আমার সামনে আমাকেই কথাটা না বললে আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতাম না। আমার ধারণা কোনোভাবেই বিশ্বাস করার মতো কথা এটা নয়। আপনি শুনলে নিশ্চিত বলবেন মফিজের মাথা খারাপ হয়ে গেছে বলে অমন অস্বাভাবিক কথা বলতে পারে। হবে হয়তো। কিন্তু আমি সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষটা পাশে বসে সিগারেট টানছি, ওর কথা শুনছি, ওর সিগারেট শেষ হয়ে গেলে আমার কাছ থেকে চাইলো,

আরেকটা দে তো! ভালোই তো সিগারেটটা!

তুমি না হয় পুরো প্যাকেটটাই রাখ।

মফিজ তা না রেখে স্রেফ একটাই সিগারেট বের করে আগের সিগারেটের আগুন থেকে নতুনটা ধরিয়ে খুব তৃপ্তি করে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, জানিস রফিক, এই পনেরো-ষোলো দিনে উনিশ রকম সিগারেট খেয়েছি!

বলো কি?

হ্যাঁ। যতই ভাবি খাবো না, ততই দেখি বেশি বেশি খাচ্ছি। কোনো ব্র্যান্ড বাছ-বিচার নেই। আসলে বুঝতে পারছি, প্রচণ্ড টেনশন নিয়ে থাকতে হচ্ছে বলে টেনশন তাড়ানোর জন্যে একটার পর একটা খেয়ে যাচ্ছি, খেয়েই যাচ্ছি।

মফিজের কথা আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করছি। আমার স্থিরবিশ্বাস জন্মে এই সিগারেটটা শেষ হয়ে গেলে ও আরেকটা চাইবে। আমি তো পুরো প্যাকেটই দিতে প্রস্তুত, কিন্তু একটার বেশি দুটো কিছুতেই নেবে না। ওর সিদ্ধান্তের ওপরই ছেড়ে দিয়ে ঘরে ফিরে যাবার জন্যে শরীরটা সবেমাত্র তুলেছি, তখনই মফিজ সেই অবিশ্বাস্য কথাটা শোনায়।

যাচ্ছিস?

হ্যাঁ।

হ্যাঁ, তোর ঘর আছে, ঘরেই তো যাবি! যা!

মনে হয় মফিজ চাইছে না আমি যাই। আবার বসে পড়ে বলি, তুমি মনে হয় কিছু বলতে চাইছ!

আমার চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে মফিজ। ওর এই হাসি আমার পরিচিত। ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি, কারো চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলে বুঝতে পারতাম এখন একটা মজার ঘটনা বা গল্প বলবে। আরো লক্ষ করেছি, ও পারতপক্ষে শ্রোতার মুখ থেকে চোখ সরায় না, পাছে ওর কথাগুলো শ্রোতার কানের এপাশ-ওপাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়।

জানিস রফিক, এজন্যেই আমি তোকে পছন্দ করি।

মফিজের এটাও আরেকটা খেলা। অন্যের চোখে দৃষ্টি গেঁথে রেখে খানিকক্ষণ খেলিয়ে নেয়। খেলানোর সময় যদি সিগারেট টানতে থাকে তাহলে সিগারেটের ধোঁয়া নাক দিয়ে বের করবে, মুখ দিয়ে রিং বানিয়ে বের করবে, যেন চোখে ধোঁয়া লেগে চোখ সরু হয়ে গেছে এমন ভাব দেখিয়ে সরু চোখে শ্রোতাকে দেখে যায়, দেখেই যায়, যেন গোয়েন্দা অপরাধীর চোখের শিরা-উপশিরা ও মুখের রেখা পড়ে অপরাধ সম্পর্কে নিশ্চিত হচ্ছে। এখানে, এই সকালে ওর বাড়ির পাশেই রাস্তায় বসে ওর কথা শোনার জন্যে আমি যেখানে মুখে কিছু প্রকাশ না করেও ছটফট করছি, সেখানে মফিজ মনে হচ্ছে ভেতরে ভেতরে নিজেকে আরো গুটিয়ে নিচ্ছে। অথচ ওর অন্যের চোখে চোখ রেখে কথা বলার চরিত্র সম্পর্কে যখন আমি খুব ভালো জানি, তখন বুঝতে পারছি, ও এই যুদ্ধ সম্পর্কে কিছু বলবে, পাকিস্তানি আর্মির জ্বালাও-পোড়াও মারো-কাটো নিয়ে কথা তুলবে এবং বলবে ওর ঘরবাড়ি সহায়-সম্পত্তি সব পুড়ে যাওয়ার করুণ ঘটনা। জানি, সে-ঘটনা শোনা খুব কষ্টকর। তবু শুনতে হবে। শুনতে হবে বলেই আমি সক্কালবেলা ওর কাছে ছুটে এসেছি।

আমি আসলে ঢাকা থেকে ছুটে এসেছি বাড়িতে। বাড়িতে আমার মা ভাই-বোন আছে, ২৫ মার্চের পর আমার একমাত্র মেয়ে ও স্ত্রীকে আরো নিরাপত্তার জন্যে পাবনায় পাঠিয়ে ঢাকায় একা একা দিন কাটিয়ে, বাড়ির খবরের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে যখন ধৈর্য দুমড়ে মুচড়ে থেঁতলে হয়ে যাওয়ার অবস্থা, তখনই বাড়ি থেকে লোকমুখে হলেও বিশ্বস্ত খবরই আসে, ভালো আছে, ভালো আছে সবাই। এই ভালো আছে ও ভালো নেইয়ের মধ্যে যে-খবরটা আমাকে গভীরভাবেই বিষণ্ন করে, সেটি হচ্ছে মফিজের বাড়িটি নেই। মিলিটারি পুড়িয়ে দিয়েছে।

আমার একমাত্র ফুফাতো ভাই মফিজ। আমার চাইতে আট-নয় মাসের বড়। বড় বলে তুমি সম্বোধনে সম্মান দিই, কিন্তু একসঙ্গে সিগারেট খাওয়া, সুন্দরী মেয়ে মহিলাদের দেখলে আহা উহু করে শরীরের মাপ নিয়ে গবেষণা করতেও আমাদের বাধে না, ওখানে বড়-ছোট কাজ করে না। বয়সের অধিকারে মাঝে মাঝে মুরুব্বিয়ানা ফলাতে চাইলেও সেটা কখনো মাত্রা ছাড়ায় না, কখনো কখনো আমি মফিজকে মনে

করিয়ে দিই, বড় ভাই কী কখনো ছোটভাইকে বিড়ি খাওয়া শেখায়?

হাসে মফিজ।

আসলে কী জানিস রফিক? ধূমপানটান মাঝে মাঝে একা করতে ভালো লাগে না। সঙ্গী-সাথি থাকলে ব্যাপারটা জম্পেশ হয়। আর তুই যখন হাতের কাছেই আছিস, তখন তোকেই সঙ্গী বানাই!

কিন্তু আব্বা টের পেলে হাড় গুঁড়ো করে দেবে।

টের পাওয়াবি না!

কিন্তু গন্ধ?

লে বাব্বা! সেটাও শিখিয়ে দিতে হবে? শোন, গন্ধ মারার জন্যে জামপাতা না হয় এলাচ কিংবা লবঙ্গ চিবোবি! গন্ধ বাপ বাপ করে পালাবে।

মফিজের এই শিক্ষা কাজে লাগেনি। কলেজে পড়ার সময় আব্বা সিগারেটের গন্ধ বুঝতে পেরে কষ্টে ও ঘৃণায় আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, তা দেখে মনে হয়েছিল, এর চাইতে দুটো চড়থাপড় খাওয়াও ছিল অনেক ভালো। তবু আমি ধূমপান ছাড়তে পারিনি, কিন্তু শুনেছি আমার ধূমপান-গুরু মফিজ সিগারেট প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। শৌখিন ধূমপায়ীদের মতো খায়। কিন্তু সে কত বছর আগে? মনে পড়ে না।

ততদিনে আমি আর পাবনায় নেই। আমি ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা বহুদিন থেকেই। বাড়ি যাই না কতদিন, তাও মনে পড়ে না। হঠাৎ গেলে একদিন, বড়জোর দুইদিন, আবার ঢাকা। রাস্তায় বেরোলে পরিচিত মুখ চোখে পড়ে না। আমার নিজ জন্মশহরে এক বিদেশী অতিথির মতোই ঘুরে বেড়াই। হাতেগোনা যে-কয়বার গিয়েছি, সব বারই যে মফিজের সঙ্গে দেখা হয়েছে তা-ও নয়। আমাদের বাড়ি লাগোয়া বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও কোনো কোনোবার ফুপুর বাড়ি যাইনি। মফিজের খোঁজ নেওয়াও প্রয়োজন মনে করিনি। রাস্তায় দেখা হলে, কিরে, কবে এলি? জিজ্ঞেস করে। তেমনি আমিও তুমি কেমন আছো-র সাথে ঢাকার খবর কী, চাকরি-বাকরির খবর কী, ঘরবাড়ি কবে করবি জাতীয় প্রশ্নের মধ্যেই কথারা ঘুরতে থাকলে একসময় আমি বলি, চলি। মফিজ বলে, যাইরে, বাড়িতে আসিস। জবাব দিই, যাবো। এবারে মনে হয় হলো না। আগামীবার।

অবাক হয় মফিজ। পাশাপাশি বাড়িতে পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে তাকালে আরেক বাড়ির খবর যেখানে নেওয়া হয়ে যায়, সেখানে গিয়ে ফুফুকে দেখে আসাও হয় না বলে খানিক খারাপ লাগে, পরে ঠিকই ভুলে যাই। এমনিই দশ-এগারো বছর আগে একবার বাড়ি এসে মফিজের বাড়ির দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠি, মফিজের পশ্চিম দিককার কালো টিনের ঘরটা নেই, উত্তরের খড়ের ঘরটা নেই, সেখানে নতুন ঢেউ খেলানো টিনের চালে সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে। জিজ্ঞেস করি, মা, মফিজ নতুন ঘরদোর বানাল কবে?

এইতো মাস দেড়েক।

দেখে বড্ড ভালো লাগছে।

যাও না, গিয়ে দেখে এসো।

মা না বললেও এবারে আমি নিজেই যেতাম। মফিজের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে, ঘরদোরের চেহারা ফিরেছে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে বাড়ির চারপাশে একটা শান্তি আর সুখ গলাগলি দাঁড়িয়ে আছে। একটা সিগারেট ধরিয়ে মফিজের সদর দরজার কাছ থেকেই হাঁক দিই, ওস্তাদ! ঘরে আছো?

আমার গলা শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ভাবি।

কে? কী কপাল আমার! গরিবের বাড়িতে হাতির পা?

ভাবি, হাতি নই, গাধা।

আমাদের চোখে হাতিই। তা কবে এলেন?

রাতে। আমার ওস্তাদ কই?

ভাবি চোখ দিয়ে ইশারা করে বাথরুম দেখায়, আর সে-মুহূর্তেই মফিজ সেখান থেকে বলতে বলতে বেরোয়, আমাকে আর ওস্তাদ বলবি না।

কেন?

আমি তো বিড়ি-সিগারেট প্রায় ছেড়েই দিয়েছি। কিন্তু শুনলাম তুই নাকি সিগারেটের পাছায় পাছায় আগুন দিয়ে খাস?

মফিজের এ-কথার জবাব না দিয়ে আমি চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাড়ি দেখতে থাকলে এক ফাঁকে লক্ষ করি, মফিজের মুখমণ্ডলে গর্ব ও আনন্দ গলে গলে পড়ে মুখের চারপাশ স্নিগ্ধতায় ভরে তুলছে।

বড় ভালো লাগল!

কিছু বললি?

না, বললাম, বড় ভালো লাগল। কেন লাগল জানো?

কী?

আমাদের স্কুলের পাঠ্যবইয়ে একটা আদর্শ বাড়ির ছবির কথা মনে হলো। বাড়ির চারভিটের চারটি ঘর, পূর্ব ও দক্ষিণ কোনায় রান্নাঘর, অদূরে গোয়ালঘর, সব মিলে যায়, পাঠ্যপুস্তকের আদর্শ বাড়ির সাথে মিলে যায়।

মফিজ, এ না দেখছি সেই পাঠ্যপুস্তকের বাড়িরে!

হাসে মফিজ।

রফিক, তুই না কত বই পড়েছিস! তোর তো আরো বলা উচিৎ নিকোনো উঠোন, উঠোনের কোনায় কোনায় গাঁদা ও দোপাটি ফুল, এক কোনায় পায়রার খোপে পায়রার বাকুম বাকুম, উঠোন ও খোলায় মুরগি খুঁটে খুঁটে খাবার খায়, বল ঠিক কিনা?

আরে এইজন্যেই তো তুমি আমার ওস্তাদ। আমি বেশি লেখাপড়া করলে কী হবে, করি তো হিসাব-নিকাশ ডেবিট-ক্রেডিটের কাজ, সেখানে কল্পনা খাটানোর কোনো সুযোগ নেই।

মফিজের সেই তৃপ্ত মুখচ্ছবিটি দীর্ঘ, দীর্ঘদিন আমার চোখে লেগে ছিল। আমি বহুজনকে আদর্শবাড়ি বলতে মফিজের বাড়ির কথা বলেছি, কিন্তু সেই বাড়িটা যে নেই তো নেই হয়ে গেছে তা নিজ-চোখে না-দেখলে বিশ্বাস করতাম না। শুধু, শুধু চারঘরের চারটে ভিটে, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, পায়রার ঘর নেই, রান্নাঘরের উপরে ঝাঁকড়া জামগাছটার ডালপাতাগুলো পুড়ে কালো হয়ে শূন্যে ঝুলে আছে। জামকালে মাটিতে জাম পড়ে পড়ে উঠোনের একটা কোনা বেগুনি হয়ে থাকত, আদর্শ বাড়ি হওয়ার আগেও ভাবি বাটিতে জাম-লবণ নিয়ে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে সামনে মেলে দিয়েছে। এখন ওখানে কেবল জামগাছের অবয়ব।

না, মফিজের সামনে আর বসে থাকা যায় না। আমার অনুমান যদি ভুল না হয় তাহলে নিশ্চিতভাবেই ওর শরীর ও মনের ভেতরটা ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার চোখে-মুখে বিন্দুমাত্র প্রকাশ নেই দেখে গা ঝাড়া দিয়ে সত্যিই উঠে পড়ে বলি, মফিজরে, ঘরে যাই।

কোনো জবাব দেয় না মফিজ। না দেওয়াতেই মনে হয় পায়ে আমার বেড়ি পড়ল। যাওয়ার অনুমতি দিলে স্বচ্ছন্দে যাওয়া যেত, না দিলে বসে আরো কিছুক্ষণ কথা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো, কিন্তু আমি তখন অসহায়ের মতো বাতাস আঁকড়ে ধরে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখার চেষ্টা করি। মনে পড়ে, কালরাতে বাড়ি পৌঁছে মা বলে ডাক দিলে আমার সহসা মনে হয় বাড়ির সমস্ত অন্ধকার ভেঙেচুরে মা, বৌ, ভাই, বোন, রাখাল, কাজের বেটি, লজিং মাস্টার, এমনকি বাড়ির পোষাকুকুর লাটু পর্যন্ত বেরিয়ে এলো; দেখতে দেখতে মফিজের বাড়ির পূবপাশের হোসেন মিস্ত্রির দুই ছেলে, তাদের বৌ-বাচ্চা, সব, সবাই বেরিয়ে এলো, কিন্তু সেখানে মফিজ নেই।

মা, মফিজ আসে না?

হ্যাঁ। তুমি আসবে বলে সারা বিকেল-সন্ধ্যা বসেই ছিল, তুমি আসছো না বলে ওর সে-কী

চিন্তা! মাগরেবের নামাজ, এশার নামাজ পড়ে জায়নামাজে বসেই কেঁদে কেঁদে তোমার জন্যে দোয়া করল। আমাদেরও কী চিন্তা। তা বাবা রফিক, এত দেরি হলো কেন?

মা, দেশ কি আর দেশ আছে? সারা রাস্তায় কত যে পোড়া বাড়িঘর, ভাঙা ঘরদোর, লাশও দেখেছি মা, মিরপুর ব্রিজের পুবে মাঠে দুটো লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি, দেখলাম কাক আর শকুন আর কুকুরের কামড়া-কামড়ি, রাস্তা থেকেও পচা লাশের গন্ধে টেকা যায় না মা, সহ্য করা যায় না। মা, আমার আসলে আগে থেকে বাড়ি আসার খবরটা দেওয়া উচিৎ হয়নি। মিরপুরে আসার পর বাসের সব প্যাসেঞ্জার লা ইলাহা ইল্লা আনতা পড়তে পড়তে এসেছে, আমিও এসেছি, তবু মা ভাবিনি ঠিকমতো পৌঁছুতে পারব।

ছোটবোন মাকে মনে করিয়ে দেয়, মা, সব কথা কী বাড়ির বাইরে সারবে?

সম্বিৎ ফেরে মা-র। আমারও। যে-ঘরে আসার জন্যে এতটা বিপদ-সংকুল পথ পাড়ি দিয়ে এলাম, সেই ঘরেই ঢোকা হয় না দেখে আমার নিজেরই অবাক লাগে। বৌয়ের কোল থেকে মেয়েকে নিয়ে ঘরের দিকে যেতে যেতে জানতে চাই, আনজুম, মফিজ গেল কোথায়?

কী জানি! মফিজ ভাই তো কিছুক্ষণ আগেও ছিল। মনে হয় এক্ষুনি এসে পড়বে।

ওর বাড়ি কী একেবারেই পুড়ে সাফ?

আর বলো না। মাটি। শুধু মাটি।

ভাবি বাচ্চারা কোথায়?

কোন গ্রামে যেন! সেখানে ভাবির এক চাচা থাকে। শুনেছি সেখানেই।

মনে ঝাঁকুনি লাগে। ভাবি-বাচ্চারা কোথায়, মফিজ কোথায়, সব এলোমেলো হয়ে যেতে থাকে আমার কাছে। জিজ্ঞেস করি আনজুমকে, মফিজ খায় কোথায়? থাকেই বা কোথায়?

বড় একটা শ্বাস পড়ে আনজুমের।

আর বলো না! তার থাকা-খাওয়ার ঠিক নেই, ঘুমানোর ঠিক নেই। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার কি জানো? মানুষটা এখনো মাঝে মাঝে এমনভাবে হাসে যে, মনেই হয় না তার অতো সুন্দর সাজানো গোছানো বাড়িটি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আর কেউ হলে ঠিক পাগল হয়ে যেত, না হয় হার্টফেল করত।

আমার তখনই মফিজের ভিটে দেখতে যেতে পা তৎপর হয়ে ওঠে। কিন্তু জানি, ঢাকা থেকে বিপদ-আপদ ডিঙাতে ডিঙাতে নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে বাড়িতে পৌঁছানোর পর এখন কেউই আমাকে বাড়ির বাইরে যেতে দেবে না। আনজুম আমাকে বোঝে বলে আরো আগলে রেখে বলে, মফিজ ভাই তার খোলা ভিটেতেই ঘুমায়।

এ্যাঁ! বলো কী? যদি বৃষ্টিটিষ্টি আসে!

আসে কী? পরশু রাতে তো আকাশভাঙা বৃষ্টি হয়ে গেল। সেই বৃষ্টির মধ্যে মফিজ ভাই শুধু একটা মানকচুর পাতা মাথায় দিয়ে বাড়ির ভিটেয় বসে সারারাত কাটিয়েছে।

পাগল-টাগল হয়ে গেল নাকি?

নাহ্! তেমন কোনো লক্ষণই নেই। কাল সকালে দেখলেই বুঝবে।

আনজুমের কথা মাথায় নিয়ে রাতে থেকে থেকে ঘুম ভেঙে যায়, ঘুম ভাঙার সাথে সাথে মনে মফিজের মুখ ভেসে ওঠে, ভাবি, এখনই গিয়ে দেখে আসি মফিজ শূন্য খাঁ খাঁ ভিটেতে শুয়ে আছে কিনা, থাকলে কীভাবে আছে, এখন ওর মানসিক অবস্থাই বা কেমন? আমার আসার পথে চরম অনিশ্চয়তা আর ধকল আর ক্লান্তি নিয়ে শুয়ে পড়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ি, ঘুম আসার আগ দিয়ে আনজুমের সঙ্গে সঙ্গম করার ইচ্ছে জাগলেও ঘুমের কাছেই হার মেনে যাই। রাতে প্রথম ঘুম ভাঙার পর এই প্রথম জড়িয়ে ধরি আনজুমকে, কিন্তু কোথায় আনজুম, সে-ও গভীর ঘুমে। জাগাই না ওকে। জড়িয়ে ধরেই চোখ চেপে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করতেই দেখি চোখের সামনে মফিজের অবয়ব। আমার মনে হয় মফিজ বলছে, আশ্চর্য! তুই আমার সঙ্গে দেখা করলি না? জবাব জোটে না আমার মুখে। বিড়বিড় করে বলি, সকালে, সক্কালেই যাবো।

সহসা ঘুম ভাঙে আনজুমের। ভেঙেই আমার বিড়বিড় শুনতে পেয়ে বেশ জোরেই একটা ধাক্কা দেয়, শুনছ, এই শুনছ?

শান্ত গলায় জবাব দিই, আমি জেগে।

কিন্তু তুমি যেভাবে বিড়বিড় করছিলে তাতে মনে হচ্ছিল তোমাকে বোবায় ধরেছে।

আনজুম, মনে হলো মফিজ আমাকে এসেই দেখা না করার জন্যে বকলো। সত্যিই তো! ওর এতবড় বিপদের পর এসেও অন্তত ভিটেটাও দেখতে যাইনি, খারাপ লাগারই কথা! আমি এখন যাই? যাবো আর আসব।

মুখ চেপে ধরে আনজুম।

ক্ষেপেছ? এই রাতে? মরে গেলেও তোমাকে যেতে দেবো না।

আনজুম আমাকে যেতে দেয়নি। ওর ভালোবাসার গভীরে আমি ডুবে যাই, আমরা দুজনেই ডুবে যাই, একসময় ঘুমিয়েও যাই, সহসাই ঘুম ভাঙে পাখির কিচিরমিচির ডাকে। জানালার একটা পাল্লা সামান্য একটু খুলেই দেখতে পাই রাত নেই, সূর্যও ওঠেনি, বেশ পরিষ্কার হয়ে এসেছে চরাচর। আমি তো এই সময়েই মফিজের কাছে যাবো কথা দিয়েছি! আনজুমের দিকে তাকিয়ে দেখি বড় আনন্দ আর তৃপ্তি মুখে মেখে ঘুমুচ্ছে, ওকে ডাকিনে, পাছে মুখের ওই সুখময় প্রলেপ মুছে যায়।

একটা সিগারেট ধরিয়ে মফিজের বাড়ির দিকে পা বাড়িয়ে একবার থমকেও যাই। গিয়ে কী দেখব মফিজ খোলা আকাশের নিচে শূন্য ভিটেয় শুয়ে আছে, কী অবস্থায় আছে ও সেই দৃশ্য দেখে সহ্য করতে পারব কিনা – নানা দ্বিধায় জড়িয়ে শেষে জড়িত পায়েই গিয়ে দেখি, আসলেই কিছু নেই, খোলা আকাশের নিচে শূন্য ভিটেয় মফিজও নেই। মনে হয় বাড়ি পৌঁছে যখন ওকে দেখিনি তখন ও নিশ্চয়ই রাতে আসেইনি। আনজুমও এইরকম একটা কথা বলেছিল। কোথায় খায় কোথায় থাকে ঠিক নেই। মফিজদের ঘরের ভিটেয় দাঁড়িয়ে যখন বাড়ির চারপাশ চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছি, তখনই শুনি, রফিক, আমি এখানে।

তাকিয়ে দেখি, মফিজ অদূরেই একটা ঝাঁকড়া নিমগাছের নিচে বসে সিগারেট টানছে। ধীরে ধীরে যাই ওর কাছে। আশ্চর্য, মফিজ আমার দিকে চোখ তুলল না, শুধু পাশে বসতে বলে একমনে সিগারেট টেনে যেতে থাকলে সময়টা আমার কাছে দীর্ঘ অস্বস্তিকর ও প্রচণ্ড ভারি মনে হতে থাকে। তারপর এ-কথা ও-কথা সে-কথার পরই মফিজ আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসতে থাকে। ভয় লাগে আমার। মনে হয় এটা পাগলের হাসি। আরো মনে হয় শান্ত পাগলরা যে-কোনো সময় ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। শুকনো গলায় ডাকি, মফিজ!

বল, শুনছি।

তুমি ওভাবে হাসো কেন?

লেবাব্বা, হাসি পেলে হাসব না তো কাঁদব?

কিন্তু কেন হাসছ?

মফিজ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বামহাতের তর্জনী ও মধ্যমা ভি আকার বানিয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিলে মনে পড়ে, হ্যাঁ, এই তো সেই আগের মফিজ, সিগারেটে আমি যখন পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তখন, তখনই যেন গুরুদক্ষিণার মতো দুই আঙুলের মাঝখানে সিগারেট গুঁজে দিচ্ছি।

হুঁ! জানতে চাচ্ছিলি হাসছিলাম কেন। শোন। একেবারে গোড়া থেকে বলব?

বুঝতে পারছি আমার ধৈর্য ধারণ করা কষ্টকর হয়ে উঠছে। বলি, প্লিজ, বলো।

মফিজের দিক থেকে আর কোনো কথা আসে না দেখে মুখ ঘুরিয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি, চোখ বন্ধ, ঠোঁট-দুটো বিড়বিড় করছে। ডাকি, মফিজ! মফিজ!

আকাশ-বাতাস ফাটিয়ে কাঁপিয়ে তোরই চাচাতো ভাই মঞ্জু বলে গেল, পালাও, সবাই পালাও শিগগির, মিলিটারি এসে গেছে, পাড়ায় ঢুকে পড়েছে, ওই, ওইতো বয়েন মোল্লার বাড়ির কাছেই গুলির শব্দ, আমি তখন দিশেপিশে না-পেয়ে তোর ভাবি ও ছেলেকে বললাম, দৌড়াও, দৌড়াও তোমরা, আমি ঘর থেকে টাকা-পয়সা গয়নাগাটিগুলো নিয়ে আসি, ওরা চলে গেল, আমি ঘরের চৌকাঠের কাছে পৌঁছেই দেখি, যদি ভেতরে গিয়ে ওগুলো বের করতে থাকি, ততক্ষণে ওরা নির্ঘাত এসে যাবে, আর আসা মানেই আমি নেই। রফিক, আমি আর দ্বিতীয় চিন্তা না করে একদৌড়ে বড় রাস্তার ওইপাশে তোদের আমবাগানের ঝোপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে দেখলাম, মিলিটারি আমার বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল। মনে মনে বলি, এশ্ শালারা, একটা মানুষও পাবি না যে মারবি, মানুষ মারতে না পারলে বাল ছেঁড় বসে বসে! ঠিক এই কথাগুলোই ভাবছি। কিন্তু রফিক, একবারও মনে আসেনি ঘরে আগুন দেবে, ঘুণাক্ষরেও না। হঠাৎ দেখি পিলপিল করে, দৌড়ে বেরিয়ে আসছে শুয়োরের বাচ্চারা। আর তারপরেই চারভিটের চারটে ঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, পায়রার খোপ, দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। জানিস রফিক, তখন আমার এটাও মনে হয়েছিল পাকিস্তানি হারামজাদা মিলিটারিদের চোখে শত্রু আমি নই, আমার ঘরগুলো, যেন ঘরগুলোর ওপরই সব আক্রোশ। তো পোড়া! ঘর পুড়িয়ে যদি আশ মেটে তো পোড়া! আমি দেখছি কী গমকে গমকে আগুন উঠছে, যেন আগুনই আগুনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কত উঁচুতে উঠতে পারে তার প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে। বল রফিক, তুই-ই বল, আমার কিছু করার ছিল তখন? একমাত্র চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিইবা করতে পারতাম! দে, আরেকটা সিগারেট দে।

সিগারেটের আগুন থেকেই সিগারেট ধরিয়ে বেশ খানিকক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকে মফিজ। আমি ডাক দিইনে, আসলে দিতে পারিনে, গায়ে হাত দিয়ে ঝিম থেকে জাগিয়ে দেবো, তাও করিনে, সত্যি বলতে, করতে পারিনে। একসময় নিজেই জাগে মফিজ, রফিক আছিস?

হ্যাঁ, তোমার পাশেই তো।

আমার বাড়িটি এত ভালোভাবে পুড়েছে কেন জানিস?

কেন?

আমার বাড়ির সমস্ত খুঁটি কড়ি বরগা খাঁটি ঘি দিয়ে পানেট করা ছিল।

কী ছিল?

অবাক হয়ে জানতে চাইলে মফিজ চিপ করে হেসে জবাব দেয়, পানেট মানেও ভুলে গেছিস? পানিতে কাঠ-বাঁশ অনেকদিন ডুবিয়ে রেখে যে-সিজনড্ করা হয়, ও-হো! ভুলেই তো গেছি তোর এখন দেশের মাটির সঙ্গে যোগাযোগই নেই। থাকলে ঠিক বুঝতি।

মফিজ পুরোপুরি ব্যাখ্যা করার আগেই যে পানেট শব্দটির অর্থ আমি বুঝেছি তা আর বলার সুযোগ পাইনে, তার আগেই আমার চোখের গভীরে চোখ রেখে প্রশ্ন করে মফিজ, রফিক, ঠিক করে বলত, আমার বাড়িটিই শুধু পুড়লো কেন? তোদের বাড়িটা কেন পুড়ল না? আমার বাড়ির চাইতেও তোদের বাড়িটা বড়, পুড়তেও অনেক সময় লাগত, আগুন পুড়িয়েও আনন্দ পেত, তাও হারামির বাচ্চারা শুধু আমার বাড়িটির দিকে নজর দিল? আসলে কী জানিস রফিক, ওরা মনে হয় ঠিকই জেনেছে তোদের বাড়ি পোড়া না পোড়া সমান কথা, পোড়াতে হবে আমাদের।

আমি ছটফট করে উঠি।

মফিজ, তোমার কথা ঠিক নয়। ওরা যেভাবে জ্বালাও-পোড়াও চালিয়েছে, তাতে কোনো কোনোটা হঠাৎ বেঁচে গেছে। আমাদেরটাও সে-রকম।

রফিক, পাগল বোঝাস না আমাকে। লুট করতে, পোড়াতে এসে কেউ কী প্রথমে ছোট জিনিসে হাত দেয়? তুইতো এসেছিস আমার বাড়ি, যাকে তুই আদর্শ বাড়ি বলেছিলি, সেটি কেমনভাবে পুড়েছে দেখতে।

মফিজ! মফিজ!

দেশের বাড়ির সঙ্গে যার যোগাযোগ নেই, সে দেশের কী বুঝবে রে? দরদ দেখাতে এসেছিস?

বিশ্বাস করো, বিশ্বাস করো, না। তুমি মাকে জিজ্ঞেস করো, আনজুমকে জিজ্ঞেস করো, জানতে চাও তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছি কিনা?মফিজ আবার খানিকক্ষণ ঝিম মেরে বসে থেকে, যেন শব্দগুলো টিপে টিপে বলে, রফিক, রফিকরে, তোর জন্যে আমি সারারাত পোড়াভিটেয় জেগে বসে ছিলাম।