২০২৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন ক্লার্ক
(John Clarke), ইয়েল এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিশেল হেনরি দ্যুভরে (Michel H. Devoret) এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন ম্যাথিউ মার্টিনিস (John M. Martinis)। রাজকীয় বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি তাদের ৭ই অক্টোবর ২০২৫ সালের প্রেস রিলিজে উল্লেখ করে যে ‘for the discovery of macroscopic quantum mechanical tunnelling and energy quantisation in an electric circuit’-এর জন্য ক্লার্ক, দ্যুভরে এবং মার্টিনিসকে নোবেল পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁরা পুরস্কারের ১১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা সমানভাবে ভাগ করে নেবেন। উল্লেখ্য, ক্লার্ক ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজে ১৯৪২ সালে, দ্যুভরে ফ্রান্সের প্যারিসে ১৯৫৩ সালে এবং মার্টিনিস ১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন।
২০২৫ সালে রসায়ন বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুসুমু কিতাগাবা (Susumu Kitagawa), অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড রবসন (Richard Robson) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওমর ময়ানেস ইয়াগি (Omar Mwannes Yaghi)। রাজকীয় সুইডিশ বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি তাদের ৮ই অক্টোবর ২০২৫ সালের প্রেস রিলিজে উল্লেখ করে যে, ‘for the development of metal-organic frameworks’-এর জন্য কিতাগাবা, রবসন ও ইয়াগিকে নোবেল পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁরা পুরস্কারের ১১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা সমানভাবে ভাগ করে নেবেন। উল্লেখ্য, কিতাগাবা জাপানের কিয়োটো শহরে ১৯৫১ সালে, রবসন যুক্তরাজ্যের গ্লাসবার্নে ১৯৩৭ সালে এবং ইয়াগি জর্ডানের আম্মানে ১৯৬৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
২০২৫ সালে শারীরবৃত্ত বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অফ সিস্টেম বায়োলজির সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মেরি এলিজাবেথ ব্রুংকো (Mary E. Brunkow), যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিস্কোতে অবস্থিত সোনমা বায়োথেরাপিউটিকসের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ফ্রেড রামসডেল (Fred Ramsdell) এবং জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিমন সাকাগুচি (Shimon Sakaguci)। সুইডেনের ক্যারোলিন্সকা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি তাদের ৬ই অক্টোবর ২০২৫ সালের প্রেস রিলিজে উল্লেখ করে যে, ‘for their discoveries concerning peripheral immune tolerence’-এর জন্য ব্রুকো, রামসডেল ও সাকাগুচিকে শারীরবৃত্তে নোবেল পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁরা পুরস্কারের ১১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা সমানভাবে ভাগ করে নেবেন। উল্লেখ্য, ব্রুংকো ১৯৬১ সালে এবং রামসডেল ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন। অন্যদিকে সাকাগুচি ১৯৫১ সালে জাপানে জন্মগ্রহণ করেন। এই প্রবন্ধে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান এবং শারীরবৃত্ত বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষণা নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করা হবে।
পদার্থবিজ্ঞান
২০২৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের মূল বিষয় স্থূল স্কেলে (macroscopic scale) কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ধর্মকে প্রদর্শন ও ব্যবহার করা। আমরা সূক্ষ্ম স্কেলে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ঘটনা সম্পর্কে জানি। যেমন একটি বলকে যদি দেয়ালের দিকে নিক্ষেপ করা হয় তাহলে তা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসবে (চিত্র ১ দ্রষ্টব্য)। এটি হচ্ছে ক্লাসিক্যাল বা চিরায়ত বলবিদ্যার বিষয়। কিন্তু একটি সূক্ষ্ম বস্তু, যেমন ইলেকট্রন কণাকে যদি দেয়ালের দিকে নিক্ষেপ করা হয়, তাহলে এই ইলেকট্রন দেয়াল ভেদ করে চলে যাবে। এই দেয়াল ভেদ করা মানে দেয়ালের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া নাও হতে পারে, এটি হতে পারে একটি উচ্চ বিভবকে অগ্রাহ্য করে চলে যাওয়া। ১৯২৮ সালে পদার্থবিদ জর্জ গ্যামো লক্ষ করেন যে, কোয়ান্টাম টানে এর কারণে কোনো ভারী পারমাণবিক নিউক্লিয়ন ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়। এই ক্ষয়ের ধরন নিউক্লিয়াসে বিদ্যমান বিভিন্ন বলের ওপর নির্ভরশীল। প্রশ্ন হচ্ছে, এই কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের ঘটনা কি স্থূল স্কেলে প্রদর্শন করা সম্ভব।
ইতঃপূর্বে অতিপরিবাহী পদার্থ নিয়ে নানা গবেষণা হয়েছে। ১৯১১ সালে হল্যান্ডের পদার্থবিদ হাইক্ কামারলিঙ্ অনেস (Heike Kamerlingh Onnes) আবিষ্কার করেন যে, অতি নিম্ন তাপমাত্রা অর্থাৎ – ২৬৪.৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পারদের বৈদ্যুতিক রোধের ক্ষমতা লোপ পায়। এর অর্থ হচ্ছে, অতি নিম্ন তাপমাত্রার কারণে পারদে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। কিন্তু এর কারণ জানা গেল ১৯৫৭ সালে যখন জন বারডিন, লিওন কুপার এবং জন শ্রিফার পরীক্ষায় দেখালেন যে, অতি নিম্ন তাপমাত্রায় ইলেকট্রন কুপার জোড়া (Cooper pairs) অবস্থায় থাকতে পারে। আমরা জানি, ইলেকট্রন পাওলির বর্জন নীতি অনুসরণ করে। এই বর্জন নীতি অনুযায়ী দুটি ইলেকট্রন যখন কোনো একটি কক্ষপথে অবস্থান করে, তখন একটির ঘূর্ণন অপরটির ঘূর্ণনের বিপরীত হবে। উল্লেখ্য, ইলেকট্রন ঋণাত্মক কণা। সুতরাং দুটি ইলেকট্রন কাছে এলে ঋণাত্মক আধানের মধ্যে বিকর্ষণ হওয়ার কথা; কিন্তু নিম্ন তাপমাত্রায় কুপার-জোড়ার ইলেকট্রন সংবদ্ধ অবস্থায় থাকে এবং অতিপরিবাহী পদার্থের মতো বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভাষায় এই কুপার-জোড়াকে বলা যায় একটি তরঙ্গ ফাংশন। তার অর্থ হচ্ছে, এই তরঙ্গ ফাংশন সম্ভাব্যতার সূত্র অনুসরণ করে। এই আবিষ্কারের জন্য ১৯৭২ সালে বারডিন, কুপার এবং শ্রিফার নোবেল পুরস্কার পান।
১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের পদার্থবিদ ব্রায়ান জোসেফশন ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, দুটি অতিপরিবাহী পদার্থের মধ্যে অন্তরক পদার্থ থাকলে কুপার-জোড়া তার ভেতর দিয়ে টানেলিং প্রক্রিয়ায় চলে যেতে পারবে। যদি এর মধ্যে তড়িৎ চাপ বা ভোল্টেজ প্রয়োগ করা হয় তাহলে অতি উচ্চ কম্পাঙ্কের বিদ্যুৎ প্রবাহ সৃষ্টি হবে। দুটি অতিপরিবাহীকে যখন একটি পাতলা অন্তরক পদার্থ দ্বারা যুক্ত করা হয়, তখন যে-গঠন পাওয়া যায় তাকে বলা হয় জোসেফশন জাংশন। এই জাংশনের নানা ব্যবহার লক্ষ করা যায়, যেমন SQUIDS বা (Superconducting quantum interference device), যা অতি ক্ষুদ্র চুম্বকক্ষেত্রকে পরীক্ষা করার জন্য ব্যবহার করা হয়, অথবা এমআরআই (magnetic resonance imaging)-এ ব্যবহার করা হয়। ১৯৭৩ সালে এই কাজের জন্য জোসেফসন নোবেল পুরস্কার পান। তারপর ২০০৩ সালে পদার্থবিদ অ্যান্থনি লেগেট অতিপরিবাহী পদার্থ নিয়ে কাজ করে নোবেল পুরস্কার পান।
ক্লার্ক উপর্যুক্ত গবেষণা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অতিপরিবাহী পদার্থ এবং জোসেফসন জাংশন নিয়ে কাজ করার জন্য একটি গবেষণা দল গঠন করেন। সেখানে আসেন মার্টিনিস পিএইচ.ডি করার জন্য এবং দ্যুভরে পোস্ট-ডক্টরেটের কাজ করার জন্য। ১৯৮৪ এবং ১৯৮৫ সালে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে স্থূল স্কেলে কোয়ান্টাম টানেলিং পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁরা কাজ শুরু করেন একটি বৈদ্যুতিক বর্তনী নিয়ে। সেই বর্তনীর সমস্ত ধর্ম প্রথমে পরিমাপ এবং বিশ্লেষণ করেন। তারপর এই বর্তনীর মধ্যে জোসেফসন জাংশন স্থাপন করে তার মধ্যে দুর্বল বিদ্যুৎ প্রবাহিত করেন। প্রথমে বৈদ্যুতিক চাপ ছিল শূন্য অবস্থায়। তারপর তাঁরা পরীক্ষা করেন কত সময় পর এই চাপশূন্য বা শূন্য ভোল্টেজ অবস্থা থেকে বৈদ্যুতিক চাপ লক্ষ করা যাবে। তাঁরা বিভিন্নভাবে পরিমাপ করে দেখান, ইলেকট্রন টানেলিং প্রক্রিয়ায় শূন্য তড়িৎচাপ অবস্থা থেকে বর্তনীতে তড়িৎচাপ সৃষ্টি হয়েছে। একে বলা হলো স্থূল কোয়ান্টাম টানেলিং অবস্থা (macroscopic quantum tunnelling)। তাঁদের পরীক্ষণ পদ্ধতি চিত্র ২-এ দেখা যায়। এই চিত্রে বিলিয়ন কুপার-জোড়াকে এক সেন্টিমিটার চিপের মধ্যে নিয়ে আসা হয়।
ক্লার্ক, দ্যুভরে এবং মার্টিনিসের নোবেল পুরস্কারস্বীকৃত গবেষণার আরেকটি বিষয় হচ্ছে, তড়িৎ বর্তনীতে শক্তিস্তরের কোয়ান্টায়িত অবস্থা। তাঁরা বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে মাইক্রো তরঙ্গ শূন্য তড়িৎচাপ অবস্থার তড়িৎ বর্তনীতে প্রেরণ করেন এবং লক্ষ করেন – এই অবস্থা অত্যন্ত সীমিত সময়ের জন্য হয়। টানেলিং প্রক্রিয়ার কারণে এই অবস্থা থেকে বর্তনী উচ্চ তড়িৎচাপের অবস্থায় যায়। উল্লেখ্য, এই গবেষণায় যে বিষয়টি সবাইকে অবাক করেছে তা হলো, কুপার-জোড়া একটি তরঙ্গ ফাংশনের মতো কাজ করে এবং স্থূল স্কেলে এর টানেলিং প্রক্রিয়াকে পরিমাপ করা যায়। নোবেলবিজয়ী অ্যান্থনি লেগেট এই আবিষ্কারকে শ্রোয়েডিংগারের পরীক্ষার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই তরঙ্গ ফাংশনকে অনেকটা কৃত্রিম পরমাণুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যা স্থূল স্কেলে ব্যবহার করা সম্ভব। মার্টিনিস এই পদ্ধতি ব্যবহার করে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের বর্তনী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির ক্ষেত্রে তাঁদের গবেষণা বলিষ্ঠ অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়।
রসায়নবিজ্ঞান
এ-বছর রসায়নবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ধাতব জৈব কাঠামো (metal-organic frameworks বা MOF) দিয়ে তৈরি এক আণবিক স্থাপত্য নির্মাণ করার স্বীকৃতি। এই কাঠামো তৈরির কাজ প্রথম শুরু করেন রিচার্ড রবসন ১৯৮৯ সালে। রবসন যখন মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ছাত্রদের রসায়নবিজ্ঞানের ক্লাসে বিভিন্ন যৌগিক পদার্থের গঠন পড়াতেন, তখন তিনি কাঠের তৈরি পরমাণুর মডেল দিয়ে কীভাবে একটি মৌল অপর একটি মৌলের সঙ্গে যুক্ত হয় তা ব্যাখ্যা করতেন। একদিন তিনি ডায়মন্ড বা হীরার মডেল তৈরি করতে গিয়ে ধারণা করেন যে, কার্বনের পরিবর্তে ধনাত্মক আধানযুক্ত কপার দিয়েও কোনো যৌগ গঠন করা সম্ভব। রবসন চার বাহুসদৃশ অণু টেট্রাসায়ানো টেট্রা ফিনাইল মিথেন কপার আয়নের সঙ্গে যুক্ত করলেন। মূলত এই যৌগের চারটি নাইট্রাল যৌগের সঙ্গে ধনাত্মক আধানযুক্ত কপার যুক্ত হয়। এর ফলে যে ধাতব জৈব কাঠামো পাওয়া যায়, তাতে রয়েছে অনেক বিবর বা শূন্যস্থান (cavity)। ১৯৮৯ সালে জার্নাল অফ দ্য আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি-তে রবসন এ-বিষয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এরপর ধাতব জৈবকাঠামো তৈরি করা নিয়ে গবেষণা পৃথিবীর নানা গবেষণা কেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা লক্ষ করলেন যে, রবসনের তৈরি ধাতব জৈবকাঠামো সহজেই ভেঙে যায়। তাই প্রয়োজন এই কাঠামোকে আরো স্থায়িত্ব কীভাবে দেওয়া যায়
সে-বিষয়ে গবেষণা। এ-বিষয়ে এগিয়ে এলেন জাপানের বিজ্ঞানী কিতাগাবা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী ওমর ইয়াগি। ১৯৯২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে এই দুই বিজ্ঞানী পৃথকভাবে ধাতব জৈবকাঠামো নির্মাণ করা নিয়ে নানা গবেষণা পরিচালনা করেন।
রবসনের তৈরি ধাতব জৈবকাঠামো সহজেই ভেঙে যায় দেখে অনেক বিজ্ঞানী এবং গবেষণা অর্থ জোগানদাতা প্রতিষ্ঠান তাকে ‘useless’ বললেও কিতাগাবা সে-সময় বলেছিলেন যে, তাঁর নীতি হচ্ছে ‘To try to see the usefulness of useless’। সমস্যা হচ্ছে যে, সে-সময় সচ্ছিদ্র বস্তু (porous material) যেমন অ্যালুমিনিয়াম এবং সিলিকন দিয়ে তৈরি জিওলাইট আবিষ্কার হয়ে গেছে, যার ব্যবহার রবসনের তৈরি ধাতব জৈবকাঠামোর মতো। ১৯৯২ সালে কিতাগাবা কপার আয়ন এবং অ্যাসিটোন জৈব যৌগ দিয়ে একটি ধাতব জৈবকাঠামো তৈরি করেন। ১৯৯৭ সালে কিতাগাবা কোবাল্ট, নিকেল এবং জিংক আয়নের সঙ্গে বাইপাইরিডিন জৈব যৌগ যুক্ত করে একটি ত্রিমাত্রিক ধাতব জৈবকাঠামো তৈরি করেন। কিতাগাবা লক্ষ করেন যে, এই কাঠামোতে বিদ্যমান বিবরে পানি অথবা অন্যান্য গ্যাস শোষিত হতে পারে, আবার এই তরল বা গ্যাসীয় পদার্থ অবমুক্ত করা যায়।
কিতাগাবা এই গবেষণাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ১৯৯৮ সালে জাপানের কেমিক্যাল সোসাইটি বুলেটিনে একটি
গবেষণা-প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধে কিতাগাবা দেখান যে, এই ধাতব জৈবকাঠামো বিভিন্ন ধরনের ধাতু এবং জৈব যৌগ দ্বারা তৈরি করা সম্ভব এবং এতে বিবরের আয়তন জিওলাইটের তুলনায় অনেক বেশি হবে। এ-ধরনের কাঠামো তাদের আকার পরিবর্তন করতে পারবে, অর্থাৎ কাঠামোর নমনীয়তা বাড়ানো যাবে। এরকমই নমনীয় একটি কাঠামো চিত্র ৩-এ দ্রষ্টব্য।
এদিকে ১৯৯২ সালে ইয়াগি অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধাতব জৈবকাঠামো নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি কপার ও কোবাল্ট দিয়ে দ্বিমাত্রিক কিছু ধাতব জৈবকাঠামো তৈরি করেন এবং দেখান যে, এ-ধরনের কাঠামোর বিবরে অন্যান্য অণু ঢুকে থাকতে পারে এবং অত্যন্ত স্থায়ী কাঠামো তৈরি করতে পারে। ইয়াগিই প্রথম যুক্তরাজ্যের ন্যাচার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধে
এ-ধরনের কাঠামোর নাম দেন ‘Metal-Organic Framework or MOF’। ১৯৯৯ সালে ইয়াগি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ধাতব জৈবকাঠামো তৈরি করেন, যার নাম দেওয়া হয় গঙঋ-৫। তিনি কার্বন, জিংক এবং অক্সিজেনের সমন্বয়ে এই কাঠামো তৈরি করেন। এ-ধরনের কয়েক গ্রাম কাঠামোতে বিদ্যমান বিবরের আয়তন প্রায় একটি ফুটবল খেলার মাঠের সমান (চিত্র ৪ দ্রষ্টব্য)।
এখানে উল্লেখ্য, কিতাগাবা যে ধাতব জৈবকাঠামো তৈরি করতে সক্ষম হন তার নমনীয়তা অনেক বেশি। অন্যদিকে ইয়াগি যে ধাতব জৈবকাঠামো তৈরি করেন তার স্থায়িত্ব বেশি এবং তাতে বিবরের পৃষ্ঠায়তন। সম্প্রতি জার্মানির ড্রেসডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদরা সর্ববৃহৎ ধাতব জৈবকাঠামো তৈরি করেছেন, যার নাম MOF-5। এর পৃষ্ঠতলের আকার প্রতি গ্রামে সাত হাজারেরও বেশি বর্গমিটার (চিত্র ৫ দ্রষ্টব্য)। ইয়াগির গবেষণাদলের অ্যারিজোনার মরুভূমির বাতাস থেকে তৈরি ধাতব জৈবকাঠামো পানি শোষণ করতে সক্ষম এবং সেই পানিকে কোনো পাত্রে সংগ্রহ করা যায়। তাছাড়া এই কাঠামো ব্যবহার করে বিভিন্ন দূষিত গ্যাস, যেমন কার্বন ডাইঅক্সাইডকে বায়ুমণ্ডল থেকে শোষণ করা সম্ভব। বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানোর ক্ষেত্রে এই আবিষ্কার অত্যন্ত বলিষ্ঠ অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়।
শারীরবৃত্ত বা চিকিৎসাবিজ্ঞান
মানবদেহের অনাক্রম্য পদ্ধতি immune system কী? এই পদ্ধতি কিভাবে অণুজীবের আক্রমণ থেকে আমাদের দেহকে রক্ষা করে? অণুজীব অনেক সময় মানবকোষ সদৃশ হয়। তাহলে দেহের অনাক্রম্য পদ্ধতি কীভাবে চিহ্নিত করতে পারে কোনটি দেহকোষ আর কোনটি অণুজীব। আমাদের দেহের অনাক্রম্য পদ্ধতি একটি জটিল নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কে আছে কোষ (cell), তন্তু (tissue) এবং অঙ্গ (organ)। এই পদ্ধতি জীবাণুকে শনাক্ত করে এবং দেহকে জীবাণুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। গবেষকরা ধারণা করতেন যে, দেহের অনাক্রম্যতা একটি কেন্দ্রীয় অনাক্রম্য সহনক্ষমতা (central immune tolerance) পদ্ধতির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। কিন্তু যে-পদ্ধতি ব্রুংকো, রামসডেল এবং সাকাগুচি আবিষ্কার করেন তাকে বলা হয় প্রান্তিক অনাক্রম্য সহনক্ষমতা (peripheral immune tolerance)। এই অনাক্রম্য পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয় যে T কোষ, যা অনাক্রম্য পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই T কোষকে চিহ্নিত করা হয়। T কোষ হচ্ছে এক ধরনের সাদা রক্তকোষ, যাকে বলা হয় লিম্ফোসাইট। কোনো জীবাণুর হাত থেকে দেহকে রক্ষা করার জন্য এই কোষ দেহের অনাক্রম্য পদ্ধতিকে সাহায্য করে। T কোষ দুই ধরনের। একটি সাইটোটক্সিন T কোষ, যারা সংক্রমিত কোষকে ধ্বংস করে। অপরটি হচ্ছে সাহায্যকারী ঞ কোষ (Helper T cell), যারা কোনো জীবাণুকে ধ্বংস করার জন্য অনাক্রম্য কোষে সংকেত প্রেরণ করে। উল্লেখ্য, T কোষের পৃষ্ঠতলে রয়েছে এক ধরনের গ্রাহক প্রোটিন। এই প্রোটিন সেন্সরের মতো কাজ করে। এই প্রোটিন তার আশেপাশের অন্যান্য কোষে কোনো জীবাণুর আক্রমণ হয়েছে কি না তা অনুভব করে। অসংখ্য T কোষের মধ্যে বিদ্যমান এই প্রোটিন কোষকে জীবাণুর হাত থেকে রক্ষার জন্য এক ধরনের পাহারাদার হিসেবে ভূমিকা পালন করে।
১৯৯৫ সালে সাকাগুচি নাগোয়ার আইচি ক্যান্সার গবেষণা কেন্দ্রে কাজ করার সময় লক্ষ করেন, দেহের অনাক্রম্য পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল। সে-সময় ধারণা করা হতো যে, অনাক্রম্য সহনক্ষমতা থাইমাস থেকে অনাক্রম্য কোষ নিষ্কাশনের মাধ্যম বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সাকাগুচি এক শ্রেণির অনাক্রম্য কোষ আবিষ্কার করেন, যার মাধ্যমে দেহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি অনাক্রম্য রোগ থেকে রক্ষা পায়। সাকাগুচি আবিষ্কার করেন যে, সাহায্যকারী T কোষ, যেখানে প্রোটিন CD-4 রয়েছে এবং ধ্বংসকারী বা সাইটক্সিক T কোষ যেখানে CD-8 প্রোটিন রয়েছে। কিন্তু একটি ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে সাকাগুচি লক্ষ করেন, একটি ভিন্ন ধরনের T কোষ আছে, যা অনাক্রম্য পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। ১৯৯৫ সালে ইমিউনোলজি জার্নালে তিনি একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যাতে উল্লেখ করেন যে, CD-25 নামে একটা প্রোটিন T কোষের পৃষ্ঠতলে আছে, যা দেহের অনাক্রম্য পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং এই নতুন T কোষের নাম দেওয়া হলো নিয়ন্ত্রণকারী T কোষ (Regulatory T cell) (চিত্র ৬ দ্রষ্টব্য)।
এদিকে ব্রুংকো এবং রামসডেল স্ব-অনাক্রম্য রোগের (auto-immune disease) কারণ নিয়ে গবেষণা করেন। ২০০১ সালে তাঁরা ওয়াশিংটনের একটি বায়োটেক কোম্পানিতে স্ব-অনাক্রম্য রোগের ওষুধের উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা করছিলেন। সে-সময় তাঁরা ধারণা করেন যে, কোনো একটি ইঁদুরের স্কারপি রোগের আণবিক কলাকৌশল জানতে পারলে তাঁরা স্ব-অনাক্রম্য রোগের কারণ সম্পর্কে জানতে পারবেন।
কয়েকটি পরীক্ষার মাধ্যমে এবং ইঁদুরের জিনোম বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্রুংকো ও রামসডেল সম্ভাব্য বিশটি জিন শনাক্ত করেন। তারপর তাঁরা একটি সুস্থ ইঁদুরের জিনের সঙ্গে স্কারপি রোগে আক্রান্ত ইঁদুরের জিনের তুলনা করেন। এর মাধ্যমে তাঁরা আবিষ্কার করেন যে, Foxp3 নামে একটি জিনের পরিব্যক্তির (IPEX) মাধ্যমে এই রোগের সৃষ্টি হয়। তাঁরা আরো আবিষ্কার করেন যে, মানবদেহে এই জিনের পরিব্যক্তির ফলে স্ব-অনাক্রম্য রোগের সৃষ্টি হয়, যাকে বলা হয় আইপেক্স সিনড্রোম (IPEX) (চিত্র ৭ দ্রষ্টব্য)।
তাঁদের আবিষ্কারের দু-বছর পরে সাকাগুচি তাঁর নিজের আবিষ্কারের সঙ্গে ব্রুংকো এবং রামসডেলের আবিষ্কারকে সমন্বিত করে দেখান যে, Foxp3 জিন নিয়ন্ত্রণকারী T কোষকে আমাদের দেহে তৈরি করতে সহায়তা করে, যে-কোষ তিনি ১৯৯৫ সালে আবিষ্কার করেন। এখানে উল্লেখ্য, নোবেল কমিটি তাঁদের প্রেস রিলিজ-পরবর্তী সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন, এ-বছর নোবেল পুরস্কার মূলত শারীরবৃত্তে প্রদান করা হয়েছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান, যেমন ক্যান্সার অথবা স্ব-অনাক্রম্য রোগের ওষুধ তৈরি এবং দেহে নতুন নতুন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন বা প্রতিস্থাপনে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
পরিশেষে এবার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষণা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এবং সংশ্লিষ্ট উদ্ভাবন যেমন কোয়ান্টাম কম্পিউটার আবিষ্কারে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে। রসায়নবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষণা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ, মরু অঞ্চলে পানির অভাব দূরীকরণ অথবা অতিপরিবাহী পদার্থ তৈরির ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রাখবে। শারীরবৃত্তে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষণা রোগাক্রান্ত দেহের নিরাময়ে যুগান্তকারী অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়। মানবকল্যাণে ব্যবহৃত আবিষ্কারকে নোবেল পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে স্বীকৃতি প্রদান করা ছিল আলফ্রেড নোবেলের স্বপ্ন। ২০২৫ সালে বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারস্বীকৃত গবেষণা আলফ্রেড নোবেলের স্বপ্নের যথার্থ বাস্তবায়ন বলে বিজ্ঞানীমহল মনে করেন।
সহায়ক তথ্যসূত্র
১. রাজকীয় সুইডিশ বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি (জঝঅঝ) প্রেস রিলিজ (৭-৮ই অক্টোবর ২০২৫)
২. নোবেল অ্যাসেম্বলি অফ ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট প্রেস রিলিজ (৬ই অক্টোবর ২০২৫)।
৩. Hori S. Nomura, T and Sakaguchi, S ‘Control of regulatory T cell development by the transcription factor Foxp3’. Science, 2003: 299: 1057-1061.
৪. Davour, A, Quantum Properties on a human scale, Popular Science Background , RSAS, 7 October 2025.
৫. Fernholm, A, They have created new rooms for chemistry, Popular Science Background, RSAS, 8 October 2025.
৬. Devoret, M H, Martinis, J. M and Clarke, J (1985) Measurement of macroscopic quantum tunnelling out of a zero voltage state of a current biased Josephson junction, Physical Review Letters, 55, 1908
চিত্রঋণ
চিত্র ১-৪ : রাজকীয় সুইডিশ বিজ্ঞান অ্যাকাডেমি এবং ইয়োন ইয়ার্নস্টেড।
চিত্র ৫ : ড্রেসডেন বিশ্ববিদ্যালয়।
চিত্র ৬-৭ : নোবেল অ্যাসেম্বলি অফ ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট এবং ম্যাটিয়াস কারলেন।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.