মসজিদের ইমাম করিমের দিকে তাকিয়ে বললেন, করিম তুঁই আঁর মুখে মুখে ক, আঁই মনির আহমদর মাইয়া রুইতনরে তালাক দিলাম – এক তালাক –

করিম কিছু বলার আগে তার পাশে বসা রুইতন আচমকা তার মুখে হাতচাপা দিয়ে বলে, তুঁই তালাক ন দিবা করিম বাই।

ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে পড়ে সালিশি বৈঠকে উপস্থিত সবাই। ইমাম পাশে বসা মাতব্বরের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন, তাঁর হা করা মুখ তখনো বন্ধ হয়নি। ধাক্কা সামলাতে কিছু সময় নিলেন মাতব্বর। তারপরই তাঁর চিরাচরিত দরাজ গলায় হুংকার দিয়ে উঠলেন, ‘কী, কী কইলিদি বেডি? রুইতন তোর এত বড় সাহস? আঁরা মুরুব্বিঅলর সামনে তুই বেয়াদবি করলিদি।’

এরপর এক ব্যক্তির দিকে চোখ তুলে বললেন, ‘এ্যাই মনির আহমদইদ্যা তোর ঝিয়রে সামালা চোদানির পোয়া।’

পড়ন্ত বিকেলবেলা। সূর্য দিগন্তের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টায় সক্রিয়। ক্রমে তাপমাত্রা কমে শীতল হচ্ছে। বাতাস পুকুরের পানিকে দোলা দিচ্ছে মৃদু লয়ে। দু-একটি মাছশিকারি পাখি চক্কর দিচ্ছে পুকুরের চারপাশে। হাওয়ার এমন একটি শীতলতা কেটে গেল মুহূর্তে। মাতব্বরের উত্তেজনা সহসা সংক্রমিত করল সালিশে উপস্থিত প্রায় সকলকে।

যে-বড় পুকুরের পাড়ে সালিশি বৈঠকটি হচ্ছে তার অবস্থানটি গ্রামের একেবারে মধ্যখানে। মনে হবে যেন এ-পুকুরকে ঘিরে বাড়িগুলো উঠেছে। হালদা নদীর কোল ঘেঁষে বলেই হয়তো গ্রামের নাম হয়েছে হালদাখালী। পুবপাড়া, পশ্চিমপাড়া আর উত্তরপাড়া – এই তিনটি পাড়া নিয়ে হালদাখালী গ্রাম। কয়েকটা বাড়ি মিলে একেকটা পাড়া। প্রতিটি বাড়িতে ১৫ থেকে ২০টি পরিবারের বসবাস। গ্রামের সবাই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। মাত্র কয়েকটি মোটামুটি সচ্ছল পরিবার। অধিকাংশই অন্যের জমি বর্গা চাষ করে। জমিতে কাজ না থাকলে অনেকে বাঁশ ও বেত দিয়ে নানা প্রকার ব্যবহার্য সামগ্রী তৈরি করে। সপ্তাহে দুদিন হাট বসে বড় রাস্তার ওপারে। সেখানে বিক্রি করে সে-টাকায় বাজার-সদাই করে। নিজেদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে আনে।

এই বড় পুকুরপাড়ে গ্রামের একমাত্র জামে মসজিদ। একসময় এটি ছিল ইবাদতখানা, যেখানে শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়ার ব্যবস্থা ছিল। বাঁশের বেড়া আর টিনের ছাউনি দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল গত শতাব্দীর ষাটের দশকের মাঝামাঝি। জুমার নামাজের জন্য যেতে হতো পাশের গ্রামের মসজিদে। স্বাধীনতার পরপর এটাকে জামে মসজিদ হিসেবে তৈরি করা হয়।

পুকুরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে শতবর্ষী একটি বটগাছ। মসজিদ আর বটগাছটির মাঝখানে খোলা জায়গা। ঈদ ও জানাজার নামাজ এখানেই অনুষ্ঠিত হয়। উত্তর পাশে শানবাঁধানো ঘাট।

গাছটিকে শতবর্ষী বলা হলেও আসলে এটির বয়স কত তা কেউ স্পষ্ট করে বলতে পারে না। গাঁয়ের বুড়া-বুড়ি যাদের অনেকের বয়স অন্তত আশি পেরিয়েছে তাঁরাও বলেন – ‘গুঁড়া থাইকতে দেখিদ্দি গাছ ইবে এত্তর।’

তার ডালপালাও একেকটা বটগাছের সমান। বিশাল জায়গা জুড়ে গাছটি দাঁড়িয়ে আছে। বটগাছের ডালপালার ঝুরিগুলো একসময় মাটিতে গেঁথে গিয়ে নিজেরাই একেকটা কাণ্ডে পরিণত হয়। এর শেকড়ও ভূমি থেকে অন্তত তিন ফুট বেরিয়ে থাকে। সেখানেই লোকজন বসে। অনেকে শেকড়ের ওপরের অংশ কেটে সমান করে দেয় বসার সুবিধার জন্য। তাতে বেঞ্চের মতো কয়েকজন একসঙ্গে বসতে পারে। সাধারণত সেখানে মাতব্বর ও মুরুব্বিগোছের লোকেরাই বসে যখন গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

জুমার নামাজের সময় অনেক লোকের জমায়েত হয়। বটগাছের ছায়ায় লোক জড়ো হতে থাকে আজানের আগে থেকেই। নামাজের পরেও এখানে আড্ডা দেয় গাঁয়ের উঠতি বয়সী ছেলেরা। তাছাড়া প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যার পরও চলে আড্ডা। জ্যোৎস্না থাকলে অনেক রাত অবধি বটতলা সরগরম থাকে তরুণ-যুবকদের আনাগোনায়। শীতকালে আমন ধান কাটার পর জমিগুলো অনাবাদি থাকে। তখন ইরি প্রকল্প চালু হয়নি ভালো করে। সে-জমিতে জ্যোৎস্নারাতে ছেলেরা প’র খেলার জন্য জড়ো হয়। এ-সময় তারা একটা সেøাগানের মতো দেয়। একজন শুরু করে এভাবে,

এক আড়ি ধানর দু আড়ি চুরা,

গোল্লাবদর দিত মানুষ কুড়া,

এর পরপরই অন্যরা সমস্বরে বলে, ‘গোল্লা বদর, হায় বদর।’

একদিন আসরের নামাজের পরপরই এখানে লোকজন জড়ো হয়। সেখানে গ্রামের শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সীরা আসে; মাথায় লম্বা ঘোমটা ও বোরকাপরা কিছু নারীও আছে তাতে। তালাক নিয়ে এক সালিশ বৈঠক। কারণ, কথামতো করিম রুইতনকে তালাক দিচ্ছে না বলে হাবিবুরের অভিযোগের পরিপ্র্রেক্ষিতে গ্রামের মাতব্বর ও মসজিদের ইমাম সাহেব এই সালিশ আহ্বান করেছেন।

গ্রামের জহুর আহমদ সারেংয়ের একমাত্র ছেলে হাবিবুর রহমানের সঙ্গে মনির আহমদের বড় মেয়ে রুইতনের বিয়ে হয় বছর পাঁচেক আগে। বিয়ে হয়েছিল হাবিবের পছন্দেই। আর্থিকভাবে রুইতনের বাবা দুর্বল হলেও রুইতনের সৌন্দর্যে মোহিত হাবিব চাপ দিয়ে নিজের মা-বাবাকে রাজি করিয়েছিল বিয়েতে। জহুর আহমদ মালবাহী জাহাজে সারেংয়ের চাকরি করতেন বলে বেশিরভাগ সময়ে জাহাজেই থাকতেন। বাড়িতে আসতেন বছরে দুয়েকবার। তা-ও কয়েকদিনের জন্য। পরিবারে একজন শক্ত অভিভাবক না থাকলে যা হয়, হাবিবের অবস্থাও তাই হয়েছে। ছোটবেলা থেকে উচ্ছন্নে গেছে। এমনকি এসএসসিটাও পার হতে পারেনি।

দুই

মনির আহমদ একজন বর্গাচাষি। অনেকটা দায় ঘোচাতে রাজি হয়েছিল বিয়েতে। তার তিন সন্তানের তিনটিই মেয়ে। একদিকে একটা ছেলে না থাকার দুঃখ, অন্যদিকে তিন-তিনটি মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার যথেষ্ট সামর্থ্য না থাকায় মনির আহমদ মানসিকভাবে থাকত বিপর্যস্ত অবস্থায়। নানা দিক থেকে বিয়ের চাপ আসতে থাকলে একসময় হাবিবের মায়ের প্রস্তাবেই রাজি হয় সে। বিয়েতে তার এক পয়সাও খরচ করতে হয়নি। সব খরচ দিয়েছে হাবিবের পরিবার।

রুইতন জন্মেছিল রাজকুমারীর মতো। যাকে বলে দুধে-আলতা রং, তেমন ছিল সে। লোকে বলত, ‘মনির আহমদের ঘরত বিদেশি মাইফোয়া কত্তুন হইল।’ পিঠাপিঠি আরো দু-মেয়ে জন্মালেও মনির আহমদ ও তার বউয়ের বড় আদরের ধন ছিল রুইতন। শুধু অপরূপ রূপের কারণে মেয়েকে চোখে চোখে রাখতে হতো গ্রামের হাড়বজ্জাত লোকদের কুদৃষ্টি থেকে বাঁচাতে। গ্রামের শেষ প্রান্তে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের ভালো ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ে ক্ষান্ত দিতে হয়। তারপর থেকেই ঘরে থাকতে হয়েছে রুইতনকে। অথচ মনির আহমদের খুব ইচ্ছে ছিল অন্তত বড় মেয়েটিকে হাইস্কুলে পর্যন্ত পড়াবে।

বাবার ঘরে অভাব-অনটনের মধ্যে বড় হওয়া রুইতন হাবিবুরের ঘরে বউ হয়ে এসে খুশিই হয়েছিল। তারা স্বামী-স্ত্রী ছাড়া আর একজন বৃদ্ধা শাশুড়ি। খুব বেশি ঝামেলা নেই। তবে নিজের ঘরে বেশি লোকজন না থাকলেও আশপাশে থেকে হাবিবুরের চাচা-চাচি ও তুতো ভাইবোনদের আনাগোনা থাকেই। সচরাচর শাশুড়ির দাপটে বউয়ের জান ওষ্ঠাগত হলেও রুইতনের শাশুড়ি খুব শান্তশিষ্ট। রুইতনকে মেয়ের মতোই দেখে। বাড়ির লোকদের বলে, ‘আঁর তো মাইয়া নাই, ইবা আঁর মাইয়া।’

প্রথম দিকে হাবিবুর সারাদিন ঘরে কাটায় দেখে একদিন রুইতন জিজ্ঞেসই করে ফেলল, ‘অনে ব্যবসা করনদে ছেডে যঅন ন পড়ে?’

যাই, খবর নেই – বলে হাবিব বিষয়টি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে।

বিয়ের পর বাপের বাড়িতে খুব বেশি যাওয়া হতো না রুইতনের। হাবিব তা পছন্দ করতো না। সে নিজেও যেতে চাইতো না। গেলে তাকে আনতে যাবে হাবিব। জামাই গেলে অন্তত একবেলা ভাত তো খাওয়াতে হবে ভালো-মন্দ দিয়ে। রুইতন বাপকে সে-চাপ দিতে চায় না। বরং সে ছোট দু-বোনের বিয়ে কীভাবে দেওয়া হবে সে-দুশ্চিন্তায় ভোগে।

বিয়ের পর বছরখানেক আনন্দেই কাটে রুইতনের। কিন্তু সে-আনন্দ ফিকে হতে বেশি সময় নেয় না। ধীরে ধীরে অসন্তোষ বাড়তে থাকে সংসারে। কারণ হাবিব মূলত কিছুই করে না। যদিও বিয়ের আগে বলা হয়েছিল ছেলে ব্যবসা করে থানা সদরে। কিন্তু দেখা গেল সে রাতদিন শুধু জুয়া খেলে। বিয়ের বছরখানেক পর তার বাবার মৃত্যু হলে সে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একটি জায়গা বিক্রি করে তার টাকায় ছয় মাস চলে মহাধুমধামে। খেয়েদেয়ে আর জুয়া খেলে সেই টাকা ফুরিয়ে গেলে আরেকটি জায়গা বেচে। বেপরোয়া ছেলের জেদের কাছে মা অসহায়। প্রথম প্রথম মৃদু প্রতিবাদ করত রুইতন। তারপর সে প্রতিবাদ রূপ নেয় ঝগড়ায়। এমন এক ঝগড়ার দিনেই রুইতনকে তালাক দিয়ে দেয় হাবিব।

সেবার টানা দুইদিন জুয়া খেলে ঘরে এলে আগে থেকে রেগে থাকা রুইতনের সঙ্গে লেগে যায় হাবিবের। এরই মধ্যে বউয়ের গায়ে হাত তোলা শুরু করেছে হাবিব। ঝগড়ার শেষ পরিণতি হলো রুইতনকে পেটানো। যত দিন যায় মারের মাত্রা বাড়তে থাকে। প্রথম প্রথম রুইতন নীরবে মার খেয়ে যেত। একসময় তর্ক শুরু করে। এ-কারণে মার আরো বেশি খেলেও মুখ বন্ধ হয় না রুইতনের। তাদের সংসার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও সন্তানাদির মুখ দেখেনি তারা। এসব ক্ষেত্রে দোষটা বউয়ের ঘাড়েই চাপানো হয়ে থাকে। এক্ষেত্রেও তাই। স্বামী, আর প্রতিবেশীরা উঠতে-বসতে রুইতনকে বাঁজা ডাকতে ছাড়ে না। হাবিব প্রতিবার মারের সময় এই খোটাও দেয় বউকে জব্দ করতে, ‘পাঁচ বছর হইয়ি বেডি আইজু আঁরে উগ্গো পোয়া হোয়াইয়েরে দেখাইত না পারলি। তুই বাঁজারে এতদিন ছাড়ি ন দিইতি ও তো বউত।’

রাগের মাথায় তালাক দিয়ে হাবিব বুঝতে পারে বড় ভুল হয়ে গেছে। সে পাগলের মতো এ-ঘর ও-ঘর করে। বাড়ির লোকজন ভিড় করে তাদের ঘরে এসে। এ-কান ও-কান হয়ে সে-খবর গোটা গ্রামে চাউর হয়ে যায়। পাড়ার লোকজন ছুটে আসতে থাকে। মুরুব্বিরা বলে যায়, এদের মধ্যে তালাক হয়ে গেছে। রুইতনকে তার বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হোক।

একই গ্রামের বাসিন্দা। ফলে রুইতনের বাবার কাছে খবর যেতে দেরি হয় না। তবে সে-খবর কিছুটা ফুলেফেঁপে পৌঁছায়। রুইতনকে মেরে বেহুঁশ করে ফেলে রাখা হয়েছে, তার চুল কেটে দেওয়া হয়েছে – এমনসব খবর।

মুনির আহমদ তার কয়েকজন ভাইবেরাদরকে সঙ্গে নিয়ে মেয়েকে উদ্ধার করতে তার শ^শুরবাড়ি এসে দেখল ঘরভর্তি নানা বয়সী মানুষ গুঞ্জন করছে। তাকে দেখে ক্ষণিকের জন্য গুঞ্জন থেমে গেল। দু-চারজন বলে উঠল, ‘রুইতনর বাপ আইস্যি।’ শুনে রুইতনের শাশুড়ি এগিয়ে এলো। ‘অ বেয়াই আঁই কিত্তেম’ – বলে কপাল চাপড়াতে লাগল। মুরুব্বি গোছের দুয়েকজন একটা কাঠের টুল এগিয়ে দিলো মনির আহমদের দিকে। হতভম্ব মনির আহমদ বসতে বসতে এদিক-ওদিক তাকায়। মনে হচ্ছে সে মেয়েকে খুঁজছে। এমন সময় বিলাপ করতে করতে ভিতর ঘর থেকে বেরিয়ে এলো রুইতন। মনির আহমদ মেয়েকে জড়িয়ে ধরল। বাবার বুকে মাথা রেখে অনেকক্ষণ কাঁদল সে। এ-দৃশ্য দেখে উপস্থিত সকলের চোখও অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। রুইতনের শাশুড়ি বলল, ‘বেয়াই আঁর ফোয়া এইয়ান কী কাম করিলদি। আজিয়া ইতের বাপ বাঁচি থাকিলি গরির ন পাইত্ত।’

মনির আহমদ কী জবাব দেবে বুঝতে পারে না। তাকে কী করতে হবে সেটিও বুঝতে পারে না। হাবিবুরের দেখা নেই। কেউ বলছে সে ইমাম সাহেবের কাছে গেছে। তাদের মধ্যে একজন বলল, তাকে হুজুরের বাড়িতে ঢুকতে দেখেছে। বেলা পড়ে যাওয়ার আগে আগে মনির আহমদ মেয়ে রুইতনকে নিয়ে বাড়ি চলে গেলে হাবিবুরের বাড়ির ভিড়ও কমতে শুরু করে।

মাদ্রাসায় কয়েক বছর পড়া গ্রামেরই এক ব্যক্তি মসজিদে ইমামতি করেন। শুধু শুক্রবার জুমার নামাজ পড়াতে আসেন কাছের এক মাদ্রাসার শিক্ষক। এই ইমামের কাছে ঘটনা তুলে ধরে হাবিবুর বলল, ‘হুজুর আঁই রাগর মাথাত তালাক দি-ফালাইদি। ইচ্ছে গরি ন দি। আঁই রুইতনরে ছাইত্তেম ন।’

ইমাম সাহেব গভীর মনোযোগ দিয়ে হাবিবুরের কথা শুনলেন। আসরের নামাজের ইমামতি করে সবেমাত্র ঘরে এসেছেন। হাবিবুরের কথা শেষ হলে মাথা থেকে পাগড়ি খুলে টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন, ‘তালাক তুঁই কীভাবে দিইয়ু? কইয়ুনা, এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক?’

হাবিবুর খুব নিচু গলায় বলল, ‘জি হুজুর।’

‘আশেপাশের মানুষে হুন্নি না? মাইনে তুঁই যে তালাক দিয়ু হেই কথা কি তিনজন মানুষ হুইন্নি না?’

‘হুইন্নি হুজুর। আঁর মুখে মুখে মাতনে আঁই বেশাবেশি মাইজ্যি রুইতনরে। ছোড়াইবারলাই বুলি বউত মানুষ আইস্যিল ঘরত। ইতারা বেগ্গুনে হুন্নি। আঁর কাক্কু, গুরো মা হক্কলে কইয়্যিদে, অ বাইজ্যেখোদা তোর বউ তো আর তোর আকদর তলত নাই।’

‘তুঁই কালিয়া আসরর পরদি গরি আইস্যু। আঁই কিতাব ছাইয়েরে কালিয়া কইয়ুম।’

কথাটা বলে হুজুর শৌচাগারে ঢুকে গেলেন।

হাবিবুর ফিরে এসে দেখে ঘরে রুইতন নেই। মা জানায় তাকে তার বাপ এসে নিয়ে গেছে। ঘরে তখন তার মা ছাড়া বাইরের কোনো লোকজন নেই।

এসময় সাধারণত গ্রামে বিদ্যুৎ থাকে না। আজো নেই। একটা রিচার্জেবল লাইট জ্বলছে মাঝের ঘরটায়। সামনের ঘরে একটি চেয়ারে বসে আছে হাবিবুর। মায়ের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। সে-সময় রুইতনের মুখটি ভেসে ওঠে তার চোখে। ফর্সা গোলগাল মুখ রুইতনের। নাকে একটা সোনার বেশন। প্রথম দেখায় প্রেমে পড়েছিল হাবিবুর। এক বাপের এক ছেলে বলে অনেকেই জামাই করতে চেয়েছিল। কিন্তু হাবিবুর মজে গিয়েছিল রুইতনের প্রেমে। পরিবারকে চাপ দিয়ে রাজি করায় সে।

কিন্তু তিক্ততা তৈরি হতে দেরি হয় না। জুয়া খেলা নিয়ে সংসারে অশান্তি বাড়তে থাকে। হাবিবুর ভাবে, রুইতনের কোনো দোষ ছিল না। সে জুয়া খেলা ছেড়ে দিলে আর ঝগড়া হতো না। হাবিবুর ভাবে, সন্তান না হওয়ায় রুইতনের মধ্যে হতাশা ছিল; কিন্তু সে তো অপারগ। রুইতন বারবার চাপ দিচ্ছিল ডাক্তার দেখাতে, চিকিৎসা নিতে। সে রাজি হয়নি। কারণ বিয়ের কয়েক বছর আগে একটি মেলায় জুয়ার আসর থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল। পুলিশের বেদম প্রহারের চিকিৎসা নিতে গিয়ে জেনেছিল তার সন্তান হওয়ার কোনো আশা নেই। সে-কথা গোপন রেখে আজ না কাল যাব যাব করে চিকিৎসকের মুখোমুখি হয়নি সে। এই দুর্বলতা প্রকাশ পেলে রুইতন তাকে ফেলে চলে যাবে – সে আশংকায় ভোগে সে সবসময়। অনুশোচনায় দগ্ধ হতে থাকে হাবিবুর। বড় ভালোবেসে রুইতনকে বিয়ে করেছিল সে। আজ সন্ধ্যায় প্রায়ান্ধকার ঘরে নাকে সোনালি বেশর, লাল মালা শাড়িতে মাথায় ঘোমটা দেওয়া রুইতনের মুখটি বারবার ভেসে ওঠে হাবিবুরের চোখে। হাবিবুরের ইচ্ছা হয় এখনই গিয়ে রুইতনের কাছে মাফ চেয়ে তাকে ঘরে নিয়ে আসতে। কিন্তু তার সাহস হয় না। হুজুর বলেছেন, আজ থেকে সে রুইতনের কাছে বেগানা পুরুষ। রুইতন তার পর হয়ে গেল ভেবে ভেঙে পড়ে সে । গগনবিদারী কান্নার সঙ্গে ক্রমাগত বলতে থাকে, ‘অ মা আঁর রুইতনরে আনি দে। আঁই রুইতনরে ছাড়া বাঁইচতেম ন।’

মা এসে তার শিয়রে দাঁড়ায়। মাকে দেখে হাবিবুর আরো জোরে বিলাপ করতে থাকে, ‘অ রুইতন, আঁরে ফালাই তুই কডে গেলিগই।’

তিন

এই গ্রামের বহুল আলোচিত চরিত্র করিম। বয়স যখন ছয় কি সাত সে-সময় পরপর মা-বাবা মারা যাওয়ার পর কিছুদিন এর ঘরে, কিছুদিন ওর ঘরে এভাবে প্রতিপালিত হচ্ছিল সে। এর মধ্যে হঠাৎ কোথায় যেন সে উধাও হয়ে যায়। প্রায় ২০ বছর পর যখন ফিরে এলো তখন সে পরিণত যুবক।

পোশাক-পরিচ্ছদে বেশ পরিবর্তন হয়েছে। গ্রামে সবাই লুঙ্গি পরলেও সে পরে পাজামা ও শার্ট। কথাবার্তা খুব একটা বলে না কারো সঙ্গে। সে কী করে, কোথায় থাকে সুনির্দিষ্টভাবে কেউ জানে না। সে নিখোঁজ থাকার সুযোগে বাপের ভিটের অনেকটা চাচা-জ্যাঠারা দখল করে নেয়। সে শুধু দোচালা একটা টিনের ঘর পায়। দোচালা ঘরটুকু পেলেও আর কোনো সম্পত্তি সে পায়নি। তার আবির্ভাব যে চাচা-জ্যাঠারা ভালোভাবে নেয়নি তা গ্রামের কেউ কেউ জানলেও করিমের স্বার্থ রক্ষায় এগিয়ে আসেনি। প্রায় সময় দু-চারজন তরুণ তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। গ্রামের দু-চারজন তরুণগোছের ছেলেও মাঝেমধ্যে করিমের কাছে যায়। তাদের সঙ্গে করিম কী নিয়ে কথা বলে বা আদৌ কথা বলে কি না তা জানে না গ্রামবাসী। তবে করিম গ্রামে এলে তা জানা হয়ে যেত গ্রামবাসীর। রাত গভীর হলে সে বাঁশি বাজাতো। গ্রামের পুবে যে-সড়কটি একসময় গ্রামে ঢোকার একমাত্র অবলম্বন ছিল তার একটি পাকা সেতুতে বসে সে বাঁশি বাজায় প্রায় ভোর অবধি। তখন গ্রামের মানুষ বলাবলি করত, ‘করিইম্যা আইস্যি।’ করিমের বাঁশি বাজানো পছন্দ করেন না ইমাম, মাতব্বরসহ অধিকাংশ মুরুব্বি। তবে উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা এ-কারণেই পছন্দ করে করিমকে। বহুবার তাকে শাসানো হয়েছে। একবার তাকে মারধরও করা হয়েছিল বাঁশি বাজানোর কারণে। তাদের অভিযোগ, বাঁশি বাজানো হারাম। কিন্তু করিম বাঁশি বাজানো বন্ধ করেনি। যে-কারণে মাতব্বর, তাদের চেলাচামুণ্ডা ও ইমাম সাহেব পছন্দ করেন না করিমকে।

পরের দিন আসরের নামাজের পর ইমাম সাহেবের মতামত নিতে যায় হাবিবুর। ইমাম সাহেব বলে দিলেন, ‘তোঁয়ারার মইধ্যে তালাক হই গেইয়্যি। এখন লত তুঁই হইলেদে, তোঁয়ার বউর নাম কী কইলেদে? রুইতন?’

হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে হাবিবুর। ‘এখন হইতে রুইতনর লাই বুলি তুঁই বেগানা পুরুষ।’

ইমাম সাহেব কথা শেষ করার আগেই হাবিবুর তাঁর দুখানি পা জড়িয়ে ধরল।

‘আঁই ন বুঝি হুজুর অনে এক্কান ব্যবস্থা গরি দন।’

হুজুর অনেক ভেবেচিন্তে মত দিয়েছেন, হাবিবুর আবার রুইতনকে পেতে পারে শরিয়তের এক শর্তে। রুইতনকে আবার বিয়ে দিতে হবে। সে স্বামী তালাক দিলে হাবিবুর আবার আকদ পড়ে রুইতনকে ঘরে তুলতে পারবে। এটাকে বলে হিল্লা বিয়া।

গ্রামের কয়েকজন এ-বন্দোবস্তের দায়িত্ব নেয়। একসময় তারা একটা উপায় বের করে। তারা ভাবে, করিম পাগল মানুষ, তাকে যা বলা হবে সেটাই সে শুনবে। তাই না করিমের সঙ্গে, না রুইতনের সঙ্গে কোনোরূপ আলাপ না করে ধরেবেঁধে তাদের বিয়ে পড়িয়ে দেওয়া হয়। সমাজের এই প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কোনো মতামত দিতে পারে না রুইতন বা তার বাবা-মা। সমাজের এই রায় তাদের মেনে নিতে হয়। তবে হিল্লে বিয়েতে করিম রাজি হওয়ায় অনেকে বিস্মিত হয়। তবে রুইতনকে পইপই করে বলে দেওয়া হয়, সে যেন করিমের সঙ্গে সহবাসে রাজি না হয়।

করিমের ঘরে এসে এ-বিষয়ে সতর্ক থাকে রুইতন। হাবিবুরের টাকায় মনির আহমদ বাজার করে দিয়ে যায়। দু-বেলা খাবার বেড়ে দিয়ে আড়াল থেকে করিমকে খেতে আসতে বলা ছাড়া এর মধ্যে আর কোনো ধরনের কথা হয়নি দুজনের মধ্যে।

এভাবে প্রায় দু-সপ্তাহ কেটে যায়। একরাতে হঠাৎ এক পুরুষের কণ্ঠে রীতিমতো চমকে ওঠে রুইতন। ‘জেগে আছো রুইতন?’

রুইতন ভাবে, ঘরে রেডিও বাজায় কে? সেখানে তার নাম বলল কেমনে? মাটিতে পাটি বিছিয়ে একা শুয়েছিল রুইতন। ধড়ফড় করে উঠে পড়ে। কাউকে উদ্দেশ করে বলে, ‘ঘরত রেডিও বাজাদ্দে কনে?’

পাশের রুম থেকে আবার সে-কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, ‘আমি কথা বলছি, তুমি জেগে থাকলে কথা বলব।’

‘ইবে এইন কী কদ্দে’ বলতে বলতে শাড়ি ঠিক করতে করতে দাঁড়িয়ে যায় রুইতন। সে খেয়াল করে তার শরীর কাঁপছে। যা
দোয়া-দরুদ জানে তাই পড়তে থাকে জোরে জোরে।

‘তোমাকে ভয় পাইয়ে দিলাম বলে দুঃখিত রুইতন। আসলে এত সুন্দর জ্যোৎস্না রাতে কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে। এমন একটি রাত তো মাসে একবার আসে মাত্র। তার ওপর বর্ষাকালে অনেক সময় দেখাও যায় না। জানো? আনন্দ ভাগ করে নিতে হয়, দুঃখটা শুধু নিজেকেই সইতে হয়।’

এত সুন্দর করে কথা বলে কেউ এর আগে জানতো না রুইতন। তার আবারো মনে হয় কেউ রেডিও বাজাচ্ছে। হাবিবুরের একটা রেডিও আছে। প্রতিদিন দুপুরবেলা অনুরোধের আসর আর সন্ধ্যার পরপর দুর্বার অনুষ্ঠানে গান শুনতো সে। তার মনে হয়, রেডিওর সে-লোকটা তার সঙ্গে কথা বলছে। সে বেড়ার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকায়। দেখে আসলেই জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে সব।

‘এসো, বাইরে দাঁড়াই, এত সুন্দর পূর্ণিমায় ঘুমাতে নেই।’

রুইতন বাইরে এসে দাঁড়ায়। চারদিকে সুনসান নীরবতা। বোঝা যাচ্ছে রাত গভীর। এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করে রুইতন। মনে হয়, জ্যোৎস্নায় ভেসে ভেসে সে এক আশ্চর্য দেশে চলে যাচ্ছে। মেঘের রাজ্য পেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে এক অমৃতলোকে। সেখান থেকে দেখতে পায়, হাবিবুর তাকে ডাকছে, ‘রুইতন তুই আঁর কাছে আয়।’

‘হাবিবের কথা ভাবছো? ও কিন্তু খুব কষ্ট পাচ্ছে তোমাকে ছেড়ে’ – এ-কথায় সম্বিত ফিরে পায় রুইতন। সঙ্গে সঙ্গে বলে, ‘হিতের কথা আঁই ন ভাবি।’

‘ওভাবে বলছো কেন? সে তোমাকে ভালোবাসে।’

রুইতন হাবিবুরের কথা শুনতে চায় না। প্রসঙ্গ পাল্টাতে চায়।

‘আইচ্ছা করিম বাই অনে বাংলাত কেয়া কথা কন? আঁরার ভাষা অনে ন জানন?’

‘জানি, কিন্তু তোমাদের মতো জানি না। আমি যাঁদের আশ্রয়ে থেকে লেখাপড়া করেছি, বড় হয়েছি, তাঁরা চট্টগ্রামের লোক নন।’

রুইতন করিমকে ছোট থাকতেই দেখেছে। তবে কখনো কথা হয়নি। তাকে যখন মারধর করা হচ্ছিল তখন লোকটি একটিবারের জন্যও প্রতিবাদ করেনি। এ-কথা শুনেছে সে লোকমুখে। তাই যতবার দেখেছে ততবারই লোকটির জন্য তার মায়া হয়েছে। মা-বাবা, ভাই-বোন ছাড়া একা লোকটিকে খুব অসহায় মনে হতো তার। মনে হতো, এর পক্ষে কেউ কিছু বলে না কেন? ভাগ্যের কী লীলাখেলা! আজ সে-লোকটির সঙ্গেই তার বিয়ে হয়েছে। যদিও সেটা স্থায়ী নয়। তিন মাস পর তাদের তালাক হবে। আবার তাকে ফিরে যেতে হবে হাবিবুরের ঘরে। কিন্তু রুইতনের আর ইচ্ছে করে না স্বামীর ঘরে ফিরে যেতে। সেই আগের অবস্থাই তো হবে। স্বামীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে একা বিছানায় ঘুমিয়ে পড়া, কিছু বললেই মার খাওয়া। এ-জীবন আর ভালো লাগে না তার। রুইতন ভাবে, কোনোভাবে যদি জীবন থেকে মুক্তি মিলত!

‘মৃত্যুর চেয়ে জীবন অনেক সুন্দর রুইতন। তবে সে সৌন্দর্য দেখার জন্য অন্তর্দৃষ্টি থাকা চাই।’ চাঁদের আলোর মতো মোলায়েম শোনালো করিমের কণ্ঠ।

রুইতন অবাক হয়। লোকটি তার মনের কথা জানল কী করে? লোকটি কি জাদু জানে?

‘এসো রুইতন, রাত প্রায় শেষের দিকে। ঘুমিয়ে পড়ো।’ উচ্চারণ করে লোকটি আর সম্মোহিতার মতো রুইতন তার ঘরে গিয়ে পাটিতে শুয়ে পড়ে, কিন্তু দু-চোখ তার এক হয় না।

যে-করিম বেদম মার খেয়েও একটি শব্দ করেনি, যে-করিম গ্রামের কারো সঙ্গেই কথা বলত না, সে-করিমকে কথার নেশা পেয়ে বসে। যত কথা জমে ছিল মনে তার সবটুকু প্রকাশ করে দিতে চায় সে। আর রুইতনকেও পেয়ে বসে সে-জাদু। মন্ত্রমুগ্ধের মতো রাতের পর রাত করিমের কথা শুনে যায় রুইতন।

সে-কথা জীবনের কথা, সে-কথা জ্ঞানের কথা, যে-কথা আগে কোথাও শোনেনি রুইতন সেসব কথা। অফুরান সে-কথার মাঝখানে একদিন রুইতন বলে, ‘তুঁই এতো কথা জানোদে করিম বাই তা তো আঁরা কেয়াই ন জাইনতেম। তুঁই এতো জ্ঞানী মানুষ, তুঁই বিয়াশাদি কেয়া ন গরো করিম ভাই?’

জবাবে করিম বলে না কিছু। সে তখন লালনের গান আর দর্শন নিয়ে কথা শুরু করে। ‘লালন কী বলেছেন জানো, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ পাবি।’

একদিন করিম বলে, ‘শোনো রুইতন ভালোবাসা হচ্ছে অমর। দেহের বিলোপ আছে, ভালোবাসার বিলোপ বা ক্ষয় নেই। যদি তুমি মন-প্রাণ দিয়ে কাউকে ভালোবাসো তাহলে সে-ভালোবাসা ব্যর্থ হবে না কখনো।’ রুইতন অবাক চোখে করিমের দিকে তাকায়। এত গভীরভাবে এর আগে দেখেনি সে। করিমের কোঁকড়া ঘন চুল আর টানা টানা চোখ কার কথা যেন মনে করিয়ে দেয়। ছোটবেলায় এমন চেহারার এক কবির কবিতা পড়েছিল বলে মনে পড়ে তার। কিন্তু কবির নামটি মনে আসে না। বুকের মাঝে এক অদ্ভুত ব্যথা টের পায় সে। এমন ব্যথা আগে কখনো কারো জন্য অনুভব করেনি। তার খুব বলতে ইচ্ছে করে, ‘করিম বাই আঁরে লই কোনোমিইক্যা যাইতগু ন পারো? তুঁই বুঝির ন পারো আঁরে? তোঁয়ার লাই বুলি আঁর পরানে কইছালে।’

কিন্তু কীভাবে বলবে? করিম তো উদাস মানুষ। সে

প্রেম-ভালোবাসা বোঝে বলেও মনে হয় না। মনের ময়নাকে মনের মধ্যে খাঁচাবন্দি করে রেখে রুইতন শুধায়, ‘আঁরে একদিন বাঁশি ন হুনাইবে করিম বাই?’

করিম মৃদু হাসে। সে-হাসিতে সম্মতি আছে কি না জানে না রুইতন।

অল্পদিনেই রুইতনের জগৎ পাল্টে যায়। তার মনে হয়, চোখ থেকে এক বিশাল পর্দা সরে গেছে তার। সে যেন নতুন করে জন্ম নিয়েছে আবার। এক নতুন পৃথিবীর দুয়ার খুলে যায় তার জন্য। বাবার ঘরে অনটন, স্বামীর ঘরে নির্যাতন কোনো কিছুই আর মনে থাকে না তার। মনে হয়, জগতের এতকিছুর পর তার এ-দুঃখ কোনো দুঃখই নয়। তার চেয়েও প্রচুর দুঃখী মানুষ আছে পৃথিবীতে। সংসারের ঝুট-ঝামেলাকে বড় তুচ্ছ বলে মনে হয় এখন। মনে হয়, এত তুচ্ছ ঘটনায় দুঃখ পেতে নেই।

করিম তার জীবনে যেন এক আলোর দিশারি হয়ে এসেছে। যে-রুইতন রিক্ত, নিঃস্বের মতো স্বামীর ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল বাবার সঙ্গে, সে-রুইতন আর এখন নেই। এই রুইতন এখন অনেক বদলে যাওয়া পরিপূর্ণ সাহসী ও আত্মনির্ভরশীল এক মানুষ।

চার

‘গাইল ন দিবেন কাক্কু’ – সরাসরি মাতব্বরের দিকে তাকিয়ে বলে রুইতন। ‘আঁরা কি অন’র কিনা গোলাম না?’

এতক্ষণ কিছুই বলেনি হাবিবুর। মাতব্বরের সঙ্গে রুইতন তর্ক করছে দেখে বলে, ‘রুইতন, তুই কার হঙ্গে বেয়াদবি গরোদ্দে?’

সমাবেশে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। মাতব্বরের মুখের ওপর এমন কথা কেউ বলতে পারে দেখে কেউ নিন্দা জানায়, কেউ সাবাশি দেয়। দুয়েকজন দাঁড়িয়ে যায়। রুইতনকে সাহস দিয়ে বলে, ‘ঠিক কতা কইয়ি রুইতন। হাবিইব্যা তুই ন মাতিবি।’

এভাবে সবাই কথা বলতে থাকায় সমাবেশে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় যখন, ঠিক তখনই করিমের গলার আওয়াজ পাওয়া যায় – ‘আমি তালাক দেব কি দেব না তা আমার সিদ্ধান্ত, আপনারা কে তা ঠিক করে দেওয়ার?’

সমাবেশস্থলে যেন বজ্রপাত হলো। লোকজন পরস্পরের দিকে তাকায়। কে কথা বলেছে সেটা বুঝতে তাদের বেশ কিছুক্ষণ লাগল। যারা দাঁড়িয়ে পড়েছিল তারা দ্রুত বসে যায়। যারা বসেছিল তারা আবার নড়েচড়ে বসে।

‘তুই কী কইতি চ’দ্দে করিম।’ মাতব্বরের কণ্ঠে উদ্বিগ্নতার আভাস। ‘আর তুই ছাবাইয়া ভাষায় কথা কদ্দে কারণ কী?’

‘আমি বলতে চাইছি, রুইতনের সঙ্গে তো আমার বিয়েই হয়নি, তালাক দেব কীভাবে? যেটা হয়েছে সেটা তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। তালাক দিয়েছে হাবিব তার জন্য শাস্তি কেন রুইতনকে পেতে হবে? এটা কেমন বিচার?’

একদিন গ্রামের মানুষের হাতে মার খাওয়া করিমের এমন দৃঢ় কথায় হতচকিত হয়ে গেছে অনেকে। আবার কেউ কেউ তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিতে চায়। কেউ কেউ ফিসফিসিয়ে বলে, ‘করিম্যা বাংলা ভাষাত কেয়া কথা ক’র।’

‘এই ধরনের কোনো বিয়ের কথা কোথাও লেখা নেই। এই জঘন্য নিয়ম একটি সভ্য সমাজে চলতে পারে না। আপনাদের ইচ্ছেমাফিক নিয়মও চলবে না আর। আরেকটি কথা, রুইতন হাবিবুরের ঘরে যাবে কি যাবে না সে-সিদ্ধান্ত রুইতনের। হাবিব বা আপনারা কিছু বলতে পারবেন না। রুইতন মানুষ তো! তার পছন্দের জীবন যাপনের স্বাধীনতা আছে।’

‘তোত্তুন আঁরা ভালা বুঝি করিইম্যা, মাতব্বর তুই না আঁই?’ মাতব্বরের কণ্ঠ ম্রিয়মাণ শোনায়।

‘আপনারা বিচারের কী বোঝেন? বিচার যদি বোঝেন তাহলে বিনা দোষে আমাকে পিটিয়েছেন কেন সবাই মিলে? বাঁশি বাজানো খারাপ কোন অর্থে?’

উপস্থিত লোকজন পরস্পরের দিকে জিজ্ঞাসুচোখে তাকায় এবং নিজেরাই বলে, ‘ঠিক তো!’

করিম বলে যায়। যেন, ‘আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পল্বলে’/ বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার-ভাঙা কল্লোলে।/ আসল হাসি, আসল কাঁদন/ মুক্তি এলো, আসল বাঁধন,/ মুখ ফুটে আজ বুক ফাটে মোর তিক্ত দুখের সুখ আসে।/ ঐ রিক্ত বুকের দুখ আসে -।’

আজ সত্যিই অর্গল খুলে গেছে করিমের। যেসব কথা কোনোদিন প্রকাশ করবে না ভেবেছিল, যে-লোকদের সঙ্গে কোনোদিন কথা বলবে না ভেবেছিল, আজ তাদের সামনে বলতে হচ্ছে। আজ তাদের সঙ্গেই কথা বলতে হচ্ছে। এ-রহস্য সে প্রাণপণে গোপন রাখতে চেয়েছিল। নিজের প্রতি এত অনাচার-অবিচার সত্ত্বেও প্রতিবাদ করেনি সে। অথচ রুইতনের ওপর অবিচার হচ্ছে দেখে সংকল্প থেকে টলে গেছে সে। ‘আমি হিল্লে বিয়েতে রাজি হয়েছি দেখে অনেকে অবাক হয়েছেন জানি। আমি গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু রুইতনের দুর্গতি মোচনের জন্য সিদ্ধান্ত বদলিয়েছি। আমি রইতনকে মুক্তি দিতে চেয়েছি। রুইতন এখন মুক্ত। বেঁচে থাকার জন্য কোনো অবলম্বনের প্রয়োজন হবে না তার।

‘আমার জন্ম এ-গ্রামে, বাবা-মায়ের কবর এখানে। নাড়ির টানে এখানে আসি। কিন্তু এখানে এত অবিচার, এত অনাচার তা আগে বুঝিনি। গ্রামবাসী সবাই আমার আত্মীয়, আপনাদের বলছি, অন্যায়কে অন্যায় বলুন। মানুষের মর্যাদা নিয়ে বাঁচুন।’

সেদিন করিমের কোনো কথার প্রতিবাদ করতে পারল না কেউ – না মাতব্বর, না ইমাম সাহেব। সালিশ অসমাপ্ত রেখে যে যার মতো বাড়ি ফিরে যায়। হাবিবুরের খুব ইচ্ছে হয়েছিল রুইতনকে খুব কাছ থেকে দেখার, একবার কথা বলার। কিন্তু সুযোগ পেল না সে। ভিড়ের মধ্যে কখন রুইতন চলে গেছে তা ঠাহর করতে পারেনি। এ-ঘটনার পর করিমকেও আর গ্রামে দেখা যায়নি কখনো।