পাঠকের চিঠি

সমরেশ মজুমদার ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ

আধুনিক বাংলা উপন্যাসের জগতে সমরেশ মজুমদারের পরিচয় নতুন করে দেবার প্রয়োজন পড়ে না। বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকদের একজন তিনি। তিনি উভয় বাংলার জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকও। লিখেছেন বিস্তর। তাঁর গর্ভধারিণী, কালবেলা, কালপুরুষ, উত্তরাধিকার ও সাতকাহন উপন্যাসের জন্যে বাঙালি পাঠকসমাজ তাঁকে বহুকাল মনে রাখবে। যদি তিনি আর নাও লেখেন (তা যেন কখনো না হয়) তবু তিনি উল্লিখিত উপন্যাসের জন্যেই ইতিহাস হয়ে থাকবেন। তাঁর উপন্যাসের স্তুতি করা আমার মূল লক্ষ্য নয়। লক্ষ্য হলো – কালি ও কলম কার্তিক ১৪১১, অক্টোবর ২০০৪ সংখ্যায়, নিয়মিত কলামে লেখা ‘নিবেদন’ প্রসঙ্গে কিছু কথার অবতারণা করা।

সমরেশ মজুমদারের মতো লেখকের লেখা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ-সংশয়-বিদ্বেষ নেই। কিন্তু কালি ও কলমের উল্লিখিত সংখ্যার ‘নিবেদন’ পড়ে আমার মধ্যে একটা বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। বিস্ময়ের সঙ্গে যোগ হয়েছে কিছু প্রশ্নের। সমরেশ মজুমদার তাঁর নিবেদনে প্রকাশ করেছেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধীদলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগ-প্রধান শেখ হাসিনা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকাকালে গর্ভধারিণীর পাইরেট (গ্রন্থস্বত্বাপহরণ) প্রসঙ্গে আরো অনেক বিখ্যাত লেখকসহ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। লেখক শেখ হাসিনা সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন – ‘বাংলা সাহিত্যের খবরাখবর উনি ভালো রাখেন।’ শেখ হাসিনা শুধু বাংলা সাহিত্যের খোঁজ-খবরই নেন না, তার সঙ্গে তিনি আন্তরিকভাবে বসবাসও করেন। লেখালেখির সঙ্গেও তিনি ভীষণভাবে যুক্ত। বাংলাদেশের অনেক প্রাবন্ধিকের তুলনায় তাঁর লেখার মানও খুব কম নয়। কেননা তিনি ওরা টোকাই কেন, বাংলাদেশের স্বৈরতন্ত্রের জন্ম, সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র, দারিদ্র্য দূরীকরণ : কিছু চিন্তাভাবনা ইত্যাদি গ্রন্থের লেখক। এ-বিষয়টির উল্লেখ থাকলে ভালো হতো। লেখক তাঁর নিবেদনে তাঁর সামনে শেখ হাসিনার আসল ও নকল বই-বাছাই সম্পর্কে বলেছেন – ‘এটা প্রশংসা না নিন্দা, আমরা বোঝার চেষ্টা করলাম।’ উত্তরে বলতে চাই, এটা আপনার প্রশংসাই বটে, নিন্দার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি আসল ও নকল বই দুখানি হাতে নিয়ে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, যাঁরা সত্যিকার বইপ্রেমিক ও পাঠক তাঁরা ঠিকই বইয়ের অরিজিন্যাল কপিটিই সংগ্রহ করবেন, নকলটি নয়। লেখক কেন এটি বুঝতে পারেননি তা বুঝলাম না। আমার শ্রদ্ধাভাজন ঔপন্যাসিককে জানাতে চাই যে, বাংলাদেশের একটি শ্রেণি আছে (ধর্মান্ধ) যারা আপনাকে কিছুটা এড়িয়ে চলে (তাতে আপনার কোনো ক্ষতি নেই), আর এর কারণ, এদেশের মেহনতি মানুষ, তাদের ভাষা, তাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আপনার শ্রদ্ধার শেষ নেই। এর জন্যে আপনার কাছে আমাদেরও ঋণ কম নয়।

নিবেদনে আমি সবচেয়ে হতবাক হয়েছি লেখকের সঙ্গে এরশাদের ঘটনাবহুল ক্ষণটিকে ঘিরে। লেখক কি এরশাদকে চিনতেন না, নাকি তাঁর সম্পর্কে জানতেনও না? এরশাদ সকালে নাস্তা করার প্রস্তাব জানালেন আর লেখক ওটিকে ‘এ-তো ভালো কথা’ বলে গ্রহণ করলেন। আমি অবাক হয়েছি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সবিতেন্দ্রনাথ রায়, বাদল বসু, ইমদাদুল হক মিলনসহ ভারত-বাংলাদেশের অনেক লেখকই এরশাদের সঙ্গে সেই সময়ে দেখা করার, সাক্ষাৎ করার প্রসঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। অথচ আপনি শেষ পর্যন্ত এরশাদের সঙ্গে দেখা করলেন-ই। এর কারণ কী? জেলখানায় বসে এরশাদ আপনার সাতকাহন উপন্যাস পড়েছিলেন, সেইজন্যেই কি? আমি বুঝতে পারলাম না যে, আপনি একজন স্বৈরাচারী, অর্থলোভী, নারীলোভী, অবৈধ ক্ষমতা-ভোগকারী, ব্যর্থ রাষ্ট্রপতিকে চিনতে পারেননি। আমি আরো আশ্চর্যান্বিত হয়েছি এই ভেবে যে, আপনি যখন এরশাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, তখন উল্লেখ করেছেন – ‘সমস্ত পৃথিবীতে আপনি (এরশাদ) পরিচিত।’ এটি লেখকের বাড়াবাড়ি বলে মনে হয়েছে আমার। এরশাদের সঙ্গে করমর্দনে লেখক বেশ ধন্য হয়েছিলেন বলে তাঁর লেখায় অনুমিত হয়। এরশাদের নাটকীয়তা ও ঢং বোঝার ক্ষমতা কেন যে লেখকের হলো না, তা বোঝা গেল না। লেখক ভুলে গেছেন যে, ইচ্ছে করলে একজন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ হওয়া যায়, কিন্তু ইচ্ছে করলেই একজন সমরেশ মজুমদার হওয়া যায় না। লেখক নিজেকে ছোট করে আমাদেরও ছোট করেছেন। বিস্ময়কর ঘটনা যেটি, তা হলো বাংলাদেশকে পৃথিবীর মানচিত্রে প্রতিষ্ঠার  গল্প এরশাদ বেশ রসিয়ে রসিয়ে লেখককে শুনিয়েছেন, আর তিনি তা গলাধঃকরণ করেছেন। লেখককে এরশাদ যে-ভিডিও দেখালেন, তা দেখে লেখক গলে গিয়েছিলেন কিনা তা আমার জানা নেই। তবে এইটুকু বলি, তৎকালীন সেই দুর্বিষহ সাহসী গণআন্দোলন-অভ্যুত্থানের সময়ে ছাত্ররাজনীতি করার কারণে সৌভাগ্যক্রমে আমরা রাজপথে ছিলাম। সুতরাং এরশাদের অভিনয়-কথায়-নাটকীয়তায় আপনি গলে গেলেও তৎকালীন বাংলাদেশে জঘন্য ইতিহাস ও বর্বরতার যে-নজির তিনি সৃষ্টি করেছিলেন আমরা তা কোনোদিন ভুলতে পারব না। এরশাদের লেখক (নামধারী) হওয়া প্রসঙ্গে লেখককে জানাতে চাই যে, এরশাদ কখনো লেখক ছিলেন কিনা। একজন শ্রদ্ধাভাজন লেখকের কথা স্মরণ করতে চাই, যাঁকে (কথিত আছে) এরশাদের কবিতা লিখে দেওয়ার জন্যেকম কথা শুনতে হয়নি, কম বিতর্কিত হতে হয়নি। এগুলো বোধহয় আপনার জানা নেই। সমরেশ মজুমদার আমাদের কাছে, আমাদের দেশে এক প্রিয় মানুষ, তিনি এরশাদের মতো বিতর্কিত ব্যক্তির কাছে তাঁর লেখার মাধ্যমে স্মৃতি-তর্পণ ও বিনয় প্রকাশ করবেন, তা সচেতন-আধুনিক-প্রগতিশীল পাঠকের কাম্য নয়। তবে সমরেশ মজুমদার এরশাদের মুখোমুখি বসে নিবেদনে লেখা যে-প্রশ্নগুলো করেছিলেন তা সত্যিই অপূর্ব। তার জবাব নেই। আর এজন্যে অবশ্য লেখক-ঔপন্যাসিক সমরেশ মজুমদারকে অসংখ্য ধন্যবাদ ও প্রশংসা জ্ঞাপন করতেই হয়।

বাকী বিল্লাহ বিকুল

গবেষক, বাংলা বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রসঙ্গ : কালি ও কলম

এক. বিষয়-বিন্যাস ও রচনা-নির্বাচন

একটি পত্রিকার বিষয়-বিন্যাস ও রচনা-নির্বাচনে সম্পাদকের ভূমিকা যেমন অনস্বীকার্য তেমনি সম্পাদকীয় কোনো পত্রিকার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রচলিত নিয়মানুসারে সূচিপত্রের পরের পাতায় সম্পাদকীয় এবং তারপরেই পাঠকের চিঠি সংযোজিত হয়ে থাকে; কালি ও কলমে কোনো সম্পাদকীয় থাকে না, তাছাড়া পাঠকের চিঠি সূচিপত্রের আগে সংযোজিত হয়েছে। এ-বিষয়ে সম্পাদকের সতর্কদৃষ্টি কামনা করছি।

দুই. একটি পত্রিকার সার্থকতা

প্রবীন লেখকদের সাথে কালি ও কলমে নবীনদেরও জায়গা হবে – পাঠক হিসেবে আমি বা আমরা এমনই আশা করি। কিন্তু কালি ও কলমের বেশির ভাগ লেখকই দুই বাংলার প্রসিদ্ধ লেখক। একটি পত্রিকার সার্থকতা সম্বন্ধে স্বনামধন্য সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘কল্লোল গোষ্ঠী ও       অচিন্ত্যকুমার’ শীর্ষক নিবন্ধে বলেন, ‘একটি নতুন পত্রিকার সার্থকতা নির্ভর করে যদি তার প্রথম দিকের সংখ্যাগুলিতে এমন সব লেখকদের আবিষ্কার করা যায়, যাঁরা পরবর্তীকালে মহীরুহ-সদৃশ হয়ে ওঠেন (দেশ, ২ ফেব্রুয়ারি ২০০৪)।’ কালি ও কলমের সার্থকতার প্রয়োজনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বক্তব্যের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক।

তিন. একটি পত্রিকার বেঁচে থাকা

বিগত দশ বছরে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি সাহিত্যপত্রিকা আত্মপ্রকাশ করে, কিন্তু প্রত্যেকটি পত্রিকাই অল্প কিছুদিন প্রকাশিত হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায়। এগুলোর মধ্যে একমাত্র শৈলী অনিয়মিতভাবে সাড়ে ছয় বছর সচল ছিল। মেঘবাহন ও ঐতিহ্য কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায়। খুব সম্প্রতি (১৭ অক্টোবর  ২০০৩) সূর্যতরু আত্মপ্রকাশ করে এবং অনিয়মিতভাবে কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন কারণে একটি ভালো পত্রিকার গতিরোধ হতে পারে। এর প্রধান কারণ ‘নীরোগ সংস্কৃতিপ্রেমিক’ খুব কম। ফলে এ-ধরনের পত্রিকার পাঠক সীমিত। এছাড়া ভালো লেখক, ভালো লেখার অভাব দেখা দিতে পারে। একটি পত্রিকার বেঁচে থাকা-বিষয়ে পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, একক একটি সাহিত্যপত্রিকার ব্যবসায়িক সাফল্য শুধু ভালো লেখকগোষ্ঠী থাকলেই চলে না বা শুধু এলিট পাঠকগোষ্ঠীর সমর্থন বা প্রশংসা পেলেই হয় না – তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিয়মিত ভরতুকি বা অতিদ্রুত প্রচার বৃদ্ধি করা (দেশ, ১৮ মার্চ ০৩)। কারণ একটি পত্রিকার নিজস্ব কণ্ঠস্বর তৈরি হতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। সে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।

চার. সৃজনশীলতা ও নামকরণ

একটি সৃজনশীল পত্রিকার জন্য কালি ও কলম নামটি যথেষ্ট সার্থক ও অর্থবহ। কল্লোল যুগের পত্রিকা ছিল কালিকলম। কালিকলমের মাঝখানে ‘ও’ যুক্ত করে বর্তমান কালি ও কলমের নামকরণ হয়েছে। এতে পত্রিকার নামকরণের দিক থেকে কোনো নতুনত্ব নেই, কোনো সৃষ্টিশীলতা নেই। কালি ও কলম যেহেতু একটি সৃষ্টিশীল পত্রিকা তাই একটি নতুন নাম সৃষ্টি করা প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া ভবিষ্যতে সৃজনশীল মানদণ্ডে ঐতিহাসিক বিচারে একই নামে একাধিক পত্রিকা থাকার কারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে নামে তেমন কিছু আসে যায় না, সৃজনশীলতাসহ প্রকাশ অব্যাহত থাকাটাই সবচেয়ে বড় কথা।

কালি ও কলমের নতুন গতিপথ সৃষ্টি হোক – এই কামনান্তে।

অ. আ. কবীর

লক্ষীতলা, দিনাজপুর

প্রত্যাশা : আরো একধাপ…

সফল অধ্যাপক, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিজ্ঞানী, সমালোচক, প্রথাবিরোধী, সত্যনিষ্ঠ, বহুমাত্রিক লেখক, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কলমসৈনিক শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আজাদ গত ১২ আগস্ট আমাদের ছেড়ে, প্রিয় বাংলা ছেড়ে, চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। আমৃত্যু কলমসৈনিক এই মানুষটি তাঁর লেখাতে বলে গেছেন – আমাদের সোনার বাংলার দিকে ধেয়ে আসা কালো হিংস্র থাবার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ; এমনকি প্রতিকার প্রতিষেধকও, যা আলোকবর্তিকারূপী – ছড়িয়ে দিতে হবে আগামীর স্বপ্ন তরুণসমাজে তথা গোটা দেশবাসীর মাঝে। এর দায়িত্ব নিতে হবে শিক্ষিতসমাজ, কবি, লেখক, শিক্ষক, পত্রপত্রিকা, গণমাধ্যমসহ সকলকে। তবেই হয়তো একদিন এই বাংলা হবে সেই সোনার বাংলা, যার স্বপ্নদ্রষ্টা – ভাষাশহীদ, ’৭১-এর মুক্তিসংগ্রামীরা। এই প্রেক্ষাপটে কালি ও কলমের অষ্টম সংখ্যায় তার কিছুটা প্রতিফলন ঘটেছে। এই সংখ্যায় তাঁর সহকর্মী ঢাবির শিক্ষক রফিকুল্লাহ খান প্রয়াত হুমায়ুন আজাদের কবিতা সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন এবং ওপার বাংলার জনপ্রিয় লেখক সমরেশ মজুমদার তাঁর নিয়মিত কলামে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছেন। এজন্য উভয় লেখক ও সম্পাদকসহ সবাই প্রশংসার দাবিদার। তারপরও আমার মনে হয় গত ৯/১০ মাসের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা কালি ও কলমের কাছে পাঠকসমাজের আরো একটু প্রত্যাশা থাকতেই পারে। হুমায়ুন আজাদ যে শুধু একজন ব্যক্তিই নন একটা ইনস্টিটিউশনও, তা সকলের সামনে মেলে ধরতে সম্পাদক সাহেব আবার চেষ্টা করবেন – সেই প্রত্যাশায় রইলাম। কালি ও কলমের দীর্ঘায়ু কামনা করি।

শুভংকর শুভ্র

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা