স্থাপত্য, শব্দসর্বস্ব এক ছন্দোবদ্ধ কবিতা

লেখক:

অভীক সোবহান
প্রস্তাবনা
মানুষের সৃজনশীল কর্মকা–র প্রকাশমাধ্যমগুলোর মাঝে উলেস্নখযোগ্য চারুকলা, সংগীত, সাহিত্য ও স্থাপনাকর্ম। এগুলো একে অন্যের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে, প্রায়ই একে অন্যের উপরিপতিত (ওভারল্যাপড, সুপারইমপোজড) অবস্থায় থাকে। শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমের এ-আমত্মঃসম্পর্কটা এতটাই জটিল যে, তার বিশেস্নষণ বেশ কষ্টসাধ্য। প্রায়ই এই তুলনামূলক আলোচনার উপস্থাপনা ভাবাবেগ আপস্নুত, আত্মনির্ভর (সাবজেকটিভ) ভাবধারায়
নিমজ্জিত হয়। অথচ একটি নান্দনিক স্থাপত্যকর্মকে একটি সুখদ কবিতার সঙ্গে মেলানোর প্রবণতাটি আমাদের সহজাত,
তবে তার বিশেস্নষণ আবেগতাড়িত বোধের ভুবনেই সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়। ভাবটা এমন যে, ‘স্থাপত্য তো কবিতাই, এ কে না জানে।’ কিন্তু কীভাবে কবিতা, কেন কবিতা, আদপে কবিতা কিনা, তা উহ্যই থাকে। মূলত এ-লেখাটা কবিতা ও স্থাপত্যের সেই সম্পর্কের নৈর্ব্যক্তিকতাকেই (অবজেকটিভিটি) তুলে ধরার এক সামান্য প্রয়াস।

একজন কবি ও স্থাপত্যের গীতল সংজ্ঞার্থায়ন
যুদ্ধোত্তর সত্তরের দশকের তরুণ সমাজের হতাশা ও সৃজনশীলতাকে উপজীব্য করে সালাউদ্দিন জাকি নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র ঘুড্ডি। ১৯৮০-তে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রটিতে নায়িকার সঙ্গে নায়কের পরিচয়ের সিকোয়েন্সটি প্রায় এরকম : নায়িকা (সুবর্ণা মুস্তাফা) স্থাপত্যের শিক্ষার্থী, সে আর্কিটেকচার-বিষয়ক ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখে অডিটরিয়াম ত্যাগ করছে। নায়ক (রাইসুল ইসলাম আসাদ) উদ্ভ্রামত্ম নিহিলিস্ট এক তরুণ, কিছুটা হিপোক্রেসির আশ্রয় নিয়ে নায়িকাকে অভিভূত করতে পা–ত্য জাহির করছে, এই বলে – ‘আর্কিটেকচার? ফ্রোজেন ফর্ম অফ মিউজিক!’ তর্জমা করলে দাঁড়ায় ‘সংগীতের হিমায়িত রূপই স্থাপত্য’। সত্যিই, প্রায় তিনশো বছর হতে চলল তবু ১৮২৯ সালে ইকারম্যানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মহাকবি গ্যেটে (Johann Wolfgang von Goethe, 1749-1832), যিনি বলেছিলেন – ‘Music is liquid architecture; Architecture is frozen music.’ – তা আজো স্থাপত্যকলার সব থেকে জনপ্রিয় সংজ্ঞার্থরূপে বিবেচিত। নৃবৈজ্ঞানিকভাবে আমাদের এও জানা যে, দৃশ্যলব্ধ (ভিজ্যুয়াল) অথবা উপস্থাপনযোগ্য (পারফর্মিং) সব শিল্পমাধ্যমের মাঝে প্রাচীন ঘরানাটি হলো সংগীত। আর তাই তো এখনো একটি শিশু প্রাথমিকভাবে ছন্দোবদ্ধ শব্দ ও তালের সঙ্গেই তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। আর মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রাগৈতিহাসিক সেই যুগে স্থাপত্য আর সংগীতই ছিল আদি মানুষের প্রথম সৃজনশীলতা, যা আজো পৃথিবীব্যাপী পাথুরে গুহায় দুরমত্ম বাইসনের ছবির সঙ্গে মিশে আছে। সেই আদি বোধকে তুলে ধরার ক্ষমতা কেবল থাকে একজন ইওহান ফন গ্যেঁটে বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের; একজন কবিই কেবল তা পারেন। কেননা তিনি শ্রম্নতিধর, আবার দ্রষ্টাও বটে। একজন কবিই উচ্চারণ করেন স্থাপত্যের গীতলতম সংজ্ঞার্থ।
মানবসভ্যতার অপর নাম তার আশ্রয়বিজ্ঞানের বা আর্কিটেকচারের ক্রমউৎকর্ষতা। সেই প্রস্তরযুগের মানবেরা খুঁজে নিয়েছিল পাথুরে গুহায় নিজস্ব আশ্রয়, সভ্যতার প্রথম পদক্ষিপ – যার নাম ‘কেভ আর্কিটেকচার’ বা ‘সুড়ঙ্গ বা গুহা স্থাপত্য’। তারই ধারাবাহিকতায় সিন্ধু, নীলনদ, দজলা-ফোরাত অববাহিকায় গড়ে ওঠে সেই সব মরুস্বর্গ শহর। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা পেয়েছি পিরামিড হয়ে তাজমহল, চীনের মহাপ্রাচীর হয়ে আজকের শততলা আকাশছোঁয়া অট্টালিকার বাহার। তবু সেই প্রথম আশ্রয়, প্রাগৈতিহাসিক বসতবাটি আজো মিশে আছে রক্তের মাঝে কবিতার ব্যঞ্জনায়। এ-প্রসঙ্গে অডেনের (W. H. Auden, 1907-73) শেষদিকের গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ অ্যাবাউট দি হাউসের (১৯৬৬) কথা স্মরণ করা প্রয়োজন। গ্রন্থের কবিতাগুলোয় কবি যে ‘বসতঘরে’র কথা বলেছেন, তা আসলে একটি মিথ অথবা একটি কাল্পনিক পরিসর অথবা শৈশবের স্মৃতি। কিংবা ইট-পাথরের এক নস্টালজিয়া, যা পুনর্বার মনে করিয়ে দেয়, বস্ত্ত ও মানুষের হারিয়ে-যাওয়া আমত্মঃসম্পর্কগুলো। কেননা, মনে রাখা দরকার, সভ্যতার ধারাবাহিকতা বস্ত্তত আশ্রয় নামক স্থাপত্যেরই ক্রমবিবর্তন। তাই তিনি বলেন, ‘বসতবাড়ির নিচের ভূগর্ভস্থ ভাঁড়ারঘর হয়তো বসবাসের জন্য নয়, তবু সে মনে করিয়ে দেয়, এই উষ্ণ বাতায়নময় সিঁড়ির ওপরের ঘরের মূলে আছে সেই জলময় চুনাপাথরের ভেজা গুহা। আমাদের প্রথম বসতবাটি, এক দৈবআশ্রয়, যতবার হিমযুগ ফিরে এসেছে। যা (ভাঁড়ারঘর) আমাদের মনে জেগে ওঠে অধিগ্রহণের একটি গর্তরূপে, যা মানুষের গন্ধে গড়া।’

নন্দনকাননের দ্বৈরথ : চারুকলা ও ব্যবহারিক নকশা
জানামতে, স্থাপত্যকলার সর্বপ্রথম তাত্ত্বিক হলেন রোমান প–ত ভিতরুভিয়াস (Marcus Vitruvius Pollio, BC 80-15)। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে দি আর্কিটেকচার নামে দশ খ–র একটি গ্রন্থ রচনা করেন। সে-গ্রন্থটি আজো স্থাপত্যবিদ্যার প্রথম পাঠ হিসেবে অ্যাকাডেমিতে সমাদৃত। সে-গ্রন্থে ভিতরুভিয়াস স্থাপত্যের প্রধান তিনটি নিয়ম ব্যাখ্যা করেন, যা ‘ভিতরুভিয়ান নীতি’ হিসেবে পরিচিত। যথাক্রমে : ইউটিলিতাস, ফারমিতাস ও ভেনাসতাস। তিনি মনে করতেন, আর্কিটেকচার হলো প্রকৃতির এক পরিবর্তিত রূপ, যেমন – পাখি বা মৌমাছিরা তাদের বাসা বাঁধে, সেভাবেই মানুষ তার ঘরবাড়ি নির্মাণ করে প্রকৃতির নানা উপাদান দিয়ে। আর মানুষের এই আশ্রয়ে থাকা চাই তিনটি বিষয় : এটা হতে হবে সুদৃঢ়, হতে হবে কার্যকরী ও অবশ্যই হতে হবে সুন্দর। এই বিবেচনায় চারুকলার (ফাইন আর্ট) সঙ্গে কারুশিল্প (ক্রাফট) ও ব্যবহারিক নকশার (ডিজাইন) একটা বিশেষ পার্থক্য আছে। তা হলো ইউটিলিতাস বা ইউটিলিটি। বাংলায় বললে ব্যবহার-উপযোগিতা বা কার্যকারিতা। কেননা, স্থাপত্যের মতো ডিজাইন বা নকশাশিল্প মূলত ফাংশনাল, তার সরাসরি ব্যবহার-উপযোগী হওয়ার প্রয়োজন আছে। যে-রকম দায়িত্ব একটি কবিতা বা চিত্রকলাকে নিতে হয় না। একজন কবি বা চিত্রশিল্পীরও দায় থাকে, সে-দায় নৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক কিংবা সামাজিক। একইভাবে মানবিক বা সামাজিক দায় স্থপতি বা একজন নকশাকারের থাকলেও, একইসঙ্গে ব্যবহার-উপযোগী সামগ্রী উৎপাদনের দায়িত্বটাই তাঁর কাছে প্রধান হয়ে ওঠে। একটি টেবিল যদি লেখার উপযোগীই না হয়, একটি জানালা যদি আলো-বাতাসই না দেয়, তবে তার সৌন্দর্য অসার। তবু নান্দনিক শিল্পকর্মের এ বিসত্মীর্ণ প্রামত্মরে – যেখানে একইসঙ্গে দেখা মিলে স্থাপত্য, রন্ধনকর্ম, গার্ডেনিং, ফ্যাশন ডিজাইন, নগরপরিকল্পনা বা আর্বান পস্ন্যানিং তথা ব্যবহার-উপযোগী ডিজাইন কর্মকা- এবং অপরদিকে কবিতা, সংগীত, নৃত্যকলা, ভাস্কর্য, থিয়েটার বা সিনেমাটোগ্রাফির মতো স্বতঃস্ফূর্ত আর্টের বসবাস, সেখানে ইউটিলিটি বিষয়টি ভিন্ন হলেও এরা সবাই নন্দনতত্ত্বের সমত্মান। তাই কবিতা ও স্থাপত্য পরস্পরের সমার্থক; কেননা, তাদের দ্বৈরথযাত্রা ছন্দের অনমত্ম-আঁধারে সমাপতিত। তাছাড়া স্থপতি মারকাস ভিতরুভিয়াসই তো বলেছেন, ‘ডিলাইট বা আনন্দ’ বিষয়টি নিজেই একটি ‘উপযোগিতা বা ইউটিলিটি’ হিসেবে গণ্য। আর শিল্পমাত্রেই এই নান্দনিক রসের প্রতিভূ; হোক তা লুই কানের (Louis I Kahn, 1901-74) নকশাকৃত ‘অ্যাসেমবিস্ন বিল্ডিং’য়ের মতো রাষ্ট্রব্যবস্থার ‘সিম্বল’ অথবা এলিয়টের (T. S. Eliot, 1888-1965) ওয়েস্টল্যান্ডর মতো কাব্যগাথা।

ছন্দের সংসারের দুই সহোদরা : কবিতা ও স্থাপত্যকলা
কবিতা যদি হয় শব্দ-ছন্দের খেলা, তবে স্থাপত্য আকার-ছন্দের নানা প্রকাশ। এটা বুঝতে হলে প্রথমত উপাদান (এলিমেন্ট) এবং ছন্দের (রিদম) সম্পর্কটা মনে রাখা প্রয়োজন। এই এলিমেন্ট হতে পারে শব্দ অথবা আকার-আয়তন। সময়ের সাপেক্ষে শব্দের বা কোনো কিছুর পুনরাবৃত্তিই হলো ছন্দ। এই ‘সময়’ বিষয়টি নানামাত্রায় ছন্দের সঙ্গে বিন্যস্ত হয়। সময়ের এই সাপেক্ষতা সংগীতের তালের ক্ষেত্রে সহজে বোধগম্য। কবিতার ছন্দের ‘ধ্বনিভিত্তিক’ রিপিটেশনের বা মাত্রার
ব্যবহার, তাও আমাদের জানা। তবে তার ‘সময়ভিত্তিক’
ছন্দ বিষয়টি সংগীতের চেয়ে জটিল। এটি নির্ধারিত হয় একটি শব্দ থেকে অন্য একটি শব্দ বা বাক্য থেকে বাক্যে রিডিংয়ের মাঝে যে-সময়ের সাপেক্ষতা যা শব্দের মাত্রাভেদ, তারই সুষ্ঠু ব্যবহারে কবিতা-ছন্দের জন্ম। তবে মজার বিষয় হলো, কবিতায় একই সঙ্গে সংগীত ও চিত্রকলার বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। ভিজ্যুয়াল আর্টের ক্ষেত্রে ছন্দ বিষয়টি বেশ জটিল; কেননা, শুধু ঘড়ির কাঁটায় এটা ধরা যায় না। আমরা ধরে নিই, একটি পেইন্টিং যখন দেখি তখন একসঙ্গেই দেখতে পাই পুরোটা। আসলে এর মাঝেও আছে কবিতার মতো নিয়মাবদ্ধ শব্দ-ব্যবহার বা মিউজিকের সঠিক নোটেশনের ব্যবহার। অর্থাৎ পেইন্টিংয়ে আঁকা এলিমেন্ট, জিওমেট্রি, রঙের পার্থক্য, টেক্সচারের রিপিটেশন বা পুনরাবৃত্তির ফলে যে-ভেরিয়েশন সমগ্র ক্যানভাস জুড়ে থাকে; তা চোখ দিয়ে দেখার মাঝেও আছে অণুক্ষুদ্র সময়ের ব্যবধান। যা মসিত্মষ্কে এনে দেয় ছন্দের নান্দনিকতা। তবে অনুধাবনের পরম্পরায় শুধু সময়ে নয়, মনের চোখেও ফুটে ওঠে ছন্দের ব্যবহার। নানা দৃষ্টিকোণের বদলেও পাই ভিন্ন ডাইমেনশন। নতুন আবিষ্কারের মাঝে থাকে পুনঃপুন আনন্দ, ঠিক সংগীতের নানা অভিজ্ঞতা বা কবিতার নান্দনিকতার মতো, যা আমাদের ব্যক্তিগত স্পন্দনের (ইমপালস) সঙ্গে মিলেমিশে এক অপার ঐকতান তৈরি করে। স্থাপত্যকলার ছন্দও এর ব্যতিক্রম নয়। সেখানে বরং কবিতার শব্দভিত্তিক সময়নির্ভর তাল-মাত্রার পাশাপাশি চিত্রকলার যে-ছন্দ তার সন্ধানও মিলে। যখন একটি মহান স্থাপত্যকর্মের পরিসর বা স্পেসগুলোতে আমরা ঘুরে বেড়াই, হতে পারে সেটি বিশ্ববরেণ্য তাজমহল অথবা আমাদের বসতবাটি। সেই চেনা বা অচেনা ভবনকাঠামোর প্রতিটি পরিসর অতিক্রমের সময় দেখতে পাই নানা জ্যামিতির নিয়মিত বিরতিতে আসা-যাওয়া। কখনো তা কড়িবর্গায়, কখনো সদৃশ জানালা বা দরজার পুনরাবৃত্তিতে। আবার সেই ছন্দ চোখে পড়ে একনজরে সমগ্র কাঠামো জুড়ে ঠিক চিত্রকলার মতো অথবা কবিতা পড়ার আনন্দে ঘর থেকে ঘরে, উঠান থেকে বারান্দায়। ছন্দোবদ্ধভাবে দ-ায়মান সুন্দর অনুপাতের পিলার বা রেলিংয়ের ব্যবহারে জেগে ওঠে ক্যাবিক কম্পোজিশন। গোথিক গির্জার উঁচু চূড়ায় অথবা মসজিদের সুসজ্জিত গম্বুজের রসবোধ আমাদের অভিভূত করে, এর নান্দনিকতা নির্মাণসামগ্রীর রং আর বুনটের খাঁজে-খাঁজে। ঘুলঘুলি আর খিড়কি পথে আসা
আলো-বাতাসের রূপক ও বিমূর্ত ব্যবহারে পস্নাবিত হয় মন, ঠিক যেন সুররিয়াল কাব্যমালা। আরো আছে সামগ্রিকভাবে, টোটালিটিতে মানসপটে চিত্রকল্প-নির্মাণের কৃৎকৌশল। তাই মহান স্থাপত্যকর্ম মাত্রই এক-একটি ছন্দোবদ্ধ কবিতা। আর প্রতিটি স্থাপত্যকর্ম যদি হয় এক-একটি কবিতা তবে একটি নগর হলো এক মহাকাব্য।

কবিতা, এক শরীরসর্বস্ব স্থাপত্য
সাহিত্যের সঙ্গে স্থাপত্যের সম্পর্কটা যে কতটা সরাসরি তা ফকনারের (William Faulkner, 1897-1962) স্থাপত্যভাবনা থেকে বোঝা যায়। তার বেশিরভাগ উপন্যাসের পটভূমিতে ‘আর্কিটেকচার’ ও ‘সিটি’ একটা বড়ো জায়গা দখল করে আছে। কম করে হলেও ফকনারের পাঁচ-ছয়খানা উপন্যাসের নামকরণের সঙ্গে বসতি বা স্থাপনা বিষয় জড়িয়ে আছে। তেমন দু-একটা নাম হলো – সাঙচুয়ারি, পাইলন, দি ম্যানসন, দি টাউন ইত্যাদি। তিনি বলেন, ‘The art of architecture like the art of literature was indeed a ‘part of life’ and did contribute to the culture and civilization of a not ‘ungrateful posterity’. তাই একজন স্থপতি সহসাই হয়ে ওঠেন কবিতার পাঠক। নান্দনিক সুখানুভূতি শুধু নয়, কবিতা আরো বেশি কিছু দেয়। একটি কবিতা একজন স্থপতিকে নিয়ে যায় শব্দের মধ্যকার সূক্ষ্ম স্পেসগুলোতে, বর্ণের রঙিন খেলার জগতে। সেইসঙ্গে দৃশ্যকল্প, রূপকের ব্যবহার – এসবই বিদ্যমান যেমন কবিতায়, তেমনি স্থাপত্যকলায়। আর দুটি বিষয়ই বেশ খানিকটা বিমূর্ত, ফলত প্যারাডক্সিক্যালও বটে।
এ-তো গেল কবিতার বায়বীয় দিকগুলো যা স্থাপত্যেও আছে। এ-মিলগুলো মনের চোখে দেখে নিতে হয়, বুঝে নিতে হয় জ্ঞান ও বিবেচনায়। এখন আসা যাক, এর কাঠামো বা মূর্ত-শরীর বিষয়ে। প্রথমেই যদি লক্ষ করি তবে দেখব, গদ্য থেকে পদ্যকে প্রায় আশি ভাগ সময় পৃথক করা হয় শুধু তার কম্পোজিশন (বিন্যাস) দেখে। মূলত দৃশ্যমান কাঠামো বুঝে নিয়েই আমরা ঘোষণা করি, কোনটি পদ্য আর কোনটি গদ্য। স্প্যানিশ সাহিত্যতাত্ত্বিক মাহরিয়া ফ্যামব্রানো (María Zambrano,1904-91) মনে করেন, ‘কবিতা হলো শব্দের সংখ্যাগত ঐকতান’। ঠিক যেমনটি বলা যায় স্থাপত্যের ক্ষিত্রে। একটি স্থাপনার আঙ্গিক বা ফর্ম হলো বিভিন্ন জ্যামিতিক উপাদানের আনুপাতিক বিন্যাস। সে-কারণেই কাগজের বুকে অক্ষরের বিন্যাস দেখে, তার আনুপাতিক অবস্থান, লাইনের রিপিটেশন, শব্দের হারমনি ইত্যাদি দেখেই একটি পদ্যকে ভিজ্যুয়ালি শনাক্ত করা যায়। কবিতাপ্রেমীদের সবার জানা ফরাসি কবি আপোলিন্যার (Guillaume Apollinaire,1880-1918) কথা। বিশেষত তাঁর বেশ কিছু ক্যালিওগ্রাম কবিতার কথা। যেখানে অক্ষরকে সাজিয়ে কবিতার মূলভাব প্রকাশে ফুটে উঠেছে কোনো ছবি, কোনো শেপ বা আকার। বৃষ্টির ধারার মতো বৃষ্টিবিষয়ক কবিতা কিংবা বিশেষ কোনো জ্যামিতিক বিন্যাস। এমনকি দুর্গ (আর্কিটেকচার) সদৃশ কবিতা। আমাদের দেশের সৈয়দ শামসুল হকের (জন্ম ১৯৩৫) দৃশ্যমান যোদ্ধার অবয়বে লেখা ‘গেরিলা’ বা স্থপতি কবি রবিউল হুসাইনের (জন্ম ১৯৪৩) জ্যামিতিক কম্পোজিশনে লেখা কবিতা ‘চারকোণা ত্রিভুজ’ নিঃসন্দেহে ভিজ্যুয়াল আর্টের দৃষ্টিকোণ থেকে মানোত্তীর্ণ। এ-ধারার কবিতার একটি আন্দোলন গড়ে ওঠে ডাডাইজম ও সুররিয়ালিজম (পরাবাস্তব) মুভমেন্টের কিছু পরে। একই সঙ্গে আর্ট, আর্কিটেকচার ও লিটারেচারে সে-আন্দোলন প্রকাশিত হয়, নাম ‘কিউবিজম’, কবিতার ক্ষিত্রে লিটারারি কিউবিজম। পরবর্তীকালে পঞ্চাশের দশকে ‘কংক্রিট পোয়েট্রি’ নামে একটি সফল দৃষ্টিনন্দন কাঠামোনির্ভর কবিতা-আন্দোলন গড়ে ওঠে। কংক্রিট পোয়েট্রির ইশতেহারে বলা হয়েছে – ‘Concrete poetry begins by being aware of graphic space a structural agent’. তবে এ-বিষয়ে আর্ট ক্রিটিক ও কবি মঈন চৌধুরীর (জন্ম ১৯৪৮) একটি কথা না যোগ করলেই নয়, তিনি বলেন – ‘ক্যালিগ্রাম, লিটারারি কিউবিজম বা কংক্রিট পোয়েট্রি ছাড়াও কেবল কবিতার শরীর ও বিস্তার নিয়েও বিভিন্ন রকম জ্যামিতির সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘ কবিতা, ছোট কবিতা, চতুর্দশপদী, লিমেরিক ইত্যাদি নামে পরিচিত কবিতাও বহুমাত্রিক জ্যামিতিক উপস্থাপন।’ এসব ঠিক যেন স্থাপত্যের – অল্পই বিস্তর (মডার্নিজম), বিস্তরই সুন্দর (গোথিক) কিংবা বড়ই নান্দনিক (মনুমেন্টাল মুভমেন্ট) ইত্যাদি আকারনির্ভর প্রকাশের মতো। যেখানে সর্বদাই ফর্ম বা আঙ্গিক নির্মিত হচ্ছে তার কাঠামোর বুনটে, বিন্যাসব্যবস্থা ও পরিসরের সঙ্গে তার ভাব তথা কনসেপ্ট প্রকাশের মধ্য দিয়ে। ঠিক এ-জায়গায় এসেই কবিতা হয়ে উঠছে মূর্ত স্থাপত্যকলা বা আর্কিটেকচারাল আর্ট। একইভাবে স্থাপত্য হয়ে যাচ্ছে নিরেট, জমাটবদ্ধ কবিতা বা কংক্রিট পোয়েট্রি। যারা উভয়েই আধুনিক শিল্পকলার প্রধান ব্যাকরণ অর্থাৎ সময়-পরিসরকে (টাইম-স্পেস) বিবেচনায় রেখে কাঠামোগতভাবে (স্ট্রাকচারাল) প্রকাশিত হয় এবং তা করে তাদের ভিজ্যুয়াল অসিত্মত্বকে স্বীকার করে।

স্থাপত্য, এক শব্দবহুল কবিতা
হয়তো বাড়ি বা অট্টালিকার আদলে একটি কংক্রিট কবিতা অনেকেই দেখে থাকবে। কিন্তু তাত্ত্বিক-আলোচনার বাইরে আদৌ কি কবিতার মতো কোনো স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব? ক্রিয়েটিভিটির খেলায় কোনো অসম্ভবই অসম্ভব নয়। তাই কিছুকাল আগে সে-চেষ্টাও করা হয়ে গেল। মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষক কবি অ্যানি ফ্রিঞ্চ ও স্থপতি বেন জ্যাক দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি কর্মশালার মাধ্যমে প্রদর্শন করেছেন কী করে একটি কাব্যিক স্থাপনাকর্ম (ইন্সটলেশন আর্ট) নির্মাণ সম্ভব। তাদের মতে, ‘এই দুই শিল্পের আঙ্গিক তাদের প্রবণতার দিক দিয়ে সদৃশ। তাদের (আর্কিটেকচার অ্যান্ড পোয়েট্রি) আনুপাতিক কাঠামো-নির্মাণপ্রণালি, পরিবেশ ও প্রতিবেশের প্রতি তাদের সংবেদনশীলতা, এই সকল উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন।’ এভাবে কংক্রিট পোয়েট্রি ও ইন্সটলেশন আর্ট হয়ে যাচ্ছে এক অভিন্ন প্রকাশ। তবু কথা থেকে যায়, উত্তরাধুনিককালের বহুমাত্রাগত (পস্নুরালিজম), উত্তরকাঠামোবাদী (পোস্ট স্ট্রাকচারালিজম), বিনির্মাণ (ডিকন্সট্রাকশন) যে পেস্নফুলনেস, ডিসপেস্নসমেন্টের মতো ক্রিটিক্যাল দার্শনিক-তত্ত্ব, তা কবিতা বা চিত্রকলায় সম্ভব হলেও কী করে স্থাপত্যচর্চায় প্রযুক্ত হবে? কেননা, তার (আর্কিটেকচার) দায় রয়েছে কার্যকারিতায়। কেননা, স্থাপত্যের শেষাবধি একটি কাঠামোগত রিজিডিটি রয়েই যায়, তাই তাকে হতে হয় সমরূপ বা ইউনিফর্ম। দৃশ্যমান বহুমাত্রিকতা এখানে দুরূহ। আশ্চর্য হলেও সত্য, এর উত্তরও আজ থেকে বেশ আগে আশির দশকেই মিলেছে। বিনির্মাণধারার স্থপতি অধ্যাপক আইজেনম্যান (Peter Eisenman, 1932) ও স্বয়ং ডিকন্সট্রাকশন-তত্ত্বের প্রবক্তা দেরিদা (Jacques Derrida, 1930-2004) যৌথভাবে প্রস্তাব করলেন, ‘ডিকন আর্কিটেকচার’। তারই ধারাবাহিকতায় স্থপতি আইজেনম্যান, জাহাহাদিদ, বার্নাড সুমির স্থাপত্যকর্ম ধ্রম্নপদী সেই পিথাগোরিয়ান (Pythagorous of Samos, BC 571-495) ‘ঐকতান সৌন্দর্যের পূর্বশর্ত’ তত্ত্বকে বাতিল ঘোষণা করে। আমাদের দীর্ঘদিনের স্থাপত্যের সঙ্গে যে-কাঠামোর স্থিতাবস্থা (ইকুলিব্রিয়াম), যে-ঐকতান ও আদর্শিকতার বোধ অমত্মর্গত হয়ে আছে, তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলেন তাঁরা। তাঁরা বলেন, আধুনিক মানুষের ‘সুইট হোম’ কনসেপ্টটি একটি ভ্রামত্ম ধারণা। বরং নাগরিক জটিলতা ও মনোবৈকল্যই তার প্রাপ্তি এবং কবিতাসহ শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমে এই বাস্তবতা নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে – শুধু স্থাপত্য এক ভ্রামত্ম আদর্শিক জগতে বর্তমান। তাই তাঁদের ডিজাইনকৃত বাড়িঘরগুলো করুণ ও ভয়ার্ত রসে উদ্ভাসিত। অ্যাবসার্ড কবিতার বিমূর্ততায় প্রকাশিত এবং চূড়ামত্মভাবে নাসিত্মবাদকে (নিহিলিজম) প্রশ্রয় দেয় এসব সমকালীন বিল্ডিং ওয়ার্ক। আইজেনম্যানের ওপর তাত্ত্বিক সালাউদ্দীন আইয়ুবের বাংলায় একটি চমৎকার লেখা আছে। লেখাটা পড়লে তা থেকে ডিকন্সট্রাকশন ধারাটি না-বোঝা গেলেও পিটার আইজেনম্যান কী করে খারিজ করে দেন ঘরবাড়ির আশ্রয়-উপযোগিতা নামক সংস্কার, তা বোঝা যায়। সত্যি বলতে নাগরিক সংস্কৃতিতে বিশৃঙ্খলা, আশ্রয়হীনতাই মানুষের নিয়তি। ফলে সমকালীন সহিত্য, শিল্পকলা, স্থাপত্যকলা সেটিই প্রকাশ করার প্রবণতায় ব্যস্ত। তাই ব্যবহারকারী ও দর্শনার্থীর কাছে এক দুরূহ বিষয় হয়ে দাঁড়ায় এসব পোয়েট্রিক আর্কিটেকচার। তাই পিটার আইজেনম্যান বলেন, ‘আমি ভালোবাসি খেলা। খেলার মাঝ দিয়ে দেখিয়েছি এটা গভীর ও সিরিয়াস একটা কাজও বটে।’ কথাগুলো পড়লে মনে হবে, ঠিক যেন জয়েসের (ঔধসবং ঔড়ুপব, ১৮৮২-১৯৪১) ইউলিসিস (১৯২২) কিংবা বেকেটের (Samuel Beckett, ১৯০৬-৮৯) ওয়েটিং ফর গডোর (১৯৫৩) মতো অ্যাবসার্ড, জটিল নান্দনিকতায় উদ্ভাসিত। স্থপতি আইজেনম্যান আরো বলেন, ‘আমি তো ঘরবাড়ির মিস্ত্রি নই, আমার এক-একটা কাজ এক-একটা টেক্সট – পাঠকের উচিত তা পড়ে দেখা’। ওদিকে দার্শনিক রোলা বার্থ (Roland Gérard Barthes, ১৯১৫-৮০) তো বলেছেনই, লেখার মাঝে
ব্যক্তি-লেখক থাকেন না, ফরাসিতে তিনি লিখেছিলেন লা মোর (খ) দো লুথা (র) বা দ্য ডেথ অথ দি অথর। ঠিক সে-কারণেই একবিংশ শতাব্দীতে এসে একজন দর্শক একটি স্থাপত্যের শরীরে জেগে
থাকা অক্ষর-শব্দগুলো পাঠ করতে বাধ্য হন, সাহিত্যে বা দর্শনের
তত্ত্বের মতো করে। একইভাবে একজন ক্রিটিক্যাল রিডারকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে হয় একটি কবিতার শরীরের ভাঁজে
জেগে-থাকা পরিসরগুলো, ছন্দের গায়ে লেগে-থাকা জ্যামিতিক বিন্যাস।