অ্যামেলিয়া

লেখক: তিলোত্তমা মজুমদার

        ॥ ১৭ ॥

আস্তে আস্তে ভরে উঠল ২১৫ নম্বর। দেখা গেল, ভেরোনিকা ছাড়া অন্য সকলেই উপস্থিত। খুব গম্ভীর মুখে এলো লোরেনটিনা। বলল, ‘আমি সাড়ে আটটায় শুয়ে পড়ি। ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে আনল। জন্মদিনে পার্টি করবে, আগে বলোনি কেন মেইমি?’
হারিক : পার্টি মেইমি করতেই চায়নি। আমরা করছি। আমাদের মধ্যে প্রথম কারো জন্মদিন পাওয়া গেল। একটু আনন্দ করার সুযোগ পেলে ছাড়া উচিত নয়। ইরাকে যারা থাকে এভাবেই ভাবে।
রুথ : আমিই বললাম, পার্টি হোক, আমরা তো এখন একই পরিবারভুক্ত। জেরেমিস, জেরেমিস, একটা সুন্দর কিছু বাজাও, ওরা না আসা পর্যন্ত।
আমি, কবরের কোনো গভীর থেকে উঠে আসা দানিয়েল – রুথ রুপার্টের নিপুণ চাতুরী ঘিরে বিষণœ হাওয়া হয়ে বইতে লাগলাম। আইওয়া নদীর বাতাসে কত গল্প, কত গল্প ওই জলে, সমস্তই ক্ষণিকের প্রতিবিম্ব। থাকে না কিছুই। ভেসে যায়। এই সত্যই সার। কিছুই থাকে না। থাকবে না। তবু মানুষের অকারণ লোভ, মোহ, মিথ্যাচার।
রুথ রুপার্ট হাঙ্গেরির কবি, লেখক, অভিনেত্রী, বুদ্ধিজীবী – মাথায় অজস্র ক্লিপ দিয়ে এঁটে রাখা চুল, নির্মেদ হিলহিলে শরীরে মুখ আর হাতের দুটি পাতাই দৃশ্যমান, বাকি সব কালো কাপড়ে মুড়ে রাখা, সমস্ত আবৃত কিন্তু নারীশরীরের সৌষ্ঠব প্রকটিত – আমি তার অন্তরে উঁকি দিয়ে শুধুই আঁধার দেখি কেন? মিথ্যাপি-ের কদাকার চিত্রে কেন শিউরে উঠি?
আমি অমলিনীর খুব কাছে এসে দাঁড়ালাম। কত অবলীলায় সে উপেক্ষা করছে রুথের অন্যায় দাবি!
পার্টি জমে উঠেছে। কেক-কাটা, মোমবাতি নেভানো, হ্যাপি বার্থ ডে গান এবং উপহার – সমস্তই। জেরেমিস বা ইয়াকভ আর বাজাচ্ছে না। এখন জিউক বক্সে ব্লু-টুথ মাধ্যমে গান বাজছে। আধুনিক রক ব্যান্ড। সঙ্গে নাচ। ঘরের চেয়ার-টেবিল সরিয়ে জায়গা করে নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই টেবিলে বেশ কয়েকটি মদের বোতল আর খাদ্য। যার যা ছিল, এনেছে বাটি ভরে। যার যেমন ইচ্ছে খাচ্ছে। মেইমি কেক কাটার সময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল। দুদিনের চেনা বন্ধুরা জন্মোৎসব করছে তার! হায়! এখনো এর-ওর নাম গুলিয়ে যায়!
সে আনন্দে নাচছে। দীর্ঘ সুন্দর শরীর। ঘন কালো চুল। দক্ষিণ আফ্রিকীয় সুন্দরী মেইমি। দশ বছর আগে সে আরো একবার ইয়াপে যোগ দিতে এসেছিল। তখন সে নেহাত এক সাহিত্যিক অঙ্কুর। আজ সে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা, নাম-করা লেখিকা, আজ সে বিবাহ বিচ্ছেদ যন্ত্রণাভারাতুর। সে একাকিনী। প্রচুর মদ্যপান করেছে জেরেমিস, জর্জ, অ্যালেক্স, লোরেনটিনা, মেইমি। কাম্বা ছাড়া প্রত্যেকেই পান করেছে কম-বেশি। কিন্তু সে-ও নাচছে।
ধার্মিক মুসলিম কাম্বা ঘালোন্দা জীবনে কখনো ধূমপান করেনি, মদ খায়নি। কোনো নেশাই সে করেনি অদ্যাবধি! সেই অর্থে তার নেশা দুটি। এক, অর্থোপার্জন, দুই, ফেসবুকে আত্মপ্রচার। এতটুকু ফাঁক পেলেই কাম্বা ফেসবুকে ডুবে যায়। এখন সে নাচছে বটে, কিন্তু সেই নাচের মধ্যে আত্মবিস্মরণ নেই। অধিকাংশ বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। মেইমি আর শবনম জোর করে অমলিনীকে টেনে এনেছিল। সে খানিক কোমর দুলিয়ে এক কোণে বসে আছে।
নাচ তার একেবারেই আসে না। নৃত্যের সুললিত অঙ্গভঙ্গি সে কখনো পারেনি জীবনে। ছোটবেলায় সে একবার ন্যাড়া মাথায় সিল্কের স্কার্ফ বেঁধে ‘হা রে রে রে রে রে আমায় ছেড়ে দে রে’ নেচেছিল। তারপর এমনকি ধুনুচি নাচেও সে সফল হয়নি। সে দেখছে মেয়েরা অনেকেই জেরেমিসের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। ইয়াসমিন দু-হাত তুলে উন্মত্ত নাচতে নাচতে বারবার জেরেমিসের গায়ে গায়ে ঘুরতে লাগল, ফাঁক বুঝে তাদের দুজনের মাঝে ঢুকে পড়তে লাগল রুথ। জেরেমিস কারো কোমর জড়াচ্ছে, কাউকে চুমু খেল, অ্যালেক্স ও মেইমি ঘন হয়ে নাচছে। মেইমি, কী সুন্দর! দীর্ঘাঙ্গী। কালো মসৃণ ত্বক। সুন্দর থোকা থোকা চুল। কোমল নয়ন। মিষ্টি মুখখানায় হাসলে টোল পড়ে। শরীরের গড়ন স্বপ্নের নারীর মতো নরম, সুগোল, মেদহীন ও নিখুঁত। যেন কালো সরস্বতী টাইট জিন্স ও শার্ট পরে নাচছে। অমলিনী বসে বসে মেয়েদের সৌন্দর্যের বিভিন্নতা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
রুথ বেশ কয়েকবার জেরেমিসের কাছাকাছি যাবার চেষ্টা করল, কিন্তু আজ জেরেমিস অনেক বেশি শক্তিশালী বলয়ে। শবনম ও ইয়াসমিন, রুবা ও লাইলাক।
রুথ একপাত্র মদ নিয়ে কাম্বার মুখের কাছে ধরল। কাম্বা নাচ থামিয়ে বলল, ‘আমি খাব না।’
রুথ : খাবে।
কাম্বা : আমি মদ খাই না তুমি জানো মাই ডিয়ার ওয়াইফ।
রুথ : আমি বলছি বলে খাবে তুমি কাম্বা।
কাম্বা : আমি কখনো কোনো নেশা করিনি রুথ। একটা সিগারেটও খাইনি।
রুথ : আজ খাবে। কারণ রুথ বলছে।
কাম্বা : প্লিজ রুথ, আমাকে জোর কোরো না। এটা ব্যক্তিগত নীতিবোধের ব্যাপার। আমি পার্টিটা মদ ছাড়াই উপভোগ করছি। কোথাও কম পড়ছে না।
রুথ : নীতিবোধ, অ্যাঁ? নীতিবোধ? ধাপ্পাবাজি কোরো না। কী প্রমাণ আছে তুমি কখনো নেশা করোনি? আমাকে সবার সামনে হেয় করতে চাও! এখানে সবাই মদ্যপান করেছে। সবাই খারাপ আর তুমি একাই পবিত্র!
অ্যালেক্স : আরে রুথ, অত চটছ কেন? মাতাল হয়ে গেলে নাকি?
রুথ : আমি মাতাল হই না। রুথ ইজ ফর ট্রুথ। ও বেশি নীতি কপচাচ্ছে, তাই না? তা হলে সত্যিটা বলি? ভাঙি হাটে হাঁড়িটা?
অ্যালেক্স : আরে ধুর, হাঁড়িটা কোথায় যে ভাঙবে? দাও তো আমায় তোমার মদটা, সব বোতল খালি, এটা আমি মেরে দিই।
রুথ : খুব নীতিবোধ তোমার কাম্বা? মদ ছোঁও না। এদিকে আমাকে চুমু যাওয়ার জন্য জাপটাজাপটি করোনি? জোর করোনি?
কাম্বা : কক্ষনো করিনি! এসব তুমি কী বলছ মাই ডিয়ার ওয়াইফ?
রুথ : আমি মোটেই তোমার ওয়াইফ নই। কী ভেবেছ? আমি কি বুঝি না, ওয়াইফ-ওয়াইফ বলে তুমি আমাকে যৌনপ্রস্তাব দিচ্ছ? কিন্তু শুনে রাখো, আমার কালচার আলাদা। আমি সহজলভ্য চিপ গার্ল নই। আমি অত্যন্ত রক্ষণশীল পরিবার থেকে এসেছি। আমার ধর্মবোধ আলাদা। আমিও জানি কী করে ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করতে হয়!
কাম্বা : দাঁড়াও দাঁড়াও। চেঁচিয়ে কথা বললেই মিথ্যেটা সত্যি হয়ে যায় না। হাজব্যান্ড-ওয়াইফ খেলাটা তুমিই শুরু করেছিলে। আমার মাথাতেও আসেনি। আমি কখনো তোমাকে চুমু খাইনি। খাবার ইচ্ছেও আমার নেই রুথ! আমিও রক্ষণশীল পরিবারের ছেলে। তোমার কি ধারণা পুরুষদের কোনো নীতিজ্ঞান হয় না? পুরুষ মাত্রই সহজলভ্য? এ-ধরনের সস্তা নারীবাদের চটক আর চলে না রুথ। আই অ্যাম সরি টু সে দ্যাট ইউ হ্যাভ স্পয়েলড দ্য পার্টি। ইউ আর সাকসেসফুল টু ডু দ্যাট।
রুথ : আই স্পয়েলড দ্য পার্টি? ইট ওয়াজ মাই আইডিয়া, মাই প্রোপোজাল! নোবডি ইভন কুড থিঙ্ক অব মেকিং অ্যানি পার্টি।
অ্যালেক্স : রুথ ফর ট্রুথ, শোনো, সত্যি কথা বলতে গেলে, এটা মোলির ভাবনা। কারণ মেইমি ওকে প্রথমে বলেছিল। ও যদি চুপচাপ মেইমিকে শুভ জন্মদিন বলে থেমে যেত, আমরা জানতেও পারতাম না।
রুথ : তোমরা সবাই একদলে। তোমরা পুরুষরা। তোমরা আমার অপমানটা দেখছ না। যন্ত্রণাটা দেখছ না। মূল বিষয় থেকে মন সরিয়ে দিতে চাইছ। তোমরা ভাবো একটা মেয়ে মানেই একটা শরীর। ছি ছি ছি! এই কাম্বা ঘালোন্দা রোজ মাঝরাতে আমার দরজায় টোকা মারে। আরো অনেকেই মারে। আমি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারি না। এগুলো যৌন নির্যাতন : সে-ক-সু-য়া-ল হ্যা-রা-স-মেন্ট। আমি অভিযোগ করব।
দু-হাতে মুখ ঢেকে বসে আছে কাম্বা। একবার শুধু বলে উঠল, ‘সমস্ত মিথ্যে। সব বানানো। প্লিজ তোমরা ওর কথা বিশ্বাস কোরো না, হে ভগবান।’
অ্যালেক্স : ও যদি এতই খারাপ, ওকে অত তোল্লাই দিচ্ছিলে কেন?
রুথ : কারণ আমি ভেবেছিলাম আলোচনা করে ব্যাপারটা মিটিয়ে নেব।
মোলি : তুমি কি দরজা খুলে দেখেছ, কাম্বা নক করছে?
রুথ : না। কিন্তু বোঝা যায়। ও হ্যাঁ, একবার দেখেছিলাম কাম্বা চলে যাচ্ছে।
কাম্বা : অসম্ভব। আমি আজ পর্যন্ত তিনতলায় যাইনি।
শবনম : যে-ই রুথের ঘরে টোকা দিয়ে থাকুক, কাজটা ঘোরতর অন্যায়।
রোজানা : এখানে আমাদের সম্পর্ক বিশ্বাস ও বন্ধুত্বের।
হারিক : কারো কাউকে ভালো লাগলে সরাসরি বলুক। বড়জোর একটা ‘নো’ শুনতে হবে। সেই সাহসটাও নেই?
আদনাশে : রাতে দরজায় টোকা দেওয়ার একটাই অর্থ, চুপি চুপি একটু মজা মারতে আসা। এখানে বিশ্বাস, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা কিছুই নেই।
অ্যালেক্স : সবকিছুই ঠিকই থাকবে, যদি না তোমরা গোটা ব্যাপারটা নারী বনাম পুরুষ করে না ফেলো।
জেনিফার : আরে কী বিশ্রী দাঁড়াচ্ছে ব্যাপারটা। সবাই কি ঘুম ফেলে এই করতে এসেছি। আমি চললাম বন্ধুরা।
লিলি : দাঁড়াও জেনিফার। রুথ যখন অভিযোগ করছে, কিছু একটা অসুবিধে তো হয়েছেই। আমার প্রস্তাব হলো, কাম্বা রুথের কাছে ক্ষমা চাক।
কাম্বা : কেন? যে-দোষ আমি করিনি তার জন্য ক্ষমা চাইব কেন?
জেরেমিস : বরং রুথের ক্ষমা চাওয়া উচিত বন্ধুর সম্পর্কে এমন বিশ্রী অভিযোগ করার জন্য। কেউ কারো দরজায় মাঝরাতে টোকা মারলে সেক্স, মাঝদুপুরে টোকা মারলে কবিতা?
ইয়াকভ : আমার তো মনে হয় এখানে সবাই পরিণতবয়স্ক, সবাই সমঝদার। পরস্পরকে ভয় পাবার কী আছে? এখানে নারী-পুরুষ সবাই সমানভাবে আমার বন্ধু। আমার ইচ্ছে করলে, প্রয়োজন হলে আমি দিনে-রাতে যে-কোনো সময় হাসিনের কাছে যাব, জেনিফার, লিলি, হারিক, মোলি, লোরেন যার কাছে খুশি যাব।
মোলি : আমার একটা প্রস্তাব আছে। ‘রোজ রাত্রি’ বলতে কী বোঝায়? প্রথম রাতে আমরা প্রত্যেকে বহু বহু দূর থেকে এসে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়েছি। তারপর আর তিন রাত্রি গিয়েছে! কারো সম্পর্কে এমন গুরুতর অভিযোগ করার আগে আরো দেখা উচিত। ভাবা উচিত। আমরা তিন মাস একসঙ্গে থাকব। এত অবিশ্বাস থাকলে তো কথা বলতেই ভয় করবে। করিডোরগুলোর সিসি টিভি ক্যামেরা আছে। কাল আমরা সারাকে বলব গত চার রাত্রির সেকেন্ড থার্ড ফ্লোরের ছবি আমরা দেখতে চাই।
রুথ : এতখানি করার দরকার নেই। আজ থেকে আমি কাম্বার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাই না। ব্যাপারটা সারার কাছে যাওয়া মানে গোটা শাম্বাগ হাউজ জানবে। রাইটারদের পক্ষে সেটা সম্মানজনক নয়। এবারের মতো কাম্বাকে আমি ক্ষমা করলাম।
অ্যালেক্স : আমাদের সবার সম্মান বাঁচাবার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ রুথ।
কাম্বা : আমাকে ক্ষমা করলে মানে? দাঁড়াও। চালাকি কোরো না। সিসি টিভি ফুটেজ দেখা হোক। আমাকে যদি আবিষ্কার করতে পারো আমি জেলে যেতেও তৈরি আছি।
জেনিফার : ইন দ্যাট কেস, ইউ নিড এ লয়ার।
হা হা হো হো হে হে হিহি!
মাতাল হাসিতে ফেটে পড়ল সারাঘর। হা হা হা হি হি হি! ইউ নিউ এ লয়ার! হেল্লো! ইউ নিড এ ব্লাডি লয়ার! কাম্বা স্বয়ং হাসতে লাগল! তারই মধ্যে সে বলে উঠল, ‘কাল নিষ্পত্তি চাই। এই জঘন্য মিথ্যা অপবাদ সহ্য করব না আমি!’
হঠাৎ কেঁদে ফেলল রুথ। ফিচ্ ফিচ্। উশ্। হিক্। ‘তোমরা কেউ জানো না। উশ উশ, কাল আমার মায়ের মেজর অপারেশন। হিক্ হিক্। আমার কী ভয়ানক দুর্ভাবনা। আই অ্যাম ইন স্ট্রেস।’
তিন দলে ভাগ হয়ে গেল রাইটাররা। একদল রুথকে ঘিরে সমবেদনা জানাতে লাগল। আরেকদল নির্বিকার মুখে ঘুমোতে গেল। তৃতীয় দল ঠিক করল, চলো আইওয়া নদীর পাড়ে বসে মুক্ত বায়ু সেবন করে আসি। অমলিনীর মতো আমারও এই প্রস্তাব সবচেয়ে বেশি ভালো লাগল। আমি, দানিয়েল, এই বায়ব শরীরেও দমবন্ধ বোধ করছিলাম ঘরটায়। বাইরেটা ভারি সুন্দর, আরামদায়ক। হাত ধরাধরি করে, কোমর জড়িয়ে, ধীরপায়ে লবি পেরিয়ে তারা বাইরে এলো। নামল ঢাল বেয়ে। নরম আলোর পথবাতিগুলোও খুশি হলো তাদের দেখে। ছোট্ট চ্যাপেলের সামনে ফুটে থাকা গোলাপের গুচ্ছ দুলে উঠল। নদীর বাঁধানো পারে গায়ে গা লাগিয়ে তারা বসল। শবনম ও ইয়াসমিন সিগারেট ধরাল।
মোলি : দাও তো, দুটো টান দিই।
হারিক : তুমি, তুমি সিগারেট খাও?
মোলি : নেশা নেই। মাঝে-সাঝে। আমার দেশে বলে সিগারেট, বিড়ি আর গাঁজা ভাগ করে খেলে বন্ধুত্ব বাড়ে।
হারিক : তুমি গাঁজা খেয়েছ?
মোলি : আমি পছন্দ করি জিনিসটা। কিন্তু ওই, চা-কফি ছাড়া আমার আর কোনো নেশা নেই।
হারিক : আমি গাঁজা খাইনি। ইরাকে গাঁজা নিষিদ্ধ।
মোলি : আমার দেশেও নিষিদ্ধ। কিন্তু নিষেধ কেউ গ্রাহ্য করে না। যার খাবার, খায়। গাঁজার গান পর্যন্ত রয়েছে। আমার দেশে এসো, খাওয়াব তোমায়।
হারিক : পাক্কা? কী জানো মোলি, তোমার চোখণ্ডমুখে এমন একটা গম্ভীর পবিত্র ভাব আছে যে মনে হয় তুমি সমস্ত দুষ্টুমির ঊর্ধ্বে!
মোলি : হারিক, তুমি তো বাচ্চা মেয়ে, তাই জানো না। মুখ দেখে কিছুই বোঝা যায় না। আচ্ছা-আচ্ছা বদমাইশের মুখও পবিত্রতার ছাউনি দেওয়া। দুষ্টুমি করতে আমি পছন্দই করি। বলছি তো, এসো আমার দেশে।

ইয়াস : আমাকে ইন্ডিয়ায় ডাকছ না তো?
মোলি : নিশ্চয়ই ডাকছি। সব্বাইকে ডাকছি।
ইয়াস : গোটা সিগারেট চাও, না আমার এঁটোটা খাবে?
মোলি : তোমার এঁটোটাই দাও।
ইয়াস : [মোলির গলা জড়িয়ে] আর একটা গান শোনাবে?
মোলি : আমি তো রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কিছু জানি না।
ইয়াস : সেই গানই শোনাও।
মানঘিল : আমি একটা ছবি তুলছি। এদিকে তাকাও।
মোলি : কী ছবি?
মানঘিল : একটা ইন্ডিয়ান আর একটা পাকিস্তানি গলা জড়িয়ে সিগারেট ভাগ করে খাচ্ছে।
ইয়াস : নোবেল পিস প্রাইজের জন্য পাঠাও।
ইয়াকভ : মোলি, তুমি ইন্ডিয়ান রাগা গাইতে জানো না?
মোলি : সামান্য জানি ইয়াকভ। শুনবে? ইয়াসমিন?
ইয়াস : কোন রাগ গাইবে? আমার প্রিয় ভৈরবী।
মোলি : ভৈরবী অবশ্য সকালের রাগ। আবার ভৈরবী অন্য সময় গাইলেও খুব অন্যায় হয় না। তবে এখন, এই মাঝরাত্তিরের জন্য দরবারি বা মালকোশ বা তিলককামোদ!
শবনম : তোমার যেটা ইচ্ছে গাও।
ইয়াস : মালকোশ।
কিছুক্ষণ মালকোশের বিস্তার করল মোলি। তারপর খুব ধীরে, প্রায় বিলম্বিতের মতো করে গাইতে লাগল রবীন্দ্রনাথের ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে।’ খানিকটা গান, খানিক বিস্তার। নিজের দেশে এভাবে কখনো গায় না সে। রবীন্দ্রনাথে যতেক নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু এই আইওয়ায়, ভিনদেশি বন্ধু-লেখকদের সান্নিধ্যে, হুইস্কির মৌতাতে মধ্যরাতের মাধুর্যে সে নিয়মের বেড়া ডিঙিয়ে গেল। প্রাণ যা চায়, তাই সে গাইতে লাগল অনুশাসনের পরোয়া না করে। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রায় পনেরো মিনিট গাইবার পর ইয়াসমিন আঙুলের ফাঁকে নিভে যাওয়া সিগারেটের শেষাংশ ছুড়ে ফেলল জলে। ইয়াসমিন তার গালে গাল ঘষে বলল, ‘ধন্যবাদ।’
অমলিনীর মনে হলো, ইয়াসমিনের চোখে পুরু কাজলের তলায় প্রগাঢ় কালিমা আছে। ইয়াসমিন মদ্যপান করলে খুব উদার, অন্তরঙ্গ, আবেগপ্রবণ। অন্য সময় স্বার্থপর ও বেপরোয়া। আজ সন্ধ্যায় ইয়াসমিনের অপমান অমলিনী ক্ষমা করে দিয়েছে, কিন্তু ভুলতে পারছে না। তবু সে মেয়েটার গালে ছোট্ট করে চুমু খেল। তাদের জাতীয় শত্রুতা। তারা ভারতীয় ও পাকিস্তানি! একদা তারা একই দেশের ছিল। ভাঙন প্রতিযোগিতা ও শত্রুতার জন্ম দেয় – এই কি অনিবার্য সত্য? তাদের জাতীয় সম্পর্ক বৈরী এ-সম্পর্কে মোলি ও ইয়াসমিন উভয়েই সচেতন। তার প্রভাব অতিক্রম করার জন্য নিজের সঙ্গে নিজের সংগ্রাম জারি রাখতে হয়।
জেরেমিস বলে উঠল, ‘খুব মিষ্টি ও সুরেলা তোমার কণ্ঠ। তুমি তালিম নিয়েছ?’
মোলি : এখনো নিই।
জিয়াং : মোলি, তুমি গাইয়ে হলেও পারতে। আমি টিকিট কেটে তোমার গান শুনতে যেতাম।
অ্যালেক্স : মোলি, এত সুন্দর গাইছিলে তুমি, আমি রেকর্ড করে ফেসবুকে দিয়ে দিলাম। তার সঙ্গে তোমার ও ইয়াসমিনের ঘনিষ্ঠ ছবি! আমার একটা ব্যাপার খুব খারাপ লাগছে শবনম। তোমার আর জিনেটের ব্যাপারটা কি মিটিয়ে ফেলা যায় না?
শবনম : জিনেটের সঙ্গে তো আমার কোনো ব্যাপার নেই।
অ্যালেক্স : ওর জন্য আমার কষ্ট হয়। তোমার কারণে ও কখনো সহজ হতে পারে না।
শবনম : আমি তো ওকে সহজ হতে আটকাচ্ছি না।
অ্যালেক্স : ওর সঙ্গে কথা বলো না তুমি। সেদিন শাম্বাগ হাউজে ওভাবে বললে। বেচারা কাঁদতে কাঁদতে উঠে গেল। আজ ওর নাচতে ইচ্ছে করছে, তোমার জন্য পারছে না।
শবনম : ঠিক আছে, আমাদের আর কোনো পার্টিতে আমি নাচব না। ও নাচুক।
অ্যালেক্স : ব্যাপারটা শুধু নাচ নয়। তুমি যে ওকে অবজ্ঞা করো, সেটাই ওর কষ্ট হয়।
যজ্ঞাগ্নিতে আহূতি পড়ল। মধ্যরাতে আইওয়া নদীর পাড়ে, সমস্ত শান্তি-স্তব্ধতা-সংগীতের রেশ ভেঙেচুরে তীব্র হয়ে উঠল শবনমের গলা। (চলবে)

Leave a Reply

%d bloggers like this: