মুহম্মদ জাফর ইকবাল
-
অদৃশ্যজগতেরসন্ধানে
আকাশের দিকে তাকানোর ব্যাপারটি আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছি। নগর-জীবনে ‘আকাশ’ শব্দটি ধীরে ধীরে অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে। অল্পজায়গায় অনেক মানুষকে জায়গা দেওয়ার জন্যে উঁচু উঁচু বিল্ডিং মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। সেগুলো ধীরে ধীরে আকাশকে আড়াল করে দিচ্ছে। তারপরও কেউ যদি আকাশের দিকে তাকায় দেখবে সেটি সৌন্দর্যহীন বিবর্ণ। শহরের ধুলোবালিতে ধূসর। রাতের বেলা সেই আকাশ আমাদের চোখে পড়ে না, শহরের লাখ লাখ আলোর বিচ্ছুরণে আকাশ ঢাকা পড়ে থাকে। আকাশে গোপনে প্রায় অপরাধীর মতো চাঁদ উঠে একসময় বড় হতে হতে পূর্ণিমা হয়, আবার ছোট হতে হতে অমাবস্যার অন্ধকারে ঢেকে যায়। শহরের মানুষ কি কখনো সেটি দেখেছে? অনুভব করেছে? আকাশের মতো এত চমৎকার একটি জিনিস আমাদের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে – তার চেয়ে দুঃখের ব্যাপার আর কী হতে পারে? আমাদের কৃত্রিম-জীবনে আকাশকে নির্বাসন দিয়েছি, কিন্তু তবু সেটি আছে। কেউ যদি কখনো শহর থেকে দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি কোনো গ্রামে, বিদ্যুৎহীন কোনো বনে-বাদাড়ে, নদীতে, খোলা প্রান্তরে রাতের বেলা এসে হাজির হয়, এখনো সেই আকাশকে দেখতে পাবে। যদি আকাশে চাঁদ থাকে, সেটি আমাদের দৃষ্টির অনেকখানি দখল করে রাখবে। যদি চাঁদ না থাকে তাহলে আমরা আকাশের নক্ষত্র দেখে মুগ্ধ হবো। পরিষ্কার আকাশে ঝকঝকে নক্ষত্রের মতো অপূর্ব দৃশ্য আর কী আছে? কোনো নক্ষত্র উজ্জ্বল, কোনো নক্ষত্র অনুজ্জ্বল, কোনোটি মিটমিট করে জ্বলছে আর কোনোটি স্থির। কোনো কোনো নক্ষত্রের আলোতে হালকা কোনো একটি রঙের স্পর্শ। বছরের কোন সময়ে দেখছি তার ওপর নির্ভর করে আমরা আবিষ্কার করতে পারি আকাশজোড়া ছায়াপথ! সেই সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে এই নক্ষত্ররাজিকে দেখে আসছে, দৃশ্যটির খুব পরিবর্তন হয়নি। আকাশের সেই নক্ষত্রকে দেখে প্রাচীনকালের গুহাবাসী মানুষের মনে যে-অনুভূতি হতো এখনো সেই অনুভূতিই হয়। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়, এখন আমরা এই রহস্যের খানিকটা বুঝতে পারি। হ্যাঁ, খানিকটা। রাতের বেলা পরিষ্কার আকাশে আমরা কয়েক হাজার নক্ষত্র দেখতে পাই। মোটামুটি একটি বাইনোকুলার চোখে দিলে তার সংখ্যা আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আবছা ধোঁয়ার মতো নক্ষত্ররাজি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বছরের ঠিক সময় ঠিক জায়গায় তাকাতে পারলে অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিটিও দেখা যায়। বাইনোকুলার ব্যবহার না-করে ভালো টেলিস্কোপ ব্যবহার করলে হঠাৎ চোখের সামনে অসংখ্য নতুন নক্ষত্রের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন গ্যালাক্সি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর আর কোনো শেষ নেই। মহাকাশের যত গভীরে দৃষ্টি দেওয়া যায় সেখানে তত নতুন নতুন গ্যালাক্সি, তত নক্ষত্রপুঞ্জ নেবুলা কোয়াজার। আমরা এই নক্ষত্ররাজির কথা জানি, গ্যালাক্সির কথা জানি, কারণ আমরা সেগুলো দেখতে পাই। মানুষের চোখ নামে অপূর্ব একজোড়া সম্পদ রয়েছে, দেখা নামক অভূতপূর্ব এক ধরনের প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই চোখ আলোকে দেখতে পায় আর সেই আলো থেকে আমরা এই নক্ষত্ররাজি, এই গ্যালাক্সির কথা জানি। যদি নক্ষত্র থেকে আলো বের না হতো তাহলে আমরা এই নক্ষত্রদের দেখতে পেতাম না, হয়তো তাদের কথা এত সহজে জানতে পারতাম না। বিজ্ঞানীরা এই নক্ষত্ররাজি এবং গ্যালাক্সিমণ্ডলীকে দেখে অনুমান করার চেষ্টা করেছেন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আকার কত বড়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল গ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সি সবকিছু মিলিয়ে তার ভর কত? সেটি করতে গিয়েই তারা আবিষ্কার করলেন যে, তাদের হিসাব মিলছে না। আমরা আমাদের চোখে যে-নক্ষত্ররাজি, যে-গ্যালাক্সি দেখছি, সেটুকু যথেষ্ট নয়। তার বাইরেও আরো বিশাল কিছু থাকতে হবে, যেগুলো আমরা দেখতে পাই না। যেটি দেখতে পাই না সেটি আছে কিংবা নেই – সেই প্রশ্নটিই আমরা করি কী করে? একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে আমরা বোঝাতে পারি, আমরা চাঁদের কথা ধরি। ধরা যাক, কোনো একটি কারণে চাঁদ আমাদের কাছে অদৃশ্য, আমরা চাঁদকে দেখতে পাই না। তাহলে পৃথিবীর মানুষ কি চাঁদের কথা জানতে পারত না? নিশ্চয়ই পারত এবং সেটি জানতে পারত নদী এবং সমুদ্রের পানিতে জোয়ারভাটা দেখে। একটি নির্দিষ্ট সময় পরে পরে কেন সমুদ্রের পানিতে জোয়ার এবং ভাটা হয়, তার ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা অনুমান করতেন পৃথিবীর কাছাকাছি নিশ্চয়ই কোনো একটি উপগ্রহ রয়েছে, সেই উপগ্রহের আকর্ষণে সমুদ্রের পানি ফুলে ফেঁপে উঠে জোয়ারভাটার জন্ম দিচ্ছে। হিসাবপত্র করে তারা এই উপগ্রহের আকার-আকৃতি বের করে ফেলতে পারতেন, পৃথিবীটাকে কতদিন পরপর প্রদক্ষিণ করছে সেটিও অনুমান করে ফেলতে পারতেন। ঠিক সে-রকম মহাজগতে নানা নক্ষত্র, নক্ষত্রপুঞ্জের গতি দেখে তারা অনুমান করার চেষ্টা করেন তাদের আশেপাশে যেসব মহাজাগতিক বস্তু আছে তাদের ভর কত? গত কয়েক দশকে তারা আবিষ্কার করেছেন যে, তাদের অনুমান মিলছে না। নক্ষত্র বা নক্ষত্রপুঞ্জ বা মহাজাগতিক গ্যাসের গতিবিধি দেখে আশেপাশে যে-ভর থাকা উচিত বলে অনুমান করা হচ্ছে, প্রকৃত ভর তার থেকে অনেক কম। তাদের মনে হচ্ছে, অদৃশ্য কোনো ভর লুকিয়ে আছে যেটি তারা দেখতে পাচ্ছেন না। আমাদের চোখ যে-আলোকে দেখতে পায় তার বাইরেও কিন্তু আলো রয়েছে। আলো হচ্ছে বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ। এই তরঙ্গের দৈর্ঘ্য যখন একটি নির্দিষ্ট সীমার ভেতরে থাকে শুধুমাত্র তখন সেটি আমরা দেখতে পাই, তার বাইরে চলে গেলে আমরা সেটি দেখতে পাই না। বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গের বিশাল ব্যাপ্তির মাঝে আমরা যেটুকু দেখতে পাই সেটি খুবই ছোট,…
