংবা বুবাইকে তিনি কড়া শাসন করেছেন – তেমনটি মনে পড়ে না। মেয়ে বরাবরই নরম স্বভাবের, তেমন করে প্রায় কিছুই বলতে হয়নি। তবে বুবাই স্কুল থেকে দেরি করে ফিরলে, খেলার মাঠ থেকে অনেকটা পর ফিরলে রত্না রেগে যেতেন।

– কখন সন্ধে হয়েছে, বুবাই? এতক্ষণে ফিরলি? কেন রে? ডর-ভয় কিছুই আর নেই দেখছি।

মায়ের দুশ্চিন্তা আর রাগকে তুড়ি দিয়ে এড়িয়ে বুবাই বলত। কী এমন দেরি হয়েছে – বলো তো। রাজীব, ববি, শুভ সবাই তো এখুনি ফিরল।

ছেলের প্রতিজবাব দেওয়া একদম পছন্দ করতেন না রত্না। নিজেও তো হাই স্কুলে পড়ান। এ-বয়সের ছেলেদের পালস কেমন হয়, তা তিনি কিছুটা হলেও বুঝতে পারেন।

সৌমেন স্ত্রীকে শান্ত করতেন এই বলে, কিশোর বয়স, আর

কিশোর-তারুণ্যের মাঝামাঝি সময়টা খুব স্পর্শকাতর হয়। সাবধানে ওদের হ্যান্ডেল করতে হয়।

এডোলেসন্ট পিরিয়ড কি রত্না জানেন না? খুব সন্তর্পণে একমাত্র ছেলে পারিজাতকে বড় করেছেন। মেয়ে একেবারেই অন্যরকম।

বাবার চিরকালের মতো চলে যাওয়ার খবর জেনে ফোনে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে খুকু, সান্ত্বনা দেন আত্মীয়স্বজন, চারতলার রাবেয়া আন্টি। ফোনে যতটুকু বলা যায়।

– কাঁদিস না রে পেখম। এ তো সংসারের নিয়ম। সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। কান্নাভাঙা গলায় খুকু জিজ্ঞেস করে, ভাইকে জানিয়েছ তো মা? হ্যাঁ হ্যাঁ মা, ঠিক আছে। ভাই তো আসবে, আমরাও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসব মা।

চারতলার রাবেয়া যখন-তখন এসে সঙ্গ দেন। দূরসম্পর্কের বোন ইস্কাটন থেকে এসেছে, সংসারের হাল ধরেছে সে।

রত্নাবলী ভাবেন, বিপদে সবাই সাহায্য-সহায়তা করছে, তা বলে নিজের আপনজন কেউ থাকবে না? দূরদেশ থেকে সংসারজীবন বা চাকরির জায়গায় সব গোছগাছ করে আসা তো সম্ভব নয়, তা বোঝেন রত্না। বুবাই যদি বলত নির্দিষ্ট কোন তারিখে সে আসছে, তবে নিশ্চয়ই বরফমোড়া করে স্বামীর শরীরটা রাখার ব্যবস্থা করতেন তিনি।

রত্নার বুকভাঙা শ্বাসবায়ু পাঁক খেতে থাকে।

সুবাই এমন নিশ্চয়তা দেয়নি বলে বরফে শীতল হয়নি মরদেহ। তাৎক্ষণিকভাবে শেষকৃত্য ও দাহ করা হয়েছে। মুখাগ্নি করেছে কাকুর ছেলে শৈবাল।

নৈঃশব্দ্যের কি ভয়ংকর বেদনা!

বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে নাভিমূল থেকে। পেখমের জন্মের ছয় বছর পর যখন পারিজাত এলো – শাশুড়ি বললেন, পুত্রসন্তান হলো অন্ধের যষ্ঠি।

রত্নাবলী শিক্ষিত ও আধুনিক। কোনো ব্যাপারে তার প্রেজুডিস নেই। একটু একটু করে বুবাই যখন বড় হচ্ছে তখন মনে হলো, শাশুড়ি কমলিনী পুরনো দিনের মানুষ হলেও তার কথাটি তো মিথ্যে নয়। মেয়ে বিয়ের পর পরের ঘরে চলে যাবে, ছেলে থাকবে সৌমেন আর তার কাছাকাছি।

সত্যিই তো, পুত্রসন্তান হলো পরিণত বয়সের ভরসা। যখন দুজনে রিটায়ার করবেন, বয়স বাড়তে থাকবে, শরীরের শক্তি-বল কমে আসবে – তখন হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাবে পুত্রসন্তান। এই তো চিরকালীন নিয়ম।

একাকিত্ব বুঝি নিয়ে আসে শুধু স্মৃতির বেদনা। দুজন রিটায়ার করার পর কী যে ছন্দময় ও আনন্দমাখা হয়ে উঠেছিল দুজনার জীবন। সৌমেনের আচমকা খুসখুসে কাশি, থেমে থেমে জ্বর মলিন করে তুলেছিল পরবর্তী দিনগুলো।

অনেকদিন পর সিনেমার স্লাইডের মতো ভেসে আসে হারিয়ে যাওয়া বাড়ির ফ্যাকাসে হয়ে আসা হলদে ছবি। বাবা-কাকা-ভাই-বোন – দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়স্বজন মিলে বিশাল একান্নবর্তী সংসার। ছোট-বড়-বয়স্ক কেউ রোগে কাতর হয়েছেন, বাড়ির সবাই মিলে আলোচনা করেছেন ডাক্তার কি চেঞ্জ করতে হবে? সিলেট কিংবা কুমিল্লায় নিয়ে গেলে কি ভালো চিকিৎসা হবে? এভাবে আলোচনা করে বড়রা সমাধানে এসেছেন। অসুস্থ মানুষটির জন্য মসলিনের ওড়নার মতো সবার মুখে থাকত বিষাদের ছায়া, সবাই যার যার নিজের মতো কাজ করেছেন। দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবন অতিক্রান্ত করতে গিয়ে মনে হয়েছে – পরিবারের সবাই একসঙ্গে রয়েছি, ভয় কিসের?

শোক-তাপের সব দুঃখ তো ভাগ হয়ে যাবে। রত্না তার মেয়েবেলায় বড়দের এমনভাবেই দেখেছেন।

আমি একেবারেই একা। বুকের ভেতরে অন্য এক রত্নাবলী কথা বলে। এ-পৃথিবীতে সবাই একা।

কে একলা নয়?

মাতৃজঠর থেকে জন্ম নেওয়া সন্তান, মায়ের বুকের কাছে থাকা একান্ত এক মানবশিশু। সেও এই দুঃসময়ে রয়েছে কানাডার টরন্টোতে।

বেডরুমে শুয়ে আছেন তিনজন মহিলা। রত্নার চুলে আদুরে হাতে বিলি কেটে দিতে দিতে রাবেয়া মৃদু সুরে জিজ্ঞেস করেন, ঘুমোলে রত্না?

– না রাবুপা, ঘুম আসছে না।

– ঘুমোতে চেষ্টা করো, নয়তো শরীর খারাপ করবে। জা সুদর্শনা বলে,

দু-চারদিনের ভেতর খুকু চলে আসবে। এত ভাবছ কেন দিদি? যা বাবা-অন্তঃপ্রাণ ছিল খুকু।

দুজনার সান্ত্বনাবাক্যেও ঘুম আসে না তার ‘একা, একা’ – দুটি শব্দে গড়া অক্ষরগুলো আলপিনের মতো হৃদপিণ্ডে যেন ঘা দিতে থাকে।

পরমুহূর্তে রত্না ভাবেন – একা কে নয়? নয়াপল্টনের ‘মমতাজ মহল’ বিল্ডিংয়ের ফ্ল্যাটে সুরাইয়া একা তাকে। ওর দুটি ছেলে বাইরে থাকে। আগের একান্নবর্তী পরিবার আর নেই। ঋতুবউদি, শিরিন ভাবি সবাই একা। ওদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে সেটেলড – এমনভাবে গড়ে উঠেছে নতুন সংসারের ভিত।

শেষ রাতের বুক চিরে মোবাইল বাজে। পেখমের গলা।

– কাকিমণি, আমি খুকু। কাল সকালেই আমরা রওনা হচ্ছি।

এ-আনন্দসংবাদে দুচোখ অশ্রুজলে ভরে যায় রত্নার। বুকের ভেতরে ধ্বনিত হতে থাকে, মেয়ে আসছে, আমার আত্মজা আসছে।

প্রতিবেশী বলতে এখন আর কিছুই নেই। এই কনসেপ্ট বদলে গেছে এখন। নেক্সট ডোর নেইবার – ঘরের গা-লাগোয়া প্রতিবেশীরা সুখ-দুঃখে এখন আর খবর নেয় না। এতগুলো ফ্ল্যাটের মাঝে শুধু রাবু আপার সহমর্মিতা বোধ রয়েছে।

চেনাজানা যারা খোঁজখবর নিতে আসেন, তারা কিছু সৌজন্যকথা ও সৌমেনের শোক জ্ঞাপনের পর একেবারে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে চলে আসেন।

– পেখম কবে আসবে রত্নাদি? আর পারিজাত? দু-তিন বছর হয়ে গেল একবারও এলো না।

কেউ বলেন, বছরে একবার এসে মা-বাবাকে দেখে যাবে না? হোয়াট আ মিরাকল। সুদর্শনা মৃদু গলায় বাধা দিতে গেলে অফিস কলিগ একজন বলে ওঠেন, না না – কথা বলতে দিন। রবিউলের ঘটনা তো জানেন। ওর ওয়াইফ মারা গেছে কিছুদিন আগে। ওর ছেলের ঘটনা শুনবেন!

– কে রবিউল? কী করেছে ছেলে?

– আরে বসকরাইলের রবিউল। ও এখন একা বাসায়। ছেলে রওশন বউকে নিয়ে ধানমন্ডিতে থাকে। কেউ একজন বলল, ছেলের অফিস বোধহয় কাছে। শোক জ্ঞাপন করতে আসা মানুষটি বলেন, হ্যাং ইয়োর অফিস। আব্বার জন্য কি এইটুকু স্যাক্রিফাইস করা যায় না? সুদর্শন চা নিয়ে এলে উত্তেজিত কথায় ছেদ পড়ে।

– এই শোকের বাড়িতে এসব আবার কেন? বিস্কিটের প্লেট এগিয়ে দিয়ে রাবেয়া বলেন, তাতে কী হয়েছে? একজনের চলে যাওয়াতে দুনিয়া তো আর থেমে থাকে না। সবই স্বাভাবিক হয়ে আসে, এর নাম সংসার।

– আপনি ঠিক বলেছেন। মানুষ চলে যায়, সংসার আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে। এমন না হলে পৃথিবী থমকে যেত।

সৌমেনের ছোট ভাই শৈবাল বলে, পেখম ৬ তারিখের ফ্লাইটে আসছে। কেউ একজন বললেন, বাহ্, রত্না বউদি অনেকটা শান্তি পাবেন।

পাশের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোক বলেন, আমার দুই মেয়ে। আমি বলি, ছেলের আর দরকার নেই আমার। মেয়েরা ছেলেদের মতো heartless হয়নি।

– মোটেও তা নয়। সুদর্শনা বলে, ছেলেমেয়ে দুজনের ইহৃদয় থাকে, কেউই হৃদয়হীন নয়।

বেলা বেড়ে যাওয়ায় সমবেদনা জানাতে আসা কলিগ ও কাছাকাছি থাকা মানুষরা উঠে দাঁড়ান।

– বেলা হয়ে গেল, এখন আসি তাহলে। কোনো কিছু প্রয়োজন হলে ফোন করবেন। ভালো থাকবেন আপনি। দেড় হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটটি হেসে ওঠে নতুন করে। পেখম এসেছে, সঙ্গে জামাই রবীন – আর এসেছে ওদের ছোট্ট মেয়ে ডল।

কী আনন্দ!

শোকমাখা দেড় হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে ডালা ভরে কেউ যেন ছড়িয়ে দিলো সুগন্ধি ফুল। পেখম মায়ের গলা জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। পাথরের মতো স্থির হয়ে থাকা রত্নাবলীর দুচোখে নামে অবিরল অশ্রুধারা।

রাবেয়া বলেন, তোমরা এসে গেছো, আর ভাবনা নেই খুকু। মায়ের পাশে থাকবে, কথা বলবে – মায়েরা তো এইটুকুনই চায়।

সুদর্শনা চা করে দিলো, ভাতের হাঁড়িতে ফুটছে বাসমতী চাল। জামাই এসেছে বাড়িতে, ওর যেন অনাদর না হয়।

স্বাভাবিক হয়ে এলো ইস্কাটন রোডের তিনতলা ফ্ল্যাটের মানুষদের জীবনযাপন। প্রখর রোদে সেঁকা পোড়া হয়ে থাকা টিনের চালের মতো রত্নার বুকের ভেতরটায় মেয়ে যেন নিয়ে এসেছে অকাল বর্ষার মতো বৃষ্টির দানা, পোড়া বুকের ভেতরটা তার শীতল হয়ে আসে।

দেখা করতে যে আসে সে-ই জিজ্ঞেস করে,

– ছেলে কবে আসবে?

– পেখম তো এসে গেছে, পারিজাতের টিকিট কি কনফার্ম হয়ে গেছে?

খুকু মোবাইলে জিজ্ঞেস করে, আমি এসে গেছি ভাই। তুই কবে আসবি রে?

– আসব, আসব।

রত্না ভাবেন, যার যাওয়ার সময় হয়েছে, সে তো চলে গেছে। বুবাই চলে এলে জমজমাট হযে উঠবে তার বিষণ্ন সংসার।

ভাইয়ের দুষ্টুমি, মজার মজার সব প্রশ্ন, উদ্ভট কাণ্ডকারখানা বলতে থাকে পেখম। না-দেখা মামুর কথা চুপটি করে বসে শোনে ডল। মাসি রুবি বোনঝির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।

– একবার কী হয়েছে জানো রাবু আন্টি। ভাইয়ের জ্বর, ভাত খেতে চাইছে না। মা ওকে মুরগির স্যুপ খাওয়াচ্ছে। বুবাই চুপটি করে খাচ্ছে।

মা জিজ্ঞেস করল, এত ভাবছিস কি রে – ও কি জবাব দিলো জানো আন্টি! আমি তো মুরগির স্যুপ খাচ্ছি, মুরগির জ্বর হলে ও কিসের স্যুপ খাবে মা।

হাসির রোল পড়ে ঘরে।

সুদর্শনা বলেন, এখন একেবারে চুপচাপ হয়ে গেছে। বড় হয়েছে তো।

রত্না বলেন, ওর কাণ্ডের শেষ নেই রাবুপা। একবার অংক খাতা নিয়ে এলো, ও পেয়েছে পঞ্চাশ। অংক একেবারে করতে চাইত না, স্থির হয়ে বসত না এক জায়গায়। রুবি তুমি তো ওকে ভালোই জানো।

– কোন ক্লাসে পড়ত তখন?

– ক্লাস ওয়ান, রত্না বলতে থাকেন, আমার কাছে ফিফটি প্রায় লেটার নম্বর। দারুণ খুশি আমি। পেখম বলে, মা জিজ্ঞেস করে হঠাৎ – তোর টিচারের হাতের লেখা এত খারাপ কেন রে? এত কাঁচা লেখা, ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে ভাই বলল, টিচারের লেখা নয় মা, ও তো আমার হাতের লেখা। মা তো রেগেমেগে শার্টের কলার চেপে ধরেছে।

– কোন লেখাটা তোর? বল বল শিগগির –

– জিরোটা টিচারের, ফাইভটা শুধু আমার। সবার হাসির মাঝে পেখম বলে, ভাই কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, আমি তো সিক্স সেভেন এইট নাইন লিখিনি, শুধু ফাইভ লিখেছি, – এত রাগ করছ কেন?

দিন কেটে যায় মধুর স্মৃতির গল্পে। বাড়ির মেয়ে ফিরে এসেছে দূরদেশ থেকে, এবার ছেলে ফিরবে। অন্তহীন এই প্রতীক্ষার নাম হলো অপত্য স্নেহ।

এবার মায়ের শুধু ফোনের রিংটোন কানে বাজে। আমার বুবাই আসবে, পারিজাত আসবে, আমার দাদুভাই আসবে।

– ফোন এসেছে রে খুকু, বুবাই করেছে বুঝি। রবীন বলে, বুবাই এলে বেশ হতো। তাই না রুবি মাসি?

সবাই কাছাকাছি থাকুক, সৌমেন তাই চাইতেন। খুকুর বিয়ের পর ভেবেছেন, ছেলেটা কাছে থাকবে – এই তো ভরসা। মানুষ যা ভাবে, তাই কি আর হয়?

প্রতীক্ষায় থেকে ক্লান্ত হয়ে গেছেন রত্না। বুবাই শুধু আসবে আসবে বলছে, কবে আসবে ডেফিনিট তারিখ জানাবে না? বউমা দোলা, নাতি ঋক – ওদের দেখতে বড্ড ইচ্ছে করে।

নাতির বয়স প্রায় তিন বছর হলো – ওকে দেখেননি। স্কাইপেতে ঋককে দেখা শুধু। ও ঠাম্মিকে শুধু দূরে থেকে দেখে, ঠাম্মি একদিনও ওকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারলেন না। এই আক্ষেপ শুধু মায়ের নয়, বাবারও ছিল।

রত্নার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে রবীন বলে,

– মন খারাপ করবেন না মা। টরন্টোতে আছে, ভালোই তো। রবিঠাকুরের ভাষায় যদি বলি –

আপন বাহিরে মেল চোখ –

সেইখানে অনন্ত আলোক।

পেখম বলে, মায়ের মন এই কবিতায় কি শান্ত হবে? বাবা চলে গেলেন, মুখাগ্নি হলো, পারলৌকিক হলো – ভাই তো কিছুই করল না।

সৌমেন মাঝে মাঝে আকুল প্রশ্ন করেছেন,

– তুই আসবি না রে বুবাই? তিন বছর হয়ে গেল তোকে দেখি না। দাদুভাইকে একবার দেখব না? সেই বিয়ে করতে একবার এলি।

– ভিডিও কলে দেখতে পাচ্ছো তো আমাদের।

– তাতে কি আর মন ভরে রে।

মোবাইল অফ করে দুজন বোবা প্রাণীর মতো বসে থেকেছেন অনেকক্ষণ। স্মৃতি যেন সহস্র হিরের বাতি হয়ে জ্বলজ্বল করে রত্নার পাণ্ডুর চোখে। বিদেশে থাকুক। রত্না কত স্বপ্ন দেখেছেন, অদৃশ্য তুলি দিয়ে মেয়ের সংসার সুচারুভাবে সাজিয়েছেন। কিন্তু কী হলো? নিয়তি যেন রবীনের মতো জামাইকে কাছে এনেছিল।

স্বরচিত সান্ত্বনায় দুজনে ভেবেছেন, মেয়ে পরের ঘরে যাবেই। চিরকাল তো কাছাকাছি রাখা যাবে না। পারিজাতকে নিজেদের কাছেই রাখবেন। যত একগুঁয়ে স্বভাবের হোক। গরম পড়লে মাকে কখন দেখেছে কিচেনে কাজ করতে করতে হাঁসফাঁস করছেন তখন বলত, – মা, কিচেন থেকে বের হয়ে এসো তো, কী ঘামছ তুমি।

আগামী দিনের কথা ভেবে মৃদু হাসতেন তিনি। মাতৃস্নেহের বন্ধন ডোর ছেড়ে বুবাই দূরদেশে যাবে না।

সুস্থ থাকাকালীন কিংবা অসুখের সময় আহাজারি করতেন সৌমেন, – এভাবে একা থাকতে হবে, কখনো ভাবিনি তো রত্না। তিনটে বছর হয়ে গেল বুবাই আসে না। নাতিটাকে দেখতে পারিনি।

দুজনের মনে আক্ষেপ ছিল এ নিয়ে। সন্তানের সঙ্গে কি সম্পর্কে এমন শ্যাওলা পড়ে? না হলে মা-বাবার সঙ্গে ঘন হয়ে থাকা সন্তান কি পিতৃবিয়োগে না এসে পারে?

সে কি কালের প্রবাহে?

সকালবেলা চায়ে চুমুক দিয়ে রবীন বলে, রাতে বুবাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে মা। আসবে বলেছে কিন্তু ডেফিনিট কোনো ডেট দেয়নি।

রত্না চুপ করে রইলেন।

ভাইব্রেশনে কেঁপে ওঠে মোবাইল। নিশ্চয়ই বুবাই। এখন সন্ধ্যারাত।

আকুল প্রশ্ন করে পেখম, – কবে আসবি রে বুবাই?

– অফকোর্স আসব।

খুশিতে ঝলমল করে ওঠে পেখমের পানপাতার মতো মুখ।

– কবে আসবি বল? ডেটটা বল নারে, এয়ারপোর্টে রবীনদা তোকে আনতে যাবে। কনফার্ম ডেট বল।

– ওকে। শুনতে পাচ্ছিস দিদি? বেসিনেট না হলে ঋককে নিয়ে আসা কি সম্ভব – তুই বল দিদি।

– কেন, আমরা ডলকে নিয়ে আসিনি? কবে আসবি তুই, ঠিক করে বল। বাবা চলে গেলেন, মায়ের কী অবস্থা একবার কাছে এসে দেখে যা।

– আরে বাবা, আমি কি আসব না বলেছি? মাকে শুধু তুই-ই ভালোবাসিস, আমি বাসি না?

শীতের রোদ কড়া হতে থাকে। আসন্ন দুপুরের দিকে তাকিয়ে খরখরে হয়ে ওঠে রত্নার চোখদুটি।

মা কি শুধু গর্ভধারণের আঁধার? মা-বাবা! কী শূন্যগর্ভ এ দুটি শব্দ! দেড় হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটটি খাঁ-খাঁ করে। নিজেকে বড় নিঃস্ব, একাকী আর মূল্যহীন মনে হতে থাকে।

ওর চলে যাওয়ার ঝড়ো দিনগুলোর কথা মনে পড়তে থাকে। বিবিএ পরীক্ষা দেওয়ার পর শুরু হলো ওর বন্ধুদের খবর মা-বাবাকে জানানো।

– আশিক-অনীক আর সাকিব কিন্তু সামনের মাসে চলে যাচ্ছে। মা। শুনতে পাচ্ছ? ওরা কেউ দেশে থাকবে না।

সৌমেন বলেছেন, ওরা যাবে যাক। তুমি বায়োডাটা তৈরি করো বুবাই।

রত্না বলেছে, তুমি চলে গেলে আমরা তো একা হয়ে যাব রে। বুবাই জবাব দিয়েছে, তোমরা এমন করে কথা বলো কেন মা? সাকিব, আশিক, রাজীব সবারই তো মা-বাবা রয়েছে। আমি বছরে একবার-দুবার আসব। দেখতে দেখতে দিন চলে যাবে। কানাডাতে সেটল হয়ে গেলে তোমাদেরও নিয়ে যাব।

বন্ধুদের কেউ যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে, কেউ যাচ্ছে জার্মানির বার্লিন শহরে, কেউবা ইংল্যান্ডে।

প্রতিবেশী নোমান সাহেব বলেন, রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা আছে না –

সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী –

রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি।

আমাদের সন্তানরা সব মানুষ হতে যাচ্ছে তো। নোমান সাহেবের একটি মাত্র সন্তান রোহান। সে সুইডেনে আছে, সেটল করেছে। একা একা তার দিন এভাবেই কেটে যায়। বুকভরা তার জ্বালা, তাই এভাবেই ব্যঙ্গ করে

ক্ষোভে-দুঃখে কথা বলেন তিনি।

স্বামী যখন বেঁচে ছিলেন – সেই সময়ের কথা। রবীন কয়েকটা দিন পর চলে যাবে। পেখম ডলকে নিয়ে দেড় মাসের মতো থাকবে, তারপর ওকে যেতেই হবে। এরপর থেকে মা একেবারেই একা। হ্যাঁ – রাবু আন্টি খোঁজখবর নেবেন, কিন্তু তারও তো বয়স হয়েছে। শৈবাল কাকু আর সুদর্শনা কাকিমা কাকরাইল থেকে মাঝেমধ্যে আসবেন। কিন্তু সার্বক্ষণিকভাবে মাকে দেখার তো কেউ নেই। ভাই এলে দুজনে কথাবার্তা বলে একটা ব্যবস্থা করা যেত। সুদর্শনা কাকিমা, রুবিমাসি ওদেরও তো সংসার রয়েছে।

পেখমের বুকের ভেতর একরাশ ক্রোধ ফেনিয়ে উঠতে থাকে। এত দায়িত্বজ্ঞানহীন কি মানুষ হতে পারে? ব্যালকনিতে বসে পেখম গুনগুন করে, ভাই এত পাল্টে গেল কেন মা? এত চেঞ্জ হয় মানুষের?

অসহায়ের মতো মেয়ের মুখের দিকে তাকান তিনি। শুধু ভাই কেন –

এ-পৃথিবীর সবকিছু কি আগের মতো রয়েছে? রত্নাবলীর

শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের দিনগুলো ছিল একেবারেই অন্যরকম। ভীষণ রকমের আলাদা।

সত্যিই তো নদী বাঁক বদলায়, সময় পাল্টে যায়। তারপরও তাদের ছোটবেলায় স্বপ্নের ঘোরে সময় কেটেছে। নতুন বছরে প্রথম গাঁয়ে গেলে কী আনন্দ! অনেকখানি জায়গা জুড়ে মেলা বসত। ছোটরা দোকান থেকে কিনত লাল-নীল-হলুদ রংকরা লেবেনচুষ, চিনি-গুড় দিয়ে বানানো ছাঁচের

হাতি-পাখি-ফুল। এখন মহকুমা-জেলা শহর-ঢাকায়ও মেলা বসে। কিন্তু সেই ভালো লাগার আমেজ কি আর আছে? এখন অনলাইনে খাবার কিনতেই ওরা আনন্দ পায়।

মায়ের জবাব না পেয়ে মেয়ে বলে, বুবাই বরাবরই সেলফিশ মা।

ভাবনায় ডোবা মেয়ের কথার কী জবাব দেবেন রত্না?

ক্ষোভ-মাখানো গলার স্বর পেখমের।

– ওকে আমি টয়লেটে নিয়ে গেছি, হোমওয়ার্ক কমপ্লিট করে দিয়েছি – ওসব ভাই কি করে ভুলে গেল মা?

খুকুর কথা মন দিয়ে শোনেন কিন্তু কিছুই বলেন না। তিনি ভাবতে থাকেন, এই স্বার্থপরতা, হৃদয়হীনতা কী করে জন্ম নিল সন্তানের ভেতরে? রত্নার লালন-পালনে কি ত্রুটি ছিল?

বাবা চলে গেছেন – এই ধাক্কাটা মা কি করে সামলাবেন – এ-ভাবনাটা কি এক মুহূর্তের জন্যও তার হৃদয়টাকে রক্তাক্ত করেনি?

– নাড়িছেঁড়া ধনের সঙ্গে বিচ্ছেদের কী অপার জ্বালা – রত্না ছাড়া কে আর বুঝবে?

স্বামী বিয়োগের দুঃখের মাঝেও দূরদেশে থাকা সন্তানের জন্য অদ্ভুত মায়া জাগে তার। এমন কেন হয়?

দুপুরে খাবার পর মায়ের পাশে পেখম শুয়ে আছে ডলকে নিয়ে।

ডল আধো আধো সুরে বলছে, মামু আসবে, মামু আসবে। রত্না বলেন, ঘুমোলি খুকু –

– না মা।

– এই ব্যাসিনেট জিনিসটা কী রে?

– সে তো তুমি ভালো জানো মা। স্কুলে ইংরেজি পড়িয়েছ। এটা দোলনা।

– আমিও ভাই ভাবছি, প্লেনে ওই দোলনার কী দরকার?

ঘুমোবে কি পেখম উঠে বসে।

– আমি ডলকে নিয়ে আসিনি মা? আমরা তো কোলে করে এনেছি। ঋকের জন্য ব্যাসিনেট (bassinet) লাগবে কেন? তুমি ঘুমোও তো মা। ভাইয়ের কথা ভেবো না। যত দুঃখ হোক মা, বেঁচে থাকতে হবে। সবই করতে হবে। বাবা চলে গেছেন বলে পৃথিবী তো থেমে থাকবে না।

ব্যাসিনেট আহামরি কিছু নয়। বাচ্চার দোলনা বা ঠেলাগাড়িও বলা যায়। শুধু একটি তুচ্ছ জিনিসের কারণে সদ্য স্বামী হারানো মাকে দেখা বা

মৃত্যু-পরবর্তী নানা সামাজিক ক্রিয়াকর্ম সব বাতিল হয়ে গেল?

পেখম অনেক কর্তব্যকর্ম করেছে। রত্না-রবীনকেও বিজনেস ক্লাসে নিয়ে গেছে অস্ট্রেলিয়ায়। শেষ বয়সে স্মৃতির ঝাঁপি যেন উপচে পড়ছে। স্বামী আর নিজে – দুজনে মিলে কী আনন্দ করেছেন – ভাবতেও ভালো লাগে। মেয়ের বাড়িতে অভাবনীয় আনন্দে দিন কেটেছে দুজনের। অবসর নিয়েছেন, কোনো পিছুটানও নেই।

এক মনোরম বিকেলে স্কাইবারদের সঙ্গে পেখমের রাস্তায় দেখা। সঙ্গে রত্না, সৌমেন একটু পিছিয়ে পড়েছেন। দানিয়েলা, জ্যানেট, পামেলা, ক্লারা সমস্বরে ‘হাই পেখাম’ বলে উল্লসিত হয়ে ওঠে। সবার হাতে শিকলে বাঁধা পেট ডগ। ওদের পেডিগ্রি নাকি খুব ভালো, উঁচু বংশের কুকুর।

রত্না হাত বাড়িয়ে দিয়ে আদরমাখা সুরে বলেছিলেন, হাউ ডু ইউ ডু বেবি, হাই বেবি – ওহ্ সো সুইট।

অনেক অজানা অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন। মেয়েজামাইয়ের আদর-যত্ন, কত কিছু কেনাকাটা ডলের সঙ্গে আদরে-আহ্লাদে সময় কাটানো – অগুনতি মধুর স্মৃতি বহুদিন আনন্দ দিয়েছে দুজনকে।

বুবাই কোনোদিনও উৎসাহ নিয়ে বলেনি টরন্টোতে যেতে। তিন বছর আগে একবার এসেছিল, এরপর থেকে ফোনে যোগাযোগ রেখেছে। কত দেখতে ইচ্ছে করে ওকে। বউমা দোলার সঙ্গে তেমনভাবে আলাপ-পরিচয় হলো না। নতুন বউকে নিয়ে গেছে, এরপর হলো ঋকের জন্ম। ভাবতে অবাক লাগে, ছোট বয়স থেকে মাকে ছাড়া ছেলের চলত না। মেঘ ডাকলে সে ভয় পেত, বিদ্যুৎ চমকালে ছুটে আসত, মা-বাবা কিংবা দিদির কাছে।

শোকের বাড়িতে চেনাজানা মানুষের খোঁজখবর নেওয়া। পুরনো প্রথার মতো। এসেই প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে বিব্রত করা।

– ছেলে আসেনি এখনো?

– বুবাই কবে আসবে?

– অনেকদিন দেখি না ওদের।

এমনধারা কথাবার্তার জবাব দিতে হয় রত্না ও পেখমকে। কত অস্বস্তিতে যে পড়তে হয়।

কিছুটা বিরক্ত হয়ে পেখম মাকে বলেছে, এত ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে গেস্টরা। বিদেশে কিন্তু পারসোনাল ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামায় না।

রত্না অসহায় স্বরে বলেন, হতে পারে খুকু। আমাদের দেশে কৌতূহল বেশি, জানতে ওদের আগ্রহ হয়, তাই জিজ্ঞেস করে। এসব মেনে নিতেই হবে।

– আমাদের যে কত বিব্রত হতে হয় মা। তা ঠিক। তবে খুকুর জন্মের পর দ্বিতীয়বার মা হওয়ার মনোরম সেই দিনগুলো! উফ্ফ্, ভাবলে এখনো শিহরণ জাগে।

শাশুড়িমা মুখভরা হাসি নিয়ে বলেছেন, আমার দাদুভাই আসছে।

ভরন্ত পেটে রত্নাবলীকে জানান দিয়ে যেত ছোট দুটি মাংসল অংশের পদাঘাত। কি মিষ্টি! কি শিহরণ!

দু-চার দিন পর হঠাৎ করে অনুভব করল রত্না, ছোট্ট নরম দু-পায়ের লাথি আর অনুভব করছে না। তবে কি অ্যাবনরমাল কিছু হলো? বেবিটা ঠিক আছে তো!

নামী গাইনোকোলজিস্টের কাছে নিয়ে গেলেন সৌমেন। ক্রিকেট বলের মতো শক্ত মুখে ডাক্তার বলেন, এমন হবে কেন? সাত মাসের বেবির তো মুভ করার কথা।

আলট্রাসনোগ্রাম করার পর বোঝা গেল সব ঠিকঠাক আছে, কোনো অসুবিধে নেই।

সেদিন ছোট্ট একটি মাংসপিণ্ডের পদাঘাতের জন্য আকুল হয়ে উঠেছিলেন রত্না। আজ মনে হয়, সন্তানের হৃদয়হীন ব্যবহার, সেও তো পদাঘাতের মতো। বাবার হঠাৎ করে চলে যাওয়া, মায়ের দুঃসহ দিন কাটানো যদি সন্তানের হৃদয়ে কোনো করুণ তরঙ্গ না তোলে – সে তো সজোরে পদাঘাতের শামিল।

একান্নবর্তী পরিবারের অংশ হয়ে থাকা সে তো এখন সোনার পাথরবাটির মতো ভাবনা। এই হৃদয়হীনতা – এ কি কালের প্রবাহে?

নদী যেমন সমুদ্রে মিশতে ছুটে যায়, পেছন ফিরে তাকায় না, আধুনিক যুগের সন্তানরা বুঝি মায়া-মমতা-ভালোবাসা-স্নেহ সব পিছুটান ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। দূরদেশে গড়ে তুলছে ভালোবাসাবিবর্জিত নতুন পৃথিবী।

ওরা কি পরিযায়ী পাখির মতো? কিন্তু ওরা তাও নয়। খাবার ও নিরাপদ আবাসের খোঁজে ওরা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে চলে যায়। ঋতু শেষে আবার ওরা ফিরে আসে নিজ আবাসে।

ওরা তো তেমনভাবে আর ফিরে আসে না। বন্ধ্যা নারীর একটি দুঃখ, তিনি সন্তানহীন। কিন্তু মায়ের জঠর থেকে জন্ম নেওয়া সন্তান – যে পরিবারের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হয় না, মায়ের জ্বালা যে সীমাহীন।

পেখমের বলা হার্টলেস, সেলফিশ – এ দুটি শব্দে বিষাদমাখা শীতের রাতে রত্নার বুকের ভেতরে সব খোয়ানোর বৃত্ত তৈরি হতে থাকে।

এরপরও তার মনে হয়, এ যে এক দুরন্ত সময়। ছুটে যাওয়া, শুধুই ছুটে যাওয়া। যখন-তখন ওরা দু-হাতের আঙুলের ছোঁয়ায় হৃদয়-চিহ্ন বানাতে পারে। মমতা প্রেম-ভালোবাসা আছে বলেই তো এমন হয়।

তাই তো রত্না অনেক স্মৃতিভার নিয়ে জেগে থাকেন সন্তানের ফেরার আশায়। অন্তহীন এই পথ চাওয়ার নাম সন্তানস্নেহ।

কেউ এই অনিশ্চিত জীবনযাপনে ওদেরকে সমর্পণ করেনি, কালের প্রবাহে ওরা সমর্পিত।