শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের চিত্রচর্চায় যেসব বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে, তার কয়েকটি ছবি আমি সচক্ষে আঁকতে দেখেছি। এই দেখাকে আমি বিরল অভিজ্ঞতা জ্ঞান করি এবং গর্বিত হই। ছাত্রাবস্থায় ক্লাসরুম-স্টাডির শিক্ষক হিসেবে মাঝে-মধ্যে পেয়ে যেতাম তাঁকে। এমনিতে তিনি আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ থাকায় ক্লাস নিতেন না। নেওয়ার সময়ও পেতেন না। কিন্তু কোনো কোনো সময়ে শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে হঠাৎ হঠাৎ বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে ঢুকে ক্লাস নেওয়া শুরু করতেন। তেমনি কিছু কিছু মুহূর্ত আমরাও পেয়ে গিয়েছিলাম। সেইসব ক্লাসে চূড়ান্ত অ্যাকাডেমিক ধরনের ধাপগুলো নিষ্ঠার সঙ্গে এঁকে দেখাতেন এবং কী করে আঁকার বিষয়কে দেখার শিল্পিত চোখ তৈরি করতে হয়, ব্যাকরণ মেনে কী করে স্তর থেকে স্তরান্তরে নান্দনিক এলিমেন্টগুলোকে সাজিয়ে সাজিয়ে একেকটি পরিপূর্ণ ছবিতে রূপান্তরিত করতে হয়, তা শেখাতেন খুব সহজ করে, অপরিসীম দক্ষতায়। বতিচেলি রমণী আঁকতে কেমনভাবে ছন্দায়িত ভঙ্গি রাখতেন ড্রয়িংয়ে, লিওনার্দো আর রাফায়েলের ড্রয়িংয়ের ধরন কী ছিল এবং কতটা মিল ছিল, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো এবং ডুরারের ড্রয়িংয়ের রস কেমন ছিল, রেমব্রান্ট আর ভারমিয়ার আলোছায়াকে কেমন করে ছবির অংশ করতেন, কনস্ট্যাবলের ল্যান্ডস্কেপটি রঙের মজা-দেখা প্রকৃতিকে ছাপিয়ে কেমন করে নিজস্বতা পায় – এসব নিয়ে বলতেন আর সংক্ষেপে এঁকে এঁকে দেখাতেন সাবলীল দক্ষতায়। আদিকাল থেকে চলে আসা চিত্রকলা-শেখার পর্যায়গুলোকে মজাদার করে বোঝানোর ক্ষমতা তাঁর মতো আর কারো মধ্যে দেখিনি। এমনকী ইউরোপে গিয়েও না। তিনি পুস্তকি ঢঙে বোঝাতেন না, স্বভাবজ্ঞানকে ব্যবহার করতেন। ছবির সমাপ্তি কোথায় টানা উচিত তাতেও ছিল তাঁর নিজস্ব এক ধরনের অভিমত।
এ-হলো একরকম – একজন শিক্ষকের অ্যাকাডেমিক পদ্ধতি শেখানোর দিক। সেই তিনিই আবার জয়নুল হিসেবে ক্যানভাসের সামনে অন্যরকম। তখন নিজ-ভুবনের চালক। তখন সরাসরি আর ইউরোপীয় অ্যাকাডেমিকতার পক্ষের কেউ নন। একজন ভিন্নরসের শিল্পী, আপন সৃষ্টিশীল জগতের মানুষ। জলরঙের ল্যান্ডস্কেপই হোক, গোয়াশের লোকশিল্পের ভাবমিশ্রিত ছবি হোক, তেলরঙে আলোছায়া-মাখা রমণীদের নিয়ে কম্পোজিশন হোক অথবা কালো কালি আর কাগজ-কলমে আঁকা ড্রয়িংয়ের কাজ হোক – তিনি তখন আর দ্য ভিঞ্চি, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, রাফায়েল, রেমব্রান্ট, ভারমিয়ার বা টিশিয়ানের কেউ নন, তখন একান্তই দেশজ এক মহাশিল্পী। শিল্পাচার্য জয়নুলের উপস্থিতি তখন একশ ভাগ সেগুলোতে।
ল্যান্ডস্কেপের ব্যাপারে বলতেন, ইম্প্রেশনিস্টদের ভাবসাব ভালো লাগে, খুব প্রিয় ‘ইজম’। কিন্তু আঁকার সময়ে তাঁকে দেখেছি আলোছায়া, রং, টোন, ড্রয়িং, পরিবেশ, স্পেস ইত্যাদিকে নিজের মতো করে সাজিয়েছেন। সবকিছুকে মনে প্রবেশ করিয়ে এক ধরনের নিজস্ব ছন্দ, ভঙ্গি আর গতি তৈরি করে প্রচণ্ড দক্ষতায় ছবি সমাপ্ত করতেন। এভাবে সবটা গড়িয়ে-পড়িয়ে ছবিটি তাঁরই আবিষ্কৃত ‘স্টাইল’ ধারণ করত। ইউরোপীয় কোনো ‘ইজম’ তখন আর তেমন অনুসৃত হতো না।
মেটেরিয়াল-ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাঁর নিজস্বতা ছিল। ইউরোপীয় রং-তুলি, কাগজ-ক্যানভাসই ব্যবহার করতেন, কিন্তু ব্যবহারের চলতি নিয়মকে গ্রাহ্য করে নয়। যেমন জলরঙের ক্ষেত্রটি। ‘ডেভিড-কক্স’ তাঁর অত্যন্ত প্রিয় কাগজ ছিল। হালকা বিস্কুট-ব্রাউন এই কাগজটিতে নামি-দামি ব্রিটিশ শিল্পীরা জলরঙে কাজ করতে পছন্দ করতেন একসময়। এই কাগজে আঁকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা বিখ্যাত ল্যান্ডস্কেপ-শিল্পীদের মধ্যে অন্তত একজনের কথা স¥রণ করতে পারি। তিনি ইংরেজ শিল্পী ফ্র্যাঙ্ক শেরউইন। পুরো কাগজ জুড়ে ভরাট কম্পোজিশনে কাজ করতেন। কাগজের মজাদার টিন্টটিকে খুব বেশি ছাড়তেন না রোদ হিসেবে। হয়তো সে-দেশের আবহাওয়াগত কারণে রোদের ব্যাপারটি তেমন প্রখর হতে পারে না বলে তাঁর ছবিতে সেই পরিবেশটিই তিনি রাখতেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রখর সূর্যালোককে ব্যবহার করতে গিয়ে জয়নুল সেই কাগজের হালকা ব্রাউন টিন্টটিকে এমন দক্ষতায় কোনো রং না লাগিয়ে ছেড়ে যেতেন যে তাতে ভিন্ন মাত্রা সৃষ্টি হতো। দর্শকের রোদের রং-সম্পর্কিত চিরাচরিত ধারণাটি একেবারে বদলে দেবার দিকটি অর্থাৎ হলুদকে বদলে ব্রাউনে আনার ব্যাপারটি এমন বুদ্ধিদীপ্ততা আর মজাদার করে প্রয়োগ করতেন তাঁর ছবিতে যে, তফাৎটি বোঝারও উপায় থাকত না।
এক ধরনের ভিন্নতা ছিল তাঁর এগ্-টেম্পেরার কাজেও। এক্ষেত্রে তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং উল্লেখযোগ্য একটি বড়মাপের কাজের উল্লেখ করছি। কোনো শিল্পীর কোনো শিল্পকর্ম ঘরে ঘরে আদৃত হওয়ার মতো অসাধারণ জনপ্রিয়তাপ্রাপ্তির একটি দুর্লভ দৃষ্টান্ত এই ছবিটি। নাম ‘স্ট্রাগল’। কাদায় আটকে যাওয়া কাঠবোঝাই একটি গরুর গাড়িকে একজন মানুষের ঠেলে-ওঠানোর খুব পরিচিত একটি দৃশ্য। ছবিটি প্লাইবোর্ডে টেম্পেরায় করা। বিশাল আকারের ছবি, কিন্তু মনে হবে অত্যন্ত দ্রুত অথচ সহজেই আঁকা। এই ব্যাপারটি অবশ্য ছিল তাঁর আঁকার বিশেষ স্বভাব।
টেম্পেরা এমন একটি মাধ্যম যা প্রাচীন পদ্ধতির এবং কঠিন। দ্রুত শুকিয়ে যায় বলে কাজও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। এইসব কারণে মনোযোগী থাকতে হয় আঁকার শুরু থেকে শেষ অবধি। কিন্তু কঠিন দিকটি হলো, দ্রুত আঁকতে হয় বটে কিন্তু কয়েকটি স্তর বা ধাপকে বাদ দিয়ে নয়। জয়নুল বিশাল এই কাজটি করেছিলেন টেম্পেরার স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় দ্রুততার চাইতেও দ্রুত। বলাই বাহুল্য যে, তা করেছিলেন তিনটি কারণে। এক – তাঁর বিষয়ের চাহিদা আর ড্রয়িং করার স্বভাবসুলভ দ্রুততা এবং বলিষ্ঠতার সঙ্গে রং-প্রয়োগের সামঞ্জস্য রাখতে। দুই – বোর্ডকে রঙের বাহক পানিকে শুষে ফেলার সময় না দিতে এবং তিন – শুষ্ক আবহাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে। ছবিটি আর্ট কলেজে অধ্যক্ষের কক্ষে রাখার পর বহু বিদগ্ধজন দেখতে আসতেন। যাই হোক, শিল্পাচার্য জয়নুলকে আমি প্রথম অত্যন্ত কাছ থেকে আঁকতে দেখেছিলাম ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। তখন মাত্র ক’মাস হয় আর্ট কলেজের ছাত্র আমি। বার্ষিক বনভোজনে গিয়েছিলাম মীরপুরের বিল-এলাকার একটি উঁচু টিলায়। সম্ভবত মাজারের পেছনের কোনো জায়গা হবে। তখন ওদিকটায় জঙ্গল ছিল। মাজারেও এখনকার মতো বড় কোনো দালানকোঠা ছিল না। শুনেছিলাম, মাজারের খাদেমদের পোষা কুমির ছিল। ডাঙায় কুমিরের গর্তও দেখেছিলাম। অত্যন্ত নিরিবিলি স্থান। সেখানে সহপাঠীরা ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম কুমির দেখার আশায়। সদ্য ম্যাট্রিক পাশ করা বালক সবাই। অতএব এসবেই উৎসাহ বেশি ছিল। হঠাৎ কেউ এসে বলল, ‘আবেদিন স্যার ছবি আঁকতে বসেছেন। সবাইকে উপস্থিত থাকতে বলেছেন স্যারেরা। আঁকাশেষে সই করতে হবে ওই ছবিতে সবাইকে।’ বালখিল্য উৎসাহ সাঙ্গ করে ওখানে যাবার ইচ্ছা হচ্ছিল না, কিন্তু আদেশ বলে কথা! অতএব গিয়ে হাজির হয়েছিলাম।
ব্যাপারটি নতুনই বটে। অন্যের ছবিতে সই? কী করে সম্ভব? তাও আবার আবেদিন স্যারের ছবিতে? তবু ছুটলাম। বেশ পাহাড়-মতন উঁচু টিলা। তার ওপরেই বনভোজনের মূল আসর। একদিকে একটি মরা কাঁঠালগাছ। তার গায়ে স্যারদের কারো কারো সোয়েটার, কোট, ঘড়ি, ব্যাগ ঝোলানো। নিচে বিরিয়ানির জন্য রাখা বিরাট বিরাট কয়েকটি ডেগচি আর জ্বালানি-খড়ি কয়েক আঁটি। ডেগচির কাছাকাছি বেশ সাহসী এবং চতুর চেহারার কয়েকটি পাতিকাক। তাদেরকে কেউ কিছু বলছে না বলে বেশ নির্বিঘ্ন ভেবে পরম আসকারায় হাঁটাহাঁটি করছে, উড়ছে-চলছে-ফিরছে।
একটু খেয়াল করতেই বুঝলাম এই পুরো দৃশ্যটিই স্যারের ছবির বিষয়। স্যার বেশখানেক দূরে একটি হালকা খাকি হ্যাট পরে একটি ফোল্ডিং টুলে বসে, বোর্ডে ফুলশিট কাগজ সেঁটে (কেন্ট পেপার) সরাসরি চাইনিজ ইংকে খাগের কলম ডুবিয়ে ডুবিয়ে দৃশ্যটি আঁকছেন। আঁকছেন বেশ মোটা দাগের রেখায়। পেছনে দাঁড়িয়ে শিক্ষকবৃন্দ, কয়েকজন লেখক-কবি, সংগীতশিল্পী এবং ওপর ক্লাসের ছাত্রছাত্রী। দেখতে দেখতে ক’মিনিটেই ছবি শেষ। কাঁচা চোখে ছবির বিচারের ক্ষমতা তো ছিলই না, শুধু দেখলাম সবাই থ’ বনে আছে। কারো মুখে কথা নেই। ছবিটির দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক আকর্ষণ বোধ হলো। তা যে কী ছিল সেই মুহূর্তে বিশ্লেষণের ভাষা জানা ছিল না। স্যার ছবিটি একজনকে গাছের কাছাকাছি একটি ঝোপে দাঁড় করিয়ে রাখতে বললেন। পরে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘দূর, ভালা হইল না। সময় পাইলে আরেকটা আঁকুম। এখন সবাই সই করেন।’ পেছন থেকে সম্ভবত শফিকুল আমীন স্যার শুধু বলেছিলেন, ‘আর একটা দুর্ভিক্ষের ছবি হলো। বহুদিন পর একই ধরনের একটা ছবি আঁকলেন।’ সে-কথা শুনে আবেদিন স্যার রসিকতা করে বলেছিলেন অনেকটা এইভাবে – ‘হ। বিরিয়ানির ডেগচি নিয়ে দুর্ভিক্ষের ভাবনা।’ সেই ছবিতে এক কোনায় আমারও সই আছে। বেশ কিছুকাল ছবিটি আর্ট কলেজে ছিল তাঁর কক্ষে – আগের বছরের মুনশিগঞ্জে বনভোজনে গিয়ে চরে বসে আঁকা নৌকার ছবির পাশে (এই ছবিটি এখনো রয়েছে চারুকলা ইনস্টিটিউটের সংগ্রহে)। কিন্তু সেই ছবিটি যে কোথায় উধাও হলো – আর দেখিনি। তবে পরে যখন তাঁর দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা জন্মালো তখন বুঝেছিলাম – কী অসাধারণ পটুত্বে একটি অ-বিষয়কে বিষয় করে কাজটি করেছিলেন – ছবির মজাদার নির্যাসকে মাখিয়ে মাখিয়ে ওই ক’মিনিটে। এবং আঁকিয়ে-ঢংটি দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার মতোই। এমনকী কাকগুলোও, যেন ওইসব ছবি থেকে এই ছবিতে উড়ে এসে বসেছে।
বড় ক্যানভাসে তেলরঙে ভিন্ন ধাঁচের ছবি আঁকতে দেখেছি আর্ট কলেজে মাস্টার হবার বছর পাঁচেক পর। সময়টা উনসত্তর সাল। এক বিকেলে শাহাদাত চৌধুরী খবর দিলেন আবেদিন স্যার ডেকে পাঠিয়েছেন জরুরিভাবে। সেদিনই সন্ধ্যায় যেতে হবে ইডেন বিল্ডিংয়ে। হঠাৎ ইডেন বিল্ডিংয়ে কেন যেতে বলা হলো বুঝতে পারিনি। শাহাদাত নিজেও জানতেন না।
ইডেন বিল্ডিংয়ে এর আগে কখনো কোনো কাজ পড়েনি, অতএব যাওয়াও হয়নি। ওখানে প্রাদেশিক প্রশাসনের হরেক দফতরের সঙ্গে কিছু কিছু কেন্দ্রীয় সরকারি দফতরও ছিল। এতো সুউচ্চ দালানের সেক্রেটারিয়েট তখন অবশ্য ছিল না। বেশ কিছু লম্বা লম্বা টিনশেড ছিল। সেসবের একটিতে ছিল প্রেস ইনফরমেশন দফতর। সেইখানে আমাদের যেতে হবে। আবেদিন স্যার সেখানে থাকবেন।
সন্ধ্যায় গিয়ে হাজির হলাম। আবেদিন স্যারের জরুরি ডাক, অতএব ঠিক সময়মতো পৌঁছালাম। কয়েকটি কম আলোর বাতি জ্বলছিল ঘরে। সেই আলোতে ঘরের এক কোণে আবেদিন স্যার বসে চা খাচ্ছেন। তাঁকে ঘিরে বসে আছেন শিল্পী কামরুল হাসান, শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার, শিল্পী হাশেম খান, কথাশিল্পী বুলবন ওসমান, জাদুঘরের এনামুল হক, শিল্পী কেরামত মওলা, শিল্পী শামসুল ইসলাম নান্টু, খ্যাতিমান অভিনেতা আবুল খায়ের (মহীবুর রহমান), ক্যামেরাম্যান মবিনসহ আরো অনেকে। ঘরময় ছবি আঁকার কাগজ ছড়ানো-ছিটানো। একটি দেয়ালের পাশে কয়েকটি ইজেল, রং-তুলি-কালিসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি। অদূরে স্ট্যান্ডে ১৬ মিলিমিটারের ম্যুভি ক্যামেরা এবং চলচ্চিত্রে ব্যবহারোপযোগী কয়েকটি ‘ডলি-ফ্লাড’ লাইট।
আমাদের দেখে স্যার খুশি হলেন। আনন্দিত হলে তিনি হইচই করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন। তাই করলেন। পরিচয় করিয়ে দিলেন অপরিচিতদের সঙ্গে। সেখানে ছিলেন ঝাঁকড়া চুলধারী বেশ লম্বা-চওড়া ফর্সা একজন। ভদ্রলোককে দেখিয়ে আবেদিন স্যার বেশ স্বাভাবিকভাবে বললেন, ‘এই যে ইনি, ইনারে নিয়ে একটা সিনেমা হবে। ইনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।’ এ-কথা শুনে ভদ্রলোকসহ সবাই হো-হো করে হেসে উঠলেন। স্যারের রসিকতা করার ধরনটা ওরকমই। খুব সহজ আর স্বাভাবিক থাকতেন নিজে। তো সবটাই হেঁয়ালি মনে হলো। পরে খায়ের সাহেব বুঝিয়ে দিলেন যে, বিদ্রোহী কবি নজরুলকে নিয়ে একটি ছবি হচ্ছে। ওই ভদ্রলোক নজরুলের ভূমিকায় অভিনয় করছেন। ছবিটি নজরুলের উপরে হলেও ইংরেজবিরোধী নানান যুদ্ধ আর গণ-আন্দোলনের দিকগুলোকে রাখা হবে ইতিহাস হিসেবে নজরুলের সারাজীবনের কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিক পরম্পরাকে ধরতে। ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা, প্রীতিলতা, অরবিন্দসহ স্বদেশী আন্দোলনের বহু বিপ্লবীর কথা এবং ছবিও থাকবে তাতে। স্যার বুঝিয়ে দিলেন – এই পর্বের জন্যে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরকেও কিছু কিছু ড্রয়িং করতে হবে চলচ্চিত্রটিতে ব্যবহারের জন্য। শুনে খাবি খাওয়ার যোগাড়। তাঁর এবং কামরুল স্যারের সঙ্গে আঁকা চারটিখানি কথা নয়! অবশেষে শুরু হয় কাজ। বহুদিন ধরে চলে সেই দুরূহ কাজের পালা। তবে আমি নিজেই ছিলাম দিন পনেরো। একদিকে রিমকে রিম কার্টিজ কাগজে সবার ড্রয়িং করা আর সেইসঙ্গে স্যারের বড় বড় ক্যানভাসে ছবি আঁকার ধুম। আমি তখন যত না আঁকি, তার চাইতে তাঁদের আঁকা দেখি বেশি। সেই অসাধারণ মুহূর্তগুলোকে একাধারে শিক্ষণীয় এবং উপভোগ্য মনে হতো বলেই আমি, হাশেম খান, শাহাদাতসহ সবাই বিকেল চারটা থেকে রাত বারোটা অবধি সারাক্ষণ কাটাতাম ওই বিশেষ টিনশেডটিতে।
তিনি বড় ছবি শুরু করেন পলাশির যুদ্ধ দিয়ে। কিন্তু শুরুর আগে ড্রয়িংয়ের পর ড্রয়িং করেন বিভিন্নভাবে। চমৎকার সব ড্রয়িং। মেমোরি ড্রয়িং যে এত মজাদার এবং আকারে, ভঙ্গিতে, ছন্দে এত সঠিক হতে পারে তা দেখাই আমার মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায়। কামানের ড্রয়িং, ইংরেজ এবং দেশী সৈনিকদের চেহারা এবং ভাবভঙ্গির ড্রয়িং, আমবাগানের খসড়া ড্রয়িংসহ অসংখ্য ড্রয়িং তিনি পলাশির যুদ্ধের পেইন্টিংটি শুরুর সহায়ক হিসেবে এঁকে ফেলেছিলেন ক’দিনে। এঁকেছিলেন সিপাহি বিদ্রোহের ছবির জন্যে অসংখ্য ড্রয়িং, ইংরেজদের অত্যাচার-নিপীড়নের নানা দৃশ্য বড় কম্পোজিশনের স্টাডি হিসেবে।
স্যার ছিলেন আসর-জমানো মানুষ। রসিকতা আর গল্প ছাড়া যেন কাজই করতে পারতেন না। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ওই দফতরে উপস্থিত হয়েই খায়ের সাহেবকে ঠাট্টার ছলে জানিয়ে দিতেন কী কী না খেলে ছবি এগোবে না। সেসব রসিকতাপূর্ণ কথার জন্যে সবাই বেশ অপেক্ষায়ই থাকতেন মনে হতো। কয়েকটি কথা এখনো কানে লেগে আছে। যেমন একদিনের কথা – ‘খায়ের সায়েব, আজকে তো রেক্সের কাবাব-পারাটা না হলে পলাশির যুদ্ধ লাগানোই যাইব না মনে হয়।’ এই রেস্তোরাঁর কাবাব-পরোটার প্রতি আবেদিন স্যারের বিশেষ আকর্ষণ ছিল বলে ধারণা হতো। তবে স্টেডিয়ামের কোনো একটি রেস্তোরাঁর মাংসের চাপ আর চাপাতিও মাঝে মাঝে আনাতেন।
তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা পেইন্টিংটি শুরুর সময়ে আরো একটি রসিকতার কথা মনে আছে। এ-সময়ে পরপর কয়েকদিন একই ধরনের খাবার খাওয়ার কারণে সম্ভবত শিল্পী কামরুল হাসান কিংবা খায়ের সাহেবের পছন্দ-অনুযায়ী গুলিস্তানের বিখ্যাত চাইনিজ রেস্টুরেন্ট চৌ-চিন-চাউ থেকে খাবার আনা হলো। কেউ একজন বললেন, খাবারে ‘ব্যাম্বু শ্যুট’ আছে। স্যার বললেন, ‘বাহ্! আমি তো বাঁশের দেশী কেল্লা নিয়া ভাবতাছি। চীনা ‘ব্যাম্বু শ্যুটে’ না গোলমাল বাঁধে।’
এই রকমের সব রসিকতার মধ্য দিয়ে তিনি কাজের সময়টিতে আসর জমিয়ে রাখতেন। সবাই তাঁর নানান কথা শুনতে শুনতে অপেক্ষা করতাম কখন পেইন্টিংটি শুরু করবেন। তিনি বিশাল শূন্য ক্যানভাসটির কাছে বসে গল্পের পর গল্প বলে যেতেন ঠিকই, কিন্তু বুঝতে পারতাম বসে বসে ছবির পুরো ব্যাপারটিকে নিজের মনে সেই মুহূর্তগুলোতে ঠিকই সাজিয়ে নিচ্ছেন। কী করে শুরু করবেন আর কী আঁকবেন তার লে-আউটটি মনে তৈরি করে ফেলতেন। তারপর একসময়ে হঠাৎই শুরু করতেন স্বভাবসুলভ দ্রুততা আর বলিষ্ঠ ড্রয়িং দিয়ে। যতদূর মনে পড়ে, পলাশির যুদ্ধ, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, সিপাহি বিদ্রোহ ইত্যাদিসহ মোট আটটি পেইন্টিং তিনি ওই ক’দিনে আঁকেন। সেইসঙ্গে নজরুলের জীবন-সম্পর্কিত বেশকিছু ইলাস্ট্রেশনধর্মী ছবি আঁকেন ফুলশিট কাগজে। ভাবতাম, অতবড় ক্যানভাসের ছবি আর ওই অতগুলো ড্রয়িং শেষ করবেন ক’দিনে, কীভাবে। কিন্তু এক ধরনের স্কেচিং-ঢঙে দিব্যি নিজের ধরনকে বজায় রেখে ঠিক সময়মতো শেষ করেছিলেন সব। আবার ব্যস্ততার মধ্যেও অন্যদের প্রশংসা করে উদ্বুদ্ধকরণ ব্যাপারটি সারতে ভুলতেন না। মাঝে-মধ্যে কামরুল স্যারের এবং মোস্তফা মনোয়ারের ক্যানভাসের সামনে গিয়ে হাজির হতেন। বলতেন, ‘আহা কী সুন্দর, ছবি! মজা হইতাছে।’ সবাইকে ডেকে জড়ো করতেন দেখাতে। এমনি করে এক সন্ধ্যায় কথায়-কথায় ঠিক করে ফেলেন যে, ‘নবান্ন’ এবং ‘কাল-বোশেখী’ – এই দুটি প্রদর্শনী করার।
যাই হোক, এসব ড্রয়িং আর পেইন্টিং এখন কোথায় আছে জানি না। মাত্র গোটা দুয়েক পেইন্টিং বোধহয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। নজরুলের বেশকিছু প্রতিকৃতিও তিনি ওই দফতরে বসেই এঁকেছিলেন। সেগুলিই বা কোথায়, পরবর্তী সময়ে আর কোনোদিন দেখিনি। চলচ্চিত্রটিই বা কী পর্যায়ে আছে, কেমন হয়েছিল, তাও জানা নেই, দেখিওনি কোনোদিন। তবে, ওই ছবির প্রধান উদ্যোক্তা দশের খ্যাতিমান ক্যামেরাম্যান মবিন দাবি করেন যে, তাঁর কাছে একটি কপি রয়েছে। আর স্যারের কিছু ছবি এখনো পিআইডিতে আছে অযত্নে।
তাঁকে আঁকতে দেখা আমার শেষ ছবিটি হলো তাঁর বিখ্যাত স্ক্রল ‘মনপুরা’। দেখেছিলাম তাঁর বাসায়। সময়কাল ১৯৭০-এর ডিসে¤¦র মাস। যথারীতি আমি, শাহাদাত চৌধুরী আর কেরামত মওলা উপস্থিত থাকতাম সকাল-সন্ধ্যা। পরিবারের সদস্য হিসেবে থাকতেন শিল্পী আবদুর রাজ্জাক এবং শিল্পকলা-সমালোচক বুলবন ওসমান। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মাঝে মাঝে আসতেন। নিভৃতে কাজ করার জন্যে তিনি বাসার ভেতরে দোতলার লম্বা বারান্দাটি বেছে নিয়েছিলেন। প্রতিদিন সকালে আমরা পৌঁছলেই বিশাল স্ক্রলটি গড়িয়ে গড়িয়ে অতি সাবধানে বিশ-পঁচিশ ফুট করে খোলা হতো। সেটুকুতে আঁকা হয়ে গেলে এবং শুকিয়ে গেলে, গুটিয়ে নিয়ে আবার বাকিটা খোলা হতো। পাশে কালো রং, প্লেট, প্যালেট, একগাদা জলরং-তেলরঙের নানা মাপের তুলি রাখা থাকত। আর থাকত সিজার্স সিগারেটের একগাদা প্যাকেট, অ্যাশ-ট্রে আর ম্যাচ। ঘরের আলমারির উপর মজুত থাকত সিগারেটের আরো কয়েকটি কার্টন। একটি প্যাকেট শেষ হলেই আরেকটি নিয়ে আসতেন নিজেই। এখানেও নতুন করে শুরুর আগে চুপ করে বসে থাকতেন। যেন অন্য আরেক জয়নুল। বেশি রসিকতা নেই, গল্প নেই। ভাবনায় মগ্ন, আত্মস্থ এক বেদনাপীড়িত মানুষ। আমার এখনো মনে হয়, হয়তো বিষাদময় বিষয়কে কী করে ছবিতে রূপ দেবেন, তা নিয়ে ভাবনা-দুর্ভাবনায় নিজেকে তৈরি করতেন, যুদ্ধ করতেন ভাবনাকে নিয়ে ওইভাবে। মন্বন্তরের বিষাদময় দিনগুলোতেও কি এমনই ছিলেন, ভাবতাম। অবশ্য চুপচাপ থাকলেও বাসার কাজের সহায়ক লোক ফরিদকে একেকদিন একেক মাছের অর্ডার দিতে ভুলতেন না দুপুরে খাওয়ার জন্যে।কিন্তু একের পর এক সিগারেট শেষ করতে করতে একসময়ে তেলরঙের চওড়া তুলি নিয়ে দাঁড়িয়ে ভারি শরীরটাকে উপুড় করে প্রথমে গ্রে-ওয়াশ দিয়ে দিয়ে বিষয়ের পর বিষয়ে টোন দিয়ে যেতেন অবলীলায়। তারপর স্বভাবসুলভ নিজস্ব ঢঙে পরবর্তী ধাপ অর্থাৎ কালো কালির দ্রুত ড্রয়িং দিয়ে এগিয়ে যেতেন রোল খুলে খুলে। দেখেছিলাম এইভাবে গর্কির ধ্বংসলীলায় মৃত মানুষ, পশু, উপড়ে-যাওয়া গাছ, কাদা-মাটি, নিষ্ফলা শুকনো ডাঙা, একে একে ছবির অবয়ব পাচ্ছিল কী অসাধারণ সাবলীলতায়! বিশাল আর দীর্ঘ স্ক্রল যেন সমুদ্র-উপকূল আর তার বুকে রচিত করুণ বেদনাময় একেকটি বিষণ্নতার দৃশ্যমান চিত্রকল্প। এইসব মহৎ কর্মের সৃষ্টিলগ্নকে নিজচক্ষে প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতাকে আমি জীবনের বিশাল অর্জন বলে মনে করি।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.