বঙ্গসন্তানের প্রথম বিলাতভ্রমণ

The Wonders of Vilayet
Mirya Sheikh I`tesamudin

Translated by
Kaiser Haq
Peepal Tree
Leeds, 2001
Price : £ 10.99

সপ্তদশ শতাব্দীর ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্তে, যাঁকে আধুনিক দর্শনের জনক বলা হয়, বলেছিলেন, ‘Travelling is almost like talking with men of other centuries।’ ভিন্ন শতকের একজন ভ্রমণকারী যিনি তাঁর ভ্রমণ-বৃত্তান্তের মধ্য দিয়ে এ-যুগের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁর সম্বন্ধে ওঁর কী মন্তব্য জানতে পারলে ভালো হতো।

সাধারণত ধারণা করা হয় যে, সর্বপ্রথম সমুদ্রপথে যে-বাঙালি বিলাতযাত্রী হয়েছিলেন তিনি রাজা রামমোহন রায়। কিন্তু মির্জা শেখ ই’তেশামউদ্দীন নামে আর-এক বঙ্গসন্তান যে রাজা রামমোহনের প্রায় অর্ধশত বছর আগে সেই দুঃসাহসিক কর্মটি করেছিলেন তা জানা আছে খুব কম লোকেরই। এই বঙ্গসন্তান যে শুধু সমুদ্রযাত্রাই করেছিলেন তা নয় (তখন চট্টগ্রাম-নোয়াখালি অঞ্চলের কিছু কিছু লোক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজে ‘লস্কর’ হিসেবে সমুদ্র পাড়ি দিতে শুরু করেছিল), সেই যাত্রার এবং তার গন্তব্যস্থলের বিবরণও তিনি লিখে রেখে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক কায়সার হক-কৃত শেখ ই’তেশামউদ্দীনের শিগুর্ফনামা-এ-বিলায়েত নামে বইটির ইংরেজি অনুবাদ দি ওয়ন্ডার্স অফ বিলায়েত পড়লে সে-কথা জানতে পারবেন পাঠকরা। শুধু তাই নয়, দেকার্তের কথা যেমন সত্য, ঠিক একথাও তেমনি সত্য যে, সপ্তদশ শতাব্দীর এই ফারসি বইটির মধ্য দিয়ে সেই বঙ্গসন্তান যেন আজকের এই ভিন্ন শতকের পাঠকদের সঙ্গে কথা বলছেন। সেই কথোপকথন সম্ভব করেছেন কায়সার হক সেই ফারসি বইটির একটি সুন্দর ও সাবলীল ইংরেজি অনুবাদ করে।

বইটির পশ্চাদপটের অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন অনুবাদক তাঁর মুখবন্ধে। তাঁর এক স্কুলের বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন যে, বন্ধুটির এক পূর্বপুরুষ হচ্ছেন প্রথম ভারতীয় বিলাতযাত্রীদের অন্যতম । পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাসের অধ্যাপক আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ-কৃত ফারসি বিলায়েতনামার একটি বাংলা অনুবাদ পড়ে তিনি জানতে পারেন যে ই’তেশামউদ্দীনের আসল লেখাটি কোনোদিনই ছাপা হয়নি, তিনি (অধ্যাপক হবিবুল্লাহ) বইটি অনুবাদ করেছেন ই’তেশামউদ্দীনের রচনার দুটি পাণ্ডুলিপি থেকে। এই পাণ্ডুলিপির একটি তিনি (অধ্যাপক হবিবুল্লাহ) দেখেছেন লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়মে এবং একটি বিহারের বাঁকিপুর শহরের বিখ্যাত খোদাবখ্শ পাঠাগারে। কায়সার হক আরো জানতে পারেন যে, জেমস্ এডওয়ার্ড আলেকজান্ডার নামে এক ইংরেজ, ১৮২৭ সালে, এই ফারসি ভ্রমণকাহিনীর পাণ্ডুলিপির একটি ‘সংক্ষিপ্ত ও ত্রুটিপূর্ণ’ ইংরেজি অনুবাদ ছাপিয়েছিলেন। অধ্যাপক কায়সার হক ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকায় পড়াশোনা করার সময়ে আলেকজান্ডার-কৃত এই ‘সংক্ষিপ্ত ও ত্রুটিপূর্ণ’ ইংরেজি বইটির এক খণ্ড দেখেন এবং এটির একটি সহজবোধ্য অনুবাদ, যেখানে ফারসির স্টাইলটি উপযুক্ত ইংরেজিতে ধরা থাকবে, করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

মির্জা শেখ ই’তেশামউদ্দীন জন্মেছিলেন অষ্টাদশ শতকের ত্রিশের দশকে নদিয়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। মির্জা পরিবারের দাবি, তাঁরা হজরত মোহাম্মদের (দ:) বংশধর। তবে তাঁদের বংশলতিকা থেকে এটুকু জানা যায় যে, তাঁরা পারস্যদেশে মোঙ্গলদের আক্রমণ থেকে পালানোর চেষ্টায় একসময়ে ভারতে এসে বাংলায় পৌঁছেছিলেন। পরিবারটি সে-সময়ে বিদ্যা ও জ্ঞানচর্চায় অগ্রসর ছিল। বংশপরম্পরায় সেই বিদ্যাচর্চার পথ ধরেই পলাশির যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পতনের পরবর্তী এক সময়ে ই’তেশামউদ্দীন এ-অঞ্চলের তৎকালীন সেনাবাহিনীপ্রধান কর্নেল কারনাকের মুনশি হিসেবে কাজ পান। সে-সময়ের রাষ্ট্রপরিচালনা, শাসনকার্য এবং কূটনীতির ভাষা ছিল ফারসি। তাই ফারসি এবং স্থানীয় দুই ভাষার উপরেই যাঁরা দখল রাখতেন তাঁরা ইংরেজদের অধীনে মুনশির কাজ পেতেন। ইংরেজ এবং স্থানীয়দের মধ্যে দোভাষীর কাজ করতে গিয়ে এঁরা কিছু কিছু ইংরেজি শব্দও আয়ত্ত করে ফেলতেন। অতএব, ইংরেজ এবং স্থানীয়দের মধ্যে যোগাযোগের সূত্র হিসেবে এঁরা যথেষ্ট সম্মান এবং অর্থসম্পদের অধিকারী ছিলেন। সকলেরই জানা আছে যে, এই সময়ে, ১৭৬৫ সালে, দিল্লির মোগল বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি লর্ড ক্লাইভকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা প্রদেশত্রয়ের সনদ দান করে এই অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেন।

সেটি ছিল ভারতের ইতিহাসের এক ক্রান্তিকাল। মোগল আমলের সূর্যাস্ত ও ব্রিটিশ শাসনের সূর্যোদয়ের মধ্যবর্তী একটি সময়। মোগল বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলম চারদিক থেকে নানা শত্রুদ্বারা আক্রান্ত হয়ে লর্ড ক্লাইভের কাছে তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানান। তাঁর এই অনুরোধ ক্লাইভ গ্রহণ করেন। তবে, যেহেতু ব্রিটিশ সেনা মোতায়েনের বিষয়টিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারেন কেবলমাত্র ব্রিটিশ সম্রাট নিজে, কাজেই ঠিক হয় তদানীন্তন ব্রিটিশ সম্রাট তৃতীয় জর্জের কাছে একটি আবেদনপত্র লিখে তাঁর অনুমতিপ্রার্থনার জন্য একজন ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তাকে লন্ডনে পাঠানো হবে। আরো ঠিক হয় যে, একজন এদেশীয় মুনশি যিনি যথাযথভাবে মহামান্য সম্রাটের দরবারে ভারতীয় বাদশার আবেদনটি ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হবেন, তিনিও যাবেন ওই চিঠির সঙ্গে, ব্রিটিশ অফিসারকে সহায়তা করার জন্য। মোগল বাদশা তাঁর আবেদনের সঙ্গে একলক্ষ টাকার একটি নজরানা পাঠানোরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। চুক্তি-অনুযায়ী ওই চিঠি এবং টাকা নিয়ে যাওয়ার জন্যে তৈরি হন ক্যাপ্টেন সুইনটন এবং মুনশি মির্জা শেখ ই’তেশামউদ্দীন। যাত্রাপ্রস্তুতির প্রায় শেষ পর্বে মির্জা জানতে পারেন যে, তাঁরা বিলাতে যাবেন অগ্রবর্তী দল হিসেবে মাত্র। বাদশার আবেদনপত্র এবং তাঁর দেওয়া এক লাখ টাকা নিয়ে লর্ড ক্লাইভ যাবেন পরবর্তীকালে। তখন সকল প্রস্তুতিপর্ব সমাপ্ত। কাজেই বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়া সত্ত্বেও বিলাতের পথে রওনা দেওয়া ছাড়া মির্জার আর কিছুই করার ছিল না। বলাবাহুল্য, চতুর ক্লাইভের চক্রান্তে সেই পত্র ব্রিটিশ সম্রাটের কাছে কোনোদিনই পৌঁছায়নি। আর টাকাটিও পরে ক্লাইভ তাঁর ব্যক্তিগত উপঢৌকন হিসেবে সম্রাটকে দেন। এখানে বলে রাখি, ক্লাইভের চরিত্রের

এ-দিকটি পরবর্তী সময়ে ব্রিটেনের আর কারো জানতে বাকি ছিল না। সম্ভবত তাই, গত শতাব্দীতে এক ব্রিটিশ ছড়াকার ক্লাইভ সম্বন্ধে লিখেছিলেন, ‘What I like about Clive/ Is that he is no longer alive./ There is a great deal to be said/ For being dead.’ যাহোক, সে অন্য প্রসঙ্গ।

১৭৬৬ সালের জানুয়ারির একদিন কলকাতার কাছে হিজলি বন্দর থেকে শুরু হয় সে-যাত্রা। চারদিন হুগলি নদীতে চলে অবশেষে বঙ্গোপসাগরে পড়ে তাঁদের জাহাজ। পালতোলা এই জাহাজের নাম কী ছিল তার উল্লেখ না থাকলেও মির্জা সাহেব লিখেছেন সেটি ছিল মসিয়েঁ কোরভিলের জাহাজ। সম্ভবত জাহাজটির ক্যাপ্টেন ছিলেন ওই মসিয়েঁ। খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে হারাম-হালাল মানা এই মুসলমান বঙ্গসন্তান, মনে হয়, জাহাজে চড়ার পর থেকেই, ইয়োরোপীয়দের নৌবিদ্যার জ্ঞান ও নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।

প্রতিটি বিষয়েই মির্জার অনুসন্ধিৎসা যে কত গভীর ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় এই সমুদ্রযাত্রার বর্ণনায়। যাত্রার বর্ণনার প্রথমেই তিনি লিখছেন সমুদ্রের বিরাটত্ব ও গভীরতার বিষয়ে। কে, কবে, কোথায় সমুদ্রের গভীরতা কীভাবে মেপেছিলেন সেসব বিষয়ে তৎকালীন চিন্তাভাবনার বিষয়টি পাওয়া যাচ্ছে তাঁর বর্ণনায়। ওই বিশাল দিগন্তবিস্তারী সমুদ্রে নির্দিষ্ট পথ চিনে গন্তব্যস্থলে যাওয়ার উপায় কী, কম্পাস কী করে তৈরি হয়, কীভাবে কম্পাস দেখে নৌচালনা করা হয়, এসব বিষয়ের কথা আছে তাঁর বর্ণনায়। মুগ্ধ হয়ে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন টুপি-পরা ফিরিঙ্গিদের চরিত্রের নানা বিষয়, তাদের সময়ানুবর্তিতা (Firinghees regard even an hour’s delay as if it meant the loss of a month), তাদের কারিগরি দক্ষতা এবং সেই দক্ষতাকে সহজীকরণের মাধ্যমে সকলের মধ্যে বিস্তার করার প্রবণতা (The nwe skills and knowledge they acquire are simplified and

systematised, so that they may be easily taught to the novices)। এসব বর্ণনায় মির্জার রসবোধের পরিচয়ও রয়েছে। নাবিকদের চটপট করে জাহাজের মাস্তুলে উঠে পাল তোলার কথায় লিখেছেন, ‘During a storm, if the sails need to be rearranged or taken down, they will climb to the top and top-gallant masts with the agility of Hanuman and hang from there like bats.’ বলাবাহুল্য, মানবচরিত্রের স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী তিনি ইয়োরোপীয়দের চরিত্রের এসব গুণাবলি লক্ষ করেছেন এবং মনে মনে তুলনা করেছেন তৎকালীন ভারতীয়দের চরিত্রের সঙ্গে।

ছয় মাসের এই সমুদ্রযাত্রায় তাঁর পর্যবেক্ষক-দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে অনেক কিছুই। সমুদ্রগামী জাহাজের রকমারি, সেগুলির আকার ও গঠনবৈচিত্র্য, সমুদ্রের বিভিন্ন জীবজন্তু, হাঙর, তিমি, উড়ন্ত মাছ, সমুদ্র-গরু (সম্ভবত শুশুক জাতীয় কোনো প্রাণী), এমনকী, কল্পকথার মারমেড, কোনো কিছুই তাঁর কৌতূহলী জিজ্ঞাসা থেকে বাদ পড়েনি। জাহাজ যেসব দেশের কাছ দিয়ে গেছে, যেসব বন্দরে জাহাজ নোঙর করেছে (মরিশাস, মালদ্বীপ, মাদাগাস্কার, উত্তমাশা অন্তরীপ, হাব্শিদের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা ইত্যাদি) এবং রসদ গ্রহণ করেছে। সেইসব দেশের ভূগোল, ইতিহাস এমনকী শাসনব্যবস্থা সম্পর্কেও জানবার চেষ্টা করেছেন তিনি এবং যেটুকু জেনেছেন তা লিখে রেখেছেন তাঁর ভ্রমণের ইতিকথায়।

অবশেষে একদিন ফ্রান্সের উপকূলবর্তী নান্তেস বন্দরে নোঙর করেছে জাহাজ। ছয় মাস ধরে শুধু সমুদ্র দেখার পর ডাঙায় নামতে পেরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন মির্জা এবং জাহাজের যাত্রী-নাবিকরা সবাই। চোদ্দদিন সহযাত্রী ক্যাপ্টেন সুইনটন, মিস্টার পিকক এঁদের সঙ্গে এই ফরাসি বন্দরে কাটানোর অভিজ্ঞতার বর্ণনা রয়েছে এই বইতে। বন্দর-শহরের গরিব ফরাসিদের দেখে হাসাহাসি করেছে ইংরেজ যাত্রীরা। মির্জাও, মনে হয়, কিছুটা তৎকালীন ইংরেজের দৃষ্টিতেই দেখেছেন এই ফিরিঙ্গিদের। ফরাসি এবং ইংরেজদের চিরাচরিত রেষারেষি বুঝতে পেরেছেন এবং মনে মনে ইংরেজদের প্রতি পক্ষপাতী হয়ে গেছেন। ‘I realised clearly that the French are a conceited race, whose conversation was always an attempt to display their own superiority and to unfailrly belittle other nations.’ যাই হোক, নান্তেস বন্দর থেকে এক মাস্তুলের জাহাজে (sloop) চেপে ক্যালে বন্দরে পৌঁছেছেন মির্জা। সেখান থেকে আরেক জাহাজে (packet boatsss) চেপে চ্যানেল পার হয়ে ডোভার বন্দরে পৌঁছেছেন অবশেষে। সেখানে শুল্ক বিভাগের কড়াকড়ির জন্য আরো চোদ্দদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে তাঁকে। সেই অপেক্ষার অবসরে ডোভারের আশেপাশে ঘুরে বেড়িয়েছেন অনেক সময়। লক্ষ করেছেন এই শহরের খেতখামারি। সেখানে একদিন এক বাড়িতে এক পার্টিতে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য, তাদের সমাজজীবন, তাদের আনন্দ-উৎসব সম্পর্কে জানা। সে-পার্টির ইংরেজ মেয়েদের সৌন্দর্য অভিভূত করেছে মির্জাকে, বিশেষ করে তাদের শ্বেতশুভ্র গাত্রবর্ণে এবং রংবেরঙের পোশাকে চমৎকৃত হয়েছেন তিনি। কিন্তু, উনি সেদেশের লোকজন যে-রকম দেখেছেন, তারাও ওঁকে তেমনি দেখেছে। তাদের অনেকের কাছে জীবনে প্রথম কালো মানুষ দেখার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। এরকম অভিজ্ঞতা তাঁর পরে লন্ডনেও হয়েছে। উনি তাই লিখেছেন, ‘Hwo ironic that I, who had gone there to enjoy a spectacle, became a spectacle myself.’

অবশেষে একদিন লন্ডন শহরে পা রেখেছেন বঙ্গসন্তান মির্জা শেখ ই’তেশামউদ্দীন। কী বলবেন লন্ডন সম্বন্ধে তিনি? এক বাক্যে শেষ করেছেন তিনি, ‘What can I say in praise of London? There is no city on earth as large or beautiful, and it is beyond my powers to describe it fittingly.’ টাওয়ার দেখেছেন তিনি, দেখেছেন সেন্ট পল’স গির্জা, রাজপ্রাসাদ, ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবি। একালের বিখ্যাত গান, ‘ওহ্ টু বি ইন ইংল্যান্ড নাউ দ্যাট ¯িপ্রং ইজ দেয়ার’-এর গায়কের মতো গ্রীষ্মের সৌন্দর্যে ঝলমল লন্ডনের ফুলে ভরা পার্ক আর বাগান, প্রাসাদ এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পথঘাট – যা দেখেছেন তাতেই উচ্ছ্বসিত হয়েছেন। নানা বর্ণের পোশাক পরিহিতা ব্রিটিশ রমণীকুল মুগ্ধ করেছে তাঁকে আরো বেশি। তবে, দিশেহারা হননি কখনো। প্রাসাদগুলির উচ্চতা কত, ভবনগুলির বৈশিষ্ট্য কী, রাস্তাগুলির দৈর্ঘ্য-প্রস্থের হিসাব করেছেন মনে মনে, লিখে রেখে গেছেন তার বৃত্তান্ত। দেশেও তিনি অনেক রাজপ্রাসাদ, অট্টালিকা দেখেছেন। কাজেই প্রতি পদে তুলনা করেছেন সে-দেশের স্থাপত্যকলার সঙ্গে এ-দেশের স্থাপত্যের। শহরবাসীর পানীয় জলের সমস্যা-সমাধানে লন্ডন শহরের দুই কোটি টাকার পানীয় জল সরবরাহের প্রকল্পটি দেখেছেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। পয়ঃনিষ্কাশনের কী ব্যবস্থা তা জেনেছেন এবং লিখে রেখেছেন সে-সম্বন্ধে। পুরো একটি অধ্যায় জুড়ে বর্ণনা করেছেন লন্ডন শহরের লোকজনের বিনোদনের ব্যবস্থা সম্পর্কে। ব্রিটিশ মিউজিয়াম ঘুরেছেন, কতরকমের ফুলফল হয় সে দেশে এবং ভারতীয় ফুলফলের সঙ্গে সেগুলির পার্থক্য কী, সবকিছুই বিবেচনা করেছেন বোদ্ধার দৃষ্টিতে। নাটক, থিয়েটার, অপেরা এবং সার্কাস – যা দেখেছেন সবই ভালো লেগেছে তাঁর (‘Talking is not allowed in the theatre. Though the audience is large, there is no noise or clamour’)। সেদেশের স্কুল-কলেজ, শিক্ষাব্যবস্থা সবকিছু সম্বন্ধে জানতে চেয়েছেন। সময় করে একবার দেখতে গেছেন ‘অক্সফোর্ড মাদ্রাসা’। সেই মাদ্রাসার এক কলেজের অধ্যাপক ড. হান্ট তাঁকে দেখিয়েছেন বিভিন্ন লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত অনেক আরবি, ফারসি এবং সংস্কৃত বই। এই লাইব্রেরি থেকে নিজে হাতে নকল করে নিয়েছেন সপ্তদশ শতকের এক

ফারসি অভিধান ফরহঙ্গ জাহাঙ্গিরির উপসংহারটুকু।

অবশেষে শীতের শুরুতে ক্যাপ্টেন সুইনটন আর তিনি গেছেন স্কটল্যান্ডে। যাওয়ার পথে বরফে ঢাকা রাস্তায় মানুষজনের চলাফেরা, স্কেটিং করা দেখে অবাক হয়েছেন। এডিনবরা শহরে আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন ক্যাপ্টেন সুইনটনের পিতার বাড়িতে। স্কটল্যান্ডের বাসিন্দাদের রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির প্রশংসা করেছেন। ইংল্যান্ডের সঙ্গে সংযুক্তি যে সেখানকার অর্থনীতি এবং সামাজিক অবস্থানকে ক্রমোন্নতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সে-বিষয়ে মির্জার কোনো সন্দেহ নেই। এ-বিষয়ে তাঁর উক্তি আজকের দিনেও অনেক দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তিনি লিখছেন, ‘Friendship between two peoples increase the wealth of both, while enmity begets poverty.’ একেবারে আজকের ব্যবস্থাপনাশাস্ত্রের (ম্যানেজমেন্ট) উইন/ উইন পরিস্থিতির বর্ণনা বলা যায়! ব্যবস্থাপনাশাস্ত্রের কথায় মনে পড়ল, আজকের দিনের রাজনীতি ও অর্থনীতি-সচেতন বাঙালির মতো, মির্জা বিলাতের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছেন। অর্থনীতির চাহিদা আর সরবরাহের টানাপোড়েনের কথা লিখেছেন একজায়গায়, ‘Here is yet another example of the truth that

excellences that abound in a country are

depreciated while

ordinary articles that are rare but of no value in their country of origin are very dear. Thus tamarinds sell for a pice a seer in India, and in Vilayet for one ashrafi or more.’ একেবারে খাঁটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল কথা। আরেক জায়গার ব্রিটিশ রাজনীতিতে রাজা এবং জনপ্রতিনিধি বিশিষ্টজনদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, যখন দেশে বহিঃশত্রু আক্রমণের সংকট দেখা দেয়, যুদ্ধাবস্থা উপস্থিত হয় তখন রাজা দেশের সকল বিশিষ্ট লোককে ডাকেন এক মজলিসে। সেখানে তিনি বিনয়ের সঙ্গে খুলে বলেন দেশের সংকটের কথা। তারপর সকলের সাহায্য চান সংকট-নিরসনে, We are faced with a crisis. If you rise to meet it you will help preserve our sovereignty and add to the nationÕs glory. The assembly rises as one man… and replies, `We owe you full obedience and we are ready for aû sacrifice to defeat the enemy.’ But were the King to order arrogantly, `Go and fight,’ the assembly would curtly reply, `We are not your slaves. Go and fight for yourself.’|’’ একেবারে উঁচুদরের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও মানবসম্পর্ক-বিষয়ক ছাড়া আর কী বলা যায় এই বর্ণনাকে? আজকের যে-কোনো ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক পাঠ্যবইতে উদাহরণ হিসেবে দেওয়া যায় এই বর্ণনা।

বিলাত-প্রবাসের দেড় বছর সবচেয়ে যে-বিষয়টি নিয়ে মির্জাকে কথাবার্তা বলতে হয়েছে, প্রশ্নোত্তরের মুখোমুখি হয়েছে, তা হচ্ছে ধর্ম। দীর্ঘ দুটি অধ্যায় জুড়ে বর্ণনা আছে তার। পরিচিত লোকজন তো বটেই, তার সহযাত্রী, ক্যাপ্টেন সুইনটন, মি. পিককও নানারকমের প্রশ্ন করেছেন তাঁকে ভারতবর্ষের লোকজনের ধর্ম, বিশেষ করে ইসলাম সম্পর্কে। অন্যদিকে উনিও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানার চেষ্টা করেছেন খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে, ব্রিটিশ জাতির ধর্মচর্চা সম্পর্কে। সমগ্র ইয়োরোপে যখন ইহুদিদের উপর অত্যাচার-নিগ্রহ চলছিল তখন ব্রিটেনে ইহুদিদের প্রতি সহনশীলতায় আনন্দিত হয়েছেন তিনি। `… the English pursue a policy of tolerance and do not prevent adherences of aû faith from practicing their religion.’ নামাজ-রোজা-করা ধর্মপ্রাণ এই মানুষটির কাছে উপাসনা-প্রার্থনার প্রতি ব্রিটিশদের অনীহা ভালো লাগেনি তাঁর। এ-বিষয়ে ব্রিটিশদের যুক্তি, Ô… God has sent man to this world to enrich and beautify it. …we try to build better houses, improve agriculture, invent nwe machines, add to knowledge … find better food and shelter for the myriad creatures in our care… we are trully fulfilling our divinely ordained role. If man spends all his time in prayer and grows weak from fasting and chanting on empty stomach, the activities of the world will be neglected …’ মির্জা গ্রহণ করেননি এই যুক্তি। প্রার্থনা করেছেন, ‘Allah save us from such misguided ideas.’ অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে কোরান এবং রসুলের হাদিস নিয়ে, ইসলামে মদ্যপান নিষিদ্ধকরণ নিয়ে। খোঁচা মেরে কথা বলেছে ইংরেজ বন্ধুরা। রসুলের বহুবিবাহের সমালোচনা করেছে তারা। ইসলামকে যুদ্ধবাজ ধর্ম বলেছে। মির্জা বুঝিয়েছেন তাদের কী পরিস্থিতিতে একটির বেশি বিবাহ সমর্থন করা হয়েছে। কোন পরিস্থিতিতে রসুলকে যুদ্ধ করতে হয়েছে। আবার অনেক সময় ওরাই বলেছে, তোমাদের রসুল তাঁর সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ ছিলেন (‘Mohammad, they say, was unsurpassed for knowledge and wisdom in his age’)। আবার ওদের যুুক্তির সঙ্গে একমতও হয়েছেন কখনো কখনো। যেমন ওদের পারিবারিক আইন, বিশেষ করে ওদের উত্তরাধিকার আইন, যা বংশপরম্পরায় জমিজমাকে টুকরো টুকরো করে (fragmentation of landholdings) চাষবাস মুশকিল করে দেয় না, সেটি ওঁর পছন্দ হয়েছে।

বিলাতের বিচারব্যবস্থা, রাজস্ব আদায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গঠন ও প্রকৃতি, ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ইত্যাদি সব প্রতিষ্ঠান বেশ ভালো করে খুঁটিয়ে দেখেছেন মির্জা। অনেকক্ষেত্রে মতামতও দিয়েছেন নিজের। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বিনয়, নম্রতা ও বীরত্ব নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার কথা চিন্তা করে দেখেছেন তিনি। লিখেছেন, ‘The English (soldiers) avoid self-praise and even consider it disgraceful to talk of their xploits’। তুলনামূলকভাবে দিল্লির সিপাহিদের কথা বলেছেন ব্যঙ্গ করে, `… the sepoys and officers in India, particularly in Delhi, think that egotism and flattery add to their consequences. Thus if a person with great difficulty succeeds in killing a fox, he will go about loudly proclaiming that he has killed a lion.’ বিলাতের বিচারকদের নিষ্ঠা ও সততায় মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন, ‘A strict code of conduct is enjoined. Neither bribes nor gifts are

permitted; if one party attempts to bribery, even if its cause is just, the judges will assume otherwise.’ আড়াই শ’ বছর আগের ভ্রমণকারী মির্জা শেখ ই’তেশামউদ্দীন এ-ভাবেই কথা বলেছেন এই শতকের মানুষের সঙ্গে।

অবশেষে ঘরে ফেরার পালা এসেছে এই প্রবাসী বাঙালির। সাহেব বন্ধুরা অনেক বলেছে আরো কিছুদিন থাকতে। সাধাসাধি করেছে, প্রলোভনও দেখিয়েছে। অনেক বিদ্বান লোক তাঁর কাছে ফারসি ভাষা শিখতে চেয়েছে। কিন্তু ঘর তাঁকে ডাক দিয়েছিল, তিনি আর থাকতে রাজি হননি। শেষে একসময়ে ক্যাপ্টেন সুইনটন বুঝতে পেরেছেন তাঁর ঘরে ফেরার তাগিদ। কলকাতাগামী কোম্পানির এক বড়কর্তা, মিস্টার মিশের (Mr Michaund) হাওলা করে তাঁকে তুলে দিয়েছেন ফিরতি যাত্রায় ভারতগামী এক জাহাজে। দীর্ঘ দুবছর নমাস পরে (জাহাজে একবছর, বিলাতে একবছর এবং পথে মাদ্রাজে সাত মাস অনেক ক্ষেত্রে এবং বিভিন্ন বন্দরে দুমাস) ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছেন।

আমাদের সৌভাগ্য তিনি ফিরেছিলেন। এবং দেশে ফিরে বন্ধুবান্ধবের অনুরোধে লিখেছিলেন এই সফরনামা। তাই আমরা আজ সুযোগ পাচ্ছি তাঁকে জানার। তাঁরও সুযোগ হয়েছে আরেক শতাব্দীর মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার। কায়সার হককে ধন্যবাদ, এই সেতুবন্ধনের দক্ষ কারিগরের ভূমিকা পালনের জন্য। এই সুযোগে আবার কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি এই বইয়ের বাংলা অনুবাদক, আমাদের সেই মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন জ্ঞানী ইতিহাসবিদ প্রয়াত অধ্যাপক আবু মহামেদ হবিবুল্লাহকে, যাঁকে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল এই আলোচকের। ধন্যবাদ দিই লন্ডনের পীপল ট্রি প্রকাশনাকে।