জাক দেরিদা – বিনির্মাণবাদকে হ্যাঁ বলুন

চুয়াত্তর বছর বয়সে সম্প্রতি দেহরক্ষা করেছেন জাক দেরিদা, যাঁকে ইংল্যান্ডের একটি পত্রিকা, ডেইলি টেলিগ্রাফ, কুড়ি শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিক হিসেবে অভিহিত করেছে। বিখ্যাতরা মৃত্যুর পর অনেক বন্দনা লাভ করেন, তাতে অতিকথন থাকে। কিন্তু ডেইলি টেলিগ্রাফ সম্ভ্রান্ত পত্রিকা, তার লেখাগুলোতে অতিকথন থাকার কথা নয়। অথচ দেরিদাকে শ্রেষ্ঠ বললে লুডভিগ ভিটজেনস্টাইনের জায়গাটা কোথায় যায়? অথবা জাঁ পল সার্ত্রর? নাকি ‘দার্শনিক’ শব্দটির একটি ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত ছিল সেইসঙ্গে, নিদেন পক্ষে কিছু টীকা টিপ্পনি? পশ্চিমের প্রচলিত সংজ্ঞা-অনুযায়ী যে-দর্শনকে আমরা পড়তে অভ্যস্ত, যেখানে সক্রেতিস থেকে নিয়ে রিচার্ড রোর্টি পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত, সেই প্রচলিত বা টেকনিক্যাল ফিলোসোফিতে দেরিদাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনটি দেওয়া সম্ভব হবে না। তবে ভাষাগত দর্শন বা লিঙ্গুইস্টিক ফিলোসোফির বিচারে দেরিদা অবশ্যই অসামান্যতার দাবিদার। পাশ্চাত্যের দর্শনের অন্তর্নিহিত কিছু প্রবণতা, এর কিছু স্থির-নির্দিষ্ট প্রত্যয় ও চিন্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তদন্ত করে, নিজস্ব কিছু ব্যাখ্যা তিনি তৈরি করেছিলেন বটে, কিন্তু তার মূলেও ছিল ভাষা, বিশেষ করে তাতে লেখার, এবং ব্যাখ্যা ও বিনির্মাণবাদী (ফবপড়হংঃৎঁপঃরাব) বিচার-বিশ্লেষণের ভূমিকাটি ছিল বড়।

দেরিদার মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে যেসব লেখালেখি হয়েছে, দেশে এবং বিদেশে, যার অনেকটাই ইন্টারনেট বাহিত হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছে গেছে, তা থেকে তিনটি প্রধান ধারণা/ বিবেচনা চিহ্নিত করা গেল। এক তো ওই দার্শনিক/ দর্শন-বিচার। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ একটি লেখায় ডিনিশিয়া স্মিথ বলেছেন, দেরিদা হচ্ছেন ‘সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত দার্শনিক – একমাত্র বিখ্যাত দার্শনিক না হলেও।’ এই মন্তব্য পড়ে, কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ২০৪ জন ডন (অনন্ত তাঁদের যে কজন বেঁচে আছেন), যাঁরা ১৯৯২ সালে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেরিদাকে সম্মানসূচক একটি ডিগ্রি প্রদানের বিরোধিতা করেছিলেন, নিশ্চয় ভয়ানক কুপিত হবেন (দেরিদার পক্ষে অবশ্য ৩৩৬টি ভোট পড়েছিল, কাজেই ডিগ্রি তাঁকে দেওয়া হয়েছিল)। তাঁকে সরাসরি বিশ্বমাত্রার দার্শনিক উপাধি দেওয়াটা বোধ হয় দর্শন বিষয়টিকে বিনির্মাণ করার একটি নমুনা। কে জানে!

এইখানে এসে জরুরি টীকা হিসেবে উল্লেখ করা যায় : ইংরেজি ডিকন্স্ট্রাকশনের অনেক বাংলা হলেও ‘বিনির্মাণ’ শব্দটি আমার পছন্দ। যদিও বিনির্মাণ অর্থ শুধুই নির্মাণ হতে পারে, যেমন বিরচিত আর রচিত একই কথা, তবে ‘বি’ উপসর্গটি বিপরীত ভাবও প্রকাশ করে, যেমন বিজাতীয়। এই লেখায় বিনির্মাণ বরাবরই ডিকন্স্ট্রাকশনের বঙ্গানুবাদ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

দেরিদা সম্পর্কে দ্বিতীয় একটি ধারণা হচ্ছে, তিনি একজন  বিধ্বংসী চিন্তক। তিনি কুড়াল হাতে আধুনিক এক পরশুরামের মতো প্রচলিত দর্শন থেকে নিয়ে অধিবিদ্যা, ভাষাচিন্তা থেকে নিয়ে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব – সকল কিছুর মূলে অবিরাম আঘাত হেনে গেছেন, যার ফলে তৈরি হয়েছে অরাজকতা। সেই অরাজক ধ্বংস¯তূপে বসে তিনি বাজিয়েছেন বিনির্মাণবাদী বাঁশি। আর তৃতীয় একটি ধারণা, যা পশ্চিমেও ব্যাপকভাবে প্রচলিত : দেরিদা হচ্ছেন দুর্বোধ্যতার অবতার। তিনি এতই অনচ্ছ – এবং ইচ্ছাকৃতভাবেই যেন অনচ্ছ – যে তাঁকে পড়ে বোঝা আর জেমস জয়েসের ফিনেগানস ওয়েইক পড়ে বোঝা একই কথা।

এই তিনটি ধারণায়/ বিবেচনায় সত্য যে নেই, তা নয়। তবে তা নির্ভর করছে কে কতটা দেরিদাকে পড়েছেন, বুঝেছেন, অথবা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁকে বোঝার চেষ্টা করেছেন, তার ওপর। তিনি দার্শনিক বটেই, তবে তাঁর দর্শনের ভিত্তিটি ছিল বিনির্মাণবাদী – অর্থাৎ তিনি দর্শনের সত্যসন্ধ মনোভাবকে যেমন প্রশ্ন করেছেন, তেমনি পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিকতার ঐতিহ্যকে দেউলিয়া প্রমাণ করে ছেড়েছেন। একনামে চিহ্নিত করা যায়, তেমন কোনো দর্শন তিনি দিয়ে যাননি, বরং জানিয়েছেন, দর্শনকে একনামে চিহ্নিত করার প্রবণতাটিই বিপজ্জনক। তাতে অধিবিদ্যার – মেটাফিজিক্সের – একটি অলীক চাদর চিন্তার শরীরের ওপর বিছিয়ে যায়। তিনি মৌলিক চিন্তক ছিলেন, যেমন ছিলেন মিশেল ফুকো বা জাক লাকাঁ, যাঁরা ‘কাঠামোবাদী এবং উত্তর-কাঠামোবাদী’ বলে পরিচিত। তাঁকে উত্তরাধুনিকও বলা হয়েছে, যেহেতু ওই দুজনের মতো তিনিও ছিলেন যে-কোনো কেন্দ্রিক চিন্তা বা কেন্দ্রিকতার বিপক্ষে; অধিবিদ্যার শাসনের বিরুদ্ধে; ইতিহাসের ‘উদ্দেশ্য-নির্ণীত’ পঠন-পাঠনের বিপরীতে; বহুত্ববাদের পক্ষে; একক কোনো অর্থের জায়গায় একাধিক অর্থের পক্ষে (অর্থ কোনো একটি বিশেষ ধারণা বা ঘটনাকে তুলে ধরে না, অর্থ নানা দ্যোতনার বিতরণ ঘটায় মাত্র)।

বিনির্মাণবাদ অবশ্যই তাঁর নামের প্রতি সুবিচার করে, অর্থাৎ এটি ভাঙে – প্রচলিত ধারণাকে ভাঙে; পশ্চিমা দর্শন/ অধিবিদ্যার ‘কেন্দ্র’ এবং ‘উপস্থিতি’-নির্ভরতাকে ভাঙে – অর্থাৎ কেন্দ্রচ্যুত করে, একটি গ্রন্থের একক-সর্বস্বতার দাবিকে ভাঙে। এবং দেরিদা একজন বিনির্মাণবাদী হিসেবে এ-কাজগুলি করেছেন। কিন্তু বিনির্মাণবাদ কোনো ধ্বংসযজ্ঞ বা বিধ্বংসী প্রকল্প নয় এবং যে-ভাঙার কথা বলা হলো তা আসলে ভাঙাও নয়, পুনর্নির্মাণের জন্য ভাঙার মতো একটা ব্যাপার। এই লেখায় একটু পরে বিনির্মাণবাদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় এর একটি চেহারা আশা করি তুলে ধরা যাবে। সেই চেহারা কোনো দার্শনিক-সাহিত্যিক বোমাবাজের যে হবে না, তা এখনি বলে দেওয়া যায়। সেটি বরং দেখা যাবে বেশ হাসিখুশি, যেমনটি বিনির্মাণবাদের এক ব্যাখ্যাকারী ক্রিস্টোফার নরিস মনে করেন। তিনি বলেন, বিনির্মাণবাদ একটি হাসিখুশি ব্যাপার। তবে ভেঙে ফেলার প্রচলিত বর্ণনায় হাসিখুশির ছবিটি থাকার কথা নয়। বস্তুত বিনির্মাণবাদ সম্পর্কে অনেকের মধ্যে বিরূপ ধারণার জন্ম হয়েছে এই ‘ভাঙা’ ‘ধ্বংস করা’র ওপর বেশি জোর দেওয়ার জন্য। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে যখন বিনির্মাণবাদ উত্তর আমেরিকায় প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য ও দর্শন (প্রধানত সাহিত্য) বিভাগগুলিতে, তখন এর প্রতি একটি শক্তিশালী প্রতিরোধও গড়ে উঠেছিল এই ধারণা থেকে যে, এই চিন্তাটি একটি বিধ্বংসী খেলা বৈ কিছু নয়। দেরিদা ও উত্তর-কাঠামোবাদীরা যে-‘টেক্সটে’র ধারণা প্রচার করেছিলেন, তাতে শুধু লিখিত গ্রন্থ নয় (ক্যানোনিকাল বা প্রধান, পূত-গ্রন্থ তো দূরের কথা), যে-কোনো ‘আখ্যান’ বা ডিসকোর্সই অন্তর্ভুক্ত ছিল (একটি সাক্ষাৎকারে দেরিদা বলেছিলেন, টেক্সট বলতে তিনি সকল কিছুকেই বোঝেন; এমনকি, যে-রেস্টুরেন্টে বসে তিনি সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন, সেই রেস্টুরেন্টের টেবিলে বসা লোকজনের বিন্যাসের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন, ‘এটিও একটি টেক্সট’)। সত্তরের দশকের শেষ ভাগে উত্তর আমেরিকার একটি রক্ষণশীল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে আমি পড়াশোনা করতাম। সে-বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনির্মাণবাদ বিবেচিত ছিল প্রায় একটি ছোঁয়াচে রোগের মতো। তবে আশির শুরুতে বিনির্মাণবাদী এবং মেধাবী গবেষক হিসেবে পরিচিত তিলোত্তমা রাজন কিছুদিনের জন্য শিক্ষকতা করতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে প্রতিরোধটা কমতে শুরু করে। কিন্তু এই সহিষ্ণু আবহাওয়া আমার বরাতে জুটেছে মাত্র মাস ছয়েক। তারপরে আমার ফেরার পালা। আমাদের যেসব শিক্ষক বিনির্মাণবাদকে বিধ্বংসী বলে অপবাদ দিতেন, তাঁদের একজন আবার মার্টিন হাইডেগারের ভক্ত ছিলেন। বিষয়টি বেশ স্ববিরোধী মনে হতো আমার কাছে, কারণ দেরিদা হয়তো এই হাইডেগার থেকেই বিনির্মাণবাদের ধারণাটি নিয়েছিলেন। হাইডেগারের বেসিক প্রব্লেমস অফ ফেনোমেনোলজি বইতে তিনি তাঁর শিক্ষক এডমন্ড হুসার্লের ফেনোমেনোলজি বা প্রপঞ্চবাদের একটি ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন, প্রপঞ্চবাদ হচ্ছে দর্শনচর্চার একটি উপায়,  যার তিনটি পর্যায় রয়েছে : ‘রিডাকশন’ বা পর্যবেসিতকরণ,    রূপান্তরিতকরণ; ‘কন্স্ট্রাকশন’ বা নির্মাণ এবং ‘ডিস্ট্রাকশন’ বা ধ্বংসসাধন। এই তিনটি পর্যায় একটির সঙ্গে অন্যটি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ধ্বংসসাধন এবং নির্মাণ পরস্পর-প্রবিষ্ট দুই ধারণা; নির্মাণের জন্য ধ্বংসের প্রয়োজন রয়েছে। একসময় এই ‘ধ্বংস’ বলতে হাইডেগার ‘বিনির্মাণ’কেও বুঝিয়েছেন। তিনি যে-জার্মান শব্দটি ব্যবহার করেছেন, তা হচ্ছে ধননধঁ, যার বাংলা হচ্ছে ‘প্রতি-নির্মাণ’ – অর্থাৎ তৈরি জিনিস খুলে নেওয়া। কিন্তু কেন খুলে নেওয়া? খুলে নেওয়া এজন্য যে, আবার নতুনভাবে যেন তাকে নির্মাণ করা যায়। তাঁর এই বইতে হাইডেগার যা বলেছেন, দেরিদাও অন্যত্র তাই বলেছেন। হাইডেগার সকল দার্শনিক আলোচনায় ‘প্রচলিত ধারণা, অতি চেনা দিগন্ত, প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির আকীর্ণতা’ দেখতে পান। এবং এগুলো যে দূরের কোনো পৃথিবীকে বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়, তা-ও বলেন। একথা দেরিদাও বলেন এবং দর্শনের একটি নতুন পাঠ তিনি উদ্ভাবন করেন, যাতে তত্ত্বগত বিষয়গুলি শ্রেণিবিন্যাসকৃত (এবং আপেক্ষিক গুরুত্ব-অর্পিত) পদ্ধতিগুলিকে বিনির্মাণ করা যায়, নতুন একটি টেক্সচুয়াল প্রেক্ষাপটে তাদেরকে সাজানো যায়। হাইডেগারও, দেরিদার মতো, তাঁর       এই বইতে এরকম একটি আভাস দেন যে, জগতের প্রতি আমাদের যুক্তিনির্ভর উদ্যোগের ভিত্তিটি সবসময় ভাষা। তাতে আমাদের বিবেচনাটি অন্যের ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়, যেহেতু ভাষার একটি সীমাবদ্ধতা হলো এটি কাঠামো-নির্ভর, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং আহরিত। যাঁদের দ্বারা আমরা প্রভাবিত হই, তাঁরাও প্রভাবিত হয়েছিলেন অন্যদের দ্বারা; আবার আমাদের দ্বারা প্রভাবিত হয় অন্যরা। তাহলে জগৎকে মৌলিকভাবে অনুধাবন করতে, একটি বিশেষ ইতিহাস ও ভাষার সঙ্গে একে সম্পর্কিত করে না দেখতে, আমরা কীভাবে পারি? অন্যের থেকে ধারণা, মত ও চিন্তা ধার নিয়ে মৌলিকভাবে দর্শনচর্চা করা কীভাবে সম্ভব হবে আমাদের পক্ষে? হাইডেগার বলেন, মূল ধারণা, মত ও     চিন্তাগুলিকে প্রশ্ন করে, সেগুলির অপ্রতুলতাকে তুলে ধরে আমরা এগোতে পারি। কিন্তু এই প্রশ্ন করার জন্য ভাষাকেও – ভাষার সকল নির্মাণকেও – প্রশ্ন করতে হবে। দেরিদার বিনির্মাণবাদও তাই বলে।

আর দুর্বোধ্যতার প্রশ্নটি দেরিদা নিজেই উত্থাপন করেন, এবং ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি বা আন্তঃগ্রন্থিকতার সূত্র ধরে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, বোঝার ব্যাপারটি সবসময়ই আপেক্ষিক; আর, একটি গ্রন্থে একটি অর্থ কেন্দ্রীভূত থাকে না, থাকে বহু গ্রন্থে, বহু টেক্সটে, যত বেশি পঠন-পাঠন, তত বেশি বোধগম্য হওয়ার সম্ভাবনা এই অর্থ/অর্থসমূহ। সোজা কথায়, বিনির্মাণবাদ পশ্চিমের দর্শনশাস্ত্রের যে-বিশাল অঞ্চল থেকে উৎসারিত, সেই অঞ্চলটিকে জানতে হবে। যে-ভাষাপদ্ধতির কাঠামোকে উপজীব্য করে এবং তাকে বিনির্মাণ করে বিনির্মাণবাদ এগোয়, সেই ভাষাপদ্ধতিকে, সেই কাঠামোকে জানতে হবে। বিনির্মাণবাদ (এবং দেরিদার) ‘অনচ্ছতা’ ‘দুর্বোধ্যতা’ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে নিরন্তর পঠন-পাঠনের কোনো বিকল্প নেই। এটি কারো পক্ষেই করা প্রায় অসম্ভব। বিনির্মাণবাদের অ্যাকাডেমিক চর্চায় যে-গ্রন্থতালিকা এবং বিষয়-আশয় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, তার ভেতর পশ্চিমের অসংখ্য দার্শনিক – বিশেষভাবে, প্লাটো (যেহেতু দেরিদা প্লাটোকে নিয়ে লিখেছেন, তাঁর ব্যাখ্যা দিয়েছেন) হেগেল থেকে নিয়ে ফার্দিনান্দ সসুর (যেহেতু দেরিদার স্পিচ – কথন – উপস্থিতি এবং উৎস-তত্ত্বের সঙ্গে তাঁরা সম্পর্কিত), জাঁ জাক রুশো (যেহেতু কথনের পক্ষে রুশো, লিখনের পক্ষে দেরিদা), কান্ট, নিৎচে, ফ্রয়েড, লেভিনাস, হাইডেগার, হুসার্ল এবং কাঠামো ও উত্তর-কাঠামোবাদীরা অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে ভাষাভিত্তিক দর্শনের প্রবক্তাদের লেখালেখির সঙ্গে পরিচয় থাকাটাও জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। আর দেরিদার সবগুলো বই সম্পর্কে সম্যক একটি জ্ঞান থাকা তো মৌলিক আবশ্যকতা। এই শেষ কাজটিই তো একজীবনের কর্মযজ্ঞ। দেরিদার ব্যাখ্যাকারীদের অভিমত – দেরিদার মতো পাঠক ও ব্যাখ্যাকারী না হলে, তাঁর মতো পঠনের দ্বিমুখী একটি উদ্দেশ্য নিয়ে না নামলে তাঁকে এবং বিনির্মাণবাদকে বোঝা সম্ভব হবে না। সেজন্য, দেরিদার মতো আমরাও বলতে পারি, দেরিদা এবং তাঁর তত্ত্ব বুঝতে গেলে দেখা যাবে, অর্থগুলি ক্রমাগত তাদের প্রকাশ মুলতুবি রাখছে। দেরিদা বলেছিলেন :

– একটি টেক্সটের ব্যাখ্যা কখনো ‘শেষ’ হয়ে যায় না, কারণ টেক্সটসকল প্রতিটি পাঠেই নতুন একটি বিন্যাসে সাজে। সকল পঠন সেজন্য একটি নতুন অথবা ভ্রান্ত পাঠ।

– কোনো একটি শব্দ কী বোঝাচ্ছে তা নির্দিষ্ট করার মাধ্যমে যেমন অর্থ আবিষ্কার হয় না, তেমনি কোনো শব্দের সুস্থির একটি অর্থের অজুহাত দিয়ে অর্থ নির্ধারণ করা যায় না। প্রথম ক্ষেত্রে ‘উপস্থিতির অধিবিদ্যা’ কার্যকর, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বাণীকেন্দ্রিকতা বা লগোসেন্ট্রিজম। দুটিই দেরিদা খারিজ করে দেন।

অর্থ একটি টেক্সটে কেন্দ্রীভূত থাকে না – গ্রন্থ থেকে গ্রন্থে তা ছড়ায়। তাছাড়া টেক্সটের ভেতর যে-অহর্নিশ খেলা চলে শব্দের, ধ্বনির, দৃশ্যের, ইচ্ছার ইত্যাদির, তাতে অর্থ বড়ই অধরা হয়ে দেখা দেয়।

অবশ্য দেরিদার এসব চিন্তার উল্লেখ একটি জিনিসকে কখনো বৈধতা দেয় না এবং তা হচ্ছে অপঠন। দেরিদা, আন্দাজ করি, পঠিত না হয়ে যত অপবাদ পেয়েছেন, ততটা আর কেউ পাননি।

তবে দেরিদা-পঠনে আগ্রহীদের জন্য কিছু পরিসংখ্যান দেওয়া যায়। দেরিদাকে গত ১৭ বছরে ১৪,০০০ বার নানা জার্নাল-প্রবন্ধে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় তাকে নিয়ে ৫০০-এর বেশি পিএইচ ডি অভিসন্দর্ভ লেখা হয়েছে, ৪০০-র মতো বই লেখা হয়েছে তাঁকে নিয়ে। কুড়িটির মতো ওয়েবসাইট সক্রিয়, যেখানে দেরিদা মূল বা অন্যতম প্রধান উপস্থিতি। তাঁর মৃত্যুর পর এসব সংখ্যা নিশ্চয় অনেক বেড়েছে এবং বাড়বে।

দুই

জোনাথান কুলার, যিনি দেরিদার একজন বড় ভাষ্যকার এবং বিনির্মাণবাদের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের রচয়িতা, দেরিদাকে তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে পড়ার কথা বলেন। এতে সুবিধা হলো, এক দেরিদার জায়গায় তিন দেরিদাকে পাওয়া যায়। এবং দেরিদাকে বিনির্মাণ করা ছাড়াও আমাদের সময়ের জন্য সম্পর্কিত তিনটি ‘প্রকল্প’কে আমরা বুঝতে পারি।

কুলারের মতে, তিন দেরিদার প্রথম জন হচ্ছেন একজন দার্শনিক, দর্শনগ্রন্থের একজন পাঠক; দ্বিতীয় জন একজন পাঠক এবং ব্যাখ্যাকারী এবং তৃতীয় জন একজন মৌলিক চিন্তাবিদ। এ-তিন দেরিদা, বলাই বাহুল্য, একসঙ্গে যে-দেরিদাকে তুলে ধরেন, তাঁকে সামূহিকভাবে বোঝা কষ্টকর। তবে এই আলাদা আলাদাভাবে দেখে যদি তিন মূর্তিকে একদেহে স্থাপন করি, তাহলে সম্পূর্ণকে জানাটা কিছুটা সহজ হয়ে যাবে।

দার্শনিক দেরিদা যা যা করেছেন : তিনি পশ্চিমা দর্শনের বাণীকেন্দ্রিকতা অথবা ‘উপস্থিতির অধিবিদ্যা’র প্রবল প্রভাবের দিকে নির্দেশ করে বলেছেন, এই যে এত এত তত্ত্ব-ব্যাখ্যা-অভিসন্দর্ভ আছে পশ্চিমা দর্শনে, সেগুলি আসলে একটি পদ্ধতিরই নানা রূপ। এই পদ্ধতিকে এড়িয়ে চলা সম্ভব না হলেও, এই অধিবিদ্যার ইতি টানতে না পারলেও, এগুলি যেসব বিষয়কে দমিয়ে রাখতে চায়, যে-শ্রেণিক্রম চাপিয়ে দিয়ে উপস্থিতির নিশ্চয়তা বিধান করতে চায়, সেগুলিকে প্রশ্ন করা যায়, শ্রেণিক্রমটি উলটে দেওয়া যায়। দেরিদা এভাবে পশ্চিমা দর্শনের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এর ভেতরের অনুপস্থিতিগুলিকে, অসমাপ্ত অথবা পরিহারকৃত বিষয়গুলিকে দৃষ্টির আলোতে নিয়ে আসেন। এই অনুপস্থিত এবং অনুচ্চারিত বিষয়ের ওপর নজর দেওয়াটা, শেষ বিচারে, নীতিবিচারের একটি প্রকাশও বটে। নেগেটিভ থিওলজি বা নেতিবাচক ধর্মতত্ত্ব যে-রকম শূন্যতাবাদী নয়, বা বাতিলপন্থি নয়, দেরিদার দর্শনও তেমনি কোনো শূন্যতার সপক্ষে কথা বলে না। বরং দর্শনে (এবং সাহিত্যগ্রন্থে) যা ভুলে যাওয়া হয়েছে – অথচ মনে রাখা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল – তা মনে করিয়ে দেওয়া; এবং ভুলে যাওয়া বিস্ময় ও আনন্দের অনুভূতি, বহুত্বতা,      প্রান্তিকতা – এসবকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই দেরিদার উদ্দেশ্য।

পাঠক ও তফসিরকারী দেরিদাকে অনুসরণ করলে দেখা যাবে, তিনিপশ্চিমের নানা দার্শনিককে – প্লাটো থেকে নিয়ে হুসার্ল পর্যন্ত – যে-ঘনিষ্ঠভাবে পড়েছেন, তাতে ওই দ্বিমুখী পঠনের উপকারিতাটা অনুভব করা যায়। ওই দার্শনিকদের (এবং সেই সঙ্গে কবি ও সাহিত্যিকদের) লেখালেখিতে যে-দর্শনের প্রতিফলন তাঁরা করেন, তার সপক্ষে শুধু নয়, বিপক্ষেও নানা যুক্তির অবতারণা ওই লেখালেখিতেই হতে দেখা যায়। রূপ বা ফর্ম এবং বস্তু বা লণ্ঠ¡ঠ¡রের সেই পুরনো বিবাদের একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। লোহার একটি গোলকের গোলকত্ব এর বস্তুর ওপর আবশ্যিকভাবে নির্ভরশীল নয়। আমাকে যখন ‘লোহা’ হল্ট¢ঠ বলা হবে, তখন লোহা বলতে যে-ধারণাটি মাথায় আসবে, তা গোলকের আকৃতির যে হবে সে-রকম কোনো কথা নেই। আবার যখন ‘গোলক’ শব্দটি বলা হবে, তখন তার ভেতরে লোহার ওই বস্তুটি ফিট করে দিতে হবে, সে-রকম কোনো কথা নেই। ‘লোহার গোলক’-বর্ণনায় যে-দুটি পদ আছে, সেগুলো চূড়ান্ত নয়, সম্পর্কিত মাত্র এবং সম্পর্কিত হওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃত বা স্বেচ্ছামূলক বটে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ‘লোহা’ ও ‘গোলক’ যতটা পরস্পরকে তুলে ধরে, ততটা নাকচ করে। এই দ্বিমুখী অবস্থানের জন্য পঠন একদিকে অর্থের সন্ধান করলেও অর্থ যে পার্থক্যের (difference) ফল তা যেমন প্রতিষ্ঠা করে, অন্যদিকে অর্থ যে কখনো চূড়ান্তভাবে আবির্ভূত হয় না বরং   নিরন্তর তার ‘অর্থ’ মুলতুবি করে যায়, তাকেও প্রমাণ করে। এই মুলতুবিকরণ বোঝাতে গিয়ে দেরিদা একটি নতুন শব্দ চালু করেছেন – differaince, যার মূল হচ্ছে ফবভবৎ বা মুলতুবি করা।

পার্থক্যের বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করলে অনুপস্থিতি, ফাঁক বা গ্যাপ এসবও কিছুটা পরিষ্কার হবে। ফরাসি ভাষাতত্ত্ববিদ ফার্দিনান্দ সসুর যেমন বলেন, সবুজ বা লাল বলতে চূড়ান্ত কোনো অর্থ নেই। লাল হচ্ছে যা লাল নয়, তার থেকে পার্থক্যের একটি নাম। সবুজ হচ্ছে অ-সবুজ থেকে পৃথক করা একটি সংকেত। ‘সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে’ কথাটি অর্থহীন যদি একে পার্থক্যের অঞ্চল থেকে এনে কোনো শাশ্বত অঞ্চলে আমরা বসাতে চাই। সূর্য বলতে যা বলা হচ্ছে, তা যা-সূর্য নয়, যেমন সৌরমণ্ডলের অন্তহীন তারকার, থেকে পৃথক একটি বস্তু। একে সূর্য না বলে চাঁদ বলা শুরু করলে সূর্য শব্দটি একে চিহ্নিত করতে অপারগ হতো। পূর্বদিক বলতে যা আছে, তা হচ্ছে অ-পূর্ব অর্থাৎ পশ্চিম, বা উত্তরের বিচারে একটি দিকগত পরিচয় মাত্র। সূর্য ওঠে না নামে, এটিও অর্থহীন প্রশ্ন। মহাকাশ থেকে যেমন পূর্ব-পশ্চিম অর্থহীন, সূর্যেরও ওঠা-নামা অর্থহীন। এতগুলি শর্তসাপেক্ষে যদি ভাষার একটি অর্থ দাঁড়ায়, তাহলে সেই ভাষা কী করে একটি অপরিবর্তনীয় সত্যকে তুলে ধরে? কীভাবেই বা সে একটি উপস্থিতির (যেমন ঈশ্বরের মুখনিঃসৃত বাণী – ষড়মড়ং) পক্ষে তীব্র ওকালতি করে?

ভাষার এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পশ্চিমের দর্শনে মুখের ভাষা বা কথনকে যে এক বিশাল উচ্চতায় বসিয়ে দেয়া হয়েছে, এই স্ববিরোধটাকে চিহ্নিত করেই দেরিদা যাত্রা শুরু করেন। অফ গ্রামাটোলজি বইতে তিনি লিখনের বিপরীতে কথনের গুরুত্বকে বড় করে দেখার প্রবণতাকেই ভাষার ফলসিফিকেশন বা মেকিত্বকরণের জন্য দায়ী করেন। রশো লিখেছিলেন, ‘ভাষা তার জীবন ও উত্তাপ হারিয়ে ফেলেছে, লিখন একে গ্রাস করেছে।’ রুশো কথন বলতে যা বুঝিয়েছিলেন, কাঠামোবাদী তাত্ত্বিক রোঁলা বার্থের একটি ব্যাখ্যায় তার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বার্থ বলেছেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে, কথন-প্রপঞ্চ সবসময় লিখন-প্রপঞ্চের আগে এসেছে। এবং বংশগতির সূত্রে, কোনো ব্যক্তির মধ্যে ভাষা সংস্থাপিত হয় পরিবেশগত কথন থেকে তার শেখার মধ্য দিয়ে।’ কিন্তু দেরিদা বলেন ভিন্ন কথা, এবং তাঁর ব্যাখ্যায় লিখনের পরিধিটি বস্তুত ব্যাপক হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর কথার একটি সারাংশ নির্ণয় করলে এরকম দাঁড়ায় : লিখন হচ্ছে ভাষার পূর্বশর্ত, অতএব কথন-পূর্ববর্তী। লিখনের এই ধারণাটি তাই সাধারণভাবে যে-অক্ষর অথবা চিহ্ননির্ভর হিসেবে ধরা হয়, তার থেকে পৃথক। এই লিখন প্রকৃতপক্ষে একটি ‘ফ্রি প্লে’, একটি মুক্ত খেলা, যা সসুর-কথিত ডিফরেন্স বা পার্থক্য নির্ণয় করে, এবং যে-কোনো যোগাযোগ পদ্ধতির ভেতরের অনির্ণয়তাকে তুলে ধরে। ক্রিস্টোফার নরিস তাঁর ডিকনস্ট্রাকশন : থিয়োরি অ্যান্ড প্রাকটিস গ্রন্থে দেরিদার ব্যাখ্যাটি এভাবে তুলে ধরেন, ‘লিখন হচ্ছে অর্থের অন্তহীন বিচ্যুতি যা ভাষাকে শাসন করে এবং তাকে একটি সুস্থির, স্ব-সত্যায়নকারী জ্ঞানের বাইরে পৌঁছে দেয়। এই অর্থে, মুখের ভাষা আগে থেকেই ‘সাধারণ লিখনে’র অন্তর্ভুক্ত।’

দেরিদার কথামতো লিখন শুধু অক্ষর-সাজানোর মধ্য দিয়ে অর্থ-নিরূপণের প্রয়াস নয়, যেহেতু অক্ষরভিত্তিক হোক, অক্ষরহীন হোক, যে-কোনো অর্থ নিজেকে পূর্ণভাবে তুলে ধরে না, সাজানোর ব্যাপারটি তো দূরেই থাকে। লিখন হচ্ছে অর্থের প্রকাশ প্রক্রিয়ার ফাঁকগুলি, এপোরিয়া বা স্বনির্ণিত হেত্বাভাষগুলিকে চিহ্নিত করে; উদ্দেশ্য ও অর্থ, উচ্চারণ ও বোধের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব বাঁধিয়ে দেয়। যে-কোনো কথনের আগে এই প্রক্রিয়াটি সচল থাকে, সেজন্য, দেরিদার মতে, কথন হচ্ছে এক ধরনের লিখন। দেরিদার গ্রামাটোলজি হচ্ছে সেই লিখন-বিজ্ঞান এবং টেক্সচুয়ালিটির তত্ত্ব।

কথন যদি পশ্চিমা অধিবিদ্যার শ্রেষ্ঠত্ব, চূড়ান্ত সত্য, অর্থ, যথার্থতা, উপস্থিতি, স্ব-উপস্থিতি এবং বোধগম্য অর্থ (শেষ দুটি হুসার্লের প্রপঞ্চবাদের দুই খুঁটি, যা দেরিদা উপড়ে ফেলেছিলেন) – এসবের পক্ষে একটি শক্তিশালী বাতাবরণ সৃষ্টি করে, লিখন সেগুলোকে নস্যাৎ করে দেয়। দেরিদা তো দেখিয়েছেন একটি টেক্সটের ভেতর থাকে অসংখ্য স্ববিরোধিতা; একটি টেক্সট কী বলতে চায় এবং কী বলতে সে অপারগ, সেই দ্বন্দ্বই তো তার কোনো সত্যের দাবিকে উলটে দেয়। সেজন্য দেরিদার বিনির্মাণতত্ত্ব কোনো টেক্সটের ভেতরকার এই দ্বন্দ্ব ও স্ববিরোধ, এর এপোরিয়াসমূহ, এর উদ্দেশ্যের লৌহপ্রাচীর টপকে বেরিয়ে আসা কোনো মন্তব্য, মেটাফর, মার্জিনের লেখা, ফুটনোট – এসবকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে। এর ফলে টেক্সটটি একটি কৌশলগত পশ্চাদপসরণের সম্মুখীন হয়। দেরিদা জানান, ভাষার কোথাও অর্থ ঠিক ঠিক এবং যথানিয়মে হাজির থাকে না। অর্থ এগোয় হোঁচট খেতে খেতে, চেহারা বদলাতে বদলাতে। অর্থের অবয়ব তৈরি হয় আহরিত, আরোপিত চিন্তায়, পরিবর্তনশীল সংকেত-ক্রিয়ার অন্তর্বয়নে। বস্তুত ভাষাকে যদি এভাবে দেখা হয়, তাহলে ভাষাভিত্তিক যে-কোনো অর্থ-অনুসন্ধান প্রক্রিয়াও অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়ায়। দার্শনিকরা যে দেরিদাকে এতটা অপছন্দ করতেন, তার মূলে ছিল দর্শনের টেক্সটগুলিকে সত্যসন্ধ, উচ্চতর পর্যায়ের প্রায় অতিমানবিক চিন্তাপ্রতিভার স্ফুরণ ও চর্চার উদাহরণ থেকে সাধারণ ভাষাভিত্তিক এবং সাহিত্যিক একটি শ্রেণিতে পুনঃস্থাপন করার দেরিদার সংকল্প। যদি ‘সাহিত্যশ্রেণি’ হয়ে দাঁড়ায় দর্শন, তাহলে তো তার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, স্ব-বিরোধিতা, অর্থের অনিশ্চয়তা, অনন্ত মুলতুবি হওয়া এবং আন্তগ্রন্থিকতার সূত্রে পুনরাবৃত্তি ও অর্থের পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনাকেও মেনে নিতে হয়। দর্শন এ-কারণে তার লিখিত চরিত্রটি দমিয়ে রাখে বা অগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে। বস্তুত দার্শনিক বলতে এক অর্থে তাঁকেই বোঝানো যায়, যিনি ‘অভ্যাসগতভাবে ভুলে যান যে তিনি লিখছেন।’ একমাত্র লিখনই পারে সকল বোধগম্য আখ্যানের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে। অথচ দার্শনিকরা ‘দার্শনিক সত্যে’র অবমূল্যায়নের দোহাই দিয়ে লিখনকে খাটো করেছেন। ফ্রান্সিস বেকন যেমন বলেছিলেন, বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথে একটি বড় বাধা হচ্ছে এই যে, মানুষ শুধু শব্দের পেছনে ছুটেছে, প্রকাশকুশলতার পেছনে ছুটেছে। একটি শব্দ নিয়ে অ-কাজ হয় না – একশটি শব্দ তৈরি করতে হয়। যদিও বেকনের নিজের লেখার মধ্যে যে-শৃঙ্খলা আছে, তার সঙ্গে কথনের সম্পর্ক কম এবং তিনি তাঁর অনেক লেখায় যে অনেক ধারণাকে প্রশ্ন করেন, তার মধ্যে ওইসব ধারণার অন্তর্গত স্ববিরোধের ‘লিখিত’ চরিত্রটি পরিস্ফুট। লিখিত – অর্থাৎ তাতে দ্বন্দ্ব এবং হেত্বাভাস ও অর্থের প্রকাশ-অনির্দিষ্টতার একটি ছায়া থাকে।

দেরিদা যে কথন-লিখনের উচ্চ-নিচ শ্রেণিক্রমকে উল্টে দিলেন, যে- শ্রেণিক্রমকে তিনি ‘সহিংস’ বলে চিহ্নিত করেন, তার অনুরূপ আরেকটি শ্রেণিক্রমের উদাহরণ দিলে লিখন কেন কথন-পরবর্তী বা কথন থেকে ঊনতর নয়, তা পরিষ্কার হবে। পশ্চিমা দর্শনে প্রকৃতি ও সভ্যতার মধ্যে একটি সহিংস দ্বন্দ্ব রয়েছে। বলা হয় ‘সভ্যতা’ ‘প্রকৃতি’কে কলুষিত করেছে। বস্তুত রোমান্টিক ঐতিহ্যে এই দ্বন্দ্বটি একটি মূল বিষয়। তবে প্রকৃতি সবসময়েই সভ্যতা দ্বারা কলুষিত। অ-কলুষিত, মৌলিক প্রকৃতি বলে কিছু নেই। সে রকম কথনও লিখন দ্বারা কলুষিত নয়, লিখন-পূর্ব কথন বলেও কিছু নেই।

দর্শন কেন কথনকে গুরুত্ব দিয়েছে, তার একটি কারণ হলো যিনি কথা বলেন, অর্থাৎ বক্তা যিনি, তাঁর উপস্থিতিটি তাঁর কথার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা প্রায়, যেমন ‘লগোসে’ প্রতিষ্ঠা পায় ঈশ্বরের উপস্থিতি। কথনও বক্তার একান্ত সত্তা – তাঁর আত্মাকে – মূর্ত করে। সে-তুলনায় লিখনে ব্যক্তির আশু উপস্থিতি নেই। যা থাকে, তা নির্ণয়মূলক। অর্থাৎ লিখন শুরুতেই ব্যক্তির কর্তৃত্ব, ক্ষমতা, যথার্থতা এবং উপস্থিতিকে খর্ব করে।

দেরিদার মতে লিখনের তিনটি বৈশিষ্ট্য বর্তমান :

লিখিত সংকেত হচ্ছে একটি চিহ্ন যা পুনরাবৃত্ত হতে পারে ওই চিহ্ন সৃষ্টিকারীর (অর্থাৎ লেখকের) এবং যার উদ্দেশ্যে চিহ্নটি লিখিত তারও অনুপস্থিতিতে (যেমন একটি চিঠি যদি কেউ পঞ্চাশ-একশ বছর পর পড়ে)।

লিখিত চিহ্ন তার ‘প্রকৃত পরিপ্রেক্ষিত’ ভেঙে ভিন্ন একটি পরিপ্রেক্ষিতে পঠিত হতে পারে – এ-ব্যাপারে লেখকের অভিপ্রায় যাই থাকুক। একটি উদ্ধৃতিচিহ্নে যেমন, সংকেতের একটি মালা ভিন্ন কোনো আখ্যানে প্রবিষ্ট করানো সম্ভব।

লিখিত চিহ্ন দুটি অর্থে ‘ফাঁকে’র (বংঢ়ধপবসবহঃ) পাল্লায় পড়তে পারে – একটি বিশেষ মালায় গাঁথা হলে অন্য চিহ্নগুলি থেকে তা আলাদা হয়, এবং ‘বর্তমান বিবেচ্য’ কোনো বিষয় থেকে তা আলাদা হতে পারে, অর্থাৎ এই মালায় অনুপস্থিত কোনো চিহ্ন সম্পর্কে সে   মন্তব্য করতে পারে। অবশ্য লিখনের পক্ষে দেরিদার এই প্রায় আবেগতাড়িত ওকালতির একটি বিষয় স্বপ্রকাশ্য হলেও আরেকটিকে আমার মনে হয়েছে, যাকে বলে, খুব সাধারণ একটি পরিচিতি : ধপপবহঃঁধঃরাব ঃযব ঢ়ড়ংরঃরাব – অর্থাৎ যা আছে, তাকে ‘আরো আছে’ সে-রকম প্রমাণের প্রয়াস। যে-বিষয়টি স্বপ্রকাশ্য তা হলো : লিখন বলতে কথনের পেছনের প্রস্তুতি এবং প্রক্রিয়াকে এবং একই সঙ্গে অর্থের সন্ধান ও অর্থকে বিনির্মাণ করে অর্থের জায়গায় নানা ফাঁক-ফোকর, অর্থের নিরন্তর জায়গা-বদল, মুলতুবি হওয়া, তাকে বোঝা। যদি কোনো অর্থই স্বপ্রকাশ্য নয়, স্ব-সত্যায়িত নয়, তাহলে সত্যের পক্ষে, চূড়ান্তের পক্ষে যেসব দাবি উত্থাপন করা হয়, সেগুলোও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কিন্তু যা অতটা প্রকাশ্য নয় দেরিদার যুক্তিতে, তা হলো, লিখন যদি অতি আবশ্যিকভাবেই (তার নানা সংজ্ঞা-অনুযায়ী) কথন-পূর্ববর্তী হয়েই থাকে, যা দেরিদা তাঁর বিনির্মাণতত্ত্ব দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, তাহলে আর দার্শনিকদের, পশ্চিমা অধিবিদ্যার ঐতিহ্যকে এত দোষারোপ করে কী লাভ? যদি একসময় আবিষ্কার হয় যে, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে নয়, তাহলে টলেমি এবং তাঁর অনুসারীদের বাপান্ত করে কী লাভ? তবে দেরিদার ক্ষেত্রে লাভ একটি আছে বটে; তিনি এই প্রায় আবেগতাড়িত অভিযোগনামা পেশ করে তাকেই বিনির্মাণবাদ করার একটি সুযোগ করে দেন আমাদের। যেমন, দেরিদার ‘আবেগে’র একটি ব্যাখ্যা এভাবে দেওয়া যায় : এটি সাধারণ মানুষের আবেগ নয়, ভাষার ভিতরের আবেগ, যা নিজের দুর্বলতাগুলির একটি শক্তিশালী প্রকাশও বটে।

তিন

দেরিদার যুক্তিতর্ক যেহেতু একটি মোটা দাগে বিনির্মাণবাদের অধীনে বিচার করা হয়, সেহেতু বিনির্মাণবাদ কী, সে-সম্পর্কে একটি ধারণা করা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা ইংরেজি সাহিত্যে এমফিল গবেষণা শুরু করে, তাদের সাহিত্যতত্ত্ব পড়তে হয় এবং দেরিদার ‘স্ট্রাকচার, সাইন, অ্যান্ড প্লে ইন দি ডিসকোর্স অফ হিউম্যান সায়েন্সেস’ নামের প্রবন্ধটি তাদের পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত। উল্লেখ্য যে, ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সেমিনারে পঠিত এই প্রবন্ধটিই বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রে একটি তাত্ত্বিক আন্দোলনের – অর্থাৎ বিনির্মাণবাদের – সূচনা করে। প্রবন্ধটি কঠিন নিঃসন্দেহে, তবে শিক্ষার্থীদের বোধের পক্ষে অগম্য মোটেও নয়। বস্তুত এমনও হয়েছে, এই প্রবন্ধের ভিত্তিতে কেউ কেউ চমৎকার ব্যাখ্যাও উপস্থিত করেছে। কয়েক বছর আগে এই প্রবন্ধটি পড়া শেষ হলে আলোচনার সূত্র ধরে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিনির্মাণবাদ কী নয়। বিনির্মাণবাদ কী, তা বোঝার জন্য তা কী নয়, সেই ধারণাটি উপকারী হতে পারে। কেউ কেউ বলেছিল, বিনির্মাণবাদ কোনো পদ্ধতি নয়, কৌশল নয়; আখ্যানের ব্যাখ্যাও তা দেয় না, সমালোচনাও তা করে না। কেউ কেউ বলছিল, এটি কোনো দর্শন বা প্রতি-দর্শন নয়। এরকম প্রতিক্রিয়া একটি প্রায় নিয়মই হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এক শিক্ষার্থীর মন্তব্য আমাকে বিনির্মাণ নিয়ে ভাবতে সাহায্য করেছে। সে বলেছিল, দেরিদা যে-কাঠামোকে বদ্ধ বিবেচনা করে ভাষার অনন্ত ‘মুক্ত খেলা’র জন্য কাঠামো ভাঙার কথা বলেন, যে-মুক্ত খেলায় ‘পৃথিবীর খেলার আনন্দিত স্বীকৃতি এবং হয়ে-ওঠার নিষ্পাপতা, এবং সংকেতের পৃথিবীর পক্ষে হ্যাঁ বলার বিষয়টি স্বপ্রকাশিত – যে-পৃথিবীতে সত্যের চূড়ান্তবাদী শাসন নেই, যার উৎপত্তি বা মূলও বস্তুত নেই’ (দেরিদার ভাষ্য, এবং লক্ষণীয় এই ভাষ্যে একটি চিন্তা অন্য একটি চিন্তায় প্রবিষ্ট হয়ে কীভাবে একটি মালা সৃষ্টি করে), তাতে কাঠামোর জায়গায় শুধু কাঠামো ভাঙা নয়, একটি অনুপস্থিতির চিন্তাও বড় হয়ে ওঠে। কাঠামোর জায়গায় অ-কাঠামো যদি স্থাপন করা হয়, তাহলে অনুপস্থিতিটি একটি শর্ত হয়ে দাঁড়ায়। সেভাবে মুক্ত খেলার জায়গায় অমুক্ত খেলাহীনতা, নিষ্পাপতার জায়গায় পাপের ছায়াপাত ঘটতে থাকে। দেরিদা এটিকে ‘ট্রেস’ বা আভাস বলেছেন বটে, কিন্তু ওই শিক্ষার্থীর মূল বক্তব্য ছিল এই : দেরিদার বিনির্মাণবাদ একটি অনুপস্থিতি বা অভাবের চিন্তা থেকে উৎপাদিত, এবং এই অভাবের/ অনুপস্থিতির কাছেই ভাষাকে তা ফিরিয়ে দেয়।কথাটি নানাভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।

১৯৬৬ সালে পঠিত ওই প্রবন্ধটিতে দেরিদা প্রধানত কাঠামোবাদী নৃতত্ত্বকে বিবেচনা করেছেন। কাঠামোবাদী নৃতাত্ত্বিক ক্লদ লেভি-স্ট্রসের সমালোচনা উপস্থিত করেছেন, এভাবে কাঠামোবাদী পুরো প্রকল্পকেই তদন্তের অধীনে এনেছেন, এবং ব্যাখ্যার দুটি সম্ভাবনা দেখিয়েছেন। একদিকে, নগণ্যভাবে হলেও, কাঠামোবাদী পঠনের অধীনে ভাষা, কিংবদন্তি এবং মানববিজ্ঞানকে ন্যস্ত করা; তারপর এগুলির মূলে বা উৎসে ফিরে গিয়ে এমন একটি অবস্থান আবিষ্কার করা (মূলের পেছনে সত্যকে) যা রয়েছে খেলা এবং সংকেতের রীতির বাইরে, এবং যেখানে ব্যাখ্যা হচ্ছে একটি নির্বাসন। অর্থাৎ শুরুতে সম্পর্ক ও পার্থক্যের খেলা যা ‘ইতিবাচক’ (কাঠামোবাদী চিন্তা), শেষে একটি ব্যাখ্যাতীত অবস্থানে পৌঁছা, যা মূল বা শেকড়ের একটি কিংবদন্তির জায়গাও বটে। দেরিদা অবশ্য দেখান যে প্রথম প্রস্তাবনাটি যতটা পরিবর্তন ও পুনর্ব্যাখ্যাযোগ্য, দ্বিতীয়টি ততটাই অলীক এবং অনজর্নযোগ্য। অন্যদিকে, এ ধরনের অলীক (যদিও আবেগমাখা) চিন্তা বাদ দিয়ে ব্যাখ্যার দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া। এই ব্যাখ্যার শক্তি কাঠামো-চিন্তা থেকে ভাষাকে মুক্তি দেবে। দেখা যাবে, পার্থক্যসৃষ্টিকারী বিষয়গুলোর খেলা সীমিত হয়ে একটি ‘কেন্দ্রের’ আদল তৈরি হচ্ছে (যা আবারো কাঠামোবাদী চিন্তার একটি রূপান্তর), অথবা, প্রবন্ধের শেষে দেরিদা যেমন বলেন, ওই টেক্সটটির মতো একটি ‘অ-প্রজাতির, রূপহীন, মূক, নবজাত এবং ভয়ানক ধরনের দৈত্য তৈরি হচ্ছে।’ দৈত্য? কেন নয়, কারণ দৈত্যও একট টেক্সট। দেরিদা যা বোঝাতে চেয়েছেন, কাঠামোবাদী চিন্তার অন্তর্গত যে-শৃঙ্খলা রয়েছে (কেন্দ্র, কাঠামো, বিন্যাস, ইত্যাদি শব্দ-ব্যবহারে যা প্রকাশ্য), তা বিনির্মাণবাদের প্রক্রিয়া-অন্তে একেবারে বিপরীত অবস্থানে চলে যায়। সেই সহিংস দ্বিত্বতা বা ভায়োলেন্ট বাইনারির শেষ মাথায়। কিন্তু এই বিপরীত অবস্থানগ্রহণে বাইনারির বাঁধনটি যতই কাটা হোক, একটি পক্ষের ওপর অন্য পক্ষটির ছায়া – ট্রেস – লেগেই থাকে। সেজন্য এর মূলে থাকে অনুপস্থিতির অনিশ্চয়তা, স্থিতির জায়গায় অস্থিতি, অর্থের জায়গায় অর্থ-নিরপেক্ষতা অথবা ভিন্নার্থতা/ অনেকার্থতার মুক্ত খেলা এবং তজ্জনিত বিস্ময় ও আনন্দ।

অর্থাৎ একই সঙ্গে দীর্ঘশ্বাস এবং আনন্দ।

আর যদি অনুপস্থিতি হয় উপস্থিতির অভাব, ট্রেস বস্তুর ছায়া, এপোরিয়া যুক্তির অপভ্রংশ, তাহলে এসব দ্বিত্বের দুটি মাথা কোনোদিনই কি একটি আরেকটিকে পরিত্যাগ করে যেতে পারে? যদি অর্থের কোনো নির্দিষ্টতা না-ই থাকে, এত যুক্তিতর্ক দিয়ে একে প্রতিষ্ঠা করার পেছনে কারণটা কী?

চার

বিনির্মাণবাদ বলতে দেরিদা যা বোঝান, তার কিছু তাঁর নিজের এবং নানা ব্যাখ্যাকারীর জবানি থেকে বেছে নিয়ে সেগুলোর একটি সারাংশ করলে এ-রকম দাঁড়ায় :

– বিনির্মাণবাদের কারবার, যদিও টেক্সট নিয়ে, এটি টেক্সচুয়াল সমালোচনার কোনো পদ্ধতি নয়।

– বিনির্মাণ জেরা করার, তদন্ত করার একটি উপায়, যদিও এক মৌলিক উপায়ে তা নিজেকেই জেরা করে, তদন্ত করে এবং নিজেকে নিয়ে ভাবে।

– বিনির্মাণের শুরু হয় যখন কোনো টেক্সট তার নিজের জন্য বেঁধে দেওয়া নিয়মগুলি ভাঙতে থাকে।

– বিনির্মাণবাদ যুক্তির বাইরে অবস্থান নেওয়া ব্যাখ্যা-মন্তব্যের এক নিরন্তর, শৃঙ্খলাহীন এমনকি বুনো স্বাধীনতার নাম।

– বিনির্মাণবাদ মৌলিকভাবে ইতিবাচক। এটি স্মৃতির পুনরাধিষ্ঠানকে হ্যাঁ বলে।

– বিনির্মাণবাদী সমালোচনা কোনো গ্রন্থের পূর্ণতা পাওয়ার পথ দেখায় না, বরং এবং আবশ্যকীয় অপূর্ণতাকেই দেখায়। বিনির্মাণবাদ বলে যে, কোনো টেক্সট কোনো কিছুর প্রতি পর্যাপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে না, এবং দেখানো উচিতও নয়। অপূর্ণতা, অপর্যাপ্ততা, অনপরিহার্যতা এসব বিনির্মাণবাদের সূত্র।

– ক্রিস্টোফার নরিস (আমার বিবেচনায় বিনির্মাণবাদের সবচেয়ে সাবলীল ব্যাখ্যাকারী) বলেছেন, বিনির্মাণবাদ হচ্ছে চিন্তার একটি ক্রিয়া যা নিরন্তর চালানো যায় না – কেননা এর অর্থ হচ্ছে উন্মাদনাকে বরণ করা।

– একটু আগে কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। দেরিদা তাঁর ১৯৬৬ সালে পঠিত প্রবন্ধে একজন উত্তর-কাঠামোবাদী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, কারণ ওই প্রবন্ধে তাঁর প্রস্তাবিত বিনির্মাণবাদ এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে যে, কোনো টেক্সটের ভেতরে একটি পূর্বস্থাপিত বা বস্তুনিষ্ঠ কাঠামো থাকে। এই কাঠামো আবার গভীর কোনো অর্থ/দ্যোতনা/চিন্তার বিন্যাসকে তুলে ধরে বলে যে-ধারণা কাঠামোবাদীরা দিয়েছিলেন, তাকেও বিনির্মাণবাদ প্রত্যাখ্যান করে।

– অর্থাৎ বিনির্মাণবাদ ব্যাখ্যামূলক চর্চার/শৈলীর মধ্যে যে-পদ্ধতিগত ও ভাষাগত ঋজু শৃঙ্খলা থাকে তাকে মাথার ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়। একটি নতুন পথের সন্ধান এতে পাওয়া যায় – এবং সেটি প্রধানত পঠনের সমালোচনার নয়।

– কারণ বিনির্মাণবাদ এই ধারণাকে প্রতিহত করে যে, সমালোচনা কোনো বিশেষ জ্ঞান প্রদান করে। সমালোচনা হচ্ছে লিখনের একটি কাজ – যেমন সাহিত্য। কাজেই বিনির্মাণবাদ সাহিত্য ও সমালোচনার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করে না।

– বিনির্মাণবাদ শুরুতেই বলে, কোনো টেক্সটের কোনো সুস্থির পরিচিতি নেই। দেরিদার ভাষায় এর কোনো নিশ্চিত উৎসও নেই। ‘কোনো টেক্সটকে পড়া পরবর্তী টেক্সট পড়ার মুখবন্ধ বিশেষ’ – এই কথাটি অফ গ্রামাটোলজির একটি আপ্তবাক্যপ্রায়।

– এরই সূত্র ধরে আবার দেরিদা বলেন, ‘টেক্সটের বাইরে কিছু নেই’। যেমন স্পিনোজা বলেছিলেন, ‘যা বর্তমান, তাই ঈশ্বর’ বা ‘যদি কিছু থাকে, তাহলে সেই থাকার নাম ঈশ্বর’। তবে, স্পিনোজার প্রসঙ্গটি জুতসই হলো না, কারণ এই ‘মেটাফিজিক্স অফ প্রেসেন্স’ বা উপস্থিতির অধিবিদ্যাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিনির্মাণবাদের শুরু। অথবা, হয়তো জুতসই, যেহেতু স্পিনোজার উদ্ধৃতি আমাদের আবার বিনির্মাণবাদের সূত্রপাত-রেখায় নিয়ে যাবে, যেখান থেকে যাত্রা শুরু করে একে একে এর প্রস্তাবিত চিন্তা-অচিন্তাগুলি (অর্থাৎ যেগুলি বিনির্মাণবাদের বিবেচনা নয়, অথচ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যেমন এই অভিযোগ যে, বিনির্মাণবাদ শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের বিপক্ষে, একক সংবিধানের বিরুদ্ধে, ইত্যাদি) বোঝার চেষ্টা করা যাবে।

পাঁচ

বিনির্মাণবাদ নিয়ে চারশর বেশি যদি বই লেখা হয়, তাহলে নিশ্চয় এটি নখের ডগায় নিয়ে আসার মতো কোনো বিষয় নয়। ওপরে যা বলা হলো, তা বিনির্মাণবাদের মূল ভাবনাগুলির খুব সাধারণ একটি পরিচিতিমাত্র। তবে এটিও দেরিদা-কথিত একটি মুখবন্ধও বটে, যা পরবর্তী টেক্সটে যাওয়ার একটি আমন্ত্রণ।তবে বিনির্মাণবাদ একটি – আনন্দিত না হলেও – আকর্ষণীয় চিন্তা বটে। এটি আগ্রাসী নয়, আবার বিনয়ীও নয়। এজন্য, মারে ক্রুগারের মতো যাঁরা বিনির্মাণবাদকে ‘নতুন কিছু নয়’ (সেই নিউ ক্রিটিসিজমের একটি নামান্তর মাত্র) বলে একে ‘না’ বলেছেন, তাঁদের কথায় কান না দিয়ে একে আমরা ‘হ্যাঁ’ বলব। কারণ এটি নিউ ক্রিটিসিজমের বহু পথ দূর দিয়ে গিয়ে আমাদেরকে পঠন-পাঠনের এবং চিন্তার একটি ক্ষেত্রের সঙ্গে পরিচিত করায়, যেখানে কর্তৃত্বকারী, কেন্দ্রবাদী এবং চূড়ান্তবাদী চিন্তাগুলির অনেক স্থাপনা আমরা ভেতর থেকে গুঁড়িয়ে দিতে থাকি। এই কেন্দ্রশাসিত, উগ্রবাদী, পাণ্ডা-ফাণ্ডাদের প্রবল প্রতাপের দিনে, এই স্বাধীনতা-রহিত, পুঁজিবাদ-আক্রান্ত, রুদ্ধ চিন্তার দিনে এই কাজটি আমাদের অস্তিত্বের জন্যেও জরুরি বটে।