নূরজাহান
ইমদাদুল হক মিলন
হাতেখড়ি, ঢাকা
প্রথম পর্ব : ১৯৯৯
দ্বিতীয় পর্ব : ২০০২
দাম : প্রথম পর্ব ১৫০ টাকা
দ্বিতীয় পর্ব ২৫০ টাকা
সমকালীন বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের আলোকে গ্রামীণ চিত্র অর্থবহ, শিল্পসম্মত ও আবশ্যিকতার প্রশ্নে খুব কম উপন্যাসেই উপস্থিত। ঐতিহাসিক পটভূমিকায় রচিত মহাকাব্যিক যে-সব উপন্যাস গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবিদার সেগুলোর মধ্যে আবুজাফর শামসুদ্দীনের (১৯১১-৮৯) পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৭৪), শহীদুল্লা কায়সারের (১৯২৭-৭১) সংশপ্তক (১৯৬৫), হরিপদ দত্তের (জন্ম ১৯৪৭) অজগর (১৯৮৯-৯১) এবং সেলিনা হোসেনের (জন্ম ১৯৪৭) গায়ত্রী সন্ধ্যা (১৯৯৪-৯৬) উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় রচিত শামসুদ্দীন আবুল কালামের (১৯২৬-৯৭) কাঞ্চনগ্রাম (১৯৯৮) এবং সৈয়দ শামসুল হকের (জন্ম ১৯৩৫) বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ (১৯৯৮) অগ্রগণ্য। শহীদুল্লা কায়সারের কবে পোহাবে বিভাবরী (মুক্তিযুদ্ধচলাকালে রচিত এবং আলাদাভাবে গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত শহীদুল্লা কায়সার রচনাবলী-৪ [১৯৮৯]-এ অন্তর্ভুক্ত) এবং হুমায়ূন আহমেদের (জন্ম ১৯৪৮) জোছনা ও জননীর গল্প (২০০৪) যেমন ব্যাপ্তি ও বিশালতার প্রশ্নে মনোযোগ আকর্ষণ করে, তেমনি আবু ইসহাকের পদ্মার পলিদ্বীপ ও হরিপদ দত্তের জন্ম জন্মান্তরও (২০০০) বাংলাদেশের উপন্যাস-পরিমণ্ডলে বিশিষ্ট সংযোজন। ইমদাদুল হক মিলনের (জন্ম ১৯৫৫) নূরজাহানও বহুবিধ কারণে আমাদের উপন্যাস-অঙ্গনে একটি মাইলফলক।
সরলরৈখিকভাবে মিলনের উপন্যাসগুলোকে দুটি সাধারণ ভাগে বিভাজন করা চলে – একটি হলো গ্রামীণ সামাজিক প্রেক্ষাপটে স্থাপিত কাহিনীকেন্দ্রিক; অন্যটি হলো শহুরে সমাজে তরুণ-তরুণীর প্রেম-ভালোবাসাকেন্দ্রিক রচনাগুলো। এর বাইরে মিলন আরো যে-দুটি অনুষঙ্গকে
আশ্রয় করেন সেগুলো হলো, মুক্তিযুদ্ধ এবং প্রবাসে বাঙালির জীবনচিত্র। বাঙালির প্রবাসজীবন-চিত্রায়ণে ইমদাদুল হক মিলন সম্ভবত বাংলাদেশের অগ্রগণ্য কথাসাহিত্যিক।
তরুণ-তরুণীর ভালোবাসার কাহিনী-নির্মাণে তিনি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তবে গ্রামীণ জীবন-রূপায়ণে মিলন একজন সফল কথাকার।
প্রথম উপন্যাস যাবজ্জীবন সেই সফলতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। পরবর্তীকালে গ্রামের মানুষ, এর প্রকৃতি এবং মননের পরিচর্যা তাঁর যে-সকল উপন্যাসে গভীর মনস্কতার এবং সুনিপুণ বিশ্লেষণে উপস্থিত সেগুলোর মধ্যে ভূমিপুত্রকে সর্বাগ্রে স্মরণ করা যায়। নূরজাহান বোধহয় সে-জীবননির্মাণে তাঁর শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ পাবার যোগ্য। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত প্রথম পর্বদুটিতে (অনুমান করতে কষ্ট হয় না লেখক এর তৃতীয় পর্বের দিকে এগুবেন) যে সুবিশাল কলেবরে (২৬৯+৪৩২= মোট ৭০১ পৃষ্ঠা) তিনি যৌক্তিকভাবে বিবিধ কাহিনীর সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সামগ্রিক এক জীবনচিত্রকে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করেছেন, তা বহুবিধ কারণেই সমকালীন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যধারায় ‘অনন্যসাধারণ’ অভিধা-লাভের যোগ্য। আর সেসব উপকাহিনীর জটাজালের ভেতর দিয়ে প্রচণ্ড শক্তিমত্ততায় প্রকাশিত হয়েছে যে-বিদ্রোহী সত্তাটি, তার নাম নূরজাহান – একজন সাধারণ নারী।
নূরজাহান দবির গাছির মেয়ে। ওর মা হামি। মিলন এদেরকে নিয়েই উপন্যাসের উপক্রমণিকা করেছেন। আর আছে বিক্রমপুর অঞ্চলের প্রকৃতি। সে-প্রকৃতির প্রথম প্রতিনিধি হলো খেজুর গাছগুলো, যেগুলোর নিঃসরিত রস বিক্রি করে দবির গাছির অন্ন জোটে। শেষ হেমন্তে উত্তুরে হাওয়ার প্রবাহ শুরু হতেই দবির গাছি বোঝে সময় হয়েছে গাছেদের – রস দেওয়ার সময় হচ্ছে এবার। কাঁধের হাড়ির ভাঁড় যখন সে খেজুর গাছতলায় নামায় পিতৃব্য এক প্রীতি-আচ্ছন্ন করে ফেলে তাকে –
একবার এই গাছটির গায়ে পিঠে হাত বুলায় আরেকবার ওই গাছটির। পাগলের মতো বিড়বিড় করে বলে, মা মাগো, মা সগল, কেমুন আছ তোমরা? শইল ভাল তো? কেঐর কোন ব্যারাম আজাব নাই তো, বালা মসিবত নাই তো?
উত্তুরে হাওয়ায় শনশন করে খেজুরডগা। সেই শব্দে দবির গাছি শোনে গাছেরা তার কথার পিঠে কথা বলছে। ভাল আছি বাজান, ভাল আছি। ব্যায়াম আজাব নাই, বালা মসিবত
নাই (পৃ ১৫)।
প্রকৃতির এই যে সন্নিকট দবির মাঝি এবং তার পরিপার্শ্ব, সেখানে একটি হিংস্র আগন্তুক হলো ঢাকা থেকে বিক্রমপুরের দিকে আসা বিশাল উঁচু সড়কটি। নগরায়ণের এই ইঙ্গিত ঔপন্যাসিক প্রারম্ভিক পর্যায়েই দিয়েছেন, যার ভবিষ্যৎ অনেক অশুভের সম্ভাবনাকেই স্পষ্ট করেছে। সবচেয়ে তীব্রটি হয়েছে শরীরী নূরজাহানের উপর। কথা আর আচরণে শিশুবৎ –
এই ফাল্গুনে তেরো পূর্ণ হবে নূরজাহানের। কিন্তু তাকে দেখায় বয়সের চেয়ে অনেক বড়। নূরজাহানের শরীর বেশ বাড়ন্ত। সীতারামপুরের হাতপাকা কারিগরদের তৈরি ডুরে শাড়ি পরছে বছরদুয়েক হল। শাড়ি পরলে বাড়ন্ত শরীরের কিশোরী চোখের পলকে যুবতী হয়ে যায়।
তেমন যুবতী নূরজাহান হয়েছে বছরদুয়েক আগে (পৃ ০৯)।
এই যে খেজুর গাছ-পরিবেষ্টিত দবির গাছি আর নূরজাহান – ঔপন্যাসিক কিন্তু তাদেরকে পূর্ণ সমাজবাস্তবতায় উপস্থাপন করেছেন।
আবার ওই যে নূরজাহানের শরীর, তা কিন্তু ওকে প্রথম থেকেই বিপদের দিকে ঠেলতে থাকে, প্রথম বিপদ আমরা দেখতে পাই বড় রাস্তার মাটির কাজে সাব-কন্ট্রাক্টর আলী আমজাদের দিক থেকে। গালে-মুখে বসন্তের ভয়াবহ দাগওয়ালা দশাসই শরীরের আলী আমজাদ প্রথম থেকে টোপ ফেলতে থাকে ওর ওপর। খুব যে সফলতার দিকে এগোয় তা-ও কিন্তু না – লেখক নূরজাহানের বিদ্রোহী চেতনাটাকে ক্রমে ক্রমে তুলে এনেছেন প্রথম থেকেই। আলী আমজাদ একজন বৃদ্ধ মাটিয়ালকে লাথি মারলে নূরজাহান কটমট করে ওঠে, ‘আপনেও একটা খাসি। আপনে মানুষ না।’ ওর এই বিদ্রোহী সত্তা শুধু এমন অন্যায় আর বিপদের বিরুদ্ধেই না, সামাজিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধেও। ও যে পুরুষ নয় – সে বুঝ ওকে দেওয়ার জন্য ওর মা হামির কত না চেষ্টা। হামির প্রলাপ : ‘এমুন মাইয়া আল্লার দুইন্নাইতে দেহি নাই। এমুন আজাজিল (আজরাইল) আমার পেডে অইছে। বুইড়া মাগি অইয়া গেছে তাও সবাব (স্বভাব) বদলায় না। ঐ গোলামের ঝি তুই কী বেডা যে সব জাগায় তর যাওন লাগব!’ শাসনের গলায় হামি আরো বলে, ‘বাড়ির বাইরে এখান পাও তুই দিতে পারবি না। তর বাপে হেদিন আমারে কইছে আমি যেমতে তোরে চালামু অমতেঐ তর চলন লাগব।’ কিন্তু এ-নিষেধের বিরুদ্ধে বিস্ফোরণ ঘটায় নূরজাহান, ‘না আমি চলুম না, তোমার ইচ্ছায় আমি চলুম না, আমি আমার ইচ্ছায় চলুম’ (পৃ ৫০)। নূরজাহানের দ্রোহী সত্তার প্রথম এ-প্রকাশ থেকে পাঠক ক্রমাগত আশঙ্কিত হতে থাকেন ভবিতব্য নূরজাহানের জন্য কী নিয়ে অপেক্ষা করছে।
পাঠকের সে-আশংকা তীব্রতর হয়ে ওঠে পরবর্তী পরিচ্ছেদগুলোতেই। নূরজাহানের সঙ্গে ওর মায়ের বিতণ্ডার একটি পরিচ্ছেদ-পরই উপন্যাসে মাওলানা মান্নানের অনুপ্রবেশ। এখানেই প্রথমবারের মতো একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি ঘটেছে। শুধু উপস্থিতিই নয় নূরজাহানের সঙ্গে তাঁর সংঘাতও ঘটে গেছে তাৎক্ষণিকভাবে। সন্দেহ নেই নূরজাহান ও মাওলানা মান্নানের প্রথম সংঘাতের চিত্রটি ঔপন্যাসিক এঁকেছেন যথেষ্ট মর্মস্পর্শী করে। তাদের সংলাপের মূল বাক্যগুলো এমন : দউবরার মাইয়া না তুই?
…
আমার বাপের নাম দউবরা না, দবির গাছি। … আমার বাপরে কোনওদিন দউবরা কইবেন না।
কইলে কী হইব?
নূরজাহানের প্রায় মুখে এসে গিয়েছিল, কইলে দাড়ি টাইন্না ছিড়া ফালামু…।
এতবড় মাইয়া এত ফরফর কইরা বেড়াচ ক্যা? যেহেনে যাই ওহেনেঐ দেহি তরে! …আর যাইতে পারবি না।
… ইঃ যাইতে পারব না। আপনে কি আমার বাপ লাগেন যে আপনের কথা আমার হোনন লাগব?
… আমার মুখের উপরে এতবড় কথা! তরে তো আমি জবেহ কইরা ফালামু। তরে তো কেঐ বাচাইতে পারব না। মজিদের ইমাম অইলে অহনঐ সাল্লিশ (সালিশ) ডাকাইয়া আমি, ল্যাংটা কইরা তর পিডে দোররা মারতাম।…
… আপনে আমার এইডা করবেন। পচা মলবি কিচ্ছু জানে না খালি বড় বড় কথা! … আপনেরে দেখলে মনে হয় একখানা খাডাস (খাটাস), রাজাকার।
না, নূরজাহান মান্নান মাওলানার সামনে আর দাঁড়ায়নি। ছুটতে ছুটতে চলে গেছে মনে আনন্দ নিয়ে – বাপকে দউবরা বলার যথার্থ প্রতিশোধ নিয়েছে সে। তবে পাঠককে সে নিমজ্জিত করে গেছে অতল এক আতঙ্কে। পাঠক বুঝে গেছে ‘দোররা’ থেকে বাংলাদেশের নূরজাহানকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। যদিও সেটি অনেক পরের ঘটনা। দ্বিতীয় পর্বের শেষ পর্যন্ত কাহিনী সেখানে পৌঁছায়নি। দুটি পর্ব ধরেই যেন পরিপ্রেক্ষিত নির্মিত হয়ে চলেছে।
এই নূরজাহান কিন্তু এমন শিশুটি থাকছে না খুব বেশি দিন। প্রকৃতিগত যে-অগ্রসরণ, সেটি তো আছেই – ভালো লাগার মানুষ মজনু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলে শরীরের ভেতর অদ্ভুত রোমাঞ্চ বোধ করে সে (পৃ ৬৮)। আবার অন্যদিকে মা হামি তো তাকে জ্ঞান দিয়েই চলেছে – শরীর-বিষয়ক জ্ঞান, নারীর শারীরিক পবিত্রতা-বিষয়ক জ্ঞান। দেহ নিয়ে গ্রামীণ নারীর সংস্কার এবং একজন বাঙালি সাধারণ নারীর যে-উদ্বেগ নূরজাহান ও হামির কথোপকথনে প্রকাশ পেয়েছে তা সত্যি প্রশংসার যোগ্য। হামির শেষ কথা হলো : ‘মনে রাখিচ, স্বামীর ঘরে একদিন যাইতে হইব, শইলডা বাচায় রাখিচ। নষ্ট শইল স্বামীরে দেওনের থিকা বড় পাপ এই দুইন্নাইতে নাই। ঐ পাপখান কোনওদিন করিচ না’ (পৃ ১১৯)।
ইতোমধ্যে ঔপন্যাসিক যে-কাজটি করেছেন তা হলো, মাওলানা মান্নানের কুৎসিত চরিত্রটিকে প্রয়োজনমতো ঘৃণ্য করে তুলেছেন। সামগ্রিকভাবেই মাওলানা মান্নান একটি ঘৃণ্য প্রাণীতে রূপান্তরিত হলেও কয়েকটি বিশেষ ঘটনা চরিত্রটির নির্মাণে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। তার বাড়ির কাজের লোক কাশেমের সঙ্গে মাওলানার জঘন্য ব্যবহার এবং দবির গাছির কাছ থেকে নেওয়া রসের দাম না দেওয়া সেগুলোর অন্যতম। দবির মাঝির সঙ্গে বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে প্রচণ্ড রেগে ওঠে মাওলানা :
নিজে যেমুন মাইয়াডাও অমুন বানাইছস। ডাঙ্গর মাইয়া, দিন নাই রাইত নাই যেহেনে ইচ্ছা ওহেনে যায়, যার লগে ইচ্ছা তার লগে রঙ্গরস করে। আমারে কয় রাজাকার। হেইদিনের ছেমড়ি ও রাজাকারের বোজে কী? হ আমি রাজাকার আছিলাম, কী হইছে? আমি অহনও রাজাকার, কী হইছে? আমার এখখান পশমও তো কেঐ ছিঁড়তে পারে না। কোনওদিন পারবও না। রাজাকারগ জোরের তরা দেকছস কী? জোর আছে দেইখাই প্রেসিডেন্ট জিয়া রাজাকারগ কিছু করতে পারে নাই, এরশাদ কিছু করতে পারে নাই। উল্টা, রাজাকারগ মন্ত্রি মিনিস্টার বানাইছে’ (পৃ ১৬৭)।
এবং এ-ঘটনাটির শেষ পর্যায়েই নূরজাহানের নিয়তি যেন আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে যখন মাওলানা মান্নান বলে : ‘বাপ বেডি দুইডাই শয়তান। বাপে কয় আমি মানুষ ঠকাই মাইয়ায় কয় রাজাকার। রাজাকার যহন কইছে রাজাকারের কাম আমি কইরা ছাড়ুম। ল্যাংটা কইরা ঐ ছেমড়ির পাছায় আমি বেতামু।’
দবির গাছির সঙ্গে মান্নান মাওলানার এই বিতণ্ডা যেন নূরজাহানের বিদ্রোহী সত্তাটিকে আরো তেজিয়ান করে তোলে। মাওলানা তার বাপকে অপমান করেছে জানার পর নূরজাহানের বারবার ইচ্ছে হতে থাকে মান্নান মাওলানাকে অপমান করতে। আর সে-ভাবনারই এক পর্যায়ে ওর চাপা ক্ষোভ : ‘আমি যে কেন মাইয়া হইয়া জন্মাইছি! আমি যে কেন পোলা হই নাই!’ তার সে-ক্ষোভ কিন্তু প্রকাশ পেতে খুব বেশি দেরি হয়নি। মাকুন্দা কাশেমকে যখন মান্নান মাওলানা শয়তানি করে গরুচুরির দায়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয় ভয়াবহ সে-ঘটনাটি ঘটে তখনই। কাশেমকে পুলিশ বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে শুনতে পেয়ে নূরজাহান দৌড়ায় সেদিকে। এতক্ষণ কাউকে কিছু না বললেও নূরজাহানের প্রশ্নের উত্তরে কাশেম আদ্যোপান্ত ঘটনা খুলে বলে, যার ভেতর ছিল গ্রামের প্রতি ওর সত্যিকার ভালোবাসা। বুকের ভেতর ফুঁসে ওঠে তীব্র ঘৃণা। অনেক তীক্ষè কথা বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু সেসবের কিছুই না বলে নূরজাহান মাকুন্দা কাশেমের মাথার ওপর দিয়ে একদলা থুতু ছিটিয়ে দেয় মান্নান মাওলানার মুখে। গ্রাম্য এক কিশোরীর শতশত লোককে স্তব্ধ করে দেওয়া এই ঘটনা দিয়ে শেষ হয় নূরজাহান ১ম পর্ব।
ঘটনাটির পরিণতি-ভাবনা মুহূর্তেই শঙ্কিত করে তোলে নূরজাহানকে। আতঙ্কিত সে আশ্রয় নেয় মজনুর মা (প্রকৃতপক্ষে খালা) মরনির কাছে। নূরজাহান-মরনি-দবির গাছি-হামিদার শ্বাসরুদ্ধকর এবং আতঙ্কগ্রস্ত এই পর্যায়টি উপন্যাসটির ২য় পর্বের শুরুটিকে অত্যন্ত গতিশীল করে তুলেছে। যদিও কলেবর-বিবেচনায় ২য় পর্বটি দীর্ঘতর হলেও নূরজাহান-আশ্রিত মূল কাহিনীর বিস্তার সেখানে কম। তুলনায় বেশি প্রসার লাভ করেছে আনুষঙ্গিক উপাখ্যানগুলো। তবে সূক্ষ্মভাবে নূরজাহান-চরিত্রের
যে-বিকাশ ঘটেছে তা হলো ওর পুরুষ হতে চাওয়ার গভীর আকাক্সক্ষা। প্রথম পর্বের সাব কনট্রাক্টর আলী আমজাদ, মান্নান মাওলানা এবং মাওলানা-পুত্র আতাহার – সবাই ২য় পর্বটিতে অধিকতর সক্রিয়। তবে মাওলানার সক্রিয়তার চূড়ান্ত সম্ভব হয় তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর। মাওলানা-পুত্র আতাহারের জন্য বিয়ের কনের সন্ধান দিতে এসে ঘটক বসির যখন মাওলানাকে ধর্ম-অনুযায়ী আরো একটি বিয়ের অনুরোধ জানায় তখনই কথা-প্রসঙ্গে বেরিয়ে আসে হিংস্র মান্নানের গোপন অভিসন্ধি। জানা যায়, সে বিয়ে করতে আগ্রহী একই গ্রামের দবির গাছির মেয়ে নূরজাহানকে।
২য় পর্বে নূরজাহানের চেতনাগত সমৃদ্ধি তত স্পষ্ট নয়। তবে তাকে দূরে রেখে সুকৌশলে ঔপন্যাসিক ওর চেতনার একটি প্রতীকী সমৃদ্ধি ঘটিয়েছেন হাসুর ভেতর দিয়ে। হাসু এবং তার ফুফু রহিমার আখ্যানটি ২য় পর্বে যথেষ্ট বিস্তারেই রচিত হয়েছে। রহিমা এসেছিল মাওলানা মান্নানের বাড়িতে কাজের মেয়ে হয়ে। বাড়ির পুরুষগুলোর অনাচারে ক্লিষ্ট সে। পরে এসেছে হাসু। দারিদ্র্যের কশাঘাতে উপায়হীন হাসুও রহিমার অবস্থানেই, যদিও মননগত শক্তিতে ভিন্ন। রহিমা নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি পুরুষ-পরিবার-সদস্যদের হাত থেকে, তবে হাসু পেরেছে, সন্ত্রস্ত হাসু আল্লাহর কাছে রহম চেয়েছে। প্রার্থনা করেছে তাকে পুরুষ করে দেওয়ার জন্য। এবং ২য় পর্বের সমাপ্তির নিকটবর্তীকালে আমরা জানতে পারি হাসু এখন আর মেয়ে নয়, সে পুরোপুরিই একজন পুরুষ। পুরুষের জামাকাপড়-পরিহিত হাসুর বক্তব্য : ‘অহন আমার কোন ডর নাই। যহন যেহেনে ইচ্ছা আমি যাইতে পারুম, যেহেনে ইচ্ছা হুইতে পারুম, যেই কাম ইচ্ছা করতে পারুম, আমার মিহি কেঐ চাইয়াও দেকব না। অহন পুরা দুইন্নাইডাঐ আমার। … এই দুইন্নাইডা মাইয়াছেইলার না, এই দুইন্নাইডা অইল পুরুষপোলার। আমি অহন পুরুষ পোলা’ (পৃ-৪১২)। লিঙ্গান্তরের এমন ঘটনা সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম নূরজাহানেই ঘটেছে।
এ-উপন্যাসের একটি অপ্রতিরোধ্য অনুষঙ্গ হলো দারিদ্র্য। গ্রামীণ সমাজে দারিদ্র্যের যে-দুর্বহ চিত্র তা এ-উপন্যাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে। তবে সবচেয়ে বেশি বোধহয় অনুভব করা গেছে আজিজ গাওয়ালের পরিবারের কাহিনীতে। ওর মা ছনুবুড়ি শুধু দুমুঠো ভাতের জন্য কত না ছলচাতুরী মিথ্যাচার করেছে আপনজনদের সঙ্গেও। শেষে মারা গেছে মেটে তেল খেয়ে। ক্ষুধার জ্বালা ছনুবুড়িকে মেটে তেল খেয়ে পেট ভরাতে উৎসাহিত করেছিল। দারিদ্র্যের এমন চরমতম দ্বিতীয় উদাহরণটি হলো আজিজের স্ত্রী বানেছার শিশুসন্তানের মৃত্যু। আজিজ সদ্যজাত ওই
কন্যাসন্তানটি অসুস্থ হলেও ডাক্তারের কাছে নেয়নি। শেষে মৃত্যু হলে তাকে কাফন না দিয়েই ভাসিয়ে দেয় পানিতে। দাফন-কাফনে টাকা খরচ করে কী হবে – স্বামী-স্ত্রী দুজনেই এমনটি ভেবেছিল। পরিবারে অনেক সন্তানের আগমনে ক্লিষ্ট এই আজিজ শেষ পর্যন্ত শহরের হাসপাতালে গিয়ে ভ্যাসেকটমি করায়।
নূরজাহান উপন্যাসটিতে লেখকের একটি প্রচেষ্টা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি শুধুমাত্র একটি চরিত্রকে প্রয়োজনানুগ প্রেক্ষাপটে চিত্রিত করেননি, বরং সামগ্রিক একটি গ্রামীণ দারিদ্র্যক্লিষ্ট প্রেক্ষাপট রচনা করেছেন, যার ভেতর থেকে নূরজাহান নামের একজন নারী মানুষ-চরিত্র নিয়ে বেরিয়ে আসতে চায়। এই যে আজিজ, তার স্ত্রী বানেছা, ওদের মা ছনুবুড়ি – এরা সবাই আসলে নূরজাহানদের সাথে সম্পর্কিত। প্রতিবেশী অথবা পারস্পরিক সম্পর্কের আরো অনেকগুলো এমন মানুষ, কিন্তু উপন্যাসটি নতুন নতুন আলাদা আলাদা আখ্যান-নির্মাণে সচেষ্ট, যাদের সামগ্রিক রূপটি হলো নূরজাহান নামের উপন্যাসটি। প্রথম পর্বের এমন আরো একটি আখ্যান রচিত হয়েছে তছিকে ঘিরে।
তছি পাগলিনী। ঢাকায় থাকা গ্রামের যুবক এনামুল রিকশা নিয়ে এলে তছির ইচ্ছে হয় রিকশায় চড়তে। রিকশাওয়ালা রুস্তম ভুলিয়ে ভালিয়ে ওকে নিয়ে গেল মুরলিভাজা খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে দূরের বাজার কোলাপাড়ায়। সেখানেই ঘটল ঘটনাটি। তছির সরলতার সুযোগে রিকশাওয়ালা আসলে ওর শরীরটাকে ভোগ করতে চাইছিল। আর তা বুঝতেই চেহারা বদলে গেল তছির।
রুস্তমের গলার গামছাটা এমনভাবে গিঁট দিয়ে ফেলল যে, সে-ফাঁসে আটকে মারা গেল রিকশাওয়ালা। তখন থেকেই তছি আর ওর মায়ের আশংকা কখন পুলিশ এসে তছিকে খুনের মামলার আসামি হিসেবে ধরে নিয়ে যায়। আর সে-ভাবনাতেই যেন তছির পাগলামি আরো বেড়ে যায়। মাথা আরো বেশি গরম মনে হয় ওর। মায়ের কাছে বায়না ধরে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু মা যখন ওকে মাথা ন্যাড়া না করার জন্য বোঝাতে থাকে রাগ হয়ে যায় তছির। চেঁচিয়ে বলে : ‘ঐ মাগি এত প্যাঁচাইল পারচ ক্যা! নাইড়া করতে কইছি কর, নাইলে তরেঐ আমি নাইড়া কইরা দিমু’ (পৃ ২৫৯)। তার তখনই যেন পাঠকের মন জয় করতে কথাকারের খেলা। তাই ঔপন্যাসিক তখন লেখেন : ‘তছির এই রাগারাগিতে নয়, নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টায়, বাঁচিয়ে রাখবার আশায় পাগল মেয়েটির যে অসহায় আকুতি সে কথা ভেবে জলে চোখ ভরে গেল তছির মায়ের। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে তছির চুলে কাচি চালাতে লাগল সে।’ ২য় পর্বে তছির কাহিনী আর বিশেষ এগোয়নি। কিন্তু ১ম পর্বে তছি-কাহিনী যে-মর্মান্তিকতায় বর্ণিত হয়েছে তা যে-কোনো পাঠককে স্পর্শ করে সহজেই।
২য় পর্বে অন্য যে-আরেকটি উপকাহিনী বিস্তারলাভ করেছে সেটি হলো আতাহারকে নিয়ে। মান্নান মাওলানার ছেলে আতাহারকে লেখক মান্নানের একটি সত্যিকারের সম্পূরক হিসেবে চিত্রিত করেছেন। কুৎসিত এই চরিত্রটি যেন তার লালসাকে নিবৃত্ত করতেই প্রচেষ্ট। চারপাশে যে-কোনো নারীর অবস্থানই তাকে যেন ভোগস্পৃহায় উন্মত্ত করে তোলে। বড়ভাইয়ের স্ত্রী পারুর সঙ্গেও তার একই সম্পর্ক। স্ত্রী-গর্ভজাত সন্তানরাও প্রকৃতপক্ষে আতাহারেরই। আর এ-তথ্য মাওলানারও অজানা নয়। মাওলানা-পত্নী তা জানে বলেই আতাহারের জন্যে যখন বিয়ের কনে দেখার প্রশ্ন উঠেছে সে
প্রস্তাব করেছে, আতাহার বড়ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী পারুকে বিয়ে করুক। কিন্তু মান্নান মাওলানা গররাজি। পুত্রকেও সে এ-ব্যাপারে নিজের দলে টেনেছে প্রধান যে-যুক্তি দিয়ে, তা হলো আতাহার সম্পন্ন ঘরের একটি মেয়েকে বিয়ে করলে অর্থসম্পদ আসবে, সামাজিক সমৃদ্ধি আসবে।
ইমদাদুল হক মিলন তাঁর নূরজাহানের কাহিনী নির্মাণ করেছেন বিক্রমপুর এবং এর সংলগ্ন অঞ্চলের পরিপ্রেক্ষিতে। সে-অঞ্চলের ভাষার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আচরণ, সংস্কার ও বিশেষ পেশার মানুষগুলোর পরিচয়ও উঠে আসে ক্রমে ক্রমে। নূরজাহানে গাওয়াল বা হাজাম পেশা তেমনই একটি উদাহরণ। আর এভাবেই উপন্যাসটি সামাজিক স্তরবিন্যাসেরও একটি অনন্য দলিল হয়ে ওঠে। বহু পাঠকের মতো বর্তমান আলোচকও ঔপন্যাসিকের কাছে এর ৩য় পর্ব সমাপ্তির দ্রুত প্রত্যাশা করেন।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.