শামসুর রাহমানের কবিতার ছন্দ-সৌন্দর্য

শুধু ভাব ভাষা নয়, কবিতার প্রাণ হচ্ছে ছন্দ। ছন্দ মূলত কবি ব্যক্তিত্ব ও চারিত্র্য, বিশেষ প্রবণতাকে রূপদান করে। সুধীন দত্ত বিষ্ণু দে’র চোরাবালি কাব্যের সমালোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন – ‘আমার বিবেচনায় কবি-প্রতিভার একমাত্র অভিজ্ঞানপত্র ছন্দ-স্বাচ্ছন্দ্য’। ছন্দকেই গুরুত্ব দিয়েছেন সুধীন দত্ত। কোন ছন্দে কবি তাঁর কবিতা লিখবেন, ভাবনাকে-অনুভূতিকে-উপলব্ধিকে কোন ছন্দে বন্দি করবেন তা কবি মাত্রেই ভালো জানেন। আন্তর প্রেরণার নানাবিধ তাগিদ থেকেই কবিতার ছন্দ নির্ধারিত হয়। তবে ছন্দ থাকলেই কবিতা হবে এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। ভাব, ভাষাও কবিতায় অবশ্যই বিচার্য। কবিতা হয়ে ওঠার বিষয়। কবিতার ছন্দ আর ছন্দের কবিতা নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে।

ছন্দ-ছুট কবিতার সংখ্যা খুব কম নয়। ভাঙচুর, একটু দোলা ও ব্যতিক্রমী চাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো ‘মাত্রাহীন আঙুল তুলে’ পাঠকদের শাসানো – এসব তো কবিতায়

থাকতেই পারে। মাত্রাবিন্যাসে অনিয়ম, ব্যাকরণের শাসনমুক্ত কিছু শব্দ-নির্মাণ কবি ইচ্ছে করলেই করতে পারেন।

বাংলা কবিতার হাজার বছরের ইতিহাস টেকনিকের ইতিহাস; ভাব-ভাষা বদলেছে, ছন্দেও এসেছে পরিবর্তন, ভাঙচুর। চর্যাপদের পাদাকুলক, দোহা ছন্দ মধ্যযুগের কবিতায় নেই। কাহিনি কাব্যে অক্ষরবৃত্তের প্রবল বিস্তার লক্ষণীয়, বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্তের আদিরূপ আমরা খুঁজে পাই, যেমন খুঁজে পাই চর্যাগীতিকায় অক্ষরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের একেবারে প্রত্নরূপ। মধ্যযুগে সব মঙ্গলকাব্যেই অক্ষরবৃত্তের রাজত্ব। মধ্যযুগে মিশ্রছন্দ ছিল না। যদিও কিছু উদাহরণ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন ছান্দসিক আবদুল কাদির তাঁর ছন্দ-সমীক্ষণ (পৃ ১৬৪-১৭১) গ্রন্থে। আবদুল কাদির উদাহরণগুলো মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের কাব্য থেকে সংগ্রহ করেছেন। এ প্রসঙ্গে কবি-ছান্দসিক আবদুল মান্নান সৈয়দের মন্তব্য স্মরণযোগ্য ‘আবদুল কাদির তাঁর গ্রন্থে যে

উদ্ধৃতিগুলো পেশ করেছেন, তাতে মিশ্রছন্দ নয়, মূলত স্বরবৃত্তের স্বাধীন স্বভাবই চিহ্নিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের আগে তো বটেই, পরেও চার মাত্রার পর্বভাগ স্বরবৃত্তের চলন হিসেবে ধরলেও কবিরা অনেক সময়ই স্বাধীনতা নিয়েছেন – প্রতি পর্বে চারের মূল চাল ঠিক রেখে মাঝেমধ্যে তিন বা পাঁচ, এমনকি ছয় মাত্রায় চালিয়ে দিয়ে। এগুলো মিশ্রছন্দের উদাহরণ নয়। এক-একটি কবিতা সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করলেই তার ছন্দ চারিত্র্য বেরিয়ে আসবে। আসলে মিশ্রছন্দ ব্যাপারটি আধুনিক কালের সৃষ্টি।’ (ছন্দ, আবদুল মান্নান সৈয়দ)

প্রাচীন ও মধ্যযুগে গদ্যকবিতা ছিল না, আধুনিককালে রবীন্দ্রনাথ গদ্য ছন্দের প্রবর্তন করেন। গদ্যেও রয়েছে এক ধরনের অন্তর্লীন ছন্দ। গদ্য মিলেরও হতে পারে, তবে গদ্যের স্বাভাবিক ধর্ম অমিলের দিকে। এ-প্রসঙ্গে জীবনানন্দ দাশের মন্তব্য স্মরণীয় : ‘কাব্যের ছন্দ তো অনেক রকম; গদ্যও তো একরকম ছন্দ। কবি যখন ভাবাক্রান্ত হন তখন চোখ তাঁর ছবি দেখে, কান শোনে ছন্দ এবং চোখও অনুভব করে যেন ছন্দবিদ্যুৎ; কোন ছন্দে কবিতাটি রচিত হবে মুহূর্তের ভিতরেই নির্ণীত হয়ে যায় অনেক সময়, কারণ যে কোনো আবেগ যে কোনো ছন্দে রূপ পরিগ্রহ করতে পারে না। কবি প্রেরণার তারতম্য অনুসারে ছন্দের জাতি নির্ণয় হয়।’

বিভিন্ন সময়ে, সময়ের ব্যবধানে কবিতার ছন্দ মোচড় খেয়েছে, বাঁক নিয়েছে। কবিতা নতুন ছন্দকে স্বাগত জানিয়েছে – মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ত্রিশের পঞ্চপাণ্ডব কবিতা-নির্মাণে বিচিত্রস্বভাবী ছন্দের যে-ব্যবহার করেছেন তা সত্যি বিস্ময়কর। ছন্দ ও শব্দশৈলীকে এমন একটি পর্যায়ে উন্নীত করেছেন এই কবিকুল যা থেকে অনেক বাঁক-নির্দেশনা, ভাবনার উজ্জ্বল উপাদান, ঋদ্ধ, অর্থময়ী শব্দ-জগতের সন্ধান পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ এবং ত্রিশ-চল্লিশ দশকের কবিতাকে আত্মস্থ করে পঞ্চেন্দ্রিয়-নির্ভর অনুভূতি ও উপলব্ধির বিকিরণের মাধ্যমে, অতল রহস্যময় সত্তার স্পর্শে একখানি অরৈবিক ভুবন নির্মাণ করেছেন সময় ও সমাজ-শাসিত ভাষা দিয়ে পঞ্চাশের কবি শামসুর রাহমান।

তিরিশের কবিদের শব্দগত, দর্শনগত, বিস্তৃত বোধের জগৎ থেকে সরে আসতে শামসুর রাহমানকে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। দু-তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পরপরই তাঁর নিজস্ব ভঙ্গি ফুটে উঠতে থাকে, ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রিকতার জাল ছিঁড়ে বহির্মুখী হয়ে তিনি বিশ্ব-আত্মাকে ছুঁয়ে ফেলেন; বহু ব্যবহৃত, বহুধা বিস্তৃত অক্ষরবৃত্ত পয়ারে তাঁর

মানস-ভ্রমণের চিত্র তিনি রচনা করেছেন চমৎকারভাবে :

     ৮                  ১০

আমিও তোমারই মতো/ প্রাদেশিক জলাভূমি ছেড়ে

দূরে সমুদ্রের দিকে/ যাত্রা করি, যদিও হোঁচট

খেয়ে পড়ি বার বার।/ রক্তে নাচে মায়াবী য়ুরোপ

ইতালী ভ্রমণ ক’রে/ সুদূর গ্রীসের জলপাই

পল্লবে বুলিয়ে চোখ,/ বুলেভার ছেড়ে ফিরে আসি

সতত আপন নদে/ তোমার মতোই কী ব্যাকুল-

আমাদের প্রত্যেকের/ ব্যক্তিগত কপোতাক্ষ আছে।

(‘আমিও তোমারই মতো’, শূন্যতায় তুমি শোকসভা)

এ-অংশে ‘জলপাই’ শব্দটি লক্ষণীয়। অক্ষরবৃত্তের নিয়মানুযায়ী ‘জলপাই’ তিনমাত্রার, কবি স্বাধীনতা গ্রহণ করে এ-শব্দটিকে ব্যবহার করেছেন চার মাত্রায়।

এ-কবিতার একটি অংশে কবি শামসুর রাহমান অক্ষরবৃত্তের চারিত্র্যের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন প্রচ্ছন্নভাবে মাত্রাবৃত্তের একটু রস-মাধুর্য, মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রিয়তমা হেনরিয়েটার চোখ হয়ে উঠেছে কবিতা :

৬         ৬              ৬

হেনরিয়েটার। চোখে দেখেছিলে। কবিতার শিখা?

নাকি কবিতাই/প্রিয়তমা হেন/ রিয়েটার চোখ?

৮ ৮

অভ্যাসবশত বেডে/ অসুস্থ আঙুল ঠুকে/ ঠুকে

তৃতীয় পঙ্ক্তির দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে পাঁচ মাত্রা এবং শেষ পঙ্ক্তিটি (৮  +  ৮ + ২) পুরোপুরি অক্ষরবৃত্তের। তবে এ-কবিতায় বিভিন্ন পঙ্ক্তিতে বিভিন্ন ছন্দ নেই। শুধু উপর্যুক্ত এ-অর্ধস্তবকে মাত্রাবৃত্তের চাল লক্ষণীয়। একে ঠিক মিশ্রবৃত্ত ছন্দ বলা যায় না। এ-ধরনের কবিতা পূর্বে অনেকেই নির্মাণ করেছেন। যেমন – বিষ্ণু দে’র ‘ক্রেসিডা’, ‘ওফেলিয়া’, সুধীন দত্তের ‘অর্কেস্ট্রা’ স্মরণীয়।

শামসুর রাহমানের প্রিয় ছন্দ অক্ষরবৃত্ত। সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন মুক্তক অক্ষরবৃত্তে তিনি। ‘তিরিশের পর থেকে এই মুক্তক অক্ষরবৃত্তই কবিদের প্রধান বাহন হিসেবে দেখা দিয়েছে। শামসুর রাহমানকে এই ছন্দে যত সহজে শনাক্ত করা যায়, ততটা যায় না মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত ছন্দে কিংবা নিñন্দ গদ্যকবিতায়। অক্ষরবৃত্তিক ধ্বনি তাঁর রক্তের ভিতরেই সঞ্চারিত, মনে হয়।’

                 (করতলে মহাদেশ, আবদুল মান্নান সৈয়দ)

মুক্তক অক্ষরবৃত্তের দু-একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে :

১. সহজ সৌন্দর্যে তুমি এসে বসলে আমার পাশে।

কবি প্রসিদ্ধির

অমেয় ভাণ্ডার থেকে রত্নরাজি নিয়ে

আজ আর সাজাবো না তোমাকে রঞ্জিতা। শুধু বলি,

তোমার চোখের মতো অমন সুন্দর চোখ কখনো দেখিনি।

‘বিচ্ছিরি গরম’।

বলেই সুনীল খাতা দুলিয়ে আমাকে তুমি হাওয়া

দিতে শুরু করেছিলে, সেই হাওয়া একরাশ নক্ষত্রের মতো

মমতা ছড়িয়ে দ্যায়।

[রঞ্জিতাকে মনে রেখে, উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ]

২. দুপুরের ছায়া মনে, হালকা পর্দা তুলে

তুমি এসে দাঁড়ালে কি পিঠ-ছাওয়া চুলে?

           (‘জর্নাল’, প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

দ্বিতীয় উদ্ধৃতিটি মিলান্ত্য মুক্তক অক্ষরবৃত্ত। ছকবাঁধা অক্ষরবৃত্তের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে শামসুর রাহমান মুক্তকের স্বাদ গ্রহণ করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে অক্ষরবৃত্তকে গদ্যাক্রান্ত করার প্রয়াস পেয়েছেন, ফুটিয়ে তুলেছেন অক্ষরবৃত্তের এক বিশেষ প্রকরণরূপ, যাতে রয়েছে গদ্যের স্বাচ্ছন্দ্য :

যেহেতু লৌকিকতার দড়িদড়া ছিঁড়ে বেপোয়ারা

উঁচিয়ে মাস্তুল সুন্দরের ভাস্বর সে নীলিমায়

ভ্রমণবিলাসী তাই সম্মিলিত মুখর প্রস্তাবে

দিয়েছি উন্মাদ আখ্যা;

           (‘অপাঙ্ক্তেয়’, প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

প্রসঙ্গত সুধীন দত্তের একটি কবিতার পঙ্ক্তি স্মরণযোগ্য : ‘বিংশ শতাব্দীর সমান বয়সী আমি মজ্জমান বঙ্গোপসাগরে’ – অক্ষরবৃত্তের এ-কবিতায় রয়েছে গদ্যের মেজাজ। অক্ষরবৃত্তকে নানাভাবে ভেঙেচুরে স্তবক নির্মাণ করেছেন শামসুর রাহমান, এক পদ থেকে আরেক পদে ভাবসঞ্চারিত করে কবিতার অভ্যন্তরে সৃষ্টি করেছেন গতিময়তা। কবি হৃদয়ের রক্তক্ষরণ, বিপন্নবোধ, প্রগাঢ় উপলব্ধি, রোমান্টিক চেতনাকে সংহত রূপ দিতে বেছে নিয়েছিলেন ভাস্কর্যরূপী সনেটকে। তবে তাঁর রচিত ‘সনেটগুচ্ছ যত না-সনেট তার চেয়ে বেশি চতুর্দশ পদবন্ধে রচিত কবিতা।’ তাঁর প্রতিটি সনেটই ১৮ মাত্রার অক্ষরবৃত্তে নির্মিত। দু-একটি নমুনা দিচ্ছি :

(ক) একদা তোমার মায়া স্পর্শে আমার প্রাক্তন মন

পাপড়ি মেলেছিলো দুদিনের জ্যোৎস্নায় দুরস্ত ঝড়ে

অলীক পদ্মের মতো। আজ শুধু স্মৃতি-রোমন্থন

সম্বল আমার এই তুমিহীন ব্যথাদীর্ণ ঘরে।

      (‘রজনীগন্ধার ঘ্রাণ’, প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

(খ) এখন কোথায় তুমি? বুঝি না দারুণ সর্বনাশ

পেতেছে জটিল ফাঁদ আমাদের অস্তিত্বের লোভে।

উড়ো কথা কানে আসে। মেটাতে এ জীবনের দাবী

ইতিমধ্যে এমনকি তুমিও হয়েছ পাতিহাঁস।

      (‘চতুর্দশপদী’, বিধ্বস্ত নীলিমা)

মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্তে কোনো সনেট শামসুর রাহমান নির্মাণ করেননি। কবি কখনো কখনো স্বেচ্ছায় অক্ষরবৃত্তের নিয়মনিষ্ঠ শরীরবৃত্ত ভেঙে দিয়েছেন :

চোখে নাগরিক

দৃশ্যাবলী গেঁথে/নষ্টালজিয়ায়/ মেদুর গলায়

কবিতার ডাকনাম ধরে ডেকেছেন কী ব্যাকুল।

              (‘বন্ধুদেব বসুর প্রতি’, এক ধরনের অহংকার)

এখানে দ্বিতীয় পঙ্ক্তিটি ৬ + ৬ + ৬ মাত্রায় নির্মিত।

কবি-ছান্দাসিক আবদুল কাদিরের মতে, ‘দ্বিতীয় পঙ্ক্তিটি ৬ + ৬ + ৬ অক্ষর যোগে গঠিত হয়েছে। এভাবে পঙ্ক্তি নির্মিত হলে অক্ষরবৃত্তের গাম্ভীর্য ক্ষুণ্ন হয় কি না, তা বিচার্য। তিনি অক্ষরবৃত্ত রীতির কবিতায় ব্যতিক্রমের প্রশ্রয় নিয়েছেন। যেমন –

সেই কবে আমি ‘হাসি-খুশির’ খেয়া বেয়ে

পৌঁছে গেছি রত্নদ্বীপে কম্পাস বিহনে।

      (‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, নিজ বাসভূমে)

কখনো বা চিত্রকরদের সৃষ্টি সান্নিধ্যে খুব

হয়েছি সমৃদ্ধ আর নিঃসঙ্গতায় ডুব

দিয়ে করি প্রশ্ন; এখনো আমার কাছে

কোন্ দৃশ্য সব চেয়ে গাঢ় হয়ে আছে?

     (ওই, কোন দৃশ্য সবচেয়ে গাঢ় হয়ে আছে?)

উৎকলিত প্রথম উদাহরণে ‘খুশী’র শব্দ প্রান্তস্থ বদ্ধধ্বনি ‘শীর’ এবং দ্বিতীয় উদাহরণে ‘নিঃসঙ্গতায়’ শব্দের প্রান্তবর্তী রুদ্ধধ্বনি ‘তায়’ এক ব্যষ্টিক গণ্য হওয়া অক্ষরবৃত্তে অবিধেয়’।

                 (‘বাঙলা ছন্দের ইতিবৃত্ত’, আবদুল কাদির)

শামসুর রাহমান নাগরিক জীবনযাপন, বৈদ্য, ফাঁপা মানুষের চালচিত্র, ফন্দি-ফিকির, ধান্দা, মেরুদণ্ড বাঁকা করেও বেঁচে থাকার চেষ্টা পর্যবেক্ষণ করেছেন, সবকিছু কাছ থেকে দেখার, বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাঁর শব্দজগৎ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নানা রকম শব্দ-সমবায়ে তিনি নির্মাণ করেছেন কবিতা। ভাষার বিভিন্ন স্তর থেকে প্রয়োজনীয় শব্দ-সহযোগে কবিতাকে মহার্ঘ করে তোলার জন্য তাঁর সাধনা নিরন্তর অব্যাহত ছিল। ঢাকা শহর – কবির স্মৃতির শহর, নাড়ির শহর, জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি এ-শহরের হৃদস্পন্দন শুনেছেন – তার নাড়ি-নক্ষত্র ছিল তাঁর নখদর্পণে। তাই ঢাকার, বিশেষত পুরনো ঢাকার

লোক-লোকভাষাকে এমন চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন যা সত্যি বিস্ময়কর ও নিরীক্ষাধর্মী। আঠারো মাত্রায় প্রবহমান অমিল অক্ষরবৃত্ত ছন্দে কবির প্রিয় ঢাকার আদিবাসীদের চিত্রভাষা এক বিশেষ বাগভঙ্গিকে মান্য করে জ্বলে উঠেছে :

আসলে কেউগা আমি? কোন্ হানেতে আছি হালায়

দাগাবাজ দুনিয়ার? কৈবা যামু আখেরে ওস্তাদ?

চুড়িহাট্টা, চানখাঁর পুল, চকবাজার, আশক

জমাদার লেইন, বংশাল। যেইহানে মকানের

ঠিকানা থাউক, আমি হেই একই মানু, গোলগাল

মাথায় বাবরি;

        (‘এই মাতোয়ালা রাইত’, এক ফোঁটা কেমন অনল)

এ প্রসঙ্গে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর ‘শামসুর রাহমানের    কবিকৃতি : খণ্ডিত সংবাদ’ লেখাটির কিছু অংশ উদ্ধৃত করা যেতে পারে : ‘এই কবিতাটি প্রকাশের পর কোনো কোনো মহল থেকে নাকি একটা প্রতিবাদ গুঞ্জরিত হয়েছিল – কবি ঢাকার আদিবাসীদের হাসির পাত্র, করুণার পাত্র করেছেন এ-কবিতায়। আমি এর সত্যতা বিষয়ে কিছুই জানি না। তবে কবিতাটি আমার কাছে এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা, শহরের লোকভাষায় একজন মহল্লাবাসী অত্যন্ত সাধারণ অথচ অত্যন্ত বর্ণিল জীবনের, একজন মৌলিক চরিত্রের মানুষের এই

আত্মপ্রতিকৃতি, প্রতিকৃতির সত্যতা ও ভাষার সত্যতার সম্মিলনে কবির বহুমুখী ক্ষমতার এক অজানা দিক উন্মোচন করছে। উঁচুমানের ঔপন্যাসিকের এ-ক্ষমতা থাকে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছিল, কিন্তু একজন কবির কাছে এ আমাদের প্রত্যাশার অতীত কিছু পাওয়া।’

                        (শামসুর রাহমান স্মারকগ্রন্থ, পৃ ৭০)

কিছু সø্যাং শব্দ ব্যবহার করেও লোকভাষার শক্তিকে কাজে লাগিয়েছেন কবি শামসুর রাহমান :

এখন নখরাবাজি ছাড়। লচ খাওয়া হয়ে গেছে

অনেক আগেই; সেই কবে থেকে জোমে আছি আর

তোমার জন্যেই আজ আমি উঠাইগিরা।

…         …           …

কেননা হেকোরবাজ নই

আমি আজো, যদিও ঢ্যাম্না বলা যায় ইদানীং;

        (‘কবিতার প্রতি ঢ্যাম্না’, আমার কোনো তাড়া নেই)

আঞ্চলিক লোকভাষা নিয়ে কবিতায় কিছু

পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন মনীষ ঘটক, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ। এদের মধ্যে সৈয়দ শামসুল হক লোকভাষাকে একটি মাত্রায় উন্নীত করেছেন। শামসুর রাহমান তাঁর জীবনের নানা পর্যায়ে ভাষার আন্তর শক্তি-সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন কবিতায়। তিনি নিভৃতচারিতার খোলস ভেঙে বহির্জগতের ভাবনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন, সর্বোপরি জাতীয় চেতনায় একাত্ম হয়ে সৃষ্টি করেছেন সপ্রতিভ শব্দের জগৎ, একটি স্বতন্ত্র রাহমানীয় কাব্যভাষা। অক্ষরবৃত্তে নির্মিত শামসুর রাহমানের বেশ কিছু সংখ্যক কবিতা কাহিনি-আভায় দীপ্ত – ব্যক্তি জীবন ও বহির্জীবনের নানা ঘটনা ও চরিত্র রূপ পেয়েছে এই সব কবিতায়। মাত্রাবৃত্ত ছন্দেও রয়েছে শামসুর রাহমানের ঈর্ষণীয় দক্ষতা।

মাত্রাবৃত্ত ছন্দ ‘যুগের নাড়ী মূলের নির্দেশ দান করে’ কি না তা নিয়ে একটু সন্দিহান ছিলেন জীবনানন্দ দাশ। জীবনানন্দ নিজেই মাত্রাবৃত্তের চেয়ে বেশি সংখ্যক কবিতা অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লিখেছেন। সব ছন্দই কম-বেশি যুগের ‘নাড়ী মূলের’ নির্দেশক।

১৯৭১। মার্চ মাস। চারদিকে অগ্ন্যুৎসব আর হত্যাযজ্ঞ। ‘শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক’। গ্রামের বাড়িতে কবি শামসুর রাহমান। এপ্রিলে শামসুর রাহমানের বয়ান – ‘এপ্রিল মাসের সাত অথবা আট তারিখে দুপুরের কিছুক্ষণ আগে বসেছিলাম আমাদের পুকুরের কিনারে গাছতলায়। বাতাস আদর বুলিয়ে দিচ্ছিল আমার শরীরে। পুকুরে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, কিশোর-কিশোরীও ক’জন সাঁতার কাটছিল মহানন্দে। হঠাৎ আমার মনে কী যেন বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো খেলে গেল। সম্ভবত একেই বলে প্রেরণা। কবিতা আমাকে জড়িয়ে ধরল। … পুকুরের প্রতিবেশী সেই গাছতলায় আবার বসে পড়ে খাতায় কাঠ পেনসিল দিয়ে শব্দের চাষ শুরু করলাম। প্রায় আধঘণ্টা কিংবা কিছু বেশি সময়ে পরপর লিখে ফেললাম দুটি কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ এবং ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’।’

(কালের ধুলোয় লেখা, শামসুর রাহমান,

পৃ ২৭৯-২৮০)

দুটোই বিখ্যাত কবিতা, পাঠকপ্রিয় কবিতা।

প্রথমটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে এবং দ্বিতীয়টি গদ্যছন্দে লেখা। ছয় মাত্রার মাত্রাবৃত্তে নির্মিত ‘স্বাধীনতা তুমি’র একটু অংশ উদ্ধৃত করছি :

স্বাধীনতা তুমি

বাগানের ঘর,/ কোকিলের গান

বয়েসী বটের/ ঝিলিমিলি পাতা,

যেমন ইচ্ছে/ লেখার আমার/ কবিতার খাতা

                 (‘স্বাধীনতা তুমি’, বন্দী শিবির থেকে)

শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে। এ কাব্যের ‘রূপালী স্নান’ কবিতাটি অসম পঙ্ক্তিতে বিন্যস্ত, ছয় মাত্রার মাত্রাবৃত্তে নির্মিত :

হাজার যুগের তারার উৎস ঐ যে আকাশ

তাকে ডেকে আনি হৃদয়ের কাছে, সোনালী অলস মৌমাছিদের

পাখাগুঞ্জনে জ্বলে ওঠে মন, হাজার হাজার বছরের ঢের

পুরোনো প্রেমের কবিতার রোদে পিঠ দিয়ে বসি,

           (‘রূপালী স্নান’, প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

কবি শামসুর রাহমান তাঁর কবি-জীবনের প্রথম ও মধ্যপর্যায়ে সব মিলিয়ে প্রায় ৭০টি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে কবিতা রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে’র মতো শামসুর রাহমানও ছয় মাত্রাপর্বের মাত্রাবৃত্ত ছন্দ ব্যবহার করেছেন স্বচ্ছন্দে এবং ফুটিয়ে তুলেছেন জীবনের তিক্ত-মধুর রূপ।

তিরিশের কবিদের মতো শামসুর রাহমান ছন্দের মধ্যে মুক্তির একটা পথ খুঁজেছেন। সাত মাত্রার মাত্রাবৃত্তেও শামসুর রাহমান তাঁর অসাধারণ কবিকৃতির পরিচয় দিয়েছেন :

আমার নড়বড়। বন্ধ জানালায়। কে যেন খুব জোরে। হঠাৎ দিলো টোকা

একাকী সত্তায়। জাগলো বিস্ময়। সত্য এলো কেউ?। নাকি মনেরই ধোঁকা?

                                (‘ভয়’, আমি অনাহারী)

এখানে প্রতি পঙ্ক্তিতে রয়েছে ৭ + ৭ + ৭ + ৭ মাত্রা। এ-কবিতার চতুর্থ স্তবকের প্রথম পঙ্ক্তিটি শুধু ব্যতিক্রম – ‘অনেক কাছে শুনি/ শব্দ কা কা’, ৭ + ৫ মাত্রাযোগে নির্মিত। ৫ মাত্রার অপূর্ণ পর্বের হঠাৎ আগমন আমরা লক্ষ করি। লক্ষণীয় তাঁর ‘কবর খোঁড়ার গান’ কবিতাও :

সে-সব ছেঁদো কথা। মস্ত ফাঁকি

বিবেক বিলকুল। লক্ষ্মী ছাড়া

মনের পশুটাও। চশমখোর

আমরা তিনজন। খুঁড়ছি গোর।

(‘কবর খোঁড়ার গান’, প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে)

এ কবিতায় ৭ মাত্রার সঙ্গে অপূর্ণপর্ব ৫ মাত্রা যোগ হয়ে এক চমৎকার আবহ তৈরি হয়েছে। মুখের ভাষাকে অনেক ক্ষেত্রেই শামসুর রাহমান মাত্রাবৃত্ত ছন্দে ফুটিয়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। আবদুল কাদির এ-কবিতাকে বলেছেন মিশ্রপর্বের কবিতা। ‘প্রকৃত প্রস্তাবে’ কবিতা কথ্যবাকভঙ্গিতে সিদ্ধ; সাত মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দে নির্মিত :

ভালোই আছি আজ। জ্বরের নেই তাপ;

সময় ভালো বটে। শীতের কিছু পরে।

হঠাৎ চেয়ে দেখি। এসেছে কোথেকে

চড়ুই পাখি দুটি। এসেছে এই ঘরে।

        (‘প্রকৃত প্রস্তাবে’, উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ)

শামসুর রাহমানের বিধ্বস্ত নীলিমা কাব্যের ‘তিনটি ঘোড়া’ নামক কবিতাও মাত্রাবৃত্তে ৭ মাত্রায় রচিত :

তিনটি শাদা ঘোড়া। বাতাসে দেয় লাফ

বন্য কেশরের। জ্বলছে বিদ্যুৎ।

পূর্বসূরিদের মধ্যে ৭ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দ-প্রয়োগে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিষ্ণু দে, আহসান হাবীব প্রমুখ কবি। তাঁর সমকালে সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদও ৭ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত কবিতা নির্মাণ করেন :

(ক) মধ্যযুগী এক/ যুবক গোস্বামী/ দেহেই পেতে চায়। পথের নির্দেশ

তোমার নাভিমূলে/ দেখেছি একা আমি/ নরমগুল্মের/ কৃষ্ণ সানুদেশ।

                  (‘শোণিতে সৌরভ’, সোনালি কাবিন)

  (খ) এমন ধনবান/ এই যে নাগরিক/ রাষ্ট্রপতি তাঁর। বন্ধু

এমন সভা নেই/ যেখানে তিনি নেই,/ কাব্য নয় তাঁর/ কণ্ঠ

পাঁচটি মহাদেশ। দেখেন তিনি ছেনে। নারীর শরীরের। বিদ্যুৎ,

                     (‘প্রেমিকের গাঁথা’, সৈয়দ শামসুল হক)

আল মাহমুদের মাত্রাবৃত্তমূলক কবিতা রীতিনিষ্ঠ। রীতিনিষ্ঠতাকে ভাঙতে বদ্ধপরিকর ছিলেন শামসুর রাহমান, মুক্তক মাত্রাবৃত্তের দিকে ঝুঁকেছেন তিনি সচেতনভাবে :

কেউ সচিত্র। পত্রিকা খুলে। অলস দৃষ্টি। মেলে

দেখে নটীময়। ফুরফুরে পাতা, পড়ে উড়ো কথা। কিছু;

কেউ বুক থেকে। তার জামদানী। শাড়ির আঁচল। হেসে

ফেলে দেয় অবহেলে।

           (‘চড়ুইভাতির পাখি’, যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে)

কবিতাটি ছয় মাত্রার মুক্তক মাত্রাবৃত্ত। মুক্তক মাত্রাবৃত্তের উদ্ভাবক কাজী নজরুল ইসলাম।

‘একজন অতিপ্রজ কবি’ শামসুর রাহমান। তাঁর অধিকাংশ কবিতাই তাঁর ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। অসামান্য এক শিল্পতৃষ্ণা নিয়ে তিনি কবিতা নির্মাণ করেছেন – নেচে-ওঠা লঘু ছন্দকে প্রয়োগ করেছেন কবিতায়, দুঃখময় জীবনের একাকিত্বকে মুক্তক স্বরবৃত্তে এঁকেছেন এভাবে –

দুঃখ কেবল/ দুঃখ হয়ে/ ফেলে গভীর। দীর্ঘ ছায়া

মুখের রেখায় –

তখন বুকের/ ভেতর শুধু / একলা লাগে।

একলা লাগে।

                 (‘এখন আমি’, এক ধরনের অহংকার)

কবিতাটি মিলহীন, প্রচ্ছন্ন অনুপ্রাসযুক্ত। ‘বাংলা ভাষার আদিতম’ ছন্দ স্বরবৃত্ত। প্রাচীন এ-ছন্দটিকে পরিশীলিত, পরিমার্জিত, পাঙ্ক্তেয় করে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ। স্বরবৃত্ত ছন্দের উজ্জ্বল নিদর্শন তাঁর ক্ষণিকা কাব্য। লোকজীবনের নানা অভিঘাতে, উপসর্গে, জোড়াতালিতে, মান-অভিমানে, তুচ্ছতায়, মালিন্যে, বচনে এ-ছন্দটি ক্রিয়াশীল। শামসুর রাহমান তাঁর নিজস্ব শব্দসুতায় গেঁথে তুলেছেন এ ছন্দের হৃদস্পদন :

ঘাতক তুমি সরে দাঁড়াও, এবার আমি

লাশ নেবো না।

নইতো আমি মুদ্দোফরাস। জীবন থেকে

সোনার মেডেল,

শিউলি ফোটা সকাল নেবো

ঘাতক তুমি বাদ সেধো নাম, এবার আমি

গোলাপ নেবো।

   (‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’, ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা)

এ-ছন্দ মূলত চলতি রীতির পন্থী। নিরতিশয় সামান্যদের কাছে এ ছন্দের আবেদন, সহজ থেকে গভীরে যাওয়ার ইশারা আমরা টের পাই। শামসুর রাহমান অবেলায় অবলম্বনহীন; কবির জীবন-পাত্র ভরে উঠেছে হলাহলে –

আমার স্মৃতির ঝোপেঝাড়ে

হরিণ কাঁদে অন্ধকারে।

এখন আমার বুকের ভেতর

শুকনো পাতা, বিষের মতো রাত।

       (‘কেউ কি এখন’, প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে)

আত্মগত-বৃত্ত ভেঙে বারবার বেরিয়ে এসেছেন শামসুর রাহমান। অসম পঙ্ক্তিক স্বরবৃত্তে লিখেছেন –

আমি যে এই ‘আমি’র খোলস ছেড়ে ছুঁড়ে যখন তখন বেরিয়ে আসি,

রৌদ্র-পোড়া জ্যোৎস্না-ঘোড়া এই সমাচার তোমার চেয়ে

ভালো করে কেউ জানে না।

                (‘বদলে ফেলি’, আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি)

প্রথম পঙ্ক্তিতে রয়েছে পাঁচ পর্ব এবং দ্বিতীয় পঙ্ক্তিতে ছয় পর্ব। কাজী নজরুল ইসলামের নির্ঝর কাব্যের প্রবহমান মুক্তক স্বরবৃত্ত ছন্দের ‘অভিমানী’ শীর্ষক কবিতাটির দীর্ঘতম পঙ্ক্তির পরিসর ৪ + ৪ + ৪ + ৪ + ২ স্বরকলা। সুতরাং উৎকলিত ‘বদলে ফেলি’ কবিতাটি পঙ্ক্তি-দৈর্ঘ্যের বিচারে শীর্ষস্থানীয়।

                  (‘বাংলা ছন্দের ইতিবৃত্ত’, আবদুল কাদির)

শামসুর রাহমান স্বরবৃত্ত ছন্দের কবিতায় মাত্রাবৃত্তেরও দোলা সঞ্চারিত করেছেন ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’র প্রথম স্তবকটি উদ্ধৃত করা যেতে পারে :

ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি

গোলাপ নেবো।

গুলবাগিচা বিরান ব’লে হরহামেশা

ফিরে যাবো,

তা হবে না দিচ্ছি বলে।

ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এবার আমি

গোলাপ নেবো।

শুধু এ-স্তবকটি মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত উভয় ছন্দেই সিদ্ধ। একে স্বরমাত্রিক মাত্রাবৃত্ত বলা যেতে পারে। এখানে দ্বিতীয় পঙ্ক্তিতে ‘ফিরে যাবো’ শব্দটি মাত্রাবৃত্ত নিয়মে চার মাত্রা। যদিও সম্পূর্ণ কবিতাটি স্বরবৃত্তে নির্মিত।

‘কবিতার মর্মসত্য পাঠকের অন্তরে অনুরণন তোলে’ ছন্দের মাধ্যমে। তাই শামসুর রাহমান ছন্দরূপে যেমন নিমগ্ন, তেমনি শিল্পরূপে ছন্দমুক্তির সাধনা করলেও বারবার তিনি ছন্দের মায়ামৃগজালে জড়িয়ে পড়েছেন। গদ্যছন্দে সমর্পিত হয়েছে তাঁর কবিসত্তা। প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞাতে ঋদ্ধ হয়ে জন্ম নিয়েছে তাঁর গদ্যকবিতা :

চাল পাচ্ছি, ডাল পাচ্ছি, তেল নুন লাকড়ি পাচ্ছি,

ভাগ-করা পিঠে পাচ্ছি, মদির রাত্তিরে কাউকে নিয়ে

শোবার ঘর পাচ্ছি –

…            …            …

নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে, মাটি কাটছে ট্রাক্টর,

ফ্যাক্টরি ছড়াচ্ছে ধোঁয়া, কাজ হচ্ছে,

কাজ হচ্ছে,

কাজ করছি, খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুমোচ্ছি, কাজ করছি।

         (‘দুঃস্বপ্নের একদিন’, নিজ বাসভূমে)

অজস্র সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয় শব্দ।

চেনা-জানা শব্দ-সমবায়ে পারিপাশির্^কতার পরিচয়, আপন অস্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন শামসুর রাহমান। এ গদ্যকবিতা কথ্যভাষাসমৃদ্ধ। আত্মগত বয়ান দিয়েছেন কবি ‘বংশধর’ (নিরালোকে দিব্যরথ) নামক গদ্যকবিতায় – নগর সভ্যতার শত বন্ধনে কবি-হৃদয় আবদ্ধ হলেও কখনো কখনো তিনি তাঁর ‘সমুদ্র-ঘেরা কবিতার দ্বীপপুঞ্জে’ বসে স্মরণ করেছেন পূর্বসূরিদের, যাঁরা আজ অতীত, ধরাছোঁয়ার বাইরে :

যেদিন আমার পিতামহের কাফন-মোড়া শরীরের ওপর

নশ্বর নক্সার মতো চাংবাঁশটায় পুঞ্জ পুঞ্জ শোক হয়ে কেবলি

ঝরে পড়ছিলো কালো মাটির দলা,

তখনও আমি পৃথিবীর কেউ নই।

            (‘বংশধর’, নিরালোকে দিব্যরথ)

বিষয়বস্তু, নিবিড় পর্যবেক্ষণ, বিচিত্র ভাবনা, কালিক দর্শন, সমসাময়িকতা, নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, সমাজ-রাজনীতির চূর্ণ অবয়ব নির্মাণে, রূপায়ণে শামসুর রাহমান নানা ছন্দ-জাল বিস্তার করেছেন। অর্থময়ী, লোকগ্রাহ্য শব্দ ও চেতনার নিবিড় সমবায়ে রচনা করেছেন তিনি কবিতা। আর কবিতায় তিনি চেয়েছেন নিরূপিত ছন্দের শাসন থেকে মুক্তি। মুক্তির লক্ষ্যেই তাঁর গদ্যছন্দে-লেখা কবিতার আয়োজন। তাঁর গদ্যকবিতায় এবং অন্যান্য ছন্দসিদ্ধ কবিতায় আমরা সহজেই লক্ষ করি বাকপটুতা। স্বরবৃত্ত নয়, মাত্রাবৃত্ত নয়, গদ্যছন্দ নয় – অক্ষরবৃত্ত। মুক্তক অক্ষরবৃত্তই কবি শামসুর রাহমানের প্রাণের ছন্দ। তাঁর অসংখ্য জনপ্রিয়, পাঠকনন্দিত কবিতা অক্ষরবৃত্ত- মুক্তক অক্ষরবৃত্তে নির্মিত, যেমন – ‘বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ (নিজ বাসভূমে), ‘আসাদের শার্ট’, ‘সফেদ পাঞ্জাবি’, ‘দুঃসময়ে মুখোমুখি’ (দুঃসময়ে মুখোমুখি), ‘এক ধরনের অহংকার’ (এক ধরনের অহংকার), ‘কখনো আমার মাকে’ (বিধ্বস্ত নীলিমা), ‘একটি চাদর’, ‘মাছ’, ‘টেলেমেকাস’ (নিরালোকে দিব্যরথ), ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’ (বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে), ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ), ‘ইকারুসের আকাশ’, ‘নিজের কবিতা বিষয়ে কবিতা’ (ইকারুসের আকাশ) ইত্যাদি।

‘কবিতা ছন্দ-প্রকরণ নিয়ে তাঁর ব্যাপক কৌতূহলের সাক্ষ্য তাঁর কবিতার অঙ্গেই ধরা আছে। তাঁর বিশেষ দুর্বলতা অক্ষরবৃত্তের প্রতি। অক্ষরবৃত্ত নিয়ে খেলেছেন, সাপুড়ে যেমন খেলা করে সাপকে নিয়ে। নিজেই কোথায় যেন বলেছেন, উটের মতো তাঁর অক্ষরবৃত্ত চলে এক দুলকি চালে। অক্ষরবৃত্তের সঙ্গে আছে বাংলা কবিতার মধুসূদন ও মধুসূদনোত্তর ধ্রুপদী ধারার এক গভীর সম্পর্ক। শামসুর রাহমান সেই ধ্রুপদী চালকে ভেঙে সেখানে এনেছেন এক অসামান্য নমনীয়তা, যেটা তাঁর এক বিশেষ কবিকৃতি বলে মনে হয়েছে আমার’ (‘শামসুর রাহমানের কবিকৃতি : খণ্ডিত সংবাদ’, জিলুর রহমান সিদ্দিকী, শামসুর রাহমান স্মারকগ্রন্থ, পৃ ৭১)। শামসুর রাহমানের কবিতায় বেজে উঠেছে ‘দিনানুদৈনিক জীবনযাপনের ছন্দ’। তাঁর কাব্যযাত্রার শুরুতে কিংবা

মধ্যপথে কেড়েছেন মন,

রবীন্দ্র ঠাকুর নন, সম্মিলিত তিরিশের কবি।

শামসুর রাহমান জীবনের অমৃত ও গরল নানাভাবে ছুঁয়েছেন, দেখেছেন – অবক্ষয়িত, সংকটাপন্ন নাগরিক জীবনের চালচিত্রকে এঁকেছেন এক অসাধারণ ব্যঞ্জনায়। তিরিশের ছন্দ-প্রকরণের আবহের মধ্যে থেকেও ছন্দের নানারকম ভাঙচুরের মাধ্যমে কবি শামসুর রাহমান নিজস্ব এক কাব্যভাষার সঙ্গে নির্মাণ করেছেন ছন্দের শতজল ঝর্ণাধারার মাঝে বাক্ছন্দের চমৎকার ঘরানা।