আবদুল মান্নান সৈয়দের জসীমউদ্দীন ও জসীমউদ্দীনের অগ্রস্থিত কবিতা

লেখক:

আহমাদ মাযহার

নিজের প্রথম বইয়ের ব্লার্বে ‘বীততিরিশ’ বলে চিহ্নিত হলেও আবদুল মান্নান সৈয়দ যে ছিলেন ঘোরতর তিরিশি চেতনার আধুনিকবাদী কবি তা তাঁর পাঠক মাত্রেরই জানা আছে। জীবনানন্দ দাশ, নজরুল ইসলাম, রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ও ফররুখ আহমদ সম্পর্কে তাঁর গভীর ওয়াকিবহাল থাকার পরিচয় এঁদের নিয়ে লেখা তাঁর বইগুলো থেকে পাওয়া যাবে। সমালোচক হিসেবে নজরুল ও জীবনানন্দকে নিয়ে অনেক বিস্তৃত কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু সম্প্রতি তাঁর লেখাপত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে লক্ষ করলাম, আপাত-নগরমুখী আধুনিক মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তিনি ‘পল্লিকবি’ হিসেবে চিহ্নিত জসীমউদ্দীন সম্পর্কেও কয়েকটি রচনা লিখেছেন। লেখাগুলোর গুরুত্ব তো উপেক্ষণীয় নয়ই, রীতিমতো কৌতূহলোদ্দীপক। বাংলা ভাষার একজন প্রধান কবি হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি বারবার জসীমউদ্দীনকে নিয়ে লিখতে উদ্যোগী হয়েছেন। না, একটি-দুটি নয় কেবল, জসীমউদ্দীনকে নিয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দের পাঁচ-পাঁচটি সম্পন্ন প্রবন্ধের খোঁজ পাওয়া গেছে। এসব রচনায় তাঁর সমালোচক সত্তার আরেকটি দিকের উন্মোচন দেখা যাচ্ছে।
‘জসীমউদ্দীনের কবিতা’ [রচনাকাল : ১৯৯০] শিরোনামের একটি রচনা তাঁর প্রথম দিককার প্রবন্ধের সংকলন করতলে মহাদেশের দ্বিতীয় সংস্করণে (১৯৯৩) অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এই প্রবন্ধেই আবদুল মান্নান সৈয়দ দেখিয়েছেন বয়সে প্রায় সমসাময়িক হওয়া সত্ত্বেও জসীমউদ্্দীন তিরিশি কবিদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা, নতুন এবং আত্মচারিত্র্যে দীপ্র! বাংলা কবিতার ইতিহাসে জসীমউদ্দীনকে এক ‘আশ্চর্যবিস্ময়’ মনে হয়েছিল তাঁর! তিনি অনুভব করেছিলেন যে, জসীমউদ্দীনের সমগ্র সাহিত্যকর্ম ছিল ‘সুচেতন’। আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, জসীমউদ্দীনের কবিত্ব ‘পা-িত্যপীড়িত নয়, স্বভাবকবি-শোভনও নয়; ততটাই আত্মস্বভাবী, যতটা শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয়, আবার ততটা আত্মসচেতন নয়, যতখানি লোকসাহিত্য।’ ওই প্রবন্ধের শেষকথায় তিনি ব্যক্ত করেছিলেন এই বিশ্বাস যে, কোনো তাৎক্ষণিকতা জসীমউদ্্দীনের কবিতাকে তার স্থানচ্যুত করতে পারবে না।
জসীমউদ্্দীনের জন্মশতবর্ষের লগ্নে দৈনিক ইত্তেফাকে (১৭ জানুয়ারি, ২০০৩) লেখেন গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘জসীমউদ্্দীনের সাহিত্য সাধনায় বাংলাদেশের লোকজীবন’। এতে তিনি দেখান জসীমউদ্্দীন কীভাবে আবহমান বাংলা কবিতার সঙ্গে লগ্ন থেকে সমসাময়িক সব কবির চেয়ে এমনকি মাইকেল এবং রবীন্দ্রনাথের চেয়েও আলাদা এক সম্পূর্ণ ও স্বরাট ভুবনের স্রষ্টা হয়ে উঠেছেন। তাঁর কবিতায়, কাহিনিকাব্যে, গানে, অভিভাষণে ও প্রবন্ধগুলোয়, নাটকে জসীমউদ্্দীন নিজস্ব জগৎ সৃষ্টি করেছেন। তিনি ব্যক্তিজীবনে জনসাধারণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; কিন্তু কোনো সাহিত্যগোষ্ঠী বা পত্রিকাগোষ্ঠীর সঙ্গে বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দূরত্ব রেখে ‘এক একাকী প্রকৃত লেখকের’ জীবনযাপন করে চলেছেন।
এর পরের প্রবন্ধ ‘জসীমউদ্দীন’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল কালি ও কলমের প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, চৈত্র ১৪১০, মার্চ ২০০৪ সংখ্যায় [পরে ‘জসীমউদ্দীন’ শিরোনামে ঈশ্বর গুপ্ত থেকে শহীদ কাদরী (২০০৭) বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়] তিনি জসীমউদ্্দীনের কবিতায় বিস্তারিতভাবে পরিভ্রমণ করে দেখান যে, দীর্ঘ ও ক্ষুদ্র কাহিনিকাব্য, মনোনাট্য, সংলাপকবিতা, লিরিক – সব মিলিয়েই জসীমউদ্্দীন ‘এক ও অনন্য’। এমনকি তাঁর গদ্যসাহিত্য ও লোকসাহিত্য-সন্ধান ইত্যাদি মিলিয়ে জসীমউদ্্দীনের মধ্যে ‘অখ- ও অবিভাজ্য’ এক সত্তার সন্ধান পান তিনি।
সামান্য অনুজ হলেও বৃহত্তর অর্থে জসীমউদ্্দীন কবি হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামেরই সমসাময়িক কবি। শুধু তা-ই নয়, আবদুল মান্নান সৈয়দের মতে নজরুল ছাড়া বাঙালি মুসলিম সমাজের আর কোনো কবি সমগ্র বাংলাভাষী সমাজে এতটা সুস্পষ্টভাবে নিজের কবিচারিত্র্যকে জানান দিতে পারেননি। ‘নজরুল ও জসীমউদ্্দীন’ প্রবন্ধে এই দুই কবিসত্তার তুলনামূলক আলোচনা করেছেন তাঁর দুই কবি (২০০৯) বইয়ে। তিনি দেখিয়েছেন, একই সমাজের মানুষ হয়েও দুই কবিই ভিন্ন ভিন্ন মানসভুবনের প্রতিভূ। তা সত্ত্বেও দুজনেই আবার চেতনায় গভীরভাবে অসাম্প্রদায়িক। উভয়েই প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর আশা ও আত্মবিশ্বাসের। অন্যদিকে এক সমাজখ-ের প্রতিনিধি হয়েও উভয়েই মানবিকতার সোপানারোহী হয়ে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন অপরখ-ের অন্তরে। প্রবন্ধটিতে আবদুল মান্নান সৈয়দ এই দুই কবির বড় বড় মিলের মধ্যেই আবার কী করে নিজেরা স্পষ্ট ও আলাদাভাবে স্ব-স্বভাবী তারও পরিচয় তুলে ধরেছেন।
জসীমউদ্দীন সম্পর্কে খোঁজ পাওয়া গেছে আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখা ‘পত্রিকা ঘাঁটতে ঘাঁটতে কবি জসীমউদ্দীন’ নামে একটি পত্র-প্রবন্ধের। প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক ইত্তেফাকের ইত্তেফাক সাময়িকী বিভাগে শুক্রবার, ২৯ ফাল্গুন, ১৪১৫/ ১৩ মার্চ, ২০০৯ তারিখে। জীবনের শেষপর্বে আবদুল মান্নান সৈয়দ যেন তাঁর বিবেচনা ও সৃষ্টিশীলতাকে এক মুঠোয় আনতে চেয়েছিলেন এই পত্রপ্রবন্ধ শ্রেণির প্রবন্ধ রচনা করে। প্রবন্ধ রচনার আঁটসাঁট আঙ্গিকে বদ্ধ না থেকে কখনো গবেষণালব্ধ উপলব্ধির প্রকাশ ঘটাতেন, কখনো খুলে বসতেন স্মৃতির ঝাঁপি, এরই ফাঁকে হাজির করতেন নিজের মূল্যায়ন, সঙ্গে থাকত সরল সমাজপর্যবেক্ষণও। তাঁর নানা ব্যক্তিক অনুভূতি-ক্ষোভ-আনন্দ প্রকাশক এই সংরূপের রচনা পাঠে পাঠকের লাভ সৃষ্টিশীল সাহিত্য পাঠের রসানুভূতি।
আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখাপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে জসীমউদ্্্দীন সম্পর্কে আপাতত এই পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ রচনারই খোঁজ পেয়েছি। আরো বিভিন্ন রচনাংশে জসীমউদ্্দীন সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যচূর্ণ থাকার কথা। সেগুলো খুঁজে দেখে একত্র করা দরকার। তাহলে জসীমউদ্্দীন সম্পর্কে আবদুল মান্নান সৈয়দের বিবেচনাকে এক অখ- দর্পণে দেখতে পাওয়া যাবে। এ থেকে বাংলা কবিতার অনুপুঙ্খ পাঠক ও সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দের আরেকটি সম্পন্ন সমালোচক-সত্তারও পরিচয় পাওয়া যাবে। ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমির ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থের ‘জীবনীগ্রন্থমালা’ সূত্রে এক রচনায় আবদুল মান্নান সৈয়দ উল্লেখ করেন যে, তাঁর এক পিরিয়ডের শিক্ষক আবু হেনা মোস্তফা কামাল তাঁকে জসীমউদ্্দীনের জীবনী লিখতে আহ্বান জানালে তিনি সোৎসাহে কাজে লেগেছিলেন। কবিকন্যা হাসনা মওদুদও তাঁকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন। শুরু করেছিলেন লাইব্রেরি-ওয়ার্কও। লাইব্রেরি-ওয়ার্ক করতে করতেই তিনি অনুভব করলেন যে,
জসীমউদ্্দীনের জীবনী প্রণয়ন সোজা কথা নয়। নজরুল ইসলামের মতো তাঁরও কলকাতা-জীবন বৈচিত্র্যপূর্ণ, তাঁর কোনো কোনো বই এডিশনের পর এডিশন হয়েছে, এবং তিনি কিছু কিছু পরিশোধন পরিযোজনও করেছেন; কলকাতার পত্রপত্রিকায় তাঁর অনেক রচনা ছড়িয়ে আছে। কোনো এক জীবনীগ্রন্থ-প্রণেতার মতো আমি লিখে লিখে দিতে পারব না যে, এটা দুঃসাধ্য কাজ। শেষ পর্যন্ত বাংলা একাডেমিকে আমি জানিয়ে দিই যে, জসীমউদ্্দীনের জীবনী আমি লিখতে পারব না। প্রসঙ্গত এখানে এই বেদনা লিখে রাখতে চাই যে, জসীমউদ্্দীনের মতো বড় কবি বাংলাদেশে তাঁর প্রকৃত মূল্য পাননি আজো। একমাত্র প্রয়াত অধ্যাপক সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায় জসীমউদ্্দীন সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। আর মাত্র জসীমউদ্্দীন সম্পর্কে দুটি বা তিনটি সমালোচনামূলক প্রবন্ধে অসাধারণ অন্তর্দর্শিতা ও বিশ্লেষণের স্বাক্ষর রেখেছেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। স্যার চাচ্ছিলেন তাঁর এই প্রিয় কবির জীবনীটি আমিই লিখি – এ আমার এক গৌরব।
কিন্তু তখন তা আমি লিখিনি জসীমউদ্্দীনের প্রতি সুবিচার করতে পারব না বলে।…
(অগ্রন্থিত আবদুল মান্নান সৈয়দ, ২০১৬, সম্পাদক, পিয়াস মজিদ)

তখন তিনি বাংলা একাডেমি-আহূত জীবনী লিখতে সম্মত না হলেও জসীমউদ্্দীন অনুসন্ধান তিনি ছাড়েননি। তাঁর নোটখাতা আরো পূর্ণ হয়েছে, পর্যবেক্ষণ আরো গভীর হয়েছে। তারই পরিণামে আবদুল মান্নান সৈয়দের এসব রচনা।
জসীমউদ্দীন বিষয়ে প্রাপ্ত তাঁর রচনাদির বিভিন্ন পাঠ মিলিয়ে দেখতে গিয়ে আমরা দেখি যে, তাঁর জসীমউদ্দীন চর্চার এক পর্বে তিনি তাঁর শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও দীর্ঘকালের বন্ধু সম্পর্কে অভিমানাহত হন। এ ব্যাপারে তাঁর ডায়েরি : ১৯৭৮-২০০৮ বইয়ের ২-৫-২০০৮ তারিখের ভুক্তিতে ‘সম্পাদকীয় চতুরতা’ শিরোনামের একটি অংশে তিনি লেখেন,
প্রথম জীবনে অনেক ভালো সম্পাদকের সংস্পর্শে এসেছিলাম বলেই এখন কোনো কোনো সম্পাদকীয়তে চতুরতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারি না।
কালি ও কলম (যার নাম কল্লোল-যুগের বিখ্যাত একটি পত্রিকার নামের নকল) নামের একটি পত্রিকা দু-দুবার আমার সঙ্গে এম্নি একটি চতুরতা করে। আমি সাহিত্য ব্যাপারে এমন গভীর লিপ্ত থাকি যে, বিষয়টা আমার অনেক পরে নজরে আসে। এই পত্রিকার প্রথম থেকেই আমি মাঝে মাঝে কবিতা ও প্রবন্ধ লিখে আসছি। বলা বাহুল্য, সম্পাদকদের আহ্বানে।
কবি জসীমউদ্দীন সম্পর্কে আমার একটি প্রবন্ধ লিড আর্টিক্যাল হিসেবে ছাপা হয় কালি ও কলম পত্রিকায়। তারপরে চিঠিপত্র কলামে একটি চিঠি মুদ্রিত হয় ‘মান্নান সৈয়দ কী জবাব দেবেন’ শিরোনামে? এরকম শিরোনামে (স্মৃতি থেকে লিখছি, শিরোনাম একটু এদিক-ওদিক হতে পারে)। পত্রটিতে আমার প্রবন্ধে কবি জসীমউদ্দীনের ছন্দ বিশ্লেষণ করেছি কি-না এ-প্রশ্ন তোলা হয় প্রায় কৈফিয়ত হিসেবে। কয়েক সংখ্যা পরে আরেকটি চিঠিতে স্বীকার করা হয় – না, মান্নান সৈয়দের ছন্দবিশ্লেষণে ভুল ছিল না। তখন আর চিঠির শিরোনামে আমার নাম ছিল না। (পৃ ৩০৭)
বর্তমান লেখকের অনুসন্ধানে কালি ও কলম পত্রিকার সূচিতে আবদুল মান্নান সৈয়দের রচনা আভাসিত ছিল নিম্নরূপভাবে :
…রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতার ইতিহাসে কবি জসীমউদ্দীন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এতখানিই স্বতন্ত্র যে, আধুনিক কবিদের সারিতে তাঁকে বসানো যাবে কিনা, সে-সন্দেহ অনেকেই পোষণ করেন। তিনি জীবনানন্দ-বুদ্ধদেব প্রমুখ কবির সমকালীন, তাঁর কবিতা সেকালের রাগী তরুণদের মুখপত্র কল্লোলে ছাপা হয়েছে। তবু তিনি আর কারো মতোই নন। সেভাবে তাঁর ঠিক কোনো পূর্বসূরি বা উত্তরসূরি নেই। তাঁর কবিতার আশ্রয়ভূমি ছিল গ্রামবাংলা আর রূপশৈলী ছিল গাথাকাব্যের। আবদুল মান্নান সৈয়দ জসীমউদ্দীনকে নিয়ে নতুন দৃষ্টিতে আলোচনা করেছেন।…
কিন্তু আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখা প্রকাশের দুই সংখ্যা পরে, প্রথম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় যশোর থেকে খসরু পারভেজ প্রশ্ন তোলেন,
আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘জসীমউদ্দীন’ প্রবন্ধ আমাদের পল্লীকবিকে নতুন করে ভাববার সুযোগ এনে দেয়। জনাব সৈয়দ এ-প্রবন্ধে জসীমউদ্দীনের কবিতায় ছন্দের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ‘পল্লীবর্ষা’ কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে তা মাত্রাবৃত্তে লেখা বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এক জায়গায় লিখেছেন – ‘অগ্রজ কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতোই তিনি অক্ষরবৃত্তকে সরিয়ে রেখে মাত্রাবৃত্ত…।’ উদ্ধৃত ‘পল্লীবর্ষা’ কি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা, নাকি অক্ষরবৃত্তে। তাঁর বিখ্যাত ‘কবর’, ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতা কি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা? আশা রাখি, আবদুল মান্নান সৈয়দ স্বপক্ষে পরবর্তী কোনো সংখ্যায় এ-প্রসঙ্গে লিখবেন।…
তার এক সংখ্যা পরে চট্টগ্রাম থেকে শিশু-কিশোর পত্রিকা দ্বীন দুনিয়ার সম্পাদক মুহাম্মদ আরমান আরজু পাঠকের চিঠি বিভাগে ‘পল্লীবর্ষা’ মাত্রাবৃত্ত ছন্দেই লেখা’ শিরোনামে লেখেন,
মে ২০০৪ সংখ্যার কালি ও কলমের ‘পাঠকের চিঠি’ নামক কলামে খসরু পারভেজ প্রশ্ন রেখেছেন কবি জসীমউদ্দীনের ‘পল্লীবর্ষা’ কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত না অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখা।
খসরু সাহেব ছন্দ-বিষয়ে আদৌ কোনো জ্ঞান রাখেন কিনা আমার সন্দেহ হয়। এটি তো স্পষ্ট যে, ‘পল্লীবর্ষা’ ছয় মাত্রার মাত্রাবৃত্তে রচিত। তেমনি তাঁর ‘কবর’ কবিতাটিও। আবদুল মান্নান সৈয়দের কোনো সীমাবদ্ধতা তো দেখছি না। আশা রাখি, কবিতাগুলো তিনি নতুন করে আবার পড়ে দেখবেন।

‘পাঠকের চিঠি’ বিভাগে ‘পল্লীবর্ষা’ কবিতার ছন্দ সম্পর্কে পাঠকের অভিযোগটি প্রকাশ করার আগে সম্পাদকীয় বিভাগের পক্ষ থেকে অভিযোগটি পরীক্ষা করে দেখাই ছিল সংগত। কারণ মাত্রাবৃত্ত ছন্দের খুব প্রচলিত চালেই কবিতাটি রচিত এবং সম্পাদকীয় বিভাগের জানা থাকার কথা যে, আবদুল মান্নান সৈয়দ ছন্দ বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ। সম্পাদকীয় বিভাগের এই উদাসীনতা তাঁকে ব্যথিত করেছিল। তাছাড়া সাহিত্যচর্চায় তিনি এতটাই নিবিষ্ট থাকতেন যে, জীবনের অন্য অনেক কিছু লক্ষই করতেন না। খসরু পারভেজের অভিযোগটি ছিল একেবারেই ভিত্তিহীন। সম্পাদকীয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগটি যাচাই না করেই সেটা প্রকাশ করেছিলেন। আবদুল মান্নান সৈয়দের মনে হয়েছিল কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদক ও সম্পাদকম-লীর সভাপতি বাংলাদেশের সাহিত্যজগতের এমনই অভিজ্ঞ ব্যক্তি যে, তাঁদের পক্ষে এতটা দায়িত্বহীন হওয়া সম্ভব নয় যদি না তাঁদের কোনো দুরভিসন্ধি থাকে। তাঁর মনে এমন একটা বদ্ধমূল ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল যে, সম্পাদকীয় বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ তাঁকে হেয় করার জন্যই এমনটি করেছিলেন। তাঁর মন থেকে বদ্ধমূল এই ধারণা নানাজনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আর দূর করা যায়নি। এ নিয়ে বর্তমান লেখকেরও দীর্ঘ আলোচনা-প্রয়াস সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল।
‘পত্রিকা ঘাঁটতে ঘাঁটতে জসীমউদ্দীন’ প্রবন্ধটিতে জসীমউদ্দীনের লেখা এমন কয়েকটি কবিতার উল্লেখ করেছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ, যেগুলো জসীমউদ্দীনের কোনো গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তিনি অবশ্য লিখেছিলেন কবিতাগুলো কোন বইয়ে আছে সময়াভাবে তা তিনি খুঁজে দেখেননি। বর্তমান লেখকের অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে যে, এগুলো এখন পর্যন্ত অগ্রন্থিত। জসীমউদ্দীনের অনুরাগী পাঠকদের জন্য কবিতাগুলো আবদুল মান্নান সৈয়দ-নির্দেশিত সূত্র অনুসারে খুঁজে বের করা হয়েছে। খুঁজতে গিয়ে শুধু তাঁর নির্দেশিত কবিতাগুলোই নয়, এর বাইরেও কবিতার সন্ধান পাওয়া গেছে। অগ্রন্থিত যে ছয়টি কবিতা পাওয়া গেছে সেগুলোও উৎস ও প্রকাশের তারিখসহ এখানে যুক্ত করা হলো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা মোকারম হোসেন কবিতাগুলো উদ্ধারে সক্রিয় সহযোগিতা না করলে এগুলো উদ্ধার করা দুরূহ হতো। তাঁর প্রতি বর্তমান লেখক আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।
জসীমউদ্্দীনের অগ্রন্থিত কবিতা

কবিতা

তোমার উপরে কবিতা লিখিতে বারণ করেছ আমারে,
না হয় কবিতা না-ই লিখিলাম, কবিতা হইতে বাঁচিবে কেমন
প্রকারে?
তোমার উপরে লিখিবে কবিতা লিখিবে লিখিবে লিখিবে।

সন্ধ্যা তোমার লিখিবে কবিতা সন্ধ্যা-মালতী অধরে
হাসিটি সারাটি বদন ভরিয়া ধরিয়াও যদি না ধরে,
মেঘ-ডম্বুর শাড়ীটি বাতাসে উড়ায়ে যখন চলিবে,
তখন সে কথা সুদূর আকাশে কালো মেঘে অনুকরিবে
গন্ধ গুঁড়ায় মুখটি ঘষিয়া টিপটি পরিয়া কপালে,
বাহির হইবে সখিজনসহ যখন পথেতে বিকালে,
রূপ-তরঙ্গ অনঙ্গ হয়ে দুলিবে যাদের হৃদয়ে,
আঁখি কটাক্ষে হেনে যাবে বাণ যাদের তুমি হে নিদয়ে
তাহারা কবিতা লিখিবে লিখিবে লিখিবে লিখিবে,
যখন যেখানে এখানে সেখানে যেভাবে যে তোমা দেখিবে।

তুমি যবে রাতে জানালা খুলিয়া শিরে এলো চুল ছড়ায়ে,
ঘুমাবে কন্যা, চাঁদ যে তোমারে জোছনায় লবে জড়ায়ে।
রাতের বাতাস জানালার পথে ফুল-সুগন্ধ মাখিয়া
ও সোনা দেহেরে চুমিয়া চুমিয়া যাইবে মরমে মরিয়া।
তাহারা তোমার লিখিবে কবিতা লিখিবে লিখিবে লিখিবে,
যখন যেখানে যাইবে সেখানে যেমনি যে তোমারে দেখিবে।
(মাহে নও, বৈশাখ ১৩৫৬, এপ্রিল ১৯৪৯)

পথ-ভোলা কবি

পথ-ভোলা কবি। গোলাপ ফুলের পল্লবে বাঁধি ঘর
গন্ধের গুঁড়া সঞ্চয় করি’ সারাটি জনম ভর,
বুলবুলিদের কণ্ঠে পুরিয়া ছড়াইছ দেশে দেশে;
রামধনুকের সাত-রঙা পথে চলেছে তা ভেসে ভেসে।

হে রঙিলা কবি! তোমার সাকীর রঙিন ঠোঁটেতে ঢুকে’
ফুলের বরণ, গজলের গানে ছড়াইছ মিঠে সুখে।
তারি এতটুকু বাঁশীতে পুরিয়া আমরা দিওয়ানা হয়ে
বিকাই কত না সমরকন্দ বোখারার সুখালয়ে।
জায়নামাজের পাটি ভিজে’ যায় তোমার ‘সুরা’র স্রোতে;
হীরামন-তোতা ডানা মেলে’ উড়ে বন্ধ সে খাঁচা হ’তে।

তোমার কথা তো মেহেদির পাতা, ঘষিতে সে রঙ ধরি’
ডুগু ডুগু করে; নতুন বধূরা অধর পেয়ালা করি’
বিলাইয়া দেয় দয়িতের ঠোঁটে সুখ-বাসরের রাতে।
চাঁদ যে ছড়ায় জোছনা-মদিরা জেগে তাহাদের সাথে।

ওগো দরবেশ! চলিয়াছ তুমি খোরমা-খেজুর ছায়ে
মেশ্ক্ হ’তে সে কস্তুরী-বাস ছড়ায়ে মরুর বায়ে;
ভূত-ভবিষ্য-বর্তমানেরে মুঠার মাঝারে ধরি’
তুমি কারিকর, গড়েছ তাদের মনের মতন করি’।
মহাকাল তব আজ্ঞাবাহক, নখ-ইঙ্গিতে তব
কত দেশে দেশে ভাঙিছে গড়িছে ইতিহাস অভিনব।

ইসমে-আজম পড়িয়া চলেছ অন্তরীক্ষ থেকে;
জীবন-কুসুম ফুটিয়া উঠিছে বেহেশ্ত গায়ে মেখে।
আমি কি তোমারে ডাক দিব আজ আমাদের আঙিনায়,
এইখানে এই ভাঙা কুঁড়ে-ঘরে কলাপাতা ঘেরা ছায়।
ক্ষুধার আহার মেলেনি যাদের, পরের ক্ষুধার লাগি’
রচিতেছে সুধা লাঙল খুঁড়িয়া দিবস রজনী জাগি;
কদাকার এই ধরণীরে যারা করেছে ফসল-বাগ,
তাহাদের পেটে জ্বলিছে চুল্লি দারুণ ক্ষুধার আগ।
তুমি কি ক্ষণেক দাঁড়াবে হেথায় তাহাদের ভাষা হয়ে,
হানিবে আঘাত অসাম্য-ভরা আজিকার লোকালয়ে?
গরীবের তরে তখ্ত তাউস্ আজো তো হয়নি গড়া;
কি করে পড়িবে তোমার নান্দী গোরস্তানের মড়া?
মিথ্যা তোমারে আহ্বানি’ কবি করিলাম অপমান;
আমরা আজিও প্রস্তুত নহি লইতে তোমার দান।
মানুষেরে মোরা দিতে পারি নাই মানুষের অধিকার;
মানুষেরে লয়ে শিখিয়াছি শুধু বিকি-কিনি কারবার।
অহমিকা ভরে একের কথারে পুরিতে আরের মুখে
ব্যর্থ প্রয়াস করিয়া ফিরিছি আমরা নকল সুখে।
হানো হানো কবি, আমাদের ’পরে নিদারুণ অভিশাপ;
জ্বলে’ পুড়ে’ যাক্ দাহনে তাহার অতীতের কৃত পাপ ॥
(মাহে নও, পঞ্চম বর্ষ প্রথম সংখ্যা, এপ্রিল ১৯৫৩, বৈশাখ,
১৩৬০)

শীতল গাঁও

আমি যাব ‘শীতল’ গাঁয়ে গাছের শীতল ছায়ে,
সেথায় ঘাসের মাদুর পাতি ডাকছে মাটির মায়ে।
শালিক কোকিল দোয়েল সেথা নিমন্ত্রণের সুরে
দূর দেশীরে ফিরছে ডাকি আকাশখানি ঘুরে।

সেথায় ঘরের ছড়িয়ে সোনা – শরষে ফুলের মাঠে
রাখাল ছেলে বাজায় বাঁশী দীঘল গেঁয়ো বাটে
চলতে পথে চরণ দুখান আদর করে ধরি,
মটরশুঁটির কোমল তৃণ শ্রান্তি যে লয় হরি।

আয়নামতি ফাঁদ পাতিয়া কালোদীঘির জল
কলমীলতায় বাঁধতে সে চায় উড়ো পাখীর দল।
তাল সুপারীর বাতান দিয়ে মেঘরে ডেকে আনে
আমার পরাণ ছুটেছে আজ সেই না দেশের পানে।
(মাসিক মোহাম্মদী, ২২শ বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা, ফাল্গুন ১৩৫৭)

ক্ষতিপূরণ

তোমারে দিলাম মোর গান
তোমারে দিলাম মোর ফুল,
প্রতিদানে আমি সে নিলাম
জীবন ভরিয়া শত ভুল।
তোমারে দিলাম মোর সুর
উজাড় করিয়া শুনো বাঁশী,
প্রতিদানে কাঁদিবে সে একা
লইয়া বুকের ক্ষতরাশি।

তোমারে দিলাম চাঁদ তারা
তোমারে দিলাম ঊষা সাঁঝ,
আমার রহিল শূন্য নভঃ
তুফান-বাহন ঘর বাজ।

তোমারে দিলাম আমি বেচে’
নিশির শিশুতে ভরা ঘুম;
যে ঘুম দীরঘ রাত্রি মোর
পরিবে না ঊষার কুঙ্কুম।

তোমার রহিল শত সুখ
তোমার রহিল যত আলো;
আমার রহিল নাকো কিছু –
তবু লাগে সবচেয়ে ভালো।

পতঙ্গ মরিয়া সুখ পায়
মানে না আগুনে কত জ্বালা,
বিজলী জ্বলিয়া মরে’ যায় –
তবু মেঘে পাতে নিতি আলা।

ভালো যে বাসিয়া কত দুখ –
সে-দুখ সহন-সুখে পুরে’
বাঁশী যে বুকের ক্ষত সহে
আকাশ বাতাস ভরি’ সুরে।
(মাহে নও, পঞ্চম বর্ষ, একাদশ সংখ্যা, ফাল্গুন ১৩৬০,
ফেব্রুয়ারি ১৯৫৪)

বনের মেয়ে

ছোট ঘরখানি, উপরেতে ছায়া মেলিয়াছে বাঁশঝাড়,
পাতার মায়ায় ভুলায়ে বাতাসে ছুঁড়িতেছে গায়ে তার।
ওধারেতে বন, লতাপাতা ফুল-ফলের আসর লয়ে,
লিখিছে লেখন অবুঝ ভাষায় কোন সে কাহিনী কয়ে।
সে ভাষায় যাহা বলিতে পারেনি, পাখীর কাকলী সনে,
কহিয়া বুঝাতে চেষ্টা করিছে বন হ’তে আর বনে।
ঘরের ওধারে জাঙলার পরে ঝিঙা ও সীমের লতা
লতায়ে লতায়ে বুঝায়ে চলিছে কি যেন মমতা কথা।

ওধারের বন, জাঙলার লতা আর ঘন বাঁশ ঝাড়,
কেউ রঙ দিয়ে কেউ দোলা দিয়ে কেউ পাতা দিয়ে তায়,
মনের মতন একটি মেয়েরে গড়িয়া যতন ভরে,
জীবন দিয়েছ রঙিন ফুলের ফোটার মন্ত্র প’ড়ে।
গহন বনের রহস্যভরা তাহার সোনার গা’য়; –
চাহিয়া দেখিতে মন যেন কোন্ সুদূরে চলিয়া যায়।
মমতা মাখান রাঙা মুখখানি, – দূর বহু কোন দূরে
কে যেন আপন, স্নেহ পাঠিয়েছে সেই অধরেতে পুরে
সে মুখের কথা কতকাল যেন শুনিয়া শুনিয়া হায়,
মমতায় নুয়ে ঘুমাইয়া ছিনু বিস্মৃত রাতি ছায়;
আজকে তাহার সোনার মুখের ঈষৎ শুনিয়া কথা,
বনের গহনে কে দোলায়ে গেল সেই পরিচয় লতা;
এত ভালো আর এত সুন্দর, এমন মমতা পরী
আমি মরে যাব আমি শেষ হব তাহারে স্মরণে ধরি।
(মাসিক মোহাম্মদী, ২১ বর্ষ, ৪ সংখ্যা, মাঘ ১৩৫৬, ২১শ
বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা)

আমার খোদারে দেখিয়াছি আমি

আমার খোদারে দেখিয়াছি আমি
গরিবের কুঁড়ে ঘরে,
দীন দুঃখীর নয়নের জল
যেথায় অঝোরে ঝরে।
অত্যাচারীর পীড়নের ঘায়
কত ব্যথাতুর কাঁদে নিরালায়,
তাদের অশ্রু গড়ায়ে পড়িছে
খোদার মাটির পরে,
আমার খোদারে দেখিয়াছি আমি
গরিবের কুঁড়ে ঘরে
তাই ত আমরা পড়িনে নমাজ
একা ঘরে নির্জনে
লোকালয়ে মোরা মসজিদ গড়ি
সব ভাই একাসনে,
জায়নামাজের পাটি আমাদের
আকাশের চেয়ে বিস্তৃত ঢের
তাই ত আকাশ লুটায়েছে হের
দুনিয়া মজিদ ঘরে,
আমার খোদারে দেখিয়াছি আমি
গরিবের কুঁড়ে ঘরে।
(মাসিক মোহাম্মদী, ফাল্লুন ১৩৪৬)