চাকরি

চাকরিটা চলে গেল সুমাইয়ার।

বৃহস্পতিবার বিকেলে চিঠিটি পেয়ে সে তাজ্জব বনে গেল। তখন হন্তদন্ত এক সময়। অফিস ছুটির ঠিক আধঘণ্টা আগের পরিবেশ। টেবিল গুছিয়ে ওয়াশরুম সেরে রেডি হয়ে বেরোনোর প্রতিযোগিতা ফ্লোরে। কে কার আগে লিফটের লাইনে গিয়ে দাঁড়াবে, তাই নিয়ে ঘড়ি দেখাদেখি। হাতে ধরা রুম-চাবির মতো পাঞ্চ কার্ড। ছুটির পর এক সেকেন্ডও আর থাকতে ইচ্ছে করে না অফিসে। অসহ্য লাগে।

ঠিক সে-সময় সাদা খামের এ-চিঠি ওর হাতে ধরিয়ে দিলো মানবসম্পদ বিভাগের পিয়ন মানিক মিঞা।

গৎবাঁধা ইংরেজিতে লেখা ক-খানা মাত্র বাক্য, ইয়োর জব ইজ নো মোর রিকোয়ার্ড ইন দ্য কোম্পানি ফর ব্রেকিং এমপ্লয়ি ডিসিপ্লিন উইথ ইফেক্ট ফ্রম জুলাই টেন, টু থাউজেন্ড টোয়েন্টি ফাইভ। প্লিজ কনট্যাক্ট অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্ট ফর ইয়োর ফাইনাল পেমেন্ট (ইফ অ্যানি)।

চক্কর দিয়ে উঠল সুমাইয়ার মাথা। চোখে অমাবস্যার রাত। সে এ-কোম্পানিতে এমন কী করে ফেলেছে যে, চাকরিটাই  শেষমেশ চলে গেল? কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না এর কারণ।

গতকালও সিইও সাহেব উদ্দীপক মেজাজে ছিলেন। ওকে দেখে হাসিমুখে বলে উঠলেন, ‘নতুন ডিপার্টমেন্ট কেমন লাগছে সুমাইয়া ম্যাডাম?’

উত্তরটি ওর মুখেই ছিল। সুযোগ পাওয়া মাত্র উগড়ে দিলো, ‘স্যার, এনায়েত সাহেবের সঙ্গে কাজ করা যায় না। এরকম শর্টটেম্পার আর ইনসেইন লোকের সঙ্গে কাজ করা অসম্ভব স্যার। দরকার হলে চাকরি ছেড়ে দেবো স্যার। তবু এ-ধরনের ফালতু লোকের সঙ্গে আমি কাজ করতে পারব না।’ বলে কাঁদো-কাঁদো ছলছল চোখে তাকিয়ে রইল সিইওর দিকে।

চশমার ফাঁক দিয়ে বস আসাদ করিম অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন সুমাইয়ার দিকে। লোকটি এমনিতে হাসিখুশি সদাপ্রফুল্ল মানুষ। কিন্তু চেহারার দিকে তাকিয়ে ভেতরের কথা মালুম করা যায় না। মাঝে মাঝে লোকটিকে জটিল প্রকৃতির বলে মনে হয় সুমাইয়ার। কিন্তু মুখোমুখি এমন ভাব করেন যেন তিনি এই মাত্র জন্মগ্রহণ করেছেন। অ-আ কিছুই বোঝেন না!

সুমাইয়ার মতো তাঁরও নরসিংদীতে বাড়ি। আঞ্চলিকতার দরদ মিশে রয়েছে বলনে-চলনে।

হয়তো এ-কারণেই আসাদ করিম সিইও হওয়ার পর তিনবার ডিপার্টমেন্ট থেকে ডিপার্টমেন্টে বদলি হয়েছে সে। নিজে থেকে চেয়ে নিয়েছে এসব, প্রমোশন পাবে এই আশায়। এবারো সে বদলি হতে চায় এনায়েত সাহেবের পাবলিক রিলেশন্স বিভাগ থেকে। একটাই সংগোপন চাওয়া। যদি বদলির সঙ্গে নরসিংদীর দিশি মানুষটি সুসংবাদের চিঠি একটি ধরিয়ে দেন ওর হাতে! ওর মন বুঝে দিশি সিইও যদি মুখের ওপর স্মিত হেসে বলে ওঠেন, নাও, এবার থেকে বসকে প্রভু জ্ঞানে তোয়াজ করো। ঠিক?

অফিসে এরকম ঘটনা আকছার ঘটে থাকে। বদলির সঙ্গে সঙ্গে প্রমোশন, এ আর নতুন কী?

কিন্তু তা আর হলো কই? বদলি তো হলোই না। বরং কথা নেই, বার্তা নেই হুট করে সরাসরি চাকরিটাই চলে গেল সুমাইয়ার। চিঠিটা পেয়ে সে ছুটে গেল সিইওর দরবারে। কিন্তু তিনি রুমে নেই। ফিল্ড ভিজিটে গেছেন রংপুর। ফিরতে ফিরতে সামনের রোববার। অগত্যা মানবসম্পদ বিভাগের সেই কর্কশ বেরসিক নির্মম-নিষ্ঠুর আচরণের রুখসানা আনোয়ারের কাছে ছুটে গেলেন।

হন্তদন্ত হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আমার দোষ কী আপা? আমি কী করেছি?’

মহিলা এমনিতে কাউকেই সময় দিতে চান না। আজ তিনি ওকে বসতে বললেন। নরম গলায় বললেন, ‘সিইওর সঙ্গে কী হয়েছিল সুমাইয়া? কফির কথা বলব?’ অসম্ভব মোলায়েম গলা। দরদে টসটস করছে। অফিসমৃত চাকরিজীবীর সঙ্গে কি মানুষ এরকম তুলতুলে কথাই বলে? এটাই কি খুনি মানবসম্পদ বিভাগের প্রশিক্ষিত আচরণ?

মধ্যবয়স্ক মহিলা এই রুখসানা আনোয়ার। স্বামী কিছুই করেন না। মাঝে মাঝে পত্রপত্রিকায় কবিতা ছাপা হয় তাঁর। কালেভদ্রে বিশেষ দিন উপলক্ষে টেলিভিশনে কবিতাও আবৃত্তি করেন। অতীতে আর কিছু করতেন কি না তাও সুমাইয়ার জানা নেই।

তবে স্বামীকে নিয়ে গর্বের শেষ নেই মহিলার। স্বামীর কথা উঠলেই তিনি গর্বের সঙ্গে বলেন, ‘ও করপোরেট হাউজে বেশ কদিন চাকরি করেছিল।’ বলে মহিলা বিরল হাসি হাসেন, ‘কিন্তু ওর ধারণা এ-জগৎ ওর নয়। তোষামোদি আর জি-হুজুর চর্চা ওকে দিয়ে হবে না। অফিস-আধিপত্য নিয়ে এত হাসিমাখা বিবাদ-বিভেদ সে মানতেই পারেনি। তাই চাকরি-বাকরির মোহ থেকে বেরিয়ে এলো। এখন কবিতা লেখা ছাড়াও বাংলা-ইংরেজি নানারকম অনুবাদ করে সময় কাটান। স্বাধীন আর মুক্ত মানুষ। আমরাই পড়ে রয়েছি জঞ্জালে।’ মৃদু কণ্ঠে স্বামীকে জাহির করেন মহিলা।

এই একটিমাত্র বিষয় যা নিয়ে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলেন অবিরল। এ-বয়সেও স্বামীপ্রীতির এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রীতিমতো বিরল এ-অফিসে। সাধারণত অফিসের ডাইনিং হলের টেবিলে-টেবিলে খাওয়ার আগে ও পরে যেভাবে স্বামীর গিবত গান কর্মজীবী স্ত্রীরা, তাতে ওর মনে হয়েছে, পৃথিবীতে বিবাহিত পুরুষের জীবনে পরকীয়া ছাড়া আর কোনো প্রেম-ভালোবাসা নেই।

এরকমই এক মাঝবয়সী ব্যতিক্রমী মহিলার কাছ থেকে প্রশ্ন শুনে সুমাইয়া একেবারে আকাশ থেকে পড়ল। মুখে বলল, ‘স্যারের সঙ্গে আমার আবার কী হবে? তিনি তো আমার দেশের বড়ভাই। আমার দাদার বাড়ি আর স্যারের নানার বাড়ি নদীর এপার আর ওপার। ডাকলে শোনা যায় দূরত্ব। আমি তো উনার কন্যার বয়সী। কী করে কিছু হবে বলুন তো?’ আকাশ থেকে পড়ে সুমাইয়া। মহিলাটা কিরকম জটিল আর কুটিল, ঝগড়া বাঁধিয়ে ফায়দা তুলতে চাইছে। মনে মনে ভাবে সে।

রুখসানা এবার হেসে ফেললেন। স্বামীর প্রসঙ্গ ছাড়া এরকম মুখভরা নির্মল হাসি খুবই কম লক্ষ করা যায় মহিলার চেহারায়। সুমাইয়ার জন্য এই প্রথম। এজন্য অফিসে কে যেন তার নাম রেখেছেন আজরাইল ম্যাডাম। কোনো কথা নেই, অভিব্যক্তি নেই, সারাক্ষণ গম্ভীর উপদ্রুত চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়ান। অথচ সময় হলেই শাস্তির চিঠি হাতে ধরিয়ে দেন কর্মচারীদের হাতে। এহেন মহিলার মুখে হাসির ছটা খেলা করায় সে কিছুটা অবাকই হলো। এ যেন এক কঠিন সৌভাগ্য ওর জন্য! মহিলা কি ওর চাকরি যাওয়ায় মনে মনে খুশি? নিজেকে প্রশ্নটা না করে পারে না সুমাইয়া।

মহিলা ওর আশ্চর্যান্বিত প্রশ্নের উত্তর দেন এভাবে, ‘না, না। আমি ওসব মিন করিনি। আমি বলছি কোনো কমপ্লেইন করেছিলে বসের কাছে।’

এবার একটু থমকে যায় সুমাইয়া। আমতা আমতা করে উত্তর দিলো, ‘হ্যাঁ। পিআরও এনায়েত সাহেবের রগচটা মেজাজ নিয়ে কথা বলেছিলাম।’

‘তুমি দু-তিন বছর ধরে কাজ করছ আর এটা বোঝ না, কোম্পানির সর্বোচ্চ বসের কাছে গিয়ে বিভাগীয় আরেক বসের বিরুদ্ধে কমপ্লেইন করা শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ? এরকম আচরণ তুমি আরো করেছ। সুমাইয়া, এটা বাসাবাড়ি নয়, এটা অফিস। অফিস ডিসিপ্লিনের ওপর চলে। আবেগ দিয়ে নয়।’ বলে মহিলা থামলেন। নিজের কাজে মনোযোগ দিলেন। এবার মহিলাকে সত্যি সত্যি আজরাইল বলে মনে হলো ওর। অফিসের লোকজন তাহলে ঠিক কথাই বলে। 

তবে সত্যি সত্যি রুখসানা আনোয়ারের কথায় সুমাইয়ার মনটা দমে গেল। আপন ভেবে প্রমোশনের আশায় হয়তো সিইও আসাদ করিমকে কথাগুলো বলেছিল। তাই বলে চাকরিচ্যুতি?

কিছুতেই বিশ^াস করতে ইচ্ছে করছে না। কেবলি মনে হচ্ছে, রুখসানা আনোয়ারই যত নষ্টের গোড়া। হয়তো সুমাইয়াকে ফ্যাসাদে ফেলে ওর দিশি বড়ভাইকে ফাঁসাতে চাইছেন এ-মহিলা। কে জানে!

সে মিনমিন করে বলে উঠল, ‘স্যার তো নরসিংদীর মানুষ। অত্যন্ত ভালো মানুষ একজন।’ সুমাইয়ার চোখে একরাশ শূন্যতা। এরকম সদানন্দ বস কীভাবে খলনায়ক হয়? প্রশ্নটা কুরে কুরে খেতে শুরু করে সুমাইয়াকে।

আনোয়ারা ওর কথা শুনলেন। ল্যাপটপে চোখ স্থির রেখে শুধু ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়লেন ক’বার। এর সঙ্গে মিশেছিল একধরনের অবজ্ঞা আর অনাস্থা।

মহিলার ভাবলেশহীন নির্দয় আচরণে মনটা বিষিয়ে উঠল সুমাইয়ার। ছেলেদের মতো একটা গালি দিতে পারলে মনের বিষ হয়তো কিছুটা হলেও কমত। কিন্তু সে তো গালাগালও শেখেনি।

তাহলে?

বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ব্রেকআপ হওয়ার মতো এক যন্ত্রণাকাতর অনুভূতি সঙ্গে নিয়ে মগবাজারের বাসায় ফিরে দ্রুত নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল সে।

বাসার সবাই বিস্মিত। সুমাইয়া মুনির সাহেবের তিন কন্যার প্রথমজন। ছেলে নেই। বছর তিনেক হলো এমবিএ শেষ করে চাকরিতে ঢুকেছে। বেসরকারি চাকরিটি নিয়ে মেয়েটি বেশ ভালোই রয়েছে। একবারও মুনির সাহেবের কাছে টাকার জন্য হাত পাততে হয়নি। এই সুখেই পিতা হিসেবে তিনি এক ধরনের অনির্বচনীয় আনন্দে বুঁদ হয়ে থাকেন। মাঝে মাঝে গিফট আর ফুড পান্ডায় করে খাবার এনে সবাইকে চমকে দেয় ওর মেয়ে। অবসর জীবনে এর চেয়ে আর কি-ই বা চাওয়া-পাওয়ার থাকে!

স্বভাবে খলবলে টাইপ। সারাক্ষণ চঞ্চল আর অস্থির। বরং ছোট দুজন ওর তুলনায় অনেক সুস্থির ও বুদ্ধিমতী।

সেই মেয়েটি আর কারো খবরাখবর না নিয়ে, রান্নাঘরের বয়াম খুলে একমুঠো চানাচুর মুখে না পুরে সোজা নিজের ঘরে গটগট করে চলে গেল?

ব্যাপারটা মুনির সাহেব লক্ষ করলেন। স্ত্রী আসমার সঙ্গে বৈকালিক চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন তখন। সহসা মেয়ের মেঘে ঢাকা তারার মতো চেহারা আর আচরণ লক্ষ করে দুজনই চমকে উঠলেন।

মুনির সাহেব সোজা ঢুকে পড়লেন মেয়ের ঘরে। একদা সরকারি অফিসের জ্যেষ্ঠ করণিক ছিলেন তিনি। প্রতিটি ফাইল খুঁটিয়ে পড়তে গিয়ে একধরনের সন্দেহবাতিক স্বভাব হয়ে গেছে তাঁর।

মেয়ের গতিবিধি লক্ষ করে বুঝতে বাকি রইল না যে অফিসে কোনো একটা গণ্ডগোল চলছে। তাই সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করে বসলেন, ‘অফিসে কি কিছু হইছে রে আম্মা?’

সুমাইয়া ওর মায়ের চাইতে আব্বার সঙ্গে বেশি খোলামেলা। এতটুকু ভনিতা না করে বলে উঠল, ‘আমার চাকরিটা নেই আব্বা। মাসে পঁচিশটা হাজার টাকা হারায়া ফেল্লাম। খারাপ লাগছে।’ এমবিএ করা সুমাইয়া এমনভাবে কথাগুলো বলল যে, মনে হবে, হাত ভরা বেলোয়ারি চুড়ির গুচ্ছের ভেতর থেকে একটি চুড়ি বুঝি ভেঙে গেছে। এমনি বালখিল্য ওর কথা বলার ভঙ্গি।

‘কীজন্য চাকরিটা গেল?’ মুনির সাহেবের গলায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।

‘বস নিয়ে কমপ্লেইন করেছিলাম সিইওর কাছে। সেইজন্য।’

সঙ্গে সঙ্গে মুনির সাহেব জিহ্বায় কামড় দিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করলেন। তাঁর কন্যা হয়ে কী করে বসকে অসম্মান করে?

নিজেকে এ-সময় বড়ই বুদ্ধিমান আর চতুর বলে মনে হলো। চাকরিতে যদি বসকে ঠান্ডা না রাখা যায় তো সেখানে পাঁচের বাহির হয়ে থাকতে হয়, এ-কথাটা চাকরির শুরুতেই বুঝে গিয়েছিলেন মুনির সাহেব। অথচ মেয়েটা টের পেল না? নিশ্চয়ই ওর মায়ের ধাত পেয়েছে। সহজ-সরল গালগপ্পো আর রোবটের মতো স্বামীর ওপর নির্ভরতা সম্বল করে জীবন কাটিয়ে ফেলা মায়ের স্বভাব না পেলে এরকম হয় কখনো? মনে মনে ভাবেন মুনির সাহেব।

জীবনের নানা সময়ে কত বসকে যে মুনির সাহেবের খুশি করতে হয়েছে। কখনো বিশালাকৃতির কালী বোয়াল আর ঘাড় মোটা ইলিশ মাছ কাজে লেগেছে। গদগদ গলায় বসকে মিথ্যা অভিনয় করে বলেছেন, ‘নরসিংদী থেইক্যা বড়ভাই পাঠাইছে, স্যার। মেঘনার রেয়ার মাছ স্যার।’ কখনো বসের স্ত্রীর জন্য শাড়ি। কখনো বা বাড়ির পুকুরে সারাদিন মাছ ধরার বন্দোবস্ত করে দেওয়া। কখনো বসের যন্ত্রণাদায়ক পাইলসের জন্য হোমিওপ্যাথি ওষুধ জোগাড় করা। এ-জীবনে চাকরির দম রাখতে গিয়ে কত কিছুই যে করতে হয়েছে তাকে। বিনিময়ে অবৈধ সুযোগ-সুবিধায় তার পকেট হয়েছে ভারী। দুটো বড় সাইজের ফ্ল্যাট হয়েছে ঢাকা শহরে। বছরে বছরে ব্যাংক উপচে পড়ছে টাকার স্ফীত ধারা। অবসর জীবনের দুশ্চিন্তা বলে কিছু নেই তার জীবনে!

অথচ সৎ মানুষ হিসেবে তাঁর সুনামের অন্ত নেই।

পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়-পরিজন সবাই জানে, সাধারণ দুটো শার্ট আর প্যান্ট পরে অফিস করা মানুষটি কত অমায়িক আর নিষ্কলঙ্ক। যে কেউ সহযোগিতা চাইলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি কাজটা করে দিতেন। কিন্তু বড় বড় প্রজেক্টের বেলায় তিনি অত্যন্ত কঠোর ও ছিদ্রান্বেষণকারী কর্মদক্ষ এক কর্মচারী। তখন বস থাকেন সঙ্গে। কেউ কিছু সন্দেহ প্রকাশ করলেই বাঁধা উত্তর, ‘কী করুম কন? ইচ্ছা না থাকলেও বসের মন জুগিয়ে চলতে হয়। দু-কড়ির মানুষ আমি। বস যা চাইবেন তাই তো হবে। তবে নিজে ভালো থাকলে জগৎ ভালো। সেইটা মনে রাখবেন।’

সেই অসামান্য চতুরালি জানা মানুষটির কন্যার কপালে কি না ঘটল এমন দুর্ঘটনা! মানতেই পারছেন না তিনি।

সুমাইয়াকে তা বুঝতে দেননি। মুখে বললেন, ‘চিন্তা করিস না। আল্লাহতায়ালা একটা রাস্তা বের করবেনই। এক চাকরি গেছে তো হাজারটা আইবো। চিন্তা করিস না। মাবুদরে ডাক।’ বলে মুনির সাহেব বেরিয়ে গেলেন।

সুমাইয়ার কিছুই ভালো লাগছে না। সিইও লোকটা যে তলে তলে এমন জটিল লোক হয়ে বসে রয়েছেন সে তা ভাবতেই পারেনি। তাহলে এদ্দিন হেসে হেসে ওর সঙ্গে কথা বলা ছিল লোকটার অভিনয়? আসলে মানুষকে বিশ্বাস করাই দায়।

এর ভেতর পিঠাপিঠি দু-বোন লিজা আর জিনিয়া তাকে দেখে গেল। দুজনই ভার্সিটির ছাত্রী। একজন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ে আর অন্যজন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছাত্রী।

রুমে ঢুকে লিজা বলে উঠল, ‘আপু তোর চাকরি নাকি নাই?’ পেছনে দাঁড়ানো জিনিয়ার হাসি আর ধরে না। জিনিয়া বলল, ‘কতগুলো টাকা তোর লস হয়ে গেল রে আপু। এখন বিএফসি কেএফসি ক্যামনে খাবি? আমরাই বা কাকে রিকোয়েস্ট করব?’ বলে আনমনা হয়ে থাকে কিছুক্ষণ। একটু বাদে লিজা জিজ্ঞেস করে, ‘কী করছিলি আপু? বসের মাথা ভাঙতে চাইছিলি?’ বলে ফের হাসির রোল। যেন একটা মজার ব্যাপার ঘটে গেছে

এ-ফ্ল্যাটে।

সুমাইয়া রেগে গেল, ‘বেরো চোখের সামনে থেকে। আমি এ-পর্যন্ত যা খাইয়েছি সব বমি করে বের করে দিবি। কাটা ঘায়ে নুন ছিটাতে আসছে। ফাজিল কোথাকার! বেরো!’ তাড়িয়ে দেয় লিজা আর জিনিয়াকে।

বড় বোনের কাছে বকা খেয়েও তাদের হাসি আর ধরে না। দুজন মিলে একসঙ্গে উত্তর দেয়, ‘ওয়াক থুঃ। ওয়াক থুঃ।’ অনেকদিন পর আপু ধরা খাওয়ায় তারা বেজায় খুশি। তবে তারা এও জানে, তাদের বড় বোন যেরকম মেধাবী, ঠিকই কদিনের ভেতর আরেকটা চাকরি জোগাড় করে নেবে। এই আত্মবিশ্বাস সুমাইয়ার প্রতি তাদের রয়েছে।

এ-সময় মুনির সাহেব ফের ঢুকে পড়েন সুমাইয়ার রুমে।  পেছন পেছন আসমা। এসব ক্রান্তিলগ্নে আসমা স্বামীর দিকে একচক্ষু হরিণের মতো তাকিয়ে থাকেন। তাঁর প্রতি স্ত্রীর অগাধ বিশ্বাস। যে-কোনো সমস্যায় সমাধান দেওয়ার ব্যাপারে স্বামীর কোনো জুড়ি নেই বলে তিনি মনে করেন। রোগের বেলায় ডাক্তারের চাইতে অভিজ্ঞ। জমির সমস্যায় তহশিলদারের চাইতেও সিদ্ধহস্ত। পরিবারের সমস্যায় তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত দিতে জানেন। শত্রুমিত্র ভালোমন্দ চেনায় আওলিয়া-দরবেশের মতো আর বাজার করায় এতই নিপুণ যে, কোনো অভিযোগ করার সুযোগ থাকে না। এহেন মুনির সাহেব এসে প্রথমেই প্রশ্ন করে বসলেন, ‘তোরে একটা সমাধান দিতে আইছি। তার আগে ক তো তোদের সিইওর বাড়ি কই?’

‘বরিশালের আগৈলঝরা।’ মুখ ভার করে উত্তর দিলো সে।

‘ঢাকার বাড়ি চিনস?’

‘না।’

ঠিকানা নিতে পারবি?’

‘দেখি।’

‘নিয়া আমারে জানা। সব ঠিক অইয়া যাইবো। কত বস হ্যান্ডল করলাম এই জীবনে, চিন্তা করিস না।’

এসব কথায় কোনো পাত্তা না দিয়ে সুমাইয়া একনাগাড়ে মোবাইল টিপতে লাগল। চাকরি চলে যাওয়া যে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিয়োগান্ত ঘটনা তা তার হাবেভাবে এখন আর মনেই হচ্ছে না।

তাকে বরং অনেকখানি দুশ্চিন্তাহীন বলেই মনে হলো। সকালে নিয়ম করে ঘুম থেকে উঠে অফিসে ছুটে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে তো মুক্তি মিলবে কদিন, তাতেই সে মহাখুশি।

এরকম এক অস্বস্তিদায়ক অস্থির সময়ে সুমাইয়ার সব সময় এরিয়ালের কথা মনে পড়ে। সুমাইয়া প্রেমে বাঁধতে চায় এরিয়েলকে। কিন্তু এ-ব্যাপারে এরিয়েলের কোনো হুঁশজ্ঞান নেই। সে বন্ধু হয়েই ওর সঙ্গে জীবন কাটাতে চায়। কলেজজীবন থেকে সম্পর্ক। এহেন দুষ্টুমি নেই যে, ওরা পরস্পর শেয়ার করেনি। যখন তখন বেরিয়ে পড়া, বুড়িগঙ্গার ভাসমান নৌকা-রেস্তোরাঁয় বসে লাঞ্চ সারা। গাছের ফাঁকে দাঁড়িয়ে সিগারেটে পুরে গঞ্জিকা সেবন করা। বিয়ার খেয়ে বমি করা, সব।

চাকরি পাওয়ার পর দুজন একটুখানি আলাদা হয়ে গেছে। এরিয়েল যখন ওর সঙ্গ চাইত, তখন সুমাইয়া চাকরির কারণে সময় পেত না। দু-চারদিন সে সুমাইয়ার অফিসেও হানা দিয়েছে। কিন্তু অফিসের গৎবাঁধা শৃঙ্খলার সঙ্গে এরিয়েল বেমানান। সবাই কেমন আজব চোখে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। ঘাড় অবধি লম্বা চুল, চোখে গোল চশমা, লম্বা ঢ্যাঙা শরীরের গড়ন। দূর থেকেও নজর কেড়ে নেয় সে। তাই দুদিনের পর সুমাইয়া বলে দিয়েছে, ‘তুই এসব সভ্য হিপোক্রেটদের আস্তানায় আসিস না তো। তোকে ঠিক মানায় না রে।’

‘কই যামু তাহলে? লালপাহাড়ের দেশে?’

দুজনই প্রাণ খুলে হেসে নেয়।

সেই এরিয়েলকে মনে পড়ে গেল সুমাইয়ার। পনেরো-বিশ দিন ধরে সে লাপাত্তা। কোনো যোগাযোগ নেই তার সঙ্গে।

এখন বিপদে পড়েছে সুমাইয়া। বিপদ না বলে গর্ত বলাই ভালো। এরিয়েল হোসেনকে না জানিয়ে কি পারে?

রিং দিতেই এরিয়েলের মা ধরল। কণ্ঠ চিনে তিনি বলে উঠলেন, ‘ও তো ফোন ওর শোবার ঘরে রেখে কদিন পাশের মিউজিক রুমে সময় কাটাচ্ছে। তুমি কি সুমাইয়া? এলে বলব।’ তিনি ফোন রেখে দিলেন।

বিকেলের দিকে এরিয়েলের ফোন পেল সুমাইয়া, ‘কী, ব্যাপারটা কী? নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা?’

‘মানে?’

‘সমস্যা ছাড়া তো তুমি রিং করো না আজকাল। তাই বলছিলাম।’

‘হ্যাঁ সমস্যা। চাকরিটা আমার চলে গেছে। মাসে পঁচিশ হাজার টাকা গায়েব। কী করব বলো?’

‘তোমার চাকরি কী করে যায়? বেশি কথা বলে ফেলেছিলে?’ বিস্ময় প্রকাশ করে এরিয়েল।

‘অনেকটা তাই। এক বসের কাছে নিজের বসের নিন্দা করেছিলাম। সেজন্য।’

‘গুরুতর অপরাধ। চিঠি দিয়ে দিছে?’

‘হ্যাঁ। তবে ফাইনাল পেমেন্টটা এখনো তুলি নাই। কিছু টাকা হয়তো পাবো। তুলে ফেলব।’ উদাসীন গলায় উত্তর দেয় সুমাইয়া।

‘এক কাজ করো না কেন? শ্রম আদালতে মামলা ঠুকে দাও। তুমি পার্মানেন্ট এমপ্লয়ি তো?’

‘হ্যাঁ। দুই-আড়াই বছর ধরে রয়েছি কোম্পানিতে।’

‘তোমাকে কি কোনো নোটিশ দিয়েছে?’

‘না।’

‘তাহলে তো হলোই। আব্বুকে বলছি। চাকরি ফেরত তো পাবেই। কমপেনসেশনও মিলবে। আব্বু অনেককে এরকম টাকা আর চাকরি পাইয়ে দিয়েছে। ডোন্ট ওরি। এখন রাখি।’

সুমাইয়া যা বোঝার বুঝে গেল। এরিয়েলকে দিয়ে কিছু হবে না। সে মিউজিক পাগল মানুষ। এক্ষুনি হয়তো ওর মিউজিক রুমে ঢুকে সব ভুলে যাবে। একটা ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে ওর। তেমন নাম না কামালেও স্বপ্ন দেখে, একদিন ঠিকই সে বাংলাদেশের এ আর রহমান হয়ে মাতিয়ে দেবে গোটা দেশ। মিলিয়ন-মিলিয়ন শ্রোতা-দর্শক তার গান শুনে বলবে, এরকম তো আগে কখনো শুনিনি!

তবু তার সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করে বড় আরাম পায় সুমাইয়া। দুজনই এমবিএ। তবু এরিয়েল চাকরির দিকে না গিয়ে মিউজিকে মেতে রইল। একজন বেভুলা স্বপ্নপাগল মানুষ। হয়তো এজন্যই তাকে ওর এত ভালো লাগে।

 সিইওর ঠিকানাটা জোগাড় করে আব্বুকে দিতে হবে সুমাইয়াকে। কিন্তু সিইওর ঠিকানা তাকে কে জোগাড় করে দেবে? অফিসে সুমাইয়া তো এখন বাইরের লোক। কে বিশ^াস করবে তাকে? করপোরেট হাউজ থেকে একবার বিদায় নিলে দারোয়ানটাও আর চিনতে চায় না। এরই ভেতর হয়তো তার পাঞ্চ-কার্ডটিও নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। তাহলে?

রেবেকার কথা মনে পড়ে গেল। মানবসম্পদ বিভাগে কাজ করে। হলি ক্রসে এক বছরের জুনিয়র ছিল তার। অফিসে থাকতে দুজন মিলে প্রায়ই খেতে বের হয়ে যেত। গুলশানের যত হোটেল-রেস্তোরাঁ সব তাদের চেনা। দুজনই ফুডি হওয়ায় মনের আনন্দে খেতে খেতে গল্প করত। কখনো নিজেদের জীবনের গল্প। কখনো বা বলিউড-হলিউড-ঢালিউডের সেলিব্রেটিদের নিয়ে চলত ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা। ভুলেই যেত তারা অফিস ফেলে এসেছে।

সেই রেবেকাকে রিং দিলো সুমাইয়া। প্রথম রিংটি ধরেনি সে। কিছুক্ষণ বাদে রেবেকা নিজেই রিং দিলো ওর ফোনে, ‘আপু, সরি। এরকম একটা ঘটনা ঘটবে আমি ভাবতেই পারিনি।’ চাপা গলা, মনে হলো টয়লেটে গিয়ে সবার আগোচরে কথা বলছে সে।

‘শোনো, একটা ছোট কাজের জন্য রিং দিয়েছি। সিইও স্যারের বাসার ঠিকানাটা দিতে পারবা?’

নিমেষে চুপ হয়ে গেল রেবেকা। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিলো, ‘আমায় মাফ করবেন আপা। আমার কাছে স্যারের পার্সোনাল অ্যাড্রেস নেই। সরি আপু।’ বলেই কেটে দিলো ফোনের লাইন।

সুমাইয়ার আগেই ধারণা হয়েছিল, যেরকম ভীরু স্বভাবের মেয়ে সে, ওর পক্ষে স্যারের ঠিকানা জোগাড় করা হয়তো সম্ভব হবে না। খেতে গেলে প্রায়ই জিজ্ঞাসা করবে, ‘আপু খাবারটা কি হালাল?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। তুমি চিন্তা করো না তো। এটা খাঁটি বিফ। খেয়ে নাও।’ ওকে আশ^স্ত করার পরও সে বিড়বিড় করে দোয়া-দরুদ পড়ে নিত। মুখে-চোখে ফুটে উঠত এক নার্ভাস অভিব্যক্তি। সেই মেয়ের কাছে সিইও স্যারের বাসার ঠিকানা থাকলেও তা সে দেবে না। দুশ্চিন্তায় বারবার মূর্ছা যাবে সে।

তাহলে উপায়? সহসা শাজাহান ড্রাইভারের কথা মনে পড়ে গেল সুমাইয়ার। সিইও সাহেবের ড্রাইভার ছিল। তেল চুরির দায়ে কদিন আগে চাকরি গেছে।

সে ওর মোবাইলে নম্বরটা আছে কি না স্ক্রল করে দেখতে থাকে। একসময় পেয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে দেরি না করে ফোন দেয় শাহজাহানকে। দুবারের মাথায় ধরে ফেলে সে, ‘আপা? আপনি ছাড়া আর কেউ এ পর্যন্ত রিং দেয়নি। আপনেই পরথম। আমি নির্দোষ আপা। বিশ্বাস করেন।’ সে সুমাইয়ার ব্যাপারটা জানে না – সে নিশ্চিন্ত। তাহলে প্রাণ খুলে কথা বলা যাবে।

‘কী হয়েছিল কও তো শাহজাহান?’

‘সিইও স্যারের বড় পোলায় ছুটির দিনে বান্ধবীরে লইয়া বাইর অইয়া আজাগা-কুজাগায় যায়। আমারে কইতো স্যাররে না কওনের লাইগা। সেই দোষ আমার মাথা পাইতা নিতে অইল। আমি অইলাম তেল চুর। আল্লাহ সব দেকতাছে। বিচার একদিন অইবো।’

‘স্যারের বাসা তো আগেরটাই আছে?’

‘জানি না আপা। আমার প্যাডে লাত্থি দিছে ব্যাডা। জীবনেও ভুলতাম না। একটা ভণ্ড লোক।’

‘এখন কী করছো?’

‘ভালা একটা কোম্পানিত চাকরি পাইছি আপা। আল্লাতালা যা করে ভালার লাইগ্যাই করে। রাহি।’

শাহজাহান আর কথা বলে না। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে নিজে থেকে লাইনটা কেটে দেয়।

সুমাইয়া মনে মনে বলল, ‘তাই তো।’ শাহজাহানের কথাটা মনে বড় ধরল তার। সত্যিই তো, রাখে আল্লাহ মারে কে? 

সুমাইয়া সযত্নে ল্যাপটপ খুলে তার নিজের তৈরি করা সিভিটা খুলে খানিকক্ষণ ঠিকঠাক করে নিল। তারপর একের পর এক কোম্পানির মানবসম্পদ বিভাগে পাঠাতে শুরু করে দিলো।

সুমাইয়া নিশ্চিত, দু-চারদিনের ভেতরই উত্তর আসতে শুরু করবে।

মিষ্টি হাসল সে। এবার চাকরিটা হলে সবাইকে নিয়ে মালদ্বীপ আর শ্রীলংকা থেকে ঘুরে আসবে!