পার্সি বিশি শেলি
-
কবিতার সপক্ষে
ভাষান্তর : অলোক কুমার বসু ইংরাজি সাহিত্যের অন্যতম সেরা রোমান্টিক কবি পার্সি বিশি শেলির জন্ম হয়েছিল ১৭৯২ সালের ৪ আগস্ট, হোরশামের কাছে ফিল্ড প্লেসে, সাসেক্সের একটি অভিজাত পরিবারে। তাঁর বাবা ছিলেন সাসেক্সের স্কোয়ার এবং সংসদ-সদস্য। শেলি তাঁর স্কুলজীবন কাটান সায়ন হাউস অ্যাকাডেমি এবং ইটনে। সেখানে নিয়মকানুনের বাঁধন আর বেঁচে থাকার পদ্ধতি কোনোটাই তাঁর পছন্দ হয়নি। তাঁর অন্তর সেই হিসেবে তখন থেকেই তরঙ্গবিক্ষুব্ধ। ১৮১০-এ তিনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু টমাস জেফারসন হগের সঙ্গে ‘দি নেসেসিটি অফ এথিজ্ম্’ প্রবন্ধ রচনার জন্য কলেজ থেকে তাঁকে বের করে দেওয়া হয় (১৮১১)। এই সময়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলির প্রথমটি ‘কুইন ম্যাব’ প্রকাশিত হয় (১৮১৩)। ১৮১১-তেই লন্ডনে একটি হোটেল- মালিকের ষোড়শী কন্যা হ্যারিয়েট ওয়েস্টব্রুকের সঙ্গে তাঁর প্রেম এবং বিয়ে, যা শেলির পরিবার মেনে নিতে পারেনি। এই প্রণয়ও সুখের হয়নি, ১৮১৬ সালেই একুশ বছরের তরুণী হ্যারিয়েট নিজের জীবন শেষ করে দেন। শেলি এরপর দার্শনিক এবং বিপ্লবী উইলিয়াম গডউইনের কন্যা মেরি গডউইনকে বিয়ে করেন (১৮১৬) এবং তাঁদের সন্তান উইলিয়ামের জন্ম হয়। ১৮১৬ সালের গ্রীষ্মকালটি শেলি কাটান বায়রনের সঙ্গে লেক জেনিভাতে। ‘হাইম টু ইনটেলেকচুয়াল বিউটি’ এবং আরো কিছু কবিতা এই সময়ে লেখা। ১৮১৭ থেকে ১৮১৮-র মধ্যে লেখা ‘দি রিভোল্ট অফ ইসলাম,’ ‘ওজিমানডিয়াস’, ‘ওড টু দি ওয়েস্ট উইন্ড’, ‘টু এ স্কাইলার্ক’। তাঁর সমসাময়িক প্রিয় কবি জন কিট্সকে উদ্দেশ করে লেখা ‘অ্যাডোনাইস’ এই সময়েরই রচনা। ১৮১৮ সালে শেলি সপরিবারে ইটালিতে যান। সেখানে বাস করতেন বায়রন। ১৮১৯-এ তাঁরা একসঙ্গে রোমে যান, ১৮২০-তে পিসায়। এই সময়ে শেলির রচনার মধ্যে ‘জুলিয়ান অ্যান্ড ম্যাজলো’ এবং কাব্যনাটকের আদলে লেখা ‘প্রমিথিয়ুস আনবাউন্ড’। সমকালীন আরো উল্লেখযোগ্য রচনা ষোড়শ শতাব্দীর পটভূমিতে এক রোমান পরিবারের পাঁচ অঙ্কের ট্র্যাজেডি ‘সেন্সি’। ১৮২২ সালে শেলি-পরিবার বে অফ লেরিসিতে যান। সেখান থেকে তাঁর বন্ধু লে হান্টের সঙ্গে দেখা করতে যান লেগহর্নে। ৮ জুলাই ১৮২২ লেরিমিতে ফেরার পথে ঝড় ওঠে। তাঁর ছোটো নৌকা এরিয়েল ডুবে যায়। পরের দিন সমুদ্র ফিরিয়ে দেয় শেলির এবং তাঁর সঙ্গীদের নি®প্রাণ দেহ। মাত্র তিরিশ বছরের জীবন। আর নয়-দশ বছরের রচনাকাল। তারই ফসল ইংরাজি সাহিত্যের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে তাঁর উজ্জ্বল নাম। ১৮২১ সালে (মতান্তরে ১৮১৯-এ) রচিত বর্তমান প্রবন্ধ ‘কবিতার সপক্ষে’ (ঞযব উবভবহপব ড়ভ চড়বঃৎু) সম্ভবত শেলির সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য গদ্যরচনা। গীতিধর্মী কবিতায় তাঁর যে-মনের ছবি আমরা পাই এই রচনা তার পরিপূরক। কল্পনার সঙ্গে সঙ্গে কবিতারচনার ব্যাপারে তাঁর গভীর জীবনদর্শনেরও পরিচয় এখানে মেলে। শেলি এই প্রবন্ধটি লিখেছিলেন কবিতাকে আক্রমণ করে লেখা টমাস লাভ পিককের একটি প্রবন্ধ ‘কবিতার চার-যুগ’ (দি ফোর এজেস অফ পোয়েট্রি)-এর উত্তরে। সাহিত্য-সমালোচকরা বলেন, কবিতার বিশুদ্ধ রূপ এবং সভ্যতার ইতিহাসে তার চিরন্তন প্রেরণাদায়ী ভূমিকা সম্বন্ধে এমন উজ্জ্বল আলোচনা পৃথিবীর যে-কোনো ভাষাতেই কম আছে। আমাদের মনের প্রবাহে দুটি প্রধান ধারা। একটি হলো যুক্তি-অনুসারী বিচারবোধ। অন্যটি কল্পনা। প্রথমটিকে বলা যায় এক চিন্তার সঙ্গে অন্য চিন্তার সম্পর্ক-নির্মাণে একটি সচেতন অন্বেষণ। অপরটিকে বলা যায় সেই চিন্তাগুলিকে মনের নিজের রঙে রাঙিয়ে তোলা, তাদের থেকে সৃষ্টি করা অন্যসব চিত্রকল্প, মনের মধ্যে নির্মাণ করা নতুন সব ছবি – যাদের প্রতিটিই স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই দুটি ধারা বা পদ্ধতির একটিকে বলা যায় সংশ্লেষণ, যা আমাদের অস্তিত্ব ও বিশ্বপ্রকৃতির সাধারণ বিষয়গুলিকেই অবলম্বন করে থাকে। অপরটি হলো বিশ্লেষণ, যা এগুলির মধ্যে নিহিত সম্পর্ককে আবিষ্কার করে শুধু সম্পর্ক হিসেবেই। সেখানে চিন্তার প্রতিটি ধারা নিজের অস্তিত্ব নিয়ে আলাদা হয়ে নেই, বরং তাদের পরস্পরের এবং সামগ্রিক সম্পর্কের ফলাফলই মূল বিচার্য। যা কিছু দৃশ্যমান এবং জানা হয়ে গেছে তাদের সাজিয়ে দেখাই বাস্তব বিচারবোধ। একের পর এক আলাদাভাবে এবং সামগ্রিকভাবে তাদের মানসিক মূল্যায়নই কল্পনা। যুক্তি ও বিচারবোধ দৃশ্যমান সবকিছুর মধ্যে প্রভেদকে খুঁজে বেড়ায়, কল্পনা খোঁজে তাদের মধ্যে সাদৃশ্যকে। যুক্তি ও কল্পনার নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক অনেকটা যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রী, শরীরের সঙ্গে চেতনা অথবা বস্তুর সঙ্গে তার ছায়ার মতো। সাধারণভাবে আমরা বলতে পারি যে, কবিতা হচ্ছে কল্পনার প্রকাশ। তার জন্ম হয়েছে মানুষের সঙ্গে – একই সঙ্গে। এক ধরনের বীণা আছে যাতে সুর বেজে ওঠে হাওয়ায় হাওয়ায়, চঞ্চল বায়ুপ্রবাহে সতত ঝঙ্কার তোলে সেই বীণা। মানুষের মন তেমনই এক বাদ্যযন্ত্র। কিন্তু মানুষের মনের মধ্যে আরো একটা বিশেষ গুণ আছে যা সেই বীণাতে নেই। সে শুধু একেকটি সুর নয়, তাদের সবাইকে নিয়ে এক ঐকতানও সৃষ্টি করতে পারে,…
