নয়
মৃতুযশয্যায় শুয়ে আছে আমার মা। আমরা সব ভাইবোন তার পাশ জুড়ে। মা শুয়ে আছে একটা খাট কিংবা চৌকিতে। একটু যেন জোরে কথা বলছে। একটু যেন বেশি শব্দ করে ছেলেমেয়েদেরকে বলছে, আমি চলে যাচ্ছি। তোমরা সবাই সবাইকে দেখে রেখো। কেউ কারোর সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি, মনোমালিন্য করো না। মার একপাশে দাঁড়িয়ে আমি আকুল হয়ে কাঁদি। একসময় আমার দিকে তাকাল মা। অপলক চোখে তাকিয়ে রইল। আমি হাঁটু গেড়ে মার সামনে বসলাম। মার কপালে-মাথায় হাত বুলাতে লাগলাম। চোখের জলে চোখ ভেসে যাচ্ছে আমার, গাল ভেসে যাচ্ছে। বুকফাটা কান্নায় আমি শুধু বলছি, মা মাগো, আমার মা। আমার মা। মা তার শীর্ণ হাত বাড়িয়ে আমার একটা হাত ধরল। কেঁদো না বাবা, কেঁদো না। এমন সময় একদিন আসবেই। মরতে একদিন হবেই। আমি আর কথা বলতে পারি না।
আমি কাঁদি।আমি শুধু কাঁদি।একসময় টের পাই আমি কাঁদছি ঘুমঘোরে। চোখের জলে বালিশ ভিজে যাচ্ছে আমার। আমি আসলে স্বপ্ন দেখে কাঁদছি।
পাশে আমার স্ত্রী শুয়ে আছে, সে কিছু টেরই পেল না। অঘোরে ঘুমাচ্ছে। প্রেসারের ওষুধ খেতে হয় তাকে। সঙ্গে বোধহয় ঘুমের ওষুধও আছে। ফলে তার ঘুম একটু বেশি গভীর।
আমার ঘুম এমনিতেই খুব পাতলা। তার ওপর একবার ভাঙলে সহজে আর আসতে চায় না।
সে-রাতেও আর ঘুম এলো না। বাকি রাত জেগে থাকলাম। শুধুই মার কথা মনে পড়ল আমার। মাকে নিয়ে কত স্মৃতি, কত দুঃখ বেদনা আনন্দের কথা। তবে দুঃখের কথাই বেশি। কারণ আমার মা বলতে গেলে সারাটা জীবন শুধু কষ্ট করেই গেল। সুখ যেটুকু পাওয়ার পেয়েছিল তার বাবার সংসারে। অতি সচ্ছল, বিশাল এক পিতার সংসারে জন্মেছিল আমার মা। জায়গা-সম্পত্তি টাকা-পয়সা প্রভাব-প্রতিপত্তি সব মিলিয়ে আমার নানা ছিলেন এক বিশাল মানুষ। বেলফাস্ট নামের এক ব্রিটিশ কারগো জাহাজের সারেঙ ছিলেন। বছরের বেশির ভাগ সময় থাকতেন কলকাতায় আর নদী-সমুদ্রে। কখনো কখনো নারায়ণগঞ্জ বন্দরে এসেও নোঙড় করত তাঁর কারগো।
নানা ছিলেন মোঘল সম্রাটদের মতো ফর্সা, সুন্দর এবং বিশাল দেহী।
নানার আদল পেয়েছিল আমার মা। মা হচ্ছে নানার দ্বিতীয় ঘরের বড়মেয়ে। অনেকগুলো ছেলেমেয়ে হয়েছিল বুজির। কিন্তু ছেলেমেয়ে বাঁচতো না। এগারো বারোটি সন্তানের মধ্যে শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকল আমার মা আর পুনুআম্মা।
টগর নামে একজন মামা ছিল আমার। সাত-আট বছর বয়সে সেও মারা যায়। মেদিনী মণ্ডল গ্রামে আমার নানাবাড়ির দক্ষিণ দিককার বাগানের পশ্চিম দিককার কয়েকটি আমগাছতলায় আমার নানা আর টগর মামার কবর।
আমার মা ছিল নানার নয়নের মণি। কী যে ভালো মেয়েকে তিনি বাসতেন, বলে বোঝানো যাবে না। শুধু একটি ঘটনার কথা বলি। একবার বর্ষাকালে আমার মায়ের খুব কমলা খাওয়ার শখ হলো। কলকাতায় নানাকে চিঠি লিখে সে-কথা জানানো হলো। কয়েকদিনের মধ্যে বাড়ি এলেন নানা। তখন কলকাতা থেকে বিক্রমপুরে আসার ব্যবস্থা হচ্ছে স্টিমার। গোয়ালন্দ হয়ে স্টিমার এসে থামতো ভাগ্যকূল কিংবা লৌহজং। নানা এসে সেবার নামলেন ভাগ্যকূলে। তারপর বিশাল একখানা কেরายนৌকা নিয়ে ধানীবিলের ওপর দিয়ে সাত-আট মাইল দূরত্ব পাড়ি দিয়ে বাড়ি এলেন। ব্যাগ সুটকেসের সঙ্গে অনেকগুলো বস্তা। মাঝিরা বস্তাগুলো এনে তুললেন বাড়ির উঠোনে।
নানা আমার মাকে ডাকলেন। আনু, আমার কাছে আসো মা।
আমার মায়ের নাম আনোয়ারা বেগম। নানাবাড়ির সবাই তাকে ডাকতো আনু।
নানার ডাক শুনে মা গেল তাঁর কাছে।
নানা তখন মার হাত ধরে উঠোনে গেলেন। পুরনো আমলের হাতাওয়ালা চেয়ার নিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসলেন। মেয়েকে দাঁড় করালেন কোলের কাছে। তারপর বাড়ির কাজের লোকদের বললেন বস্তাগুলো খুলতে। মোট পাঁচখানা বস্তা। সবগুলোই খোলা হলো। দেখা গেল বস্তাভর্তি কমলা আর কমলা। এবং পাঁচ বস্তা কমলাই উঠোনে ঢালা হলো। উঠোন প্রায় ভরে গেল কমলায়। মা বিস্ময়ের চোখে তাকিয়ে রইলো। বাড়ির লোকজন হতভম্ব। এত কমলা একসাথে জীবনে কেউ দেখেনি।
নানা বললেন, মাগো, তুমি কমলা খেতে চেয়েছিলে এজন্য তোমার জন্য কমলা নিয়ে এসেছি। খাও, যত ইচ্ছা কমলা খাও।
বিয়ের পর এই সুখের জীবন আমার মায়ের থাকেনا۔ আব্বা ছিলেন এক মোটামুটি সচ্ছল গেরস্তঘরের ছেলে। লৌহজং থানার পয়সা গ্রামে জন্ম। দেড় বছর বয়সে মা হারান। সাত-আট বছরের বড় একভাই ছিল। নাম, রহিম। এই দুই ছেলে নিয়ে দাদা আবার বিয়ে করেন তাঁর এক আত্মীয়কে। আমার সেই দাদি আগের স্বামীর একটি ছেলের হাত ধরে দাদার সংসারে আসেন। সেই ছেলেই আমার হপিকাকা। এই ঘরে তাঁর একটি মেয়ে হয় একটি ছেলে জন্মায়। ছেলেটি আমার ফজল কাকা।
আমার সেই ফুফুটি এখন মায়ের চব্বিশ ঘণ্টার সঙ্গী। নিজে বৃদ্ধ হয়েছেন, তবু আমার মাকে আগলে রাখার চেষ্টা করছেন। বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
যা হোক, পয়সা হস্কুলে আব্বা যখন ক্লাস এইটে পড়েন তখন দাদা মারা গেলেন। বড়ভাই মারা গেছেন আগে।
কিন্তু সমসারের সংসারে বাবা থাকেননি। তিনি থাকতেন তাঁর এক চাচাতো চাচার কাছে। একই গ্রামে, একটু দূরে বাড়ি। সেই বাড়ি থেকে কলকাতায় গিয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন।
তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষার সিট পড়তো কলকাতায়। দেশভাগ হয়নি।
কিন্তু চাচার সংসারে থেকেও আব্বা ছিলেন সর্বান্তঃকরণে একা, এতিম।
নানার মৃত্যুর পর মেয়ের জন্য এরকম একটি পাত্রই খুঁজছিলে বুঝি। নানা অনেক জায়গাসম্পত্তি রেখে গেছেন। নিজের কোনো ছেলে নেই। দুটোমাত্র মেয়ে। বড়মেয়ের জন্য ঘরজামাই ধরনের একটি পাত্র পেলে ভালো। তা-ই হলো।
আব্বা তখন ম্যাট্রিক সেকেন্ড ডিভিশন পাশ করে ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কমিটিতে কেরানি চাকরিতে ঢুকেছেন। চাকরির ব্যবস্থা করেছেন তাঁর ওই চাচা। কারণ তিনি নিজেও ওখানে চাকরি করতেন। লক্ষ্মীবাজারে মিউনিসিপ্যাল কমিটি সদ্য হয়েছে। লম্বা মত একটা টিনের ঘরে পুরো অফিস।
আমরা তখন একে একে ভাইবোনেরা জন্মাচ্ছি। ওদিকে আব্বার যা বেতন তাতে সংসার ঠিকমতো চলে না। তার ওপর পুনুয়াম্মা আছেন, রিনা আছে, বুজি আছে। সব মিলিয়ে আব্বারের রোজগারে সংসার চলে না।
বুজি তখন একটার পর একটা জমি বিক্রি করতে শুরু করলেন। আব্বার রোজগারের টাকা আর বুজির জমিবিক্রির টাকা এভাবে সংসার চলে। আর এইসব সামলাতে সামলাতে আমার মা দিন দিন ম্লান হচ্ছে।
মা অসাধারণ সুন্দর ছিল একসময়ে। আমার শিশু বয়স, কিশোর বয়স পর্যন্ত দেখা মার চেহারা এখনো আমার চোখ জুড়ে। প্যাটার্ন ছিল কিছুটা ওয়াহিদা রহমান কিছুটা রাখি গুলজার ধরনের। দুধে আলতা বলতে যা বোঝায় গায়ের রং ঠিক তেমন। মাথাভর্তি লম্বা চুল। মাঝারি আকৃতির শরীর, না মোটা না রোগা। সবমিলিয়ে চোখ ভরে থাকত মতো মানুষ। এগারোটি ভাইবোন জন্মাল্লাম আমরা, তবু মার সৌন্দর্য তেমন ম্লান হচ্ছিল না। নিজের বাবার সংসারে রাজকীয় জীবন যাপন করে এসে গরিব কেরানির সংসার, এতগুলো ছেলেমেয়ে, অভাব অনটন তবুও একটা সময় পর্যন্ত মা ভালোই ছিল। একহাতে এতবড় সংসার সবদিক ঠিক রেখে কী সুন্দরভাবে চালিয়ে যাচ্ছিল!
কিন্তু আব্বা মারা যাওয়ার পর আমাদের মাথার ওপর সম্পূর্ণ আকাশ ভেঙে পড়ল। ঘরে একটি পয়সাও নেই। মাস গেলে চারশো টাকা বাড়িভাড়া। এতগুলো ছেলেমেয়ের পড়াশোনা। আমাদের পাশে দাঁড়াবার ওজনর মানুষ নেই। দশটি নগদ টাকাও রেখে যেতে পারেননি আব্বা। মা একেবারে দিশেহারা হয়ে গেল।
দেশ আছে তখন মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে।
মিউনিসিপ্যালিতে আব্বার প্রভিডেন্ট ফান্ডের কিছু টাকা ছিল, গ্রাচ্যুইটির সামান্য টাকা ছিল কিন্তু সে টাকা তোলার জন্য কোর্ট থেকে একটা সাকসেসন সার্টিফিকেট বের করা দরকার। সেই কাজটা কে করবে? আমরা তো কিছু বুঝই না।
মার প্রকৃত যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল তখন থেকেই।
মিনু খালার বর বাদল খান সাহেব দায়িত্ব নিলেন সাকসেসন সার্টিফিকেট বের করার। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে দেশ স্বাধীন হলো। নতুন দেশ। সবকিছুই নতুন করে শুরু হচ্ছে। ওই সার্টিফিকেট হাতে পেতে বছরদেয়েক লাগল। সেই দেড়টা বছর প্রায়ই কেটে যেতে হতো মাকে। আমার ছোটভাই খোকন তখন একেবারে ছোট। ছ-সাত বছর বয়স হবে। খোকনকে নিয়ে গেণ্ডারিয়া থেকে হেঁটে লক্ষ্মীবাজারের ওদিক দিয়ে কোর্টে গিয়ে বসে থাকত মা। রিকশা করে যাওয়ার সাধ্য ছিল না। পয়সা পাবে কোথায়?
এই অবস্থায় একদিন খোকন আবার কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গেল।
মার এই যুদ্ধটা চলেছে অনেকদিন। বাহাত্তর সালের শেষদিক কিংবা পিয়াত্তরের শুরুতে মিউনিসিপ্যালিতে আজাদের চাকরি হলো। আব্বারের জায়গায় তাকে নেওয়া হলো। আব্বারের প্রভিডেন্ট ফাণ্ড গ্রাচ্যুইটির সামান্যকিছু টাকাও পাওয়া গেল। সেই টাকা থেকে ছয়হাজার টাকা আবার মেরে দিল মোতালেব মামা। ব্যবসার কথা বলে টাকাটা সে নিয়েছিল, মাসে মাসে আমাদেরিক কিছু লাভ দেবে বলে। একপর্যায়ে পুরোটাই নিজেই খেয়ে ফেলল।
তারপর থেকে দিন ফিরতে শুরু করেছিল আমাদের।
মিউনিসিপ্যালিতে চাকরিতে ঢুকে বৃদ্ধি করে আমার নামে একটা কন্ট্রাক্টরীর লাইসেন্স বের করল আজাদ। ‘মিলন ট্রেডিং কোম্পানী’। আমি তখন জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট পড়ি। পড়ি সায়েন্স। ওই বয়সে যা হয়, চোখ ভরা অনেক স্বপ্ন। এক ফাঁকে লেখক হওয়ার চেষ্টা করছি। বাংলাবাজার থেকে প্রকাশিত শুভেচ্ছা নামের একটি সিনেমা মাসিকের ছবিতে থাকা লেখাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
বিজ্ঞাপন প্রতিনিধির কাজ করছি। সস্তা একটা ব্রিফকেস হাতে অনেকদিন বিজ্ঞাপন সংগ্রহের জন্য বায়তুল মোকাররমের বিভিন্ন দোকানে ছুটেছি। ফাঁকে ফাঁকে লেখা। এদিক-ওদিক অবিরাম ছাপা হচ্ছে গল্প।
আমার বন্ধু কামাল এবং মুকুলের ওয়াইজ ঘাটের বুলবুল একাডেমীতে তিনচার মাস রবীন্দ্রসংগীতও শেখার চেষ্টা করলাম।
তারপর শুরু হলো মিউনিসিপালিটিতে কন্ট্রাক্টরি। ‘মিলন ট্রেডিং কোম্পানী’র মালিক আমি। রাস্তাঘাট মেরামতের ছোট ছোট কাজ করি। ওস্তাগার লেবারদের সঙ্গে কাজ। রোড ইন্সপেক্টর, ওভারসিয়ার, অ্যাসিসট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার, ইঞ্জিনিয়ারদেরকে স্যার স্যার করি।
আস্তে আস্তে দিন ঘুরতে লাগল।
অবস্থা যখন বেশ ভালোর দিকে তখন সবকিছু চলে গেল আজাদের হাতে। আর আমি নিজের জীবন বদলাতে, আমার বোন মণির জীবন বদলাতে চলে গেলাম জার্মানিতে। মণির কিছুটা গোপনেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। দুলাভাই চলে গিয়েছিলেন জার্মানিতে।
এই যে এতগুলো দিন, আব্বা বেঁচে থাকতেও অনেকদিন আগে থেকে যুদ্ধটা যে মা শুরু করেছিল, তারপর আব্বার মৃত্যু, আমাদের উঠে দাঁড়াবার সময় একে একে প্রতিটি ভাইয়ের প্রতিষ্ঠিত হওয়া, বোনদের বিয়ে, সবার বড় মণি এবং সবার ছোট বোন আসমা থাকে আমেরিকাতে। একজন নিউইয়র্কে, একজন লস এঞ্জেলসে। ছোটভাই খোকন পনেরো বছর আমেরিকা থেকে দেশে ফিরল। আজাদ ভালোই অবস্থাপন্ন, শুধু একটা দুঃখজনক ঘটনা এর মধ্যে ঘটে গেল, আমার পিঠাপিঠি বাদল তিনবছর আগে মারা গেল। সব মিলিয়ে সময় আমাদেরকেও একটা ভালো জায়গায় এনে দাঁড় করাল। এর পেছনে একক অবদান আমার মায়ের।
বহু বহু বছরে আমার মাকে কখনো ক্লান্ত হতে দেখিনি। অসুস্থ হতে দেখিনি। জ্বরজারি সর্দি-কাশি কিচ্ছু না। যন্ত্রের মতো প্রতিটি সকালে জীবন শুরু করেছে মা। দুপুরবেলা আধঘণ্টাও শুয়ে থাকেনি কোনদিন। একটানা রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত সংসারের কাজ। আব্বা বেঁচে থাকার সময় থেকে কাজের বুয়া বারেকের মা। আমার মার এতটাই ভক্ত সে, সংগে ডাকে মা। আজ বত্রিশ-তেত্রিশ বছর মার সঙ্গেই আছে। মাকে ছেড়ে যায়নি। আমার সেই ফুফু আর বারেকের মা এখনও চব্বিশ ঘণ্টা আনন্দে রাখছে মাকে।
মা থাকে গেণ্ডারিয়ার বাড়িতে। আমার সেজোবোন ডলি থাকে মায়ের সঙ্গে। ডলির বর থাকে জর্ডানে। এক ছেলে এক মেয়ে ডলির। মেয়ের বিয়ে হয়েছে ইতালিতে। নাম শিশির। ছেলেটির নাম শাওন। ভালো ক্রিকেট খেলে। সারাক্ষণ আমার মাকে দেখে রাখছে ওরা।
আর আমরা তো যে যার সংসার নিয়ে একেকজন একেকদিকে চলে গেছি। সংসারের নিয়মই তো এই। মায়েদের জীবন হচ্ছে পাখির মতো। পাখি যেমন ডিম পেড়ে, ডানার আড়ালে ছানাদের রেখে বড় করে, তারপর উড়তে শিখে ছানারা যে যার মতো নিজের আকাশে উড়াল দেয়, আমরাও মায়ের সংসার ভেঙে সেভাবে একদিন উড়াল দিলাম।
মাকে প্রথম ভাঙতে দেখলাম আজাদ আলাদা সংসারে চলে যাওয়ার পর। তবে আশ্চর্য ঘটনা হলো, আমরা সবাই দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর থেকেই আমার মাকে দেখছিলাম আস্তে আস্তে নিস্তেজ হচ্ছে। প্রথমে বসে পড়ল সে। হাঁটাচলা কমে এলো। তারপর শুয়ে পড়ল। গেণ্ডারিয়ার রফিক ডাক্তার, আর রিয়াজ মোবারক তার চিকিৎসা করে। কখনও কখনও নার্সিংহোমে নিয়ে যাই আমরা। কয়েকজন থেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে ফিরে আসে।
এরপর আরেক শোকের ঘটনা ঘটে গেল মার জীবনে।
বাদল মারা গেল।
বাদলের লাশ গেণ্ডারিয়ার বাসায় আনার পর মা যে কী পরিমাণ চিৎকার করে কেঁদেছিল, সেই চিৎকার এবং বুকফাটা হাহাকার এখনও আমার বুকে চেপে আছে। একজীবনে সেই চাপ আমি বুক থেকে মুছতে পারব না।
তারপর থেকে আরও ভাঙতে শুরু করল মা।
আরও ভাঙতে।
পুরোপুরিই বিছানা নিয়ে নিল। উঠে দাঁড়াতে পারে না। বসতে পারে না। খেতে পারে না।
একরাতে প্রবলভাবে কাঁপতে লাগল। ডলি কাঁদতে কাঁদতে ফোন করল। রাত তিনটার সময় আজাদ ছুটে এলো রূপনগর থেকে, খোকন এলো মোহাম্মদপুর থেকে। আমি মনোয়ারা হাসপাতাল থেকে একটা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে গেলাম। গেণ্ডারিয়াতেই থাকে ডালু, সে সবসময়ই আছে আমাদের পাশে। সেও এলো। সবাই মিলে মনোয়ারা হাসপাতালে নিয়ে এলাম মাকে। বেশ কিছুদিন হাসপাতালে থেকে কিছুটা সুস্থ হলো সে।
কিন্তু হাসপাতালে মা কিছুতেই থাকতে চায় না। এক-দুদিন পরই বাড়ি ফেরার জন্য উতলা হয়।
এই ফাঁকে একটু একটু মাথার গণ্ডগোলও দেখা দিয়েছে তাঁর। বর্তমান সময় এবং অতীতকালের স্মৃতি একাকার করে ফেলে। কখনও কখনও অবিরাম অতীতকাল নিয়ে কথা বলে যায়। কত ছোট ছোট সূক্ষ্ম ঘটনা যে বলে! মেদিনী মণ্ডল গ্রামের মানুষের জন্য, আত্মীয়-স্বজন এবং পড়শিদের জন্য আজীবনই প্রবল টান ছিল তার। আমাদের সেইসব দুঃখ এবং অভাবের দিনেও মাকে দেখেছি গ্রাম থেকে কেউ এলে নিজে না খেয়ে তাদেরকে খাইয়েছে। কত যত্ন আশ্রয়ে দিয়েছে আমাদের এতগুলো মানুষের গাদাগাদি সংসারে।
আর গ্রামের মানুষ কী যে ভালোবাসে আমার মাকে! গরিব মানুষেরা বাসের ভাড়া জোগাড় করে চলে আসে আমার মাকে দেখতে।
মাথার ওই গণ্ডগোলের জন্য দেশের বড় বড় ডাক্তাররা দেখেছেন তাকে। আমার বন্ধু ডাক্তার মোহিত কামাল নিয়মিত দেখছেন। মাঝখানে একেবারেই এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল মা। রাতের পর রাত ঘুমাতো না। অবিরাম কথা বলতো। ডলিকে ডাকতো। সারাক্ষণ তার সামনে বসে থাকতে হতো কাউকে না কাউকে। নয়তো কী রকম যেন ভয় পেত। হয় আমার সেই ফুফু নয় বারেকের মা নয় ডলি, আর প্রতিদিনই আমার কোনও না কোনও বোন মায়ের পাশে এসে বসে থাকতো।
মাঝখানে তো অনেকগুলো দিন রাখতে হলো মনোয়ারা হাসপাতালে। এই হাসপাতালটি আমার বাসার কাছে। সব কাজ বন্ধ করে আমি তখন রাতদিন বসে থাকি মায়ের মুখোমুখি একটা চেয়ারে। কখনও কখনও রুমের অন্য বেডে। আমার সঙ্গে বসে থাকে আমার কোনও কোনও বোন, বোন জামাই। মুমূর্ষু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আমার তখন শুধু মনে হতো, মাকে কি আর বাড়ি ফিরিয়ে নিতে পারব!
সেবার তাকে হাসপাতালে আনার কারণ ছিল, হঠাৎ করে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছিল। কিছুতেই কিছু খাওয়ানো যাচ্ছিল না।
হাসপাতালে এনে টিউব দিয়ে খাওয়াতে হলো অনেকদিন। তারপর একটু স্বাভাবিক হওয়ার পর বাড়ি ফিরিয়ে নিলাম। এখন কিছুটা স্বাভাবিক সে। মুখ দিয়ে খেতে পারছে। অবিরাম কথা বলাটা একেবারেই কমে গেছে। আর কোনও ফাঁকে যেন কমেছে তার শরীর। মাঝে বেশ মোটা হয়েছিল। এখন আবার কী রকম যেন রোগা।
এক জীবনে কত যে বদলালো আমার মা।
হাসপাতালে মুমূর্ষু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে যখন বসে থাকতাম, ফেলে আসা দিনের কত যে স্মৃতি আমার মনে পড়তো!
একবার খুব ছেলেবেলায়, নানাবাড়িতে কী যেন কী কারণে মাকে শক্ত মাটির ছোট্ট একটা টুকরো ছুড়ে মেরেছিলাম। আমার আনমনা মায়ের কপাল বরাবরের গিয়ে লেগেছিল সেই টুকরো। মা ‘উহ্’ করে শব্দ করেছিল। সেই করুণ শব্দ এখনও আমার বুকে লেগে আছে। ভয়ে আমি তারপর শেষ দুপুর পর্যন্ত বাড়ি ফিরিনি। মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়িয়েছি। খিদে সহ্য করতে না পেরে যখন বাড়ি ফিরেছি, দেখি আমার মা মাত্র নামাজ পড়া শেষ করেছে। আমাকে দেখে হাসিমুখে ডাকল। কাছে যেতেই দুহাতে বুকে জড়িয়ে ধরে গভীর মায়াবী গলায় বলল, আমি তো জানিই তুই ইচ্ছে করে মারিসনি। হয়তো অন্য কোনওদিকে ছুঁড়েছিলি আমার কপালে এসে লেগেছে। চল ভাত খেতে চল।
আমি তখন মায়ের বুকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলাম।
কিন্তু এর মধ্যে যে রাতে মাকে স্বপ্ন দেখে কাঁদলাম, পরদিন ঘুম ভাঙার পর ভাবলাম আজ সকালেই গেণ্ডারিয়ায় গিয়ে মাকে একটু দেখে আসব। তৈরি হচ্ছি, গেণ্ডারিয়ার বাড়ি থেকে ডলির ফোন এলো। গত রাতে প্রায় সারারাত ধরেই নাকি মা আমার কথা বলেছে। মাকে ফোন দিল ডলি। জড়ানো অসংলগ্ন কণ্ঠে মা বলল, বাবা, তুমি কোথায়? আসো, আমার কাছে আসো।
আমি ছুটে গেছি মায়ের কাছে। তার কোলের কাছে গিয়ে বসেছি। মাথায় হাত দিয়েছি। অতিকষ্টে মা তার শীর্ণ একটা হাত তুলে আমার গলা জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো হুহু করে কাঁদতে লাগল। কী যে আকুল করা কান্না। কাঁদতে কাঁদতে বারবার জানতে চাইল আমি খেয়েছি কি না। আর ডলিকে ডাকতে লাগল। বলতে লাগল, ওকে খেতে দে। খেতে দে। অন্তত আট দশবার বলল।
তারপর বলল, আমি তো অনেকদিন তোমাকে রান্না করে খাওয়াতে পারি না বাবা। তুমি পেট ভরে খাও তো?
মাঝখানে আমেরিকায় গিয়েছিলাম আমি। ডালাস ফ্লোরিডা হয়ে লস এঞ্জেলসে আমার ছোটবোন আসমার ওখান হয়ে ফিরেছি। ফেরার পর মা কিন্তু একবারও আসমার কথা জিজ্ঞেস করল না। অথচ আসমা হচ্ছে আমার মায়ের জান।
কিন্তু আসমার কথা মা জিজ্ঞেস করল না কেন?
আসমার কথা কি মা ভুলে গেছে?
কদিন আগে মাকে দেখতে গেছি, হঠাৎ করে আমাকে বলে, বাবা, তুমি নাকি আমেরিকায় গিয়েছিলে? আমার আসমা কেমন আছে?
নিশ্চয় হঠাৎ করে তার আসমার কথা মনে পড়েছে।
সেদিন অনেকক্ষণ মায়ের পাশে বসেছিলাম আমি। কত কথা যে আমার মনে পড়ছিল। আব্বার মৃত্যুর পরদিনকার সকালবেলার কথা। তার পরবর্তী দিনগুলোর কথা। হায় কী অসহায় দিন সেইসব! কী দুঃখ-বেদনার দিন।
বিকেলবেলা মাওলা ভাই এসে বললেন, টাউনের অবস্থা খুব খারাপ। আর থাকা ঠিক হবে না।
শুনে আমাদের মুখ শুকিয়ে গেল।
সাবেক শরাফতগঞ্জ লেনের সেই বাড়িতে আমরা দশটি ভাইবোন আর মা। আব্বা মারা যাওয়ার পর আমাদের দুঃখী সংসার আরও দুঃখী হয়ে গেছে। আব্বা ছিলেন সংসারের একমাত্র ভরসা। আব্বাকে নিয়ে ষোলজন মানুষের সংসার ছিল। তাঁর মৃত্যুতে একজন মানুষ কমেছে কিন্তু সংসারের সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমাদের চোখমুখে পাকিস্তান আর্মির ভয় আতঙ্কের চেয়ে বেশি আতঙ্ক তিনবেলার খাবার নিয়ে, বাড়িভাড়া এবং এতগুলো ভাইবোনের পড়াশোনা নিয়ে। কীভাবে বাঁচবো আমরা?
মায়ের মুখে সারাক্ষণ লেগে আছে দুঃখের ছায়া। ছোট ভাইবোনগুলো স্তব্ধ হয়ে গেছে। কারও মুখে কথা নেই, হাসি নেই। দেশজুড়ে আতঙ্ক, আমাদের বয়সী ছেলে দেখলেই তাদেরকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে মিলিটারি কিংবা রাজাকারেরা। এই অবস্থায় আজাদ আর আমি সংসার বাঁচাবার জন্য, তিনবেলার খাবার জোটাবার জন্য এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমাদের আত্মীয়-স্বজনেরা প্রায় সবাই ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে। পাশে দাঁড়াবার মতো একজন মানুষ নেই। কী যে অসহায় দিন!
আব্বা ছিলেন মিউনিসিপালিটির শুরুর দিককার কর্মচারী। তাঁর আচমকা মৃত্যুতে মোটামুটি একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল লক্ষ্মীবাজারের অফিসটায়। আমাদের কে সাহায্য করার জন্য কর্মচারী কর্মকর্তারা চাঁদা তুলেছিলেন। আব্বার মৃত্যুর কিছুদিন পর ঈদ ছিল। সেই ঈদের দুতিনদিন আগে আব্বার সহকর্মীরা কয়েকজন এসে মায়ের হাতে বারোশো টাকা আর চারটা সুতিশাড়ি দিয়ে গিয়েছিল। ছোট ভাইবোনদেরকে ঈদের জামাকাপড় দিয়েছিলেন আমাদের বাড়িওয়ালা।
কিন্তু মিউনিসিপালিটি এতবড় প্রতিষ্ঠান, এত কর্মচারী, আর টাকা উঠেছে মাত্র বারোশো?
পরে জেনেছিলাম, না, টাকা অনেক বেশি উঠেছিল। আমাদের হাতে পৌঁছেছে মাত্র বারোশো নগদ আর আট নশো টাকার শাড়ি। বাকিটা যাঁরা তুলেছিলেন তাদের নেতৃত্বস্থানীয়রা ভাগ-বাটোয়ারা করে খেয়েছেন।
আমাদের সামনে তখন দুটোমাত্র স্বপ্ন, কবে আব্বার প্রভিডেন্ট ফান্ড আর গ্র্যাচুয়িটির টাকা পাবো আর কবে দেশ স্বাধীন হবে। দেশ স্বাধীন হলে কোনও না কোনও ব্যবস্থা হবেই। আজাদের টিচির চাকরিটা তো আছেই। সকালবেলা অফিসে চলে যাবে, বিকেলবেলা চাকরি শেষ করে টঙ্গি থেকে বাসে করে চলে আসবে সদরঘাট, সেখান থেকে কাছেই জগন্নাথ কলেজ, আই কম-এর ক্লাস করে বাড়ি ফিরবে। আমি আবার টিউশনি নেব। ফাঁকে ফাঁকে এস এস সির প্রিপারেশন। রেজাল্ট বের হবার পর মিউনিসিপালিটিতে আমার চাকরি হবে। আব্বার সহকর্মীরা কথা দিয়েছেন এস এস সীর রেজাল্ট বের হবার সঙ্গে সঙ্গে মিউনিসিপালিটিতে রোড ইনস্পেক্টরের চাকরি হয়ে যাবে আমার। কাজটা কন্ট্রাক্টদের সঙ্গে। রোড কনস্ট্রাকশনের কাজের তদারকি। এই কাজের ভালোরকমের ঘুষ পাওয়া যায়। আমার রোড ইনস্পেক্টরের চাকরি হওয়া মানে সংসারের চেহারা ঘুরে যাওয়া।
সেইসব দুঃখের দিনে এই স্বপ্নে বিভোর হয়ে ছিলাম আমি। দিনভর রোড ইনস্পেক্টরের চাকরি করব আর নাইট কলেজে পড়ব। আমি ছিলাম সায়েন্সের ছাত্র। গেণ্ডারিয়া হাইস্কুলে ভালো ছাত্র হিসেবে নামডাক ছিল আমার। ফার্স্ট সেকেন্ড হতাম। এই কারণে স্কুলে বেতন দিতে হতো না। ফুল ফ্রি পেতাম প্রায় প্রত্যেক বছর। এজন্য গেণ্ডারিয়া এলাকায় টিউশনি পেতে অসুবিধা হতো না। স্বপ্ন ছিল ইন্টারমিডিয়েটের পর বুয়েটে ভর্তি হব। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ব। কিন্তু আব্বার মৃত্যুতে সেই স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। রোড ইনস্পেক্টরের চাকরিতে ঢুকলে নাইট শিফটে পড়তে হবে। নাইট শিফটে সায়েন্স পড়ার ব্যবস্থা নেই।
তবু নিজের স্বপ্নভঙ্গের জন্য আমি তেমন কষ্ট তখন পেতাম না। সংসারের চেহারা বদলাবে, স্বচ্ছলতা আসবে, মায়ের বিষণ্ণ মুখ কিছুটা আলোকিত হবে, ছোট ভাইবোনগুলোর পড়াশোনা, বড়বোনের বিয়ে আস্তে আস্তে সুখের দিন আসবে।
দেশ তখন ক্রমশ এগুচ্ছিল স্বাধীনতার দিকে। চারদিক দিয়ে রাজধানীর দিকে এগুচ্ছে মুক্তিযোদ্ধারা। কয়েকজন হলো ভারত সরাসরি যুদ্ধ শুরু করেছে। ঢাকার আকাশে ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের ফাইটার বিমান ককফাইট করছে। তেজগাঁ এয়ারপোর্টে নাপাম বোমা ফেলেছে ইন্ডিয়া। এয়ারপোর্টে আগুন ধরে গিয়েছিল। এই অবস্থায় আমরা জবুথবু হয়ে বসে আছি সাবেক শরাফতগঞ্জ লেনের সেই বাড়ির বড় ঘরটায়। ঘরে একবেলার খাবার আছে তো অন্যবেলার নেই। মিউনিসিপ্যালিটি থেকে সেই যে চাঁদার বারোশো টাকা দিয়ে গিয়েছিল সেই টাকার দু চারশো হয়তো তখনও আছে মায়ের কাছে। একটি দুটি করে টাকা বের করে মা। বারেকের মা গিয়ে বাজার করে আনে। সপ্তাহে একদিন আলাউদ্দিনের রেশনশপে গিয়ে পোকায় খাওয়া মোটা মোটা চাল-গম নিয়ে আসি আমি। গম ভাঙিয়ে আটা করে আনি ধোপাবাড়ির গলির কল থেকে। তারপরও দিন কাটে না, রাত কাটে না! কবে দেশ স্বাধীন হবে, কবে শেষ হবে আমারদের দুর্ভোগ। কোর্ট থেকে সাকসেসন সার্টিফিকেট বের হলেই মিউনিসিপ্যালিটি থেকে পাওয়া যাবে আব্বার প্রভিডেন্ট ফান্ড আর গ্র্যাচুয়েটির কিছু থোক টাকা। তারপর আমার রোড ইন্সপেক্টরের চাকরি। দিন ঘুরে যাবে।
কিন্তু কবে, কবে আসবে সেইদিন।
গোপনে গোপনে স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র শুনি। স্বাধীনতা আসছে। আশার আলো দেখতে পাই।
আমাদের ভাঙাচোরা, ব্যাটারির জোর কমে যাওয়া রেডিওতে স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র শুনতে হতো গোপনে। আমাদের বাড়িওয়ালা ছিলেন পাকিস্তানের পক্ষের লোক। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা এসব শব্দ তিনি শুনতে পারতেন না। শুনলে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠতেন। একে তাঁর বাড়ির ভাড়াটে আমরা, আব্বার মৃত্যুর পর থেকে ভাড়া নিচ্ছেন না, ঈদে আমাদেরকে জামাকাপড় দিয়েছেন, সুতরাং তাঁর মত মতো চলাই ভালো। তিনি রেগে যেতে পারেন কিংবা বিরক্ত হতে পারেন এমন কাজ কেন করব? রেগে গিয়ে যদি বাড়ি থেকে তুলে দেন, আমরা তাহলে যাব কোথায়? টাকা নেই, পয়সা নেই, কে আমাদেরকে বাড়িভাড়া দেবে?
তবে তিনি থাকতেন দোতলায়, আমরা নিচতলার পূর্বদিককার অংশ। তবু সাবধানে স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র শুনতাম, স্বাধীনতার আশায় বুক বাঁধতাম।
এই অবস্থায় একদিন বিকেলবেলা মাওলা ভাই এলেন আমাদের বাসায়। শুকনো ভয়ার্ত মুখে বললেন, টাউনের অবস্থা খুব খারাপ। আর থাকা ঠিক হবে না।
মাওলা ভাই আমাদের কোনো আত্মীয় নন। বছরদুয়েক আগে আমরা ছিলাম রজনী চৌধুরী রোডে, নবনুর ভাইদের বাড়ির, মাঝখানে পার্টিশন দেওয়া দু কামড়ার টিনের ঘরে। সামনে অনেকখানি খোলা উঠোন, তারপর গেট। নবনুর ভাইদের সংসারে তিনভাই দুজন। একবোন থাকতেন মফচ্ছলে। বাবা ছিলেন না, মা ছিলেন। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন।
এই বাড়ির সামনে হামিদ ভাইদের বাড়ি আর দক্ষিণে আমার সঙ্গে গেন্ডারিয়া স্কুলে পড়ত আমিনুল, আমিনুলদের বাড়ি। লতায় পাতায় মাওলা ভাই বোধহয় আমিনুলদের কিংবা ওই বাড়ির কোনো ভাড়াটের আত্মীয়। প্রায়ই ওই বাড়িতে আসতেন। কেমন কেমন করে যেন আমাদের সঙ্গে তাঁর একটা পরিচয় হলো। আমাদের বাসায়ও আসা যাওয়া শুরু করলেন। বাবার সঙ্গে বেশ একটা খাতির হয়ে গেল।
মাওলা ভাই ফরিদপুরের মানুষ। বি এ পাশ করে জীবনবীমা কর্পোরেশনের একাউন্টস ডিপার্টমেন্টে চাকরি করছেন। মা বাবার একমাত্র ছেলে। বাবা কোরানে হাফেজ, গ্রামের মসজিদে ইমামতি করেন। মাওলা ভাই চাকরির খাতিরে জীবনবাজি রেখে তখনও রয়ে গেছেন ঢাকায়। বিজয়নগরের এক মেসে থাকেন। পঁচিশে মার্চের দুদিন পর দুপুরবেলা আমাদের বাসায় এসে ‘এত লাশ! এত লাশ!’ বলতে বলতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও চাকরির মায়ায় শহর ছাড়েননি। ছুটিছাটার দিনে প্রায়ই আমাদের বাসায় আসতেন। মাকে ডাকতেন আম্মা। ছোটখাট গড়নের প্রাণবন্ত যুবক। অত্যন্ত আন্তরিক ধরনের। আমরা সবাই তাঁকে খুবই পছন্দ করতাম।
সেই বিকেলে মাওলা ভাইয়ের সঙ্গে একটা রেক্সিনের ব্যাগ। শুকনো ভয়ার্ত মুখে তিনি যখন কথা বলছিলেন আমরা সবাই তাঁর চারপাশে ঘিরে ছিলাম। পুরনো ঢাকার অনেক জায়গায়, মোহাম্মদপুর, মিরপুরে পাকিস্তান আর্মির চেয়েও নাকি বেশি অত্যাচার চালাচ্ছে বিহারিরা। নির্বিচারে হত্যা করছে মানুষজন, লুটপাট আর নারীদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে ব্যাপকভাবে।
শুনে মা কেমন দিশেহারা হয়ে গেল। মার মতো দিশেহারা হলো আমার বড়বোন মণি আর আমার ছোট পলি। মুখ শুকিয়ে রক্তশূন্য হয়ে গেল তাদের। এতগুলো মানুষ জড়াজড়ি করে আছে একটি মাত্র ঘরে তবু সেই ঘরে কোনো শব্দ নেই, যেন মৃত্যুর স্তব্ধতা নেমে এসেছে ঘরে। সবগুলো মানুষ যেন একসাথে মরে গেছি আমরা।
একসময় মা কোনও রকমে বললো, তুমি এখন কী করবে?
মাওলা ভাই বললেন, আজকের রাতটা আপনাদের এখানে থাকব। ভোরবেলা, আজানের সঙ্গে সঙ্গে উঠে ফরাশগঞ্জের ওদিক দিয়ে গেন্ডারিয়া পার হব। বুড়িগঙ্গার ওপার গিয়ে দক্ষিণে হাঁটা ধরব। যে কদিন লাগে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের বাড়িতে চলে যাব। শহর থেকে যাওয়া মানুষদেরকে খুবই হেল্প করছে গ্রামের লোকেরা। রাস্তায় রাস্তায় মুড়িছিড়া গুড়পানি খাওয়াচ্ছে। খিচুড়ি খাওয়াচ্ছে। রাতের আশ্রয়ও দিচ্ছে। কোনও অসুবিধা নেই।
মাওলা ভাইয়ের কথা শুনে খানিক চুপচাপ কী ভাবল মা। তারপর বলল, তুমি একটা কাজ করবে বাবা?
কী কাজ?
মণি মিলন আর পলিকে নিয়ে যাবে তোমার সঙ্গে?
কোথায় নিয়ে যাব? আমাদের বাড়িতে?
না। তুমি তো বিক্রমপুরের ওপর দিয়েই যাবে। ওদেরকে পয়সা গ্রামে পৌঁছে দিয়ে যেও। পয়সার বাড়িতে ওদের দুই চাচা আছে, হাপি আর ফজল, আমার শাশুড়ি আছেন। ওই বাড়িতে পৌঁছে দিলে সেখানে ওরা ভালো থাকবে। মেয়েদের নিয়ে আমারও দুশ্চিন্তা কমে।
শুনে মাওলা ভাই খানিক চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে।
মণি পলি আর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তাহলে কাপড়চোপড় যা যা খুব জরুরি শুধু সেসব গুছিয়ে ফেলো। ছোট এবং হালকা ধরনের ব্যাগ না হলে কিন্তু হাঁটতে পারবে না। বাইশ-তেইশ মাইল পথ হাঁটতে হবে।
ঢাকায় তখন ব্ল্যাক আউট চলছে। সন্ধ্যার পর অন্ধকারে তলিয়ে যায় শহর। কোথাও কোনও শব্দ নেই, আলো নেই। পুরো নমাস গেন্ডারিয়া ছিল মোটামুটি নিরাপদ এলাকা। বড় ধরনের কোনও ঘটনা গেন্ডারিয়াতে ঘটেনি। শুধু সাধনা ঔষধালয়ের প্রাণপুরুষ অধ্যাপক যোগেশচন্দ্র ঘোষকে মিলিটারিরা এক দুপুরে এসে গুলি করে মেরেছিল।
আমরা যে-বাড়িতে আছি এই বাড়িতে ভয়ের কিছু নেই। তবু মা কেন আমাদের তিনজনকে মাওলা ভাইয়ের সঙ্গে চলে যেতে বলছে? সারারাত কথাটা ভেবেছি আমি। তারপর উত্তর পেয়ে গেছি একসময়। এই ধরনের অভাবী সংসার থেকে তিনটি মুখ যদি কিছুদিন অন্যকোথাও গিয়ে থাকে তাহলে তিনটি মুখের আহার অন্তত কমলো। এও তো সংগ্রামেরই একটা পন্থা! আমার মা সেই পন্থাটাই ধরেছিল।
সেইরাতে হারিকেনম্লান আলোয় মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুকটা তোলপাড় করছিল আমার। চোখে পানি আসছিল। ইচ্ছা করছিল দুহাতে মাকে জড়িয়ে ধরে, মায়ের বুকে মুখ রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলি, মা, মাগো, তোমার জীবনটা এমন হলো কেন মা? আমাদের জীবন এমন হলো কেন? [চলবে]