খুলনা-বাগেরহাটের মাঝে যে ছোট মিটারগেজ ট্রেনটা চলত সেটা বাগেরহাট ছেড়ে খুলনায় সকালে আসত আর বিকেলে বাগেরহাটে ফিরে যেত। খুলনায় মানে খুলনা শহরের পাশে রূপসা নদীর ওপারের খেয়াঘাটে এসে ট্রেনটা থামত। এ-ট্রেনের যাত্রীদের মধ্যে দু-বছর ধরে একজন তরুণী যাত্রীকে নিয়মিতই দেখা যেত। শোভা নামের মেয়েটা সকালের ট্রেনে খুলনায় আসত আর ফিরে যেত বিকেলের ট্রেনটাতে। তবে শোভা বাগেরহাট থেকে নয়, উঠত ফকিরহাট স্টেশন থেকে। স্টেশনের দু-মাইল দূরে যাত্রাপুর গ্রামে ওদের বাড়ি। গ্রামের বাড়ি থেকে ফকিরহাট স্টেশন পর্যন্ত মেয়েটা হেঁটেই আসত। তবে রূপসা স্টেশনে পৌঁছেও শোভার যাত্রা শেষ হতো না। খেয়ানৌকায় রূপসা নদী পার হয়ে ও খুলনা শহরের মধ্য দিয়ে আরো প্রায় দেড় মাইল পথ হেঁটে খুলনা আযম খান কমার্স কলেজে ক্লাস করতে যেত। ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক, কলেজের শিক্ষকেরা বা ওর সহপাঠীরা, শোভাকে কখনোই ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতে দেখেনি। গরমের আর বৃষ্টির দিনগুলোতে ও একটা ছাতা মাথায় দিয়ে চলত। মেয়েটাকে চেনার আরেকটা উপায় ছিল ওর শাড়ির রং। দুটো মাত্র শাড়ি পরত মেয়েটা। কোনো দিন সবুজ রঙের একটা শাড়ি, অন্যদিন নীল রংয়ের একটা শাড়ি। শাড়ি দুটো মলিন হলেও পরিষ্কার থাকত সবসময়। তবে বোঝাই যেত তরুণীটা এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ে এবং এটাও বোঝা যেত যে, মেয়েটা শিক্ষার মাধ্যমে ওর এবং ওর পরিবারের ভাগ্য পাল্টাতে চায়।
এভাবেই চলে আসছিল। শোভা তখন আই.কম শেষ বর্ষের ছাত্রী। আর মাস তিনেক পরেই ওদের ফাইনাল পরীক্ষা। এসময়ই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সপ্তাহ-দুই ওদের কলেজ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। কিন্তু সামরিক কর্তৃপক্ষের কড়া হুকুমে কলেজ আবার চালু হয়েছে। তবে ছাত্র ও শিক্ষকদের উপস্থিতি খুবই কম। তবে ক্লাস শুরু হয়েছে জেনে শোভা আবার কলেজে যাওয়া শুরু করে। খুলনা, বাগেরহাট সর্বত্রই তখন পাকিস্তানি সৈন্যদের শক্ত ঘাঁটি। তারা পথে পথে চেকপোস্ট বসিয়ে লোকজনকে থামিয়ে চেক করে। কাউকে কাউকে আটকায়ও। এসব পাকিস্তানি সৈন্যদের সম্পর্কে ভয়াবহ সব তথ্য শোনা যেত। সন্দেহভাজন যে-কোনো বাঙালিকে ধরতে বা মেরে ফেলতে ওরা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করত না। রেললাইনের ধারে, নদীর পারে বা খালের পানিতে প্রায়ই মানুষের লাশ ভাসতে দেখা যেত। তবে যুদ্ধ চললেও বাগেরহাট-খুলনা ট্রেন চলাচল কিন্তু বন্ধ হয়ে যায়নি। সরকারি ট্রেন। ফলে তা তো বন্ধ হতে পারে না। তবে যাত্রীসংখ্যা কমে গেল ব্যাপকভাবে। লোকজন নিজ নিজ গ্রাম বা বাড়ি থেকে এখন আর তেমন বের হয় না। কারণ পথঘাট তো নিরাপদ নয় মোটেই। তবে শোভা তখনো নিয়মিত এই ট্রেনের যাত্রী ছিল। এমনও হয়েছে যে, কোনো কোনো দিন ফকিরহাট স্টেশন থেকে সে-ই ছিল একমাত্র নারী যাত্রী, যে খুলনাগামী ট্রেনটাতে উঠেছে।
এদিকে ওদের গ্রাম যাত্রাপুরের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হয়ে পড়ছিল। হিন্দু পরিবারগুলোর অনেকেই গ্রাম ছেড়েছে। বাকিরাও ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফকিরহাট থানায়, বিশেষ করে যাত্রাপুর গ্রামটার আশেপাশের অঞ্চলে, বড় বিপদ হয়ে দেখা দিলো পাকিস্তানি সৈন্যরা ততটা নয়, কারণ তারা তখনো এত ভেতরে আসেনি। বিপদ হয়ে দেখা দিলো ফকিরহাটে মুসলিম লীগের শমশের ডাক্তারের অধীনে গড়ে ওঠা শান্তি কমিটির লোকেরা। পুলিশ বাহিনীকে এখন আর তেমন দেখা যায় না। তবে রাজাকার বাহিনী গড়ে উঠেছে এবং যাত্রাপুরসহ আশেপাাশের গ্রামগুলোতে তারা প্রায়ই ঢুকে মানুষের ঘরবাড়ি থেকে গরু বা টিনের চাল খুলে নিতে শুরু করল। আর অবস্থাপন্ন বাড়িগুলো থেকে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার তো হয়ে পড়ল তাদের বিশেষ লক্ষ্যবস্তু। আর হিন্দু বাড়ি হলে তো কোনো রক্ষাই নেই। সবকিছুই নিয়ে যেত। এমনকি জাল দিয়ে ধরে পুকুরের মাছ পর্যন্ত। তবে শোভাদের গোলপাতার বাড়িটাকে তারা হয়তো হামলার যোগ্য মনে করেনি। কারণ শোভার বাবা পুরোহিত নিত্যানন্দ চক্রবর্তী ছিলেন খুবই দরিদ্র একজন মানুষ। মাতৃহারা শোভার বাবা নিত্যানন্দ ঠাকুর মানুষ হিসেবেও ছিলেন বেশ সহজ-সরল। গ্রামের অন্য সবাই যখন চলে যাচ্ছে তখনো নিত্যানন্দ ঠাকুর গ্রাম ছাড়ার কথা ভাবেননি। আশেপাশে যে দু-পাঁচ ঘর যজমান ওর তখনো ছিল, ভেবেছিলেন, তাদের সাহায্যে এই খারাপ সময়টা পার করে দেবেন। কারণ খারাপ সময় তো কখনো বেশিদিন থাকে না। নিত্যানন্দ ঠাকুরের মনে আছে, পঞ্চাশ সালে এ-অঞ্চলে যখন কালশিরার বড় দাঙ্গাটা হয় তখনো গ্রামের অধিকাংশ হিন্দু পরিবার চলে গিয়েছিল। কিন্তু নিত্যানন্দ ঠাকুরের বাবা জগদানন্দ ঠাকুর বা জগন ঠাকুর গ্রাম ছাড়েননি। এবং দাঙ্গা একসময় থেমেও যায়। পরিবারটার বড় কোনো ক্ষতি ছাড়াই। নিত্যানন্দ ঠাকুর ভেবেছিলেন, হয়তো এবারো সেরকমই কিছু হবে।
বাবা-মেয়ে দুজনে তাই গ্রামেই রয়ে গেল। কলেজ খোলার পর শোভা যখন আবার খুলনা শহরে নিয়মিত যেতে চাইল তখন গ্রামের কেউ কেউ যে আপত্তি করেনি তা নয়। নিত্যানন্দ ঠাকুরও বলেছিলেন, এখন না যাওয়াই ভালো। কলেজ খুললেও পথঘাট তো নিরাপদ নয়। এসময় একজন হিন্দু মেয়ের পক্ষে একা চলাফেরা করা যে ঠিক হবে না এটা সবাই বুঝত। কিন্তু শোভা খুব জেদ ধরে যে, সামনে ওর পরীক্ষা। এসময় ওর ক্লাস মিস করা ঠিক হবে না। ফলে শোভা আবার প্রতিদিন সকালে ওদের গ্রাম থেকে দু-মাইল হেঁটে ফকিরহাট স্টেশনে এসে ট্রেন ধরা শুরু করল।
বাগেরহাট-খুলনা লাইনের ট্রেনটা ফকিরহাট স্টেশনে এসে পৌঁছত সকাল ৯টার দিকে। তবে এ-ট্রেনটা ধরতে শোভাকে ঘুম থেকে উঠতে হতো ভোর ৫টায়। কারণ বাবার জন্য সারাদিনের রান্না করে, নিজে প্রস্তুত হয়ে, আর কিছু লেখাপড়ার কাজ থাকলে সেসব সেরে, সকাল ৮টার দিকে সে ফকিরহাট স্টেশনের দিকে রওনা দিত। প্রথমে কলেজের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরা শোভাকে দেখে বেশ বিস্মিত হয়েছিল। তবে কলেজে ওর কোনো সমস্যা হয়নি। বরং সবাই ওকে উৎসাহই দিত।
এভাবেই চলছিল। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো আষাঢ় মাসের এক সকালে। আকাশটা সেদিন ছিল মেঘাচ্ছন্ন। বৃষ্টি তখনো নামেনি। তবে নামবে নামবে করছে। এসময় ফকিরহাট স্টেশনে শোভা এসে পৌঁছল। সে যখন প্লাটফর্মের দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কে যেন তাকে পেছন থেকে ডাকল, ‘এই মেয়ে, এদিকে আসো।’ গত তিন সপ্তাহ ধরে ফকিরহাট স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের পাশের একটা খালি ঘরে রাজাকাররা একটা অফিস বসিয়েছে। আগে ওটা ছিল বিনোদ সাহার চা-বিস্কুট-কলার দোকান। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিনোদ সাহা দোকান বন্ধ করে কোথায় যেন চলে গেছে। কানাঘুষায় শোনা যায় যে, বিনোদ সাহা নাকি ভারতে পালিয়ে গেছে। ফকিরহাটের কিছু রাজাকার বিনোদ সাহার ছোট দোকানটা দখল করে ওখানে এখন রাজাকারদের একটা অফিস বানিয়েছে। অফিসটার সামনে একটা বেঞ্চে রাইফেল নিয়ে তিন-চারজন রাজাকারকে প্রায়ই বসে থাকতে দেখা যেত। ডাকটা ওই অফিসঘরটার দিক থেকেই আসছিল।
শোভা কিছুটা চমকে গেলেও কোনো অশুভ চিন্তা ওর মনে তেমন আসেনি। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আমারে ডাকছেন?’ শোভা দেখল রাজাকার অফিসটার সামনে রাইফেল কাঁধে দাঁড়ানো বেঁটেমতো একজন লোক তাকে হাতের ইশারায় ডাকছে। লোকটা জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি শোভা না?’ শোভা বলল, ‘হ্যাঁ … ক্যান? আমারে ডাকেন ক্যান?’ লোকটা বলল, ‘অফিসে আসো। তোমার লগে আমাগো কথা আছে।’ লোকটার পেছন পেছন শোভা অফিসঘরটাতে ঢুকল। দেখল একটা টেবিল ঘিরে আরো তিনজন রাজাকার বসা। শোভা খেয়াল করল টেবিলের পাশে দুটো খালি চেয়ার আর উল্টো দিকে দেয়াল ঘেঁষে খালি একটা বেঞ্চ থাকলেও তাকে কেউ বসতে বলল না। রাজাকারগুলোর মধ্যে যাকে নেতা বলে মনে হচ্ছিল সে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার বাড়ি যাত্রাপুর না?’ মাথা নাড়িয়ে শোভা বলল, ‘হ্যাঁ।’ লোকটা এবার জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার বাবার নাম তো নিত্যানন্দ ঠাকুর, তাই না?’ শোভা বুঝল লোকগুলো তার অচেনা হলেও ওরা তার এবং তার পরিবার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে। শোভা জিজ্ঞেস করল, ‘আমারে ডাকিছেন ক্যান?’ ওরা কেউ কোনো জবাব দিলো না। এবার শোভা কিছুটা মরিয়া হয়ে বলে উঠল, ‘আমারে কলেজে যাতি হবে। ট্রেন এসে পড়বে এক্ষুনি।’ কিন্তু লোকগুলোর মধ্যে কোনো তাড়া দেখা গেল না। তারা যেন জানেই শোভার এ-ট্রেনটাতে চড়া হবে না। একজন রাজাকারকে বরং পাশের জনকে ফিসফিস করে বলতে শোনা গেল, ‘মালটা তেজী আছে।’ কথাটা আবছাভাবে শুনতে পেল শোভা। নেতাগোছের রাজাকারটা এবার শোভার দিকে সরাসরি চেয়ে বলল, ‘দ্যাশের সব হিন্দু তো ভাগছে। তোমরা বাপ-বেটি এহনও পড়ে আছো কী জন্যি?’ শোভা শুনল দ্বিতীয় একজন রাজাকার তার পাশের জনকে বলছে, ‘কেসটায় ভেজাল আছে।’
এবার শোভা কিছুটা শঙ্কিত হলো। তবুও গলায় স্বাভাবিকতা রেখে জিজ্ঞেস করে, ‘আমি তা’ হলি এখন যাই?’ রাজাকারদের নেতাটা বলল, ‘না। তোমার লগে আমাগো কাম আছে।’ তারপর দেয়ালের দিকে রাখা বেঞ্চটার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘ওহানে বসো।’ শোভা ধীর পায়ে হেঁটে ওই বেঞ্চটাতে গিয়ে বসে। তবে সে কান খাড়া করে রাখে যে লোকগুলো তার সম্পর্কে কী আলাপ করে। ভেসে আসা কথাগুলোর মাঝে সে শুনল বাগেরহাটের কথা, আর্মি ক্যাম্পের কথা, শমশের ডাক্তারের কথা। যদিও শমশের ডাক্তার নামটা এ-অঞ্চলে বর্তমানে রীতিমতো একটা আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে তবুও সে-নামটা শুনে শোভা যেন কিছুটা স্বস্তি পেল। কারণ শমশের ডাক্তারের মেয়ে আয়েশার সঙ্গে সে ফকিরহাট গার্লস স্কুলে একই ক্লাসে পড়েছে।
শোভা আরেকবার কিছুটা মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আমার ট্রেন এসে যাবে। আমারে যাতি দেবেন না?’ চেয়ারে বসা রাজাকার নেতাটা জবাবে তাকে আশ্বস্তের সুরে বলল, ‘শমশের সাহেব আসুক। উনিই তোমার ব্যাপারে ঠিক করবেন।’
খুব বেশি দেরি হলো না। একটা মোটরসাইকেলের পেছনে বসে শমশের ডাক্তার ফকিরহাট স্টেশনে এসে নামল। আগে শমশের ডাক্তার সাইকেলে চলাফেরা করত। এখন একটা মোটরসাইকেলের পেছনে বসে এখানে-ওখানে যাতায়াত করে। মোটরসাইকেলটা চালায় রাইফেল কাঁধে খাকি শার্ট পরা কুদ্দুস নামে এক রাজাকার। নৃশংসতার জন্য কুখ্যাতি আছে কুদ্দুস রাজাকারের। শমশের ডাক্তারের আদি বাড়ি ফকিরহাটের পেছনের দিকে বিলের পারে হাইলেকান্দি গ্রামে হলেও ফকিরহাট বাজারে শমশের ডাক্তারের একটা হোমিওপ্যাথির চেম্বার আছে। ফকিরহাট বাজার সংলগ্ন যে-ঘরে শমশের ডাক্তারের চেম্বারটা সেই একতলা বাড়িটা আগে ছিল এ-অঞ্চলের নামকরা শিক্ষক বিকাশরঞ্জন দত্তের বাড়ি। পঞ্চাশের দাঙ্গার পর বিকাশবাবুরা এদেশ ছেড়ে চলে গেলে শমশের ডাক্তার বাড়িটা দখলে নেয়। বেশ বড় বাড়িটার পেছনদিকে শমশের ডাক্তার এখন সপরিবারে থাকে। আর বাজারের দিকে সামনের ঘরটায় তার চেম্বার। খুব বেশি রোগী যে শমশের ডাক্তারের চেম্বারে আসে তা নয়। তবুও প্রতি বিকালে চেম্বারটা লোকজনে ভরা থাকত। এসব লোকজনের মধ্যে শমশের ডাক্তারের রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকরাই বেশি। আর এখন শমশের ডাক্তার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হওয়াতে তার অফিসটা ইদানীং ভিড়ে প্রায় গিজগিজ করে। নানা রকম তদ্বির নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসে। সবাই বুঝে গিয়েছে যে, এই যুদ্ধের মধ্যে থানা-পুলিশের কাছে গিয়ে কোনো লাভ নেই। ফকিরহাটের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা এখন শমশের ডাক্তারই।
শমশের ডাক্তার ফকিরহাট স্টেশনের রাজাকারদের অফিসঘরটায় ঢুকলে রাজাকারগুলো দাঁড়িয়ে যায়। নেতাগোছের রাজাকারটা নিজের চেয়ারটা শমশের ডাক্তারকে ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘বসেন ডাক্তার সাহেব।’ শোভা দাঁড়িয়ে শমশের ডাক্তারকে সালাম দিলো। কিন্তু শমশের ডাক্তার শোভার সালামের কোনো জবাব দিলো না। কেবল ভ্রƒকুটি করে তার দিকে একবার তাকাল। তাকে দেখে মনে হলো, শোভার ব্যাপারটা শমশের ডাক্তার জানে এবং শোভার ব্যাপারে যে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে আছে সেটাও। এরই মধ্যে বেশকিছু লোকজন অফিসটার দরজা আর জানালার কাছে এসে ভিড় করে শোভাকে দেখতে শুরু করেছে। লোকগুলো এমনভাবে শোভার দিকে তাকিয়ে দেখছিল যেন মেয়েটা চিড়িয়াখানায় বন্দি কোনো হরিণী।
প্রথমে অস্বস্তি ও পরে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল শোভা। আসলে শোভার তো জানার কথা নয় যে, এরই মধ্যে বাগেরহাটের পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে একটা পরিবর্তন ঘটেছে। পাঞ্জাব রেজিমেন্টের যে-ব্রিগেডটা বাগেরহাটের দায়িত্বে রয়েছে সে-ব্রিগেডের কমান্ডার আগে ছিল মেজর আজমত শিরওয়ানি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ হলো মেজর শিরওয়ানির বদলে ব্রিগেডটার নতুন কমান্ডার হয়ে এসেছে মেজর বিল্লাল খটক। মেজর শিরওয়ানির মানুষ হত্যায় বেশ আগ্রহ ছিল। বাগেরহাট অঞ্চলের বেশকিছু বড় গণহত্যা মেজর শিরওয়ানি এবং তার বাহিনী ঘটিয়েছে। কিন্তু মেজর বিল্লাল খটককে দেখা গেল একটু অন্যরকম। মানুষ হত্যায় তার ততটা আগ্রহ নেই। তবে নতুন এ-মেজরটা খুবই নারীমাংস লোলুপ। আর তার বিশেষ আগ্রহ হচ্ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষিত মেয়েদের প্রতি। তার অধীনস্থ শান্তি বাহিনী আর রাজাকারদের ওপর বিশেষ নির্দেশ ছিল এ-ধরনের মেয়েদের জোগাড় করে মেজর বিল্লালের ক্যাম্প বাগেরহাট সার্কিট হাউসে পাঠাতে। নিজের ভোগের পর এসব মেয়েকে মেজর বিল্লাল খটক ওর নিচের দিকের সৈন্যদের দিয়ে দিত। পরে এসব হতভাগ্য অনেক মেয়েরই পরিণতি হতো ভৈরব নদীর জলে। কেউ কেউ আত্মহত্যাও করত।
এরই মধ্যে বেশ কিছুটা সময় পার হয়েছে। শোভা এবার সাহস করে উঠে শমশের ডাক্তারকে আরেকবার সালাম দিয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শোভাকে কাছে এগিয়ে আসতে দেখে শমশের ডাক্তার ওকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী চাও?’ শোভা বলে, ‘চাচা, আমারে আপনারা আটকে রাখতিছেন কেন? আমার কলেজ …।’ শমশের ডাক্তার তাকে কথাটা শেষ করতে দিলো না। বলে উঠল, ‘এখন কলেজ-টলেজ যাওয়া বন্ধ। … তোমারে বাগেরহাটে যাতি হবে।’ কথাটা শুনে শোভার দু-চোখে যেন অন্ধকার নেমে এলো। ক্ষীণস্বরে বলল, ‘বাগেরহাটে কেন?’ শোভার মুখে এ-প্রশ্নটা শুনে যেন কিছুটা ক্ষেপেই গেল শমশের ডাক্তার। রাগান্বিত স্বরে বলে উঠল, ‘তার আমি কী জানি! সেসব জানে মেজর সাহেব।’ শোভা বুঝতে পারছিল ওর কী সর্বনাশ ঘটতে চলেছে। কোনো তরুণী মেয়েকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে পাঠালে কী ঘটে সেসব তো অন্য সবার মতো সে-ও শুনেছে। শোভা প্রায় শমশের ডাক্তারের পায়ে পড়ে গেল। কেঁদে উঠে বলল, ‘চাচা, আমি আপনার মেয়ে আয়েশার সঙ্গে এক ক্লাসে পড়িছি। আমি আপনার মেয়ের মতো।’ কিন্তু শমশের ডাক্তার অনড় হয়ে বসে রইল। তার মেয়ের বয়সী আরো অনেককেই এর আগে সে মেজর সাহেবের খেদমতে পাঠিয়েছে। আর এ-মেয়েটা তো হিন্দু।
এর ঘণ্টা দুই পরে রাজাকারদের প্রহরায় শোভাকে ট্রেনে চাপানো হলো। না, খুলনায় ওর কলেজের উদ্দেশে নয়। বাগেরহাটের সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে। এরপর থেকে কেউ আর কখনো শোভাকে দেখেনি।খুলনা-বাগেরহাট ট্রেনটা এরপরও আরো অনেকদিন চলেছে। তবে খুব সকালে বই-খাতা হাতে সবুজ বা নীল শাড়ি পরা কোনো মেয়ে অনেক ধানক্ষেত পেরিয়ে দ্রুত হেঁটে ফকিরহাট স্টেশন থেকে সে-ট্রেনটাতে আর ওঠেনি।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.