এর আগেও বিতর্কের ঝড় উঠেছে, এবারও তা ক্ষান্ত হয়নি, ভবিষ্যতেও এ-রকম বাকবিতণ্ডা নোবেল পুরস্কারকে ঘিরে চলতে থাকবে কিনা কে জানে! গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ঔপন্যাসিক আচিবিকে নোবেল পুরস্কারটি না দিয়ে আফ্রিকারই অন্য এক শ্বেতকায় ঔপন্যাসিক কোয়েৎজিকে যখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সাহিত্যপুরস্কারে ভূষিত করা হলো, তখনো কথা উঠেছিল। বেশ কবছর ধরেই এ-রকমটি হয়ে আসছে। নোবেল পুরস্কার-কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখনো পৃথিবীর অনেক দেশে এমন অনেক লেখক রয়েছেন যাঁরা নিজ-দেশে তো বটেই, আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান, পুলিৎজারও পেয়েছেন, কিন্তু নোবেল পুরস্কারের শিরোপা এখনো জোটেনি। যেমন-কানাডার দ্য ব্লাইন্ড অ্যাসাসিন উপন্যাসখ্যাত ঔপন্যাসিক মার্গারিট অ্যাটউড, লাতিন আমেরিকার ভার্গোস য়োসা, চেক ঔপন্যাসিক মিলান কুন্দেরা, মার্কিন লেখক ফিলিপ রথ এবং এ-রকম আরো অনেকে।
এ-কথা তো সত্য এবং স্বতঃসিদ্ধ যে, একটি নিয়মাবলির মাধ্যমে নোবেল পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ লেখাটি নির্বাচন করা হয়। একটি বিদগ্ধ জুরি-বোর্ড থাকে।তারপরও এ-রকমটি কেন হচ্ছে, এটি নিঃসন্দেহে বিস্ময়ের বিষয়।
এবারের সাহিত্যপুরস্কার পেয়েছেন অস্ট্রিয়ার লেখিকা এলফ্রিয়েদা ইয়েলিনেক। বাংলাদেশে বিপুলভাবে পরিচিতি না পেলেও, স্বদেশে তিনি জনপ্রিয়, বিতর্কিত এবং নিন্দিত। নোবেল পুরস্কারের তালিকায় তিনি দশম মহিলা, যিনি নোবেল পেলেন।
যারা মোটামুটিভাবে বিশ্ব-সাহিত্যের খবরাখবর রাখেন, তারা এই লেখিকার ১৯৮৮ সালে ইংরেজি ভাষায় রূপান্তরিত দ্য পিয়ানো টিচার উপন্যাসটির কথা নিশ্চয়ই মনে রেখেছেন। তাঁর বয়স এখন ৬২ বছর। তিনি ও তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে ইংরেজিতে ৩টি গ্রন্থ আর সরাসরি জার্মান ভাষায় আরো ৪টি গ্রন্থ রচিত হয়েছে। অতএব, ইয়েলিনেক বিশ্বসাহিত্যে একেবারে অচেনা কেউ নন। হয়তো আমাদের দেশে বহুলপঠিত নন, যেমনটি ক্লাসিক লেখক টমাস মান, অথবা হোল্ডারলিন, শ্রয়েডর, রীলকে, বের্টল্ড ব্রেখ্ট রয়েছেন। তবুও লেখায় এক ধরনের ব্যতিক্রমি শৈলী ও বিষয় খুঁজে পাওয়া যায়।
ইয়েলিনেক নিজ-বাসভূমে কেন নিন্দিত ও বিতর্কিত? না, তিনি এমন কিছু লেখেননি, যা তাঁর দেশ ও ধর্মানুভূতিতে আঘাত হেনেছে। নোবেল পুরস্কার-কর্তৃপক্ষের ঘোষণায় জানা যায়, ইয়েলিনেককে এই দুর্লভ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে ‘উপন্যাস ও নাটকে তাঁর গীতল গদ্যশৈলী, নারীর নির্যাতিত ও অবদমিত কণ্ঠস্বরের বহিঃপ্রকাশ এবং অসাধারণ ভাষাবৈদগ্ধ্যতার মাধ্যমে সমাজের অসংগতি, সংঘাত এবং ক্ষমতার রূপায়ণের জন্য।’
তিনি অস্ট্রিয়ার যে-সমাজে জন্মেছেন, তা ছিল জার্মান-অধ্যুষিত। তিনি ইহুদি-বংশোদ্ভূত অস্ট্রিয় জার্মান। দুই বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে বিক্ষুব্ধ পৃথিবীতে ১৯৪৬ সালের ২০ অক্টোবর অস্ট্রিয়ার স্টিরিয়া প্রদেশে জন্মেছেন। বাবা ছিলেন চেক-ইহুদি বংশোদ্ভূত, পেশায় কেমিস্ট, মা ছিলেন ভিয়েনার এক ধনী পরিবারের সংস্কৃতিবান নারী। শৈশবে ভিয়েনা কনজার-ভেটরিতে ইয়েলিনেককে পাঠানো হয় পিয়ানো ও অর্গান শেখার জন্য এবং ১৯৬৪ সালে তিনি আলবার্ট জিমনেশিয়াম থেকে গ্রাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করেন। এ-সময় তিনি নাট্যকলা এবং শিল্পের ইতিহাস-বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৭১ সালে কনজারভেটরি থেকে অর্গানিস্ট হিসেবে ডিপ্লোমা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
খুব ছেলেবেলায় তিনি কবিতায় অবগাহন করেন। সংগীত তাঁর কবিতায় প্রভাব বিস্তার করে। ১৯৬৭ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এ-সময় তাঁর জীবন একটি নতুন বাঁক নেয়। তিনি অস্ট্রিয়ার তদানীন্তন ছাত্র-আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং তাঁর লেখা এ-সময় সমাজ-নিরীক্ষায় দেদীপ্যমান হয়ে ওঠে।
সত্তর দশকের প্রথমার্ধের বেশ কবছর জার্মানির বার্লিন ও ইতালির রোমে কাটানোর পর গটস্ফ্রাইড হাংগস্বার্গকে বিয়ে করেন। এ-সময় তাঁর জীবন ভিয়েনা এবং মিউনিখে অতিবাহিত হয়।
Women as Lovers জার্মান ভাষায় ১৯৭৫ সালে এবং ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয় ১৯৯৪ সালে। Wonderful, Wonderful times জার্মান ভাষায় ১৯৮০ সালে এবং ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয় দশ বছর পর ১৯৯০ সালে। অতঃপর আত্মজৈবনিক উপন্যাস The Piano Teacher জার্মান ভাষায় ১৯৮৩ এবং পাঁচ বছর পর ইংরেজি ভাষায় ১৯৮৮ সালে অনূদিত হয়ে দেশে ও বিদেশে বিতর্কিত, নিন্দিত ও জনপ্রিয় হয়।
মাইকেল হ্যানেকি ২০০১ সালে এ-উপন্যাসটির চলচ্চিত্রায়ণ করেন এবং তা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
১৯৮৯ সালে Lust জার্মান ভাষায় লেখেন, যা তিন বছর পর ১৯৯২ সালে ইংরেজিতে অনূদিত হয়।
তাঁর অধিকাংশ উপন্যাসের কাহিনী নারী-নির্যাতন, যৌনপীড়ন এবং এক নিষ্ঠুর শাসনব্যবস্থা, যেখানে নারী নিয়ত নির্যাতনের শিকার, যেখানে চলছে অবিশ্রান্ত শোষণ ও সংঘাত। আমাদের এই সময়কে তিনি তাঁর উপন্যাসে তুলে এনেছেন এবং সে-কারণে তাঁর উপন্যাসের কাহিনী কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের কাহিনী নয়, বরং এর পরিধি আন্তর্জাতিক। একুশ শতকের সংস্কৃতি যে নারী-নিপীড়নে পর্যুদস্ত, শ্রেণিবৈষম্যে উৎপীড়িত, এসব কথা ইয়েলিনেক তাঁর উপন্যাসে কখনো তীক্ষèভাষায়, কখনো ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেছেন।
তিনি ১৯৭৪ সালে প্রথম বেতার-নাটক লেখেন। নাটকটি শ্রোতাদের অকুণ্ঠ প্রশংসা পায়। অতঃপর তিনি বেশ কটি বেতার-নাটক লিখেছেন। এ-সময় তিনি মঞ্চের জন্যেও নাটক রচনা করেন। গতানুগতিক নাট্যধারা থেকে তাঁর নাটক একটু আলাদা ধাঁচের। তিনি স্বগতসংলাপ বা মনোলোগ পরিহার করে একক কণ্ঠে অসংখ্য সংলাপের ধ্বনি সংযোজন করে একটি ভিন্নমাত্রার আবহ-তৈরিতে আগ্রহী হন। নাটকে চরিত্রও অল্প থাকে।
অস্ট্রিয় সাহিত্যের অপরাপর লেখক জোহান নেপোমুক নেস্ট্রোয়, কার্ল ক্রাউস, অডন ভন্ হরভাথ, এলিয়াস কানেত্তি, টমাস বার্নহার্ড এবং উইনার গ্রুপের লেখকরা তাঁর পরম পূজনীয় এবং এঁদের ঐতিহ্য সামনে রেখে ইয়েলিনেক এগিয়েছেন।
তাঁর উপন্যাস কেন ব্যতিক্রম? যে-পাঁচটি উপন্যাসের কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় সবগুলোর ভাষা সাবলীল, কিন্তু আঙ্গিক একটু আলাদা ধাঁচের – সেখানে কখনো নাট্যরীতি, কখনো সংগীতের (গানের) অন্তরা, কখনো কবিতা, কখনো চিত্রনাট্য ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু মোদ্দাকথা তাঁর মূল উদ্দেশ্য সত্য-উদ্ঘাটন। তা তিনি সফলভাবে করেছেন। প্রসঙ্গত, চমোস্কির একটি প্রবন্ধের কথা মনে পড়ছে। চমোস্কি Writers and his Intellectual Responsibility প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘লেখকের দায়িত্ব সত্যের উদ্ঘাটন করা।’ এ-রকম একটি কথা সার্ত্রেও বলেছেন তাঁর What is Literature গ্রন্থের একাধিক প্রবন্ধে। For Whom Does One Write A_ev What is Writing -এর কথা প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে। সার্ত্রে What is Writing প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখেছেন, ‘It is not only the form which differentiates, but the matter as well|’ GB matter বা বিষয়বস্তু ইয়েলিনেকের লেখায় একটি মিশ্র মাধ্যম হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে; অবশ্য সব উপন্যাসে নয়। Lust উপন্যাসটিতে লেখক আঙ্গিক বা ফর্ম নিয়ে অতটা গভীরভাবে ভাবেননি। তিনি নারী-নিপীড়নের ব্যাখ্যা করেছেন, ঘটনার পর ঘটনা সাজিয়ে অবরুদ্ধ অস্ট্রিয়ার বিরূপ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু The Piano Teacher সম্পূর্ণ অন্য এক উপন্যাস, অন্য এক গল্প। যৌনতা এবং উৎপীড়ন এই উপন্যাসের ভিত্তিভূমি রচনা করেছে। উপন্যাসটি আজকের ভিয়েনার পটভূমিতে লেখা। এরিকা কোহাট, বয়স তিরিশ, অবিবাহিত; তার মা তাকে শিল্পের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করেছেন। এরিকাও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে জীবনে কোনোদিন আর বিয়ে করবে না, আজীবন শিল্পের জন্য, বিশেষত পিয়ানো-বাজনায় নিজেকে উৎসর্গ করবে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার এই যে, সে সৃষ্টিশীল পিয়ানো-বাদক না হয়ে, পিয়ানো-শিক্ষিকা হলো। পৃথিবীর সবাই জানে যে, সে এক মাতৃভক্ত কন্যা, যে-মায়ের সঙ্গে থাকে, একই বিছানায় ঘুমায়। কিন্তু একইভাবে এই এরিকা চরিত্রের আরেকটি বৈপরীত্য, এক ধরনের যৌনতানির্ভর দিক লেখিকা পাঠকদের সামনে তুলে ধরেন। সে পিপ্ শো দেখতে যায়, স্থানীয় পার্কে অপেক্ষা করে, যেখান থেকে তুর্কি এবং সার্বো-ক্রোয়াটস খদ্দেররা যৌনকর্ম-সম্পাদনের জন্য নারীদের সংগ্রহ করে নেয়। ঘটনাচক্রে একদিন তার ক্লাসের এক ছাত্র, ওয়াল্টার ক্লিমার তার প্রেমে পড়ে এবং তাকে ভালোবাসার কথা জানায়। এরিকা এই প্রস্তাবগ্রহণ ও রাজি হওয়ার আগে উৎপীড়নমূলক যৌনক্রীড়া ও যৌনলীলা করার আকুল আগ্রহ প্রকাশ করে।
এই উপন্যাসের ভেতর দিয়ে আমরা একটি প্রতীক খুঁজে পাই। সাদা চোখে ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী মনে হলেও, আসলে এটি এক সামাজিক বিদ্রোহের কাহিনী। স্বৈরাচারী মা ও সমাজব্যবস্থাকে আমরা একাকার হতে দেখি; পর মুহূর্তে দেখি এক শান্ত মাতৃভক্ত কন্যা শেষ পর্যন্ত মায়ের রক্তচক্ষু অবজ্ঞা করে তার অবদমিত তৃষ্ণাকে পরিপূর্ণ করার প্রয়াস পায়, কিন্তু তার প্রকাশ একটু ভিন্নরকমের, হয়তো তা সমালোচকদের দৃষ্টিতে ‘বিকৃতি’ মনে হতে পারে। কিন্তু আমরা যদি সময় ও সমাজের প্রেক্ষাপটে রেখে বিচার করি, তাহলে দেখব, নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে ইয়েলিনেক পাশ কাটিয়ে যাননি। তিনি সত্যানুসন্ধানের জন্য বাস্তবের বিকৃত দিকটিও চিত্রিত করেছেন একজন সাংবাদিকের নির্মোহ পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া দিয়ে, অত্যন্ত যত্নসহকারে।প্রসঙ্গত, গতবারের নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক দক্ষিণ আফ্রিকার কোয়েৎজির ডিসগ্রেইস উপন্যাসটির কথা মনে পড়বে। দুটি উপন্যাস যেন একই সমতলে দাঁড়িয়ে আছে। দুটি উপন্যাসের বর্ণনা অত্যন্ত খোলামেলা, কখনো কখনো অসম্ভব নগ্ন, কিন্তু এইসব নগ্নতার ভেতর থেকে যে-ছবিটি ভেসে উঠে তাহলো এক মানবিক আবেদন : পৃথিবী উৎপীড়নমুক্ত হোক, মানুষের মৌল আবেগ ও আকাক্সক্ষা তার সঠিক দিকনির্দেশনা ফিরে পাক।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.