নিধুবাবুর গান : সময় ও সমাজের প্রতিচ্ছবি

লেখক:

দীপা বন্দ্যোপাধ্যায়

যে-টপ্পা একদিন সমাজের
বিশিষ্টজনের মন হরণ করেছিল, নিধুবাবুর সেই টপ্পাই ভদ্রসমাজে নিষিদ্ধ হয়েছিল তাঁর
জীবিতাবস্থায়। তাঁর সময়ে ‘বাবু’ বলতে নিধুবাবুকেই বোঝাত, একসময় তাঁর টপ্পার নাম
হয়ে গেল ‘নিধুর টপ্পা’। মৃত্যুর কুড়ি-পঁচিশ বছর আগেই তাঁর জীবিত থাকা নিয়ে সংশয়
দেখা দেয়। বাংলা টপ্পার স্রষ্টা হিসেবে শ্রোতাদের কাছ থেকে তিনি যে সমাদর ও সম্মান
পেয়েছিলেন, জীবিতাবস্থায়ই তাঁকে বিস্মৃত হওয়ার মধ্যে বিধৃত আছে অষ্টাদশ-ঊনবিংশ
শতাব্দীর সাংস্কৃতিক ইতিহাস।

নিধুবাবুর জীবন এবং সময় সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন। তাঁর সময়ের এবং পরে
যেসব লেখক তাঁকে নিয়ে লিখেছেন, যেমন – ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, বৈষ্ণবচরণ বসাক, জয়গোপাল
গুপ্ত, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, বরদাপ্রসাদ দে, অবিনাশচন্দ্র ঘোষ, সুশীল কুমার দে
– প্রত্যেকেই তাঁর কবিত্বশক্তি এবং ভাষাজ্ঞানের প্রশংসা করলেও তাঁর জীবনের
ঘটনাবলির পূর্ণাঙ্গ তথ্যসমৃদ্ধ বিবরণ দিতে পারেননি। পলাশীর যুদ্ধেরও ষোলো বছর
আগেকার বাংলায় (১৭৪১ সাল) রামনিধি গুপ্তের জন্ম হয়। একটা রাষ্ট্রের পতন হচ্ছে আর
একটা রাষ্ট্রের জন্ম হচ্ছে – এমনই এক সময়ে জন্ম হয় বলে তাঁকে যুগসন্ধিক্ষণের কবি
বলা হয়। বাংলার মানুষ তখন বর্গির হামলার ভয়ে সদা তটস্থ। জমিদারেরা উচ্ছৃঙ্খল,
স্বেচ্ছাচারী, স্থূল আদিরসের আমোদ-প্রমোদে নিমজ্জিত। কলকাতা তখন নানা কারণে
অস্থির। রাজনৈতিক বিরোধ, দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তর, যুদ্ধ প্রভৃতিতে ক্ষতবিক্ষত। এরকম
এক অস্থির সময়ে ত্রিবেণীর কাছে চাপতা গ্রামে নিধুবাবুর জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন
কলকাতার কুমারটুলীর বাসিন্দা। তিনি পেশায় ছিলেন কবিরাজ। নিধুবাবুর জন্মতারিখ নিয়ে
নানাজনের নানা মত। তবে অষ্টাদশ শতকের তৃতীয় দশকের শেষ অথবা চতুর্থ দশকের প্রথমে
তাঁর জন্ম – এ-কথা অনেকেই বলেছেন। কলকাতাতেই তাঁর শিক্ষা শুরু  এবং শেষ হয়। তাঁর জীবনীকারেরা বলেন, সংস্কৃত,
ফার্সি ছাড়াও একজন পাদ্রি সাহেবের কাছে তিনি ইংরেজিও শিখেছিলেন। সেকালে ইংরেজি
শিক্ষিত বাঙালি ছিল না           বললেই চলে।

দীর্ঘজীবী হওয়ায় (৯৭) নিধুবাবুর বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বহু
পরিবর্তন দেখার সুযোগ হয়েছিল। সময়টা ছিল বাংলায় নবজাগরণের সূচনাকাল। এই নবজাগরণের
কেন্দ্রস্থল ছিল কলকাতা। বাংলায় যখন তথাকথিত নবজাগরণের সূচনা হয়েছে, তখন নিধুবাবু
আশি অতিক্রান্ত। আর ইংরেজি শিক্ষার সূচনাকালে তিনি নববই পার করেছেন। নিধুবাবুর
দীর্ঘ জীবন এই যুগসন্ধিকালের কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং পরিমন্ডলের বহু তথ্যই
আমাদের সামনে তুলে ধরে। যে-কোনো দেশের সংস্কৃতির ওপর প্রভাব পড়ে সে-দেশের সমসাময়িক
সমাজ, রাজনীতি এবং অর্থনীতির। সংস্কৃতি হয়ে ওঠে সমসাময়িক সমাজের প্রতিচ্ছবি।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক অবধি এদেশের সংস্কৃতিতে একটি
মিশ্র সংস্কৃতির ধারা বাংলা তথা কলকাতায় প্রবহমান ছিল। সংস্কৃতিতে স্থূল গ্রাম্যতা
যেমন ছিল, তেমনি সূক্ষ্ম, পরিশীলিত শিল্পের অস্তিত্বও পরিলক্ষিত হয়।  তদানীন্তন কলকাতার বাবুরা সংগীত সংস্কৃতিকে
যেমন তাঁদের বিনোদনের উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, তেমনি তাতে যুক্ত করেছিলেন
নতুন এক মাত্রা। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় সংগীতের ধারাটি বহুমাত্রিক হওয়ার সুযোগ
পেয়েছিল। কবিগান, পক্ষীর দলের কবিতা, পাঁচালি গান, খেউড়, তর্জা ও ‘বাঈ নাচ’ যেমন
ছিল স্থূল রুচির পরিচয়বাহী, তেমনি আখড়াই ও টপ্পা উচ্চাঙ্গ বৈঠকি সংগীতের আসর দখল
করে থাকত। কলকাতার তদানীন্তন কিছু ধনী ব্যক্তি ছিলেন এসব গানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

পলাশীর যুদ্ধের ষোলো বছর আগের বাংলা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের দখল
বিস্তৃত করায় ব্যস্ত। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি বিদ্যমান
বাঙালি সংস্কৃতির ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। তার প্রধান কারণ, ইংরেজের
হিন্দুদের প্রতি অপরিসীম ঘৃণা ও বিদ্বেষ। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র
মজুমদার-সম্পাদিত বইয়ে এর সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়। ‘The
English despised the Hindus as barbarians, with hardly any trace of culture and
civilization, and some even regarded them almost as brutes. (The British
Paramountey and Indian Renaissance, ED. R. C. Majumdar, Bombay, 1965, Part-II,
Page 337-38)’
তথাকথিত ‘রেনেসাঁসে’র আগে বাংলার যে কিছু সাংস্কৃতিক সম্ভাবনা ছিল, সে-কথা অনেকেই
মানতে চান না। নিধুবাবুর গান সেই সম্ভাবনারই অন্যতম প্রমাণ, এই সত্য আজ
সর্বজনস্বীকৃত। প্রায় আশি বছর ধরে লিখে যাওয়া তাঁর গান একবিংশ শতাব্দীতেও কথা এবং
সুরের জাদুতে আধুনিক মনকে আকর্ষণ করে যাচ্ছে। যে-সময়ে তিনি জন্মেছিলেন, গান রচনা
করে বিখ্যাত হয়েছিলেন, প্রচল সংগীতের ধারায় নতুন এক সংগীতধারা সংযোজন করেছিলেন;
সেই সংগীত বিষয়-বৈচিত্র্যে দেব-দেবীর প্রেম থেকে বাস্তব জীবনের নরনারীর মনের
অবদমিত ইচ্ছা, আবেগ, আকাঙ্ক্ষাকে গানের সুরে প্রকাশ করেছিল, – বলা যায় বাংলা
সংগীতের ইতিহাসে তিনি এক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। সমাজ সংস্কার, শিক্ষা সংস্কারের চেয়ে
এটি কোনো অংশে কম নয়।

নিধুবাবুর নামের সঙ্গে ‘টপ্পা’ শব্দটি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে গেছে। টপ্পা
বলতে আমরা আন্দোলনযুক্ত তানবিশিষ্ট গানকে বুঝি। ধ্রুপদ, খেয়ালের মতো টপ্পাও
প্রচলিত সংগীত রীতি থেকে গড়ে উঠেছে। কাপ্তেন উইলার্ভকে উদ্ধৃত করে রাজ্যেশ্বর মিত্র
টপ্পার উৎস সম্পর্কে জানিয়েছেন – ‘টপ্পা ছিল রাজপুতনার উষ্ট্র চালকদের গীত। শোনা
যায়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে যেসব বণিক উটের পিঠে চেপে বাণিজ্য করতে আসত, তারা সারারাত
নিম্নস্বরে টপ্পার মতো একপ্রকার গান গাইতে গাইতে আসত। তাদের গানের দানাদার তানকেই
বলা হতো ‘জমজমা’। আসলে জমজমা শব্দে ‘দলবদ্ধ উষ্ট্র’ বোঝায়। সাধারণভাবে
উষ্ট্রবিহারিদের গানও এই শব্দের আওতায় এসে গেছে। লাহোরে উট বদল হতো। এই লাহোর
থেকেই টপ্পার চলটি ভারতীয় সংগীতে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে।’ (বাংলার গীতিকার ও বাংলা
গানের নানা দিক : রাজ্যেশ্বর মিত্র, বাংলার
টপ্পা, পৃ ১০) সাধারণত বিলম্বিত লয়ে গাওয়া হয়ে থাকে টপ্পা, বড় খেয়াল টপ্পায়
গাওয়া গেলেও সাধারণত গাওয়া হয় না। টপ্পার স্বাভাবিক করুণ রস, প্রেম, প্রধানত
বিরহকে বিষয়বস্ত্ত করে রচিত বলে টপ্পার উপযোগী কিছু বিশেষ রাগও আছে, যেমন – ভৈরবী,
খাম্বাজ, দেশ, সিন্ধু, কালাংড়া, ঝিঁঝিট, পিলু, বারোয়া প্রভৃতি। নিধুবাবু-রচিত গানে
বিরহের প্রকাশ কত মার্জিত, পরিশীলিত; একটি গানের উদাহরণ দিলে তার প্রমাণ পাওয়া
যাবে –

বিধি দিলে যদি বিরহ যাতনা

প্রেম গেল কেন প্রাণ গেল না \

হইয়ে বহিয়ে গেছে প্রেম ফুরায়েছে

রহিল কেবলি প্রেমেরি নিশানা \

নিধুবাবু-রচিত গানে সংক্ষিপ্ত,
মার্জিত ও সহজ-সরল ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে হৃদয়ের গভীর আকুলতা। অষ্টাদশ শতাব্দীর
সাহিত্য থেকে এ-গান একেবারেই ব্যতিক্রমী, আধুনিক, নতুন এক সৃষ্টি।

বাংলায় যখন কবিগান, পাঁচালি, খেউড়, তর্জার যুগ, তখন উচ্চাঙ্গ ঘরানার এই
সংগীত ধারাটির সন্ধান এবং শিক্ষা নিধুবাবু পেয়েছিলেন বাংলা ছেড়ে ছাপরায় গিয়ে।
পুত্রসন্তান এবং পরপর দুই পত্নীর মৃত্যুতে নিধুবাবু স্বাভাবিকভাবেই শোকে ভেঙে
পড়েছিলেন। কর্মক্ষেত্রে অনীহা দেখা দিয়েছিল। শোকে তিনি এতটাই কাতর হয়ে পড়েছিলেন
যে, সেই থেকে তিনি সাংসারিক সুখ সম্বন্ধে একেবারেই আসক্তিহীন হয়ে পড়েন। ঐশ্বর্য,
বৈষয়িক জীবন কোনোভাবেই তাঁকে আর আকর্ষণ করতে পারছিল না। ধরে নেওয়া যেতে পারে, এই
শোক কাটিয়ে উঠতেই সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ এবং আসক্তি বেড়ে যায়। পরপর প্রিয়জনের
মৃত্যুশোকে অধীর হয়ে যে-গানটি তিনি রচনা করেন, সেটি তাঁর একটি বিখ্যাত গান –

মনপুর
হতে আমার হারায়েছে মন

কাহারে কহিব কারে দোষ দিব নিলে কোন জন?

না বলে কেমনে রব বলে বল কী করিব

তোমা বিনে আর সেখানে কাহার গমনাগমন?

অন্যের অগমনীয় জান সে স্থান নিশ্চয়

ইথে অনুমান এই হয় প্রাণ তুমি সে কারণ।

যদি তাহে থাকে ফল লয়েছ করেছ ভাল

নাহি চাহি আমি যদি প্রাণ, তুমি করহ যতন

রাজ্যেশ্বর মিত্রের মতে,
ছাপরাখানার আগে স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পর শোকসংগীত হিসেবে গানটি রচিত।

এটি তাঁর একটি বিখ্যাত গান। যে কবিত্বশক্তি এবং ভাষাজ্ঞানের প্রশংসা
জীবনীকারেরা তাঁর সম্বন্ধে করেছেন গানটিতে, তারও প্রমাণ পাওয়া যায়।

যদি ধরে নেওয়া হয়, ছাপরা যাওয়ার আগেই গানটি রচিত, তাহলে এটাও প্রমাণিত হয়,
টপ্পায় প্রশিক্ষণ পাওয়ার আগেই সংগীতে তিনি যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন।

টপ্পার প্রশিক্ষণ নিধুবাবুর ছাপরাতেই হয়েছিল। মনে করা হয়, কলকাতা ছেড়ে তিনি
যে ছাপরায় গিয়েছিলেন, তার কারণও মৃত্যুশোক। ছাপরায় তিনি মুসলমান এক ওস্তাদের কাছে
উচ্চাঙ্গসংগীত শিখেছিলেন। হিন্দুস্তানি সংগীতে পারদর্শিতা অর্জন করলেও ওস্তাদ
তাঁকে ঘরানার রহস্য শেখাতে ইচ্ছুক নন বুঝতে পেরে তিনি তাঁকে সেলাম জানিয়ে বিদায়
নিয়ে ছাপরা ছেড়ে চলে আসেন। কলকাতায় ফিরে নিজেই বাংলা ভাষায় রাগরাগিনী-নির্ভর গান
রচনার সিদ্ধান্ত নেন। ‘মিঞা সাহেবকে সেলাম করিয়া কহিলেন, আমি তোমারদিগের জাতীয়
যাবনিক গীত আর গান করিব না, আপনিই বঙ্গভাষায় হিন্দি গীতের অনুবাদপূর্বক
রাগরাগিনী সংযুক্ত করিয়া গান করিব।’ (বিস্মৃত দর্পণ নিধুবাব/ বাবু বাংলা/ গীতরত্ন,
রমাকান্ত চক্রবর্তী, উদ্ধৃতিটি কবিজীবনী
গ্রন্থ থেকে গৃহীত) বঙ্গভাষায় গান রচনার পেছনে তাঁর কোনো ভাষাপ্রেম কাজ করেনি।

‘নানান দেশে নানান ভাষা’ গানটি তিনি যেসব ধনী শৌখিন বাবুর বৈঠকে সংগীত
পরিবেশন করতেন, তাঁদের কথা মাথায় রেখেই রচনা করেছিলেন। এই একটি মাত্র গান ছাড়া আর
অন্য কোনো গানে তাঁর ভাষাপ্রেম কিংবা স্বদেশপ্রেম প্রকাশিত হয়নি।

নিধুবাবুর গানের বিষয় প্রেম, প্রণয়, বিরহ। বিরহই প্রধান। মানবিক বোধের
উদ্বোধন সংগীতে নিধুবাবুই প্রথম সূচিত করলেন। সমাজ যখন অস্থিরতায় আক্রান্ত,
সংগীত-সংস্কৃতিতে স্থূলতা, আদিরসের আয়োজন, শিক্ষার প্রসার কিংবা চর্চা নেই,
কোম্পানির মুখোশের আড়ালে ইংরেজ তার ক্ষমতা, দখলদারি বিস্তৃত করার পরিকল্পনায়
ব্যস্ত, বাঙালি তথা ভারতীয়দের সম্পর্কে তাদের অপরিসীম ঘৃণা আর অবহেলা, অষ্টাদশ
শতকের বাংলায় নবজাগরণের সূচনা কিংবা ধারণ – কারো মনেই জাগেনি, সেরকম বন্ধ্যা একটি
সময় নিধুবাবু তাঁর রচিত সংগীতের মধ্য দিয়ে নরনারীর নিয়ন্ত্রিত জীবনের সংগুপ্ত
আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রেম-বিরহ, দুঃখ-বিষাদের কথা গানের সুরে পরিবেশন করে জয় করে নিলেন
মানুষের মন। যে-মন বন্দি থাকত শুধু মনের মধ্যে, যে-মনের আশা, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা
মনের মধ্যেই মরে যেত, শুধু নিভৃতে মনে মনে কাঁদার অধিকার ছিল, মনের সেই মনস্তত্ত্বকে
প্রেমের গান রচনার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর গানের বিষয় করলেন। আশি বছর পরে
সমাজ-সংস্কারের ক্ষেত্রে রামমোহন যে-কাজের সূচনা করেছিলেন, আশি বছর আগেই রামনিধি
গুপ্ত সংগীতের ক্ষেত্রে সেই কাজটির সূচনা করলেন। সংগীতের দুরবস্থা তাঁর বোধকে
বিচলিত করেছিল কি না, তা জানার উপায় নেই। তবে তিনি সংগীতকে যে ভালোবেসেছিলেন,
অাঁকড়ে ধরেছিলেন, সৃজনশীলতা এবং পরিশীলিত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সংগীত-সংস্কৃতির
উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। নিধু গুপ্ত তাঁর সময়ের চেয়ে কতটা এগিয়েছিলেন,
তাঁর রচিত গানই তার প্রমাণ।

ধর্মের প্রভাবমুক্ত নিধুবাবুর গানে মানবিক প্রেম সম্পর্কে ব্যক্তিগত
অনুভূতির যে-প্রকাশ ঘটেছে, এ-কথা মনে করা অসংগত হবে না যে, তার আড়ালে তাঁর
দাম্পত্য জীবন, স্ত্রী-বিয়োগব্যথা, তাঁর শিক্ষিত, পরিশীলিত জীবনচর্যার প্রভাব
নিশ্চয় ছিল। ভেতরে জমে থাকা কোনো দুঃখবোধই হয়তো তাঁকে মিলনের চেয়ে বিচ্ছেদের গান
গাইতে বেশি উৎসাহিত করত। যদি ধরে নিই, ব্যক্তিগত দুঃখবোধ থেকে উৎসারিত তাঁর গান,
সেই গানই আগলভাঙার গান হয়ে এলো। সমাজ-সংস্কৃতির বিশেষ এক সময়ে তাঁর গান বাংলার
সংগীত-সংস্কৃতিতে যে-পরিবর্তন নিয়ে এলো, তিনি নিজে বোধহয় সে-ব্যাপারে অবহিত ছিলেন
না। অনেকে মনে করেন, নিধুবাবুর টপ্পা বিশেষ এক পরিমন্ডলে, সমঝদার শ্রোতাদের বিশেষ
রুচির প্রভাবেই রচিত হয়েছিল। সাধারণ শ্রোতাদের কথা ভেবে তিনি তাঁর গান রচনা
করেননি। বাণী ও সুরের গভীরতায় রবীন্দ্রনাথের গান যেমন হয়ে উঠেছে অভিনব এক
সৃষ্টিধারা, তেমনিভাবেই সমসাময়িক সমাজের প্রচলিত সংগীতকে একেবারেই আমলে না এনে
নিধুবাবু সৃষ্টি করলেন সংগীতের নতুন এক ধারা। সংগীতকে ‘হালকা’, ‘চটুল’ কিংবা লঘু
স্থূলরুচির করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁর শিক্ষা, সংগীতের বোধ তাঁকে উদ্বুদ্ধ
করেছিল প্রচলিত ‘কুশ্রিতা’ এবং ‘গ্রাম্যতা’ থেকে সংগীতকে মুক্ত করে সুর ও বাণীর মধ্য
দিয়ে মানুষের মনের অব্যক্ত ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, বিরহ, বিষাদ, ভালোলাগা, ভালোবাসার
অনুভবের প্রকাশ ঘটানো। প্রচলকে অগ্রাহ্য করে নতুন কিছু সৃষ্টির পেছনে থাকে সৃজনশীল
মনের অদম্য ইচ্ছা। ব্যক্তিমানুষটি ছিলেন চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের
অধিকারী। গম্ভীর প্রকৃতির দৃঢ়চেতা মানুষটি ধনী পৃষ্ঠপোষকদের বিরোধিতা যেমন করেননি,
তেমনি তাদের মোসাহেবিও করেননি। তাঁর সঙ্গে যাঁরা অপ্রিয় ব্যবহার করেছেন, তাঁদের
সঙ্গেও তিনি বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখতেন। তদানীন্তন কলকাতার অনেক শৌখিন ধনী, এমনকি
বর্ধমানের মহারাজা তেজেশচন্দ্র কলকাতায় এসে তাঁর গান শুনতে যেতেন। তিনি নিজে কারো
কাছে যেতেন না। পরিণত বার্ধক্যেও সুস্থ-সমর্থ শরীরে মৃত্যুর মাত্র এক বছর আগেও
তিনি গান লিখে গেছেন। রাজ্যেশ্বর মিত্র সেকালের বাবুদের বৈঠকি আসরে নিধুবাবুর
সংগীত পরিবেশনের অপূর্ব একটি বর্ণনা দিয়েছেন – ‘দেড়শো বছরেরও কিছু আগেকার কলকাতা।
শোভাবাজারের এক প্রসিদ্ধ আটচালায় সন্ধ্যার আসরে এক প্রিয়দর্শন বর্ষীয়ান ভরাট গলায়
গান ধরেছেন সিন্ধু-কাফিতে। করুণ প্রেমের গান – টপ্পার আন্দোলনের সঙ্গে হৃদয়াবেগ
উঠছে উচ্ছলিত হয়ে। পেছনে দাঁড়িয়ে যে-ভৃত্য হাওয়া করছে, সে-ও থেকে থেকে আনমনা হয়ে
পড়ছে, পাখা আসছে ঝিমিয়ে। ফরাসের ওপর গালচে, তার ওপর তাকিয়া ঠেসান দিয়ে শহরের
গণ্যমান্য বাবুদেরও সেই অবস্থা। মাথা দুলে দুলে উঠছে, গুড়গুড়ির নলটা হাতে ধরা,
কিন্তু তামাকের চেয়ে আরো বড় নেশায় তখন মন মশগুল। মৃদুকণ্ঠে আওয়াজ হচ্ছে – ‘বাহা
বাহা, বহুৎ আচ্ছা।’  দু-চার লাইনের ছোট্ট
গান, কিন্তু তার ভাব, তার ব্যাপকতা অনেকখানি। নানা কাজে, নানা তানে, নানা বিস্তারে
যখন সে-গান শেষ হল, তখন শ্রোতাদের আর সাধুবাদ দেবার ভাষা নেই – শুধু চোখে জল টলমল
করছে। এমনি ক্ষমতা ছিল নিধুবাবুর, আর এমনি ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব। তাঁর গানে ছিল
কাঁটা, আর সেই কাঁটার জ্বালায় জ্বলতে জ্বলতে এক এক সময় সন্ধান পাওয়া যেত ফুলের –
সকল কাঁটা ধন্য করা হৃদয় রক্তে রঞ্জিত টকটকে লাল সেই ফুল।’ (বাংলার গীতিকার ও বাংলা গানের নানাদিক :
রাজ্যেশ্বর মিত্র, জিজ্ঞাসা, পৃ ২১)।

নিধুবাবুর গানের বিমুগ্ধ এই শ্রোতারা ছিলেন উত্তর কলকাতার ধনী, শৌখিন
শ্রেণির মানুষ। ইংরেজ আগমনের আগেই উত্তর কলকাতার চিৎপুর-শোভাবাজার অঞ্চলে একটি
বিশেষ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল ছিল। G. A. Grierson একেই ‘Calcutta Civilisation’ বলে তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন। (The Modern Vernacular Literature of
Hindustan, 1889
) উত্তর
কলকাতার এই এলাকায় সমকালীন ধনী, অভিজাত, সম্ভ্রান্ত রাজা, মহারাজা, দেওয়ান,
জমিদার, মুৎসুদ্দি, বণিক, চাকুরে, গায়ক, ওস্তাদদের বসবাস ছিল। ইংরেজ আগমনের প্রথম
যুগে উত্তর কলকাতার চেহারাটা ছিল এরকম। কলকাতায় নিধুবাবুর কর্মক্ষেত্র ছিল
চিৎপুর-শোভাবাজার অঞ্চলে। ছাপরা থেকে নিধুবাবু কলকাতায় ফিরে আসার আগে বিনোদনের
পরস্পরবিরোধী দুটি ধারা প্রচলিত ছিল, এ-কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। ধনী,
সম্ভ্রান্ত, বড়লোকেরা ‘স্থূল গ্রাম্যতা’ যেমন অাঁকড়ে ছিলেন, একই সঙ্গে ‘সূক্ষ্ম
সু-সংস্কৃত’ শিল্পের সমর্থকও ছিলেন তাঁরাই। শহুরে সংস্কৃতিতে ‘গ্রাম্যতা’ এবং
‘সূক্ষ্ম শিল্পবোধে’র সংমিশ্রণ প্রচলিত ছিল। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা দুই ধারা
উপভোগেই অভ্যস্ত ছিলেন। হয়তো তাঁরা পার্থক্যটা বুঝতেন না; বিনোদন, আনন্দ উপভোগই
ছিল তাঁদের কাছে প্রধান। এ থেকে তৎকালীন সম্ভ্রান্ত শ্রেণির মানসিক রুচির পরিচয়টিও
স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এসব সম্ভ্রান্ত শ্রেণির মানুষই ছিলেন নিধুবাবু, কালী মির্জা,
শ্রীধর কথকের মতো উচ্চাঙ্গের শিল্পীদের রাগসংগীতের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। কলকাতায় ফিরে
এসে নিধুবাবু নিজে হিন্দুস্তানি সংগীতের আদর্শে একটি সংগীতগোষ্ঠী গঠন করে নিজেই
সেটা পরিচালনা করতেন। এই সংগীতগোষ্ঠী সমসাময়িক কলকাতার শ্রোতামহলে যথেষ্ট পরিমাণে
বৈদগ্ধ্য ও শালীনতা সৃষ্টি করেছিল, গান ও কবিতাবিষয়ক রুচিবোধ যথেষ্ট উন্নত করেছিল।
আখড়াইয়ের দিন শেষ হয়ে আসছিল। আখড়াইকে ভেঙে তৈরি হলো হাফ-আখড়াই। আখড়াই উচ্চাঙ্গের
অন্তর্ভুক্ত হলেও তার ভাষা-গায়কি ছিল একেবারে ভিন্ন। একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে
দুজন-তিনজনে পালা কর রাগরাগিনীভিত্তিক এই গান ঢোল, তানপুরা, বেহালা, সেতার,
মন্দিরা প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র সহযোগে পরিবেশন করা হতো। এ-গানেরও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন
ধনী অভিজাতরাই। নিধুবাবুর গান সব শ্রেণির জন্য – ধনী, সংস্কৃতিমান এবং সাধারণ
শ্রোতা সবাই সমানভাবে উপভোগ করতে পারতেন। তাঁর একটি বিখ্যাত গানের উদ্ধৃতি দিলে
বিষয়টি বোঝার সুবিধা হবে –

নানান দেশে নানান ভাষা

বিনে স্বদেশীয় ভাষা পূরে কি আশা

কত নদী সরোবর

কিবা ফল চাতকীর

ধারাজল বিনে কভু ঘুচে কি তৃষা?

মনে রাখতে হবে, নিধুবাবু
যখন গান লিখছেন তখনো বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্যের
যুগ চলছে। বৈষ্ণব কবিতার রাধাকৃষ্ণের প্রেম দীর্ঘদিন সংগীতের বিষয় হয়ে ছিল। মঙ্গলকাব্য, মৈমনসিং গীতিকা কিংবা ভারতচন্দ্রের
কাব্যের নায়ক-নায়িকার শারীরিক যোগাযোগের বিলাস ও ছলাকলার আড়ালে হৃদয় নামক বস্ত্তটি
চাপা পড়ে গিয়েছিল। সে-যুগের শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষ এবং শ্রোতার কাছে হৃদয়ের
আকুতি, আবেদন, ইচ্ছা, আনন্দ, প্রেম, বিরহ মূল্যহীন ও অর্থহীন ছিল। শরীরের ভেতরে
হৃদয়ের অস্তিত্ব ছিল উপেক্ষিত; প্রেম, প্রণয়, বিরহ, ভালোলাগা, ভালোবাসা সংগীতে
শুধু নয়, সে-যুগের মানুষের এ-ব্যাপারে সংকীর্ণ অজ্ঞতা ছিল। যদিও রাধাকৃষ্ণের
প্রেমের ব্যাপারে উচ্ছ্বাস-আনন্দ কবিতায়-গানে প্রকাশিত হয়েছে। রাধাকৃষ্ণ
মানব-মানবী নয়, দেব-দেবী বলেই হয়তো তাঁদের প্রেমোপাখ্যান প্রকাশে কোনো নিষেধাজ্ঞা
ছিল না। বাস্তব জীবনে নর-নারীর হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক কবিতায় কিংবা সংগীতে যে প্রকাশ
করা যায়, এ-ধারণা কারো ছিল না। নিধুবাবু যখন সংগীত রচনা শুরু করেন, তখনো বাংলায়
ছোটগল্প, উপন্যাস কিংবা গীতিকাব্য সার্থকভাবে রচিত হয়নি। পনেরো বছর বয়সে ইংরেজের
সঙ্গে নবাবি সৈন্যের যুদ্ধ দেখা নিধুবাবু সময়ের চেয়ে কতটা এগিয়ে ছিলেন, তাঁর গানের
ভাষা এবং প্রকাশভঙ্গি কতটা আধুনিক ছিল, তাঁর রচিত গান তার প্রমাণ। একটি গানে
টপ্পার করুণ সুরে প্রেমের প্রকাশ ঘটেছে এভাবে –

কত ভালোবাসি তারে, সই! কেমনে বুঝাব

দরশনে পুলকিত মম অঙ্গ সব।

যতক্ষণ নাহি দেখি রোদন করয়ে অাঁখি

দেখিলে কি নিধি পাই, কোথায় রাখিব।

ঊনবিংশ শতকে বাঙালি শিক্ষিত সমাজের মনকে নিধুবাবু-রচিত বাংলা গান যে
গভীরভাবে আকর্ষণ করেছিল, তার একটি প্রধান কারণ তাঁর গানের বিষয়বস্ত্ত। তাঁর গানে
উঠে এসেছে সে-যুগের নাগরিক সমাজের প্রণয়ঘটিত জীবনের প্রকৃত চিত্র। প্রেমকে গানের
বিষয় করে নিধুবাবু সাহসের পরিচয়ই শুধু দেননি, সমসাময়িক সমাজের একটি দিকের প্রকৃত
চিত্রও তুলে ধরেছেন। দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রথাকে নিধুবাবু যে ভেঙে দিলেন, এটা তাঁর
সাহসিকতার পরিচয়। এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। টপ্পার সুরে তিনি গাইলেন –

প্রেম মোর অতি প্রিয় হে, তুমি আমারে তেজো না,

যদি রাত্রিদিন কর জ্বালাতন ভালো সে যাতনা।

ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা
সংগীতের বৈশিষ্ট্য সুরে কিংবা গায়কিতে নয়, এই বৈশিষ্ট্য তাঁর বিষয়বস্ত্ত,
কাব্যবস্ত্তর মধ্যে নিহিত। সুরসর্বস্বতার গন্ডি থেকে বেরিয়ে এসে সংগীত এই প্রথম
মানুষের মনোজগতের গতিবিধি সংগীতে গেঁথে তুলল। ব্যক্তি-স্বাধীনতার
স্পৃহা-নিয়ন্ত্রিত জীবনের গন্ডি ছেড়ে সংগীতে মুক্তির স্বাদ পেল। ব্যক্তিজীবন থেকে
সংগীত উপকরণ সংগ্রহ করতে শুরু করল। ব্যক্তিমনের যেসব সূক্ষ্ম অনুভূতি, সেসবই
সংগীতের বিষয় হিসেবে প্রাধান্য পেতে লাগল।

সাহিত্য যেমন সময়ের প্রতিচ্ছবি, সংস্কৃতিও তাই। সংস্কৃতির প্রধান ধারা
সংগীতে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর নগরজীবনের মানবিক
সম্পর্কগুলো, যা এতদিন অবগুণ্ঠিত ছিল অন্তঃপুরের আড়ালে, সংগীতের সুরে সেসব
সম্পর্কের প্রকাশ ঘটতে লাগল। অনিবার্যভাবে প্রেম প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠল। মধ্যযুগের
মঙ্গলকাব্যে আমরা পেয়েছি সামাজিক
ও সাম্প্রদায়িক মানুষের ইতিহাস, ব্যক্তিমানুষের মুক্তচিন্তার কোনো প্রতিফলন সেখানে
ছিল না। মধ্যযুগের শেষভাগে রচিত মৈমনসিং
গীতিকায় প্রেম-প্রণয়ের ছবি পাওয়া গেলেও তা তদানীন্তন সমাজের রীতিনিরপেক্ষ
এবং নিয়তির অন্ধ অনুশাসন মেনে চলেছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে সংগীত-রচয়িতারা প্রধানত রাধাকৃষ্ণের
প্রেমলীলাকে সংস্কার করে তার নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে নর-নারীর সম্পর্ককে তাঁদের গানের
বিষয়বস্ত্ত করে তুলতে লাগলেন। একে অনুসরণ করেই নাগরিক জীবনে নর-নারীর পারস্পরিক
হৃদয়ঘটিত সম্পর্ককে তদানীন্তন সংগীত-রচয়িতারা তাঁদের গানের বিষয়বস্ত্ত করে তুললেন।
সংগীতের বিষয়বস্ত্তর ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন এবং প্রচলিত রীতিবিরুদ্ধতাকে সংগীতের
আধুনিকতার সূচনা বলা যেতে পারে। সংগীত-সংস্কৃতির এই পরিবর্তন সম্পূর্ণভাবে ছিল
নগরকেন্দ্রিক। যে-স্থূলরুচি এবং গ্রাম্যতা বাংলা সংগীতকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে
ছিল, নর-নারীর হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক এবং প্রেম সে-স্থানটি দখল করে নিল। পৌরাণিক
প্রেমের রীতিনীতি পরিহার করে মৌলিক প্রেমকে গানের বিষয়বস্ত্ত করে তোলার একক
কৃতিত্ব বলা যায় নিধুবাবুরই প্রাপ্য। প্রেম কত বিচিত্র, কত সূক্ষ্ম, তার গতিবিধি,
তার স্বরূপ অনুধাবন করে নিধুবাবু প্রথম তাকে তাঁর গানে প্রয়োগ ঘটালেন। দু-একটি
উদাহরণ দিলে সে-যুগে প্রেমের গানের রচয়িতা হিসেবে তাঁর দক্ষতা এবং শ্রেষ্ঠত্বের
প্রমাণ পাওয়া যাবে।

১. ভালবাসিবে বলে ভালবাসিনে

আমার স্বভাব এই তোমা বই আর জানিনে

বিধু মুখে মধুর হাসি দেখতে বড় ভালবাসি

তাই তোমারে দেখতে আসি দেখা দিতে আসিনে।

 

২. মিলনে যতেক সুখ মননে তা হয় না।

প্রতিনিধি পেয়ে সই নিধি ত্যজা যায় না \

চাতকীর ধারাজল তাহাতে হয় শীতল

সেই বারি বিনা আর অন্য বারি চায় না \

 

৩. প্রাণ তুমি বুঝিলে না আমার বাসনা।

ওই খেদে মরি আমি, তুমি তা বুঝ না \

হৃদয় সরোজে থাক, মোর দুঃখ নাহি দেখ।

প্রাণ গেলে সদয়েতে, কী গুণ বল না \

 

৪. তোমার তুলনা তুমিই প্রাণ এ মহীমন্ডলে।

গগনে শারদ শশী জিনেছ কলঙ্ক ছলে \

সৌরভে আর গৌরবে, কে তব তুলনা হবে,

অন্যের কি সম্ভব, যেমন গঙ্গাপূজা গঙ্গাজলে \

প্রেম সম্পর্কে যতকিছু
যতভাবে বলা যায়, তার প্রায় সবকিছুই নিধুবাবু তাঁর গানে বলে গেছেন। রাধাকৃষ্ণের
প্রেমলীলা থেকে পরিবর্তিত হয়ে তাঁর গানে ব্যক্তিমানুষের স্বাতন্ত্র্যবোধ স্থান করে
নিয়েছে। ‘ময়রা মুচি থেকে বসু-ঠাকুর, নিম্নহিন্দু থেকে বর্ণহিন্দু গায়কের দলে কোনো
ভেদ নেই, বৈষম্য নেই। কারণ, সকলেই এক দুঃখের ও অভিজ্ঞতার অংশীদার। উনিশ শতকের
বিপুল মৌনবাক সংগীতের মধ্যেই সেকালের সমাজজীবনের সেই অবরুদ্ধ হৃদয়বেদনার ইতিহাস
নিহিত আছে। সমাজ শৃঙ্খলা যত শৃঙ্খল হয়ে হৃদয়বৃত্তিকে লাঞ্ছিত করেছে, গানের সংখ্যা
তত বৃদ্ধি পেয়েছে।’ (বাংলা কাব্যসংগীত ও
রবীন্দ্রসংগীত : অরুণ কুমার বসু, পৃ ৮৩) উনিশ শতকে নারীর অবস্থান ছিল
অন্তঃপুরে। উনিশ শতকের সমাজ নারীর সামাজিক অধিকার স্বীকার করেনি। স্বাধীন
নির্বাচনের অধিকার তার ছিল না। সংগীতের বিষয় হিসেবে যে-প্রেম উঠে এলো, তা
ধনতান্ত্রিক সমাজের ব্যক্তিত্ব জাগরণের উপলব্ধির প্রথম আত্মপ্রকাশ এবং নারীর
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধের প্রথম উচ্চারণ। ব্রজাঙ্গনা
কাব্যে রাধা প্রেমের স্বাধীনতার সংজ্ঞা দিলেও তার জীবনে তার প্রয়োগ ছিল না। সকাতরে
কেঁদে তাকে বলতে হয়েছিল, ‘রাধিকার বেড়ি ভাঙ এ মম মিনতি।’ প্রেম পাপ নয়, প্রেম
সমাজবিরোধী অসামাজিক, অনৈতিক কোনো বিষয় নয়। সংগীতে প্রেমের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি
নিধুবাবুর গানেই প্রথম উচ্চারিত হলো। উনিশ শতকের কাব্যসংগীতের যে-বৈশিষ্ট্য
ব্যক্তিত্বের স্বাধীন প্রকাশ, মনের স্বাধীনতা, নিধুবাবুর গানে প্রথম তার শৈল্পিক
এবং সংকোচহীন প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর গানে মনের ভালোলাগা, মন্দলাগা, নিবেদন, সমর্পণ,
গ্রহণ, প্রত্যাখ্যান, হৃদয়ের আবেগ, অনুভবের প্রকাশ তাঁকে করে তুলেছে বাংলায় প্রেম
এবং প্রণয় সংগীতের প্রথম সার্থক স্রষ্টা।

নিধুবাবুর সেই গানই তাঁর জীবিতাবস্থায় নিষিদ্ধ হয়ে গেল। ‘নিধুবাবুর টপ্পা
ভদ্রসমাজে গাইতে মানা’ – এই স্লোগান নিয়ে রক্ষণশীলের দল তাঁর বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ
হলো। সমাজ-সংস্কার এবং শিক্ষার সূচনালগ্নে সমাজের প্রভাবশালী অংশ বিভক্ত হলো। একদল
সনাতনকে অাঁকড়ে থাকতে চাইলেন। তাঁরা নিধুবাবুর গানের বিষয় এবং গায়কিতে অশ্লীলতা
খুঁজে পেয়ে তাঁকে বর্জনের পক্ষে মত দিলেন। অন্যদল ধ্রুপদাঙ্গের গানে মনঃসংযোগ
করলেন। মাঝখান থেকে বাংলা সংগীতের অপূর্ব ঐশ্বর্যময় ধারাটি বিলুপ্ত হতে বসল।

বাঙালি রক্ষণশীলতা ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে প্রতিক্রিয়াশীলতায় পরিণত হয়।
রক্ষণশীলরা সমাজ-সংস্কার তথা নবজাগরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। সতীদাহ
নিবারণ, বিধবা বিবাহ, কৌলীন্য প্রথা টিকিয়ে রাখা – কোনোকিছুই তাদের বিরোধিতা থেকে
বাদ গেল না। তাদের এই বিরোধিতার মূলে ছিল নানা রকম কায়েমি স্বার্থ নষ্ট হওয়ার ভয়।
রক্ষণশীল এসব বাঙালিই আবার ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয়-চতুর্থ দশকে দেশীয় শিল্পধারাকে
বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াসে গড়ে তুলেছিলেন ‘গৌড়ীয় সমাজ’ বা ‘The
Hindu Literary Society’।
তাদের একবারও মনে হলো না যে বাংলা টপ্পা দেশীয় সংগীত-ঐতিহ্যেরই ধারক। দেশীয়
সংগীত-ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বাঙালির সংগীত-সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে। অশ্লীলতার
অভিযোগে আক্রান্ত হলো নিধুবাবুর গান। শুধু গান নয়, শিক্ষিত, সুদর্শন,
ব্যক্তিত্ববান, বর্ষীয়ান মানুষটি নৈতিক স্খলনের অপরাধেও অভিযুক্ত হলেন। রাজ্যেশ্বর
মিত্র তাঁর বাংলার গীতিকার ও বাংলা
গানের নানাদিক বইয়ে লিখেছেন – ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে কিছু সম্ভ্রান্ত
বাঙালি ‘টপ্পা দমন’ আন্দোলন শুরু করেন। এই… আন্দোলনে একবারও ভেবে দেখা হয়নি যে
এসব গানে প্রকৃত সম্পদ কতখানি আছে।… হিন্দু সমাজের পৌত্তলিকতাবিরোধী দল সুকৌশলে
সুকুমার প্রণয়-সংগীত পুত্তলিকাকে অপসারিত করে সেখানে নিরাকার-নির্বিকার ধ্রুবপদকে
প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।’ এরই পরিণতিতে তদানীন্তন সকল সংগীত সংকলন থেকেই প্রায়
তাঁর গান বাদ দেওয়া হলো। পৌত্তলিকতাবিরোধী দল শুধু নয়, হিন্দু রক্ষণশীলেরাও
অশ্লীলতার অভিযোগ এনে নিধুবাবুর টপ্পার বিরোধিতা করলেন। যে নিরাকার-নির্বিকার
ধ্রুবপদকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিধুবাবুর গানকে অপসারিত করা হলো, সে-গান কিন্তু
টপ্পার মতো জনপ্রিয় হতে পারল না। আত্মীয় সভায় রামমোহন নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনার
জন্য সংগীতের প্রচলন করেছিলেন। সেখানে ধ্রুপদ পরিবেশিত হতো। ধ্রুপদের মন্থর চালে
গম্ভীর ভাব, শান্ত, ভক্তি রসের বিষয়টি প্রাধান্য পেত। আবেগহীন, ভারী ভারী শব্দ,
নির্বিকার ধ্রুবপদে বাঁধা প্রার্থনা সংগীতে মানুষের মন বেশিদিন স্থির থাকতে
পারেনি। নিধুবাবু নিজেও একটি ব্রহ্মসংগীত রচনা করেছিলেন। তাঁর রচিত ব্রহ্মসংগীতটি
এবং একটি প্রেমসংগীত পাশাপাশি রাখলে এই পার্থক্যটা স্পষ্ট হবে। বেহাগ রাগে আড়া
তালে নিবদ্ধ ব্রহ্মসংগীতটি হলো –

পরমব্রহ্ম
ত্বং পরাৎপর পরমেশ্বর।

নিরঞ্জন
নিরাময়, নির্বিশেষ সদাশ্রয় আপনাআপনি হেতু,

বিভু
বিশ্বধর \

সমুদয়
পঞ্চকোষ, জ্ঞানাজ্ঞান যথাবাস, প্রপঞ্চ ভূতাধিকার। অন্নময়, প্রাণময়, মানসবিজ্ঞানময়,
শেষেতে আনন্দময়,

প্রাপ্ত
সিদ্ধ নর।

নিধুবাবুর
একটি প্রেমসংগীত –

তুমি
যা বুজিলে প্রাণ সেই ভালো ভালো।

আমার
বচনস্বরূপ কখন বোধ নাহি হ’ল হ’ল \

এতেক
করি যতন, তবু না পাইলেম মন,

আপনারি
মন, দিয়াছি যখন, উপায় কি বল বল।

(গীতরত্ন)

‘তুমি যা বুঝেছ সেটাই সব
হলো, আমার কথা বেঝার চেষ্টা তুমি করলে না কখনো, এত কষ্ট করেও তোমার মন পেলেম না,
আমার মন কিন্তু তোমায় আমি দিয়ে বসে আছি।’ প্রেমের এমন অকপট প্রকাশ সে-যুগে
নিধুবাবুর গানেই কেবল সম্ভব ছিল। টপ্পার দানাদার তানে প্রেমের করুণ ব্যাকুলতা
যেভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব, ধ্রুপদে সেটা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তা ছাড়া তাঁর
গানে যে ‘প্রাণ’, ‘মন’ শব্দগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ – একে অরুণ কুমার বসু তাঁর বাংলা কাব্যসংগীত ও রবীন্দ্রসংগীত
গ্রন্থে ‘আধুনিক মানুষের মন’ বলেই উল্লেখ করেছেন। বাংলা সাহিত্যে গীতিকবিতায়
বিহারীলালের আবির্ভাবের আগেই বাংলা গানে এই মনোময়তা নিধুবাবুর গানেই আমরা প্রথম
পাই। রাজ্যেশ্বর মিত্র লিখেছেন, নিধুবাবুর গানের সংকলন অনেক আছে, কিন্তু খুঁজলে
কোথাও তাঁর একটিও অশ্লীল গান পাওয়া যাবে না, বরং তিনি নিজেই অশ্লীলতাকে তাঁর কাব্য
থেকে পরিহারের ব্যাপারে সর্বদা সচেতন ছিলেন। সংগীতে যে মার্জিত, পরিশীলিত ধারার
সৃষ্টি তিনি করেছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর সাহিত্যে, তার দেখা মেলা ভার।

সময়ের সঙ্গে মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়। সমাজের নৈতিক অধঃপতনের ফলে
সমাজ-সংস্কারের স্রোত প্রবল হয়ে ওঠায় সংযমের কঠোরতাও প্রবল হলো। উচ্চ শ্রেণির
অভিজাতরা প্রেম, প্রণয়কে পরিত্যাজ্য পদার্থ বলে মনে করতে লাগলেন। রুচির পরিবর্তনের
ফলে পুরনো যা কিছু, তার প্রতি অবজ্ঞা আর অবহেলা দেখা দিল। ক্রমশ নিধুবাবু এবং তাঁর
গান সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ কমে আসতে লাগল। জীবদ্দশায় তাঁর গান বিলুপ্ত প্রজাতির
মতো হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কেউ কেউ অন্য কারণ দেখিয়েছেন। নিধুবাবুর গান বিরহ-মিলনের
গান, তাঁর গানের শ্রোতা ছিল নব্য ধনী সম্প্রদায়, তারা তাঁর গান সমাদরে গ্রহণ করলেও
তাদের কাছে এ-গান ছিল শুধুই বিনোদনের উপকরণ। অতএব, যে বিশেষ পরিবেশে, বিশেষ একটি
শ্রেণির চিত্তবিনোদনের জন্য নিধুবাবু তাঁর গান লিখেছিলেন, সেই পরিবেশ এবং শ্রেণির
ক্ষয়িষ্ণুতার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর খ্যাতি এবং প্রভাব ম্লান হতে থাকে। তাঁর প্রতিভার
সীমাবদ্ধতা ছিল, এ-কথাও কেউ কেউ বলেছেন। যুগসন্ধিক্ষণের কবি হয়েও তাঁর গানে
সামাজিক দায়বদ্ধতার কোনো ছবি ফুটে ওঠেনি। শুধু প্রেম সম্পর্কেই ছোট ছোট টপ্পা
লিখেছেন তিনি। সময়ের সংকটকালে কোটি কোটি মানুষের জীবনে যে-দুর্দশা, হতাশা – তার
কোনো ছাপ তাঁর গানে পড়েনি। তাঁর প্রেমের গানে প্রচল নির্ভরতার কথাও বলেছেন কেউ
কেউ। এরকমই হয়। ভারতীয় কাব্যসাহিত্যের ইতিহাস ঘাঁটলে এমন নজির অনেক পাওয়া যাবে।
জনপ্রিয়তার স্রোতে যে-কবি একদা ভেসেছিলেন বর্জনের বিরুদ্ধস্রোতে, তিনিই আবার
বিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে গেলেন। স্থূলরুচি, স্থূলভাষায় বিদ্রূপ করে তাঁকে নিয়ে
লেখা হলো কবিতা –

এখনো গেল না বেটীর লুকিয়ে জল খাওয়া।

জুতোর চোটে ঘুচাব তোর নিধুর টপ্পা গাওয়া \

(দাশরথি রায়)

রাজ্যেশ্বর মিত্র
লিখেছেন : ‘টপ্পা আমাদের গৌরবের বস্ত্ত এই কারণে যে, টপ্পায় বাঙালি শিল্পীর
স্বকীয়তার পরিচয় যথেষ্ট পাওয়া যায়।’ এ-কথা বলে তিনি নিশ্চয় সে-যুগের তিন প্রধান
টপ্পা রচয়িতা – নিধুবাবু, শ্রীধর কথক এবং কালী মির্জাকেই বোঝাতে চেয়েছেন। এঁদের
রচনা এত পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দর, যা বাংলা সাহিত্যে খুঁজলে খুব কমই পাওয়া যাবে।
তিনজনের মধ্যে নিধুবাবুর শ্রেষ্ঠত্বকে সকলে স্বীকার করে নিয়েছেন। সাহিত্য কিংবা
সংগীত যেদিক থেকেই দেখি না কেন, এ-কথা স্বীকার করতেই হবে অষ্টাদশ শতাব্দী তর্জা,
খেউড়, পক্ষীদলের গান, কবিগানের যুগে নিধুবাবু একটা নতুন পথের নির্দেশ দিয়ে গেছেন।
বাংলায় সংগীতের দুর্দিনে নিধুবাবু সংগীতের সংস্কারে উদ্যোগী হয়েছিলেন। তিনি শুধু
টপ্পা রচনা করেননি, আধুনিক বাংলা কাব্যসংগীতের সূচনাও তিনি করে গেছেন।

 

সহায়ক গ্রন্থসূচি

১.   রাজ্যেশ্বর
মিত্র, বাংলার গীতিকার ও বাংলা গানের
নানাদিক, জিজ্ঞাসা।

২.   অরুণকুমার
বসু, বাংলা কাব্যসংগীত ও রবীন্দ্রসংগীত,
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।

৩.  রমাকান্ত
চক্রবর্তী-সম্পাদিত, বিস্মৃত দর্পণ
নিধুবাবু/ বাবু বাংলা/ গীতরত্ন।

৪.         ‘ভালোবাসিরে বলে
ভালোবাসিনে’ গানটি নিধুবাবু-রচিত হলেও ঈষৎ পরিবর্তিত রূপে শ্রীধর কথকের খাতায়
পাওয়া গিয়েছিল বলে অনেকেই মনে করেন, এটি তাঁরই রচনা।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার