ভাবনা অর্থনীতির/
বিশ্বায়ন, উন্নয়ন ও অন্যান্য
সনৎকুমার সাহা
সাহিত্যিকা
ঢাকা, ২০০৩
১৮০ টাকা
সনৎকুমার সাহা তাঁর শেষ বই ভাবনা অর্থনীতির/ বিশ্বায়ন, উন্নয়ন ও অন্যান্য শুরু করেন রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রত্যাবর্তনের কথা জানানোর মধ্য দিয়ে। তিনি লেখেন, কীভাবে অ্যাডাম স্মিথ, রিকার্ডো, সিনিয়ার বা মিল্ থেকে শুরু করে কার্ল মার্কস রাজনৈতিক অর্থনীতিকে অনিবার্য ও পরিশীলিত করে তোলেন; কিন্তু তারপরই বিষয়টি অর্থনীতিবিদ মার্শালদের খপ্পরে পড়ে সতীসাধ্বী শুদ্ধ অর্থনীতি হয়ে উঠতে থাকে। বুদ্ধির খেলা ছাড়া এই শুদ্ধ অর্থনীতিকে আর কিছু তো বলা যায় না। সেই বুুদ্ধির খেলায় মগ্ন থাকা যায়, কিন্তু অর্থনীতির দায় ও বিপর্যয় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। আমরা কেউই তাই মুক্তি পাইনি আজ অবধি। মুক্তির অন্বেষায় তাই অর্থনীতি আবারও ফিরে আসছে রাজনৈতিক অর্থনীতির কাছে।
এ-বইয়ের মধ্য দিয়ে কেবল রাজনৈতিক অর্থনীতিই নয়, সনৎকুমার সাহাও প্রত্যাবর্তন করেন; সাহিত্যচিন্তা থেকে তিনি মুহূর্তের জন্যে হলেও ফিরে আসেন তাঁর অ্যাকাডেমিক পৃথিবীতে। সাহিত্য নিয়ে বিভিন্ন মননশীল প্রবন্ধ লেখার পাশাপাশি তিনি একজন অর্থনীতিবিদ। নিজের অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রকে তিনি কোন চোখে দেখেন এ-বই তারই প্রতিফলক। এর আগেও তাঁর দুটি বই বেরিয়েছে। কিন্তু সে-দুটি বইয়ের মূল প্রতিপাদ্য সাহিত্য। আমাদের পাঠকরা তাঁকে সাহিত্যিক হিসেবেই বেশি জানেন, চেনেন। কারণ তাঁর অর্থনৈতিক ভাষ্য সংবাদপত্রের বাজেট-প্রতিক্রিয়ার মতো সহজলভ্য নয়। আমাদের যেসব অর্থনীতিবিদ বাজেট-প্রতিক্রিয়া জানানোর মধ্য দিয়ে জনগণের কাছে বেশ পরিচিত, সনৎকুমার সাহা সেই দলের অর্থনীতিবিদ নন। আবার তিনি রাশিয়াতেও লেখাপড়া করেননি যে, কেউ তাঁকে ‘রাশিয়া থেকে পড়ে এসে তারা ঘরে বসে লিখে দেন’ বলে উড়িয়ে দেবেন! একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামের শুরু থেকে
যে-কজন অর্থনীতিবিদ আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজকে অর্থনৈতিক সাম্য দেওয়ার জন্যে, পরিকল্পিত অর্থনীতি বিকশিত করার জন্যে একাগ্র হয়ে কাজ করেছেন তিনি তাঁদেরই একজন।
বাংলাদেশের অন্যান্য অর্থনীতিবিদের সঙ্গে আমাদের প্রসঙ্গক্রমে সনৎকুমার সাহাই পরিচয় করিয়ে দেন বইয়ের প্রথম লেখাটির মাধ্যমে। সেইসূত্রে আমরা তাঁর অর্থনীতির স্কুলিং সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা পাই। এ-লেখায় বাংলাদেশের অর্থনীতিচর্চা সম্পর্কে তিনি জানান যে, ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে এ-দেশের মেধাবী অর্থনীতিবিদরা শিক্ষা নিয়েছেন প্রধানত পাশ্চাত্যের নিও-ক্লাসিক্যাল স্কুলে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে অর্থনীতিবিদ মার্শাল লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত বই প্রিন্সিপ্ল্স্ অফ ইকোনমিক্স্ (১৮৯০)। এ-বইয়ের মধ্য দিয়েই অর্থনীতি আর সব বিষয়-আশয় বাদ দিয়ে নিজস্ব অ্যাকাডেমিক বৃত্তে বন্দি হয়। ক্লাসিক্যাল অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও চিন্তাকে টপকে সবার সামনে চলে আসে নিও-ক্লাসিক্যাল যুক্তিকাঠামো। নিও-ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদরা সার্বিক ভারসাম্যের ধারণা দেওয়ার জন্যে ভর করেন বাজারের প্রতিটি কাজকর্ম এবং সেসবের উপসংহারের সর্বোত্তম অবস্থার তাত্ত্বিক বুনিয়াদের ওপর। বাংলাদেশের মেধাবী অর্থনীতিবিদরা অর্থনীতির শিক্ষা অর্জন করেছেন এই ঘরানায়। ফলে ‘তাঁরা নিও-ক্লাসিক্যাল পদ্ধতি-প্রকরণের দক্ষ কারিগর হয়েছেন, কিন্তু সেই পরিমাণেই হয়েছেন সমাজ ও জীবন-বিচ্ছিন্ন। আর নিও-ক্লাসিক্যাল পদ্ধতি-প্রকরণ যতই উচ্চতর গণিত ও পরিসংখ্যান-নির্ভর হোক না কেন, আমরা দেখেছি, বাস্তবতাকে সঠিকভাবে ধরবার ক্ষমতা তার নিতান্তই সামান্য। ফলে এসব নামী-দামি অর্থনীতিবিদ হয়ে পড়েছেন সম্পূর্ণত পেশাজীবী। সমাজ-অর্থনীতির সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে নীতিনির্ধারণে বা বৌদ্ধিক নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতায় তাঁরা পিছিয়ে পড়েছেন।’ (রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রত্যাবর্তন, পৃ. ২৩) ‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ’ প্রবন্ধে দেখতে পাই তিনি চোখ ঘুরিয়েছেন পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে, যখন আমাদের দেশে পড়ার বিষয় হিসেবে অর্থনীতি ছিল প্রবল সম্মানের শৃঙ্খলা। প্রসঙ্গক্রমে তিনি উল্লেখ করেছেন সে-সময়ের মেধাবী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মির্জা নূরুল হুদা, নূরুল ইসলাম, রেহমান সোবহান, মুশাররফ হোসেন, মোজাফফর আহমদ, আনিসুর রহমান প্রমুখের কথা। সেই ‘দুই অর্থনীতির বিতর্কের যুগে’র কথা স্মরণ করে তিনি লিখেছেন, ‘সব অর্থনীতিবিদই বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন না, অবিভক্ত পাকিস্তান চান এমন অর্থনীতিবিদের সংখ্যাও একেবারে কম ছিল না। ‘কিন্তু অর্থনীতির বিবেককে তাঁরা জলাঞ্জলি দেননি। বিদ্যাচর্চার সামাজিক মাত্রা ও দায়বোধকে উপেক্ষা করেননি। এই মনোভাব তাঁদের পঠন-পাঠনে ছড়িয়েছে। সবাই অনুপ্রাণিত হয়েছে।’ (অর্থনীতির ভবিষ্যৎ, পৃ. ২৩২)
অতএব নির্দ্বিধায় লেখা যায়, তাঁর আশেপাশের অ্যাকাডেমিশিয়ানদের সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি সচেতন, সেই সঙ্গে সচেতন নিজের অবস্থান সম্পর্কে। অর্থনীতি নিয়ে এ-ধরনের লেখা তিনি লিখছেন অনেক আগে থেকেই। তবে সেসব নিয়ে ‘পেশাজীবী’ হওয়ার প্রবৃত্তি নেই বলেই হয়তো কখনো লেখাগুলো গ্রন্থিত হয়নি। তাঁর সাহিত্যসংক্রান্ত লেখাগুলো বই-আকারে ছাপার উদ্যোক্তা কমলকান্তি দাস আর আনিসুজ্জামান মানিক এই উদ্যোগ নিয়েছেন এবং বইটি ছাপিয়েছেন। প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেছে সনৎকুমার সাহার ভাবনা অর্থনীতির/ বিশ্বায়ন, উন্নয়ন ও অন্যান্য বই বেরুনোর পর। একুশের বইমেলার আস্বাদ এই বই নিতে পারেনি; বোধহয় সে-কারণে এখনো অনালোচিত। সনৎকুমার সাহার মতো অর্থনীতিবিদ এই প্রথম তাঁর অর্থনীতিবিষয়ক লেখা গ্রন্থবদ্ধ করেছেন বলেই যে এ-বইটি গুরুত্বপূর্ণ সে-রকম নয়, এর বিষয়-আশয়ই বইটির গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার দাবি জানায়। এগুলো তিনি লিখেছেন ১৯৭৭ সাল থেকে ২০০২-এর ভেতর। এই দীর্ঘ ২৫ বছরে বিশ্ব-অর্থনীতি অনেক চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়েছে। বইটির নামেও এর ছাপ পড়েছে। ভূমিকায় তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, একেবারে শুরুর দিকে ১৯৭৭-এর একটি লেখায় সমাজতন্ত্রের প্রতি ‘শিশুসুলভ সরল প্রশ্নহীন আস্থা ফুটে উঠেছে’। শেষের দিকের লেখাগুলোয় সেই আস্থা আর থাকেনি, কিন্তু সমাজতন্ত্রের আদর্শগত প্রণোদনাও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সব মিলিয়ে বলা যায়, এ-বই অর্থনীতির দোলাচলের মধ্যে দাঁড়ানো এক অর্থনীতিবিদের আত্মজিজ্ঞাসার প্রতিচ্ছবি।
এই আত্মজিজ্ঞাসার অর্থ অবশ্য আত্মসংকটের মুখোমুখি হওয়া নয়। কেননা দ্বান্দ্বিকতা-প্রসঙ্গে তিনি নির্মোহ, সচেতন এবং সেজন্যেই দেখতে পান যে, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরেই গড়ে-ওঠা দ্বান্দ্বিকতা বিভিন্ন স্বার্থের বিভিন্ন বিন্যাস থেকে শক্তি পেয়ে এগিয়ে যায় পতনের দিকে, পুরানোকে সে খারিজ করতে পারে না, বরং তার নতুন অবতার হয়ে-ওঠার মধ্য দিয়ে সে ধসে যাওয়ার ভিত্তি গড়ে। তবে আগের হোক আর পরের হোক, সনৎকুমার সাহার বিভিন্ন লেখার মূল প্রতিপাদ্য বাজার-ব্যবস্থা। বাজার-ব্যবস্থার নানা বিকৃতি তুলে ধরেন তিনি। বাজার-ব্যবস্থাকে তিনি কখনো ইতিবাচক মনে করেননি। লিখেছেন তাই, বাজারের বিশ্বজয়ের মধ্য দিয়ে তার শ্রেষ্ঠত্ব আদৌ প্রমাণিত হয় না। কিন্তু একই সঙ্গে সার্বিক অর্থনৈতিক সঞ্চালন-প্রক্রিয়ায় বাজারের প্রয়োজনীয়তার কথা এমনকি ভবিষ্যতের জন্যেও মেনে নিয়েছেন। তারপর প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এই মেনে নেওয়াতে সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক নির্মাণ কি খণ্ডিত হয়? নাকি তার সহযোগীও হতে পারে? প্রথমটিতে যাদের পরিপূর্ণ বিশ্বাস, তাদের কাছে দ্বিতীয়টি স্ব-বিরোধের পর্যায়ে পড়ে। এমন অভিযোগের কথা ও আশংকা মাথায় রেখেই এই সংকলনে হাত দিই; যদিও বাজারের একচ্ছত্র আধিপত্যে যে আমার সায় নেই, এ-কথাটিও অসংকোচে জানিয়ে রাখি।’ (প্রারম্ভিক কথা)
শুরুতেই লিখেছি, সনৎকুমার সাহা তাঁর এ-বইয়ের প্রথম লেখাতেই রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রত্যাবর্তনের কথা ঘোষণা করেন। নির্দ্বিধায় বলা যায়, তাঁর এ-ঘোষণাই এ-বইয়ের সারবস্তু। বোধকরি অর্থনীতিবিদ হিসেবে তাঁর মৌলিকত্বও আমরা খুঁজে পাই এ-ঘোষণা থেকে। তিনি তাঁর লেখায় প্রচল প্রসঙ্গ নিয়ে বাকপটুতা দেখাতে বসেননি, লেখাগুলো তাই সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রসঙ্গের তাৎক্ষণিক ভাবনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি অর্থনীতির প্রথম সংহিতার লেখক অ্যাডাম স্মিথের (১৭২৩-৯০) মৌলিকত্বের স্বীকৃতি দেন বলে মনে হয়। তবে পাশাপাশি আমাদের এও জানান, শ্যুমপিটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিবিদ থেকে অনেকেই স্মিথের মৌলিকত্ব মেনে নিতে নারাজ। কিন্তু সনৎকুমার সাহা জানান, অর্থনীতিশাস্ত্রবিদ্যার নির্মাণের মালমশলার খুব সামান্যই অ্যাডাম স্মিথের হলেও মূল কাঠামো সুসমন্বিত আকারে গড়ে তোলার কৃতিত্ব তাঁকেই দিতে হবে। এর একটি কারণ বোধকরি এই যে, অ্যাডাম স্মিথ ‘বাজার অর্থনীতির মূল ধারণাকে নৈর্ব্যক্তিক যুক্তিশৃঙ্খলায় প্রতিষ্ঠা’ করেছিলেন। আরেকটি কারণ, স্মিথের রাজনৈতিক অর্থনীতিচর্চা ও অনুশীলনের ওপর বিশেষ দুর্বলতা। এই দুর্বলতার কারণেই স্মিথের মহৎ ও বড় বই অ্যান এনকোয়ারি ইনটু দ্য নেচার অ্যান্ড কজেস অব দ্য ওয়েলথ অব নেশনস বইয়ে অর্থনীতি শব্দই খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সনৎকুমার সাহা লিখছেন যে, ‘তিনি তাকে যদি ‘ইকোনমিক্স্’ বলে পরিচিত না করে থাকেন, তবে তা তাঁর সজ্ঞান অনুধাবনেরই ফল’। নিও-ক্লাসিক্যাল যুক্তিকাঠামোর অকার্যকরতা সনৎকুমার বুঝতে পারেন স্রাফা, জোন রবিনসন্ ও এডওয়ার্ড চেম্বারলিনের তীক্ষè তাত্ত্বিক আলোচনা থেকে। এ-প্রসঙ্গে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন স্রাফার বিখ্যাত বই প্রোডাক্শন অফ কমোডিটিজ বাই মিন্স্ অফ কমোটিডিটের কথা। স্রাফা আগেও বলেছেন, ‘উৎপাদনে বহিঃসূত্রে ব্যয় কমানোর কারণে পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একটি শিল্পে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় আর সব শিল্পেও ভারসাম্যে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।’ নতুন এ-বইটিতে স্রাফা এ-ধারণার পাশাপাশি আরো জুড়ে দেন সহ-উৎপাদন, পুঁজি পরিমাপ ও উৎপাদন-পদ্ধতির সঙ্গে পুুঁজি-পরিবর্তনের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক প্রশ্ন। (মূল্য ও দাম বিষয়ক বিবেচনা; পৃ. ৪০) কেবল এঁরাই নন, চল্লিশের দশক থেকে সত্তরের দশক অবধি কাঠামোবাদী অর্থনীতিবিদ প্রেবিশ, ফুতার্দো, সিঙ্গার, সীআর্স প্রমুখ এবং নব্য মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ পল বরন, আদ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্ক, সামীর আমিন, ইমানুয়েল প্রমুখ নিও-ক্লাসিকাল তত্ত্বের অসারতা তুলে ধরেন। এইসব যুক্তির তোড়ে নিও-ক্লাসিক্যাল তত্ত্বের জগৎ ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে, যদিও বিশ্বপুঁজিবাদ সেই তত্ত্বকেই মহিমান্বিত করে, বিভিন্নভাবে বাঁচিয়ে রাখে।
দুই
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনীতিশাস্ত্রের এইসব তাত্ত্বিক আলোচনার সূত্রপাত ঘটানোর মধ্য দিয়ে আমাদের অর্থনীতিবিদদের মধ্যে (প্রয়াত আবু মাহমুদ কিংবা আখলাকুর রহমান প্রমুখকে বাদ দিলে) সম্ভবত সনৎকুমার সাহাই প্রথম জনগণের সামনে তাঁর নিজের তাত্ত্বিক অবস্থানটি তুলে ধরলেন। স্পষ্টভাবে ঘোষণা করলেন যে, তিনি নিও-ক্লাসিক্যাল ধারার অর্থনীতি চর্চা করেন না। তাঁর এই ঘোষণা মেঠো বক্তৃতা নয়। আমাদের অনেক অর্থনীতিবিদই এখন মেঠো বক্তৃতা দিতে শুরু করেছেন এবং ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ জাতীয় কথাবার্তা বলে আসলে তলে তলে নিও-ক্লাসিক্যাল অর্থনীতি চর্চা করে চলেছেন। তাছাড়া তাঁদের অনেকেই চেষ্টা করছেন ‘ক্যারিশম্যাটিক পাবলিক ফিগার’ হয়ে ওঠার। আর তাই অর্থনীতি নিয়ে এখানে তাত্ত্বিক কোনো আলোচনা বা বিতর্ক আর আমাদের চোখে পড়ে না। সনৎকুমার সাহার এ-বইয়ের বিভিন্ন প্রবন্ধ লেখার সমসময়ে আমাদের পাঠের জগতে হাতে গোনা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই ছাপা হয়েছে, যাতে বিশ্ব-অর্থনীতির গতিমুখসংক্রান্ত বিভিন্ন তাত্ত্বিক মন্তব্য করা হয়েছে।
এ-প্রসঙ্গে জাপানি বংশোদ্ভূত মার্কিন চিন্তাবিদ ফুকুয়ামার দি এন্ড অফ হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান, বিশ্বব্যাংকের প্রাক্তন মুখ্য অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজের গ্লোবালাইজেশন অ্যান্ড ইটস ডিসকন্টেন্ট কিংবা দি রোরিং নাইনটিস আর অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নেইল ফারগুসনের এমপায়ারের নাম বিশেষভাবে মনে পড়ছে। সনৎকুমার সাহার এ-বইয়ে প্রসঙ্গক্রমে দুবার ফুকুয়ামার বইটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মার্কসকে নিও-ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদরা একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। যদিও তাঁরা পারতপক্ষে তা জানাতেও চান না। কিন্তু বিভিন্ন তত্ত্ব ও মন্তব্যের ঘোরপ্যাঁচে তাঁদের মনোভাব ঠিকই বেরিয়ে আসে। মার্কস সম্পর্কে এঁদের ঘোরতর আপত্তির কারণ, মার্কস উৎপাদনকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখতে রাজি নন। তিনি উৎপাদনকে সমাজবিকাশের সার্বিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রভূমিতে যুক্ত করে বরং অর্থনীতির জগৎই সম্প্রসারিত করেছিলেন। নতুন এ-সব বইতে দেখতে পাই, পুঁজিবাদী বাজারকে নতুন বাস্তবতায় দেখা হচ্ছে, মার্কসের মতোই সমাজবিকাশের সার্বিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রভূমিতে স্থাপন করা হচ্ছে। যদিও নিও-ক্লাসিক্ল্যাল তাত্ত্বিক আর এঁদের মূল লক্ষ্য একই। নেইল ফারগুসন তাঁর এমপায়ার বইতে দেখিয়েছেন কীভাবে ব্রিটেন আজকের এই আধুনিক বিশ্বকে গড়ে তুলেছে, অর্থনীতির সংস্কৃতি দিয়ে বিশ্বায়নের বুনিয়াদ তৈরি করেছে। আর জোসেফ স্টিগলিজের কথা তো এখন সবাই জানেন। ব্রিটেনের অন্যতম দৈনিক সংবাদপত্র ইনডিপেনডেন্টের মতে, তিনি হলেন সেই শিশু যিনি কণ্ঠ উঁচিয়ে বলে ফেলেছেন আইএমএফ সাম্রাজ্যের সম্রাটের পরনে কাপড় নেই। নিউ স্টেট্সম্যান পত্রিকার মতে, যারা তৃতীয় ধারায় চিন্তা করতে চান তারা কেইনসের চেয়ে স্টিগলিজের কাছ থেকে অনেক বেশি অনুপ্রেরণা পাবেন। এবং কেইনসিয় হওয়ার চেয়ে স্টিগলিজিয় হওয়ার মধ্য দিয়েই বরং অর্থনীতিকে নতুন করে ঢেলে সাজানো সম্ভব। এ-কথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে, কেইনসিয় অর্থনীতির ফাঁকফোকর থেকেই নিওক্লাসিক্যাল অর্থনীতির জয়ধ্বনি উঠেছিল, যদিও তাতে সমস্যা দূর হয়নি, বরং আরো জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছে অর্থনীতি। এখন যেহেতু কেইনসের বিকল্প পাওয়া গেছে তখন কী দরকার গাণিতিক অর্থনীতিতে আবদ্ধ থাকার? তাই বিশ্বপুঁজিবাদের নিয়ন্তারাও রাজনৈতিক অর্থনীতিতে
ফিরে আসছেন। সনৎকুমার
সাহা কখনো স্টিগলিজের বইগুলো নিয়ে আলোচনা করলে আমরা বিশেষভাবে উপকৃত হবো।
স্টিগলিজ আমাদের এক ঘোরের মধ্যে ফেলে দেন। কেননা তিনি যখন লেখেন ইকোনমিয়া আমেরিকানা তখন অসতর্ক ও উদ্দীপিত আমরা উত্তেজনার বশে ভেবে বসি, নতুন কোনো পথ খুঁজে পাব আমরা। কিন্তু হায়, দেখা যায় তিনিও প্রকৃতার্থে খুবই ব্যস্ত বাজারকে আরো কার্যকর করে তোলার কাজে। তিনিও সামাজিক ন্যায়বিচার-প্রতিষ্ঠার স্বার্থে খুঁজে ফিরছেন বাজার আর রাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার পথ। তিনি বিশ্বায়নের সমালোচনা করেছেন, কিন্তু মৌলিক অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
অর্থনীতিসংক্রান্ত আলোচনায় বাজার-প্রসঙ্গ বারবার উত্থাপিত হবে, এটি খুবই স্বাভাবিক। তবে সনৎকুমার সাহার বই পড়তে গিয়ে অনেকের কাছে তা পুনরাবৃত্তি মনে হতে পারে। কেননা আলাদাভাবে একেকটি প্রবন্ধ লেখার সময় সেটির অখণ্ডতাই তাঁর কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। মনে হয় তিনি এগুলো কোনো একদিন একই মলাটের বইয়ের মধ্যে সংকলিত করার ব্যাপারে সচেতন ছিলেন না। বাজার-ব্যবস্থার সমূহ বিকার তিনি তুলে ধরেছেন। বিশ্বব্যাংক বা বিভিন্ন দাতা-সংস্থার কথা একটিই – উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে হলে উদার বাজার-অর্থনীতি চর্চা করতে হবে। বাজারকে উদার করতে পেরেছিল বলেই সাফল্য পেয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল আর চিলি, এশিয়ার দেশ দক্ষিণ কোরিয়া, – এ-রকমই ভাষ্য তাদের। কিন্তু সনৎকুমার সাহা আলোচনা করেন, ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি-অর্জনের পরিস্থিতি গড়ে তোলার জন্যে এসব দেশের সমাজকে কতটা মূল্য দিতে হয়েছে। (সক্ষমতা ও উন্নয়ন; পৃ. ৮৩-৮৬) তিনি লেখেন, বাজারের উৎপাদনকর্ম লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় কেবল বিত্তবান শ্রেণির কথা মনে রেখেই পরিচালনা করা হয়েছে। এদের প্রান্তিক ভোগপ্রবণতা ভারসাম্যমূলক অবস্থায় রাখার জন্যে প্রতিনিয়ত বাইরের বাজার খুঁজতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণগ্রস্ত দেশ হিসেবে ব্রাজিল সুপরিচিত। সবচেয়ে
বড় কথা, ব্রাজিল ভয়াবহ আয়-বৈষম্যে আক্রান্ত। চিলিতেও রয়েছে ব্রাজিলের মতোই তীব্র
আয়-বৈষম্য। মেক্সিকোর উন্নয়নের গৌরবও ধুলায় গড়িয়ে পড়েছে মুদ্রাবাজারের এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজার-ব্যবস্থা নিও-ক্লাসিক্যাল ধারণায় গড়ে ওঠেনি। ব্যক্তির উদ্যোগ এ-বাজারকে বিকশিত করেনি, করেছে কঠোর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। ব্যক্তিমালিকানা এই রাষ্ট্রের বাজার-ব্যবস্থার জন্যে অপরিহার্য নয়। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ছিল দক্ষিণ কোরিয়া সুবিধাজনক অবস্থানে। সনৎকুমার সাহা তাই দক্ষিণ কোরিয়াকে বাজার-অর্থনীতির ‘নির্ভেজাল রূপকার’ হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। চীনের বাজার-ব্যবস্থা সম্পর্কে সনৎকুমার সাহা অবশ্য কোনো আলোচনা করেননি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন আলোচনা ও গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে, মুক্ত বাজারমুখী সমাজতান্ত্রিক চীনে প্রচুর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও সেখানকার মানুষ বৈষম্য ও বঞ্চনার দিকে অভিযাত্রা শুরু করেছে। (এ-ব্যাপারে সামান্য কিছু তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাবে দি ইকোনমিস্টের আগস্ট ২১-২৭, ২০০৪ সংখ্যায় )
কিন্তু এই মুক্ত বাজার-অর্থনীতিকেই আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকরা, কী বিএনপি আমলে কী আওয়ামী লীগ আমলে, উন্নয়নের পথ হিসেবে ধরে নিয়েছেন। অনেকদিন থেকেই বাংলাদেশে একটি অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে (এই তাত্ত্বিক কাঠামো সম্প্রতি রাজনৈতিকভাবেও প্রতিষ্ঠা করার কাজ শুরু হয়েছে)। এই তাত্ত্বিক কাঠামোয় দেখা যাচ্ছে, যেসব দেশ বিশ্ববাজারের অনুগত থাকে তাদেরই কেবল উন্নয়ন ঘটে; আর যারা বাজারকে উপেক্ষা করে তারা ক্রমাগত পরিণত হয় অকার্যকর ব্যর্থ রাষ্ট্রে। আমাদের পরিকল্পনাবিদরা এই মুক্ত বাজারের ঘোরে পড়েছেন অনেক আগেই। øায়ুযুদ্ধের কাল যতদিন ছিল ততদিন তাঁরা পররাষ্ট্রনীতির পরাকাষ্ঠা দেখাতে গিয়ে এই ঘোরকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সোভিয়েত মডেলের সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনের পর সবাই খোলা বাজারের জয়গান গাইতে শুরু করেছেন উদোম হয়ে দুবাহু তুলে। বাংলাদেশের কাঠামোগত সংস্কারের মধ্যে এর প্রকাশ ঘটতে থাকে। এই সংস্কারের পথে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বেঘোর এতই প্রবল হয়ে ওঠে যে, বাংলাদেশ ১৯৯৪ সালে ডব্লিউটিওতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ভরতুকি, পরিপোষণমূল্য, শুল্কহার-নির্ধারণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে পাওয়া ছাড়ও পুরোপুরি নেয়নি। শুধুমাত্র বিশ্বব্যাংক আর আইএমএফের ওপর গভীর আস্থা দেখানোর জন্যেই সরকার এ-কাজ করে। এইভাবে বাংলাদেশ প্রবেশ করে বিশ্বায়নের খোলা প্রান্তরে। বলা হয়, বাংলাদেশ বিশ্ব-অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে।
বিশ্বায়ন আর বিশ্ব-অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে লিখতে গিয়ে সনৎকুমার এমন অনেক মন্তব্য করেছেন, যা আমাদের অনেক সাধারণ ধারণা পরিবর্তন করে ফেলে। তিনি লেখেন, ‘বিশ্বায়ন কোনো নতুন বাস্তবতা নয়, যা নতুন – না নতুন নয়, যা আজ প্রধান নিয়ন্তা, তা হলো খোলা বাজারের অপ্রতিহত দাপট ও পণ্যমোহবশ্যতার অবাধ
বিস্তার।’ (বিশ্বায়ন, উন্নয়ন ও বাংলাদেশ, পৃ. ১২০) নেইল ফারগুসনের এমপায়ারে আমরা দেখি, সেই পুরানো বিশ্বায়নের ধারাবাহিক আলোচনা; যে-আলোচনাশেষে তিনি চাপা দম্ভের সঙ্গে (হাজার হলেও অ্যাকাডেমিশিয়ান, খোলাখুলি তো আর দম্ভ দেখাতে পারেন না!) মন্তব্য করেন যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যদি গড়ে না উঠত তাহলে আজকে পৃথিবীর দেশে দেশে কি আর এই সংসদীয় গণতন্ত্রের বিস্তার ঘটত?
ঘুরে-ফিরে তিনি বলার চেষ্টা করেন, ব্রিটিশ মডেলের এই গণতন্ত্র, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতও অনুসরণ করে, বিশ্বায়নের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করে গেছে। অবশ্য শেষমেষ ফারগুসনকে লিখতেই হয় যে, পৃথিবীতে নতুন সম্রাটের আবির্ভাব ঘটেছে এবং সেই সম্রাট হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (পৃ. ৩৭৭) সম্প্রতি বাজারে একটি বইও এসেছে নিউ এমপায়ার নামে।
বিশ্বপুঁজিবাদের এই ধারাবাহিক চড়াই-উতরাই নেড়েচেড়ে আমরা সংক্ষেপে একটি কথাই বলতে পারি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিশ্বায়নের যে-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত রচনা করেছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত রচনা ও কার্যকর করে চলেছে। তবে, লেখাই বাহুল্য, বিশ্বায়নের কোনো দার্শনিক পরিপ্রেক্ষিত এখনো আমরা খুঁজে পাইনি। পুঁজিবাদ যখন অভিযাত্রা শুরু করে তখন ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব তার অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত, ফ্রান্সের বাস্তিল দুর্গের পতন রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত, আর জার্মানির ‘চিন্তা আগে না বস্তু আগে’র বিতর্ক দার্শনিক পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করে দেয়। কিন্তু বিশ্বায়ন তার সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিত অর্জন করতে শুরুতেই ব্যর্থ হয়েছে। তবু সেই খণ্ডিত চরিত্রের প্রক্রিয়াটি নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকদের আগ্রহের কমতি নেই। এই আগ্রহ এত বেশি যে, তাঁদের অনেকে স্পষ্টভাবেই বলেন, এতদিন বিশ্ব-অর্থনীতিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় উপেক্ষা করা হয়েছে। আশির দশক পর্যন্ত বাংলাদেশে রপ্তানিমুখী উন্নয়ন প্রাধান্য পায়নি ঠিকই, কিন্তু তাই বলে অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বিশ্ব-অর্থনীতিকে উপেক্ষা করা হয়েছে এ-কথা মেনে নিতে নারাজ সনৎকুমার। দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তির আওতায় বহুমুখী ভারসাম্যের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উদ্দেশ্যকে বিশ্ববাজারে আমাদের ক্রমবর্ধমান কেনা-বেচার প্রসঙ্গে তুলে ধরেন তিনি। এসব মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি রাজনীতিনিরপেক্ষ থাকেননি; যদিও রাজনৈতিক দলনিরপেক্ষতা ভীষণ প্রবল তাঁর আলোচনায়। কোন পরিস্থিতিতে স্বাধীনতার পর সরকারকেই উন্নয়নের পুরোধা করা হয়েছিল আর কখনোই বা সেই নীতি পালটে যেতে থাকে, তাও সংক্ষেপে তুলে ধরেন তিনি। রাজনৈতিক অমিল যতই থাক, এই পালটে ফেলার ব্যাপারে যে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি অলিখিত আঁতাত ছিল, তা চিন্তা করতে মোটেও কষ্ট হয় না আমাদের তাঁর লেখা পড়ে। সত্তরের দশকেই নীতি পালটে যেতে থাকে। স্থানীয় ও বিদেশী উদ্যোক্তারা স্বাধীনভাবে
শিল্প-স্থাপনার অনুমতি পায় ১৯৭৪-এই। ১৯৭৫-এর পর এ-ব্যাপারে আর রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক দায়বদ্ধতাও থাকে না। এবং ১৯৭৮-এ বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমাও তুলে নেওয়া হয়। অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট অপরিহার্য কয়েকটি খাতে সরকারি উদ্যোগকে সীমিত করা হয়। এরপর যা ঘটেছে তা জানার জন্যে আমাদের অর্থমন্ত্রীর মুখ দেখাই যথেষ্ট।
বাজার নয়, পরিকল্পিত অর্থনীতিকেই যারা বাংলাদেশের উন্নয়নের সোপান মনে করেছিলেন, তারা কি তাহলে ভুল করেছিলেন? না, সে-রকম মনে করার কোনো কারণ নেই। সত্তরের আগে দুদশক ধরে পরিকল্পিত অর্থনীতিই উপনিবেশ-উত্তর বিভিন্ন দেশে আমদানিবিকল্প উৎপাদনমুখী পরিকল্পিত উন্নয়ন-কৌশলের মাধ্যমে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করেছে। নিওক্লাসিক্যালরা নিজেদের সঠিক বলে দাবি করার সুযোগ পেয়ে গেছেন এ-কারণে যে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরকারি খাত হয়ে উঠেছিল জাতীয় অর্থনীতির সাদা হাতি। অদক্ষতা, অপচয় আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মিশ্রণে গলগলিয়ে উপচে-পড়া দুর্নীতি অনিয়মের কারণে বিভিন্ন অর্থনৈতিক উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্যই হয়ে পড়ে উদ্বৃত্ত শোষণ। তাই নিওক্লাসিক্যাল তত্ত্ব নয় বরং দেশে সুশাসনের অভাব, গণতন্ত্রের সংকট, তীব্র দুর্নীতি, অনিয়ম, আইনের শাসন না থাকা ইত্যাদিই অর্থনৈতিক স্থবিরতার মূল কারণ দাবি করার একটি যৌক্তিক ভিত্তি তৈরি হয়ে যায়। তাই নৈতিক কারণেই সংকটের প্রকৃত উৎস জানার পরও রাষ্ট্র ও সরকারের তখন আর ডব্লিউটিও, বিশ্বব্যাংক কিংবা আইএমএফের মন্তব্যের প্রতিবাদ করার শক্তি থাকে না। কিন্তু সনৎকুমার সাহা একটি নৈতিক অবস্থানে থেকেই সে-প্রশ্নগুলো তুলে আনেন। তিনি লেখেন, ‘রপ্তানিমুখী উৎপাদনের বৃত্ত কতটুকু হবে, কর্মসংস্থান ও আয়সৃষ্টি সমাজের ভেতর কতদূর ছড়াবে, তাদের কর্তৃত্ব থাকবে কার হাতে, কার স্বার্থে লাভের গুড় কে খাবে, কোথায় খাবে, এ-প্রশ্নগুলো তাৎক্ষণিক উজ্জ্বল উদ্ধারের মোহিনী মায়ায় অনুন্নত দেশসমূহের অধিকাংশ কর্তাব্যক্তিকে ভুলিয়ে রাখে। তবু কিন্তু কথাগুলো উবে যায় না।’ (বিশ্বায়ন, উন্নয়ন ও বাংলাদেশ, পৃ. ১৩০) তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘বাজারই একমাত্র নিয়ন্তা, অর্থনীতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য আর কিছুই কি বিবেচনায় আনতে নেই (পূর্বোক্ত)?’
এই বাজারের বিকৃতি যে আমাদের কতভাবে ভুলিয়ে রেখেছে তা ধরা পড়ে অর্থনীতির তলদেশ দেখলে। তথাকথিত রপ্তানিমুখী কৌশলের জয়জয়কার এখন। রপ্তানি-আয় বাড়ার হার ক্রমাগত বাড়ছে, জাতীয়
অভ্যন্তরীণ উৎপাদনেও তার অবস্থান ইতিবাচক। অর্থনীতির ওপরও এর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা। অথচ তা মোটেও পড়ছে না। রপ্তানিমুখী উৎপাদন বিভিন্ন ধরনের
সুযোগ-সুবিধা পেলেও
বাণিজ্য-ঘাটতি থেকে যাচ্ছে একইরকম। যে-পোশাকশিল্প নিয়ে আমরা গর্ব করি সেই শিল্পের অসারতাও তুলে ধরেন সনৎকুমার সাহা। তিনি দেখান যে, তৈরি পোশাক থেকে অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন অর্জিত আয়ের শতকরা ২০ ভাগের বেশি নয়। নারীশ্রম নিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করলেও আয়সৃষ্টির ক্ষেত্রে এর ভূমিকা খুবই দুর্বল। জাতীয় উৎপাদনের শতকরা সাত ভাগের বেশি এই তৈরি পোশাক থেকে এলেও কর্মসংস্থান মোটেও আশাপ্রদ নয়, মোট কর্মক্ষম শ্রমের মাত্র শতকরা ৩ ভাগেরও কম। (ঐ, পৃ. ১৩৫) রপ্তানিমুখী আরেকটি খাত হিমায়িত খাদ্যের ব্যাপারেও তাঁর ধারণা উল্লেখ করার মতো। তাঁর মতে, ‘নিওক্ল্যাসিক্যাল তাত্ত্বিক কাঠামোয় একই বাজারব্যবস্থার অসংখ্য
শাখা-প্রশাখা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়ে প্রত্যাশিত ফল তখনই আশা করা যেতে পারে, যখন সম্প্রসারমান ক্ষেত্রের প্রতিটি বিন্দু একই রকম যোগ্যতা ও অধিকারে বলীয়ান। তা নইলে দুর্বল সব বিন্দু অবলুপ্ত হতে থাকে। পরিণামে বিশ্ববাজার কেবল সফলের ক্রীড়াক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়। একটি নড়বড়ে অবস্থান থেকে বাংলাদেশের অধিকারবঞ্চিত জনসমষ্টির জন্যে এ হবে এক অসম লড়াই। দীর্ঘদিন এতে টিকে থাকার সম্ভাবনা তাদের ক্ষীণ। লড়াই শুধু বাইরের অধিক শক্তিশালী পক্ষের সঙ্গেই নয়, ভেতরের ক্ষমতাবানদের সঙ্গেও। দক্ষিণ বাংলায় উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি চাষ প্রকল্প এর উদাহরণ। বাংলাদেশের রপ্তানি-বাণিজ্যে চিংড়ির ভূমিকা ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু চিংড়ি-ঘেরের নব্য ধনপতি মালিকদের দাপটে বহু পুরানো মাছচাষি আজ ভিটেমাটি ছাড়া। বৃহৎ পুঁজি ও উন্নত প্রযুক্তির আগ্রাসন থেকে আত্মরক্ষার ক্ষমতা তাদের নেই। বিশ্ববাজারের অঙ্গীভূত হওয়ার ফলে ওই এলাকা তার দুর্বল জনগোষ্ঠীকে আরো নিঃস্ব করে ফেলছে;
যদিও বাংলাদেশের মোট রপ্তানি-আয়ে পড়ছে তার আশাব্যঞ্জক অনুকূল প্রভাব।’ (সক্ষমতা ও উন্নয়ন, পৃ. ৮৯)
মুক্ত বাজার-অর্থনীতির ফলে দুর্বল জনগোষ্ঠীকে এই যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে তাকে কি আমরা উপেক্ষা করব? ডব্লিউটিও, বিশ্বব্যাংক কিংবা আইএমএফ সে-রকমই বলে। তবে বিক্ষোভের ভয়ও আছে। তাই এই দুর্বল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্রয়ক্ষমতা চাঙা রাখার জন্যে সবখানে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প। এই প্রকল্পের সাফল্য তুলে ধরে ব্যক্তিবিশেষকে অকারণে গৌরবান্বিত করার মতো অর্থনীতিবিদও একেবারে কম নেই আমাদের। কিন্তু সনৎকুমার সাহা বলছেন অন্য কথা, ‘পুরনো মহাজনি কারবারকে নতুন বোতলে ঢেলে ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবসার বিশাল কর্মযজ্ঞও আমরা দেখেছি। পেছনে থেকেছে দাতা গোষ্ঠীর বিস্ময়ভরা উচ্ছ্বাস ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সমর্থন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুযোগব্যয়ের আপেক্ষিক হিসাবের প্রেক্ষিতে শুধুই তার কারণে উপকার কতটা হয়েছে, তা খুব স্পষ্ট নয়। দেশে-বিদেশে প্রশংসা মিলেছে যদিও প্রচুর।’ (পুণ্য কথা, পৃ. ১৮০)
তবে আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তিবিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাজার যে-রূপ পেয়েছে এবং বিশ্বায়ন তাকে যেভাবে ছায়া দিয়েছে তাতে পৃথিবীজুড়ে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং সম্পর্কেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। দুশো বছর আগের শিল্পবিপ্লব সমাজ-রাষ্ট্র-অর্থনীতি আর রাজনীতিতে যে-ঢেউ তুলেছিল কেবল তার সঙ্গেই এই তথ্য ও প্রযুক্তিবিপ্লবের তুলনা হতে পারে। তথ্যবিপ্লব নিঃসন্দেহে আমাদের প্রথাগত শিল্প-উৎপাদনের ধারণাকে পালটে ফেলেছে। একই সঙ্গে সে মানুষের সম্পর্ককে আগের চেয়ে অনেক বেশি খণ্ডিত করে ফেলেছে। শিল্প-ব্যবস্থাপনা হয়ে পড়েছে বহুজাতিক আর বহুমাত্রিক; তাই ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা তাৎপর্যহীন হয়ে পড়ছে – সনৎকুমার সাহার এ-কথাটি যে কত সত্য তা বাংলাদেশের ইপিজেডগুলোর দিকে তাকালেই টের পাই আমরা। সেখানে যে এখন আমেরিকা চাপ দিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা করছে তাও বিশ্বায়ন-রাজনীতির আরেক খেলা। বিভিন্ন দেশে ইপিজেড ও পোশাকশিল্পের বিস্তার থেকে আমরা বুঝতে পারি, বৃহৎ উৎপাদনে এমনই তারল্য তৈরি হয়েছে যে একে ইচ্ছেমতো অসংখ্য পাত্রে আলাদা আলাদা করে এর ভাগ ও পর্যায়গুলো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব এবং শ্রমকে এক জায়গায় জড়ো করাও আর অবশ্যম্ভাবী নয়। বিশ্বায়ন এমনই শক্তিধর যে বড় বড় কারখানায় শিল্পশ্রমের সমজাতীয়তা, একাত্মতা আর সংহতি ভেঙেচুরে ফেলেছে। বহুজাতিক করপোরেশনগুলোর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সত্তর ও আশির দশকে অনেক বিতর্ক হতে দেখেছি আমরা। এদের ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় চরিত্র, সমাজ-কাঠামোর ধরন ও বিপ্লবের স্তর-বিশ্লেষণ সমস্যাবহুল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এতদিনে বোঝা যাচ্ছে এইসব এমএনসি প্রকৃতার্থে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বিশ্বায়নের মুখোমুখি।
তিন
বিশ্বায়নের এই ধারণা নারীদের ওপর কী অভিঘাত ফেলেছে, শাশ্বত বাঙালি নারীর পোশাক শাড়ি তাতে আদৌ কি টিকে থাকবে কিংবা মুক্ত বাজারের এই তোড়জোড়ের ভেতর ছাগলপালন-অর্থনীতি আমাদের কতটা কাজে আসবে,- এইসব প্রসঙ্গও আমরা খুঁজে পাই সনৎকুমার সাহার একেকটি আলোচনায়। স্বস্তি মিত্রের একটি বই কমন ফেট কমন বন্ড – উইমেন ইন দ্য গ্লোবাল ইকোনমি নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। স্বস্তি মিত্র যখন এই বই লিখছেন (১৯৮৬) তখনও মনিকা আলী ব্রিকলেন লেখার কথা চিন্তা করেননি। এমনকি মনিকা আলীর বইটি বহুল আলোচিত হওয়ার পরও কাউকে লিখতে বা বলতে শুনিনি যে, ব্রিকলেন অনেক আগেই আলোচনার টেবিলে উঠে এসেছে। ১৯৮২ সালেই স্বস্তি মিত্র খেয়াল করেন যে, ব্রিকলেন অঞ্চলে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বিরাট অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক নতুন ধরনের শ্রমবিভাজন দেখা দিচ্ছে। বিভিন্ন কারখানায় বিশেষত পোশাকশিল্পে তখন পুরুষ শ্রমিকরা কাজ হারাতে থাকে, অন্য দিকে নারী শ্রমিকরা কাজ পেতে থাকে নতুন করে। কর্মসংস্থানের এই নতুন ধরন স্বস্তি মিত্রকে বিস্মিত করে। প্রথমে তিনি অর্থনীতির এ-নতুন প্রবণতাকে বুঝে উঠতে পারেননি। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এমনকি চীনের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে বহুজাতিক সংস্থাগুলোর প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন তিনি। কেবল তখনই তাঁর ধারণায় আসে যে বহুজাতিক সংস্থাগুলো কী প্রথম বিশ্ব কী তৃতীয় বিশ্ব উভয় জায়গাতেই উৎপাদন ও কর্মসংস্থান-কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে চলেছে। এই নতুন বিন্যাসে নারীশ্রম বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। নতুন প্রক্রিয়ায় উৎপাদন ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর দেশে দেশে, কিন্তু ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রীভূত হয় পরিচালনার মূল ক্ষেত্রে। আর এসবই ঘটে কম্পিউটার ও উপগ্রহ-যোগাযোগের মাধ্যমে। (নোতুন অর্থনীতির সন্ধানে, পৃ. ১৮৫-১৮৬) কাজের ক্ষেত্রে নারীদের নিয়ে আসার জন্যে নয়, এক সুপরিকল্পিত ব্যবসায়িক নীতির কারণেই বহুজাতিক ব্যবস্থাপনায় নতুন দেখা-দেওয়া প্রান্তিক কাজ মূলত নারীদের হাতে চলে আসে। সনৎকুমার সাহা লিখেছেন, ‘শ্রীমতী মিত্র প্রচুর পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছেন গত দুই দশকে কাজের বাজারে নারীশ্রমের ব্যবহার কি দ্রুত বেড়েছে। পাশাপাশি পুরুষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান একই সঙ্গে কমে চলেছে। শ্রমিকদের চেতনার পরিমণ্ডলে এই পরিস্থিতি ঠিক ঠিক ধরা পড়ে না। মজুরি বাড়াবার বা কাজের পরিবেশ উন্নত করার জন্যে আন্দোলনে তারা অভ্যস্ত। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রটাই প্রায় নিঃশব্দে তাদের পায়ের তলা থেকে
সরে যায়। তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। অন্যদিকে উৎপাদন-কাঠামোর পরিবর্তনে মেয়েরা যে-কাজ পায়, তা বেশির
ভাগই শ্রমিক-সংগঠনের আওতায় পড়ে না।’ (ঐ, পৃ. ১৯০)
শ্রমের এই বাজার নারীকে ঘরের বাইরে নিয়ে আসে, যেভাবে অতীতে এই শ্রমের বাজারই সামন্তসমাজের ভূমিসংশ্লিষ্ট মানুষকে শহরের শিল্পকারখানায় নিয়ে এসেছিল। কিন্তু মুক্তি কারো মেলেনি। সনৎকুমারের এ-লেখা আমাদের স্বস্তি মিত্রের মূল বইটি পড়তে অনুপ্রাণিত করে, যদিও বাংলাদেশে তা সহজলভ্য নয়। তবে আরেকটি লেখায় অর্থমন্ত্রীর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তিনি যা লিখেছেন তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অর্থমন্ত্রী ওই সময়ে (২০০২) তাঁর এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, আমাদের দেশে মাঠেঘাটে বনেজঙ্গলে যারা শাকপাতা কুড়ায়, জ্বালানি কুড়ায় তাদের এসব আয় জাতীয় আয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় না। মেয়েদের ঘরের কাজও জাতীয় আয়ের পরিধিতে আসে না। এগুলো যদি আসতো তাহলে আমাদের জাতীয় আয় দেখা যেত অনেক উন্নত দেশের চেয়েও বেশি! তাঁর এ-কথা যে কত বেশি অর্থহীন সনৎকুমার সাহা তা তুলে ধরেছেন। তিনি লেখেন, ‘… মূল্য সৃষ্টি বা সংযোজিত হলে তবেই তা আয়ের ভেতরে গণ্য হয়। ওই সৃষ্টি বা সংযোজন মানুষের। প্রকৃতি অনেক কিছু ঢেলে দিতে পারে। যেমন আছে তেমনি থাকলে তা সম্পদ, কিন্তু কারো আয় নয়।’ (পুণ্য কথা, পৃ. ১৭৭) মেয়েদের ঘরের বাইরে নিয়ে এসে কাজ দিলেই কি তার মুক্তিসাধন হবে? হবে না। কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গেই তাঁকে এরপর লিখতে দেখি, ‘ক্রীতদাসেরও অনেক কাজ। তাতে তার দাসত্ব ঘোচে না। নারীর অধিকার তার পছন্দের অধিকার, তার সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকার – তার নিজেকে নিয়ে, তার পরিবারকে নিয়ে, এমনকি বাইরের জগৎকে নিয়েও। বিচ্ছিন্নভাবে নয়, নারীপুরুষের জীবনে একসঙ্গে জড়িয়ে। এই বোধের উদ্বোধন আমরা দেখি না।’ (ঐ, পৃ. ১৭৮)
নারী-প্রসঙ্গে সনৎকুমার সাহার অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা ‘যৌতুকের অর্থনীতি’। যৌতুক নিয়ে ছাড়া-ছাড়াভাবে অনেক কথাবার্তা হলেও সামগ্রিক অর্থে বিষয়টিকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা আমাদের তেমন চোখে পড়ে না। এ-লেখায় তিনি যৌতুকের অর্থনীতি আলোচনা করেছেন বিষয়টিকে সার্বিক আর্থসামাজিক কাঠামো ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ধারাবাহিকতায় স্থাপন করে। যৌক্তিক কারণেই এসেছে উফশি প্রযুক্তি-প্রসারের কারণে আমাদের কৃষিসমাজে নারীশ্রম-সংকোচনের প্রভাবে যৌতুকপ্রথা বিস্তারের কথা। তেমনি এসেছে বিদ্যাসাগর ও সামাজিক উদ্যোগের প্রসঙ্গ। নির্মোহ দৃষ্টিতে তিনি পর্যালোচনা করেছেন, ‘বিদ্যাসাগর যে একই সঙ্গে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে মন দেন, তারও মূলে কাজ করে নিজ বৃত্তের অপদার্থ বিকৃত উদ্বৃত্ত বেকার মানুষদের পেশার ভিত মজবুত করার আকাক্সক্ষা। নিুবর্গের মানুষের বিদ্যাজীবী হবার অর্থনৈতিক তাগিদ তখনো তৈরি হয়নি। বিদ্যাসাগর নিশ্চয় আশা করেছিলেন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নতুন নতুন অর্থকরী পেশায় নিয়োজিত হলে উচ্চতর বর্ণের মানুষেরা বিকৃত বিবাহ-ব্যবসার ওপর নির্ভর করে জীবনধারণের চেষ্টা থেকে ক্রমশ সরে আসবে।’ (যৌতুকের অর্থনীতি, পৃ. ১৬৮) কোনো কোনো লেখার বিষয়বস্তু পঠিত বই, যেমন লেখা যায় ‘তৃতীয় ভুবনে ঋণের ফাঁদ’ কিংবা ‘মুক্তির স্বপ্ন পুষ্টির খতিয়ানে’র কথা। প্রথমটিতে তিনি আলোচনা করেছেন বৈদেশিক সাহায্যের কার্যকারণ নিয়ে লেখা তেরেসা হেয়টার ও চেরিল পেয়ারের লেখা দুটি বই। দ্বিতীয়টিতে তিনি আলোচনা করেছেন পুষ্টি বিষয়ে খুরশিদ জাহান ও মুশাররফ হোসেনের যৌথ গবেষণাকর্ম নিয়ে। কিন্তু এসব আলোচনায়ও প্রসঙ্গক্রমে তাঁর নিজস্ব ধারণার প্রকাশ ঘটতে দেখি আমরা।
সনৎকুমার সাহার এ-বইটিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিচর্চার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক বই বলা মোটেও অত্যুক্তি হবে না। কেননা তিনি অর্থনীতির মূল তত্ত্বগুলোকেই যাচাই করেছেন বিভিন্ন সমসাময়িক পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করে। এতে রয়েছে তাঁর ‘পরিকল্পনা বিষয়ক চিন্তা’ নামের একটি লেখা, যাতে তিনি বাংলাদেশের এক ক্রান্তিকালীন সময়ে (১৯৭৭) অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সম্পর্কে নিজের অকুতোভয় মন্তব্য তুলে ধরেছেন। বাণিজ্যচক্রের চূড়ান্ত সংকট ও অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে শতাব্দীর তৃতীয় ও চতুর্থ দশকে পাশ্চাত্যবিশ্বের দেশগুলো বুঝতে পারে অনিয়ন্ত্রিত বাজার-ব্যবস্থা নয়, বরং প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত বাজার-ব্যবস্থা। (পরিকল্পনা বিষয়ক চিন্তা, পৃ. ১৪৯) কিন্তু পরে এসব দেশই তৃতীয় বিশ্বের সামনে তুলে ধরে তথাকথিত মুক্ত বাজার-ব্যবস্থার দর্শন। কোনো কোনো লেখার প্রসঙ্গ হালকা হলেও তা অর্থনীতিকে নিয়ে গেছে সমসাময়িক
বাস্তবতায়। তিনি বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালির সংস্কৃতি নিয়েও আলোচনা করেছেন; যদিও আমার মনে হয়, এটিকে আরো তাৎপর্যপূর্ণ লেখায় পরিণত করা তাঁর পক্ষে সম্ভবপর ছিল। এতে তিনি লিখেছেন, ‘রান্নাঘরে প্রতিটি নারীর মৌলিক প্রতিভা তার রান্নায় মিশে যায়। তার দেখাশোনা-জানার বৃত্ত যত ছোট হয়, তার মৌলিকত্বও তত বেশি ফুটে ওঠে। এবং এই মৌলিকতা বাঙালির এতদিনের সংস্কৃতি-সাধনায় তার নির্ভুল ছাপ রেখে যায়। এই ছাপ অগৌরবের নয়।’ (বিশ্বায়ন ও বাঙালির সংস্কৃতি, পৃ. ২৩৭) তাঁর এ-মন্তব্য দ্বিধাহীনভাবে মেনে নেওয়া ভীষণ কষ্টকর। তাহলে কি বাঙালি নারী এই গৌরবের ছাপ পরার জন্যে, মৌলিকত্ব অর্জনের জন্যে দেখাশোনা-জানার বৃত্ত ক্রমাগত ছোট করে আনবে?
তবে জ্ঞান-মেধা-প্রজ্ঞাচর্চার বিভিন্ন ক্ষেত্রের সমন্বয় যে কত জরুরি ও আনন্দময় সেটি অনুভব করা যায় সনৎকুমার সাহার এ-বইটি থেকে। সাহিত্যের দীপ্তিকে তিনি অর্থনৈতিক চিন্তার সঙ্গে সমন্বিত করেছেন; তার ফলে কী সাহিত্য কী অর্থনীতি একটি আরেকটির শিল্প হয়ে উঠেছে। যেমন তিনি উন্নয়ন ও জনকল্যাণের কথা কিংবা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা লিখতে গিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের বঙ্গদেশের কৃষক আর সাম্যের প্রসঙ্গ তুলে এনেছেন। শ্রমের বাজার আর ভোগ্যপণ্যের উন্মত্ততার কথা তুলে ধরতে গিয়ে লিখেছেন, ‘রক্তকরবীর রাজা কোন অলীক কল্পনা নয়’; আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধের অর্থনৈতিক প্রগতির কাল ইউরোপে কী নিয়ে এসেছিল তা জানিয়েছেন চার্লস ডিকেনসের ভাষ্যে ‘সবচেয়ে সুসময়; আবার একই সঙ্গে দুঃসময়’, বিশ শতকের গোড়ার দিকে ইংল্যান্ডের শ্রমিকদের দুর্বিষহ জীবনযাপনের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ডি. এইচ. লরেন্সের বিভিন্ন লেখার কথা; দুর্ভিক্ষ ও গণমাধ্যম-প্রসঙ্গে অমর্ত্য সেন-প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ল্যাটিন আমেরিকার প্রথাবিরোধী অসাধারণ লেখক এডোয়ার্ডো গ্যালিয়ানোর উক্তি, ‘গণমাধ্যম বাস্তবতার প্রকাশ ঘটায় না, তা তাকে নির্মাণ করে’। এসবের মধ্য দিয়েই আমরা টের পেয়ে যাই, তাঁর অর্থনৈতিক সংস্কৃতির মান কত উঁচুস্তরের। আমাদের দেশে অবশ্য ইদানীং কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ এই চেষ্টা করছেন; প্রতিষ্ঠানের অধস্তন কর্মচারীদের দিয়ে রবীন্দ্রনাথের রচনাবলি ক্যাটাগরাইজড করা হচ্ছে, তারপর বিভিন্ন লেখায় লাগসই উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে তাঁদের জ্ঞানের প্রকাশ ঘটলেও কৃত্রিমতা ঘুচছে না কিছুতেই। সেজন্যেই মনে হয়, আমাদের রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক উদ্যোগ ও
রচনাসমূহ নিয়ে একটি
লেখা আমরা সনৎকুমার সাহার কাছ থেকে দাবি করতে পারি। কেননা সামগ্রিক অর্থনৈতিক তত্ত্বের পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের সমবায় ও কৃষি-উদ্যোগ ইত্যাদি নিয়ে অর্থনীতিবিদরা কী ভাবছেন তা জেনে নেওয়া আমাদের খুবই জরুরি। এই পর্যালোচনায় রবীন্দ্রনাথের অবস্থান যাই হোক না কেন, তাতে তাঁর মর্যাদার কোনো পরিবর্তন হবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। বরং মনে হয় ওই রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রত্যাবর্তন-প্রসঙ্গই পুনরায় বড় হয়ে দেখা দেবে।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.