মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম উপন্যাস আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত। একাত্তরের ২৫/২৬ মার্চের মধ্যরাতে ঘুমন্ত নগরী ঢাকার রাজপথে নেমে পড়ে পাকিস্তানের সাঁজোয়াবাহিনী, যুদ্ধ নয়, হত্যা ও ধ্বংসের প্রস্তুতি নিয়ে। নিরস্ত্র বেসামরিক নগরবাসীর উপর একই দেশের সশস্ত্র প্রতিরক্ষাবাহিনীর আক্রমণ। নিষ্ঠুরতায় ও অনৈতিকতায় এর জুড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে না ইতিহাসে। প্রতিরক্ষাবাহিনী গঠিত হয় দেশকে
বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য। দেশের জনগণ কখনো সশস্ত্র বাহিনীর বা সরকারের শত্রু হতে পারে না। যে-হিংস্রতায় পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তাদের হত্যা ও ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল ২৫/২৬-এর রাতে, কোনো পূর্ব-ঘোষণা ছাড়াই, তারও দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া ভার। এটি সত্য যে, ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। প্রচলিত অর্থে সেটি যুদ্ধ-ঘোষণা নয়, তবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির ঘোষণা ছিল। এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব যে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সংলাপ অব্যাহত রেখেছিল, এতেই প্রমাণ হয় রাজনৈতিক সংকটের এক রাজনৈতিক সমাধানের আশা ত্যাগ করেননি বঙ্গবন্ধু বা তাঁর দলের নেতৃত্ব। জেনারেল ইয়াহিয়ার এই প্রতারণামূলক সংলাপ যে ছিল আসলে পূর্বপরিকল্পিত হামলার জন্য প্রস্তুতির অংশ, সেটি পরিষ্কার হয়ে গেল আক্রমণের আকস্মিকতায়। এর মারমুখী ভয়ংকরতা সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না ঢাকাবাসীর। আক্রমণের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট টার্গেটের মধ্যে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলি।
আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত উপন্যাসটির আখ্যানভাগ এই নরহত্যাযজ্ঞের প্রথম দুই-তিনদিনের ঘটনাভিত্তিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেপাক মিলিটারি চিনেছিল সরকারবিরোধী সকল আন্দোলনের উৎসস্থল হিসেবে। পাক মিলিটারির এই শনাক্তকরণে কোনো ভুল ছিল না। উপন্যাসে সেই সত্যটিকেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন আনোয়ার পাশা, তাঁর নায়ক সুদীপ্ত শাহিন চরিত্রের মাধ্যমে।
সুদীপ্তকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলা যায় না। তবে তিনি চলমান রাজনীতির পিছনে যে-সাংস্কৃতিক চেতনা, তার প্রতিনিধিত্ব করেন পূর্ণমাত্রায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করেন। কবিতা লেখেন। তাঁর শিকড় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। পঞ্চাশের দাঙ্গা তাঁর স্বদেশত্যাগের পিছনে প্রেরণা জুগিয়েছিল। বিভিন্ন বিবেচনায় ওই সময়ে এপার বাংলার মানুষ ওপারে গিয়েছে, ওপার বাংলার মানুষ এপারে এসেছে। সুদীপ্তর বেলায় নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার বাসনাটাই মূল বিবেচনা ছিল। অনেকের মতো তিনিও এসেছিলেন, ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-পরিচয়ে স্থিতি লাভ করেছিলেন। রাইফেল রোটি আওরাতের আখ্যানভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কেন্দ্রীয় হয়েছে এজন্যই। মধ্যরাতে আক্রান্ত ক্যাম্পাসের প্রত্যক্ষ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর গড়ে উঠেছে উপন্যাসের আখ্যানভাগ। উপন্যাসের রচনাকাল যদি মনে রাখি, ১৯৭২-এর এপ্রিল থেকে জুন মাস, তাহলে একে মুক্তিযুদ্ধের আদি উপন্যাস দাবি করা যায়। উপন্যাস হিসেবে এর বৈশিষ্ট্য ও এর সীমাবদ্ধতার কারণও নিহিত এর মধ্যে। শুধুমাত্র নির্যাতন ও নির্যাতিতের কাহিনীর মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি উপন্যাসটি, একটি বিদ্রোহী জাতির মন ও মানসিকতা ওই সময়ে কেমন ছিল একই কাহিনীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে তার বস্তুনিষ্ঠ উন্মোচন।
সুদীপ্ত শাহিন, তাঁর বন্ধু ফিরোজ, ফিরোজের প্রতিবেশী সাবির চৌধুরী, ফিরোজের চাচা, জামাতে ইসলামীর উগ্র সমর্থক গাজি মাসউদুর রহমান, মালেক-খালেক ভ্রাতৃদ্বয়, পাক মিলিটারির বাঙালি বিদ্বেষ যাদের পাকিস্তানি আনুগত্যে ফাটল ধরাতে পারেনি, শিল্পী আবদুল্লাহ মনসুর, Ñ হালকা মুখোশের আড়ালে বিরাজ করছে বাস্তব জগতের, এমনকি চেনামহলের কিছু মানুষ, এই সন্দেহকেই উসকে দেন লেখক। ঘটনার বিন্যাসে বা চরিত্র-অঙ্কনে তাকে কল্পনাশ্রয়ী হতে হয়নি, তবে বাস্তবের মানুষগুলিকে ছদ্মনামের নিরাপত্তা দিতে হয়েছে।
বস্তুত বলার অপেক্ষা রাখে না যে সুদীপ্তর জগৎ ও আনোয়ার পাশার জগৎ এক ও অভিন্ন। এক পরিচিত জগতের কথাই লিখেছেন আনোয়ার পাশা। মালেক-খালেক ভ্রাতৃদ্বয়ের পরিচয় একটু বিশদভাবেই দিয়েছেন তিনি। জ্যেষ্ঠ মালেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক, চরিত্রহীন বলতে যা বোঝায়, আপাদমস্তক তাই। লেখালেখির প্রথম পর্যায়ে তিনি কম্যুনিস্টদের গালি দিয়ে মাসিক মোহাম্মদীতে কবিতা লিখতেন। কেননা এটাই সবচেয়ে নিরাপদ ছিল সেই সময়। বলা যায় না কে বা কোন দল কখন ক্ষমতায় আসে, সবদিক হিসাব করে তিনি কলম চালিয়েছেন। ব্রিটিশ-কংগ্রেস-মুসলিম লীগ সকল পক্ষকেই খুশি করা যায় এমন বিষয় ছিল কম্যুনিস্ট-বিরোধিতা। তাই লিখলেন ‘লাল বন্দুকের গান’।
কনিষ্ঠ ভাই খালেক বড়ো ভাইয়ের মতো ধূর্ত ও সুবিধাবাদী নন, তবে পাকিস্তানি আনুগত্যে কম যান না একটুও। মালেকের মৃত্যু হলো পাক মিলিটারির হাতে। প্রাণরক্ষার জন্য যা বলতে হবে সবই বলেছিলেন, যা করবার সবই করেছিলেন। কোনো কিছুতেই রক্ষা পাননি। কোরান শরীফের সামনেই পাওয়া গিয়েছিল মালেক সাহেবের লাশ। পাঁচ বছরের ছোট ছেলেটিকে বাপের পাশেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায়। কিন্তু পাওয়া যায়নি দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে। ‘জওয়ানরা ভারি খুশি। এই বাড়িটাতে ঢোকা তাদের খুবই সার্থক হয়েছে। তিন তিনটি খুবসুরৎ আওরাত, চল্লিশ ভরি জেওয়ার, পাঞ্চ শো রূপেয়া। এ সবি মালে গনিমাৎ, অতএব হালাল।’
ছোটভাই ড. খালেকের মুখে এ কাহিনী শুনেছিলেন সুদীপ্ত, ঘটনার দিন দশেক পরে। সুদীপ্তর দুঃখ, ঘৃণা, বিস্ময়কে অগ্রাহ্য করে নিহতের ভাই ড. খালেক তাঁকে শোনালেন পাকবাহিনীর উন্নত নীতিবোধের কথা। ‘ঐ একটা কাজ তারা বাই চান্স করে ফেলেছে। তাও দেখুন না, ঐ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে আমার কাছে চিঠি দিয়েছে ওরা। এবং ক্ষমা চেয়েছে।’ আর্মির ঔদার্যে মুগ্ধ ড. খালেক। যেহেতু তারা মেয়েদের ফেরৎ পাঠাবার সময় চিকিৎসার জন্য টাকাও দিয়েছে। কাহিনীর এই অংশটি মনে হয় বিশুদ্ধ কল্পনার সৃষ্টি। যাই হোক।
একাত্তরে, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে, বাংলাদেশে মালেক-খালেকদের অভাব ছিল না। সারাদেশে ছড়িয়ে-থাকা এই কোলাবরেটরদের প্রতিনিধিস্থানীয় হিসেবে মালেক-খালেক দু-ভাইয়ের চরিত্রায়ণে লেখকের ঘৃণা বোধহয় তাকে দিয়ে একটু বেশি বলিয়ে নিয়েছে। আমার ভুল হতে পারে। বিশেষত ড. মালেকের চরিত্রায়ণে কিছুটা স্থূলতার দাগ আমার চোখে পড়ে। আইয়ুবের সঙ্গে মালেকের সাক্ষাৎকার ও সংলাপ বিশ্বাসযোগ্য হয়নি।
আরো একটি সংলাপ, সুদীপ্তর সঙ্গে খালেকের, তুলনায়
বাস্তবধর্মী। জামাতে ইসলামীর এক ছাত্র দুই দল ছাত্রের মারামারির মধ্যে মারা গিয়েছে। খালেকের চোখে সে শহীদ। তার রক্ত যেখানে পড়েছে সেখানে মসজিদ বানাতে হবে। কেউ মারামারির মধ্যে মারা পড়লেই শহীদ হয় না, সুদীপ্তর এই মন্তব্যে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন ড. খালেক, এবং উত্তেজনার বশে ঘোষণা করেন, তেমন দিন এলে আপনাদের ওই শহীদ মিনার ভাঙবেন তাঁরা।
‘শহীদ মিনার ভেঙে দেবেন!’ Ñ বিস্ময় প্রকাশ করেন সুদীপ্ত। ‘একশ বার ভাঙব। আপনারা সেখানে কুফরী করবেন, শেরেক করবেন, আর আমরা সেটা ভাঙব না! ভেঙেই সেখানে বানাব মসজিদ।’
বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে ঈদে মিলাদুন্নবীর আলোচনাসভায় ঋষিতুল্য ড. গোবিন্দচন্দ্র দেবের বক্তৃতা দুজনেই শুনেছেন। ফেরার পথে খালেকের উক্তিও চরিত্রসম্মত : ‘মালাউনের কাজটা দেখলেন, কেমন করে মসজিদের ইজ্জত নষ্ট করে দিল।’ বিকৃত মানসিকতার আরেক উদাহরণ দিয়েছেন চাচা গাজী সাহেব। ফিরোজ বন্ধু সুদীপ্ত ও তার পরিবারকে ক্যাম্পাসের বাড়ি থেকে উদ্ধার করে এনেছে। তার নিজের বাড়ি ওদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নয়, যেহেতু সে একজন পরিচিত আওয়ামী লীগার। মালিবাগে তার চাচার বাড়িতে সবাই ওঠে, যদি তিনি এই বিপন্ন পরিবারকে আশ্রয় দেন। তার বাড়ির গ্যারেজে তিনি লুকিয়ে রেখেছেন তিনজন পুলিশ, যারা রাজারবাগের হত্যাকাণ্ড থেকে প্রাণে রক্ষা পেয়েছে। গাজী সাহেব ফিরোজের গাড়িটা চেয়ে নেন। বেরিয়ে যান। একটু পরে ফিরে আসেন কয়েকজন আর্মির লোককে সঙ্গে করে ও তাদের হাতে তুলে দেন তিন হতভাগ্য পুলিশকে। এরপর সুদীপ্ত বা ফিরোজের পক্ষে সম্ভব হয় না, গাজী সাহেবের আতিথ্য
গ্রহণ করা।
সুদীপ্ত যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসবাসী, সেখানেও, তার উচ্চশিক্ষিত সহকর্মীদের মধ্যেও দেখা যায় এই অদ্ভুত মানসিকতা, উগ্র
পাকিস্তানমনস্কতা। এক আলাপের সময় তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল ‘পূর্ববাংলা’, আর যায় কোথায়, সঙ্গে সঙ্গে ফোঁস করে ওঠেন যে-ভদ্রলোক, তিনি এর মধ্যে দেশদ্রোহিতার গন্ধ পান। একটা ছোট্ট কিন্তু ধারালো বিতর্কের সৃষ্টি হয় সুদীপ্তর এই বাঙালিয়ানার অসতর্ক প্রকাশে।
২৬ মার্চের রাতের নরহত্যালীলার পর যে-দুদিন-দুরাত্রির অভিজ্ঞতার উপর রচিত হয়েছে এ-উপন্যাস, এতে একটা জানা কথা জানা হয়ে গেল নতুনভাবে, তীব্রভাবে : পাকিস্তানিরা বাঙালির শত্রু অবশ্যই, তবে সমান
শত্রু বা আরো বিপজ্জনক শত্রু আছে বাঙালিদের মধ্যেই। এদের কাছে পাকিস্তান ও ইসলাম সমার্থক, এই অর্থে যে ইসলামের বাইরে পাকিস্তানে কিছুই বৈধ নয়। যাদের চিন্তায় আছে হিন্দু-মুসলমানের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান,
সম-নাগরিকত্বের ভিত্তিতে সমমর্যাদার বসবাস, এদের চোখে তারা
পাকিস্তানের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে হুমকি।
মালিবাগে, ফিরোজের চাচার বাড়ি থেকে দ্রুত প্রস্থান ছাড়া উপায় ছিল না এই বিপন্ন মানুষগুলির। এরপর তাঁরা চলে যান সুদীপ্তর স্ত্রী আমিনার এক খালার বাসায়। সেই খালার বাড়ির বাইরের দরোজায় তালা ঝুলছে, তাঁরা নিজেরাই বাসা ছেড়ে কোথাও পালিয়েছেন। সৌভাগ্যক্রমে পাশেই এক অপরিচিত পরিবারের বাড়ির দরোজা খুলে যায়। এ-বাড়িতে গোপনে চলেছে মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা, কেউ আসছে, কেউ যাচ্ছে। কেন বাইরের ঘরে তাঁদের এতক্ষণ বসিয়ে রাখা হলো, সে-রহস্য খানিক পরে বোঝা গেল। আগন্তুকদের পরিচয় সম্বন্ধে পুরোপুরি সন্দেহমুক্ত না-হয়ে ওরা এই ক্ষুধার্ত, বিধ্বস্ত পরিবারটিকে ভিতরে ডাকেনি। সন্দেহমুক্ত হওয়ার পর তাদের আচরণে যে আলাদা সুর শোনা গেল তা নিখাদ সহানুভূতির, আন্তরিক মানবিকতার, বিশুদ্ধ আতিথেয়তার।
উপন্যাসে স্থানকালপাত্র সীমিত হওয়ায় জঙ্গি আক্রমণের ভয়াবহতা, পাশবিকতা প্রাধান্য পেয়েছে। আবার বিপরীত দিকে নায়ক সুদীপ্তর শিক্ষা-সংস্কৃতি-বাঙালিত্বের চেতনা ও প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে তার দূরত্ব উপন্যাসটিকে শুধু হত্যা ও ত্রাসের ভয়ংকরতায় বেঁধে রাখেনি। বাঙালির প্রতিজ্ঞা ও প্রতিরোধের স্বরূপও উন্মোচন করেছে। মৃত্যুর নগরীতে বসে সুদীপ্ত ভবিষ্যতের কোনো-এক সুদিনে বাঙালির মুক্তি অবধারিত, এই প্রত্যয়ে পুরোপুরি সমর্পিত। অত্যাচার-নির্যাতনের, গুলি ও আগুনের কালরাত্রি কেটে যাবে, ভিন্ন এক ভোরের আলো ফুটবে, মা ভৈ Ñ এভাবেই কাহিনীর সমাপ্তি টেনেছেন আনোয়ার পাশা।
দুই
জোছনা ও জননীর গল্প হুমায়ূন আহমেদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উচ্চাকাক্সক্ষী উপন্যাস। পূর্বকথায় তিনি বলেছেন, যেমন পিতৃঋণ-মাতৃঋণ শোধ করতে হয় তেমনি দেশমাতার ঋণও শোধ করতে হয়। এই লেখার মাধ্যমে তিনি সেই ঋণই শোধ করতে চেয়েছেন। উদ্দেশ্য, ‘মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টা’ ধরে রাখা।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে এত কিছু ঘটে গেছে, ১৫ খণ্ডে সম্পূর্ণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার দলিলপত্রেও তার পুরোটা ধরা যায়নি। স্মৃতিচারণ, গবেষণা, ঐতিহাসিক বিবরণ ও ব্যাখ্যা বিগত বছরগুলিতে কম হয়নি। একটি উপন্যাসের পরিসরে সেই বিপুল ও জটিল ঘটনাকে ধারণ করা Ñ এই দুরূহ কাজটিই করতে চেয়েছেন জোছনা ও জননীর গল্পে হুমায়ূন আহমেদ।
রাইফেল রোটি আওরাতের সঙ্গে এখানেই হুমায়ূনের উপন্যাসের মূল পার্থক্য। আনোয়ার পাশার সম্বল ছিল ২৫/২৬ মার্চের মধ্যরাত্রি থেকে পরবর্তী দুই কি তিনদিনের বিধ্বস্ত-বিপর্যস্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাণ হাতে করে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে বেড়ানো একটি পরিবারের আশা-ভয়-অসহায়তার ছবি। পক্ষান্তরে হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসই দেশের মাটিতে ছিলেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিজ্ঞতার বিশাল ভাণ্ডার ছিল তাঁর করায়ত্ত যখন তিনি তাঁর এই মহাকাব্যিক পরিসরের উপন্যাস-রচনায় হাত দেন। মাঝখানে অতিক্রান্ত হয়েছে সিকি শতাব্দীকাল। সেদিনের তাজা-দগদগে অভিজ্ঞতা গ্রহণ করেছে দূরস্মৃতির রূপ। কল্পনায় ধরা দিয়েছে পরিশ্রুত হয়ে।
পাণ্ডুলিপি অবস্থায় উপন্যাসটি পড়ে নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে এর অনেক ঘটনাই কাল্পনিক মনে হয়েছে, যদিও উপন্যাসে বর্ণিত প্রায় সব ঘটনাই সত্যি। ‘তাদের কাছে আমার একটাই কথা Ñ সে বড় অদ্ভুত সময় ছিল। স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের মিশ্র এক জগৎ। সবই বাস্তব, আবার সবই অবাস্তব। আমি সেই ভয়ংকর সুন্দর সুররিয়ালিস্টিক সময় পার করে এসেছি। তার খানিকটাও যদি ধরে রাখতে পারি, তাহলেই আমার মানবজীবন ধন্য।’
নিঃসন্দেহে হুমায়ূন আহমেদ সেই সুররিয়ালিস্টিক সময়ের খানিকটা কেন, অনেকটাই ধরতে পেরেছেন তাঁর এই উপন্যাসে। তার পরাবাস্তব কিন্তু পুরোপুরি বাস্তবের উপাদানে তৈরি। একাত্তরে বাস্তবতার রূপ বদলে গিয়েছিল। মৃত্যু, অকারণে মৃত্যু, অসময়ে মৃত্যু, অস্বাভাবিক মৃত্যু, একদল উন্মত্ত ঘাতকের হাতে মৃত্যু, যা ঘাতকদের চোখে নিছক ছেলেখেলায় রূপ নিয়েছে প্রায়শই, মৃত্যু যখন যে-কোনো সময় ঘটতে পারে ও ঘটে চলেছে, বেঁচে থাকাই যখন বিস্ময়কর, সেই সময়টা পরাবাস্তবের রূপ নেয় সহজেই। দস্যুরূপী হানাদার সেনা যখন একপাল জল্লাদের মতো ছেয়ে ফেলেছে দেশ, ঘরবাড়ি যা চোখে পড়ছে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে হত্যা করছে, আর এ সবই করছে পুরো দেশের মানুষকে দেশদ্রোহীর কাতারে দাঁড় করিয়ে, সে-সময়ের পরিস্থিতি কালের দূরত্বে বসে আজকের প্রজন্ম কীভাবে বুঝবে? নয় মাস ধরে অবিশ্বাস্য ঘটনাবলি একের পর ঘটে চলেছিল, হুমায়ূন আহমেদ তাকেই বিশ্বাসযোগ্যতায় উত্তীর্ণ করেছেন, সত্যের অপলাপ না-করে, অতিরঞ্জনের পথে পা না-বাড়িয়ে এবং এর মধ্যেই ব্যক্তিজীবনের স্বাভাবিক আশা-আকাক্সক্ষা, ঘৃণা-ভয়-ভালোবাসার ছবিটাও চোখের আড়াল করেননি। এজন্য যে-কৌশল তিনি অবলম্বন করেছেন, তা হলো গুটিকয় সাধারণ মানুষকে তিনি তাঁর কাহিনীর উপজীব্য করেছেন। তিনি সাধারণের মধ্যেই অসাধারণত্বের খোঁজ পেয়েছেন। তাঁর কাহিনীর বৈশিষ্ট্য হলো এর ভূমিলগ্নতা।
ইতিহাসের, মুক্তিযুদ্ধের নায়কেরা এ-উপন্যাসে ক্বচিৎ দেখা দিয়ে যান একেবারেই পার্শ্বচরিত্র হিসেবে, বা তা-ও নয়। তাঁরা দেখা দেন, যেহেতু হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের মূলধারার সঙ্গে গেঁথে দিয়েছেন তাঁর কাহিনী। এভাবেই আসে ৭ই মার্চের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা শুনতে আসা শাহেদ, আরও আসেন সেই অবিস্মরণীয় বক্তা বঙ্গবন্ধু, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে গোপনে নিষ্ক্রান্ত ইয়াহিয়া, পল্টনের সভায় ও পরবর্তী পর্যায়ে, কলকাতার ফ্ল্যাটে মওলানা ভাসানী, তাঁর দোয়াপ্রার্থী তাজউদ্দীন আহমদ, আসেন টিক্কা খান, যিনি হোটেল থেকে দুটি কেক আনিয়েছেন তার জন্মদিনের আপ্যায়নের অঙ্গ হিসেবে; শান্তিকমিটির মিছিলে নেতৃত্ব দিতে আসেন গোলাম আযম; লায়ালপুরের জেলে শেখ মুজিব, তেলঢালায় তাঁবুর বাইরে কাঠের ফোল্ডিং চেয়ারে আসীন জিয়াউর রহমান। এই সংক্ষিপ্ত দৃশ্যগুলি মূলকাহিনীর অংশ নয়, তারা শুধু উপন্যাসটির ইতিহাসলগ্নতা প্রতিষ্ঠা করে। উপন্যাসের মূল ধারায় থাকে শাহেদ, তার স্ত্রী আসমানী, বন্ধু গৌরাঙ্গ, গৌরাঙ্গের স্ত্রী নীলিমা, শাহেদের বন্ধু নাইমুল, তার স্ত্রী মরিয়ম, মরিয়মের পিতা পুলিশ অফিসার মোবারক হোসেন, শাহেদের জ্যেষ্ঠভ্রাতা স্কুলশিক্ষক ইরতাজউদ্দীন কাশেমপুরী ও অনবরত রং-বদলানো ভোল-পালটানো গিরগিটি কলিমুল্লাহ্।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও কিছু কিছু অসাধারণত্ব থাকে, শাহেদের তাও নেই। সে নিজে তার এই সাধারণত্ব-বিষয়ে সচেতন। সেজন্য সে আশ্চর্য হয় যখন তাকেও ঢাকার রাস্তায় মিলিটারি থামতে বলে, তার মনুষ্যত্বের পক্ষে অবমাননাকর কাজ করায়, এক পর্যায়ে তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করায়। সেখান থেকে সে বেঁচে আসে অলৌকিকভাবে, তার নিজেরই বিশ্বাস হতে চায় না সে বেঁচে আছে। স্ত্রী আসমানী সেই যে রাগ করে বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তাকে আর খুঁজে পায় না সে। তার ফেরার পথে দুর্লঙ্ঘ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যুদ্ধ। এই বিচ্ছিন্নতার রেশ চলে কাহিনীর প্রায় শেষ পর্যন্ত। বন্ধু নাইমুল, যুদ্ধশেষের দিনগুলিতে রণাঙ্গন থেকে রণাঙ্গনে তার অবাধ গতিবিধি, সে-ই আগরতলার আশ্রয়-কেন্দ্র থেকে আসমানী ও তার মেয়েকে পৌঁছে দেয় পশ্চিমবঙ্গের বারাসতে। যুদ্ধের পাগলা হাওয়ায় খড়কুটোর মতো ভেসে বেড়াচ্ছিল মা ও মেয়ে। শেষ পর্যন্ত নিরাপদ ও মমতাময় আশ্রয় পায় তারা নাইমুলেরই এক আত্মীয়ের বাড়িতে। গল্পের শাহেদ-আসমানী অংশে দুর্ভাগ্যের উপর জয়ী হয়েছে এক স্বপ্নসম্ভব সৌভাগ্য, দুঃসহ বিচ্ছিন্নতার পর মধুর মিলন, আর নাইমুল-মরিয়ম অংশে এক ক্ষণিকের কমেডির পরিণতি ঘটেছে মরিয়মের নিদারুণ আশাভঙ্গের ট্র্যাজেডিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতীছাত্র নাইমুল, কমনওয়েলথ স্কলারশিপ, মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ যার পকেটে, যে বিদেশে যাবে, গবেষণাশেষে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরবে, সে সদ্যবিবাহিত স্ত্রীকে এক রঙিন ভবিষ্যতের ছবি দেখিয়ে যুদ্ধে যায়। যুদ্ধ করে, বিজয়ী হয়ে স্বাধীন দেশে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বউয়ের কাছ থেকে বিদায় নেয়। যুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু নাইমুল ফেরে না। বিয়ের শাড়ি পরে তাকে বরণ করে নেবে Ñ মরিয়মের সেই প্রতীক্ষার আকুলতার এক মর্মস্পর্শী বিবরণ দেন হুমায়ূন আহমেদ। মরিয়মের দুঃখ এতই গভীর যে, নাইমুলের ফিরে না আসার মর্মান্তিক সত্যটিও ঔপন্যাসিক কিছুক্ষণের জন্য মিথ্যে করে দেন, তাকে ফিরিয়ে আনেন তার অপেক্ষমানা বধূ মরিয়মের কাছে। দুঃসহ বেদনার ছবি আঁকেন যে-শিল্পী, তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ, তাঁর দৃষ্টি বাষ্পাচ্ছন্ন। তাই নিজের সঙ্গেই ছলনা করতে দেখি গল্পকার হুমায়ূন আহমেদকে। ‘পাঠক, মহান বিজয় দিবসে যে গল্প শেষ হবে সেই গল্প আনন্দময় হওয়া উচিত বলেই আমি এরকম একটা সমাপ্তি তৈরি করেছি।
‘বাস্তবের সমাপ্তি এরকম ছিল না। নাইমুল কথা রাখেনি। সে ফিরে আসতে পারেনি তার স্ত্রীর কাছে। বাংলার বিশাল
প্রান্তরের কোথাও তার কবর হয়েছে। কেউ জানে না কোথায়। এই দেশের ঠিকানাহীন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার কবরের মধ্যে তারটাও আছে। তাতে কিছু যায় আসে না। বাংলার মাটি পরম আদরে তার বীর সন্তানকে ধারণ করেছে। জোছনা রাতে সে তার বীর সন্তানদের কবরে অপূর্ব নকশা তৈরি করে। গভীর বেদনায় বলে, আহারে! আহারে!’
নাইমুল এককভাবে উপন্যাসের নায়ক হতে পারত, কিন্তু হয়নি। সে শাহেদের মতো সাধারণ নয়, সে মেধাবী এবং সে কলম ছেড়ে অস্ত্র ধারণ করেছে, মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে, তার একাধিক অপারেশনের বর্ণনার মধ্য দিয়ে গেরিলা-যুদ্ধের চরিত্র ফোটানো হয়েছে। নাইমুল পরিবর্তিত হয়েছে গেরিলাযোদ্ধা হাছুইন্যায়। এলাকার মানুষের মনে তার নামেই ত্রাসের সঞ্চার হয়। ঠান্ডা মাথায় চন্দ্রপুরের পীর সাহেব, ‘সুরমা বাবা’কে সে হত্যা করে। শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ উড়িয়ে দিতে পারে না, তবে নিকটবর্তী থানায় এক অপারেশনে পাঁচজন মিলিটারি ও তিনজন পাকিস্তানি পুলিশকে পাকড়াও করে। এবং ব্রিজের উপর থেকে গুলি করে পানিতে ফেলে দেয়। কাঁচপুর ব্রিজ অপারেশনের পর সে তার দল নিয়ে নিরাপদে পালিয়েছে। তার সাহস ও তার বন্ধু শাহেদের ভীরুতায়, তার আত্মদান ও শাহেদের অলৌকিক আত্মরক্ষায়, তার মৃত্যুর মধ্যে হারিয়ে যাওয়া ও শাহেদের মৃত্যুর খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসায়, মুক্তিযুদ্ধের আনন্দ-বেদনার, জয়-পরাজয়ের দ্বৈত চরিত্র ফুটেছে। যুগ্মভাবে এই দুই বন্ধু ও তাদের স্ত্রীকে উপন্যাসের কেন্দ্রে রেখে, কখনো পৃথকভাবে কখনো একত্রে, গল্পের শুরু থেকে শেষ অবধি তাদের দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্যের রেখা অনুসরণ করে, চতুর্পার্শ্বের বিচিত্র ও বিভিন্ন ঘটনাবলির মধ্যে এক ধরনের একরৈখিকতা সৃষ্টি হয়েছে। এ না হলে উপন্যাসটি কিছুটা কোলাজধর্মী রূপ নিত।
প্রায়ই বলা হয়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, অল্পকিছু রাজাকারকে হিসাবে না ধরলে, সমগ্র দেশকে একতাবদ্ধ করেছিল। কিন্তু এই অল্পকিছু রাজাকার আসলে কতো অল্প ছিল! কলিমুল্লাহ্ নামের চরিত্রটি এই প্রশ্নের জন্ম দেয়।
বিশুদ্ধ রাজাকার-চরিত্রও এ-গল্পে আছে Ñ চন্দ্রপুরের পীর সাহেব, বা মজিদ ডাক্তার, যে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে মিলিটারিকে এলাকার বিশিষ্ট ‘দারোগা বাড়ি’তে, এবং নব্বই বছরের বৃদ্ধ সরফরাজ সাহেব, পুত্র মোতালেব ও বাড়ির আরো তিনজন পুরুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। কলিমুল্লাহ্ও এক রাজাকার, তবে একটু বিশিষ্ট। তার আছে কবিযশ কাতরতা। সে কবি শামসুর রাহমানের কবিতার অনুরাগী পাঠক। তাঁকে তার অফিসে গিয়ে তাঁর রচিত কবিতা মুখস্থ শুনিয়ে আসে। অফিস ছেড়ে-আসা নিভৃত গ্রামের বাড়িতে আত্মগোপনকারী কবির সঙ্গে দেখা করে, তাকে অধিকতর নিরাপত্তার পরামর্শ দিয়ে আসে। পাক আর্মির জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালেকের সঙ্গে তার সখ্যতার সম্পর্ক। সেই সুবাদে সে নিজের নামটাই পালটে নিয়েছে Ñ গোলাম কলন্দর। নাইমুলের স্ত্রী মরিয়মের ছোটবোন মাসুমাকে, ওই পরিবারের দুঃসময়ে, সে স্ত্রী হিসেবে লাভ করে, ও দুস্থ পরিবারের অভিভাবক সেজে বসে। সরলা কিশোরী মাসুমা তার স্বামীর কবি-প্রতিভায় রীতিমতো মুগ্ধ, রোমাঞ্চিত। নানা অদৃশ্যপথে কলিমুল্লাহ্র হাতে টাকা-পয়সা আসতে থাকে, সে বাস করে ঠাটেবাটে এক পরিত্যক্ত বাড়িতে। পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা কবি ইকবালের প্রশস্তিতে সে প্রবন্ধ রচনা করে। পাক দখলদারবাহিনী যখন সমূহ পরাজয়ের সম্মুখীন, স্ত্রী মাসুমা তার স্বামীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাকে আশ্বস্ত করে। ‘আমি হচ্ছি গিরগিটি।’ ‘তার মানে কী?’ ‘গিরগিটি গায়ের রঙ বদলাতে পারে। মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে গিরগিটি হতে হয়।’
গিরগিটি-চরিত্রের রাজাকারদের, যারা স্বাধীন বাংলাদেশেও বহাল তবিয়তে আছে, তাদের প্রতিনিধিত্ব করে কলিমুল্লাহ্, নাম ভাড়িয়ে গোলাম কলন্দর।
আমাদের চেনা জগতের চেনা মানুষ, চেনা পরিস্থিতি নিয়ে আকর্ষণীয় কাহিনী সৃষ্টি করেন হুমায়ূন আহমেদ। সেদিক দিয়ে এ গল্পের শাহেদের বড়োভাই ইরতাজ উদ্দীন কাশেমপুরীও একজন চেনা মানুষ। মফস্বলের এক স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক, জীবন-যাপনে সাদাসিধে, ঢাকায় একাত্তরের হাঙ্গামার মধ্যে বসবাসরত ছোটভাই শাহেদের জন্য তাঁর মনে উদ্বেগ, চিঠিপত্রে তার প্রকাশ ঘটান। গল্পের শুরুতে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে ঢাকায় এসে বেশ বিড়ম্বনার শিকার হন, ভাইয়ের জন্য হাতে করে আনা সাদা রাজহাঁসটি নিয়ে। তাঁকে দিয়েই গল্পের শুরু। একজন সরলচিত্ত নিখাদ ভালোমানুষ এই মওলানা। দুঃসময়ের রাজনীতি তাঁকে স্পর্শ করে না, তিনি থাকেন তাঁর ধর্মকর্ম নিয়ে। আল্লাহর উপর অটল বিশ্বাস নিয়ে। নীলগঞ্জের মসজিদে তিনি ইমামতি করেন। কীভাবে একসময়ে তাঁর মনে হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে জুমার নামাজের বৈধতা নেই। এবারের জুমার নামাজে তিনি ইমামতি করবেন না, এমনকি নিজে নামাজও পড়বেন না। বাড়ির কাছেই মিলিটারি ক্যাম্পের ক্যাপ্টেন বাসেত এদিকে তৈরি হয়ে আছেন জুমার নামাজ আদায় করার জন্য ও চারজন হিন্দুর মুসলমান হওয়া, ও তাদের প্রকাশ্য খৎনা-দৃশ্য উপভোগের জন্য। এই চারজন নওমুসলমানের নামও তিনি ঠিক করে দিয়েছেন। মওলানার ঘোষণায় তিনি প্রথমে অবাক হন। তারপর তাঁকে তাঁর সিদ্ধান্ত-পরিবর্তনে ব্যর্থ হয়ে তিনি ক্ষেপে যান। ক্যাপ্টেনের আদেশে তাঁকে উলঙ্গ করে নীলগঞ্জের রাস্তায় ঘোরানো হয়। তাঁর অঙ্গুলি-সংকেতে নীলগঞ্জের অতি শ্রদ্ধেয় অতি সম্মানিত মানুষ মাওলানা ইরতাজ উদ্দীনকে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় প্রদক্ষিণ করানো হয়। তাঁকে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হলো নীলগঞ্জ স্কুলে। সেখান থেকে নীলগঞ্জ বাজারে। বাজারে ছোট্ট একটা ঘটনা ঘটল। দরজির দোকানের এক দরজি একটা চাদর নিয়ে ছুটে এসে ইরতাজ উদ্দীনকে ঢেকে দিয়ে জড়িয়ে ধরে থাকল। ঘটনা এতই দ্রুত ঘটল যে সঙ্গের মিলিটারিরা বাধা দেবার সময় পেল না। ইরতাজ উদ্দীন এবং দরজিকে মাগরেবের নামাজের পর সোহাগী নদীর পাড়ে নিয়ে গুলি করা হলো।
পাদটীকায় হুমায়ূন আহমেদ ইরতাজ উদ্দীনের হত্যার ঘটনাটি সত্য ঘটনা বলে দাবি করেছেন। মওলানার মৃতদেহ নদীর পাড়ে পড়ে ছিল। সেটি ছিল ঘোর বৃষ্টির রাত। সে-রাতে, প্রবল বৃষ্টির মধ্যে, কারফিউ অগ্রাহ্য করে নীলগঞ্জ স্কুলের হেডমাস্টার মনসুর সাহেব ও তাঁর স্ত্রী মৃতদেহ নিয়ে আসতে নদীতীরে যান। হঠাৎ একজনকে ভিজতে ভিজতে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। সে আসিয়া বেগমের কাছে এসে উর্দুতে বলল, মাতাজি আপনি সরুন, আমি ধরছি।
মনসুর সাহেব বললেন, আপনার নাম?
আগন্তুক বলল, আমি বেলুচ রেজিমেন্টের একজন সেপাই। আমার নাম আসলাম খাঁ।
এরকম আরো একটি সত্য ঘটনা লেখকের নিজ-পরিবারের মর্মস্পর্শী কাহিনী। পিরোজপুরের এস.ডি.পিও মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে প্রকাশ্যেই গেরিলাদের পক্ষ নিয়েছিলেন। অবাঙালি এস.ডি.ও-কে তিনি বিশেষ ব্যবস্থায় বরিশাল পর্যন্ত যাওয়ার ব্যবস্থা করেন, না হলে গেরিলাদের হাতে তাঁর মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত ছিল। তাঁর পরিবার Ñ স্ত্রী পুত্রকন্যা Ñ এরপর প্রথমে লুকিয়ে থাকে দুর্গাপুর ইউনিয়নের বাবলা গ্রামে এক সম্পন্ন গৃহস্থবাড়িতে। হঠাৎ-ই আর্মির ভয়ে ভীত গৃহকর্তা পুরো পরিবারকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। একটি সাজানো নৌকায় পরিবারটিকে অজানা
গন্তব্যে রওনা হতে হয়। পরের কাহিনীতে আছে একজন আশ্রয়দাতার মহানুভবতা, ও একজন বিখ্যাত ব্যক্তি, শর্ষিনার পীর সাহেবের নিরাপদ আশ্রমে দুটি বিপন্ন যুবকের আশ্রয়লাভে ব্যর্থতা। পীর সাহেবের সঙ্গে মিলিটারির গভীর সখ্য। এদের পিতার মৃত্যু-সংবাদ পেয়েছেন পীর সাহেব। তবে কোথায় কীভাবে তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছিল সেটি জানা যায়নি। তাঁর বিশ্বস্ত পাংখাপুলার রশিদকে নির্যাতন করেও মিলিটারি তাঁর ঠিকানা উদ্ধার করতে পারেনি। তবে হুলারহাটের নদীতীরে তাঁকে দাঁড় করিয়ে দুটি গুলি খরচ করতে পেরেছিল।
এরপর এ-পরিবারের আর কোনো সংবাদ মেলে না উপন্যাসে। বিজয় দিবসে জানা যায়, হুমায়ূন বেঁচে আছে, ভাই জাফর ইকবাল কোথায় আছে, কেমন আছে, সে জানে না।
গল্প-তৈরির অসামান্য ক্ষমতার জন্য যে-খ্যাতি হুমায়ূন আহমেদের, এই বিপুলাকার উপন্যাসের খাঁজে-খাঁজে ছোট ছোট গল্প ঢুকিয়ে দিয়ে তিনি তার প্রমাণ রেখেছেন। বিশেষভাবে লক্ষণীয় কাহিনীর সঞ্চরণশীলতা। দৃশ্যপটের পরিবর্তন ঘটতে থাকে, বহু ঘটনার সঙ্গে জড়িত বহু মানুষের দেখা মিলতে থাকে, কাহিনীর মধ্যে সৃষ্টি হয় বহুমাত্রিকতা, ন্যারেটিভের উপর নির্ভরতা খর্ব করেন লেখক গল্পের বাঁকে বাঁকে। স্বাধীনতা-যুদ্ধের দলিল থেকে উদ্ধৃতিও সেই কৌশলের মধ্যে পড়ে। কেবল একটি বিষয় হুমায়ূন আহমেদ সরাসরি পরিবেশন করেন না, Ñ মিলিটারির হাতে নারী-নির্যাতনের কাহিনী। তাঁর কৈফিয়ত : আমার এই বইটির অসম্পূর্ণতার মধ্যে একটি হলো
আমি পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্বারা অত্যাচারিত নারীদের বিষয়টি
আনতে পারিনি। বিষয়টি এতই স্পর্শকাতর এবং এতই কষ্টকর যে কিছুতেই লিখতে পারলাম না। আশা করছি অন্যরা লিখবেন।
তাঁদের কলমে এই হতভাগ্য তরুণীর (তরুণীদের) অশ্রুজল উঠে আসবে। (পূর্বকথা।)
তিন
একাত্তরে পাক হানাদার দ্বারা নির্যাতিত যে-হতভাগ্য নারীদের কথা হুমায়ূন আহমেদ লেখেননি বা লিখতে পারেননি, সেই কাজটিই করেছেন শাহীন আখতার, তাঁর তালাশ উপন্যাসে। বলা যায়, এক মরিয়মের কাহিনীর মধ্য দিয়ে তিনি লক্ষ দুর্ভাগা নারীর নিদারুণ অভিজ্ঞতার
সারাৎসার হাজির করেছেন।
ঢাকায় পাক মিলিটারির তাণ্ডবের দুদিন পর কয়েক ঘণ্টার জন্য কারফিউ তুলে নেয় ওরা। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় নরক থেকে বেরিয়ে পড়ার পালা। মরিয়মও বেরিয়ে পড়ে, সামনের বাড়ির হাজী সাহেবের কাফেলায় যোগ দিয়ে।
রায়ের বাজারের এই বাড়িটার এক ছোট্ট ইতিহাস আছে, সেটি উপন্যাসের কাহিনীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ’৬৪/৬৫-র ভীতসন্ত্রস্ত দেশত্যাগী এক হিন্দুপরিবারের চার কাঠা জমি পানির দরে কিনে নেন মরিয়মের বাবা, কফিলউদ্দীন আহমেদ, সেখানে একটি দু-কামরার আধ-পাকা ঘর তোলেন, একটা কুয়ো, একটা টিউবওয়েল, মুলিবাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা, লোহার গেটে মালিকের নাম-পরিচয় কালো জমিনে সাদা অক্ষরে লেখা, Ñ এই গ্রাম্য বেচারার বাড়িটা উপন্যাসের অনেক ঘটনার সাক্ষী। উপন্যাসের একটি চরিত্রই হয়ে ওঠে এটি। শুরুতে বাড়িটা শুধু মরিয়ম ও তার দু-বছরের ছোটভাই মন্টুর বাসস্থান। বাবা-মা-বোনেরা থাকে দেশের বাড়িতে। দুই ভাইবোন কীভাবে এ বাড়ির বাসিন্দা হলো, সেখান থেকেই মরিয়ম-কাহিনীর সূত্রপাত।
মরিয়মের জীবনে প্রথম পুরুষ, জসিমুল হক, দূর-সম্পর্কের আত্মীয়। ওদের বাড়িতে উঠেছিল এক মাইল দূরের উপজেলা শহরে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। পরীক্ষা শেষ, মরিয়মের বাবা ঢাকায়, রায়ের বাজারে বাড়ি তৈরি হচ্ছে। মাকে না জানিয়ে মেয়ে ওই আত্মীয় ছেলেটির সঙ্গে মহুয়া সিনেমা হলে একটা ইংরেজি ছবি দেখতে যায়। ছবিটির এক আবেগঘন দৃশ্যে ছেলেটির মনে বোধহয় প্রেমভাব জেগেছিল, সে পাশের সিটে বসা মরিয়মের হাত চেপে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে পিছনের সারি থেকে তীব্র শিস, জানিয়ে দেয় যে ওরা দেখে ফেলেছে। ভয় পেয়ে যায় ওরা। তিনদিন পথে-পথে ঘোরে। ছেলেটি আর ফেরে না, একা মরিয়ম ফেরে ও কিছুদিনের মধ্যেই তাকে ঢাকায় নতুন বাড়িতে নির্বাসনে পাঠানো হয়। সঙ্গে মন্টুকেও যেতে হয়, বোনের পাহারাদার হিসেবে।
একাত্তরের মার্চ যতোই এগিয়ে আসছে, ঢাকা হয়ে উঠেছে মিছিলের নগরী, মন্টু যোগ দিয়েছে আন্দোলনের এক কর্মী হিসেবে। মরিয়ম তাকে প্রায় জোর করেই দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়, যাতে সে কোনো বিপদে না পড়ে। রায়ের বাজারের বাড়িতে মরিয়ম একা।
জসিমুল হককে মরিয়মের প্রথম প্রেমিক গণ্য করা যায়, কিন্তু তার জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়ায় মরিয়মের মনে দুঃখ নেই। মরিয়ম, ঢাকায় এসে কলেজের ছাত্রী হয়েছে, ম্যাট্রিক পাশ করেছে ফার্স্ট ডিভিশনে, অংকে লেটার নিয়ে। স্বামী-সংসার নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ সে এঁকে ফেলেছে, এবং এস.এম হলের তুখোড় ছাত্র আবেদের মধ্যে পেয়েছে তার মনের মানুষটিকে। আর এখানেই সে মারাত্মক ভুল করে বসেছে।
লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে আবেদ এখন দেখা দিয়েছে একজন প্রভাবশালী ছাত্রনেতার পরিচয়ে। সে মরিয়মের প্রেমে সাড়া দিয়েছিল, তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে শয্যায় টেনেছিল, তার বিয়ের কথায় পিছু হটেছিল। বিয়ে? দেশের এই সংকট সময়ে? মরিয়মের গর্ভে তার সন্তান, মরিয়মের কাতরতা, আর্তি তাকে বিচলিত করে না। শাহেদের প্রত্যাখ্যানের মধ্যে রূঢ়তা আছে, একটি বিপন্ন মেয়ের প্রতি সামান্যতম সহানুভূতির চিহ্ন নেই। আন্দোলনের দিনে আবেদের পরিচয়, সে একজন অগ্নিপুরুষ, এস.এম হলের বন্ধুদের চোখে একজন ছাত্রনেতা। তার আসল স্বার্থপরায়ণ খলচরিত্র বেরিয়ে আসে স্বাধীনতার পর। ছাত্রজীবনের বন্ধু ও অনুসারীদের সঙ্গে তার দুস্তর ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। সে এক অবাঙালির সওদাগরি অফিসের মালিক হয়ে বসেছে। ‘প্রাক্তন মালিককে ভারত হয়ে পাকিস্তানে ভেগে যেতে সাহায্য করার বিনিময়ে তার পরমা সুন্দরী মেয়েকে সে বিয়ে করেছে। অর্থাৎ যুদ্ধজয়ের পর পুরো রাজত্বসহ এক রাজকন্যা তার ভাগে।’ আবেদ তার অতীতকে একেবারেই মুছে ফেলেছে। তার অফিসের গেটে ‘ডেরেস পরা’ দারোয়ান সম্পর্কে তার চাচা। তবে চাচা এখন ‘ভাজিতা থুক্কু সারের’ প্রতি যথোচিত সমীহ রক্ষা করেও, দর্শনপ্রার্থী, আসলে চাকুরিপ্রার্থী, বীরাঙ্গনা মরিয়মকে আবেদ ও তার অবাঙালি স্ত্রী সম্পর্কে কিছু গোপন তথ্য সরবরাহ করে। আবেদের কাছে মরিয়মের আর কিছু চাওয়ার নেই, শুধু একটি চাকরি ছাড়া। মরিয়মকে আবেদ এভাবে আশা করেনি। প্রথম ধাক্কাটা সে সামলে নেয়। তারপর তার প্রতিক্রিয়া অন্যরকম। মেয়েটা চাকরির ‘দাবি’ নিয়ে এসেছে। এত মনের জোর সে কোথা থেকে পেল? বিপদের সম্ভাবনা দেখে আবেদ। কয়েকবার তাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ফিরিয়ে দেয়। তারপর, আবার যদি আসে, পুলিশে খবর দিয়ে তাকে পাকড়াবার ব্যবস্থা করে। চতুর আবেদ লক্ষ করেছে, মরিয়মের চেহারায়ও কেমন ‘রাণ্ডি রাণ্ডি ভাব’ এসে গিয়েছে।
বিগত নয় মাসে বিচিত্র মানুষের দেখা পেয়েছে মরিয়ম, বিচিত্র ও কষ্টকর অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। মানুষ হিসেবে প্রথম বিস্ময় রমিজ শেখ, হাজী সাহেবের বাড়ির সেই রহস্যজনক লোকটি। একসময় দোতলার জানালা দিয়ে রাস্তার ওপারে মরিয়মের বাড়ির দিকে সময়ে-অসময়ে তাকিয়ে থাকত, যা ছিল মরিয়মের অস্বস্তির কারণ। কিন্তু ২৬ মার্চের রাতের তাণ্ডবের শেষে ২৭-এর কারফিউর সুযোগে সেই মানুষটি মরিয়মকে উদ্ধার করে। এক পাতা ঘুমের বড়ি খেয়ে মরিয়ম শুয়েছিল সেই ভয়াল রাতে, খাটের তলায়। তার অচৈতন্যে সে তার গর্ভের ভ্রƒণটিকে হারিয়েছে। তাকে, তার রক্তমাখা শরীরটাকে এই রমিজ শেখই মেঝে থেকে তুলে ধরে চৌকির ওপর শুইয়ে দেয়। তার শুশ্রƒষা করে উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে। ২৭-এর সকালে তার ডাকেই সাড়া দিয়ে শহর ছাড়ার দলে যোগ দিয়েছিল মরিয়ম, হাজী সাহেবের কাফেলায়। হাজী সাহেবের পাকিস্তানি আনুগত্য কিছুদিন পরেই তাঁকে ফিরিয়ে আনে ঢাকায়, যেহেতু পাক মিলিটারি ইতোমধ্যে ঢাকার ও দেশের পরিস্থিতি তাঁর মতো মানুষের জন্য অনুকূল করে ফেলেছে। কিন্তু রমিজ শেখের মন পড়ে থাকে মরিয়মের দিকে, যাকে সে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে। রমিজ শেখ ফিরে যায় স্বর্গধামে : মরিয়মসহ অনেকগুলি পরিবারের আশ্রয়স্থলে।
রমিজ শেখের একটা অপরাধবিজড়িত অতীত আছে। স্ত্রী হত্যাকারী খুনের আসামি জেল-পলাতক রমিজ শেখকে হাজী সাহেবই আশ্রয় দিয়েছিলেন। স্বর্গধামে রমিজ ফিরে আসায় সে-বাড়িতে আশ্রয়কামী পরিবারগুলি, বিশেষত মহিলারা, খুব খুশি। কখন কোন দিক থেকে বিপদ চলে আসে, তখন চওড়া কাঁধের, খর্বাকৃতির, অভিব্যক্তিহীন, গ্রাম্য প্রকৃতির লোকটা সব সামাল দেবে। তার হাতে একটা বন্দুকও আছে।
দশ বছরের জেলখাটা রমিজ শেখের রাজনীতিজ্ঞান বলতে যা, সবই তার হাজী সাহেবের কাছ থেকে পাওয়া। যুদ্ধের কার্যকারণ সে কিছুই জানে না, বোঝে না। উত্তেজিত হলে এখনো পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে চেঁচিয়ে ওঠে। জয় বাংলা বলার সময় তোতলায়। হাজী সাহেবের আশ্রয় ছেড়ে সে ‘স্বর্গধামে’ এসেছে মেরী/মরিয়মের টানে। মেয়েটিকে সে মরিচ পোড়া দিয়ে বাঁচিয়েছে, এখন ওর বাকি জীবন ওর হাতে।’ আশ্চর্য এই দায়িত্ববোধ কোথা থেকে পেল এই মূর্খ গ্রাম্য গোঁয়ার লোকটা!
‘স্বর্গধামে’ ঘটনাচক্রে জড়ো হওয়া পরিবারগুলো প্রথম থেকেই বিনা কারণে মরিয়মের প্রতি বিরূপ। তাদের মনোভাব তারা গোপন করে না। মরিয়ম বুঝতে পারে এই দুর্গত শিবিরে সে অবাঞ্ছিত এক নারী। বিশেষত অন্য বিবাহিতা নারীদের চোখে। মরিয়ম রমিজ শেখের হাত ধরে নিজের পথ দেখার সংকল্প গ্রহণ করেছে। সে এখন লোকলজ্জা ভয়ের ঊর্ধ্বে। দুজনে একটি বিকল্প আশ্রয়ের খোঁজে পথে পথে ঘোরে।
নতুন গাঁওয়ের চৌধুরী বাড়িতে এসেই বিপদে পড়ে রমিজ শেখ। মরিয়ম সহজেই ভিড়ে যায় মেয়ে-মহলে, আর রমিজ শেখকে গ্রামের যুবকরা টেনে নেয় তাদের গ্রাম পাহারার কাজে। এই যুবকদের মুখেই রমিজ শেখ প্রথম শোনে মুক্তিবাহিনীর কথা। হাজী সাহেবের বৃত্তান্ত শোনার পর এরা তাকে মীরজাফর আখ্যা দেয়। রমিজ ইতিমধ্যে নতুন গাঁওয়ের স্কুলমাঠে ফিবছর অভিনীত সিরাজউদ্দৌলা পালার মীরজাফরকে চিনে ফেলেছে। তবে বেশি চিনেছে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও আলেয়াকে। মরিয়মের মধ্যে সে তার আলেয়াকে পায়। এর অল্পদিন পরে, আর্মির হাতে ধরা পড়ে, অশেষ নির্যাতন সহ্য করে, এক ফাঁকে পালাবার সময় সে ‘আলেয়া’ ‘আলেয়া’ বলে চিৎকার করে স্কুলঘরটার দিকেই দৌড় দিয়েছিল। পিছন থেকে গুলিবর্ষণ করে পাক মিলিটারি। তার পলায়ন ও মৃত্যু-দৃশ্য দোতলার স্কুলঘরে আটক মরিয়ম দেখতে পায়। ঘরের দরোজা বাইরে থেকে তালা মারা। বিপদের দিনের পরম বন্ধু রমিজ শেখের জন্য মরিয়ম কিছুই করতে পারে না। তাছাড়া স্কুলঘরে, আরো কয়েকটি মেয়ের সঙ্গে, সেও এক বিবস্ত্রা রমণী।
রমিজ শেখ মুক্তিযোদ্ধা নয়, রাজাকার নয়, একটা সবল দেহ ও সরল প্রাণের মানুষ, যে দুঃসময়ের আবর্তে পড়ে ডুবে যায় মরিয়মের বুকে একটা তীব্র বেদনার স্পন্দন তুলে। উপন্যাসের অনেক হিসাবী, চতুর, স্বার্থপর মানুষের মধ্যে এক ব্যতিক্রমি সত্তা। এক মনুষ্যরূপী বোবা প্রাণী, অনেক অমানুষের মধ্যে এক প্রকৃত মানুষ।
মরিয়মের মামা গোলাম মোস্তফা ও প্রতিবেশী হাজী সাহেব, দুজনই অমানুষদের দলভুক্ত। তবে দুধরনের অমানুষ তারা।
গোলাম মোস্তফা বিত্তবান হয়েছেন ঢাকা থেকে গৃহত্যাগী হিন্দুদের বাড়িঘরসম্পত্তি বেচাকেনার বেসাতি করে। সমাজের উপরতলার কেউ কেউ ঠিক এ কাজটিই করেছিলেন, যদিও শুরুতেই বিত্তবান ছিলেন তাঁরা। গোলাম মোস্তফা উপরতলার মানুষ নন, তবে সেদিকেই তাঁর দৃষ্টি। অসাধু উপায়ে অর্জিত বিত্ত-সম্পত্তি তাঁকে রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষার পথে টেনেছে। স্বাধীনতার পর তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, হিন্দুরা যদি ফিরে আসে তাদের হৃতসম্পত্তি উদ্ধার করতে। তবে শত্রু-সম্পত্তি আইনের পরিবর্তিত রূপ দেখার পর তাঁর দুশ্চিন্তা কাটে। তিনি পুরানো ব্যবসা ভুলে গিয়ে এখন ফুল-টাইম রাজনীতি করছেন। এক জায়গায় তাঁর চতুরতা ও বিষয়বুদ্ধি মার খায়। মিলিটারি ক্যাম্পফেরত মরিয়মকে নিয়ে যখন তার বাবা দিশেহারা, তিনি তাঁর হাবাগোবা পুত্রের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে দিয়ে তাকে ঘরে তুলতে চান। মরিয়ম কেবলই পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে তাঁর মগবাজারের বাসায় উঠেছে, তার বিধ্বস্ত শরীরটাকে নিয়ে। শ্যালকের প্রস্তাবে ভগ্নিপতির মন সায় দেয় না। তবে, মরিয়মের অসাক্ষাতে বাড়িতে এই প্রস্তাবটি নিয়ে কথাবার্তা চলতে থাকে, তার অর্ধঅচৈতন্যের মধ্যেও মরিয়ম টের পায়। গোলাম মোস্তফা একজন বীরাঙ্গনাকে পুত্রবধূ করে আনলে সে-বিবাহ-অনুষ্ঠানে বেগম মুজিব অবশ্যই আসবেন। আর সেটি হবে তাঁর রাজনৈতিক মূলধন!
কফিলউদ্দীন চরিত্রটি, নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে, শেষ পর্যন্ত একটা সুডৌল রূপ লাভ করে। মরিয়মের প্রত্যাবর্তন কোনো নিভাঁজ খুশির খবর নয়। নারী-পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। শ্যালক গোলাম মোস্তফার স্বার্থপর প্রস্তাবও গ্রহণযোগ্য নয়। মেয়েও ভয়ানক জেদি, বদলে গিয়েছে নানা প্রবঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে। একমাত্র পুত্র মন্টুর খোঁজ নেই। তার মৃত্যুসংবাদ নিয়ে আসে সরফরাজ, রায়ের বাজারের বাসায়, তারপর সে উধাও। কোথায় মন্টুর মৃত্যু হলো, কেমন করে, কিছুই জানা গেল না। ইতিমধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব বেড়ে গিয়ে এখন দুজন যেন একে অপরের অচেনা। রায়ের বাজারের সেই বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়েও তিনি চিনতে পারেন না Ñ সেটা এখন এক ভগ্নস্তূপ Ñ ইতিহাসের সাক্ষী এক জাদুঘর।
এই জাদুঘরে প্রথম প্রবেশ করে মরিয়ম, জ্বরের ঘোরে, পাগলের মতো, মগবাজারের মামার বাড়ি থেকে এক দৌড়ে। পিছন পিছন ছোটেন বাবা।
‘বাড়িটা দেখলেই কফিলউদ্দীন আহমেদের মনে আধ্যাত্মিক ভাব জাগে। এত শূন্য, মহাশূন্যের মধ্যে বসত বাড়ি। তার জীবনের অনুরূপ। কপাটবিহীন দরজা-জানালা দিয়ে আকাশ-বায়ু উভয়েই নির্বিঘ্নে চলাচল করে। পাখীরা উড়ে যায়। মাথার উপরে রোদ-বৃষ্টি সরাসরি কিরণ ও পানি দেয়। মগবাজার থেকে রায়ের বাজার এটুকু পথ আসতেই মরিয়ম শক্তি আর তেজের সবটা খরচ করে ফেলেছে। কফিলউদ্দীন আহমেদ পৌঁছে দেখেন, খোলা ছাদের নিচে, খালি মেঝেতে কুঁকড়ে মুকড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে সে। মেয়েটা কি তার পাগল হয়ে গেল! যে বাড়ির ছাদ নেই, দুয়ার নেই, ফটক নেই, বাউন্ডারি ওয়াল নেই, সেখানে পাগল ছাড়া কেউ আর এমন নিশ্চিন্ত ঘুমাতে পারে?’
আসলে মরিয়ম পাগল হয়নি। যেদিন নতুন গাঁওয়ের চৌধুরী বাড়ি থেকে তাকে ও তার সঙ্গে বাড়ির কাজের মেয়ে টুকি, যোগেন বাইন্যার বড় বেটি বিন্দুবালাকে মিলিটারি টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল, ও দুই ক্রোশ পথ হাঁটিয়ে শেষ পর্যন্ত তুলেছিল মল্লিকপুর সদরে, তখন মুক্তিযুদ্ধের তিনমাস চলছে। এর পরের ছয় মাস তার দেহমনের উপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে, সে-কাহিনী একটু একটু করে উদ্ধার করেছে মুক্তি, যার গবেষণার বিষয় একাত্তরের বীরাঙ্গনা। তার অনুসন্ধান শুরু হয়েছে ঘটনার আটাশ বছর পর। যখন মরিয়মের চুলে পাক ধরার বয়স।
মল্লিকপুরের দোতলা স্কুলঘরে মরিয়ম, টুকু, বিন্দুবালা ছাড়াও বন্দি ছিল আরো মেয়ে। বিভিন্ন কামরায়। সেটা বোঝা যেত যখন মরিয়ম চিৎকার শুনতে পেত, ও কোনো কোনোটা থেকে হঠাৎ হঠাৎ কান্নাকাটির শব্দ কানে ভেসে আসত। সেই স্কুলবাড়ি থেকেও তারা চালান হয়ে যায়। মিলিটারির হাতে ধর্ষণ-নির্যাতনের রক্তহিমকরা কাহিনীর মধ্যে ধরা পড়ে একদিকে মরিয়ম, সেই সঙ্গে শ্যামলী, পারুল, অনুরাধা। দুঃস্বপ্নের সেই দীর্ঘ রাত্রিতে মরিয়ম মুখোমুখি হয় দুজন আর্মি অফিসারের, যে দুজনই মেজর ইশতিয়াক। সার্কিট হাউজে পাড়মাতাল মেজর ইশতিয়াকের দ্বারা ধর্ষিত হওয়ার আগে পথেই, গাড়িতে তাকে ধর্ষণ করেছে তাকে নিয়ে আসার দায়িত্বে জওয়ান। সার্কিট হাউজের ব্যাপারটা ভিন্ন আঙ্গিকে। প্রথমে শাওয়ারে স্নান, বেশ পরিবর্তন, তারপর ডিনার টেবিলে ঘিয়ে-ভাজা লাল লাল গলদা চিংড়ি, মুরগির রোস্ট, পোলাও, জগভর্তি ফ্রুট জুস। এ সবই তাকে নিয়ে নিষ্ঠুর রসিকতা।
ধর্ষিতা মেয়েদের একেক জনের একক কাহিনী, মুক্তির নেওয়া সাক্ষাৎকারে সবাই যার যতোটি মনে আছে খুলে বলে। দ্বিতীয় যে মেজর ইশতিয়াক মরিয়মের কষ্ট কদিনের জন্য অনেকটাই লাঘব করে, তার মুখেই মরিয়ম প্রথমজনের মৃত্যুসংবাদ পায়। দ্বিতীয় জন মরিয়মকে তার দুঃখের কথা বলে। তার কাছ থেকে মরিয়ম পায় অভাবিত ভালো ব্যবহার, অবশ্য দেহের বিনিময়ে। তবু তো এই নরকে এক মেকি স্বর্গদৃশ্যের সূচনা করে একটি সজ্জিত কক্ষ, লাল গোলাপ, মদসহযোগে ওমর খৈয়াম, হাফিজ। মোহ কাটতে বেশিদিন লাগে না। কী আশ্চর্য! মরিয়মের হঠাৎ হুঁশ হয়, খুনি-ধর্ষক লোকটাকে নিয়ে গত কয়েকটা দিন সে মতোয়ারা ছিল কীভাবে? দেখা যায়, একই মোহে পেয়েছে ধর্ষিতাদের মধ্যে আরো কোনো কোনো মেয়েকে, যেমন শ্যামলীকে। সাক্ষাৎকারে সে স্বীকার করেছে, সে অফিস থেকে পালিয়ে যায়নি। তার বারোয়ারি শরীরটাকে ভোগ করেছে অনেকে তবে একজন অফিসার তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। ‘এ অবস্থায় সে পালাতে যাবে কেন, তাকে অচিরেই সে বিয়ে করবে।’ ঢাকায়, নারী-পুনর্বাসন কেন্দ্রে মরিয়ম, অনুরাধা, শোভারাণী, তিনজন গর্ভবতীর মধ্যে একমাত্র শোভারাণীর গর্ভপাতের মেয়াদ উত্তীর্ণ, তবে শোভারাণী নিজেই গর্ভপাত চায় না। সে অস্থির হয়ে আছে তার অনাগত সন্তানের জন্য। ভগবানের অশেষ কৃপায় তার পেটে সন্তান এসেছে, বাঁজা বিধবার দুর্নাম নিয়ে তাকে বাকি জীবন কাটাতে হবে না। তার শ্বশুরের ভিটায় বাতি জ্বালাবার সুযোগ সে ছাড়বে না!
মরিয়ম পাগল হয়নি। তার বিড়ম্বনাময় জীবনের দ্বিতীয় পর্বের সূচনায় সে ক্লান্ত, অবসন্ন, তার ঘুমের প্রয়োজন। পিতামাতার সংসারে ফিরে যাবে না। পুনর্বাসন কেন্দ্রে সে দেখেছে, সংবাদপত্রে নিখোঁজ পুত্র মন্টুর জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছেন তার বাবা, নিখোঁজ কন্যার জন্য দেননি। মরিয়ম তাঁর জন্য লজ্জা, তাঁর পরিবারের জন্য লজ্জা।
আবেদ তাকে চাকরি দেয়নি, বরং এই দুর্বিনীত মেয়েটিকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে চেয়েছে। বীরাঙ্গনাকে এ-সময় বাধ্য হয়ে বেছে নিতে হয় বারাঙ্গনার জীবন। সেই সময় একজন তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাকে বিয়ে করে ঘরে তোলে। সমাজে পুনর্বাসিত হওয়ার এ সুযোগ ছাড়ে না মরিয়ম। কিন্তু আবারও সে ভুল করে। মমতাজ নামের এই লোকটির চরিত্রের কদর্যতা অচিরেই ধরা পড়ে। ওদিকে দেশের বাড়িতে বয়ে যায় মরিয়মের এই ভাগ্য-পরিবর্তনে খুশির হাওয়া। মেয়ে ও জামাইয়ের আমন্ত্রণ আসে দেশের বাড়ি থেকে। একা মরিয়মকে আসতে দেখে তার মা ঠিকই বুঝে নেন, কেমন বিয়ে তার মেয়ে করেছে, কেমন জামাই তাদের ভাগ্যে জুটেছে।
গ্রামে থাকতেই বন্যার আগমন ঘটে। বন্যার পায়ে পায়ে অজন্মা, অন্নাভাব। সে-আকালের কালো ছায়া পড়ে এই সচ্ছল পরিবারটির উপরও। কষ্টের দিন শেষ হতে চায় না। পরিবারের মধ্যে ভাঙন প্রকট হয়ে ওঠে আরো। শুধু এই দুর্দিনে মা ও মেয়ে কাছাকাছি হয়, একা হয়ে যান কফিলউদ্দীন আহমদ। জমিজমা বিক্রি করতে থাকেন অভাবের তাড়নায়। তাঁর স্বভাবে দেখা দেয় এক নতুন উপসর্গ, হিংস্রতা। তাকে তাঁর গ্রামের বাড়িতে ফেলে রেখে শহরের পথে বেরিয়ে পড়ে মা ও মেয়ে। মা তাঁর এতদিনের যত্নে তুলে রাখা স্বর্ণালংকার একটা পুটলিতে বেঁধে নেন। ঢাকায় তিনি নতুন জীবন শুরু করবেন এই মূলধন নিয়ে।
ঢাকায় এলে তাঁর এতদিনের অতৃপ্ত জীবনতৃষ্ণা তাঁকে অতিশীঘ্র বদলে দেয়। রায়ের বাজারের ভাঙা বাড়ির চেহারা বদলে দেন তিনি। সংসারের হাল ধরেন শক্ত মুঠোয়। তাঁর এতদিনের গ্রাম্য চালচলন পিছনে ছুড়ে ফেলে তিনি হাইহিল জুতো পরে গটমট করে চলেন। তাঁর ইংরেজি শব্দের স্টকও বেড়ে যায়। কিন্তু তাঁর ব্যবসায় তাঁকে কেবলই ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। মা ও মেয়ের যৌথ টেইলারিংও এক ব্যর্থ উদ্যোগ হয়ে দাঁড়ায়। গহনা-বিক্রির টাকায় প্রথমদিকে তারা দুজনে একটু বিলাসিতার স্বাদ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু আবারও অভাবগ্রস্ত জীবন ফিরে আসে। একসময় মা হঠাৎ-ই ঘোষণা করেন, তিনি ফিরে যাবেন গ্রামের বাড়িতে, স্বামীর সংসারে, ছোট দুটি মেয়ের কাছে। এই অপয়া মেয়েকে নিয়ে আর কতোদিন? ভেবেছিলেন, ভাঙা জীবনকে আবার জোড়াতালি দিয়ে গড়বে মরিয়ম। কিন্তু সেদিকেও আশাব্যঞ্জক কিছু ঘটছে না। এমন অবস্থায় মায়ের গৃহত্যাগে মরিয়ম অসহায় বোধ করে।
মরিয়ম একান্তভাবে কামনা করে একজন পুরুষকে অবলম্বন করে সে আবার উঠে দাঁড়াবে। যখন আবেদের বন্ধু সুমনের সুবাদে পরিচিত আবেদ সামির তার জীবনে দেখা দেয় প্রেমিকের দাবি নিয়ে, এই চালচুলোহীন যুবকও তার উষ্ণ প্রশ্রয় পায়। আবেদ সামিরের চরিত্রে কবিতা ও ভীরুতার সহাবস্থান। মরিয়ম সত্যিই তাকে মশারিতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারতে পারে, মরিয়মের এই ঠাট্টাও সে বোঝে না। সে ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়।
কাহিনীটা ক্রমেই যেন মক্-ট্র্যাজেডির রূপ নিচ্ছে। মা তার নিজের সংসারে ফিরে গেছেন। আবেদ সামির পালিয়েছে। বঙ্গবন্ধু নিহত। আবেদ জাহাঙ্গীর এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে নিজের বিপদ গোনে। সে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় মরিয়মের বাড়িতে। তার আগমনে আবার মরিয়মের
সংসারে সচ্ছলতা দেখা দেয়। আবেদ খালি হাতে আসেনি, তার টাকায় মরিয়ম বেশ খুশি হয়ে বাজারে যায়, চাল-ডাল-তরকারি কেনে। মরিয়মের প্রতি তার অতীতের নির্দয়তার ক্ষতিপূরণ করে আবেদ, একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি জুটিয়ে দিয়ে। পরপর কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সিতে মরিয়ম চাকরি করে। এখানেই দেখা হয় তার দেবাশিষের সঙ্গে। দেবাশিষের বন্ধু চলে গেছে জার্মানিতে, সেও যাবে, ভিসার জন্য অপেক্ষা করছে। একদিন মাঝরাতে পাগলের মতো তার রায়ের বাজারের বাড়িতে দেবাশিষ এসে হাজির।
বিদেশে বন্ধুর বিয়ের খবরে দেবাশিষ ভেঙে পড়েছে। যে-ঘরে মন্টু বেঁচে থাকলে থাকতে পারত সেই ঘরে দেবাশিষ একা থাকতে ভয় পায়। তাকে শুতে দিতে হয় মরিয়মের নিজের ঘরে। তবে কোনো বিপত্তি ঘটাবার মানুষ নয় দেবাশিষ। নারীদেহে তার বিন্দুমাত্র আকর্ষণ নেই। তার আকর্ষণ পুরুষে। এতদিনে ব্যাপারটা বুঝতে পারে মরিয়ম।
যাই যাই করেও দেবাশিষের যাওয়া হয়ে ওঠে না। এদিকে প্রতিবেশীদের নজরে পড়েছে এই সমাজবিরোধী একত্রবাস। প্রতিবেশী হাজীর পুত্র সামাজিক রোষের মুখপাত্র হয়ে দলবল নিয়ে মরিয়মের বাড়িতে চড়াও হয়। সঙ্গে যোগ দেন মরিয়মের মামা, পক্ষাঘাতে পঙ্গু গোলাম মোস্তফা। নিজের ভাগিনীর এই অচেনা পুরুষের সঙ্গে ‘লিভিং টুগেদার’! সবাই এক জোট হয়ে দেবাশিষকে বাধ্য করে মরিয়মকে বিয়ে করতে। মরিয়ম যতোই বলে, দেবাশিষ তার ছোট ভাইয়ের মতো, কেউ তার কথায় কান দেয় না।
ভাগ্যের কী বিড়ম্বনা Ñ মরিয়মের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত যে-পুরুষটি জুটল, সে নপুংসক! দেবাশিষ পুরুষ হয়েও পুরুষ নয়, তাকে নিয়ে মরিয়ম করবে কী? বিয়ের নামে এই নির্দয় প্রবঞ্চনা। ইতিমধ্যে দেবাশিষের নতুন এক পুরুষবন্ধু জোটে, সে একটা চিঠি লিখে মরিয়মের কাছ থেকে বিদায় নেয়। একটাই অনুরোধ, মরিয়ম যেন তাদের খোঁজ না করে। ঘটনাটা ঘটে এরশাদের পদত্যাগের পরদিন।
‘দেশের প্রতিটা পটপরিবর্তনে মরিয়ম একটা ছেলে বন্ধুকে হারিয়েছে। এবারই সে প্রথম গর্ভবতী হয়নি। এর একটা কারণ হয়তো এই যে, মেরী প্রকারান্তরে মরিয়ম যখন বিবাহিত, তখন তার বাচ্চা হয় না, যখন বাচ্চা পেটে আসে, তখন সে বিবাহিত থাকে না। দেবাশিষ যে মেয়েলোকের সঙ্গে শোয় না Ñ তা এক্ষেত্রে উপলক্ষমাত্র।’
বীরাঙ্গনাদের নিয়ে গবেষণারত মুক্তি একের পর এক পতিতালয়ে ঘোরে। ঘোরে, যেহেতু সমাজকর্মী তাকে বলেছেন, যেসব বীরাঙ্গনার খোঁজ মিলছে না তাদের খোঁজ পাওয়া যাবে বারাঙ্গনাদের পাড়ায়। এভাবেই মুক্তি চলে যায় নারায়ণগঞ্জের টানবাজার পতিতালয়ে। সেখানে তখন চলেছে উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলন। মেয়েরা সব মারমুখী হয়ে আছে। মুক্তি কোনো বীরাঙ্গনার খোঁজ পায় না। সমাজকর্মী এবার তাকে পাঠিয়ে দেন দৌলতদিয়ায়। পদ্মাপাড়ের পতিতাপল্লি। সেখানে রাধারাণী আছে। বোন রাধারাণীর পাতানো কোনো কুসুমকলির দেখা মেলে। সে ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ করেছে। ‘চালের বস্তায় করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গ্রেনেড পাচার করতো সে।’ কিন্তু সে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা মনে করে না। যা করেছে, পেটের দায়ে করেছে, তার স্বীকারোক্তি। এখন সে পাড়মাতাল, টাকা-পয়সা যা পায়, মদ খেয়ে উড়িয়ে দেয়।
মরিয়ম চরিত্রটি একদিকে যেমন বাস্তব, অন্যদিকে আবার প্রতীকীও। স্বাধীন দেশে বীরাঙ্গনাদের নিয়ে তরল ভাবোচ্ছ্বাস, বাস্তব জীবনে তাদের নিয়ে প্রবঞ্চনা ও অপমান। যারা পেরেছে, অতীত-জীবন গোপন করে সংসার করছে। যারা তা পারেনি, তারা ভাসমান শ্যাওলার মতো জীবনযাপন করছে, Ñ পার্কের অন্ধকারে, বেশ্যাপল্লিতে। এনজিও কর্মীরা এখানকার মেয়েদের স্বাস্থ্যবিষয়ক সহায়তা করে। অনেকে সেটি গ্রহণ করে, অনেকে করে না। বারাঙ্গনাদের দলে ভিড়ে যাওয়া বীরাঙ্গনারা মরে গেলেও মুখ খুলবে না মুক্তির কাছে।
অনেকদিনের হারিয়ে যাওয়া টুকির দেখা পায় মরিয়ম ১৯৯২-এর ২৬ মার্চ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ২১ বছর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষণার দিন। মরিয়ম সেখানে গিয়েছে ছদ্মবেশী নায়িকার বেশে, চোখে কালো চশমা আর মাথার চুল উঁচু করে খোপা বাঁধা। ‘ভেবেছিল, আর কেউ না আসুক অনুরাধা আসবেই, যদি সে বেঁচে থাকে।’ সেখানেই দেখা হয় টুকির সঙ্গে।
টুকিকে নিয়ে বাড়িতে ফেরে মরিয়ম। টুকি আসায় বাড়িটা যেন প্রাণ ফিরে পায়। টুকি ঘরদোর সাফ করে, মুরগি পালে। অফিস থেকে ফেরার পর মরিয়মের কথা বলার মানুষ জুটেছে Ñ টুকি। তার একমাত্র দুঃখ কেউ জানতে পারল না যে সে একজন বীরাঙ্গনা। একটা গণআদালত টুকিকে উচ্চাকাক্সক্ষার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কুষ্টিয়ার তিনজন মহিলা গণআদালতে সাক্ষী দিয়ে গেল, টাকাও পেল, ঢাকায় বসে তারা কিছু জানল না, বুঝতে পারল না। ‘মেরী আফা, আমাদের মতো বীরাঙ্গনা এদেশে কয়জনা। … মরিয়ম ঘুমিয়ে পড়েছে। টুকি কথা বলে যাচ্ছে নিজের মনে। ‘এক সময় আরেকটা গণআদালতের স্বপ্ন নিয়ে টুকি ঘুমিয়ে পড়ে।’
জসিমুল হক, আবেদ জাহাঙ্গীর, রমিজ শেখ, মেজর ইশতিয়াক এক, মেজর ইশতিয়াক দুই, মমতাজ, আবেদ সামির, দেবাশিষ Ñ মরিয়মের জীবনে যতো পুরুষ এসেছে, এসেছে প্রতারকের বেশে বা ধর্ষকের বেশে। একমাত্র ব্যতিক্রম ওই গ্রাম্য গোঁয়ার রমিজ শেখ। এর মধ্যে দুজন, মমতাজ ও দেবাশিষ, তাকে বিয়ে করেছে বা করতে বাধ্য হয়েছে। একজন লাম্পট্য ও বর্বরতার চূড়ান্ত উদাহরণ, অন্যজন নপুংসক। দুজন তাকে ভালোবেসেছিল রমিজ শেখ ও মেজর ইশতিয়াক দুই। প্রথমজন আত্মাহুতি দেয় তার জন্য, দ্বিতীয়জন পরাজয়ের প্রাক্কালে প্রাণ নিয়ে পলায়ন করে। মরিয়ম স্বামী চেয়েছিল, সংসার চেয়েছিল, আর কিছু নয়। এর কিছুই সে পেল না, পেল বীরাঙ্গনার বিড়ম্বনা ও অপমান যে-বীরাঙ্গনা পরিচয় সে সাধ্যমতো গোপন করেছে। কোথায় গেল একাত্তরের বীরাঙ্গনারা? তারামন বিবিকে নিয়ে সবাই মাতে, তার পরিচয় সে মুক্তিযোদ্ধা।
মিলিটারির বন্দিশালায় নির্যাতনের সঙ্গিনী অনুরাধাকে মরিয়ম ভোলেনি, কাগজ-কলমহীন নগ্নতায় যে অ্যান ফ্র্যাঙ্কের মতো ডায়রি লিখে যেতে পারেনি। দৌলতদিয়ার পতিতালয়ে রাধারাণীই কি সেই হারিয়ে-যাওয়া অনুরাধা? একটা রহস্য জট পাকিয়ে থাকে। রাধারাণী খুন হয়েছিল, তার মৃতদেহ গোর পায়নি, পদ্মায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের এ উপন্যাসে মুক্তিযোদ্ধা কে? আছে একজন, মরিয়মের আদরের ভাই মন্টু। বেচারা মন্টু, বড়ো ভীতু ছিল, আবার সাহসীও। যুদ্ধের গৌরবগাথা নয়, যুদ্ধের অমানবিকতা, যুদ্ধের ক্ষয়-ক্ষতি, যুদ্ধের অসহায় শিকার Ñ নারী, এরই সাহিত্যিক দলিল হলো এই উপন্যাস, আমার ধারণায় এক কালজয়ী উপন্যাস। নিজের পয়সায় তৈরি স্বপ্নের নৌকায় টুকিকে নিয়ে মরিয়মের নিরুদ্দেশযাত্রা কিসের তালাশে? অনুরাধার? নাকি ব্যর্থ বিড়ম্বিত জীবনের শেষ কোথায়, তারই খোঁজে? এই পরাবাস্তব নৌ-যাত্রার মধ্য দিয়েই কাহিনীর ইতি টানেন শাহীন আখতার।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.