কবিতা অ্যালকহল এবং মারিয়ার গল্প

অনেকদিন আগে কোরিয়ার সওল শহরে

এখনো মনে আছে আমার

উনিশশো বিরানব্বই সালের এক সন্ধ্যারাতে

আমরা কয়েকজন বসেছিলাম এক কফিশপে

কিম হোটেলের গ্রাউন্ডফ্লোরে বুকাক পর্বতের পাদদেশে

শীতের মাত্র শুরু তখন

তবু বাতাস ছিলো কেমন কনকনে

একটু আগে আমরা রামাদা থেকে হেঁটে এসেছি

এই ঠান্ডায় এই সন্ধ্যায় এই অপরাহ্ণের হাওয়ায়

আমরা কয়েকজন

কবিতা মেলা ছেড়ে চলে এসেছি এইখানে

বার এবং কফিশপ মেশানো রেস্তোরাঁয়

কয়েকজন কয়েক দেশের বসেছি এই আলোছায়াতে

কোরিয়ার লী

ডক্টর ইশিহারা প্রফেসর ইউটাকা জাপান থেকে

পরিপূর্ণ যুবতী এক টেরেসা মারিয়া হারনানদেজ

ফিলিপিনের মেট্রো-ম্যানিলা থেকে

মারিয়া দীর্ঘাঙ্গী, সুপুষ্ট শরীর চোখের আলোতে মায়া

এবং অস্তিত্বময় আন্দোলিত সঘন গহন এক ভঙ্গি

লী ছাড়া আর কেউ কেউ নয়, সকলেই কবি

লী কোরিয়ার মেলার অন্যতম কর্ণধার

এবং সংগত কারণেই আমাদের হোস্ট

বলা হয়নি, সকলেরই উদ্দেশ্য কিছু কঠিন পানীয়গ্রহণ

লী আশ্চর্য ভদ্রলোক নম্র ভদ্র উত্তেজনাহীন

এবং কবি ও কবিতার কাছে নিবেদিত

পানীয়ের জন্যে লী প্রথম উচ্চারণ করলো

মে বি উই গো ফর সাম সর্ট অফ অ্যালকহল

লী হোস্ট সে-কারণেই অন্য সবাই উচ্চারণ করলো

দ্যাটস ইট দ্যাট্স ওকে

আমি কেমন ক’রে যেন বলতে পারলাম

আমার জন্যে নয়

সবাই অবাক হলো,

বিস্মিত হলো টেরেসা মারিয়া হারনানদেজ

অবিশ্বাস্য এক দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে

বললো, তুমি কি একজন ধার্মিক লোক

এ রিলিজিয়াস পারসন, এ ডিভাউট মোসলেম

অবিশ্বাসের গভীর থেকে যেন ফিসফিস করে উঠলো মারিয়া

আর ইউ, রিয়েলি?

তুমি কি এ-কারণেই হার্ড ড্রিংক নাও না

ওর মন খারাপ দেখে আমার খুব দুঃখ হলো

হাসলাম, বললাম আমি জানি না বিশ্বাস করো

আমি জানি না

তারপরও তুমি… কবিতা

বললাম তারপরও আমি কবিতা লিখি

লী মাঝখানে কথা বললো এবার, ফরগেট

 ফরগেট ইট পোয়েট্রি হ্যাজ নাথিং টুডু উইথ অ্যালকহল

এরপর রাত ক্রমশ গভীর হতে থাকলো

কিম হোটেলের সেই মাতাল মৌতাতে

আর ওপারের বিশাল বুকাক পর্বতমালার আত্মায়

পাতার শব্দে বাতাসের শরীরে অরণ্যের গন্ধে

মারিয়া টেরেসা হারনানদেজের দিকে তাকালাম আমি

অদ্ভুত এক বিস্ময় তার চোখের সিক্ত বিপন্নতায়

আবার জিজ্ঞেস করলো মারিয়া

তুমি কেন মদ্যপান করো না, সে কি তোমার বিশ্বাস থেকে

বললাম বিশ্বাস অবিশ্বাস থেকে নয় অভ্যাস থেকে

আমি তো শুধু কবিতাতেই বিশ্বাস করি, ক’রে আসছি

হেসে খুব সাধারণভাবেই বললাম

এবং কবিতার বিশ্বাসতো সর্বগ্রাসী

আমি তো সেই বিশ্বাসকে নিয়েই মাতাল থাকি সর্বক্ষণ

অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়

 আমার সকল বিশ্বাসে সকল ধ্যানে এবং চৈতন্যে

এই নেশা এই ঘোর আর এই শব্দ-নিঃশব্দতা ছাড়া

যেন আর কিছু নেই থাকে না থাকবে না কোনোদিন

আবদুল গাফফার মালয়েশিয়ার কবি

 সে অনেকক্ষণ পরে এই প্রথম কথা বললো

আমার দিকে তাকিয়ে বিপুল এক স্থৈর্যের মধ্য থেকে উচ্চারণ করলো

ফজল চলো আমরা নাটককে পরিহার করি, এই আলোচনা থেকে

আমাদের সংলাপ থেকে

আফটার অল উই আর হিয়ার ফর এ ড্রিঙ্ক ওনলি

এখানে নাটকের অবকাশ কোথায়

কবিতা আসলে এখন লাগামছাড়া

আশা করি তুমি কিছু মনে করছো না ফজল

গ্লাসে আর একটা সিপ নিয়ে সশব্দে হাসলো এবার

মালয়েশিয়ার কবি অনেক কনিষ্ঠ আবদুল গাফফার

তোমার এই মাতাল বিশ্বাসের মধ্যে আর কী কী আছে

শুধালো মারিয়া

আছে কি রমণীর উদ্ভাস এবং তার বিশাল বিপুল তরঙ্গ

তার অন্ধস্রোত তার নির্মম কাম

তার ইহপরকালব্যাপী নিশ্ছিদ্র আলিঙ্গন

আছে কি তার স্বপ্নের বিষণ্নতা দৃষ্টির অন্তর্ভেদী শর

আছে কি রমণীর সেই প্রকৃতি তোমার মাতাল সেই পৃথিবীতে

হাসলো মৃদু, শুধালো মারিয়া আবার

তুমি কি আসলেই মাতাল সর্বগ্রাসী কবিতায়? কেমন ক’রে?

আমি তো আসলে নিজেই জানি না কী সে ঝড়ো হাওয়া

যা আমার মধ্যে এক ধরনের এক মাতাল ধ্বনিকে

ক্ষণে ক্ষণে উন্মাদ ক’রে তোলে

 সেই বাতাস কেবলি বয়ে যেতে থাকে ভারি হতে থাকে 

প্রসারিত হতে থাকে বিপুল হতে থাকে আমি জানি না

 কেমন ক’রে কেন কার জন্যে কার আহ্বানে সেই বাতাস

 কেবলি অশ্রুতে ভ’রে যায় শ্রাবণের মতো কান্নায় উথাল পাথাল হয়

আমি জানি না তবু মনে হয়

 সেই বাতাস আছে সবকিছুতে সবখানে সবার মধ্যে

সবকিছু থেকেই এই মাতাল বাতাস আমার অস্তিত্বে নেমে আসে

আমার মধ্যে সংক্রামিত হয় বয়ে যেতে থাকে

যেমন এই ধরিত্রী এই আকাশ অন্তরীক্ষ সমুদ্র মহাসমুদ্র

মরুভূমি শুষ্কপত্র বালুকারাশি জীবনানন্দের স্তব্ধ উটের গ্রীবা

লাল হিজল ফুল যেখানে ভেসে যেতে থাকে সারা দুপুর

সেই একাকি খাল ছায়া একটি কী দুটি মাছ পুটি কিংবা খলশে

যেমন তুমি হারনানদেজ পরিপূর্ণ আর থইথই আমার সামনে

একটি অচেনা শহর যেমন এখানকার সওল

কিংবা অনেক দূরের কুয়ালালুম্পুর কলম্বো অথবা চেন্নাই

একটি বিষ্ণু কফিশপ আর এই যেমন কিম হোটেলের নিচে রেস্তোরাঁ

 যেখানে কয়েকজন কবি কবিতাপ্রেমী ব’সে আছি

অ্যালকহলের মধ্যে আবিষ্কার করতে চেষ্টা করছি

নতুন সমুদ্রকে ঘনিষ্ঠতম চোখের জলকে কান্নার নতুন অবয়বকে

যেমন একটি নদী যার শব্দের সংগীতের কোনো শুরু নেই

শেষ নেই অথবা একজন সন্ত পুরুষ যিনি বিরতিহীন এবাদতে মগ্ন

প্রার্থনার ক্রমাগত শরীরে নিমজ্জমান

 কিংবা ব্যাংককের কোনো ম্যাসেজ পার্লারে

 নিষ্পাপ রমণীর ওষ্ঠযুগল তার মুখ তার একান্ত সংলাপ

একটি মসজিদ একটি মন্দির সবুজ পাতার সমারোহ

 চুম্বনের দাহ এবং রমণী সঙ্গম আর প্রজননের অবিশ্বাস্য ধারাক্রম

সবকিছু

সবকিছুতে আছে সেই বাতাস কেমন ক’রে আমি নিজেই জানি না

শুধু জানি আমি ডুবে যাচ্ছি

এই মাতাল অস্থিরতার অবিনশ্বর এক সরোবরে

ডক্টর ইশিহারা বললেন, হি লুস্ স্পেলবাউন্ড

মেট্রো-ম্যানিলার মারিয়া টেরেসা হারনানদেজ

এবার ভয় পেয়ে গেলো

আমার দিকে তাকিয়ে বললো, মাই গড ইউ আর ম্যাড ইনসাইড

 তুমি তোমার ভেতরের সকল বাসনা সকল উচ্চারণ আর

সকল অস্তিত্ব জুড়ে প্রবল এক উন্মাদ

এরপর একবিন্দু পান না করেও আমি হেসেছিলাম

বলেছিলাম না, আমি জানি না

এছাড়া আর কিইবা করতে পারতাম

বললাম না, আমি একজন উন্মাদ নই

বলতে চাইলাম আমি এক পরমানন্দময়

গভীর আবিষ্টতার মধ্যে ডুবে আছি মাত্র

লী কবি নয়

 সে কবিতার পাঠক কবিতার ভক্ত কবিতার মধ্যে ডুবে

থাকতে চায় শুধু এবং আড্ডা ক’রে ক্রমাগত কবিদের সঙ্গে দেশের বিদেশের

লী আমার দিকে তাকালো যেন বলতে চাইলো সবাইকে

আসলে ও নিজের মধ্যে একজন কবিকে লালন করছে

লালন ক’রে চলেছে আজীবন অবিরাম বিরতিবিহীন

মদ্যপান না ক’রে কি আমি ভুল করেছি

মনে হলো কোথায় যেন সবকিছু গোলমাল হয়ে গেছে

আমার ভালো লাগছে না কিছুই

আবার লী কথা বললো

ইনাফ, লেস গো টু দ্য মাউন্টেনন

 মারিয়া টেরেসা হারনানদেজ বললো, চলো যাই

 কিন্তু সবাই যেতে রাজি হলো না পর্বতের কাছে

আলো অন্ধকারময় বাতাসে

আমি চোখে বিষণ্ণতা নিয়ে তাকালাম

 গাফফারের দিকে – গাফফার বললো যাব

আসলেই, অ্যালকহলের ঘোর আর কবিতার ঘোর

কখনো এক হতে পারে?

মধ্যরাতে বুকাক পর্বতের আলো অন্ধকার থেকে

 ফিরে আসছিলাম আমরা

 হঠাৎ মারিয়া বললো, আমার ভালো লেগেছে তোমার কথা

 তুমি মিথ্যে বলো নি

পর্বত থেকে ফিরে এসে কফিশপে বসলাম

দেখলাম আমি আর হারনানদেজ

মারিয়া ওয়েটারকে বললো

আমি এক পেয়ালা কফি পান করতে চাই

আমি অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে

কফি এলে মারিয়া বললো

চলো আগামীকাল তোমার সঙ্গে যাই হংকং

আবার বললো কফি খেতে খেতে, যাবে?

বিস্ময় ছিল আমার কণ্ঠে, জানি না

মারিয়া বললো, আমি জানি আমি কবি নই কবিতা লিখি মাত্র

জানি সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি

কিন্তু আমি চাই আমি তোমার মতো সত্য কথা বলি, বলতে পারি

বললাম তুমি কেন যেতে চাও হংকং

 তোমার সঙ্গে সমুদ্র আকাশ পাহাড় পাখি স্কাইস্ক্র্যাপার

সারা শহরময় আলোর প্লাবন

এবং বহুদূরাগত নক্ষত্রকণার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুম্বনের কাছে

 নিজেকে সমর্পণ করবো বলে

আমি কবিতার কাছে যেতে চাই

মারিয়া টেরেসাকে বললাম কবিতা তো আছে সবখানে

তাকে শনাক্ত করো

তাকে গ্রহণ করো

তাকে অস্তিত্বের সবখানে ঘনিষ্ঠ ক’রে নাও

বিশ্বাসের ভালোবাসার আনন্দের দুঃখের

প্রার্থনার বোধের মননের

যে ঘোর আছে দশদিক ভরানো উপচানো তরঙ্গে

তার মধ্যে নিজকে সমর্পণ করো

আসলে জীবনের সকল উচ্চারণের মধ্যেই

 তাকে শনাক্ত করো কবিতা

আন্দোলিত মারিয়া কফি খেতে খেতে সেইদিন

স্বগতোক্তির মতোন ক’রে উচ্চারণ করেছিলো

 কেউ কেউ নয় আসলে সকলেই কবি

শুধু কেউ কেউ কবিতা লিখতে পারেন কবিতা লেখেন