দেবেশরায়

  • ভাষারসীমা-সীমান্ত

    হাঁটার কথাও উঠল, ভাষার কথাও উঠল। ভাষার গতি কেমন – হাঁটা, না ওড়া, না চক্কর-মারা? আমি এখানে ভাষা বলতে শুধুই মুখের কথা ধরছি। জন্ম থেকেই শুনে আসছি – ক্রোশেষু জঙ্গমতে ভাষা। সব ভাষাই কি ক্রোশে-ক্রোশে বদলায়? সংস্কৃত প্রবাদটিকে একটু ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করা যায়, ক্রোশে-ক্রোশে বদলালেই কি ভাষা? অন্তত সংস্কৃত, আরবি, ল্যাটিন – এগুলো আইন-কানুন দিয়ে এত টাইট যে ক্রোশান্তর তো দূরের কথা, দেশান্তরেও বদলায় না। আর-একটা কথাও তো সেই প্রায় জন্ম থেকেই শুনে আসছি – নদীর বাঁক যত, কথা তত। ওই একই মানে – বাঁকে-বাঁকে কথা বদলে-বদলে যায়। গ্রামের নানারকমের মানুষের সঙ্গে প্রথম মেলামেশার ভিতর থেকে প্রায় তিরিশ-পঁয়তিরিশ বছর আগে আমার মনে হয়েছিল, চাষির ভাষা হাঁটে না, পাক খায়। ওই ধানভানার সময় যেমন ধান ছড়িয়ে গরু ঘোরানো হয় পাক খাইয়ে, তেমন। রোজ একই পথ বা আল ধরে একই জমিতে চাষ করতে যাওয়া, সপ্তাহে দু-বার একবার একই হাটে খরচা করতে যাওয়া, কাছের ও দূরের গাছ-গাছালি নদীনালা চিনে যাওয়া – এটা তো একটা পাক। এমন কী এ-ও দেখেছি, সে যে-হাটে যায়, প্রায় তার সমদূরত্বের আরেকটা হাটের হদিশটাই জানে না। আরো একবার, আমি একটা নদী খুঁজছিলাম – নদী পেরিয়ে-পেরিয়ে, নদীর পাড় দিয়ে হেঁটে-হেঁটে, ওই ‘বড় বাঁক’ নামের নদী খুঁজছিলাম। এক আমিই আনাড়ি, আর-সকলেই কব্রেজ। কত নদীর কত-যে নাম শুনলাম, আমার নদী আর আসে না। যে যতটুকু নদী জানে, শুধু সেটুকুই জানে। শেষে আমি রেগে গিয়ে বললাম, ‘আরে, আমার নদী না পেলে চলবে কী করে? নদী পেলে তবে তো ‘বড় বাঁক’ পেরিয়ে গোঁসাইনীর হাটে উঠব!’ শুনে সকলে মিলে সে কী হাসি! ‘রো রো রো, সেই কথাখান আগত্ কহিবেন তো? যাচ্ছেন হাটত্, গোঁসাইনীর হাটত্, আর খুঁজিবার ধইচছেন নদী! কী নদী? না? বড় বাঁক। নদীত্ কি হাট বসে? চলো কেনে – হাটও পাবেন,…