শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপ্রকাশিত চিঠি সাহিত্যরত্ন হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়কে লেখা

সংকলন ও সম্পাদনা : বিশ্বনাথ রায়

পত্র ১

শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়                    

  সারদা কুটির 

   কুড়মিঠা

P.O. Batikar     31/7/Õ54

Birbhum

 (West Bengal)

শ্রীচরণেষু

দাদা, আপনার পত্র পাইয়া বিশেষ আনন্দিত হইলাম। আপনার স্নেহপূর্ণ আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা শিরোধার্য করিলাম।

বই১ শ্রদ্ধেয় হরিদাস বাবুকে২ দিতে লিখিব। আপনি কি কলিকাতায় যাওয়া-আসা করেন? যদি আসা যাওয়া থাকে আপনার হাতেই দিতে লিখিব। নচেৎ ডাকে পাঠাইতে হইবে। আপনার যেরূপ সুবিধা আমাকে জানাইলে আমি হরিদাস বাবুকে লিখিয়া দিব।

আশা করি আপনি এবং বৌদিদি৩ কুশলে আছেন। অনেকদিন পরে আপনাদের মুঙ্গের যাওয়ার৪ কথা মনে পড়িল।

প্রণাম জানাই

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

পত্র ২

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

[মনোগ্রাম]১

শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়

সাহিত্যরত্ন       পুনা

শ্রীচরণেষু

দাদা, কলকাতা থেকে আপনার চিঠি পেলাম। আপনি পণ্ডিত মানুষ তাই আপনার লাইব্রেরীর২ জন্যে ডিটিকটিভ বই দিতে চাইনি। যাহোক আপনার যখন পছন্দ তখন সেগুলি আমি নিজেই পাঠালাম। আশা করি আপনার লাইব্রেরীর পাঠকেরা৩ তৃপ্ত হবেন।

কালের মন্দিরা৪ এবং গৌড়মল্লার৫ আপনার ভাল লেগেছে জেনে আনন্দ পেয়েছি। ‘হেম্নঃ সংলক্ষতে হ্যগ্নৌ Ñ’৬ কালিদাস কি যে একটা লিখেছেন।

আপনারা আমার প্রণাম নেবেন। প্রাপ্তিসংবাদ পেলে সুখী হব।

             ইতি

             স্নেহবদ্ধ

            শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

পত্র ৩

শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্ন

     কুড়মিঠা

   বাতিকার ডাকঘর     বিজয়নগর কলোনী

     বীরভূম       পুনা ২

     (ডবংঃ ইবহমধষ)    ১৪/১০/’৫৪

শ্রীচরণেষু

দাদা, আশা করি এতদিনে দেশে ফিরিয়াছেন। ঁ বিজয়ার প্রণাম আপনি ও বৌদিদি১ গ্রহণ করিবেন। কনিষ্ঠদের২ আশীর্বাদ জানাই।

চিড়িয়াখানা৩ আপনার গ্রন্থালয়ের জন্য দিবার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু আমার কাছে যে কয়খানা ছিল ফুরাইয়া গিয়াছে। ২য় সং বাহির হইলে পাঠাইব।

গৌড়মল্লার৪ আপনার ভাল লাগিয়াছে লিখিয়াছিলেন। আজকাল ‘ভারতবর্ষে’৫ পুস্তক সমালোচনা বাহির হইতেছে। আপনি গৌড়মল্লারের সমালোচনা লিখুন না। আপনি পণ্ডিত ও রসিক। আপনি সমালোচনা লিখিলে গৌড়মল্লারের মর্যাদা বাড়িবে।

আশা করি কুশলে আছেন।

            স্নেহবদ্ধ

            শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

পত্র ৪

শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্ন

    কুড়মিঠা      বিজয়নগর কলোনী

    বাতিকার ডাকঘর       পুনা ২

     ইরৎনযঁস      ২৫/১০/’৫৪

     (ডবংঃ ইবহমধষ)

শ্রীচরণকমলেষু

দাদা, আপনার পত্র পাইয়া এবং আপনি গৌড়মল্লার আলোচনা১ করিবেন জানিয়া অতিশয় আনন্দিত হইলাম। নয়পাল বিগ্রহপাল২ লইয়া গল্প লিখিবার খুবই আগ্রহ আছে, কিন্তু তাহাদের সম্বন্ধে কিছুই যে জানি না। নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙালীর ইতিহাসে নামমাত্র আছে। আপনি যেসব গৌরব গরিমার কথা৩ লিখিয়াছেন তাহা কোথায় পাইব? অনুগ্রহপূর্বক জানাইবেন কোন পুস্তকে৪ পাওয়া যাইবে।

আশা করি সকলে ভাল আছেন। আমরা একরকম।

            প্রণাম জানিবেন                      আপনাদের

            শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

পত্র ৫

শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্ন

    কুড়মিঠা

  পোঃ বাতিকার

  উঃ. ইরৎনযঁস            ১০/১১/৫৪

    (ডবংঃ ইবহমধষ)

শ্রীচরণেষু

দাদা, আপনার বিস্তারিত পত্র১ পাইয়া সুখী হইলাম। আপনি রাজা-রাজড়ার কথা যাহা লিখিয়াছেন উপন্যাস২ লেখার পক্ষে তাহা যথেষ্ট। কিন্তু তাৎক্ষণিক বাতাবরণ কোথায় পাইব? দেশের অবস্থা, সমাজের অবস্থা, জীবনযাত্রার খুঁটি-নাটি Ñ এগুলা যে দরকার। আপনি যদি সন্ধান দিতে পারেন কোথায় পাইব তাহা হইলে সংগ্রহ করিতে চেষ্টা করিব। সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতে৩ কি এসব কথা পাওয়া যাইবে? আমার কাছে রাখালদাসের৪ বাংলার ইতিহাস আছে, কিন্তু তাহাতে কেবল রাজারাজড়ার কথা। আপাতত অতীশ দীপঙ্করকে লইয়া একটি গল্প৫ লিখিব স্থির করিয়াছি।

আপনাদের অনাবৃষ্টির সংবাদ৬ পাইয়া কষ্ট হইল। এত প্রোজেক্ট্৭ হইতেছে, আপনাদের কি কোনই সুবিধা হইল না?

আমার প্রণাম জানিবেন। আশা করি অন্যান্য কুশল।

            স্নেহবদ্ধ

            শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

পত্র ৬

Sree HareKrishna Mukerjee mvwnZ¨iZœ

 Vill Ñ Kurmitha

 P. O. Ñ Batikar

 Dist Ñ Birbhum        9/5/Õ55

 (West Bengal)

শ্রীচরণেষু

দাদা, আপনার পত্র যথাসময় পাইয়াছিলাম, কিন্তু পুত্রের বিবাহের১ গণ্ডগোলে উত্তর দিতে দেরি হইল। আপনাকে ছাপা নিমন্ত্রণপত্র২ পাঠাইয়াছিলাম। আশা করি পাইয়াছেন।

গৌড়মল্লারের সমালোচনা৩ ছাপা সম্বন্ধে আপনি বিব্রত

হইবেন না। লেখাটা আমাকে পাঠাইয়া দিন আমি ছাপার

ব্যবস্থা করিব। কথা সাহিত্যে৪ দিয়া ভুল করিয়াছেন, উহারা ছাপিবে কিনা সন্দেহ। আমার লেখা আদায় করিবার ফন্দি৫ বাহির করিয়াছে।

আশা করি কুশলে আছেন, আমার প্রণাম জানিবেন। কানু কহে রাই৫ ছাপা হইয়াছে, হরিদাস বাবুকে৬ বলিলেই তিনি দিবেন। আপনার ‘জয়দেব’ আমার কাছে আছে। নূতন সংস্করণে৭ যদি নূতন কথা কিছু থাকে তবে সানন্দে পড়িব।

            ইতি

            আপনাদের

            শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

পত্র ৭

শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, সাহিত্যরত্ন

  কুড়মিঠা কঁৎসরঃযধ

  চ. ঙ. ইধঃরশধৎ        বিজয়নগর কলোনী

  ইরৎনযঁস (ডবংঃ ইবহমধষ)  পুনা

জব-ফরৎবপঃবফ Ñ   ৪/৬/’৫৫

  ১৯৮ ইরনধশধহধহফধ জড়ধফ

  ঈধষপঁঃঃধ-৬

শ্রীচরণেষু

দাদা, কিছুদিন আগে আপনাকে গ্রামের ঠিকানায়১ চিড়িয়াখানা২ ও কানু কহে রাই৩ পাঠাইয়াছি। তারপর আপনার পত্র পাইলাম। কয়েকদিন আগে বৈশাখের ‘কথা সাহিত্য’৪ পাইয়াছি। আপনি কখন কোথায় থাকেন ঠিক নাই। তাই গ্রামের ঠিকানায় পত্র দিতেছি।

বুঝিলাম আপনি আমার পুত্রের বিবাহের পত্র পান নাই। কেন পাইলেন না জানি না, হয়তো ডাকে মারা গিয়াছে। আমার

ছোট ছেলে শান্তনু, তাহারই বিবাহ দিলাম। শান্তনুকে আপনি মুঙ্গেরে দেখিয়াছেন। সে এখন কলিকাতায় আছে, ওনপড়হ নামক

বিলাতী কোম্পানীতে কর্ম করে। তাহার বিবাহ হইয়াছে মধ্যপ্রদেশের রায়পুর শহরে বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ শ্রীউমাদাস মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের মধ্যমা কন্যার সহিত। বধূমাতাটি

বড়ই শ্রীমতী ও সুলক্ষণা। আপনাদের আশীর্বাদে সবদিক দিয়াই ভাল হইয়াছে।

দাদা, আপনার গৌড়মল্লারের সমালোচনা৫ পড়িলাম। কেমন হইয়াছে তাহা আমার বলা সাজে না; আমি এইটুকু বলিতে পারি যে এমন প্রাণ-খোলা মুক্তকণ্ঠ প্রশংসা৬ আমি আজ পর্যন্ত পাই নাই। শেষে যে ভুল৭ ধরিয়াছেন তাহার জন্য লজ্জিত, অসাবধানে ভুল করিয়াছি, পরবর্তী সংস্করণে সংশোধন করিব। কিন্তু কুকুরের অষ্ট্রিক নাম চুচু Ñ কেন উল্লেখ করিয়াছেন ধরিতে পারিলাম না৮। সমালোচনার শেষের দিকটা একটু খাপছাড়া লাগিল, পত্রিকার সম্পাদক কি কাটছাঁট করিয়াছেন৯? যা হোক সমালোচনার জন্য অশেষ ধন্যবাদ জানাই।

বিগ্রহপাল ও যৌবনশ্রীর গল্প১০ লিখিবার তোড়জোড় করিতেছি। আপনি যেমনটি চান হয়তো পারিব না, তবু চেষ্টা করিব। এখনও তথ্য সংগ্রহের পালা চলিতেছে। সে সময়ে ভারতের পশ্চিমাংশে মুসলমান আসিয়া পৌঁছিয়াছে অথচ পূর্বাংশের রাজারা (লক্ষ্মীবর্ম নয়পাল ইত্যাদি) পরস্পর কাম্ড়া কাম্ড়ি করিতেছেন এই পটভূমিকায় গল্প লিখিব।

আপনি ও বৌদিদি আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম জানিবেন, আর সকলকে যথাযোগ্য দিবেন।

            ইতি

            স্নেহবদ্ধ

            শরদিন্দু

পত্র ৮

Sree Harey Krishna Mukerjee

Sahityaratna  wgw_jv

Kurmitha        weRqbMi K‡jvbx

P.O. Batikar     cybv-2

Dist-Birbhum.1          23/6/55

শ্রীচরণেষু

দাদা, আপনার রাগের চিঠি২ এবং রাগ পড়ার চিঠি একসঙ্গে পেলাম। চিঠির উত্তর দিতে দেরি হলে চটে যাবেন না। আমার মাথা গরম হয়নি।

আপনি লিখেছেন কানু কহে রাই এনেছেন। বোধহয় গুরুদাসের দোকান৩ থেকে এনেছেন। কিন্তু আমি যে ডাকে আপনাকে চিড়িয়াখানা ও কানু কহে রাই পাঠিয়েছি তা কি পান নি? মারা যাবার কথা নয় কারণ রেজিষ্ট্রি ডাকে পাঠিয়েছি। কানু কহে রাইয়ের সব গল্পই কি ভাল লেগেছে? দ্বিতীয় গল্প ‘বড় ঘরের কথা’৪ যখন শারদীয় দেশে বেরোয় তখন খুব আন্দোলন হয়েছিল৫ শুনেছি। আপনার কেমন লাগল?

আপনি গৌড়মল্লারের যে সমালোচনা লিখেছেন৬ তা সত্যিকার সাহিত্য বিচার। আজকাল সমালোচনার নামে যে পিত্তরক্ষা সাময়িক পত্রিকায় বের হয় তার সঙ্গে তুলনাই হয় না। তবে লেখাটা যদি কাটছাঁট না হত৭ তাহলে আরও পূর্ণাঙ্গ হত। মূল পাণ্ডুলিপি যদি আপনার কাছে থাকে আমাকে দেবেন। আমি যত্ন করে রেখে দেব। দাদা, আপনার মত পণ্ডিত ব্যক্তির উচিত মাঝে মাঝে পুস্তক সমালোচনা করেন৮ তাহলে পুস্তকের গৌরব বাড়ে। আজকাল বিজ্ঞাপনের ঠেলায় মুড়ি-মিছ্রীর এক দর হয়েছে।

যৌবনশ্রীর কাহিনী৯ এখনও আরম্ভ করতে পারিনি। গরমের সময় বেশী লিখতে পারি না, তার ওপর শরীরটাও ভাল যাচ্ছে না। তোড়জোড় করে লেখা আরম্ভ করতে১০ আরও ২/১ মাস যাবে।

আশা করি আপনি ভাল আছেন। আমাদের একরকম চলছে।

            প্রণাম জানাই

            আপনাদের

            শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

পত্র ৯

শ্রীযুক্ত হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্ন

Kurmitha KyowgVv

P.O. Batikar evwZKvi

  Birbhum (West Bengal)      Saradindu Benerjee

Re-directed     Mithila

  198 Bivekananda Road      Vijaynagar, Poona 2

  Calcutta-6

4/8/’58পরম পূজনীয়

দাদা, এতদিনে নিশ্চয় আপনার রাগ১ পড়িয়া গিয়াছে, কারণ সাধুব্যক্তির রাগ বেশী দিন থাকে না। তাই চিঠি লিখিতে সাহস করিলাম।

যৌবনশ্রী ও বিগ্রহপালকে লইয়া যে উপন্যাসটি২ আপনার আগ্রহ ও উৎসাহে লিখিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম তাহা এতদিনে প্রায় শেষ করিয়াছি৩। কোনও সাময়িক পত্রিকায় উহা প্রকাশ হইবে না, একেবারে পুস্তকাকারে বাহির হইবে৪। এই প্রেসে গিয়াছে Ñ নাম দিয়াছি Ñ তুমি সন্ধ্যার মেঘ। বইটি আপনার নামে উৎসর্গ করিবার ইচ্ছা৫, আশা করি আপনি অনুমতি দিয়া আমাকে অনুগৃহীত করিবেন।

উপন্যাসটি আমি যেভাবে লিখিয়াছি তাহা আপনার ভাল লাগিবে এমন দুরাশা করি না। তবে আপনার নামের গৌরবে ও পুণ্যে কাটিয়া যাইতে পারে। আপনি আমার প্রণাম লইবেন।

            ইতি

            স্নেহধন্য

            শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

পত্র ১০

শ্রীযুক্ত হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় 

Saradindu Benerjee

mvwnZ¨iZœ  Mithila

198 Vivekananda Road       

Vijayanagar, Poona 2

Calcutta-6      cyYv

১৭/৮/’৫৮

শ্রীচরণকমলেষু

দাদা, আপনার পত্র পাইলাম। আপনার অসুস্থতার সংবাদে উদ্বিগ্ন আছি। আশা করি শীঘ্রই আপনি সুস্থ হইয়া উঠিবেন এবং বাংলা ভাষা তথা সাহিত্যের কল্যাণ সাধনে নিযুক্ত হইবেন।

আপনি আমার বইখানির ‘উৎসর্গ’ গ্রহণে১ স্বীকৃত হইয়াছেন সেজন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। আমার বইয়ে আপনার নাম সংযুক্ত থাকিবে এ গৌরব আমারই। বইখানি ছাপা হইলে আপনাকে অবশ্য পাঠাইব।

ভগবান আপনাকে নিরাময় করুন এই প্রার্থনা। প্রণাম জানাই।

            আপনার স্নেহধন্য কনিষ্ঠ

            শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

পত্র ১১

শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্ন

198 Bibekananda Road       

cyYv

Calcutta-6      5/11/58

শ্রীচরণকমলেষু

দাদা, আমার কোটি কোটি বিজয়ার প্রণাম লইবেন। আবার শরীর খারাপ হইয়াছিল জানিয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইলাম। আর দেশে গিয়া কাজ নাই১ দাদা। দেশের জল হাওয়া আর আপনার সহ্য হইবে না।

প্রকাশককে লিখিয়া দিলাম মন্মথবাবুর২ কাছে বই৩ পাঠাইতে। মন্মথবাবুর সঙ্গে আমারও পরিচয় আছে। আশা করি তিনি অনুকূল সমালোচনা করিবেন।

            স্নেহধন্য

            শরদিন্দু

পত্র ১২

শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্ন

  P.O. Kurmitha            মিথিলা

   Dt. Birbhum            বিজয়নগর – পুণা ৯

  (West Bengal)            ১০/৩/১৯৬১

শ্রীশ্রীচরণকমলেষু

দাদা, আপনার স্নেহালিঙ্গন পাইয়া কৃতার্থ হইলাম। আপনার আশীর্বাদ পুরস্কারের অধিক মূল্যবান। ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করি আপনি আরো দীর্ঘকাল জীবিত থাকিয়া পৃথিবীর পুণ্যভার বৃদ্ধি করুন।

দৃষ্টোহসি তুষ্টাঃবয়ম্১।

            ইতি

            আপনার স্নেহধন্য

            শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

পত্র ১৩

শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্ন

P.O. Kurmitha Via Sewri

Dt. Birbhum    cyYv

 (West Bengal) 4/9/1967

পরমপূজ্যপাদ দাদা মহাশয়

 শ্রীকরকমলেষু

আপনার আশীর্বাদী পত্র পাইয়া আহ্লাদিত হইলাম। একটা শজারুর কাঁটা১ আপনার হাতে দিব বলিয়া আলাদা করিয়া রাখিয়াছি; জানি আপনি পরম বৈষ্ণব, শজারুর কাঁটা হাতে পাইয়াও কাহারও অনিষ্ট করিবেন না। নেহাৎ আলস্যবশেই এতদিন পাঠানো হয় নাই। কাল পাঠাইব।

আশা করি সপরিবারে কুশলে আছেন। শত কোটি প্রণাম জানাই।

            স্নেহবদ্ধ

            শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়কে লেখা হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের পত্র

পত্র ১

ওঁশ্রীহরি

কুড়মিঠা

বাতিকার-ডাকঘর

বীরভূম

পশ্চিমবঙ্গ

১৩৬১/১৮ শ্রাবণ

সোদরপ্রতিমেষু,

আশীর্বাদ লও।

পত্র পাইয়া আনন্দিত হইলাম। আমরা Ñ আমি এবং তোমার বৌঠাকুরুণ Ñ মুঙ্গেরের কথা, কয়েকদিনের তোমাদের সাহচর্যের মধুর স্মৃতি প্রায়ই আলোচনা করি। পত্রে তুমিও মুঙ্গেরের কথা উল্লেখ করিয়াছ। ভাবিয়াছিলাম হয়তো ভুলিয়া গিয়াছ। আমি তোমার জন্য লোকের কাছে গর্ব করিয়া বেড়াই। তুমি এবং বলাই আমার গৌরবের বন্ধু, সোদরাধিক সুহৃদ। অযোগ্য হইলেও আমাকে তোমরা অগ্রজের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা দিয়াছ। তোমরা দীর্ঘজীবী হও। আরো বড় হও।

আমি শীঘ্রই কলিকাতা যাইব। কলিকাতা মাঝে মাঝে যাই। বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়কে লিখিয়া দিও যেন বইগুলি আমার হাতে দেন। অত বই ডাকে পাঠাইতে খরচ হইবে। তার প্রয়োজনও নাই। আমি সপ্তাহ মধ্যেই কলকাতা চলিলাম।

বাঙ্গালার তথা ভারতের ইতিহাস আমার অন্যতম প্রিয় বস্তু। তুমি যখন সেই ইতিহাসের উপকরণ লইয়া গল্প উপন্যাস লেখ, অতীতের সুন্দর বাতাবরণ সৃষ্টি কর, সেকালের সম্রাট, সেনাপতি সামন্ত, সেই নাম ধাম, সেকালের উপযোগী কথোপকথন Ñ সে এক অভিনব কল্পলোক। আমি সব চোখের সম্মুখে দেখি Ñ একেবারে সেকালে গিয়া উপস্থিত হই। দুর্গেশনন্দিনীতে, রাজসিংহেও ইতিহাসের ছায়া আছে। কিন্তু কালের মন্দিরা ও গৌড়মল্লারের সঙ্গে তাহার পার্থক্য কত।

তুমি চেদীরাজ কর্ণদেব ও বাঙ্গালার পাল সম্রাটদের লইয়া একখানি উপন্যাস লেখ। কর্ণদেব আপন কন্যা যৌবনশ্রীকে বিগ্রহপালের হাতে দিয়া সন্ধি করিয়াছিলেন। বাঙ্গালার সে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। রাঢ়ের তখন বিপুল প্রাচুর্য। চেদীরাজ আট বৎসর ধরিয়া দিগি¦জয় করিয়া বেড়াইয়াছিলেন।

কুশল কামনা করি।

            ইতি

            আঃ শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়

পত্র ২

“সারদা কুটীর”

কুড়মিঠা

ডাকঘর Ñ বাতিকার

বীরভূম

১৩৬১/১১ কার্তিক

সোদরপ্রতিমেষু,

আশীর্বাদ লও। তোমার পত্র পাইলাম। ঁ রাখালদাস বন্দ্যোর বাঙ্গালার ইতিহাস প্রথম খণ্ড ও ঁ নগেন্দ্রনাথ প্রাচ্যবিদ্যামহার্ণবের রাজন্যকাণ্ড গ্রন্থে সংক্ষিপ্তভাবে চেদীরাজ কর্ণদেব ও নয়পাল ও বিগ্রহপালের কথা আছে। বাঙ্গালার মাৎস্যন্যায় প্রশমন জন্য বাঙ্গালী প্রধানগণ গোপালদেবকে রাজা নির্বাচিত করেন। গোপালের ইতিহাস বিখ্যাত পুত্র ধর্মপাল। ইঁহার ব্রাহ্মণ মন্ত্রীর নাম গর্গদেব। ইঁহারই মন্ত্রণা কৌশলে ধর্মপাল সমগ্র উত্তরাপথে রাজচক্রবর্তী পদবীতে আরূঢ় হন। এই বংশে নয়পালের উদ্ভব। নর্মদা নদীর তীরবর্তী জব্বলপুরের নিকটস্থিত ত্রিপুরীর অধীশ্বর গাঙ্গেয়দেবের পুত্র চেদীবংশীয় নরনাথ কর্ণদেব জীবনের অধিকাংশ দিন দিগি¦জয়ে অতিবাহিত করেন। ষাট বৎসর এইরূপে ব্যয়িত হয়। তিনি নয়পালের সঙ্গে যুদ্ধে পরাস্ত হইয়া যুবরাজ বিগ্রহপালের করে কন্যা যৌবনশ্রীকে সমর্পণ করেন। কর্ণদেবের জ্যেষ্ঠাকন্যা বীরশ্রীকেও একজন রাজা বিবাহ করেন তাহার নাম জাতবর্মা। তোমার পক্ষে এই কাহিনীই তো যথেষ্ট। গৌড়মল্লারে তুমি ইতিহাস লিখিয়াছ কতটুকু! উপাদান কিই বা পাইয়াছ। তাহা অপেক্ষা এ উপকরণ তো যথেষ্ট বলিতে হয়। কর্ণদেব ও নয়পালের যুদ্ধে অতীশ দীপঙ্কর মধ্যস্থ হইয়াছিলেন। পালরাজগণ বৌদ্ধ ছিলেন। বাঙ্গালায় বৌদ্ধধর্ম রাজধর্মরূপে প্রবলও ছিল। কিন্তু তথাপি হিন্দুধর্মও নি®প্রভ ছিল না, এবং রাজগণ হিন্দুমন্ত্রীর অনুগত ছিলেন। হিন্দুধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করিতেন। কর্ণদেব চতুর্ভুজ বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন। বৌদ্ধধর্মের অন্যতম আচার্য দীপঙ্কর প্রকাণ্ড পণ্ডিত ছিলেন। তিনি চীনদেশে গিয়েছিলেন।

তুমি ঁ রাখাল বন্দ্যোর ‘ধর্মপাল’ পড়িলে সেকালের

বাঙ্গালার অবস্থার আভাষ পাইবে। গৌড়মল্লারে বাঙ্গালার

দুর্দিনের চিত্র আঁকিয়াছ। অধঃপতিত রাজবংশের এক

কামোন্মাদিনী রানীর ছবি দেখাইয়াছ। ইহারই পরবর্তী অধ্যায় লিখিতে অনুরোধ করিতেছি। স্বাধীন বাঙ্গালার শৌর্যে বীর্যে মহিমান্বিত বাঙ্গালী, চাণক্যপ্রতিম ব্রাহ্মণ মন্ত্রী, ভিন্নধর্মাবলম্বী হইয়াও সর্বধর্মের উৎসাহদাতা বাঙ্গালী সম্রাট। ভাস্কর্যে ধীমান বীতপালের মত শিল্পী। সতীত্ব-মুকুট মণ্ডিতা রাজেন্দ্রাণী। গুপ্তযুগের পর এই আর এক স্মরণীয় যুগ। ডক্টর রাধাগোবিন্দ বসাকের রামচরিতের অনুবাদ পড়িলে আবার বাঙ্গালীর আর একযুগের পরিচয় পাইবে। আমি যদি কিছু ইহার অধিক পাই একটু অবসর পাইলেই তোমাকে লিখিব। বইগুলি এখনো গুছাইতে পারি নাই। বৃষ্টির অভাবে ফসল মরিয়া গেল, এই দুশ্চিন্তাতেও অস্থির হইয়া আছি। উপায় নাই। আজীবন কষ্টই ভোগ করিলাম। শেষ বয়সেও শান্তি পাইলাম না।

            ইতি

            আশীর্বাদক

            শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়

পত্র ৩

ওঁশ্রীহরি

            সারদা কুটীর

কুড়মিঠা

ডাকঘরÑবাতিকার

বীরভূম

১৩৬১/২১ চৈত্র

সোদরপ্রতিমেষু,

আশীর্বাদ জানবে।

গৌড়মল্লারের সমালোচনা একটা লিখিয়া হরিদাসবাবুকে দিলাম। তিনি লিখিলেন ভাদ্রে নারায়ণ গঙ্গো একটা সমালোচনা লিখিয়াছেন অতএব ‘ভারতবর্ষে’ আর দেওয়া চলিবে না। আমি কলকাতা গিয়া অন্য কাগজে দেওয়ার চেষ্টা করিব।

১ম মহীপালের পুত্র নয়পাল। তার পুত্র হয় বিগ্রহপাল। জয়পাল নয়, নয়পালই প্রকৃত নাম। ইহাদের রাজধানী ছিল গৌড়ে এবং মগধে। মালদহ এবং পাটনায়। মধ্যে মধ্যে মুদগগিরি অর্থাৎ মুঙ্গেরেও ইহাদের জয়স্কন্ধাবার প্রতিষ্ঠিত হইত। ১ম মহীপাল রাজ্য হারাইয়া মুর্শিদাবাদ অঞ্চলেÑগয়েসপুরে নিভৃতে রাজধানী স্থাপন করিয়া বলসঞ্চয় করেন। এবং হৃতরাজ্য উদ্ধার করেন। নয়পাল এবং বিগ্রহপালের সঙ্গে চেদীরাজ কর্ণদেবের যুদ্ধ মগধে আরম্ভ হইয়া রাঢ় পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল। রাঢ়দেশের পাইকোড় (প্রাচীকোট) গ্রামে চেদীকর্ণের শিলালিপি আবি®কৃত হইয়াছে। কর্ণদেবের রাজধানী ছিল জব্বলপুরে নর্মদার তীরে ত্রিপুরী। মর্মর পাহাড়ের সৌন্দর্য লালিতা কর্ণদেবের দুই কন্যা জ্যেষ্ঠা বীরশ্রী, জাতবর্মা ইহাকে বিবাহ করেন। বঙ্গ বা সমতট ইহাদের রাজধানী। দ্বিতীয়া কন্যা যৌবনশ্রীকে বিবাহ করেন বিগ্রহপাল। বিবাহ বোধহয় রাঢ়দেশেই হইয়াছিল। পাইকোড়ের লিপি হইতে মনে হয় চেদীরাজ সেখানে কোন দেববিগ্রহ ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়া কিছুদিন অবস্থান করিয়াছিলেন। খ্রীস্টীয় একাদশ শতকের মধ্যভাগের ঘটনা।

তোমার অমোঘবীর্য এক নায়ক কর্ণসুবর্ণের রাজবল্লভ। দ্বিতীয় মানবদেবও অমোঘবীর্য। গোপাও যেমন রাঙাও তেমনই এক রাত্রেই গর্ভবতী। অবশ্য অসম্ভব কিছুই নয়। আর সেকালে হয়তো এমনই হইত। যাক আমার সমালোচনাটিতে এসব কথা নাই। সংক্ষেপে দুই-চার কথা বলিয়াছি। কলিকাতা গিয়া দেখি কোন্ কাগজে দিতে পারি। আমি ৮ই এপ্রিল কলিকাতা পৌঁছিব। তুমি আমাকে কুশলসহ কলিকাতার ঠিকানায় পত্র দিও। কলিকাতার ঠিকানাÑ১৯৮ বিবেকানন্দ রোড, কলিকাতা ৬।

আঃ শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়

পত্র ৪

            [সারদা কুটীর

            কুড়মিঠা

            ডাকঘর Ñ বাতিকার

            বীরভূম]

            ১৩৬২/ ৬ শ্রাবণ

[সোদরপ্রতিমেষু,

আশীর্বাদ লও।]

যৌবনশ্রী তো ক্ষত্রিয়ের মেয়ে। সে যদি বাপের কাছে যুদ্ধবিদ্যা শিখিয়া থাকে এবং পুরুষবেশে যুদ্ধক্ষেত্রে বাপের সহযাত্রী হয়, দোষ হয় নাকি? এই পরিবেশে বিগ্রহপালের সঙ্গে তাহার দেখাটা তুমি পছন্দ কর? ভাই, ‘যৌবনশ্রী’ তুমি আরম্ভ কর…।

            [ইতি

            আশীর্বাদক

            শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়]

পত্র ৫

            [সারদা কুটীর

            কুড়মিঠা

            ডাকঘর Ñ বাতিকার

            বীরভূম]

            ১৩৬৫/ ১৮ আশ্বিন

[সোদরপ্রতিমেষু,

আশীর্বাদ জানবে।]

…জীবনের এই উত্তীর্ণপ্রায় অপরাহ্ণে আসন্ন সন্ধ্যার গোধূলি ধূসর পাণ্ডুর ছায়া যখন আমাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে অপসারিত করিবার সার্থক প্রযত্নে অগ্রসর হইতেছে, আমি যখন প্রসন্ন চিত্তে চির প্রস্থানের প্রতীক্ষায় দিন গণিতেছি, এমনই দিনে তোমার অকপট আন্তরিক শ্রদ্ধাসম্ভার আমি অঞ্জলি পাতিয়াই গ্রহণ করিলাম।… তোমার কল্যাণ হউক। নিরাময় দীর্ঘজীবনে বাঙ্গালার যুবক যুবতীকে বাঙ্গালীর অতীত গৌরবের কাহিনী শুনাইয়া, বাঙ্গালীর দুর্বলতার, তাহার স্খলন ত্রুটির চিত্র আঁকিয়া দেখাইয়া আত্মসচেতন করিবার চেষ্টা কর। বাঙ্গালী আত্মবিস্মৃত জাতি।

সুন্দর পটভূমি, লোভনীয় বাতাবরণ, তৎকালোপযোগী পরিবেশ, সংঘাত সঙ্কুল ঘটনা, সার্থক চরিত্র, মনোহারী সংলাপ, কোনটা রাখিয়া কোনটার কথা বলিব।…

যৌবনশ্রীকে আমার বড় ভাল লাগিয়াছে। ভারী সুন্দর যৌবনশ্রী। রূপে গুণে নারীরত্ন। হাজার কয়েক বছর আগে এক চতুর্দশবর্ষীয়া ক্ষত্রিয় কুমারী রাজ[া]বরোধ হইতে ঠিক এই কথাই লিখিয়া পাঠাইয়া ছিলেন দ্বারকায় শ্রীকৃষ্ণকে। যৌবনশ্রী মুখে যাহা বলিয়াছেন, পত্রে সেই কথাই লেখা ছিল, তুমি এস, একাকী নয়, চতুরঙ্গ বাহিনীতে সজ্জিত হইয়া এস। প্রকাশ্য দিবালোকে সমাগত রাজন্যমণ্ডলীর সমক্ষে আমাকে রথে তুলিয়া লও। রাক্ষস বিবাহে আমায় গ্রহণ কর। সিংহের ভোগ্য যেন শৃগালে স্পর্শ না করে। ইহার সুস্পষ্ট ব্যঞ্জনাÑচোরের মত আসিও না। আমাকে চুরি করিয়া লইয়া যাইও না, ক্ষত্রিয় নন্দিনীর গৌরব বহন করিয়া আমি তোমার সঙ্গিনী হইব। ইনিই ভীষ্মক দুহিতা। দ্বারকায় শ্রীকৃষ্ণের পরিহাস বাক্যে মূর্ছিতা হইয়া পড়িয়াছিলেন। ভারতের ক্ষত্রিয় কুমারীর অন্তর্নিহিত এই কামনা ঐ কুসুমপেলব তন্বী যৌবনশ্রীর আলেখ্যকে মহিমান্বিত করিয়াছে। অম্বিকা দেবী মনে রাখিবার মত।

বাঙ্গালী যুবক বিগ্রহপাল ও জাতবর্মা, তোমার বীরশ্রী ও বান্ধুলী, তোমার লম্বোদর, রন্তিদেব ও অনঙ্গপালÑযথাযথ চিত্র। কিন্তু চেদীরাজ কর্ণদেব কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হয়। …

            [ইতি

            আশীর্বাদক

            শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়]

প্রাসঙ্গিক তথ্য : পত্রপ্রাপক ও প্রেরক সম্পর্কে

সাহিত্যরত্ন হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় (১৮৯০-১৯৭৭) আমার জীবন কথায় (প্রগতি, বৈশাখ ১৩৭৭) একই সঙ্গে বেদনা ও গৌরবের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমার এই ভাগ্যহীন জীবনে আমি একমাত্র বন্ধু ভাগ্যেরই গৌরব করিতে পারি।’ কথাটি যে কত সত্য তা বোঝা যায় সারাটা জীবন আর্থিক অভাব-অনটনে কাট্লেও তাঁর ‘বান্ধব’ভাগ্যের আকাশে বিচিত্র নক্ষত্রের সমাহার দেখে। হরেকৃষ্ণকে লেখা বহু বিখ্যাত মানুষের চিঠি-পত্রের ভাঁড়ারটি তার প্রমাণ। প্রবীণতম হরপ্রসাদ শাস্ত্রী-নগেন্দ্রনাথ বসু থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র-সুনীতিকুমার প্রমুখ সমকালীন এমনকি বয়সে ছোট প্রায় সব সাহিত্যরথীর সঙ্গেই তাঁর হৃদয়ের সম্পর্ক ছিল গভীর। ঐতিহাসিক পণ্ডিত গবেষক যেমন সেই দলে ছিলেন, তেমনি ছিলেন সংগীত-নাট্য চলচ্চিত্র-জগতের কৃতী মানুষরাও। স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী তথা শিল্প-বিশেষজ্ঞের লেখা অজস্র চিঠিও পাওয়া গেছে তাঁর সংগ্রহে। মৌলিক সৃষ্টির ক্ষেত্রেও তিনি উপাদান জুগিয়েছেন তারাশঙ্কর সুবোধ ঘোষ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কথাশিল্পীকে।

হরেকৃষ্ণকে ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধি প্রদান করেছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী; ও.সি. গাঙ্গুলী বলতেন ‘পরম ভাগবত’। আর আচার্য সুকুমার সেন তাঁকে ‘রবীন্দ্রনাথের জোড়া’ বলেছিলেন এই কারণেই যে, রবীন্দ্রনাথের মতো তিনিও স্কুল-কলেজের প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম ডিগ্রি ডি.লিট্. লাভ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মতোই একাধিক পিএইচ.ডি. গবেষণাপত্রের পরীক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলেন। অথচ প্রথাগত শিক্ষায় তাঁর দৌড় ছিল পাঠশালায় উচ্চ প্রাথমিক পরীক্ষায় পাশ করে ছাত্রবৃত্তি পর্যন্ত। বীরভূমের এক গণ্ডগ্রামে বাল্যকালে পিতৃমাতৃহীন হয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত হয়েছিলেন হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়।

বিংশ শতাব্দীর প্রায় অর্ধেক সময় ধরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা তাঁর প্রবন্ধ নিবন্ধের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। পুরাতন ভারতবর্ষ, প্রবাসী, শনিবারের চিঠি, বঙ্গশ্রী, দেশ, আনন্দবাজার, যুগান্তর লক্ষ করলে দেখা যাবে তাঁর নিরবচ্ছিন্ন লেখার প্রয়াসে পত্রিকাগুলি কীভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। সাহিত্যরত্নের রত্নভাণ্ডারের দুটি দৃষ্টান্তেই সে কথা প্রমাণিত হবে। ভারতবর্ষ ও দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধের সংখ্যা যথাক্রমে ৭৫ এবং ৫০। একাধারে তিনি বৈষ্ণবসাহিত্য ও দর্শনে সুপণ্ডিত, গবেষক, কীর্তন গানের বিশেষজ্ঞ, ঐতিহাসিক, সাহিত্যরসিক কবি এবং সমালোচক।

হরেকৃষ্ণর প্রথম প্রকাশিত রচনা একটি কবিতা Ñ ‘উদ্বোধন গীত’ শিরোনামে বীরভূমি (নবপর্যায়) পত্রিকায় ১৩১৮ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় মুদ্রিত। প্রথম গবেষণামূলক প্রবন্ধ ‘প্রাচীন মঙ্গলডিহি’ প্রকাশিত হয় ঐ একই পত্রিকাতে (আষাঢ় ১৩২০)। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থসমূহের কয়েকটি হলো : বীরভূম বিবরণ (তিন খণ্ড), কবি জয়দেব ও শ্রীগীতগোবিন্দ, পদাবলী পরিচয়, বাঙ্গালার কীর্ত্তন ও কীর্ত্তনীয়া, গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাধনা, গৌড়বঙ্গ সংস্কৃতি। সম্পাদিত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৈষ্ণব পদাবলী, চণ্ডীদাসের পদাবলী, জ্ঞানদাসের পদাবলী, কৃত্তিবাসী রামায়ণ, চৈতন্যচরিতামৃত, চৈতন্যভাগবত প্রভৃতি।

সমকালের অন্যান্য সাহিত্যিকের মতো শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৯-১৯৭০) সঙ্গেও হরেকৃষ্ণ সাহিত্যরত্নের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। দুজনেরই জন্মশতবর্ষ পার হয়ে গেছে Ñ বলতে গেলে Ñ প্রায় নিঃশব্দে। উভয়ের বয়সের ফারাক ছিল প্রায় নয় বৎসর। পত্রে পরস্পর সম্পর্ক ছিল ‘সোদরপ্রতিমেষু’ ও ‘শ্রীচরণেষু দাদা’ সম্বোধনে। এই সম্পর্ক কতটা হার্দিক ছিল তা বোঝা যায় হরেকৃষ্ণর অকপট স্বীকৃতিতে। শরদিন্দুকে তিনি লিখেছেন, ‘তুমি এবং বলাই [বনফুল] আমার গৌরবের বন্ধু, সোদরাধিক সুহৃদ। অযোগ্য হলেও আমাকে তোমরা অগ্রজের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দিয়াছ।’ বস্তুত পুনাÑকুড়ামিঠার দূরত্ব ঘুচে গিয়েছিল এই প্রীতির বন্ধনেই। ‘সোদরাধিক সুহৃদ’ শরদিন্দুর সঙ্গে তাঁর নাড়ির যোগ এতই গভীর ছিল যে এই আচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ মুঙ্গেরে তাঁর গৃহে সপরিবারে আতিথ্যও স্বীকার করেছিলেন।

অন্যপক্ষে ব্যোমকেশ বক্সীর সৃষ্টিকর্তা বাঙালি পাঠকের অতি প্রিয়। তেমনি ঐতিহাসিক রোমান্সের রচয়িতা হিসেবেও পড়ুয়াদের কাছে শরদিন্দুর জনপ্রিয়তা আজও সমান। হরেকৃষ্ণকে লেখা তাঁর তেরোটি চিঠির সন্ধান আমরা পেয়েছি। বিপরীতে শরদিন্দুকে লেখা হরেকৃষ্ণ সাহিত্যরত্নের তিনটি পূর্ণপত্র ও দুটি চিঠির অংশবিশেষ যথাক্রমে শরদিন্দু অম্নিবাসের দ্বাদশ খণ্ডের চিঠিপত্র বিভাগ ও তৃতীয় খণ্ডের গ্রন্থপরিচয়ে ইতিপূর্বেই প্রকাশিত হয়েছে। পরস্পরের প্রীতি-শ্রদ্ধার সম্পর্কের চিত্রটি স্পষ্ট করতে সেই চিঠিগুলিও এখানে সংকলিত হলো। উভয়ের পত্রাবলিতে কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথাই নয়, দুজনের সাহিত্য-ভাবনা ও সৃষ্টির বেশকিছু কৌতূহলজনক তথ্য-উপাদানও লিপিবদ্ধ আছে Ñ যা এই প্রথম আলোর মুখ দেখল বলা যায়।

১৯৫৪-১৯৬৭ সালের মধ্যে লেখা শরদিন্দুর অপ্রকাশিত পত্রগুলি একটি খামে, দুটি ইন্ল্যান্ডে এবং দশটি পোস্টকার্ডের। কোনোটি সাধুভাষায় কোনোটি আবার চলিত ভাষায় লেখা। ‘স্নেহধন্য কনিষ্ঠে’র ‘শ্রীচরণেষু দাদা’কে লেখা চিঠিপত্র হয়তো আরো ছিল, যা হারিয়ে গেছে অথবা নষ্ট হয়েছে।

পত্র-পরিচিতি

পত্রসংখ্যা ১

১.         সম্ভবত রহস্য-রোমাঞ্চ ও ব্যোমকেশের গোয়েন্দাকাহিনীর বইগুলি হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় চেয়ে পাঠিয়েছিলেন নিজের লাইব্রেরির জন্য। কেননা শরদিন্দুর পরের চিঠিতেই সেই ‘ডিটিকটিভ বই’য়ের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে।

২.        শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গ্রন্থের প্রকাশক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড্ সন্স্-এর হরিদাস চট্টোপাধ্যায়।

৩.        হরেকৃষ্ণ-জায়া কনকলতা দেবী।

৪.         শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে চাকরিসূত্রে বোম্বাই চলে গেলেও এবং পরে পুনার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েও ‘ধাতৃভূমি’ মুঙ্গেরের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করেননি বরং সে-সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। তাঁর অতিথি হয়েই সপরিবারে মুঙ্গেরে গিয়েছিলেন হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়। শরদিন্দুকে লেখা তাঁর চিঠিতে সে-স্বীকৃতি আছে : ‘আমরাÑ আমি এবং তোমার বৌঠাকুরণ Ñ মুঙ্গেরের কথা, কয়েকদিনের তোমাদের সাহচর্যের মধুর স্মৃতি প্রায়ই আলোচনা করি।’

পত্রসংখ্যা ২

১.         পত্রটি খামে পাঠানো হয়েছিল, সে-খামের সন্ধান পাওয়া যায়নি। যে-লেটারহেডে চিঠিটি লেখা তার উপরের বামদিকে ‘শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়’ মনোগ্রামটি আছে। পত্রটি তারিখহীন।

২.        বীরভূম জেলার কুড়মিঠা গ্রামের ‘সারদা কুটিরে’ হরেকৃষ্ণর ব্যক্তিগত লাইব্রেরিটি ছিল সমৃদ্ধ। অর্থের অভাবজনিত কারণে শেষ বয়সে তিলে তিলে গড়ে তোলা সেই গ্রন্থাগার তিনি বিক্রয় করে দিতে বাধ্য হন জেলার সুপ্রাচীন মহাবিদ্যালয় ‘হেতমপুর কলেজ’কে। হরেকৃষ্ণ-সংগৃহীত গ্রন্থসমূহ বর্তমানে সেখানেই আছে।

৩.        অজ-পাড়াগাঁ বলতে যা বোঝায় কুড়মিঠা গ্রাম তাই। আজও সেখানে কোনো উচ্চবিদ্যালয় বা গ্রন্থাগার গড়ে ওঠেনি। হরেকৃষ্ণর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারটি ছিল গ্রামের শিক্ষিত পড়ুয়াদের একমাত্র আশ্রয়।

৪.         শরদিন্দুর লেখা ঐতিহাসিক রোমান্স্টির প্রথম প্রকাশ শ্রাবণ ১৩৫৮ সাল। গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড্ সন্স্ থেকে প্রকাশিত বইটির দাম ছিল সাড়ে তিন টাকা।

৫.        শরদিন্দুর এই উপন্যাস প্রথম প্রকাশিত হয় জ্যৈষ্ঠ ১৩৬১ সালে। প্রকাশক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড্ সন্স্, দাম চার টাকা। উপন্যাসটির প্রথমে নাম ছিল মৌরী নদীর তীরে।

৬.        সম্পূর্ণ শ্লোকটি হলো : ‘হেম্নঃ সংলক্ষ্যতে হ্যগ্নৌ বিশুদ্ধিঃ শ্যামিকাপি বা।’ কালিদাস : রঘুবংশ ১/১০।

পত্রসংখ্যা ৩

১.         হরেকৃষ্ণ-জায়া কনকলতা দেবী।

২.        হরেকৃষ্ণ-পুত্র নন্দদুলাল মুখোপাধ্যায় এবং পৌত্র গৌরগোপাল, ব্রজগোপাল প্রমুখ।

৩.        শরদিন্দুর এই বইটির প্রথম প্রকাশ ফাল্গুন ১৩৬০ বঙ্গাব্দে বেঙ্গল পাবলিশার্স থেকে। মূল্য আড়াই টাকা।

৪.         দ্বিতীয় পত্রের ৫ সংখ্যক পরিচিতি দ্রষ্টব্য।

৫.        জলধর সেন এবং অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ-সম্পাদিত এক সময়ের বহুল প্রচারিত জনপ্রিয় মাসিক পত্রিকা ভারতবর্ষে (প্রথম প্রকাশ : আষাঢ় ১৩২০) প্রথমদিকে ‘সাহিত্য সংবাদ’ থাকলেও পুস্তক-সমালোচনা প্রকাশিত হতো না। পরে এই বিভাগটি সংযুক্ত হয়।

পত্রসংখ্যা ৪

১.         হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় গৌড়মল্লার উপন্যাসটির সমালোচনা লিখবেন এমন প্রতিশ্রুতি পাওয়ার ফলে এই প্রতিক্রিয়া।

২.        বাংলার বিখ্যাত পালবংশের রাজা গোপাল-ধর্মপালের বংশধর।

৩.        শরদিন্দুকে লেখা হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের পত্রে সেইসব গৌরব-গরিমার কথা আছে।

৪.         হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পত্রটিতে পুস্তকগুলির নাম উল্লিখিত।

পত্রসংখ্যা ৫

১.         ১১ কার্তিক ১৩৬১ তারিখে লেখা হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পত্র দ্রষ্টব্য।

২.        হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের প্রস্তাবিত যৌবনশ্রী ও বিগ্রহপালের কাহিনী অবলম্বনে শরদিন্দুর ভবিষ্যৎ উপন্যাসের পরিকল্পনা।

৩.        পৌণ্ড্রবর্ধনের (উত্তরবঙ্গ) অধিবাসী সন্ধ্যাকর নন্দীর চার পরিচ্ছেদে সমাপ্ত সংস্কৃতে লেখা রামচরিত একটি শ্লেষকাব্য; পালযুগের শেষাংশের ইতিহাস সম্পর্কে আকরগ্রন্থ। সন্ধ্যাকর ছিলেন রামপালের মহামন্ত্রী প্রজাপতি নন্দীর পুত্র।

৪.         ঐতিহাসিক প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৫৫-১৯৩০)।

৫.        দ্রষ্টব্য : হরেকৃষ্ণ-প্রদত্ত কাহিনী অবলম্বনে লেখা নতুন উপন্যাস তুমি সন্ধ্যার মেঘের প্রথম পরিচ্ছেদ।

৬.        পূর্বোক্ত ১১ কার্তিক ১৩৬১ তারিখে লেখা হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের পত্রে আছে : ‘বৃষ্টির অভাবে ফসল মরিয়া গেল, এই দুশ্চিন্তাতেও অস্থির হইয়া আছি।’

৭.         স্বাধীনতার পর পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা-রূপায়ণে নানা প্রোজেক্ট হাতে নেয় সরকার। বীরভূমের সেচ-ব্যবস্থার উন্নতির জন্য ময়ূরাক্ষী পরিকল্পনাও গৃহীত হয়। শরদিন্দু সম্ভবত তার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

পত্রসংখ্যা ৬

১.         শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়র তিন পুত্রের সর্বকনিষ্ঠ শান্তনুর বিবাহ। পরবর্তী ৭-সংখ্যক পত্রে এই বিবাহের বিস্তৃত বিবরণ আছে।

২.        ডাকের গোলযোগে উল্লিখিত ছাপা নিমন্ত্রণপত্র হরেকৃষ্ণর

হস্তগত হয়নি।

৩.        হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়-লিখিত শরদিন্দুর গৌড়মল্লার উপন্যাসের সমালোচনা।

৪.         কথাসাহিত্য (প্রথম প্রকাশ, কার্তিক ১৩৫৬) পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় মিত্র ও ঘোষ (প্রতিষ্ঠা ১৯৩৪) প্রকাশন সংস্থা থেকে। উক্ত প্রকাশক শরদিন্দুর বই ছাপার ব্যাপারে আগ্রহী থাকলেও যে-কোনো কারণেই হোক লেখক স্বয়ং তাঁদের প্রতি সুপ্রসন্ন ছিলেন না। এই চিঠি লেখার পূর্বে তাঁর একটিমাত্র বই সরস গল্প মিত্র ও ঘোষ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৫৯ বঙ্গাব্দে। অনেক পরে ১৩৭০ সালে আর একটিমাত্র বই মগ্ন মৈনাক সেখান থেকে প্রকাশিত হয়।

৫.        গল্প-সংকলনটি প্রথম প্রকাশিত হয় বৈশাখ ১৩৬২ বঙ্গাব্দে। এই চিঠি লেখার অব্যবহিত পূর্বে। প্রকাশক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড্ সন্স্। দাম ছিল আড়াই টাকা।

৬.        গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড্ সন্স্-এর হরিদাস চট্টোপাধ্যায়।

৭.         হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের লেখা কবি জয়দেব ও শ্রীগীতগোবিন্দ গ্রন্থের তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় এই চিঠি লেখার মাসদেড়েক পরে ৬ আষাঢ় ১৩৬২ বঙ্গাব্দে। সম্ভবত প্রকাশিতব্য গ্রন্থটি শরদিন্দুকে উপহার দেবার কথা চিঠিতে লিখেছিলেন তিনি। আগে থেকেই শরদিন্দুর সংগ্রহে উক্ত গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ (১৩৩৬) অথবা দ্বিতীয় সংস্করণ (১৩৫৭) ছিল। পঠিত বইটি সম্পর্কে পত্রলেখকের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয়েছে। অপরপক্ষে তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকায় হরেকৃষ্ণও লিখেছেন, ‘সাহিত্যিক বন্ধুগণ এবং সাধারণ পাঠকগণ অনেকেই গ্রন্থখানিকে প্রীতির চক্ষে দেখিয়াছেন। ইহা আমার আশাতীত সৌভাগ্য, ইহা আমার পরম পুরস্কার।’

পত্রসংখ্যা ৭

১.         হরেকৃষ্ণ সাহিত্যরত্নর গ্রামের ঠিকানা কুড়মিঠা, বাতিকার, বীরভূম প্রায় সব পত্রেই আছে।

২.        চিড়িয়াখানার প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ফাল্গুন মাসে। বই শেষ হয়ে যাওয়ায় হরেকৃষ্ণকে কোনো কপি দিতে পারেননি লেখক। ১৯৫৫ সালে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হলে সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় এর কাহিনী চলচ্চিত্রায়িত হয়েছিল ১৯৬৬ সালে।

৩.        ৬ সংখ্যক পত্রের ৫ সংখ্যক পরিচিতি দ্রষ্টব্য।

৪.         সুমথনাথ ঘোষ ও গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য সম্পাদিত কথাসাহিত্য (বৈশাখ ১৩৬২) পত্রিকায় ‘গ্রন্থজিজ্ঞাসা’ শিরোনামে শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্নর লেখা গৌড়মল্লার উপন্যাসের সমালোচনাটি প্রকাশিত হয় (পৃ ৫৮২-৫৮৬)। শরদিন্দুর কাছে সংখ্যাটি পাঠানো হয়েছিল।

৫.        সাড়ে চার পৃষ্ঠায় মুদ্রিত দীর্ঘ পুস্তক-সমালোচনা পাঠ করে খুশি হয়েছিলেন গৌড়মল্লারের লেখক।

৬.        সম্পূর্ণ সমালোচনাটি উদ্ধৃত করার সুযোগ এখানে নেই। কেবল ‘মুক্তকণ্ঠ প্রশংসা’র দুটি প্যারাগ্রাফ তুলে দেওয়া হলো :

‘… বাঙ্গালার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথালক রচয়িতা শ্রীমান্ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় “গৌড়মল্লার” রচনা করিয়াছেন। দেড় হাজার বৎসরের অতীত কাহিনী মূর্ত্তি ধরিয়া সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। অকস্মাৎ এক দুর্য্যােগে বাঙ্গালার সর্ব্বনাশ হইয়া গেল। বাঙ্গালীর স্বাধীনতা গেল, রাজ্য গেল, বাণিজ্য গেল। অমন যে সমৃদ্ধ রাজধানী কর্ণসুবর্ণ প্রায় ধ্বংস হইয়া গেল। বাঙ্গালীর ভাগ্য ভাল যে এ হেন নিদারুণ দুর্যোগেও বাঙ্গালার গ্রামÑ“বেতস গ্রাম” সর্ব্বনাশে সমুৎপন্নে সর্ব্বস্ব বিসর্জ্জন দিয়াও কোনরূপে বাঁচিয়া গিয়াছে। সমস্ত প্রলোভন জয় করিয়া নগরীর ক্লেদ কর্দ্দম পায়ে দলিয়া পল্লীর দুলাল বজ্রদেব পল্লীর ভস্ম¯তূপে ফিরিয়া আসিয়া নব সৃষ্টির অঙ্কুর রচনা করিয়াছে। শরদিন্দুর অপূর্ব্ব সৃষ্টি এই বজ্রদেব। গৌড়মল্লারে এইরূপ মৌলিক সৃষ্টি কয়েকটাই আছে। সে কালের পল্লীর শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতীক “চাতক ঠাকুর” এবং বাঙ্গালার নাগরিক জীবনের আশা-আকাক্সক্ষার কঙ্কাল কোদণ্ড মিশ্র খুঁজিলে এখনো হয়তো সাক্ষাৎ মিলিতে পারে। …

শরদিন্দুর বৈশিষ্ট্য তিনি যে কালের কাহিনী বলিতেছেন, সেই কালোপযোগী বাতাবরণ সৃষ্টি করিতে পারেন। সেই কালের মত করিয়া কথা বলিবার চেষ্টা করেন। অতীতের পটভূমিকায় ছবি আঁকিতে গিয়া সেকালের রং তুলিকার সন্ধান এবং ব্যবহার করিতে জানেন। আর সর্ব্বাপেক্ষা আনন্দের সংবাদ শরদিন্দু যে কালেরই চিত্র রচনা করেন, তাহা কালোত্তীর্ণ বস্তুরূপে সর্ব্বকালের পাঠক-পাঠিকার মনোহরণ করিবে এই ভরসায় আশ্বস্ত হইতে পারি …’

৭.         উপন্যাসে শরদিন্দুর ভুল চমৎকারভাবে নির্দেশ করেছেন সমালোচক হরেকৃষ্ণ : ‘… গৌড়মল্লার ইতিহাস নহে। সুতরাং ইতিহাসে যেখানে শশাঙ্কদেব ময়ূরভঞ্জের অরণ্য ভূমিতে বেণু সাগর অঞ্চলে গিয়া নূতন রাজধানী প্রতিষ্ঠা পূর্ব্বক স্বাধীনতা রক্ষা করিয়াছেন, লেখক সেখানে তাঁহাকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত কল্পনা করিয়াছেন। শশাঙ্কের কোন উত্তরাধিকারীর নাম কেহ জানে না। শরদিন্দু কিন্তু তিন পুরুষের সংবাদ দিয়াছেন। ভাস্করবর্মার পরে তাঁহার কোন বংশধর কর্ণসুবর্ণে রাজত্ব করেন নাই। লেখক অগ্নিবর্মাকে আনিয়াছেন। ইতিহাসের সঙ্গে কল্পনা মিশাইয়া লেখক যে রসায়ন প্রস্তুত করিয়াছেন তাহা বাঙ্গালীÑশুধু বাঙ্গালার নহে যে কোন কালের যে কোন দেশের পাঠক পাঠিকার মনের বলাধান করিবে। আশা করি তথাপি কেহ উপন্যাসকে ইতিহাস বলিয়া ভুল করিবে না। …’

৮.        ‘গৌড়মল্লার’ উপন্যাসের লেখক মাঝে মধ্যেই পাদটীকা ব্যবহার করেছেন। ‘বনপর্ব’ নামক নবম পরিচ্ছেদে এরকম একটি পাদটীকা : ‘কুকুরের অস্ট্রিক প্রতিশব্দ চুচু’। হরেকৃষ্ণর গ্রন্থ-সমালোচনার শেষ লাইনটি হলো : ‘লেখক পাদটীকায় (৮০ পৃষ্ঠা) আমাদের শুনাইয়া দিয়াছেন Ñ ‘কুকুরের অস্ট্রিক প্রতিশব্দ চুচু’। পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠায় এর পরেই আছে ঐ.গ.ঠ. জধফরড়’র একটি বিজ্ঞাপন। আমাদের অনুমান এর ফলেই সমালোচকের বক্তব্যের পরের অংশ খণ্ডিত হয়ে গেছে। শরদিন্দু বিষয়টি ধরতে না পারায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

৯.        ‘বিজ্ঞাপন’ পত্রিকা সম্পাদকের কাছে লক্ষ্মীবিশেষ। সাময়িকপত্র বা সংবাদপত্রের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত তাঁরা জানেন পত্রিকা ছাপার শেষ মুহূর্তে হঠাৎ করে যদি কোনো বিজ্ঞাপন এসে যায় তখন কোনো সংবাদ বা লেখা কাটছাঁট করে বিজ্ঞাপনটি খাইয়ে দেওয়া হয়। এখানেও সে-রকম ঘটনা ঘটেছে। গ্রামোফোন কোম্পানির ঐ.গ.ঠ. জধফরড়-র

লোভনীয় বিজ্ঞাপনটি ছাপতে গিয়ে হরেকৃষ্ণর গ্রন্থ সমালোচনার শেষ অংশে কোপ পড়েছে। পড়তে গিয়ে খাপছাড়া লাগার কারণ সে-কারণেই।

১০.       শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তুমি সন্ধ্যার মেঘ উপন্যাসটি লিখেছিলেন ২৬ অক্টোবর ১৯৫৬ থেকে ১৯ আগস্ট ১৯৫৮Ñএই কালসীমায়। কিন্তু এর তোড়জোড় শুরু হয়েছিল কয়েক বৎসর পূর্ব থেকেই। উপন্যাসের কাহিনীকাঠামো, উপাদান ও তথ্যাবলির অনেকটাই জুগিয়েছিলেন হরেকৃষ্ণ সাহিত্যরত্ন। এমনকি উপন্যাসটির একটি নামকরণও করে ফেলেছিলেন ‘যৌবনশ্রী’। সবচেয়ে বড়ো কথা, বারবার তাগিদ দিয়ে লেখককে উৎসাহিত করেছেন তিনি। উপন্যাসটির লেখা কবে শেষ হবে এ-নিয়ে তাঁর আগ্রহের শেষ ছিল না। বিগ্রহপাল ও যৌবনশ্রী উক্ত উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র।

পত্রসংখ্যা ৮

১.         ইন্ল্যান্ড লেটারে লেখা পত্রটি এসেছিল হরেকৃষ্ণ সাহিত্যরত্নের কলকাতার অস্থায়ী আবাস ১৯৮ বিবেকানন্দ রোডের ঠিকানায়। সেখান থেকে জবফরৎবপঃবফ হয়ে পৌঁছয় বীরভূমের কুড়মিঠার বাড়িতে।

২.        যে-কোনো কিছুতে সামান্য বিচ্যুতি দেখলেই সাহিত্যরত্ন মশাই ভীষণ চটে যেতেন। এইজন্য সাহিত্যিক মহল তাঁকে ‘দুর্বাসা’ নামে পরিচিত করেছিল।

৩.        বইটির প্রকাশক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড্ সন্স্।

৪.         ১৯৫৪ সালের শারদীয় দেশ পত্রিকায় গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে কানু কহে রাই (১৩৬২) গল্পসংকলনভুক্ত হয়েছে।

৫.        ‘বড় ঘরের কথা’ নিয়ে আন্দোলন হওয়ার কারণ গল্পের বিষয়। বংশরক্ষার খাতিরে বড়ো এক জমিদার-পরিবারে জমিদার-কন্যার ভৃত্য-উপগত হওয়ার কেচ্ছা-কেলেঙ্কারির গল্প হয়তো উচ্চসমাজের বিশেষ কোনো পরিবারের প্রতি ইঙ্গিত করেছিল।

৬.        ৭-সংখ্যক পত্রের পত্র-পরিচিতি দ্রষ্টব্য।

৭.         সমালোচনাটি কাটছাঁটের কারণ উল্লেখ করা হয়েছে ৭ সংখ্যক পত্রের ৯-সংখ্যক পরিচিতিতে।

            ৮.        সমকালে পুস্তক-সমালোচনার নামে চলত কপট সাহিত্যবিচার। হরেকৃষ্ণ সাহিত্যরত্নের রসগ্রাহী সমালোচনা তাই লেখকদের ছিল প্রিয়। শরদিন্দু যেমন নিজের গ্রন্থের সমালোচক হিসেবে তাঁকে পেতে চেয়েছেন, তেমনি সে-সময়ের আর এক খ্যাতিমান লেখক ‘বনফুল’ ওরফে বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের আকাক্সক্ষা ছিল তিনি যেন তাঁর মহারানী ও উজ্জ্বলা উপন্যাসদুটির সমালোচনা করেন। একটি চিঠিতে সাহিত্যরত্নকে লিখেছেন (০৮.০১.১৯৫৮), ‘আমার বই দুটির রস-বিচার করিয়া কোথাও যদি সমালোচনা লেখেন বড়ই আনন্দ পাইব।’

            ৯.        তুমি সন্ধ্যার মেঘ উপন্যাস।

            ১০.       উপন্যাসটি লেখা শুরু করেছিলেন ২৬ অক্টোবর ১৯৫৬ সালে। এই তারিখ পাওয়া গেছে শরদিন্দুর ডায়েরি থেকে।

পত্রসংখ্যা ৯

১.         দ্রষ্টব্য ৮-সংখ্যক পত্রের ২-সংখ্যক পরিচিতি।

২.        তুমি সন্ধ্যার মেঘ উপন্যাস। শরদিন্দু প্রথমে উপন্যাসটির নাম দিয়েছিলেন ‘রেবা রোধসি’। পাণ্ডুলিপিতে দেখা যায় প্রথম কয়েকটি পরিচ্ছেদ এই নামেই লেখা হয়েছিল। পরে নাম পরিবর্তন করেন।

৩.        উপন্যাসটি সমাপ্ত হয়েছিল এই চিঠি লেখার আরো পনেরোদিন বাদে, ১৯ আগস্ট ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে।

৪.         তুমি সন্ধ্যার মেঘ সরাসরি পুস্তকাকারে আশ্বিন ১৩৬৫ (সেপ্টেম্বর ১৯৫৮) সালে নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড থেকে। দাম ছিল সাড়ে পাঁচ টাকা।

৫.        তুমি সন্ধ্যার মেঘ উপন্যাসের উৎসর্গপত্রে লেখা আছে :

‘যাঁহার প্ররোচনায় এই কাহিনী লিখিয়াছি সেই পরম ভক্তিভাজন পণ্ডিত প্রবর শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্ন মহাশয়ের করকমলে ইহা সাদরে অর্পণ করিলাম।’

পত্রসংখ্যা ১০

১.         অসুস্থ অবস্থায় শরদিন্দুর কাছ থেকে নিজের মানসপ্রসূত প্রিয় গ্রন্থটির উৎসর্গ-প্রস্তাব আসায় অভিভূত হরেকৃষ্ণ আবেগে বিহ্বল হয়ে তাঁকে যে-চিঠি লেখেন (হরেকৃষ্ণর পত্র-৫) পাঠক নিশ্চয় সেটি লক্ষ করেছেন। সাহিত্যরত্ন সে-চিঠিতে লেখেন : ‘তোমার অকপট আন্তরিক শ্রদ্ধাসম্ভার আমি অঞ্জলি পাতিয়াই গ্রহণ করিলাম।’

পত্রসংখ্যা ১১

১.         হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের সমসাময়িক বীরভূমের আরো কয়েকজন সাহিত্যরথীর উত্থান ঘটেছিল Ñ তারাশঙ্কর, শৈলজানন্দ, সজনীকান্ত দাস এঁদের মধ্যে বিশিষ্ট। বীরভূম থেকে এসে এঁরা প্রত্যেকেই কলকাতায় বাড়ি-ঘর করে

থিতু হয়ে ছিলেন। হরেকৃষ্ণ ছিলেন ভিন্ন ধাতুতে গড়া

মানুষ। কলকাতায় মাঝে মাঝে এখানে-ওখানে থাকলেও বীরভূমের স্বগ্রাম কুড়মিঠাই ছিল তাঁর প্রাণের আরাম, আত্মার শান্তিক্ষেত্র। আমৃত্যু সেখানেই তিনি কাটিয়েছেন। সুতরাং শরদিন্দুর ‘আর দেশে গিয়া কাজ নাই’, Ñ এ-প্রস্তাব-পরামর্শ তিনি কখনই স্বীকার করেননি।

২.        আনন্দবাজার পত্রিকার ‘রবিবাসরীয়’র সম্পাদক মন্মথনাথ সান্যাল (১৯০২-১৯৮৩)।

৩.        তুমি সন্ধ্যার মেঘ উপন্যাসটি সমালোচনার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা।

পত্রসংখ্যা ১২

১.         ‘দৃষ্টোহসি তুষ্টাঃ বয়ম্’ Ñ প্রচলিত এই সংস্কৃত বাগ্ধারাটির সাধারণ অর্থ হলো : তোমাকে যতদিন দেখতে পাবো ততদিন তুষ্ট হবো।

পত্র সংখ্যা ১৩

১.         রহস্য-কাহিনীটির প্রথম প্রকাশ ১৪ আষাঢ় ১৩৭৪।

            প্রকাশক : আনন্দ পাবলিশার্স প্রা: লি:, দাম চার টাকা।

স্বীকৃতি : হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়কে লেখা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৩টি অপ্রকাশিত পত্র প্রকাশ করা সম্ভব হলো সাহিত্যরত্নের পৌত্র শ্রীপ্রাণগোপাল মুখোপাধ্যায় ও বনগোপাল মুখোপাধ্যায়ের সৌজন্যে। শরদিন্দু অম্নিবাসে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের পত্রাবলির যেটুকু রক্ষিত হয়েছে তার সাহায্যেই উভয়ের চিঠিপত্রের সম্পর্কটি স্পষ্ট করা সম্ভব হয়েছে। এজন্য সাধুবাদ প্রাপ্য অবশ্যই আনন্দ পাবলিশার্সের। এছাড়াও পত্র-সম্পাদনায় সাহায্য পেয়েছি ড. নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, শ্রীজগদীশ বসাক, এবং শ্রীমান বিনোদ সরকার, শুভাশিস মণ্ডল ও সুজয়কৃষ্ণ চক্রবর্তীর কাছে। য়

৭.         স্বাধীনতার পর পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা-রূপায়ণে নানা প্রোজেক্ট হাতে নেয় সরকার। বীরভূমের সেচ-ব্যবস্থার উন্নতির জন্য ময়ূরাক্ষী পরিকল্পনাও গৃহীত হয়। শরদিন্দু সম্ভবত তার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

পত্রসংখ্যা ৬

১.         শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়র তিন পুত্রের সর্বকনিষ্ঠ শান্তনুর বিবাহ। পরবর্তী ৭-সংখ্যক পত্রে এই বিবাহের বিস্তৃত বিবরণ আছে।

২.        ডাকের গোলযোগে উল্লিখিত ছাপা নিমন্ত্রণপত্র হরেকৃষ্ণর

হস্তগত হয়নি।

৩.        হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়-লিখিত শরদিন্দুর গৌড়মল্লার উপন্যাসের সমালোচনা।

৪.         কথাসাহিত্য (প্রথম প্রকাশ, কার্তিক ১৩৫৬) পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় মিত্র ও ঘোষ (প্রতিষ্ঠা ১৯৩৪) প্রকাশন সংস্থা থেকে। উক্ত প্রকাশক শরদিন্দুর বই ছাপার ব্যাপারে আগ্রহী থাকলেও যে-কোনো কারণেই হোক লেখক স্বয়ং তাঁদের প্রতি সুপ্রসন্ন ছিলেন না। এই চিঠি লেখার পূর্বে তাঁর একটিমাত্র বই সরস গল্প মিত্র ও ঘোষ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৫৯ বঙ্গাব্দে। অনেক পরে ১৩৭০ সালে আর একটিমাত্র বই মগ্ন মৈনাক সেখান থেকে প্রকাশিত হয়।

৫.        গল্প-সংকলনটি প্রথম প্রকাশিত হয় বৈশাখ ১৩৬২ বঙ্গাব্দে। এই চিঠি লেখার অব্যবহিত পূর্বে। প্রকাশক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড্ সন্স্। দাম ছিল আড়াই টাকা।

৬.        গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড্ সন্স্-এর হরিদাস চট্টোপাধ্যায়।

৭.         হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের লেখা কবি জয়দেব ও শ্রীগীতগোবিন্দ গ্রন্থের তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় এই চিঠি লেখার মাসদেড়েক পরে ৬ আষাঢ় ১৩৬২ বঙ্গাব্দে। সম্ভবত প্রকাশিতব্য গ্রন্থটি শরদিন্দুকে উপহার দেবার কথা চিঠিতে লিখেছিলেন তিনি। আগে থেকেই শরদিন্দুর সংগ্রহে উক্ত গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ (১৩৩৬) অথবা দ্বিতীয় সংস্করণ (১৩৫৭) ছিল। পঠিত বইটি সম্পর্কে পত্রলেখকের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয়েছে। অপরপক্ষে তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকায় হরেকৃষ্ণও লিখেছেন, ‘সাহিত্যিক বন্ধুগণ এবং সাধারণ পাঠকগণ অনেকেই গ্রন্থখানিকে প্রীতির চক্ষে দেখিয়াছেন। ইহা আমার আশাতীত সৌভাগ্য, ইহা আমার পরম পুরস্কার।’

পত্রসংখ্যা ৭

            ১.         হরেকৃষ্ণ সাহিত্যরত্নর গ্রামের ঠিকানা কুড়মিঠা, বাতিকার, বীরভূম প্রায় সব পত্রেই আছে।

            ২.        চিড়িয়াখানার প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ফাল্গুন মাসে। বই শেষ হয়ে যাওয়ায় হরেকৃষ্ণকে কোনো কপি দিতে পারেননি লেখক। ১৯৫৫ সালে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হলে সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় এর কাহিনী চলচ্চিত্রায়িত হয়েছিল ১৯৬৬ সালে।

            ৩.        ৬ সংখ্যক পত্রের ৫ সংখ্যক পরিচিতি দ্রষ্টব্য।

            ৪.         সুমথনাথ ঘোষ ও গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য সম্পাদিত কথাসাহিত্য (বৈশাখ ১৩৬২) পত্রিকায় ‘গ্রন্থজিজ্ঞাসা’ শিরোনামে শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্নর লেখা গৌড়মল্লার উপন্যাসের সমালোচনাটি প্রকাশিত হয় (পৃ ৫৮২-৫৮৬)। শরদিন্দুর কাছে সংখ্যাটি পাঠানো হয়েছিল।

            ৫.        সাড়ে চার পৃষ্ঠায় মুদ্রিত দীর্ঘ পুস্তক-সমালোচনা পাঠ করে খুশি হয়েছিলেন গৌড়মল্লারের লেখক।

            ৬.        সম্পূর্ণ সমালোচনাটি উদ্ধৃত করার সুযোগ এখানে নেই। কেবল ‘মুক্তকণ্ঠ প্রশংসা’র দুটি প্যারাগ্রাফ তুলে দেওয়া হলো :

‘… বাঙ্গালার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথালক রচয়িতা শ্রীমান্ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় “গৌড়মল্লার” রচনা করিয়াছেন। দেড় হাজার বৎসরের অতীত কাহিনী মূর্ত্তি ধরিয়া সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। অকস্মাৎ এক দুর্য্যােগে বাঙ্গালার সর্ব্বনাশ হইয়া গেল। বাঙ্গালীর স্বাধীনতা গেল, রাজ্য গেল, বাণিজ্য গেল। অমন যে সমৃদ্ধ রাজধানী কর্ণসুবর্ণ প্রায় ধ্বংস হইয়া গেল। বাঙ্গালীর ভাগ্য ভাল যে এ হেন নিদারুণ দুর্যোগেও বাঙ্গালার গ্রামÑ“বেতস গ্রাম” সর্ব্বনাশে সমুৎপন্নে সর্ব্বস্ব বিসর্জ্জন দিয়াও কোনরূপে বাঁচিয়া গিয়াছে। সমস্ত প্রলোভন জয় করিয়া নগরীর ক্লেদ কর্দ্দম পায়ে দলিয়া পল্লীর দুলাল বজ্রদেব পল্লীর ভস্ম¯তূপে ফিরিয়া আসিয়া নব সৃষ্টির অঙ্কুর রচনা করিয়াছে। শরদিন্দুর অপূর্ব্ব সৃষ্টি এই বজ্রদেব। গৌড়মল্লারে এইরূপ মৌলিক সৃষ্টি কয়েকটাই আছে। সে কালের পল্লীর শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতীক “চাতক ঠাকুর” এবং বাঙ্গালার নাগরিক জীবনের আশা-আকাক্সক্ষার কঙ্কাল কোদণ্ড মিশ্র খুঁজিলে এখনো হয়তো সাক্ষাৎ মিলিতে পারে। …

শরদিন্দুর বৈশিষ্ট্য তিনি যে কালের কাহিনী বলিতেছেন, সেই কালোপযোগী বাতাবরণ সৃষ্টি করিতে পারেন। সেই কালের মত করিয়া কথা বলিবার চেষ্টা করেন। অতীতের পটভূমিকায় ছবি আঁকিতে গিয়া সেকালের রং তুলিকার সন্ধান এবং ব্যবহার করিতে জানেন। আর সর্ব্বাপেক্ষা আনন্দের সংবাদ শরদিন্দু যে কালেরই চিত্র রচনা করেন, তাহা কালোত্তীর্ণ বস্তুরূপে সর্ব্বকালের পাঠক-পাঠিকার মনোহরণ করিবে এই ভরসায় আশ্বস্ত হইতে পারি …’

৭.         উপন্যাসে শরদিন্দুর ভুল চমৎকারভাবে নির্দেশ করেছেন সমালোচক হরেকৃষ্ণ : ‘… গৌড়মল্লার ইতিহাস নহে। সুতরাং ইতিহাসে যেখানে শশাঙ্কদেব ময়ূরভঞ্জের অরণ্য ভূমিতে বেণু সাগর অঞ্চলে গিয়া নূতন রাজধানী প্রতিষ্ঠা পূর্ব্বক স্বাধীনতা রক্ষা করিয়াছেন, লেখক সেখানে তাঁহাকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত কল্পনা করিয়াছেন। শশাঙ্কের কোন উত্তরাধিকারীর নাম কেহ জানে না। শরদিন্দু কিন্তু তিন পুরুষের সংবাদ দিয়াছেন। ভাস্করবর্মার পরে তাঁহার কোন বংশধর কর্ণসুবর্ণে রাজত্ব করেন নাই। লেখক অগ্নিবর্মাকে আনিয়াছেন। ইতিহাসের সঙ্গে কল্পনা মিশাইয়া লেখক যে রসায়ন প্রস্তুত করিয়াছেন তাহা বাঙ্গালীÑশুধু বাঙ্গালার নহে যে কোন কালের যে কোন দেশের পাঠক পাঠিকার মনের বলাধান করিবে। আশা করি তথাপি কেহ উপন্যাসকে ইতিহাস বলিয়া ভুল করিবে না। …’

৮.        ‘গৌড়মল্লার’ উপন্যাসের লেখক মাঝে মধ্যেই পাদটীকা ব্যবহার করেছেন। ‘বনপর্ব’ নামক নবম পরিচ্ছেদে এরকম একটি পাদটীকা : ‘কুকুরের অস্ট্রিক প্রতিশব্দ চুচু’। হরেকৃষ্ণর গ্রন্থ-সমালোচনার শেষ লাইনটি হলো : ‘লেখক পাদটীকায় (৮০ পৃষ্ঠা) আমাদের শুনাইয়া দিয়াছেন Ñ ‘কুকুরের অস্ট্রিক প্রতিশব্দ চুচু’। পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠায় এর পরেই আছে ঐ.গ.ঠ. জধফরড়’র একটি বিজ্ঞাপন। আমাদের অনুমান এর ফলেই সমালোচকের বক্তব্যের পরের অংশ খণ্ডিত হয়ে গেছে। শরদিন্দু বিষয়টি ধরতে না পারায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

৯.        ‘বিজ্ঞাপন’ পত্রিকা সম্পাদকের কাছে লক্ষ্মীবিশেষ। সাময়িকপত্র বা সংবাদপত্রের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত তাঁরা জানেন পত্রিকা ছাপার শেষ মুহূর্তে হঠাৎ করে যদি কোনো বিজ্ঞাপন এসে যায় তখন কোনো সংবাদ বা লেখা কাটছাঁট করে বিজ্ঞাপনটি খাইয়ে দেওয়া হয়। এখানেও সে-রকম ঘটনা ঘটেছে। গ্রামোফোন কোম্পানির ঐ.গ.ঠ. জধফরড়-র

লোভনীয় বিজ্ঞাপনটি ছাপতে গিয়ে হরেকৃষ্ণর গ্রন্থ সমালোচনার শেষ অংশে কোপ পড়েছে। পড়তে গিয়ে খাপছাড়া লাগার কারণ সে-কারণেই।

১০.       শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তুমি সন্ধ্যার মেঘ উপন্যাসটি লিখেছিলেন ২৬ অক্টোবর ১৯৫৬ থেকে ১৯ আগস্ট ১৯৫৮Ñএই কালসীমায়। কিন্তু এর তোড়জোড় শুরু হয়েছিল কয়েক বৎসর পূর্ব থেকেই। উপন্যাসের কাহিনীকাঠামো, উপাদান ও তথ্যাবলির অনেকটাই জুগিয়েছিলেন হরেকৃষ্ণ সাহিত্যরত্ন। এমনকি উপন্যাসটির একটি নামকরণও করে ফেলেছিলেন ‘যৌবনশ্রী’। সবচেয়ে বড়ো কথা, বারবার তাগিদ দিয়ে লেখককে উৎসাহিত করেছেন তিনি। উপন্যাসটির লেখা কবে শেষ হবে এ-নিয়ে তাঁর আগ্রহের শেষ ছিল না। বিগ্রহপাল ও যৌবনশ্রী উক্ত উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র।

পত্রসংখ্যা ৮

            ১.         ইন্ল্যান্ড লেটারে লেখা পত্রটি এসেছিল হরেকৃষ্ণ সাহিত্যরত্নের কলকাতার অস্থায়ী আবাস ১৯৮ বিবেকানন্দ রোডের ঠিকানায়। সেখান থেকে জবফরৎবপঃবফ হয়ে পৌঁছয় বীরভূমের কুড়মিঠার বাড়িতে।

            ২.        যে-কোনো কিছুতে সামান্য বিচ্যুতি দেখলেই সাহিত্যরত্ন মশাই ভীষণ চটে যেতেন। এইজন্য সাহিত্যিক মহল তাঁকে ‘দুর্বাসা’ নামে পরিচিত করেছিল।

            ৩.        বইটির প্রকাশক গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড্ সন্স্।

            ৪.         ১৯৫৪ সালের শারদীয় দেশ পত্রিকায় গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে কানু কহে রাই (১৩৬২) গল্পসংকলনভুক্ত হয়েছে।

            ৫.        ‘বড় ঘরের কথা’ নিয়ে আন্দোলন হওয়ার কারণ গল্পের বিষয়। বংশরক্ষার খাতিরে বড়ো এক জমিদার-পরিবারে জমিদার-কন্যার ভৃত্য-উপগত হওয়ার কেচ্ছা-কেলেঙ্কারির গল্প হয়তো উচ্চসমাজের বিশেষ কোনো পরিবারের প্রতি ইঙ্গিত করেছিল।

            ৬.        ৭-সংখ্যক পত্রের পত্র-পরিচিতি দ্রষ্টব্য।

            ৭.         সমালোচনাটি কাটছাঁটের কারণ উল্লেখ করা হয়েছে ৭ সংখ্যক পত্রের ৯-সংখ্যক পরিচিতিতে।

            ৮.        সমকালে পুস্তক-সমালোচনার নামে চলত কপট সাহিত্যবিচার। হরেকৃষ্ণ সাহিত্যরত্নের রসগ্রাহী সমালোচনা তাই লেখকদের ছিল প্রিয়। শরদিন্দু যেমন নিজের গ্রন্থের সমালোচক হিসেবে তাঁকে পেতে চেয়েছেন, তেমনি সে-সময়ের আর এক খ্যাতিমান লেখক ‘বনফুল’ ওরফে বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের আকাক্সক্ষা ছিল তিনি যেন তাঁর মহারানী ও উজ্জ্বলা উপন্যাসদুটির সমালোচনা করেন। একটি চিঠিতে সাহিত্যরত্নকে লিখেছেন (০৮.০১.১৯৫৮), ‘আমার বই দুটির রস-বিচার করিয়া কোথাও যদি সমালোচনা লেখেন বড়ই আনন্দ পাইব।’

            ৯.        তুমি সন্ধ্যার মেঘ উপন্যাস।

            ১০.       উপন্যাসটি লেখা শুরু করেছিলেন ২৬ অক্টোবর ১৯৫৬ সালে। এই তারিখ পাওয়া গেছে শরদিন্দুর ডায়েরি থেকে।

পত্রসংখ্যা ৯

১.         দ্রষ্টব্য ৮-সংখ্যক পত্রের ২-সংখ্যক পরিচিতি।

২.        তুমি সন্ধ্যার মেঘ উপন্যাস। শরদিন্দু প্রথমে উপন্যাসটির নাম দিয়েছিলেন ‘রেবা রোধসি’। পাণ্ডুলিপিতে দেখা যায় প্রথম কয়েকটি পরিচ্ছেদ এই নামেই লেখা হয়েছিল। পরে নাম পরিবর্তন করেন।

৩.        উপন্যাসটি সমাপ্ত হয়েছিল এই চিঠি লেখার আরো পনেরোদিন বাদে, ১৯ আগস্ট ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে।

৪.         তুমি সন্ধ্যার মেঘ সরাসরি পুস্তকাকারে আশ্বিন ১৩৬৫ (সেপ্টেম্বর ১৯৫৮) সালে নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড থেকে। দাম ছিল সাড়ে পাঁচ টাকা।

৫.        তুমি সন্ধ্যার মেঘ উপন্যাসের উৎসর্গপত্রে লেখা আছে :

‘যাঁহার প্ররোচনায় এই কাহিনী লিখিয়াছি সেই পরম ভক্তিভাজন পণ্ডিত প্রবর শ্রীহরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সাহিত্যরত্ন মহাশয়ের করকমলে ইহা সাদরে অর্পণ করিলাম।’

পত্রসংখ্যা ১০

১.         অসুস্থ অবস্থায় শরদিন্দুর কাছ থেকে নিজের মানসপ্রসূত প্রিয় গ্রন্থটির উৎসর্গ-প্রস্তাব আসায় অভিভূত হরেকৃষ্ণ আবেগে বিহ্বল হয়ে তাঁকে যে-চিঠি লেখেন (হরেকৃষ্ণর পত্র-৫) পাঠক নিশ্চয় সেটি লক্ষ করেছেন। সাহিত্যরত্ন সে-চিঠিতে লেখেন : ‘তোমার অকপট আন্তরিক শ্রদ্ধাসম্ভার আমি অঞ্জলি পাতিয়াই গ্রহণ করিলাম।’

পত্রসংখ্যা ১১

১.         হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের সমসাময়িক বীরভূমের আরো কয়েকজন সাহিত্যরথীর উত্থান ঘটেছিল Ñ তারাশঙ্কর, শৈলজানন্দ, সজনীকান্ত দাস এঁদের মধ্যে বিশিষ্ট। বীরভূম থেকে এসে এঁরা প্রত্যেকেই কলকাতায় বাড়ি-ঘর করে

থিতু হয়ে ছিলেন। হরেকৃষ্ণ ছিলেন ভিন্ন ধাতুতে গড়া

মানুষ। কলকাতায় মাঝে মাঝে এখানে-ওখানে থাকলেও বীরভূমের স্বগ্রাম কুড়মিঠাই ছিল তাঁর প্রাণের আরাম, আত্মার শান্তিক্ষেত্র। আমৃত্যু সেখানেই তিনি কাটিয়েছেন। সুতরাং শরদিন্দুর ‘আর দেশে গিয়া কাজ নাই’, এ-প্রস্তাব-পরামর্শ তিনি কখনই স্বীকার করেননি।

২.        আনন্দবাজার পত্রিকার ‘রবিবাসরীয়’র সম্পাদক মন্মথনাথ সান্যাল (১৯০২-১৯৮৩)।

৩.        তুমি সন্ধ্যার মেঘ উপন্যাসটি সমালোচনার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা।

পত্রসংখ্যা ১২

১.         ‘দৃষ্টোহসি তুষ্টাঃ বয়ম্’ Ñ প্রচলিত এই সংস্কৃত বাগ্ধারাটির সাধারণ অর্থ হলো : তোমাকে যতদিন দেখতে পাবো ততদিন তুষ্ট হবো।

পত্র সংখ্যা ১৩

১.         রহস্য-কাহিনীটির প্রথম প্রকাশ ১৪ আষাঢ় ১৩৭৪।

            প্রকাশক : আনন্দ পাবলিশার্স প্রা: লি:, দাম চার টাকা। স্বীকৃতি : হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়কে লেখা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৩টি অপ্রকাশিত পত্র প্রকাশ করা সম্ভব হলো সাহিত্যরত্নের পৌত্র শ্রীপ্রাণগোপাল মুখোপাধ্যায় ও বনগোপাল মুখোপাধ্যায়ের সৌজন্যে। শরদিন্দু অম্নিবাসে হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের পত্রাবলির যেটুকু রক্ষিত হয়েছে তার সাহায্যেই উভয়ের চিঠিপত্রের সম্পর্কটি স্পষ্ট করা সম্ভব হয়েছে। এজন্য সাধুবাদ প্রাপ্য অবশ্যই আনন্দ পাবলিশার্সের। এছাড়াও পত্র-সম্পাদনায় সাহায্য পেয়েছি ড. নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, শ্রীজগদীশ বসাক, এবং শ্রীমান বিনোদ সরকার, শুভাশিস মণ্ডল ও সুজয়কৃষ্ণ চক্রবর্তীর কাছে।