কদিন স্বপ্নে দেখেছিলাম, আমি স্বপ্ন দেখছি, লেখক হয়ে গেছি।
এটি সেই স্বপ্নের কথা বলছি যার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে দেখেছিলাম সেই স্বপ্নটি, যেখানে আমি মৃত কিন্তু আমার শ্রাদ্ধবাসরের ভোজে আমিই মাতব্বরের মতো নিজেকে দেখাচ্ছি আর উদ্বেগে জেরবার হয়ে যাচ্ছি।
বস্তুত এই মৃত্যু ও শ্রাদ্ধকেন্দ্রিক স্বপ্ন কিংবা লেখক হয়ে যাওয়ার স্বপ্নটি নিয়ে চুলচেরা কেন, কোনোরকম ভাবনা বা বিশ্লেষণের অবসর ছিল না। স্ত্রী রয়েছেন ক্যানসার হাসপাতালে। কন্যা শ্বশুরালয়ে সন্তানসম্ভবা, রোজই যেতে বলছে মায়ের খবর নিয়ে, সে-তো সম্ভব নয়, তবুও!
তাই ভাবব কখন?
আমাকে চেতিয়ে তুলেছে সাম্প্রতিক যে-স্বপ্নটি, তা নিয়ে ভাবতে পেরেছি। বলতে গেলে সে-কথা যথেষ্ট কৌতুকের। ভাবনা মানে আড়াআড়ি ভেবে চলা; এমন ভাবনায় কোথাও পৌঁছুনোর খবর নেই যে দিয়ে দেবো!
বিশ বছর আগের আনন্দ মেইকাপ তার সেই সময়ের চেহারা হাবভাব উত্তেজনার প্রকাশভঙ্গি – সব নিয়ে আমার সঙ্গে তুমুল আড্ডায় মেতে উঠেছে। শোকজ্ঞাপনের মুদ্রা – আন্তরিকতার ভণ্ডামিতে কুঞ্চিত কপোল ও ভ্রƒযুগল – সব!
এটিই আমার সম্প্রতি দেখা স্বপ্ন। কাণ্ডটি গতকাল রাতে ঘটে গেল। পাঁচতলায় ফ্ল্যাটটি হওয়ায় ছাদটি আমার মাথার ওপরেই। উঠতে গেলে অল্প সিঁড়ি ডিঙোলে চলে। উঠে গিয়ে চাঁদের তলায় দাঁড়ালাম।
এইরকম দাঁড়িয়ে পড়া দশায় আমার সীমায়িত জীবনের মধ্যবিত্ত ভাবুকতা অনেক সময় অনেক সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে। এ-সমাধানে দৈব অনুগ্রহ বা বিন্দুমাত্র অলৌকিকতা নেই। আসলে মনকে গুছিয়ে নিয়ে সেই অনুযায়ী কাজে নেমে ফল পেয়েছি। যারা শুনছেন আমার কথা, হয়তো বলবেন এই সহজ কাজটির জন্য এত রোমান্টিক আয়োজন কেন? আমি বলব, আমার কাছে রোমান্টিকের বা আয়োজনের ভিন্ন কোনো সংজ্ঞা নেই আমার বাঁচার ধরন ছাড়া। আসলে পূর্বাপর কাণ্ড বিশ্লেষণ করলে বুঝতে পারি এই পদ্ধতিতে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বেশ জুতসই হতে পেরেছিল। আমার একটি বিশ্বাস আছে, তা হলো, এক-একটি মুহূর্ত মানুষকে একেবারে বদলে দিতে পারে। সেই মুহূর্তগুলো রচনা করে নিই, আর সেই মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বেশ কাজে লেগে যায়।
তবু দেখুন, এত বুঝেসুঝেও গত রাতে কোথাও পৌঁছুনো গেল না। অবশ্য পৌঁছুতে পারলে এই কথকতার দরকার পড়ত না। সমঝদার আপনাদেরও এই বাচালতা শুনতে হতো না।
ভাবতে গিয়ে বুঝলাম বয়স গড়িয়ে আসছে বলে মনের মধ্যে অনেকটা অস্থিরতা বা তাড়াহুড়ো কাজ করছে কিংবা অল্পসময়ের মধ্যে অনেকটা ভাবতে গিয়ে সব তালগোল পাকিয়ে যাওয়ায় সিদ্ধান্তে পৌঁছুনো সম্ভব হলো না।
কথাটা তাহলে কী? অনেকটা সময়ের ব্যবধানে একজন আর-একজনের সঙ্গে তুমুল আলাপে মেতে উঠেছে। তাতে এত উদ্বেগ আর অস্থিরতা আর সিদ্ধান্তের-ফিদ্ধান্তের বা ছাদ বা চাঁদের এত কথা আসছে কেন? তাও আবার স্বপ্নের কাণ্ড। একটি স্বপ্ন নিয়েই বা এত কী ভাববার থাকতে পারে? স্বপ্ন তো স্বপ্নই। সে তো আর জীবন নয়! স্বপ্নেরও চরিত্র আছে বটে। যেমন ওই যে লেখক হয়ে গেছি-র স্বপ্নের প্রসঙ্গটি! লেখক হবো, ডাকাত হবো, নেতা হবো, বড়লোক হবো, ঠগ হবো, পণ্ডিত হবো নতুন ভুবনের রূপকার হবো, সৌরভ হবো, ঐশ্বর্য হবো – এসব স্বপ্নের মানে আছে – একটি অন্যরকমের চরিত্র আছে। আমার গতরাতের স্বপ্নের সঙ্গে এগুলোর কোনো সম্পর্ক থাকবার কথা নয়। ধন্দটা এখানেই।
আনন্দ মেইকাপ আড্ডায় বেশকিছু প্রশ্ন-প্রসঙ্গ উসকে দিয়ে গেল। সেই সময়ের রং আমার চেতনায় ছিটিয়ে দিয়ে গেল। স্বপ্নের সব কথা তো মনে থাকে না! বিশ বছর আগের আনন্দ মেইকাপের একটি কথা স্বপ্নের বাস্তবকে ছাপিয়ে আমার প্রত্যক্ষ বাস্তবে পৌঁছে নিদ্রা আর জাগরণের স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিয়ে গেল। রেণুকণাগুলো ব্রহ্মাণ্ডে বিছিয়ে দিয়ে ভারি মায়াজাল রচনা করেছিল পাঁচ বাই সাত বিছানায় – পাঁচশ দশ স্কয়ার ফুট কাভার্ড এরিয়ায় – সিঁড়িতে – ছাদে – চাঁদের গায়ে।
আমার মুক্তি নেই এর হাত থেকে। তাই রাত গড়িয়ে গেল, চাঁদ ডুবে গেল, নৈশ-নির্জনতা উবে গেল ফের কোনো তেমন আবিষ্ট রাতের অপেক্ষায় আমাকে রেখে। আমার মতো ডোন্ট-কেয়ার মানুষটি তাই এমন অতি সকালেও বারান্দায় বসে কেবল ভেবেই চলেছে হিসেবির মতো। যেন কোথাও পৌঁছুতেই হবে। বলুন তো সাতান্ন বছর বয়সে কি কোথাও পৌঁছুনো সম্ভব? এমন বিধুনিত চৈতন্যে?
আমার ফ্ল্যাটবাড়ির নিচে বড় রাস্তা – তারপরে একটি বড় মাঠ – তারপরে একটি বড় পুকুর – তারপরে অনেকটা-জুড়ে এক বস্তি তার টালির চালের মাথাগুলো নারকোল গাছ ধোঁয়া। আমার চোখ এতটাই পৌঁছুচ্ছে আর ভেবে চলেছি এলোমেলো। যদি তেমন কোথাও পৌঁছুনোর কোনো খবর উঠিয়ে আনতে পারি! এক গীতল স্বপ্নময়তায় আচ্ছন্ন হতে চাইছি। কিন্তু বারবার ছিঁড়ে যাচ্ছে সেই সুর। এই যন্ত্রণাকাতর মুহূর্তে না দাঁড়িয়ে পড়লে কিছুতেই উপলব্ধি করতে পারতাম না, অতীত কতটা প্রাসঙ্গিক! বারবার সামনে চলে আসছে আনন্দ মেইকাপ। অথচ আমি ভাবতে চাইছি আমাকে নিয়ে – গতকাল রাতের স্বপ্নে আনন্দ মেইকাপের উসকে দেওয়া প্রসঙ্গ নিয়ে, প্রস্তাব নিয়ে। স্বপ্নে মনস্তাত্ত্বিক সিদ্ধান্তগুলো খুব একটা নেওয়া যায় না। ডাকাত পড়লে ডাকাত ডাকাত বলে তেড়ে যাওয়া যায় এই মাত্র। তাই দেখা যাক, বা ভেবে নিই, বা পারব কি – এসব বলার আগেই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই স্বপ্নটিকে লালন করতে শুরু করলাম। একমাত্র সেই কারণেই ওই স্বপ্ন বা আনন্দ মেইকাপ বা আমার ভবিষ্যৎ-সিদ্ধান্ত নিয়ে এতটা মাথা ঘামাচ্ছি। রাতেও চাঁদের গায়ে তাকিয়ে থাকার সময় এইরকম হচ্ছিল – তেমন কোনো প্রত্যয়ে পৌঁছে গূঢ় সিদ্ধান্তটি নেওয়ার বদলে আনন্দ মেইকাপের জীবনের টুকরো-টাকরা এসে যাচ্ছিল।
এখন ভাবতে ভাবতে ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি তার কারণটি। কারণটি হলো গল্পের প্রতি টান। আনন্দ মেইকাপ যেমন ছিল তুখোড় গপ্পোবাজ আড্ডাবাজ তেমন ডাকসাইটে লেখক – কথাকার। আসলে আনন্দর জীবনটাও একটি গল্প ছাড়া কিছু নয়। সেইসব গল্পই আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমার নিজের কাছ থেকে চন্দ্রাস্ত কিংবা সূর্যোদয়ের কাছ থেকে আনন্দের দিকে।
বিশ বছর আগের আনন্দ মেইকাপ। সময় ধরা জরুরি হলে বলা যাক, যে-বার ইন্দিরা গান্ধী মারা গেলেন। কিন্তু ওটা তো সেই আনন্দর ‘পথ’ গল্পের কথা। শেষ গল্প। যেটি লেখার পর পরম তৃপ্তিতে বসুন্ধরাকে নিয়ে নদীর দিকে গিয়েছিল সে! আনন্দ মানে তারও আগের বিশ বছর, যার সূচনাবিন্দুটি এইরকম : ঝুটা স্বাধীনতার সতেরো বছর বয়সে আনন্দর সাচ-জীবনের সতেরো বছর বয়সে বিক্ষুদ্ধ সময় আর মত-নীতি-দর্শনের বিপজ্জনক অদূরদর্শী কচকচি নিয়ে লিখে ফেলা প্রথম গল্প ‘বিভাজিত পথ’। ছাপা হলো অতি পরিচিত পত্রিকা পৃথিবীতে। তুমুল আনন্দ পাঠকের, আনন্দকে নিয়ে। রাতারাতি বিখ্যাত হওয়া তবে একেই বলে! বছর ঘুরতে না ঘুরতেই লেখা হয়ে গেল ছটি গল্প। সংকলন বেরুল। ছমাসেই দ্বিতীয় সংস্করণ। আনন্দকে ফিরে তাকাতে হলো না। নাই নাই করে বিশ বছরে বেয়াল্লিশটা বই। সম্মান-প্রতিপত্তি-পুরস্কার-প্রেম-নারী-সন্তান – সবই পেয়েছিল সে। সাঁইত্রিশেই ভরে উঠেছিল একেবারে।
ঠিক এইরকম সময়ে একদিন শরতের দুপুর গড়িয়ে এলে কী এক ঘোরের ভেতর বসেছিল আনন্দ। তারপর ওরা এলো। ওরা এলে আনন্দর ঘোরটা গেল ছিঁড়ে। আনন্দর দুই বন্ধু। একজন বুদ্ধদেব, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ায়। অন্যজন প্রভাত, আনন্দর নিজেরই অফিসের সহকর্মী। এক বাস্তবে ওদের যেমন এই পরিচয়, অন্য বাস্তবের পরিচয় হলো বুদ্ধদেব বা প্রভাত দুজনেই এ-পৃথিবীর সুখী মানুষ। বসতে না বসতেই বুদ্ধদেব বলল, ‘চলো আনন্দ, চলো প্রভাত, কোথাও বেরিয়ে পড়ি।’ আনন্দ বলেছিল, ‘তাই ভালো! বাড়ির সবাই ঘুমুচ্ছে – বাইরেই চা খাওয়া যাবে। চলো -’। সবাই মানে বসুন্ধরা আর পাঁচ বছরের মেয়ে। তারা তারপর বেরিয়ে পড়ল পথে। পথের মানেই হলো তার শেষ নেই। শুধু এক-একটি বাঁকে এক-একটি জায়গা মাত্র; মাত্র সেখানেই পৌঁছুনো সম্ভব। বোধহয় এইরকম এক দর্শন থাকায় কখন যেন ওরা তিনজনেই বুদ্ধদেবের গৃহের সামনের খাঁচার দেওয়ালে বেল বাজাল। পাখির ডাকে জেগে উঠে আগমনী বলল, ‘ও – তোমরা!’ আনন্দ জিজ্ঞেস করে, ‘কেন আগমনী? তুমি কী ভাবছিলে?’ – ‘ভাবছিলাম, আপনারা নয়। ভাবছিলাম রাধার মা। ভাবছি, অনেক দিন বাদে আপনি এলেন আনন্দ দা! এতদিন কোথায় ছিলেন? রাস্তায় না থেকে ঘরে কেন আসেন না বলুন তো!’ আনন্দ বলেছিল, ‘উঃ তুমি আবার শুরু করলে! একটু বসতে দাও -।’ আগমনী উজ্জ্বল। হেসে গুঁড়িয়ে গিয়ে কুয়াশায় হারিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘তোমরা এখন বসবে? তাহলে কী কী লাগবে বলো, বের করে দিই -’। তখন সন্ধ্যা এসে গেছে। পুবে নদীর দিকটায় তুলনাহীন শরৎশশী বসে পড়েছে। মদ নিয়ে ছুতমার্গ না থাকলেও মদ্যপান বিকল্পহীন – এরকম কখনোই মনে হয় না আনন্দর। এ-আসর, এই পরিপাটি তার ভালো লাগল না। প্রভাত বা বুদ্ধদেব তার বন্ধু, নিজেদের মতো করে লিখতে পারে, শিল্প বোঝে, আনন্দর ভালো সমঝদারও বটে। বন্ধুর নাম-খ্যাতিতে ভ্রƒ কুঁচকায় না, তৃপ্তিই পায়। ওরা জানে, আনন্দ খাবে না, কেবল সঙ্গ। হয়তো আঘাত পাবে। তবুও কিছুই করবার ছিল না আনন্দর। বলল, ‘তোমরা বসো – আমার ভালো লাগছে না – বেরিয়ে পড়ি।’ সুতরাং বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আনন্দ পথে পথ হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় তার চা খেতে ইচ্ছে করল। নিজেকেই শুনিয়ে বলল, ‘চা চাই’। কতকিছু ভাবতে ভাবতে অনেকক্ষণ হেঁটে ফেলেছে। মাথার ভেতর একটা ঘোর তৈরি হয়ে গেছে। ঘনিয়ে উঠছে। তখন সে দেখতে পেল পথের ধারে অন্ধকারে একটি বাড়ির সামনে লোকের জটলা। ছোট ছোট জটলা অনেকগুলো। সেখানে কথা আছে, হাসি আছে, মশকরা আছে। থমকে দাঁড়ালো আনন্দ। চায়ের চাহিদা আরো বেড়ে গেছে। এই গ্রামের নাম পীড়াকাটা। পীড়াকাটার মানুষরা বসে আছে। প্রত্যেকের সামনে জামবাটি। আনন্দ মালকিনের কাছে গিয়ে বলল, ‘আমাকে দাও -’। তখন, এক বুড়ি একটি পাত্র এনে তার সামনে রাখলে আনন্দ এক চুমুকে হাঁড়িয়ার বাটি শেষ করে কিছুক্ষণ লোকগুলোর সঙ্গে কাটাল। কিছুক্ষণ মানে রাত হলো বেশ। রাস্তায় উঠে এসে ভাবতে শুরু করল, মাতাল হওয়ার জন্য বুদ্ধদেব আগমনী প্রভাতের সঙ্গে সে তবে কোনোদিন বসল না কেন? কোনোদিন যা খায়নি, সেটি খেতে গিয়ে এক মুহূর্তের জন্যও দ্বিধান্বিত হলো না কেন? হঠাৎ কী এমন হয়ে গেল যে, নিজেকে তার এখন এমন মোহহীন ঝরঝরে লাগছে? শৃঙ্খলা যুক্তিহীন সংস্কারের দিকে এগিয়ে যায় ঠিক কখন? – নিজেকে প্রশ্ন করল আনন্দ। বুঝতে পারল না ঠিক কখন অন্ধকার এমন সুন্দর হয়ে ওঠে! সে তার আবেগটির প্রকাশ কীভাবে ঘটাবে তাও বুঝতে পারল না। বাড়িতে পা দিতেই বসুন্ধরার মাথায় বিস্ময় জিজ্ঞাসা স্তম্ভনের পাহাড়গুলো ভেঙে পড়ল। সে জিজ্ঞেস করেছে, ‘করেছ কী?’ আনন্দ অনায়াসেই বলল, ‘দেখতে পেলাম লোকে খাচ্ছে, আমি ভাবলাম আমিও খাই।’ – ‘তোমার বিবেচনা?’ – ‘হ্যাঁ, এইরকমই বিবেচনা করলাম! তুমি খুশি হওনি?’ – ‘না! অবাক হচ্ছি! কী দুর্গন্ধ! তুমি!’ – ‘কেন, আমি কী? কোনো কোনো লোকের সম্বন্ধে কোনো কোনো ধারণা মানুষের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে যায়। তাই তাকে মানুষের প্রতি সেই রকম নির্দিষ্ট নির্ধারিত আচরণ করতে হয়। বলব বাকিটা?’ – ‘বলো, তবে মাতলামি করবে না! মেয়ে বেরিয়ে এসে ভূত দেখবে!’ – ‘শোনো, আস্তেই বলছি। তার সম্পর্কে ধারণাগুলো যে মিথ্যা নয়, তা দেখাতে গিয়ে রীতিমতো অভিনয় করে যেতে হয় সারাজীবন। নিজের সঙ্গে দ্বিচারিতা! অশ্লীল! এমনকি মৃত্যুর মতো ভয়ানক পরিণতিকেও ডেকে আনতে হয়, এ-রকম উদাহরণ আছে।’ বসুন্ধরার বিস্ময় কাটল না। প্রশ্ন করল, ‘কোনো অপরাধবোধ বা অনুশোচনা?’ আনন্দ বলেছিল, ‘অপরাধের চেয়ে অনুশোচনা বেশি পীড়া দেয়। অনুশোচনায় নীতিবোধ থাকে। নীতিবোধে পূর্বধারণা কাজ করে। এ-রকম ধারণাকে বিদ্রƒপ করতে ইচ্ছে জাগলে দোষ দেখি না। তাই অপরাধ করেছি কী না জানি না, এখন অনুশোচনায় মন নেই।’ বসুন্ধরা বলল, ‘শোবে এসো –। – ‘খেতে দেবে না?’ – ‘খাবে?’ – ‘না খাওয়ার কী হলো?’ – ‘কী আবার হবে! স্নান করে এসো – ঘেমে গিয়ে গন্ধে যা তা!’ খাওয়ার পর গুম হয়ে বসেছিল আনন্দ বারান্দায় বেতের চেয়ারে। কাছে এলো বসুন্ধরা। – ‘শোবে না?’ ও বলেছিল, ‘না।’ – ‘কেন?’ – ‘লিখব।’ – ‘খাওয়ার পর জীবনে কবে লিখেছ?’ – ‘ওই জন্যই লিখব।’ – ‘বেশ! তবে আমি একটা কথা বলি?’ – ‘বলো।’ – ‘লেখা এসেছে অথচ লিখলে না এ-রকম হতে পারে না?’ – ‘তোফা বলেছ। সেটি ভালোও হয়। নিশ্চয়ই হতে পারে।’ – ‘তাহলে সঙের মতো বসে রইলে কেন?’ – ‘লিখব। লেখার আবার আসাআসি কী? লিখতে হবে তাই লেখা।’ – ‘আচ্ছা এ-রকম হতে পারে না?’ -‘কী রকম?’ – ‘নিজের ইচ্ছে হয়, তাই লেখ। লিখতে হবে, তাই লেখ। তো ধরো দশ বছর লিখলে না। কেমন হয়?’ – ‘হতে পারে!’ – ‘তবে?’ – ‘এখন লিখে ফেলি?’ বসুন্ধরা আর কথা বাড়াবার জন্য দাঁড়ালো না। তার ঘুম পেয়েছে। রীতি ভেঙে খাওয়ার পর লিখতে বসল আনন্দ। কিস্তির লেখা নয়, একটি গোটা গল্প। মানুষের বেঁচে থাকা আর বেঁচে ওঠার জীবনলগ্ন গল্প। লেখাটি হয়ে গেল ভোর রাতে। এমন তৃপ্তি জীবনে অন্য কোনো সময় লেখার পর জাগেনি। উঠে দাঁড়ালো আনন্দ। ভারি খুশি খুশি লাগছে। গল্পটি আগামীকালই কোনো কাগজে দিয়ে দেবে। এখন নদী তাকে ডাকছে বুঝতে পারল। চুপিচুপি দরজা খুলতে গিয়ে ও থমকে দাঁড়ালো। এইভাবে নিজ-নিজ করে সে নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছে না তো! বসুন্ধরাও নদী খুব ভালোবাসে। ভোরের নদী। বসুন্ধরাকে ডাকল আনন্দ। বলল, ‘মেয়ে ঘুমুচ্ছে। এখন জেগে ওঠার কোনো প্রশ্নই নেই। চলো বেরিয়ে পড়ি।’ তারপর দুজনে নদীর দিকে বেরিয়ে পড়ল। গিয়ে দেখল পীড়াকাটার লোকেরা নদীতে মাছ ধরছে। মাছ ধরবার ডিটেইলিং বেশ গেঁথে যাচ্ছিল। সে তখন বসুন্ধরার গায়ে হাত রাখল। এমন আবেগতাড়িত আচরণে অনভ্যস্ত মানুষীটি মুখ তুলল আনন্দর চোখের ওপর। আনন্দ দেখল নদীর সূর্যটি নদীর ওপর আকাশে নয়, নদীর পাশের নারীর কপালে উড়ে এসে বসেছে। লিখে ফেলা গল্পটাই শেষ গল্প হোক তবে। বলল, ‘জানো বসুন্ধরা, এই মাছ ধরার গল্পটি আর লিখব না।’ -‘মানে?’ – ‘তোমার কথাটিই ভাবছি!’ বসুন্ধরা বোকার মতো তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর বলল, ‘চলো – মেয়ে উঠে পড়বে। ভয় পাবে।’
আনন্দ মেইকাপ গত বিশ বছরে আর এক লাইনও লেখেনি।
তার পথও পৃথিবীতে বেরিয়েছিল। এই পর্যন্ত। কিস্তিগুলো সব বন্ধ হয়ে গেল। ম্যাগাজিনঅলারা তাদের পাঠককে কী কৈফিয়ৎ দিয়েছিল কে জানে!
সেই বোকা হয়ে যাওয়ার মাস দুয়েক বাদে একদিন বসুন্ধরা অন্যমনস্কতার ভেতর থেকে জেগে উঠে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘সত্যিই তুমি আর লিখবে না?’
এক উচ্ছল প্রাণের খুশি-ভরা সুবাতাস বইয়ে দিয়ে অদ্ভুত কণ্ঠস্বরে আনন্দ বলল, ‘না। ভাবছি অন্যরকম লেখার কথা। সব বলব তোমাকে দুদিন যাক!’
কথা বলবার সময় আনন্দর চাউনিতে বাস্তববোধ বা বুদ্ধিমত্তার কোনো অভাব দেখল না বসুন্ধরা। সে-কথা সে আনন্দকে বলেও ফেলল মেয়েলি আবেগে। আর তখন আনন্দ নিজেকে বলল, ঠিক আছে – সব ঠিক আছে! এই নারীকে নিয়ে অনেকদূর যাওয়া যেতে পারে, এতখানি আত্মসংযম, বিনয় আর পরমত সহিষ্ণুতা যে-মানুষের সহজাত, তাকে স্ত্রী হিসেবে পাওয়াই তো ভরে ওঠার ব্যাপার! এত তৃপ্তি! বলল, ‘তবে চলো বসুন্ধরা – শুরু করা যাক!’
বছর খানেকের মধ্যেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে, ওই শহর ছেড়ে দিয়ে ব্যবসায় আর কৃষিকাজে নেমে পড়ল সে। বড় রাস্তার ধারে একটি নির্জন এলাকায় কয়েক বিঘা জমি কিনে ফার্ম খুলে ফেলল। ফার্ম মানে বিঘে পাঁচেক জমিতে চাষ – ধান, শবজি, সরষে, কলাই। একটি পুকুর খোঁড়া হলো। তার চারপাশে নারকোল, আম, জাম, জামরুল, সফেদা, পেয়ারা, আতা, নোনা এইসব ফলের গাছ।
বেশকিছু সাদা শূকর, এক ডজন জার্সি গাই, হাফ-ডজন দুধেল মহিষ, হাঁস-মুরগি, খরগোশ এইসব প্রাণী বড় ভূমিকা নিল আনন্দের সম্প্রসারিত জীবনে। লেখার টাকা, চাকরির টাকা – সব মিলিয়ে বেশ বড় রকমের ইনভেস্টমেন্ট। চব্বিশ ঘণ্টার লোক রইল জনা পাঁচেক। পাম্প জেনারেটর কত কী! মাল বওয়ার একটি গাড়িও কিনতে হলো। যেন বা নতুন জন্ম – সারাক্ষণ ঘোরের মধ্যে থাকল আনন্দ। কন্যা তার সবুজলতার মতো বেড়ে উঠছে দিন দিন। খোলামেলা অনেকটা জায়গা পাওয়ায় বসুন্ধরা যেন ছড়িয়ে পড়ছে চৈত্রের শালবনের মতো। নন্দিতা বসুন্ধরার কপালে ঘামের দানা দেখে কখনো কখনো বিভ্রম তৈরি হচ্ছিল আনন্দর চৈতন্যে – আশ্বিনের ভোরে ধানের পাতায় শিশির নয় তো!
বালতিভরা দুধের ফেনা – মুরগির ডাক – জলে হংস-হংসীর সঙ্গম – খরগোশদের লুকোচুরি – শালা, জীবনের অন্য কোনো মানে থাকতে পারে!
তবে কি আনন্দ তার বিগত লেখালেখির মধ্যে কোনোরকম ক্লান্তি অনুভব করেছিল? এ-রকম
মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন উঁকি দিলে ডোন্ট-কেয়ার আনন্দ সারাদিনের ব্যবসার হিসাবের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিল। ওদিকে মায়ে-ঝিয়ে খুনসুটি করছে – বাইরের মহলে কাজের লোকগুলো গাইছে গান – মাতালের টলোমলো গলায়। পোকার ডাক – ব্যাঙের ডাক – হাইরোডে ভারি লরির চলে যাওয়া – সময় এখানে
স্তব্ধ, তার কোনো চিহ্নায়ন যেন বা সম্ভব নয়!
এভাবেই প্রায় বিশ – ঠিক বিশ নয় – ষোলো-সতেরো, তখনই শুরু হলো ক্ষয়! জমি-পশু বেচা শুরু হলো। লোকসান বাড়ল। ফার্ম সিকেয় ওঠার যোগাড়! বসুন্ধরা অসুস্থ।
আনন্দর স্ত্রী বসুন্ধরা বুঝতে পারল মৃত্যু তার দিকে এগিয়ে আসছে। বলল, ‘মেয়ের বিয়ে দিয়ে দাও।’
মেয়ে রাজি হলো।
বসুন্ধরাকে ভর্তি করতে হলো হাসপাতালে। মেয়ের বিয়েতে বাড়ি এলো সে। বাড়ি আর হাসপাতাল – এইরকম অস্থায়ী বসবাস। কারণ ক্যানসার স্থায়ী জায়গা নিয়েছে তার শরীরে। সেই দশাতেই বসুন্ধরা তার মেয়েকে মা হতে দেখল। ভারি খুশি হলো। শেষদিকে আনন্দকে বলত, ‘সব বৌয়ের ক্ষোভ থাকে, জানো তো, তোমাকে নিয়ে আমার কোনো ক্ষোভ নেই। যা করেছ, তোমার ইচ্ছেয় করেছ। যা হয়েছে, তোমার ইচ্ছেয় হয়েছে। তোমার ইচ্ছেগুলো ছিল আমার ঐশ্বর্য!’
বাধা দিত না আনন্দ। বলুক কথা। কথাই তো সব। কথার জাল বুনে বুনে জীবন। জীবন ফুরিয়ে এলেও যে জীবন ফুরায় না – কথা চলুক। হোক আবেগময়! হোক উচ্ছ্বাসপূর্ণ! আনন্দ বলত, ‘বেশ তো! কী বলছিলে? বলো -’।
বসুন্ধরা বলত, ‘খারাপ তো কাটালাম না! আরো কিছুদিন তোমার সঙ্গে কাটাতে পারলে বেশ হতো!’
তারপর কান্নাকাটির ব্যাপার!
বুঝুন!
আমিও কেঁদে ফেলছি! আমার চোখের সামনে মাঠটি এখন রোদে ভরে গেছে – কত ছেলেপুলে খেলছে! কত মানব-মানবী গা ঘামাচ্ছে। আনন্দ মেইকাপের কথা থেকে আমি আমার কথায় ঢুকে পড়েছি।
ভাবতে চাইছিলাম নিজেকে নিয়েই। ভাবতে চাইছিলাম আমার স্বপ্ন আর সিদ্ধান্ত নিয়ে। আনন্দকে ঠেকাতে না পেরে চলে গিয়েছিলাম তার কথায়।
কেন লেখা ছেড়ে দিয়েছিল সে?
অন্তর্গত ক্লান্তি? না বসুন্ধরার খেয়ালপূরণ?
ফার্ম খোলাটি কি অ্যাডভেঞ্চার? না রূপ থেকে রূপান্তরে যাওয়া? নিজেকে বুঝতে চাওয়ার একটি পদ্ধতিগত কৌশল? শিল্পের জগৎ আর জীবনের ভুবনকে এক করে দিয়ে আনন্দর এ-এক পূর্ণতার উপলব্ধি! তাকে খোঁজার এমনই নেশা যে সামাজিক রাজনৈতিক প্রতিকূলতাকে মানিয়ে নিয়ে সাইজ করে করে সময়কে পাশ কাটিয়ে চলার জন্য অদ্ভুত চালাকিরও আশ্রয় নিতে হলো।
তবে চালিয়াত না বলে লোকে পাগল বলেছিল। তাহলে কি যারা পাগল নয়, তারা সব চালিয়াত? বসুন্ধরাকে জিজ্ঞেস করলে আনন্দ কোনো উত্তর পেত না।
বসুন্ধরা তার ঘরকরনার ভেতরে থেকে বলেছিল, ‘আরো কিছুদিন তোমার সঙ্গে থাকতে পারলে বেশ হতো!’ আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি। প্রশ্ন না হলেও তো এটি একটি প্রস্তাব। এমন প্রস্তাব, যা এক উত্তরহীন গল্প। আনন্দর কথা থেকে আমি আমার কথায় পৌঁছে যেতেই আনন্দ আর আমি এক হয়ে গেলাম। তাহলে এই যে আমার নীরব কথকতা – নিজের সঙ্গে নিজের নিভৃতালাপ – সেখানে গল্প আছে! কার গল্প? আমার না আনন্দর? আমার নস্টালজিয়ার না আনন্দর মজাদার জীবনের? শেষ পর্যন্ত কোনো জারিজুরি চলল না! আমি আর আনন্দ এক হয়ে গেলাম।
এ-ঘটনা যখন ঘটে গেলই, বলে ফেলি আনন্দর প্রস্তাবটির কথা। আনন্দ স্বপ্নে বলেছিল, ‘তুমি আবার লিখতে শুরু করো আনন্দ -’। আমি হেসে উঠেছিলাম। আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তারপর এতটা সময়ে আমি আমার দেখা স্বপ্নের মধ্যে আবিষ্ট রয়েছি। সুখদ কিনা জানি না, কিন্তু ওই স্বপ্নমায়া আমাকে অবশ্যম্ভাবীভাবে যেন এক প্রত্নস্মৃতির ধূসর ছায়ার দিকে টেনে নিতে চাইছে – যেন বা এক অপ্রত্যক্ষ রহস্যময়তা আমার চৈতন্যগ্রাহ্যতাকে ছাপিয়ে সুদূরতার আবেশ রচনা করছে। আমার বেপরোয়া খরদৃষ্টি চংক্রমণের আর কোনো ভূমিকাই যেন নেই। লেখা নেই, মালিকানা নেই, স্ত্রী নেই, কন্যাও পাশে নেই। তবু আমার কোনো নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব বা বিচ্ছিন্নতার বোধ নেই। নেই মানে ছিল না। নিজের মাপজোখ নিজে করতে বসলে তেমনই তো মনে হয়েছে এতদিন। এতদিন মানে যে কটা দিন এই ফ্ল্যাটে কাটাচ্ছি, সব বেচেবুচে দিয়ে আসার পর! এমন জীবনের পাণ্ডুলিপিতে হতাশার কোনো চিহ্ন নেই। বরং এক সহৃদয় সামাজিক হয়ে ওঠা – এটিই আমার স্বপ্ন। সেখানেই থাকবে ঈপ্সিত চরিতার্থতার কথা। আর এর মধ্যেই এসে গেল লেখালেখির গল্পটি! লিখব যদি সিদ্ধান্ত নিতে চাই, তবে এসে যাবে সাহচর্যের কথা। কার সাহচর্য? কীসের সাহচর্য? এমন সব প্রশ্নও তো অপ্রাসঙ্গিক নয়! কেমন হবে সেই কথকতার ভাষা? কালিক পরিবর্তনের সূচকতাকে ধরব কী উপায়ে? প্রভাত বা বুদ্ধদেব কি কোনো সুরাহা করতে পারে? পৃথিবীর পুরানো সম্পাদক মরে গেছে। নতুনের কাছে আমার গুরুত্ব কী? একজন ডেড-অথরের? এসব যদিও লেখা শুরুর পরেকার কথা। আগে তো লিখতে হবে! লিখব কি? কী লিখব?
অনুভব করেছিলাম বিষয়টির মধ্যে আবেগের বাড়াবাড়ি থাকলে চলবে না। তাগিদটি জোরালোভাবে আসুক, হওয়ার হলে আপনা-আপনিই হবে। বরং সেটি হবে একটি চমৎকার আরামদায়ক ব্যাপার। ধীরে ধীরে অন্যমনস্ক হতে চেয়েছি। না পেরে বেরিয়ে পড়লাম বুদ্ধদেবের খোঁজে। সীমা বেঁধে দেওয়া বর্তমানের বর্গাকার জীবনে ধীরে ধীরে একটি ক্লান্তিও তৈরি হচ্ছিল। তাই মনে হলো বুদ্ধদেবকে চাই, প্রভাতকে চাই। ওই স্বপ্ন থেকে সরে যাওয়ার জন্য মেয়েকে বেশি করে ফোন করেছি। নাতির আধো আধো কথা শুনেছি, অপ্রয়োজনীয় বাজার করেছি। রান্নাও করলাম কদিন নিজের হাতে। শখের বইপত্র টেনে টেনে নিয়ে বসলাম। কিছুতেই কিছু হলো না। ওদের চাই – এদিকে-ওদিকে ফোন করে বুদ্ধদেব-আগমনীদের খোঁজ পেয়েছি। ও রিটায়ার করে গেছে। পৈতৃক আবাসেই ফিরে এসেছে বছর দুই হলো। সেটি কালিপার্ক ছাড়িয়ে আরো অনেকটা ভেতরে নারাণপুরের দিকে। বাসে উঠে বসেছি। দুপুরের ফাঁকা বাস। অনেক দিন বাদে বেরুনো হলো। দুপুরের রোদটা চড়া হলে কী হবে মন্দ লাগছে না! বাস্তবের দাবিকে অস্বীকার করতে পারি না ঠিকই, তবে আমার বর্তমানের ভালো-লাগা মন্দ-লাগাকে একেবারেই আমল দিতে চাই না। এইসব সামান্য ভালো-লাগা মন্দ-লাগার বাইরেও এ-সবকে ছাপিয়ে ছাড়িয়ে অন্য কিছু যেন একটি চাইছি, বেশ বুঝতে পারছি। জীবনের বহু কথা জেনেছি, আমার মতো করে ভোগ করেছি, উপলব্ধি করেছি, বলেওছি সে-সব নানাভাবে। তবু বারবার মনে হচ্ছে, যেভাবে বেঁচে আছি বা যাপিত সময় অতিক্রম করছি, এটিই জীবন নয়, জীবন বোধহয় সেটিই, অতিক্রমিত সময়গুলোকে কীভাবে টেনে আনতে পারছি এবং কীভাবে টেনে আনছি স্মৃতিতে, সেগুলোর পরস্পরের সম্পর্ককে তুলে ধরা, ধরতে পারা! সে-সব বলবার জন্যই আমার বর্তমানের বেঁচে থাকা। বেশ বুঝতে পারছি এই শ্লথ গতির যাত্রার ভেতর দিয়ে তাগাদাহীন পরিক্রমণ আসলে যেন আমার ভেতরে তৈরি হওয়া একটি প্রক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ! এখন প্রশ্ন, এটিকে কীভাবে ব্যবহার করব? সে কি কেবল আমার অজ্ঞাতবাসের কথা কিংবা সেইসব গল্প লিখে ফেলা? এটিই হবে পদ্ধতি? বাসটি যেন বেশি সময় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! অনেক মানুষ উঠছে বাসে। একটি লোক প্রায় উলটে পড়ল আমার গায়ে। ধরে ফেললাম, না হলে ও পড়েই যেত। লোকটির সেদিকে পরোয়া নেই, বকবক করেই যাচ্ছে। তাকালাম, কার সঙ্গে কথা বলছে ও?
প্রায় দুজনের ওপাশে এক মহিলা – অনেক উঁকি-ঝুঁকির পর চিহ্নিত করলাম উদ্দিষ্ট কথনশ্রোতাকে! তাও মহিলার চেহারার পুরোটা বুঝতে পারছি না। আন্দাজে কল্পনায় মিশিয়ে ধরে নিলাম রোগাটে ক্ষয়াটে চেহারা। বয়সী বয়সী মনে হলে কী হবে, আদৌ বেশি বয়স নয়। মাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে দুটি শিশু। একটি মেয়ে একটি ছেলে। বছর পাঁচেক বয়সের শিশুকন্যাটি নতুন কটকটে উজ্জ্বল রাংতাভরা ঘাগরা-চোলীতে মোড়া। ঘাড়টাকে যতটা সম্ভব পেছনে পাঠিয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে আছে। তলায় দাঁড়িয়ে গাছের পাকা ফল দেখার মতো মায়ের মুখের দিকে তার দৃষ্টি। মায়ের শিশুপুত্রটির বয়স দু-আড়াই হবে। সেও বয়সের মেঝেতে পা রেখে দাঁড়িয়ে। এক হাতের শক্ত মুঠিতে মায়ের শাড়ি, অন্য হাত দিদির ঘাগরায়। ফলে দিদির ঘাগরাটি খুলে নিচের দিকে নেমে যাওয়ার যোগাড়! ভাইবোন কেন, মায়েরও শরীর অস্থির বাসের দুলুনি-ঝাঁকুনিতে! কী ভয়ংকর ভাঙাচোরা রাস্তা! ধীরে ধীরে আমি ওদের প্রতি বেশ মনোযোগী হয়ে পড়ছি বুঝতে পারছি। কটা দিন শুধুই নিজের মাথার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে যথেষ্ট বিরক্ত যে হয়ে পড়েছিলাম, এই মুহূর্তে তা টের পেলাম। একটিমাত্র দৃশ্য সেই প্রমত্ত দশাটি কাটিয়ে দিল। ফলে অনুভব করতে পারছি আমার চোখদুটি ঠিকঠাক দেখছে – চামড়া ঠিকঠাক স্পর্শ নিচ্ছে – কান যথাযথ তার ভূমিকা পালন করছে। এমনকি মুখেও একটি স্বাদ এসে গেল। বাধ্য হলাম ওদের কথায় কান দিতে। মানুষটির কথা বলবার ধরনটিই কেমন যেন ভিন্ন। অনেকটা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে স্বরের উত্থান-পতনে নাটকীয় ভঙ্গিতে। সাধারণত বাস-ফাসে এ-রকম চেঁচিয়ে ব্যক্তিগত কথা বলতে শোনা যায় না। এ-রকম করে একমাত্র কমবয়সীরা, স্থান-কাল-পাত্র ভুলে গিয়ে। সে তো নিজেদের জাহির করার জন্য – মেলে ধরার জন্য – অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য, যদি একসঙ্গে একগাদা সমবয়সী ওঠে। ওদের বয়সের প্রবণতাই হলো, কিংবা মনস্তত্ত্ব – তোমরা সবাই আমার প্রতি মনোযোগ দাও, হাবেভাবে এটি বুঝিয়ে ছাড়া। কিন্তু এরা তো পরিণত দুটি মানুষ-মানুষী। স্থান-কালের ব্যাপারে অজ্ঞ হওয়ার কথা নয়! এ-বিষয়টিই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। কেবল কথা বলবার জন্য কথা বলা নয়, অপ্রাসঙ্গিক এলোমেলো কথা নয়। আটপৌরে বিষয়ী কথা এসব, ঘরের কথা। এদের কি কোনো ঘর নেই? যাবতীয় কথা সব বাসেই সেরে নিতে চাইছে কেন? গতকালের কথা, আজকের কথা, আগামীকালের কথা! শ্রমের কথা, মজুরির কথা, বোনাসের কথা! বাচ্চাকাচ্চার কথা, শরীরের কথা, পরিজনদের আচরণের কথা, ঝগড়ার কথা, কাজের বাড়ির গিন্নিদের কথা! আসন্ন পুজোর কথা, শহরের ঠাকুরের কথা, বাচ্চাদের আনন্দের কথা, পুত্রটির ভবিষ্যৎ শিক্ষার কথা! কত কথা! সব কি এখনই সেরে নিতে হবে এই চলন্ত ভিড় বাসের মধ্যে – মানুষের মাঝে – দুপুরবেলা? ব্যক্তিগত বা গোপন বা একান্ত বলে কি এদের জীবনে কিছু নেই? সবই সর্বজনীন? সবই প্রকাশ্য? শিশুপুত্রটির নাকের সিকনি অস্বাভাবিক গড়িয়ে আসায় খেয়ে খেয়ে ক্লান্ত হয়েই সম্ভবত কেঁদে উঠল। মানুষের পায়ের চাপও পড়তে পারে তার কচি পায়ের ওপর। হাত বাড়িয়ে পুত্রকে কাছে টেনে নিয়ে এলো মানুষটি। তারপর ভোলাতে ভোলাতে কোলে তুলে নিল। পরনের নতুন লুঙ্গিটি দিয়ে বাচ্চার নাক মুছিয়ে শিশুর গালে মাথায় ট্যারা চোখে চুমু খেল বাবা। এ-এক উৎকট আদর – সরব। অদ্ভুত হাসিতে ভরে গেছে শিশুর মুখ। কী গভীর তৃপ্তি তার চোখে। একটি চোখ অতিমাত্রায় ট্যারা হওয়ায় এই তৃপ্তি বেশি করে ধরা পড়ছে – সব মিলিয়ে সুন্দর হয়ে উঠল। কেন কে জানে, জানালা দিয়ে আমি একবার শরৎকালের দুপুরের আকাশটি দেখে নিলাম। বেশিক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থাকা গেল না। ওদের কথা আমার চোখ-কান টেনে নিল ভেতরে। বাবাকে বললাম, ‘বাচ্চাটাকে দেবেন আমার কোলে?’ মানুষটি পূর্বাপর গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল, ‘না! বেশ আছে!’ তারপর সন্তানের চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কি রে বসবি কচি?’ বাচ্চাটি অকারণে লজ্জা পেয়ে হেসে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বাবার বুকে আরো লুটিয়ে পড়ল। আমিও হেসে উঠলাম এই কাণ্ডে অভিভূত হয়ে। তারপর নিজেই চমকে উঠলাম। কখন যেন আমিও সরব হয়ে পড়েছি। প্রায় ওদের মতোই। শিশুদুটির উদ্দেশে অনর্গল কথা বলে চলেছি। বাবা ছেলেকে বলছে, ‘তোর আর আমার হলো না নতুন! না হোক! কালীপূজায় হবে। আরো অনেক টাকা আনব। মায়ের হলো, দিদির হলো, ভালো হলো না? আমাদের পরে হবে বলো?’ মা পেছন থেকে বাচ্চার নাকের সিকনি আর একবার পরিষ্কার করে দিল শাড়ির আঁচল দিয়ে। শিশুকন্যাটির দুটি হাত আমার দুই হাঁটুর ওপর। আমিও ওর ক্ষণিকের অবলম্বন হতে পেরেছি দেখে বেশ লাগল। ধীরে ধীরে আবিষ্ট হয়ে পড়ছি ওদের মধ্যে। মা বাবার কানে যুক্তি দিচ্ছিল ঠিক কী কী কারণে কিছুদিন আগে পাড়ার দোকান থেকে এই লুঙ্গিটি কেনা ছাড়া ছেলেমেয়ের বাবার জন্য টাকা তুলে রাখা সম্ভব হলো না, যে-টাকায় মহাশহরের একটি বিশেষ হাটে এসে জামা-প্যান্ট কেনা যেত! কিংবা পুত্রসন্তানের জন্য পুজোর নতুন পোশাক! বাবা বলল, ‘পুজোয় মেয়েদেরটা হয়ে গেল, কালীপূজায় পুরুষদের হবে।’ বলেই সে আর-একবার শিশুপুত্রের – অপর পুরুষের মতামত যাচাই করে নিতে চাইল। এবার কীভাবে টাকা সংগ্রহ করবে, মা শোনাচ্ছিল এখন সেই কথা। কনডাক্টর লোকটিকে টিকিট কাটতে বললে, ছেলেকে মায়ের কোলে দিয়ে অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে লুঙ্গি ওপরে তুলে লুঙ্গির ভেতরে হাত ঢুকিয়ে শর্টসের পকেট থেকে টাকা বের করে দিল সে। আমি বললাম, ‘ছেলেমেয়েকে নিয়ে আপনি বসুন না আমার সিটটায়। অসুবিধে হচ্ছে আপনার। আমি উঠে দাঁড়াচ্ছি।’ মানুষটির মুখে এবার একটু হাসি খেলে গেল। বিড়ি খাওয়া কালো ঠোঁট আর লালচে-কালচে দাঁতের সেই হাসিতে ঠিক কৃতজ্ঞতা নয়, একরকমের ভালো লাগার বোধ। দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা সাধারণত বসে থাকা যাত্রীদের শ্রেণিশত্রু ভেবে বসে। মানুষটি হয়তো ভাবল, এই বসে থাকা লোকটি শ্রেণিশত্রু নয়। আমারও এই হাসি ভারি আপন মনে হলো। লোকটি বলল, ‘না, এই তো এসে গেছি! নামব।’ বলতে না বলতেই জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখে নিয়ে এক পলকে লোকটি নামার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল – ‘চলো চলো – এসে গেছে!’ বাসের চলন্ত অবস্থাতেই হাত ছেড়ে দিয়ে পুত্রকন্যার মা পা বাড়াল দরজার দিকে। কোনোক্রমে পুরুষটি এক হাতে স্ত্রীকে ধরে নিল। মুহূর্তের জন্য আমার মধ্যেও কেমন একটি আতঙ্কের বিদ্যুৎ খেলে গেল। সব ঠিকঠাক হয়ে যেতেই, স্থির হলাম। কিন্তু কী হলো কে জানে, সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। ভিড় ঠেলে এগুতে থাকলাম দরজার দিকে। দুটি শিশুসহ ওই দম্পতির পেছনে পেছনে আমিও নেমে পড়লাম। নামতে না নামতেই ঘোরতর সংসারী আর দক্ষ-স্ত্রী পটু-মা ওই মহিলা বিষয়চর্চায় মন দিল। পুরুষটি বলল, ‘ওসব তুমি ভাবো -।’ মহিলা খানিকক্ষণ নীরব থেকে আবার কথায় চলে গেল। আমি যে ওদের পেছনে পেছনে কিছুটা দূরত্বে চলেছি বা এ-জগতে হাওয়া বইছে, রোদে তাপ আছে, গরু চরছে, পাখি ডাকছে – এ-সবে কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই।
কিন্তু প্রায় গোয়েন্দার মতো আমি ওদের পিছু নিলাম কেন? বাস থেকে নামলামই বা কেন? আমার গন্তব্য তো এখনো অনেক দূর। কিচ্ছু বুঝতে পারছি না! নিশিতে পাওয়ার মতো কী টানে যেন এগিয়ে চলেছি। ওরা যেন চুম্বক! ওই অতি সামান্য পরিবারটি যেন এক মায়া। ওদের কথায় কী যে মোহ, কী যে জাদু! এই মুহূর্তে ওরাই যেন আমার নিয়তি!
ঘোর কাটিয়ে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করলাম। নিজেকেই প্রশ্ন করলাম অনেকগুলো। কেন? কেন? বুঝতে পারলাম আমি ওদের ঘরকরনা দেখতে চলেছি – কোথায় থাকে ওরা?‘কিন্তু কেন?’ বললাম, ‘জানি না।’ ওরা সামনে, আমি পেছনে। গেঁয়োপথ ধরে এগিয়ে চলেছি। আমার কিন্তু যাওয়ার কথা ছিল বুদ্ধদেবের কাছে – আগমনীর কাছে। আমার কিন্তু আমার লেখালেখি নিয়ে ভাববার কথা ছিল। একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা – তেমন কোনো চাঁদের গায়ে তাকিয়ে একটি মুহূর্তেই! লেখা শুরু করবার জন্য, আলাপ-আলোচনা আর সাহচর্যের জন্য, অতিবাহিত জীবনের তুল্যমূল্য বিচারের জন্য বুদ্ধদেবের কাছে আমার আর যাওয়া হলো না। শরতের রোদ পড়ে আসছে।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.