ধারাবাহিক উপন্যাস

  • ঢাকা আগমন ও আর্ট কলেজে ভর্তি

    সৈয়দ জাহাঙ্গীর ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ই কলকাতায় জাফর ভাইয়ের পার্ল রোডের বাসায় একবার বেড়াতে গেলাম। জাফর ভাই আমাকে একটা নতুন জুতো কিনে দিয়েছিলেন। ওই জুতোর বাক্সের ভেতর সুন্দর কিছু ড্রইং করেছিলাম। জাফর ভাইয়ের চোখে পড়েছিল সেসব। তিনি সেটা মনে রেখেছিলেন। জাফর ভাই ঢাকা চলে আসেন সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের পরপরই। কলকাতায় একজন পরিচিত তরুণ মুসলমান লেখক…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক \ ৩৩ \   রাতের ঘন অন্ধকার, হারিকেনের দীপ্তিও তার চিমনির বাইরে বিস্তার লাভ করতে পারে নাই। বাঁশবনের ভেতরে হাওয়ার অবিরাম সরসর ধ্বনি। সেই ধ্বনিও এমন প্রবল যে তাকে ঠেলে মইনুল হোসেন মোক্তারের গৃহিণীর কণ্ঠস্বর শ্রুত হতে পারে নাই। এই ভ্যাপসা গরমকালেও সর্বাঙ্গ চাদরে মোড়া ওয়াহেদ ডাক্তার, অন্ধকারে প্রায় বিলীন, সে চাদরের…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক   \ ৩২ \   উন্মাদের উন্মাদ! পাগলের সাঁকো কোথায় যে কে নাড়ায়! সাতচল্লিশের দেশভাগ কাল। সেই উন্মাদকালে আকাশে বর্ষণ নাই, মাটিতে ফাটল, আধকোশা স্তিমিত, মানুষেরা চঞ্চল এই মতো যে কোথাও থেকে একটা ঢোলের বাড়ি শোনা যাচ্ছে – গাঁজা ঝাঁই ঝপর ঝপর – নির্ণয় নাই যে কোথায়! এইকালে নদী পেরিয়ে কি কেবল…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হকসৈয়দ শামসুল হক \ ৩১ \  সেই ওয়াহেদ ডাক্তারের কথা আমরা ভুলি নাই। রাতের জলেশ্বরীর ভুতভুতুম সড়কে কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমানের কেয়ারটেকার সোলেমান এখন বুড়ির চরের পথে, গন্তব্য তার হাফেজ আবুল কাশেম বলরামপুরীর নিবাসে। মনিবের তাগাদা তাকে ধরি আনো। ধরি আনো মানে পারিলে তাকে বান্ধি আনো। হয়, হয়, বান্ধি আনিবারই কাম বটে। এত রাইতে…

  • সেবার যখন মৌসুমি বায়ু এসেছিল

    দেবেশ রায় ছয় এমন কি হওয়া সম্ভব? কল্পনাতেও? আফটার অল -। সাধারণভাবে কী এমন অসম্ভব? ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর একেবারে ঘোষণা করে, দিনক্ষণ জানিয়ে, কিছু না লুকিয়ে, সারাদেশ থেকে করসেবকদের জড়ো করে, যুদ্ধে যেমন বিদেশি সৈন্যবাহিনী আক্রমণ করে অবিকল সে-রকম আক্রমণে বাবরি মসজিদ ভেঙে দেওয়া হলো না? তখন তো উত্তর প্রদেশে গণতান্ত্রিক এক সরকার, মানে সে-সরকার…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক ৩০ বুড়ির চরে রাত তখন কাঁথার মতো পুরু, হালকা শীতের দিনে পুরনো কাঁথার মতোই আরামে জড়িয়ে ধরে আছে বুড়ির চরের কুটিরে কুটিরে মানুষের ঘুমশরীর। নারী তার শিশুসন্তানের মুখে স্তন গুঁজে দিয়ে অকাতর হয়ে আছে ঘুমে, স্বামীটি তার কতকাল বৃষ্টি নাই সেই দুঃস্বপ্নের তাড়কা মাছিগুলো তাড়িয়ে চলে, বাপোদাদার সমৃদ্ধকালের স্বপ্ন দেখার চেষ্টায় কেবলই…

  • সেবার যখন মৌসুমি বায়ু এসেছিল

    দেবেশ রায় পাঁচ কলকাতার সেই কমবয়েসি মন্ত্রী ধরলেন ফোন। বাগনানের মন্ত্রীর কাছ থেকে খবর শুনে তিনি বললেন, ‘সে কী? আমি তো কিছুই জানি না। কিন্তু সিএমকে তো ফোন করা যাবে না। আমাদের গোলাপদাকে ডাকা যায়। দাঁড়ান, আমি রমাপদদাকে ফোন করছি।’ ‘উনি কি ধরবেন?’ ‘না। আমি পবিত্রদাকে বলছি ওঁকে ডেকে দিতে। নইলে তো উনিই বলবেন –…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক   \ ২৯ \   নখের আঁচড়ের মতো নদীর চিকন একটানা একটি রব চরাচরের ওপর দাগ কেটে চলে, আঁকের পর আঁক মকবুলের মনে তার মেয়েটির উদ্ভ্রান্ত মুখ রচনা করতে থাকে, নক্ষত্রের আগুন রেখায় যেন বিন্যস্ত হয়ে ওঠে প্রিয়লির মুখ, রাতের সম্মোহিত গভীরে নদী নয় প্রিয়লিরই কান্না শুনে ওঠে মকবুল। কতকাল সে মেয়েটিকে…

  • সেবার যখন মৌসুমি বায়ু এসেছিল

    দেবেশ রায় চার ২৩ জুন শেষরাত থেকে চন্দ্র সাঁতরা আর নিমাই ঢালির মতৈক্যঘটিত আবহাওয়ার যে-পূর্বাভাসের ভয়ে চন্দ্র সাঁতরা খালের জলে ফেলে রাখা পাইপ উদ্ধার করতে চাইল ও একটু দরকষাকষি করেও নিমাই ঢালি জলে নেমে গিয়ে ডুবে গেল – মাঝখানে একবার উঠে সে সাঁতরাকে ক্ষ্যান্ত দিতে বলেছিল কি না ও সাঁতরাই তাকে আরো একবার জলে নামতে…

  • সেবার যখন মৌসুমি বায়ু এসেছিল

    দেবেশ রায় তিন ১৭ জুন মঙ্গলবার থেকে তো কলকাতার জল বেরোতে শুরু করেছে, সে-ই ১১ আর ১২ তারিখের  শেষ ও অষ্টম কালবৈশাখীর জল ও ১৪ থেকে মৌসুমি বায়ুর জল। জল বেরোনোর নানা জটিলতা আছে। সে-সব কথা না হয় থাক। কেষ্টপুর খাল দিয়ে যে-জল বেরোনোর সে-জল কেষ্টপুর খালে ঢুকে আর বেরোতে পারে না। কোনো দিনই পারে…

  • নদী কারো নয়

    সৈয়দ শামসুল হক \ ২৮ \   নদী কেঁদে চলেছে, একটানা তার সিঁ সিঁ কান্নার শব্দ মকবুল হোসেনকে বধির করে দিতে থাকে। সে নির্ণয় করতে চেষ্টা করে, কেন নদী কাঁদছে। তার মনে হয় তার বাবা মইনুল হোসেন মোক্তারের জন্যে কাঁদছে। আধকোশার পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় তাঁর। কেন তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আধকোশার উন্মত্ত খলখল পানিতে? এই…

  • নদী কারো নয়

    \ ২৭ \   মকবুল হোসেনের ঘুম ভেঙে যায়। রাত এখন কত? নির্ণয় তার নাই। কোথায় সে আছে তারও কোনো নির্ণয় নাই। প্রথমে সে মনে করে চাটগাঁয়ে বোধহয় আছে, সার্কিট হাউসের কামরায়, চাটগাঁয় সে এসেছে একটা সাহিত্যসভায় যোগ দিতে। পরমুহূর্তেই ঘোরটা ভেঙে যায় – এই চাটগাঁ থেকে ফিরেই তো সে বুয়ার কাছে জানতে পেয়েছিলো তার…