জলঢাকা চেনেন? বাহের দেশ। সেই দেশে মাঘের শীত, বাঘেও ডরায়! কুয়াশায় নেড়িকুত্তাগুলা কেমন কাঁই-কুঁই করে গো। গাছসকল ঝিমায় সেজদায়। খালি নাদের ব্যাপারী গেঞ্জি গায়ে, ধুধু চান্দি বান্ধে নতুন গামছায়। হাঁড়ি বান্দে খাজুর গাছে। সুয্য তখনো ঘুমে। …
ঝিনুক দুই হাতের দশ আঙুলে কুয়াশা হটায়া দৌড় ধরে। বালিকা উড়াল পাখি – দুই কচি ডানায় বেশুমার আনন্দ। দে ছুট – দে ছুট –
চারদিক খোলা হাওয়ার খেলা – উপুড় হয়া আছে গোটা আকাশখান। হাতের নরম ডানায় নাচের ঢেউ খেলে। মিহি গীতের সুর। আরে সাব্বাস! এই গেদির রক্তে ফড়িংয়ের নাচন। গলায় পক্ষীর সুর ঝরে –
গুড় চাচা ছোট্ট হাতের তালুর উপর এক আঁজলা মিঠা রস টুপটুপাইয়া ঢালে। কী নেয়ামত, কী তার ঘেরান! ছোট শরীরে জারকাঁটা। তবু লেবেনচুষের কায়দায় আঙুল চোষে একরত্তি এক রঙিন পাখি। আবার ঘরমুখী ছুট – ছুট –
জলার ধারের আতা, বান্দরলাঠি গাছগাছালির আব্রু ঢাকা চারচালা ঘরের উঠানে ল্যাটকা মেরে বসে পড়ে ও, কুট্টি ঝিনুক। একটা টুকটুকা ঘাসফড়িং।
‘এই বিহানবেলায় কই গেছিলি? ডাঙর হইতাছিস, নাকি আরো গেদি হইতাছিস ঝিনু। তোর কপালে কী আছে মাবুদ জানে।’
মায়ের নোনতা গালমন্দ জিগাগাছের মাথায় গোত্তা খায়া কপ্পুর। মিটমিটে হাসি ওর ঠোঁটের আগায়।
মা-বাপের বাড়ি ছিল মুলাডুলি। জবানে সেহেতু বাহের দ্যাশের টান নাই।
মা পিয়ারি বানু লাকড়ির চুলায় ইয়া ভোমা ভোমা চিতুই ভাজে। বাপধন কামেল রডমিস্ত্রি। কামাই-রোজগার মন্দ না। দেমাকও তেমন।
ঝিনুক ইঁচড়েপাকনা হয়ে উঠছে দিনে দিনে। বাপের নামে যে আকথা-কুকথা বাতাসে আনাগোনা করে, সে শোনে, সুই ফোটায় রে। তার বাপধন এমুন ক্যা?
মায়ের সঙ্গে এ বিষয়ে মিল হয় না তার।
‘তোমার মন-মিজাজ এমুন ক্যা কও তো মা? ফকিন্নিরা তোমারে কটুকথা কয়া যায়। বাপরে কিছু কও না।’
পিয়ারি বিবি পানির তলায় সাঁতরায়, ঘর-সংসারের চাক্কা ঘুরায়। … খালি পানসা হাসি, ব্যাক্কল সুরুতে ভাসে।
গলা তুলে কথা কইলে তিন তালাক, বাইন তালাক। সেইটা বিয়ার বছর থেকাই ধেয়ানে আনছে পিয়ারি। তালাকনামা মাথায় নিয়া কোন গাছতলায় জিন্দেগি কাটাবে অপয়া! বাপের ভিটা তো আগুনের কড়াইডা। ভাইবউরা মুথা ঝাঁটা হাতে খাড়া। চোখ বুজলে এই বায়োস্কোপ দেখা যায়!
ড্যাক ভরা আউশ আমনের বলক। রুহিত, শোলের আঁশ ছাড়াতে বসা লাগে মাঝেমধ্যে। পিয়ারি বঁটি গুঁতায়, বিনবিন করে কান্দে! শোনে শুধু বঁটিটা আর সে। …
ধলু মিস্ত্রি ঢলানি মালতি, বানেছার সুতায় বান্দা বান্দর এক।
ডবকা সুন্দর মেয়ামানুষ। পাঞ্জু ঘোষের আমৃত্তি, শরবতে কেরু নিয়া গহন গন্তব্যে ধলু মিয়া হাঁটা ধরে। লাট বাহাদুর যেন বা কোন মুল্লুকের।
পাড়া-পড়শির থুতুর ছিটা, ছেনির কোপ পিয়ারির নাদান বক্ষে।
পরনারী মালতির ঘরে ইলিশ, গরুর গোশতের সোয়াদ জিব্বায়, আচমকা ধলু মিয়ার গোঙানি! চক্ষুর পলকে সব শেষ। এই সেদিন, শাওন মাসের ঘন রাতবিরাতে ধলু মিস্ত্রির রঙিন জিন্দেগির ফয়সালা।
বছরখানেক কচু-ঘেচু, পাটা আলু, বিলাতি বেগুনে মা-বেটির দিন কাটে। আর তো কাটে না সারা দিনরাত। হাঁপানির টান ওঠে। পিয়ারির ভাবনা ডাগর মেয়া ঝিনুকরে কার হিল্লায় রাখব পোড়াকপালি। দয়াল মাবুদই ভরসা।
সেদিন সন্ধ্যা হয় হয়। কাঁঠাল পাকা গরমের কাল। পিয়ারি কলেমা ঠোঁটে নিয়া দুনিয়াবি খেল খতম করল। খেল খতম। গড়ায়া গেল গা কচু পাতার পানি, এই মরার জীবন, আহ্লাদের জীবনডা। …
অঘ্রানের লাউডগার কিসমত। ঝিনুকের দিন কাটে না শোকে, রাতে
দেও-দানবের উৎপাত। রাতচরা পাখি ডাকে, শিয়ালের ডাকের সঙ্গে আরো শিয়াল ডাকে।
তাগোরে মনুষ্যের সুরত। লতু খালা কয়রাত একনাগাড়ে দোক্তাপানের বাটার সঙ্গে একখান দাও শিথানে নিয়া পহরা দিলো। পাড়া-পড়শির বুড়া খালার মনডা দিঘির মতোন। দরদি খালা!
‘ডরাইস না কইলাম। ডরাইলেই ডর। দাওখানে কেমুন ওজন দেখছস?’
কপাটের কড়া ভাঙে এক ব্যাটারি মকবুইল্যা। খালার দাওখান শক্ত করে মুষ্টির মধ্যে ধরছিল ষোলো বছরের মেয়া। ফুটি কার্পাস মুষ্টি, পাকা আনারের মতো রক্ত যেমুন গড়ায়া পড়ে।
সে-যাত্রা চোট্টা পগারপার। কিন্তু ঝিনুক দালাল নসু মিধ্যার বদনজরে। মিধ্যার জালের সুতলি বহুত মজবুত। কারেন্টের জাল। সেই জালে আটক কন্যা ! নিয়তি! …
সরজু বালার খোঁজে আসছিল মনিকান্ত, বাপ-মা -মরা ভাগ্নি তার। বেহাত হয়ে নিখোঁজ। নিষিদ্ধ পাড়ায় সরজুরে খোঁজে মনিবাবু।
অন্ধকারের মন্দ দুনিয়ায় চাঁদবদনী ঝিনুর ঠিকানা। চোখ পড়ল নিউ মঞ্জুরি অপেরার স্বয়ং অধিকারী মনিকান্ত ঘোষালের। ফুলপরীটা কান্দে বেশুমার!
কিছু মালপানি খরচা হলো। পদ্মফুলডা নিউ অপেরার শোভা-মান বাড়াবে। মনিকান্ত বহুত ঘোড়েল তীরন্দাজ। বাণিজ্য তার শিরায় শিরায়। আগাম হিসাব-নিকাশ তার নখের ডগায়। আচানক এ-রত্নের হদিস মিলে গেছে। হাতছাড়া করা যাবে না। পাঁক থেকে আলগোছে তুলে আনল আস্ত এক ফুটন্ত পদ্ম। কিছু খরচা তো করাই লাগে!
তার নয়া আবিষ্কারে বিরাট চমক। মনিবাবুর বেজায় খোশমেজাজ! সরজুবালার হদিস না মিললেও তরতাজা জোছনাকুমারী তার আবিষ্কার, খরিদ করা রত্নমানিক। ঝিনুকমালার হাবিয়া দোজখবাসের ইতি হলো। মুক্তির আনন্দে ঝলমল করে অভাগী।
এ মেয়ে ঝিনুক! জলঢাকার সেই লাল ফড়িং! … আপনেরা চিনি চিনি করেও ঠিক চিনবার পারছেন না কি! উনিশ বছরের মেয়া বচ্ছর না গড়াতেই নিউ মঞ্জুরি অপেরার টপ হিরোইন। সোজা কথা?
দশা এমন ঝিনুকের পাট না থাকলে পীরগঞ্জের যাত্রাপাগল দর্শক চেয়ার ভাঙে, প্যান্ডেল তছনছ করার পাঁয়তারা করে।
‘ঝিনুকমালারে চাই। ছালেহা, কমেলা ময়দার বস্তা। পাট কইতে জিবলা কাঁপে। পয়সা নষ্ট।’ সাইদুল, জামান বয়াতির হুমকি।
শীত মৌসুমে শুরু হয় যাত্রাপালা। ধান কাটার পর ফাঁকা জমিতে, নদীর ধারে প্যান্ডেল বাঁধার মরশুম। ঝিনুক, মালতি, চিনু বিবিরাও ফুরসুত পায় না মোটে।
পরিমল রায়ের এখনো আছে নাটমণ্ডপ। বায়না করতে গেছে অধিকারী। গুনাই বিবির পালা।
টপ হিরোইন পালা মুখস্থ করে দুয়ার বন্ধ করে। কাজে যেন বদনাম না হয়, মঞ্জুরি অপেরার প্রাণভোমরার ধ্যানজ্ঞান এইমতো।
সরগরম যাত্রাবাড়ি। মহড়া চলে। নগেনের মুরলি বাজে, বড়ো উদাস মধুর সে-সুর। কামেল বংশিবাদক। সুজন ঢুলির বাদ্য। কাবেলের ট্রাম্পেটের ওস্তাদি কাজ। এক্সট্রা কমেলা, কাজলীর পাঠ পড়ার গুনগুনানি চলতে থাকে। মহড়া চলে, হাসি-তামাশাও চলে। সরগরম। মাঝে মধ্যে খিস্তিখেউর – এগুলা অপেরার জনমানুষের সহজ মুখের বুলি যেমন।
ফুরসত মিললে বসে দাবার গুঁটির কারবার। জুয়ার আসর। দাবাড়ু সোহাগ মিয়ার মাহফিল। তার চেহারা-সুরতের জেল্লা, ভাবসাবের জাদুটোনায় ঈষৎ কাত হয়ে যায় বুঝি টপ হিরোইন। আর সোহাগ মিয়ার নজর তো প্রথম দর্শনেই ঝিনুকমালার দিকে কাত।
‘তোমার গাল পাকা ডালিম্ব। রুজ পাউডার মাইখা রাখ ময়না পক্ষী।’
ঝিনুকের কাচভাঙা হাসির ঢেউ দাবাড়ুর বুকে তুফান তোলে।
‘লাগে না গো। এমনেই।’
আষাঢ় মাসের আকাশ, গোমড়া মুখ। ধারেকাছে বাজ পড়ে। নামে বেশুমার বৃষ্টি। অপেরার আস্তানা ফজলু মৃধার সেমিপাকা ঘরের দুয়ার প্যাক ঘোলা পানিতে সয়লাব। সেদিন বউ-সাজ ঝিনুকমালার। লাল পাড় টিয়া রঙের শাড়ি তিন লহরি পুঁতির মালায় মনোহরা পরি। দাবাড়ুরা মেতে আছে দাবার চালে।
টপ হিরোইনের মনে ধাঁধার আছর। অচিন ঘোর।
কাজি অফিসের নিকাহনামা গোলাপি ব্লাউজের সিন্দুকে। সোহাগ মিয়ার হাত বজ্রমুষ্টিতে আটক। ফেরত আসে সেই জলঢাকার লাল ফড়িং। স্বামী ঘরযাপনের স্বপ্ন তার!
হুল বিঁধায় ঢুলি, বংশিবাদক আর দুনিয়ার আউলা কথা ঝিনুকের দিকে ছুটে আসে। সব এক্সট্রা বাজার বসায়, মাতে গিবতের খোশগল্পে। …
নিউ অপেরার তপ্ত শোরগোল দিনে দিনে ঠান্ডা হয়।
অধিকারী চাপা গর্জনে মলম লাগায়।
‘এইডা একটা কাম করলা মালা? দাবাড়ু সোহাগ মিয়ার গলায় দিলা ফুলের মাল্যখান? পচা শামুকে পাওখান কাটলা! এইডা আমি ভাবি নাই।’
আগের বিধান জারি থাকে। মনিকান্তের বয়সী হাড়হাড্ডি। বিষব্যথা আর কঠিন ব্যাধি অনিদ্রা। তার নিরাময়ের দায় ঝিনুকমালার!
অধিকারীর শোবার ঘরখান চওড়া। সিল্কের পর্দা।
গোছ মিছিল সুন্দর। এই ঘরে ঢুকলে তার নাম হয় মধুবালা। মনিকান্তের পছন্দসই। মধুবালার হাতের জাদু খেলায় পোড়া চোখে নামে ঘুমের আঠা। মাঝেমধ্যে গেলাস সাজান লাগে। পয়লা প্রথম ঝিনুর হাত কাঁপত। মায়ের গায়েবি কান্দন বাতাসে আনাগোনা করত। এখন আর তেমন কাঁপে না।
সোহাগ মিয়ার চওড়া সিনায় হাপরের আগুন। অপেরার অধিশ্বররে মান্য করাই লাগে। রুটি-রুজির সওয়াল। তবু মাঝরাতে গজরায় মিয়া, ‘বুড়া ঘুমাইছে? ঘুম পাড়ানি গান গাইছিলা?’
মালা মুখে স্নো মাখে। জবাব দেয় না কোনো।
ঝিনুকের দিনগুলা নিত্যদিন উজালা। দম নেওয়ার ফুরসত নেহায়েত সামান্য। পীরগঞ্জে পূজার মৌসুম। ব্যাপারী সুবল বণিকের নাটঘর থেকে বায়না আসছে।
মোটা অংকের লেনদেনের ইশারা। শর্ত ঝিনুকমালা।
পালা সীতার বনবাস। যেনবা নিয়াশ ফেলার জো নাই। মহাব্যস্ত হিরোইন। ভোরের আলোয় সে নিত্যনতুন ঝলকে নিজেরে সাজায়। নিজেরে
ভাঙে-গড়ে।
পালা, পালা, যাত্রাপালা। ঝিনুক এক অচিন নাচঘরের ঘোর সামলায়। নিজের মাখন মাখন শরীরে চিমটি কাটে। এইটা কি আমার পোড়াকপালের বখশিশ? নাকি অন্য কিছু!
সোহাগের বাবরি চুলের নেশা আর টানে না। বিস্বাদ লাগে। ভুলের মাশুল গুনে মালা। আর কত! কত আর!
খালি টাকা চাই। টাকা – হাত ভরা টাকা।
টাকা দেও, ভালোবাসা নেও। হায় কপাল। …
আলগোছে তালাকনামা সুসম্পন্ন হলো। মুক্তি। সোহাগ নতুন এক্সট্রা কলিবিবির ঘরে।
মাসদুই বাদে ঝিনুক সেই মায়ের ভিটার আরেক জুয়ারি তরফদারের ঘোরে বেদিশা। তরফদার ঝিনুকের জ্ঞাতিগুষ্টির কেচ্ছা কয়। মালার মনে কিসের অচিন নেশা। তার মামুজান এখনো ভিটায় বহাল। আলগোছে তিন কবুল পড়া হলো, নসিবের তেলেসমাতি। মালা নসিবের পাশাখেলায় ডানাভাঙা খেলুড়ে এক।
এই দফা অধিকারী নিশ্চুপ। মেজাজ খিচড়ে আছে ভিতরে ভিতরে। বরদাশত হয় না। উভয় সংকট যারে কয়।
রাত ঘনায়। ঘোষালের চক্ষু চঞ্চল। রক্তলাল। মোলায়েম আঙুলের খেলে হবে বাজিমাত। কবে থেকে জানি এমন মিহিন শুশ্রূষার এলেম তার! আঙুলের ডগায় ডগমগ নৃত্য খেলায় মাতোয়ারা! নিজেরে নিজেই কয় সুন্দরী, তুমি সব পারো গো।
দুর্গা দেবীর একটা মূর্তি। জলচোকির ওপরে। ধূপকাঠি সুবাস ছড়ায়। কয়ডা ঝুমকাজবা মিইয়ে গেছে।
আচানক মনিবাবু দুই হাত নমস্কারের ভঙ্গিমায় জড়ো করে। ঝিনুকের সামনে গিয়ে আওড়ায়, ‘যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা নমস্ত্যসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমো নমঃ।’
সে এক রক্তচক্ষু পুজারি। মনিকান্ত বাবুর রগজাগা হাত ঈষৎ কাঁপে।
দেবী বন্দনা। মধুবালাও ঈষৎ কাঁপে। মন্ত্রতন্ত্রের সাধন ভজনে মাথা ঝিম ঝিম করে। কি জপে মনিবাবু! আল্লাহ জানে।
লালচে শরবত ঢালতে হয় গেলাসে। বুদবুদ ওড়ে। বুদবুদ। চুমুকে আর্দ্র তার জিব্বা।
বিড়বিড় করে মনিবাবু, ‘রমণীর মন, দেব ন জানন্তি কুতো মনুষ্যা!’
মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝে না টপ হিরোইন। বাবুর কি মাথার ব্যারাম হইসে? আল্লাহ মাফ কইরা দিও। আবোলতাবোল কি কথাগুলা! কুফরি কালামের কথা মায়ে কইত, মাঝেমধ্যে। জাদুটোনা করছে তার বাপরে বজ্জাত মেয়ালোকরা। মনে ফাল দিয়া ওঠে সেই যত কথা। আজগুবি!
বাবু গুনগুন করে গান গাইল সে-রাতে।
‘রঙ্গমতী রাইকিশোরী/ তোমায় বলি শোনো শ্যাম রঙে রঙ মিললে আপন/ রঙ থাকে না কোন যুগল মিলন ক্ষণে ক্ষণে/ এক হয়ে যাও শ্যামের সনে।’ …
কখন কেমনে দুর্গা দেবীর পায়ের সিঁদুর মেখে গেছে মালার ঘন কালো সিঁথির অরণ্যে। দিশ নাই তার!
বছর না ঘুরতেই কোলে এলো কন্যা এক রূপের ডালি। মা ঝিনু! অন্য ঝিনু। অন্য নারী। মুক্তামালা তার জীবন-মরণ। সময়ের চাকা ঘুরে চলেছে অক্লান্ত। তরফদারেরও সেই গোঙানি, সেই গোসা।
‘সতীনারী আইছ? বুড়ারে ঘুম পারাইছ? খুবই ভালো।’
ঘোষাল বাবু তার মালিক, এক জায়গায় নাচার সে-ও।
পুরানা কেচ্ছা –
‘সেই টাকা দে, তোর আঁচলা ভর্তি টাকা। টাকা দে কলাম, ভালোমন্দ গিলি। মিজাজ বহুত শুকায়া রইছে।’
মেয়া বড়ো হইতাছে, এইসব ক্যাচক্যাচানি সয় না।
ট্রাঙ্কের তালা খুলে দুইটা পাঁচশো টাকার নোট গুঁজে দেয় তরফদারের পকেটে। শকুনের চোখের নজর টিনের ফুললতা আঁকা বাক্সের ভিতর। নড়েচড়ে না। মালার বুক ধুকধুক করে। কীসের আলামত। কত তিতা গেলা লাগে রোজদিন।
রঙের এই জীবনডা হামানদিস্তার তলে! রোজ শোভা বাড়াও, নাচে-গানে পালার পাঠে ছড়াও ঝিলিক। পয়সা উসুল, মনিবাবু জবর খুশি। রাতজাগা দর্শক হাই তুলতে তুলতে ঘরে যায়।
‘দারুণ একখান মাল মাইরি।’ বাতাসে কাঁপন তোলে। … নিউ মঞ্জুরি অপেরার শতভাগ জিত! হাজার জোড়া শকুন চক্ষু, ট্রাম্পেট, বাঁশি। ঢোলে, করতালের সমতালে গিলে খায় তারে। কয়জনে মাথা নোয়ায়া কয়, কেমন কোকিলার সুর, কী তার পালার পাঠ, অভিনয়। এমন আর কেউ না। আহা রত্ন একখান।
ঝিনুক অপেরার শো শেষে ঘরের দরজায় খিল তুলে কান্দে। বুকের মধ্যে কেন জানি হুতাশ লাগে। রঙের দুনিয়া ফিকা লাগে।
মালার মন ফাঁপর লাগে। মেয়াটা একলা ঘরে। বাহবা, হাততালি, শিস টুকরা-টাকরা মন্তব্য বরং একরকম জ্বালা বাড়ায়। মানুষে তার লীলা-লাস্যের ভোমরা। তার গুণ দেখার হাউস নাই।
মুক্তামালারে ইশকুলে ভর্তি করা লাগবো। ইশকুলের ড্রেস লাগবো। মনিবাবু অবশ্য বলেছিল, ‘ভাইব না মধুবালা আমি আছি না। আমারও দায়িত্ব। সে তো আমারও কন্যা।’
ঝিনুকমালা আচমকা চমকে ওঠে! বনবন করে মস্তক। চমকে ওঠে!
বণিকবাড়ির বায়না আসছে। দিন সাতেকের মামলা।
এবার যাত্রা তালগাছির হাটের জলার কিনারে কানা ইঁদারার মাঠে। বিরাট আয়োজন। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ।
কান ঝালাপালা মাইকের আওয়াজে, ‘যাত্রা যাত্রা যাত্রা – বিউটিকুইন ঝিনুকমালা, লীলা-লাস্যে পয়লা নম্বর। ভাইসব জলদি টিকিট কাটেন। দৌপদীর বস্ত্রহরণ। গীত বাদ্যে ভরপুর। আসুন, যাত্রাপালা। রূপের নারী ঝিনুকমালা। পয়সা পাই পাই উসুল।’
ঝিনুকের ভয়, সাঁঝবেলায় মুক্তা ঘরে নাই।
‘মেয়াডা কই গেছে? সন্ধ্যাকালে বাইরে থাকা যাইবে না কলাম তরফদার। চারদিকে মস্তান গুণ্ডা। মেয়া ডাগর হইতাছে নজরে নজরে রাখা লাগে।’
ফিচকা হাসি ঠোঁটের আগায়। বিড়বিড় করে মানুষটা, ‘সতী মায়ের ঝি কি না! অপেরার মেয়া আগুনের ঝাপটা খাইয়াই ডাগরডোগর হইবো।’
আচমকা খাড়া দুপুরে ঝিনুকের মাথায় যন্ত্রণা। ভয়ানক যন্ত্রণা। ঘোষাল অস্থির। ডাক্তারের চেম্বারে ছোটে বাবু। আপেল, বেদানা ঠোঙা ভরা।
পরশমণি অপেরা আনছে প্রিন্সেস আলেয়ারে। ওরা যদি বাজার মাত করে, তবে মঞ্জুরি অপেরার পেটে লাথি। কী উপায় আছে। নিউ অপেরার মুখে চুনকালি।
চণ্ডীমায়ের পূজা করে ঘোষাল। প্রসাদ বিলায়। আর পরদিনই মালার শরীরে জুত ফিরে আসে।
সাতদিন মুক্তা তরফদারের হিল্লায় কেমনে থাকবেনে!
মায়ের মন কেন জানি উতলা। এক্সট্রা মাঝবয়েসি খালা মিনারানির ওপরে ভরসা করা যায়! খালার হাতে কড়কড়া চারশো টাকা গুঁজে দেয় মালা, ‘মেয়া আমার নরম-শরম। আমারে ছাড়া সাতদিন কেমনে থাকবো গো খালা।
তত্ত্ব-তালাশ কইরো।’
মিনারানি গা সাপটে মালার। ‘ডরাইয়ো না। আল্লাতাল্লা ভরসা। আমরা কয়জন আছি না।’
কানা ইঁদারার মাঠে ঝিনুকমালা মাতায়ে আসছে। অধিকারী মহাখুশি। কী তেজী মেয়েমানুষ, আগুনের ফুলকি। যেমন রূপের তেমন গুণের। হাজারে একটা।
ঘরের দুয়ারে পা দিয়াই মালার বুকটা ধুকধুক করতে থাকে। কই মুক্তামা দৌড়ায়া আসলো না তো। ঘর অন্ধকার। ওই মানুষটার ছায়াও নাই। কই অকম্মা মানুষটা?
তরফদার বিকাল শেষে সাঁঝ নামলে আসে।
‘মুক্তামা কই?’ ফেটে পড়ে মালা। বোমা ফাটে।
‘সেইডা তো আমিও জিগাই! সকালে ঘুম থেকা ওইঠা দেখি মেয়া বিছনায় নাই। পাগলের মতোন সারা মহল্লায় খুঁজতাছি!’
ঘোষাল থানা পুলিশ দৌড়ঝাঁপে বেদিশা।
মিনারানি খালার গলা বুঁজে আসে। কিন্তু কথা কয়ডা কয়া জরুরি।
সে-রাতে খালা চিকন গলার চিক্কুর শুনে দৌড় দিয়া আসে। মুক্তার গলা। নড়বড়া দরজার পাল্লা ধইরা খাড়ায়া খালা বেচারি। ঘরের ভিতর তুফান মালুম হয়। কিল-থাপ্পড় চলে, কান্দে কচি মাইয়া। শোনা যায়।
‘তালা ভাঙেন ক্যা? মার বাকসো না। মায়ে আসলে কানবো।’ মুক্তার কান্দন শোনা যায় আরো একদফা। তরফদার কচি মুখ চেপে ধরে খসখসা হাতে। অসুরের শক্তি গায়ে।
কুহেলি, সুজন মিয়া, নগেনও কড়া নাড়ে। কী হইলো!
‘কি হইছে মুক্তায় কান্দে ক্যা?’ সকলে জানবার চায়।
‘কিছু না গো। মায়েরে স্বপনে দেখছে মুক্তা বেটি। চিক্কুর দিছে সেই জইন্যে।’
তরফদার ঠান্ডা গলায় কথা কয়।
‘যাও তোমরা ঘুমাও গিয়া।’ আশ্বস্ত করে ধড়িবাজ।
লোকটা পরদিন বেটিরে আইসক্রিম, চকলেট খাওয়ায়। মা মা করে উথালপাথাল আদর করে। …
আর মহানিম বৃক্ষের সবুজ পাতারা ঝরে ঝরে উজাড় হয়। ওদিকে মাটির নিচে তোলপাড়!
এইখানে বদনাপাড়া গাঁয়ের সুরুজ মুন্সির গোয়ালের পুবে মুক্তাফুল ঘুমিয়ে গেছে গহন বিছানায়। গলায় দশ আঙুলের গভীর দাগ গো। এ-খবর বাতাসে বাতাসে অশ্রুজলের মতো ভাসে। …
অপেরার রানি একদানা অন্ন মুখে তোলে না। পথের মিসকিনের চেহারা তার! … পাগল পাগল দশা।
তরফদার ঝিনুকের পায়ে লুটায়।
‘চলো মুক্তামায়েরে তালাশ করি। যাইব কই সোনাপাখিডা।’
পাগলপারা মা জননী লোকটার পিছু নেয়। রাতের অন্ধকারে। অধিকারী থানা পুলিশ দৌড়ঝাঁপে দিশাহারা। নেতিয়ে পড়ে আছে বিছানায়। তারও মুখে অন্ন রোচে না। সেই যে শনিবার রাতদুপুরে মুক্তামালারে তালাশ করতে বাইর হইলো জননী, দুইদিন যায় ঝিনুক গেল কোন দ্যাশে, কোন গড়ঠিকানায় উপরআলা জানে। …
অপেরায় বাদ্য বাজে না, প্যান্ডেল সাজে না। বিরান সবকিছু। পেটে দানাপানি নাই কুশীলবদের। কেউ ছিটকে গেছে নানা ধান্দায়।
ভাদ্র মাসের খাড়া দুপুর।
মরিচ খ্যাতে মরিচ তোলে সোনাভান। কী দেইখা তরাসে কাঁপে? কী দেখে সে দিনে-দুপুরে?
করতোয়ার কিনারে এলোচুল ভাসে। এইডা তো যাত্রাপালার ঝিনুকমালা। সোনাভান বিজন দুপুরকালে মাটিত কাত হয়ে পড়ে থাকে। মাতম করে মৃদু। দেহ অবশ আধা কাটা মুণ্ডুটার দিক নজর আছাড় খায়। কাউয়াগুলা কী মনে করে কা কা ডাকতাছে। পীরগঞ্জের টেংরাদহে ঝিনুকমালার প্রাণহীন পেলব দেহ নদীর জলে আখেরি সিনান করে গো। … খুন হইছে টপ হিরোইন। তাইলে ডবল খুনের মামলা! বাতাসে পোড়া গন্ধ। কে সেই মহাপাতকী!
মা-বেটির মরদেহ নিউ অপেরার উঠোনে। জিপবোঝাই পুলিশ দারোগা। হাটুরে লোকজনের জটলা আশপড়শির মলিন মুখ, নগেন, কুহেলি, মিনারানির।
মনিবাবু মুক্তার কচি হাতটা ধরে রাখে। একটা জড়ুল লালচে। রোদ পড়ে ঝলমল করছে। নিজের হাতটা উল্টায় মনিবাবু। একটা জড়ুল! পদ্মের মতো মনে হলো আজ, এক্ষণে। এইডা আর তেমন বিষয় কী!
অধিকারী গুরুগম্ভীর মানুষ। কম কথা কাম বেশি।
মালিকের হাতে রুটিরুজির ফয়সালা। সবসময় গম্ভীর। খবরদারির কম্মডা অত সহজ নারে।
মর্মান্তিক শোক তাকে মাটির ধুলায় নিয়ে বসিয়েছে।
অপেরার কুশীলবরা চোখ সরায় না মালিকের দিক থেকে। আহা অধিকারীর মরণদশা।
মনিকান্ত ঘোষাল শিশুটিকে নিয়েই জেরবার।
একবার বেখেয়ালে বলে ওঠে, ‘ওর শীত লাগছে, আমার কোলে দাও।’
ঝিনুকের টুকরা শরীর কুহেলির বিছানার চাদর দিয়ে আব্রু রক্ষা করা হইছে। সেদিকে নজর কম বাবুর।
অপেরার ঘরে, চাতালে আজ দুইদিন বাজেনি ট্রাম্পেট, বাঁশি, খোল, করতাল। মহড়া বন্ধ।
শোনা যায় অকারণ তারস্বরে মাইকের বাজনাসহ আমন্ত্রণ। রাস্তায় রাস্তায় উৎসব। কারো পৌষ মাস আর কারো সব্বোনাশ জোড় বাঁধা।
যাত্রা যাত্রা যাত্রাপালা বেহুলা লখিন্দর পালা। প্রিন্সেস আলেয়া মোহনীয় রূপকুমারী। আসুন দেখুন মন জুড়াক। গীত বাদ্যে রঙিন যাত্রাপালা। … মিতালি অপেরার লাগাতার মাইকিং।
মনিবাবুর ভাঙা বুকে হাতুড়ি পেটায়। হাউমাউ করে কেঁদে বেহুঁশ রাশভারি মনিব। রসাতলে যাক পালা।
মুক্তার কাদামাটি মাখা কচি শরীরটা বুকে তুলে নিয়েছে অন্যমনে, মনে হয় পিতৃহৃদয় চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
আকাশে উড়ে যায় একঝাঁক সবুজ টিয়া। মনিকান্তের নজর সেই ছবির দিকে। সকল হুতাসন টিয়ার ডানায় ভর করে উড়াল দিলে এ-মাতম কি জুড়াবে?
ভারি ক্রন্দনে গলা বুঁজে এলেও তীরের ফলার মতো কয়টি বাক্য ছুটে যায় দিগ্বিদিক।
‘ঝিনুকের দাফন-কাফন তোমরা করবা। খরচাপাতি আমি দেবো।’ বাজনাদার বৃদ্ধ মোবারক জোড় হাতে নত মাথায় এগিয়ে আসে। পিছনে আরো কয়জন।
থানার দারোগা সাহেব জিপ থেকে ভারি বুট পরা পা মাটিতে ফেলেন। মর্গে উঠবে মধুবালা। সুরতহাল রিপোর্ট হবে। এমনি বিধান। লাশকাটা ঘরে মুক্তাও যাবে। মার্ডার কেস, হাজারো ফ্যাকড়া।
তরফদার পলাতক। তারে অ্যারেস্ট করা থানা পুলিশের কর্তব্যকম্ম। জোর তৎপর থানার দারোগা বাবু।
দ্বিতীয় বাক্য বাবুর, ‘মুক্তামায়ের মুখাগ্নি আমি করবো!’
টিয়ার ঝাঁক ততক্ষণে মহাকাশে মিলিয়ে গেছে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.