2015
-
জগন্নাথের হাত
কৃষ্ণেন্দু পালিত ট্রেনে উঠতেই কানে এলো কেউ একজন আস্ফালন করছে, আপনি আমাকে চেনেন? কথা বলতে-বলতে উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়েছে সে। বুঝলাম, কোনো একটা বিষয় নিয়ে অনেক আগে থেকেই চলছে। মাঝবয়সী ভদ্রলোক, লম্বা-চওড়ায় দশাসই, মাথায় কদমছাঁট চুল, দুদিনের না-কামানো দাড়িগোঁফ, পরনে ফেডেড জিনসের ওপরে লাল-সবুজের ডোরাকাটা টি-শার্ট। চোখমুখে অদ্ভুত একটা রুক্ষতা। দুপুরের বনগাঁ লোকাল এমনিতেই ফাঁকা…
-
সাঁওতালি নদী
পরিতোষ হালদার আমার জন্মের পরে যারা শাঁখ বাজিয়েছিলেন, তারা কেউ আজ বেঁচে নেই। অথচ রোজ ক্যানভাস থেকে উড়ে যায় সাতঝাঁক পাখি। মায়ের চোখের গভীরে যে চৈত্রমাস ছিল, তার এক প্যারা অনুবাদ আমি। আজো জনেমর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে ঘুমের মতো ভেসে ওঠে প্রথম দেখা মায়ের মুখ – কেমন খুশিখুশি জাফরানকন্যা। আমি যখন প্রথম…
-
সকল আহবান গ্রহণীয় নয়
মাহমুদ কামাল দরোজার কার্যকারণ ভিতর-বাহির শুধু আহবান নয়, দরোজা নিষেধও করে সেইমতো সকল আহবান গ্রহণীয় নয়। একটাই দরোজা তোমার, বন্ধ ঘর – তবু আহবান কখনো সচল হয়ে হেঁটে আসো ঘরের বাইরে আদর্শহীনের মতো ফিরে গিয়ে বন্ধ করো আলোকবর্তিকা উপেক্ষার ক্ষত নিয়ে নিষেধকে রসায়ন করে তোমার দরোজা দিয়ে প্রবেশ করেও যদি দূরীভূত হই অতিক্রমণের অসামান্য…
-
বিবেকমূল্যের দায়
জাহিদ হায়দার দাঁড়াতাম আমি বজ্রপাতের নিচে, সামান্য হলেও যদি তুমি নিতে বিবেকমূল্যের দায়। দন্ড আমার, স্বপ্ন আমার তোমার করুণায় ঋদ্ধ হতো মৃত্যুর কল্যাণে। স্মৃতির মেঘ বৃষ্টি খোঁজে সত্তার প্রান্তরে, শুদ্ধ হতো ভুল বোঝার ঋণ, পরস্পরের ফেরা। কে আর ভোলে বাঁচার ক্ষতি ক্ষতর সন্ধিতে?
-
বীথি
মাহবুব বারী বীথি, কনের মতোই সেজেছিলে, অন্যের সমস্ত অলঙ্কার পরে, বিকেল গেছে সজ্জায়, সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে কোনো মন নেই, বইয়ের ওপর যখন হাত, তখন আরেকজনের হাতে হাত পড়ে, কেঁপে উঠেছিলে, বাইরে তখন উথাল-পাতাল বাতাস – বাতি নিভে গেছে, অন্ধকারে এমন সময় কার না বুক কাঁপে, শিহরণে এক শীতল উত্তাপ বুকের উপর থেকে নিচের…
-
মাছির ছিলান দেহ
বায়তুল্লাহ্ কাদেরী এই যে একটি মাছি ভং ধরে সারাদিন পড়ে আছে বিছানার ওপর সারাদিন মাছিটির ভং বিহবল মাছির মাথা চক্রাকার ঘুরিতেছে আরো চক্রাকার মাছির ছিলান দেহ হায় এত জটিলতা! কীভাবে খোয়াব দেখি – যন্ত্রণার নর্তকীকে একা ফেলে আমি কতল করেছি এক তিমির মোরগ? নিজের সাজের দিকে তাকালেই মনে হবে সং, জবরজং রংচঙে সং এক…
-
রহস্য
পার্থপ্রতিম মজুমদার শরীর শরীর চায়, মন চায় মন বুঝি না বুঝি না আমি, কে বেশি আপন কার কথা কার কাছে কোনভাবে যায় কটুবাক্য কে বা বলে, কে চোখে হারায় বুঝি না বুঝি না কিছু এই লীলাখেলা কে অতি সবল আর কেই-বা অবলা পৃথিবী রহস্যে ভরা, রহস্য অপার কী এক গোপন খেলা চলে চারিধার…
-
চারজন লোক হেঁটে আসে তারা
ইকবাল আজিজ চারজন লোক হেঁটে আসে তারা একলাশ কাঁধে বহুদূর থেকে; আকাশে আকাশে তুষারিত মেঘ সাদা গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো। চারজন লোক বিড়বিড় করে; পৃথিবীর পথে হেঁটে যায় তারা – চলতে চলতে দেখেছে যে তারা অনেক আকাশ দুর্ভিক্ষ শাসকের নীল কূটনীতি কতো কাঁটাতার চারদিকে; চারজন লোক দেখেছে যে তারা ব্যথা-বেদনার সুরগুলি সব পথে পথে ঝরে;…
-
আমার পা
মমতাজ বেগম টলোমলো পায়ে ভর করে কখন প্রথম ভূমিতে দাঁড়িয়েছি জানিনে কতবার পড়েছি-উঠেছি তা মনে নেই তারপর হাঁটা – অবিরাম হাঁটা চিরকালের বিশ্বস্ত সঙ্গী আমার। কখনো তেমন করে মূল্য বুঝিনি তোমার আলো বাতাসের মতো তুমি আমার আজন্মের সাথি চিরকাল বহন করবে ভার এ রকমই বিশ্বাস। তুমি যে কখনো ক্লান্ত হতে পারো একথা কখনো…
-
কী করে তোমাকে ভুলি
মাহবুব সাদিক কী করে অধরা গ্রহণশেষের আংটির মতো হীরে ঝলকানো তোমাকে কী করে ভুলি? নক্ষত্রের মতো তুমি শেষে দূরভুবনের কেউ! তোমাকে খুঁজেছি সংগোপনেই কীর্তিনাশার তীরে এখানে-ওখানে কোনাকানছিতে বুলিয়েছি শ্যেনচোখ আকাশে-পাতালে খুঁজে গেছি নিরাময় – হৃদয়ের ক্ষত হয়তো তাতেও ঢাকবে না কোনোমতে নিরিবিলি ভোজ জুটবে না মাঝরাতে নিরাশার খাতে স্থিরতর হতে দেবে না আমাকে…
-
গ্রহণ-বর্জন
কালীকৃষ্ণ গুহ অনেক রাত হলো অনেক পুণ্য – জানি এ-অর্জন বহু প্রতীক্ষার বলি না কোনো কথা গহন সময়ের অন্তরিক্ষে এ এক ভিক্ষা। রাত্রি বহমান সকলই তুচ্ছ গ্রহণ-বর্জন নশ্বরের ঘুম ঈশ্বরীয় জাগা সকলই খেলা শুধু বাঁচাই শেষ কথা আনত ফাল্গুন। ‘অনেক রাত হল’ প্রাচীন কণ্ঠ।
-
ইস্ট সী, পোল্যান্ড, ২০১৪
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সিন্ধুমরালের ডাক নবজাত শিশুর কান্নার সঙ্গে মিশে গিয়ে তৈরি করে নতুন সিম্ফনি সমুদ্রকিনারে আমি লেখার কেবিন থেকে দেখি স্নানার্থীরা জলের ভিতরে অকাতরে মজে গিয়ে পুনর্বার সৈকতে তাদের নিজ-নিজ অবসরচর্চার ঝুপড়িতে ঢুকে যায়, ইসাবেল আলেন্দের বই পড়ে, পড়তে-পড়তেও করুণামিশ্রিত ব্যঙ্গে আমাকে অবলোকন করে। এমন সময় বেলাভূমির বিস্তীর্ণ বালুকায় ভূমিষ্ঠ নবজাতক কঁকিয়ে উঠেছে, সিন্ধুমরালেরা অমনি…
