জাহিদ মুস্তাফা

  • শিল্পী আনিসুজ্জামানের ছাপচিত্রে নগরযন্ত্রণা

    একদার সবুজবেষ্টিত ঢাকা এখন কংক্রিটের অরণ্য। ঢাকার প্রধান প্রধান সব পথের পাশেই স্কাইস্ক্র্যাপার ভবনের সারি। এখন রাজপথ ছেড়ে গলিপথেও ডানা মেলছে বিশাল বিশাল ভবন। দ্রুত অন্তর্হিত হচ্ছে সবুজ। নগরীর নানা কেন্দ্রে ইট-কাঠ-রড-বালু-সিমেন্টের বিস্তার, নির্মাণাধীন ভবনের সমাহার। দখল হয়ে গেছে রাজধানীর অনেক খাস জমি, ভরাট হয়ে গেছে বেশ কটি খাল, নালা। দু-তিনদিনের বর্ষণেই জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে ঢাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। প্রকৃতির প্রতি মানুষের এই অন্যায়-অনাচারের প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে প্রকৃতি নিজেই। নগরবন্যায় বিপর্যস্ত হচ্ছে এক কোটি জন-অধ্যুষিত ঢাকা, দুঃসহ কষ্টের শিকার হচ্ছে ঢাকাবাসী। পরিবেশবিদ ও নগর-বিশারদরা ঢাকাকে ওই বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে অনেক আগে থেকেই সোচ্চার। এই শুভ উদ্যোগে শামিল হয়েছেন তরুণ এক চারুশিল্পী আনিসুজ্জামান। অপরিকল্পিত নগরায়ণে নাগরিক-যন্ত্রণার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর সাম্প্রতিক চিত্রপটে। তাঁর সিরিজের শিরোনাম ‘কমপ্লেকসিটি’ ও ‘ইমেজ অব ঢাকা’। তরুণ এই শিল্পী কাজ করেন ছাপচিত্র-মাধ্যমে। এর মধ্যে কাঠখোদাই-মাধ্যমেই তাঁর মূল ঝোঁক। চিত্রকলায় আলোছায়ার প্রয়োগ নিয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল শিল্পীজীবনের প্রারম্ভ থেকে। শিক্ষক ও অগ্রজদের পরামর্শে তিনি ছাপচিত্রে নিয়োজিত হন। তাঁর প্রথম দিককার বিষয় ছিল বাংলাদেশের নিসর্গ, নগরজীবন ও কর্মরত মানুষ। অ্যাকাডেমিক ছাপচিত্রে তিনি এভাবে ক্রমান্বয়ে দক্ষতা অর্জন করতে থাকেন। এজন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তিনি কিছু স্বীকৃতিও অর্জন করেছেন। আনিসুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৯৩ সালে ছাপচিত্রকলায় স্নাতক এবং ১৯৯৭ সালে ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে তিনি কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তাঁর ভূতপূর্ব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাপচিত্র বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। এ-বছরই তিনি ছয়মাসের রেসিডেন্ট শিল্পী হিসেবে যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো ও লন্ডন প্রিন্ট স্টুডিওতে ছাপচিত্রে উচ্চতর দীক্ষা নিয়েছেন। গত ১৭ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের ডিভাইন আর্ট গ্যালারিতে তাঁর পঞ্চম একক ছাপচিত্র-প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হলো। এতে তাঁর পঁয়তাল্লিশটি ছাপাই ছবি স্থান পেয়েছে। তেতাল্লিশটি উডকাট এবং দুটিমাত্র লিনোকাট কাজ। উডকাট মাধ্যমের দুটি ‘বংশীবাদক’ ও ‘অবয়ব’ ছাড়া বাকি কাজগুলো নগর-ইমেজ নিয়ে করা। ‘কমপ্লেকসিটি’ শীর্ষক সিরিজে অপরিকল্পিত নগরায়ণকে তুলে ধরেছেন শিল্পী। আমাদের গোটা সমাজব্যবস্থার সংকট ও জটিলতাকে তিনি প্রতীকায়িত করেছেন এই সিরিজে। নির্মাণাধীন বিভিন্ন ভবনের কাঠামো ও তার বাইরে উল্লম্ব ও আনুভূমিক বাঁশের বা স্টিলের তৈরি   কাঠামোর বৈপরীত্য যেন ফুলের পাপড়ি ও দলের বিপরীতমুখী রূপের সমন্বয়ক সৌন্দর্যানুভূতির আবেশ ছড়ায় আমাদের মনে। আমাদের চোখে নগরায়ণের নিত্য দৃশ্যমান একটি সাধারণ বিষয়কে অসাধারণ ক্রাফট্সম্যানশিপ-দক্ষতায় তুলে এনেছেন শিল্পী। সূক্ষ্ম-সরলরেখার শক্তিমানতা, আলোছায়ার হৃদয়গ্রাহী প্রয়োগ, কুশলতায় ও বর্ণের পরিমিত উপস্থাপনায় তাঁর ছাপাই হয়ে উঠেছে নগরকাব্যের মতো ছন্দময়। নগরজীবনের রূঢ় দিক উন্মোচন করেও তাঁর চিত্রকর্মের কুশলতা আমাদের আশ্বস্ত করে শিল্পীর যোগ্যতা সম্পর্কে, পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের বিরুদ্ধে তাঁর ধিক্কারের অনুরণন ছড়িয়ে পড়ে দর্শক-মননে। তবে তাঁর কাজে পুরানো ঢাকা ও এর ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলো উঠে এলে দুই ঢাকার বৈপরীত্য আরো ভালো বোঝা যেত। শিল্পী আনিসুজ্জামানের ‘ইমেজ অব গ্লাসগো’ ও ‘ইমেজ অব লন্ডন’ সিরিজে ওই দুই নগরের ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটেছে। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয়ও ঘটেছে কোনো কোনো কাজে। ‘ইমেজ অব গ্লাসগো-১’ শীর্ষক উডকাট-ছাপাইটি অনবদ্য ও কাব্যিক হয়ে উঠেছে বলিষ্ঠ অঙ্কন ও শেষ বিকেলের হলুদাভ আলোর পটভূমির সার্থক প্রয়োগে। আলোছায়ার বৈপরীত্যের এমন কুশলী প্রয়োগ সচরাচর দেখা যায় না। সর্বশেষ এই কাজগুলোতে শিল্পীর ক্রমোন্নতি বিধৃত হয়েছে। আনিসুজ্জামানের ছাপাই ছবি বাস্তবতার উৎকর্ষ প্রকাশ। মনে হয় শিল্পী এ-ক্ষেত্রে তাঁর কাজের সুবিধার জন্য ফটোগ্রাফির সহায়তা নিয়েছেন এবং স্থাপত্যের নকশা ও রেখাঙ্কনকে সুদৃঢ় অথচ সরল রাখতে স্কেল ফেলে কাঠ খোদাই করে ছাপ নিয়েছেন। বাস্তব ও চেনা বিষয়কে আরো নিবিড়ভাবে প্রকাশে শিল্পীর করণকৌশল আমাদেরকে বেশ আকর্ষিত করে। তাঁর ‘বংশীবাদক’ ও ‘অবয়ব’ শীর্ষক দুটি ছাপাই প্রশান্ত অনুভূতির জন্ম দেয়। বংশীবাদকের অবয়বে ফুটে উঠেছে সুরসাধনার গভীর অভিনিবেশ। আনিসুজ্জামান বয়সে নিতান্তই তরুণ। ত্রিশের কোটা অতিক্রম করেছেন খুব বেশিদিন হয়নি। এ-বয়সেই অনেক অর্জন তাঁর। দেশ-বিদেশে অসংখ্য দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। বেশ কটি স্কলারশিপ ও পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত তাঁর পাঁচটি একক চিত্রপ্রদর্শনী হলো। ১৯৯৯-তে প্রথম একক প্রদর্শনী হয় কলকাতার কৌণিক আর্ট গ্যালারিতে, দ্বিতীয়টি ঢাকায় জয়নুল গ্যালারিতে, তৃতীয়টি একই বছর চট্টগ্রামে মৃন্ময় আর্ট গ্যালারিতে। এ-বছর তাঁর চতুর্থ একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো প্রিন্ট স্টুডিওতে।তাঁর সাম্প্রতিক প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু ও এর অন্তর্নিহিত বক্তব্য নগররক্ষকদের আরো সচেতন করে তুলুক, ঢাকা মুক্ত হোক অপরিকল্পিত নগরায়ণ থেকে।