ভাষান্তর : অলোক কুমার বসু
ইংরাজি সাহিত্যের অন্যতম সেরা রোমান্টিক কবি পার্সি বিশি শেলির জন্ম হয়েছিল ১৭৯২ সালের ৪ আগস্ট, হোরশামের কাছে ফিল্ড প্লেসে, সাসেক্সের একটি অভিজাত পরিবারে। তাঁর বাবা ছিলেন সাসেক্সের স্কোয়ার এবং সংসদ-সদস্য। শেলি তাঁর স্কুলজীবন কাটান সায়ন হাউস অ্যাকাডেমি এবং ইটনে। সেখানে নিয়মকানুনের বাঁধন আর বেঁচে থাকার পদ্ধতি কোনোটাই তাঁর পছন্দ হয়নি। তাঁর অন্তর সেই হিসেবে তখন থেকেই তরঙ্গবিক্ষুব্ধ। ১৮১০-এ তিনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু টমাস জেফারসন হগের সঙ্গে ‘দি নেসেসিটি অফ এথিজ্ম্’ প্রবন্ধ রচনার জন্য কলেজ থেকে তাঁকে বের করে দেওয়া হয় (১৮১১)। এই সময়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলির প্রথমটি ‘কুইন ম্যাব’ প্রকাশিত হয় (১৮১৩)। ১৮১১-তেই লন্ডনে একটি হোটেল- মালিকের ষোড়শী কন্যা হ্যারিয়েট ওয়েস্টব্রুকের সঙ্গে তাঁর প্রেম এবং বিয়ে, যা শেলির পরিবার মেনে নিতে পারেনি। এই প্রণয়ও সুখের হয়নি, ১৮১৬ সালেই একুশ বছরের তরুণী হ্যারিয়েট নিজের জীবন শেষ করে দেন। শেলি এরপর দার্শনিক এবং বিপ্লবী উইলিয়াম গডউইনের কন্যা মেরি গডউইনকে বিয়ে করেন (১৮১৬) এবং তাঁদের সন্তান উইলিয়ামের জন্ম হয়।
১৮১৬ সালের গ্রীষ্মকালটি শেলি কাটান বায়রনের সঙ্গে লেক জেনিভাতে। ‘হাইম টু ইনটেলেকচুয়াল বিউটি’ এবং আরো কিছু কবিতা এই সময়ে লেখা। ১৮১৭ থেকে ১৮১৮-র মধ্যে লেখা ‘দি রিভোল্ট অফ ইসলাম,’ ‘ওজিমানডিয়াস’, ‘ওড টু দি ওয়েস্ট উইন্ড’, ‘টু এ স্কাইলার্ক’। তাঁর সমসাময়িক প্রিয় কবি জন কিট্সকে উদ্দেশ করে লেখা ‘অ্যাডোনাইস’ এই সময়েরই রচনা। ১৮১৮ সালে শেলি সপরিবারে ইটালিতে যান। সেখানে বাস করতেন বায়রন। ১৮১৯-এ তাঁরা একসঙ্গে রোমে যান, ১৮২০-তে পিসায়। এই সময়ে শেলির রচনার মধ্যে ‘জুলিয়ান অ্যান্ড ম্যাজলো’ এবং কাব্যনাটকের আদলে লেখা ‘প্রমিথিয়ুস আনবাউন্ড’। সমকালীন আরো উল্লেখযোগ্য রচনা ষোড়শ শতাব্দীর পটভূমিতে এক রোমান পরিবারের পাঁচ অঙ্কের ট্র্যাজেডি ‘সেন্সি’। ১৮২২ সালে শেলি-পরিবার বে অফ লেরিসিতে যান। সেখান থেকে তাঁর বন্ধু লে হান্টের সঙ্গে দেখা করতে যান লেগহর্নে। ৮ জুলাই ১৮২২ লেরিমিতে ফেরার পথে ঝড় ওঠে। তাঁর ছোটো নৌকা এরিয়েল ডুবে যায়। পরের দিন সমুদ্র ফিরিয়ে দেয় শেলির এবং তাঁর সঙ্গীদের নি®প্রাণ দেহ।
মাত্র তিরিশ বছরের জীবন। আর নয়-দশ বছরের রচনাকাল। তারই ফসল ইংরাজি সাহিত্যের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে তাঁর উজ্জ্বল নাম।
১৮২১ সালে (মতান্তরে ১৮১৯-এ) রচিত বর্তমান প্রবন্ধ ‘কবিতার সপক্ষে’ (ঞযব উবভবহপব ড়ভ চড়বঃৎু) সম্ভবত শেলির সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য গদ্যরচনা। গীতিধর্মী কবিতায় তাঁর যে-মনের ছবি আমরা পাই এই রচনা তার পরিপূরক। কল্পনার সঙ্গে সঙ্গে কবিতারচনার ব্যাপারে তাঁর গভীর জীবনদর্শনেরও পরিচয় এখানে মেলে। শেলি এই প্রবন্ধটি লিখেছিলেন কবিতাকে আক্রমণ করে লেখা টমাস লাভ পিককের একটি প্রবন্ধ ‘কবিতার চার-যুগ’ (দি ফোর এজেস অফ পোয়েট্রি)-এর উত্তরে। সাহিত্য-সমালোচকরা বলেন, কবিতার বিশুদ্ধ রূপ এবং সভ্যতার ইতিহাসে তার চিরন্তন প্রেরণাদায়ী ভূমিকা সম্বন্ধে এমন উজ্জ্বল আলোচনা পৃথিবীর যে-কোনো ভাষাতেই কম আছে।
আমাদের মনের প্রবাহে দুটি প্রধান ধারা। একটি হলো যুক্তি-অনুসারী বিচারবোধ। অন্যটি কল্পনা। প্রথমটিকে বলা যায় এক চিন্তার সঙ্গে অন্য চিন্তার সম্পর্ক-নির্মাণে একটি সচেতন অন্বেষণ। অপরটিকে বলা যায় সেই চিন্তাগুলিকে মনের নিজের রঙে রাঙিয়ে তোলা, তাদের থেকে সৃষ্টি করা অন্যসব চিত্রকল্প, মনের মধ্যে নির্মাণ করা নতুন সব ছবি – যাদের প্রতিটিই স্বয়ংসম্পূর্ণ।
এই দুটি ধারা বা পদ্ধতির একটিকে বলা যায় সংশ্লেষণ, যা আমাদের অস্তিত্ব ও বিশ্বপ্রকৃতির সাধারণ বিষয়গুলিকেই অবলম্বন করে থাকে। অপরটি হলো বিশ্লেষণ, যা এগুলির মধ্যে নিহিত সম্পর্ককে আবিষ্কার করে শুধু সম্পর্ক হিসেবেই। সেখানে চিন্তার প্রতিটি ধারা নিজের অস্তিত্ব নিয়ে আলাদা হয়ে নেই, বরং তাদের পরস্পরের এবং সামগ্রিক সম্পর্কের ফলাফলই মূল বিচার্য।
যা কিছু দৃশ্যমান এবং জানা হয়ে গেছে তাদের সাজিয়ে দেখাই বাস্তব বিচারবোধ। একের পর এক আলাদাভাবে এবং সামগ্রিকভাবে তাদের মানসিক মূল্যায়নই কল্পনা। যুক্তি ও বিচারবোধ দৃশ্যমান সবকিছুর মধ্যে প্রভেদকে খুঁজে বেড়ায়, কল্পনা খোঁজে তাদের মধ্যে সাদৃশ্যকে। যুক্তি ও কল্পনার নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক অনেকটা যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রী, শরীরের সঙ্গে চেতনা অথবা বস্তুর সঙ্গে তার ছায়ার মতো।
সাধারণভাবে আমরা বলতে পারি যে, কবিতা হচ্ছে কল্পনার প্রকাশ। তার জন্ম হয়েছে মানুষের সঙ্গে – একই সঙ্গে। এক ধরনের বীণা আছে যাতে সুর বেজে ওঠে হাওয়ায় হাওয়ায়, চঞ্চল বায়ুপ্রবাহে সতত ঝঙ্কার তোলে সেই বীণা। মানুষের মন তেমনই এক বাদ্যযন্ত্র। কিন্তু মানুষের মনের মধ্যে আরো একটা বিশেষ গুণ আছে যা সেই বীণাতে নেই। সে শুধু একেকটি সুর নয়, তাদের সবাইকে নিয়ে এক ঐকতানও সৃষ্টি করতে পারে, বাইরের পৃথিবী থেকে আসা বিচিত্র গতি আর শব্দ সম্ভার অন্তরের মাধুর্যে পরিবর্তিত আর পরিবর্ধিত হওয়ার পর সমস্ত ঝঙ্কার মিলে যেতে পারে একই মূর্ছনায়। মনের বীণায় যেন এমন কোনো ক্ষমতা আছে যাতে তার প্রতিটি তন্ত্রী তার ওপরে আসা ঝঙ্কারকে শব্দের কোনো নির্দিষ্ট অনুপাতে পরিবর্তিত করতে পারে। কোনো গায়ক যেমন তার কণ্ঠকে বীণার তারে বেঁধে নিতে পারেন, অনেকটা তেমনই।
শিশু যখন আপন মনে খেলা করে তখন শব্দ আর গতি দিয়েই সে নিজের আনন্দকে প্রকাশ করে। তার কণ্ঠস্বরের প্রতিটি মাত্রা আর প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি আসলে তো তার মনে রেখাপাত করা কোনো অনুভূতিকেই প্রকাশ করার চেষ্টা। তার সবকিছুই বাইরে থেকে আসা এবং মনে ছাপ রেখে যাওয়া কোনো অনুভূতির প্রতিফলন। বায়ুর প্রবাহ থেমে গেলেও যেমন পূর্বকথিত বীণার ঝঙ্কার সঙ্গে সঙ্গেই থামে না, তেমনই বাইরে থেকে আসা অনুভবের কারণটি আর না থাকলেও শিশুর মনে তার খেলা চলতেই থাকে। সে তার কণ্ঠের কাকলি আর গতিবিধির দ্বারা তার চেতনায় উঠতে থাকা এই তরঙ্গকে বাইরে ছড়িয়ে দেয়।
শিশুর মনে ছাপ রেখে যাওয়া বাইরের জগতের দৃশ্য ও ঘটনাবলি আর তাই থেকে উদ্ভূত এইসব আনন্দ আর তার প্রকাশের মধ্যে যে-সম্পর্ক, কবিতা ও তার প্রেরণাদায়ী উচ্চতর অনুভূতির মধ্যে সম্পর্ক একই রকমের। সভ্যতার স্পর্শ পায়নি যে-সব মানবগোষ্ঠী তারা বহির্জগৎ এবং বস্তুজগতের এই ধরনের প্রকাশকে এবং সেগুলি সম্বন্ধে তাদের ধারণাকে অনেকটা এই রকম শিশুর মতোই ভাষা এবং চিত্রকর্মে অনুকরণের দ্বারা প্রকাশ করে। মনে রাখতে হবে সভ্য মানুষ ও আদিম মানুষের মনের মধ্যে যে-তুলনা, বেড়ে ওঠা মানুষ ও শিশুর মনের মধ্যেও সেই তুলনাই প্রযোজ্য।
সমাজভুক্ত মানুষ তার আবেগ এবং আনন্দসহ অন্য মানুষেরও আবেগ আর আনন্দের বিষয় হয়ে পড়ে। আবেগের এক নতুন শ্রেণি থেকে নতুনতর প্রকাশভঙ্গির সম্পদ গড়ে ওঠে তখন। নব নব অনুভূতি নিজেকে প্রকাশ করতে চায় ভাষা এবং অন্য সব মাধ্যমে। তখন অনুকরণভিত্তিক বিভিন্ন শিল্প নিজেই হয়ে পড়ে তার প্রকাশ এবং মাধ্যম। পেনসিল আর তাতে আঁকা কোনো ছবি, ভাস্করের যন্ত্র আর তার তৈরি কোনো মূর্তি, সুর এবং ঐকতান, এ-সবই তখন তার ক্ষেত্র।
সামাজিক সেইসব সহানুভূতি, অথবা সেইসব নিয়মকানুন, বা সেইসব মূল কারণ – যা থেকে সমাজের জন্ম হয়, দুজন মানুষ যখন একত্রে বাস করতে থাকে তখন থেকেই গড়ে ওঠে তারা। বর্তমানের মধ্যেই নিহিত থাকে ভবিষ্যৎ, যেমন বীজের মধ্যে থাকে গাছ। আর সাম্য, বৈচিত্র্য, ঐক্য, বৈপরীত্য আর তার পরেও পারস্পরিক নির্ভরতা, এ-সবকিছুই সামাজিক মানুষের অস্তিত্বের মূলসূত্র হয়ে দাঁড়ায়, এইসব নীতিই তখন নির্ধারণ করে দেয় কেমনভাবে বাঁচবে সে। এইসব নীতির প্রতি আনুগত্য থেকেই সেকখনো পরিচিত কিছুর ব্যতিক্রম দেখে আশ্চর্য হয় আর আনন্দ পায়, আবেগকে মানবিক গুণাবলির মধ্যে গণনা করে, শিল্পের মধ্যে খুঁজে পায় সৌন্দর্যকে, বিচারবোধের মধ্যে সত্যকে আর পারস্পরিক মন দেওয়া-নেওয়ার মধ্যে ভালোবাসাকে।
সুতরাং সমাজ গড়ে ওঠার একদম শুরুতেও মানুষ তার ভাষা এবং কাজের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা রক্ষা করতে শিখেছে – সেই ভাষা এবং কাজ আসলে বস্তু এবং ভাবজগতের যা কিছুকে প্রতিনিধিত্ব করে তার সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়।
কিন্তু এখন বরং আমরা সমাজের মূলগত নীতির এইসব সাধারণ আলোচনার মধ্যে না গিয়ে কল্পনা ও তার প্রকাশের বিভিন্ন মাধ্যম আর আরোপিত রূপের কথা বলি।
পৃথিবী যখন তরুণ, মানুষ তখন নাচে, গান করে আর অনুকরণ করে তার চারপাশের প্রকৃতিকে। এসব কাজের মধ্যে সে খুঁজে পায় ছন্দ এবং শৃঙ্খলাকে এবং যদিও সব মানুষই প্রায় একই ধরনের শৃঙ্খলাকে দেখে, তাদের দেখা সকল হিসেবে ঠিক এক নয়। নৃত্যের ছন্দে, সংগীতের সুরে, ভাষার ব্যবহারে, প্রকৃতির অনুকরণে, মানুষ থেকে মানুষে দেখার একটু তফাত হয়ই। তার কারণ এই ধরনের প্রতিটি অনুকরণের উপস্থাপনের মধ্যে তাদের নিজস্ব শ্রেণিগত একটা ছন্দ আছে, যার জন্য কোনো শ্রোতা এবং দর্শক ব্যক্তিগতভাবে অন্যগুলি থেকে হয়তো বেশি আনন্দ পান। এই শৃঙ্খলাকে মনে মনে আনার যে-অনুভূতি তাকেই লেখকরা বলেছেন ‘রুচি’।
শিল্পকর্মের শৈশবাবস্থায় তার উপস্থাপনার মধ্যে এনে দেওয়া এই শৃঙ্খলা যে সবসময়ে সর্বোত্তম আনন্দকে আহ্বান করার উদ্দেশেই রচিত থাকে এটা সবাই লক্ষ করেছেন। কিন্তু সবসময়ে তাদের বৈচিত্র্য যথেষ্ট নয়, বা সাজানোর ক্রম সেরা নয়। যে-শিল্পকর্ম এর ব্যতিক্রম তারা পরমতম সৌন্দর্যের খুব কাছাকাছি। হ্যাঁ, সর্বোত্তম আনন্দ আর তাকে সৃষ্টি করে যে-কারণ, তাদের মধ্যে সম্পর্ককে আমরা ‘সৌন্দর্য’ বলতে পারি, আর যে-শিল্পস্রষ্টাদের মধ্যে এমন বোধ অনেক বেশি, কবি-শব্দের সর্বোত্তম বিশ্বজনীন অর্থে তারাই কবি। তাঁদের মনের ওপর মানুষের সমাজ ও বিশ্বপ্রকৃতির যে-প্রভাব তাঁরা যেভাবে প্রকাশ করেন তাতে সৃষ্টি হয় আনন্দের – তাঁরা সেই আনন্দকে আবার ছড়িয়ে দেন অপরের মনেও, এইভাবে তাঁদের অনুভূত আনন্দ যেন সেই মানবগোষ্ঠীর মধ্যে নিজের থেকে বারবার জন্ম নেয়। তাঁদের ভাষা প্রাণবন্তভাবে উপমা-আশ্রয়ী, এমন উপমা, যা আগে কখনো বলা হয়নি। এমন সাদৃশ্যকে সামনে নিয়ে আসে তারা যা আগে লক্ষ করেনি কেউই। তারপর সেই বোধ পুনরাবৃত্ত হতে থাকে মানুষের মনে বারবার। শেষে সেই শব্দগুচ্ছ আর সামগ্রিক কোনো চিন্তার ছবি না এনে শুধু কবির অঙ্কিত খণ্ডিত চিত্রকেই দেখায়।
এরপর যদি আর একজন নতুন কবি এসে নতুন করে প্রকাশ না করেন এইসব শব্দের এলোমেলো হয়ে যাওয়া সম্পর্ককে, যদি না যুগের পর যুগ নতুন মূর্তি দেন তাকে, তাহলে মানুষের মনের মহত্তম প্রয়োগের জন্য ভাষা হয়ে পড়বে অনুপযুক্ত এবং মৃত। এইসব উপমার উৎসকে লর্ড বেকন বর্ণনা করেছেন ‘বিশ্বের বিভিন্ন বিষয়ের ওপরে রেখে যাওয়া প্রকৃতির একই পদচিহ্ন’-রূপে। আর মনের যে-বৃত্তি তাকে চিনতে পারে আর আত্মস্থ করতে পারে তাকে তিনি বলেছেন, ‘সকল জ্ঞানের মধ্যে সাধারণ যে-স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞান, তার কোষাগার’। সমাজ যখন সবে গড়ে উঠেছে তখন সকল লেখকই কবি, কারণ ভাষা নিজেই তখন কাব্য। আরো একভাবে দেখলে সত্য এবং সুন্দরকে যিনি উপলব্ধি করতে পারেন তিনিই কবি। এককথায় তিনি চিনতে পারেন সেই শুভকে যা রয়েছে প্রথমে অস্তিত্ব ও অনুভূতির পারস্পরিক সম্পর্কে আর তারপর অনুভূতি ও প্রকাশের মাঝে যোগসূত্র হয়ে।
প্রতিটি মৌলিক ভাষা শুরুতে একটি অক্ষরবৃত্তের কাব্য। শব্দকোষের প্রাচুর্য আর ব্যকরণের বিশেষত্ব অনেক পরের যুগের কাজ। তারা শুধু কবিতা-সৃষ্টির সূচিপত্র আর তার শরীরের রূপরেখা মাত্র।
কিন্তু কবিরা, যারা এই অব্যয় শৃঙ্খলাকে ধরে রাখেন, নিজের কল্পনাতে আর ভাষায় প্রকাশ করেন তাদের, তারা শুধু সাহিত্য, সংগীত, স্থাপত্য বা চিত্রকর্মের স্রষ্টা ও প্রেরণাই নন, আরেক অর্থে তারা সকল নিয়মের এবং সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠাতা, জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল শিল্পকর্মের প্রথম রূপকার। তারা হচ্ছেন আমাদের সেইসব শিক্ষক, যারা নিজেরা সত্য এবং সুন্দরের খুব কাছে যেতে পারেন এবং ধর্ম নামে যে-অদৃশ্য জগৎ আমাদের ঘিরে আছে তাকেও খানিকটা উপলব্ধি করতে পারেন। সেইজন্য সকল মৌলিক ধর্মই রূপকধর্মী। গ্রিক পুরাণে বর্ণিত জেনাসের মতো তাদের প্রত্যেকের দুটি মুখ দেখা যায়। তার একটি আসল আর অপরটি নকল। কোনো দেশ ও জাতির বিশেষ সময় ও পরিস্থিতি-অনুযায়ী প্রাচীনকালে কবিকে কখনো সভ্য সামাজিক নিয়ম ও কখনো ধর্মের নিয়মের পথপ্রদর্শক বলে ডাকা হয়েছে। আসলে তাঁরা এই দুই চরিত্রেরই সমন্বয়।
কবি যে শুধু বর্তমানকেই তাঁর নিজস্বরূপে পরিপূর্ণভাবে দেখেন এবং তার উপকরণগুলিকে সঠিকক্রমে সাজানোর পরামর্শ দিতে পারেন তা-ই নয়, তিনি বর্তমানের মধ্যে ভবিষ্যৎকেও দেখতে পান। তাঁর চিন্তা এবং মনন সকল সময়ের ফুল ও ফলে সম্ভাবনাময় পরাগরেণু। তার মানে অবশ্য এই নয় যে, কবিকে আমি আক্ষরিকভাবে ‘ভবিষ্যদ্বক্তা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছি। ভবিষ্যতে যা ঘটবে তার একটা অনুভব তাদের থাকে, কিন্তু সেই অনুভব বিশেষ কোনো ঘটনার বাস্তব চেহারাকে দেখতে পায় এমন কথা আমি বলতে চাইছি না। সে-রকম কোনো ধারণাকে আমি অন্ধবিশ্বাসই বলব। এই রকম বিশ্বাস কবিকে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হিসেবে না দেখে কবিত্বকে ভবিষ্যদ্বক্তার অন্যতম গুণ হিসেবে দেখবে। কবির সম্পর্ক অসীম ও অনন্তের সঙ্গে, সত্তার গভীরে, অনির্বচনীয় একত্বে। দেশকাল ও সংখ্যার ঊর্ধ্বে। কবিতার ব্যাকরণের যেসব দিক লেখার সময়, দেশ ও মানুষের বাইরের চেহারার বিভিন্নতাকে সামনে আনে; যুগ ও কাল হিসেবে তাকে পরিবর্তন করে দেখলে শ্রেষ্ঠ কবিতার কবিতা হিসেবে কোনো ক্ষতি হয় না। যদি বিশেষ কোনো উদাহরণ দেওয়া এই রচনার বৃত্তের বাইরে বলে না ধরা হয় তাহলে আমরা এই প্রসঙ্গে ইসকিলাস কোরাস, বাইবেলের ‘বুক অফ জব’ অথবা দান্তের প্যারাডাইসের নাম করতে পারি। স্থাপত্য, চিত্রকর্ম অথবা সংগীতের উদাহরণ এ-ব্যাপারে আরো বেশি নিশ্চিত এবং চূড়ান্ত বলা যায়।
ভাষা, বর্ণ, উপস্থাপনের রূপ এবং কাঠামো ধর্মীয় এবং সামাজিক আচার-ব্যবহার এই সবকিছুই কবিতার উপকরণ এবং অনুষঙ্গ। যে-মানদণ্ডে ফলাফলকে কারণের সঙ্গে সমার্থক হিসেবে দেখা হয় সেই মানদণ্ডে এরাও কবিতা। কিন্তু নীড় ছেড়ে যদি আমরা ক্ষীরের সন্ধান করতে যাই তাহলে দেখব, কবিতা আসলে যে-ভাষায় কথা বলে, বিশেষত যে-ছন্দের ভাষায়, তার রচয়িতা কবির অন্তরে বাস করা কোনো রাজাধিরাজ। তাঁর সিংহাসন মানবপ্রকৃতির অনেক গভীরে পর্দার আড়ালে পাতা আছে। যে-বৃত্তি থেকে কবিতা লেখা হয় তার উদ্ভব অনেকটা ভাষার প্রকৃতি থেকেও। আমাদের ভিতরে যে-মানুষটি বাস করে ভাষা তার আবেগ ও অনুভূতির প্রতিনিধিস্বরূপ এবং বর্ণ, রূপ, গতি এই সবকিছুর থেকে ভাষার ব্যঞ্জনা সূক্ষ¥ এবং বৈচিত্র্যময় হতে পারে।
ভাষা শিল্পীমনের আজ্ঞাবহ এবং সকলভাবে সংবেদনশীল। কল্পনাই ভাষাকে সৃষ্টি করে এবং তার সম্পর্ক শুধু চিন্তার সঙ্গে; কিন্তু শিল্পের আর সমস্ত উপকরণ, অনুষঙ্গ এবং শর্ত পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এই সকল সম্পর্ক ধারণা ও প্রকাশের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সীমিত করে তাদের। মন থেকে বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মির জন্য ভাষার প্রকৃতি যেন আয়নার মতো,আর অন্যসব শিল্পমাধ্যম সেই তুলনায় খানিকটা মেঘসংকুল, প্রকাশকে খানিকটা দুর্বল আর আচ্ছন্ন করে তারা। সেইজন্যই ভাস্কর, চিত্রকর, সংগীতজ্ঞ, অন্যসব শিল্পমাধ্যমের যাঁরা সেরা তাঁরা যদিও লেখক বা কবিদের থেকে অন্তরের ঐশ্বর্যে কোনো অংশেই কম ঐশ্বর্যবান নন, তবুও তাঁরা কেউই প্রকৃত অর্থে মহত্তম কবিদের মতো খ্যাতিমান হন না। দুজন একই মাপের শিল্পী যেমন দুটি বাদ্যযন্ত্র থেকে ভিন্ন প্রভাবের সৃষ্টি করবেন, তেমনই কবি ও অন্য শিল্পীরা একই প্রেরণা থেকে সৃষ্টি করবেন ভিন্ন স্তরের শিল্প। শ্রেষ্টতম কবির সঙ্গে খ্যাতির তুলনায় শুধুমাত্র ধর্মপ্রবর্তক ও কীর্তিমান শাসকরাই তুলনীয়। তাও সীমিত অর্থে, যতক্ষণ তাদের সৃষ্ট প্রতিষ্ঠান, নিয়ম বা শাসনপ্রণালি গ্রহণযোগ্য থাকে ততদিন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শাসক ও ধর্মপ্রবর্তকের এই খ্যাতির অনেকটাই তাঁর চারপাশের স্তাবকদলের সৃষ্টি এবং এই বাহুল্যটুকু বাদ দিলে কবির তুলনায় বেশি নয়। তাহলে আমরা এইভাবে অনুভূতির প্রকাশস্বরূপ শিল্পের সীমার মধ্যে কবিতার স্থাননির্দেশক বৃত্তকে আঁকতে পারি। এরপরে প্রয়োজন সেই বৃত্তকে আরো নির্ভুলভাবে ছোট করে আনার, যাতে আমরা সংহত এবং অসংহত ভাষার মধ্যে প্রভেদ করতে পারি। শিল্পের অনুভবী বিচারে ভাষাকে শুধুমাত্র গদ্য এবং কবিতায় আলাদা করে ফেলা গ্রহণযোগ্য নয়।
শব্দ এবং চিন্তা – দুইই তাদের নিজেদের মধ্যে এবং তারা যার প্রতিনিধিত্ব করে তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এইসব সম্পর্কের শৃঙ্খলা আবার সর্বদাই চিন্তা এবং ধারণার পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত।
কবিদের ব্যবহৃত ভাষায় শব্দের একটা সুষম এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ পুনরাবৃত্তিকে আমরা দেখতে পাই। এই সুষম পুনরাবৃত্তি ছাড়া কবিতা যেন কবিতা হয়ে ওঠে না। প্রভাব বিস্তারকারী কল্পনা ও তার শৃঙ্খলাকে প্রকাশ করার জন্য শব্দের নিজেদের মতো এই ছন্দময় পুনরাবৃত্তি ও শৃঙ্খলাও অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
কবিতার অনুবাদ এইজন্যই প্রায়ই নিষ্ফল। কবির সৃষ্টিকে একভাষা থেকে অন্যভাষায় প্রকাশ করার চেষ্টা অনেকটা একটি প্রস্ফুটিত রঙিন ফুলকে একটা রাসায়নিকের কড়াইয়ের মধ্যে ফেলে পরে আবার তার বর্ণ ও গন্ধকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করার মতো। সেটা আর সম্ভব নয়। তার জন্মদাতাকে বীজ থেকে জন্ম নিতে হবে, তবেই আবার তেমন ফুল ফুটবে। এ যেন বাইবেলে বর্ণিত ব্যাবেলের মিনার এবং তার অভিশাপের কাহিনী।
কবিমনের নিজস্ব ভাষার মধ্যে শব্দসম্ভারের যে-নান্দনিক পুনরাবৃত্তি দেখতে পাওয়া যায় সংগীতের সঙ্গে তার সম্পর্ককে লক্ষ্য করে ছন্দের জন্ম হয়েছে। ভাষা এবং তার সুরেলা প্রকাশভঙ্গির একটা প্রথাগত রূপ এখন এই ছন্দ। কিন্তু অনুভূতিকে প্রকাশ করার জন্য কবিতার ভাষা যে সর্বদা কোনো প্রথাগত রূপের মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ছন্দোবদ্ধ এই রূপ জনপ্রিয় এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য, বিশেষত সেইসব পরিস্থিতিতে যখন বহুরকম গতিবিধি বর্ণনার মধ্যে আসতে চাইছে। কিন্তু প্রত্যেক মহান কবিই একদিন তার নিজস্ব একটা প্রকাশভঙ্গি নির্মাণ করে নেন।
সে-হিসেবে কবিতা ও গদ্যের লেখকের মধ্যে তফাত করা কিন্তু একটা বড় ধরনের ভুল। কবি ও দার্শনিকদের পৃথকীকরণও এক ধরনের দূর থেকে করা মূল্যায়ন বলা যায়।
প্লেটো এমনই একজন উদাহরণ। তিনি প্রকৃতপক্ষে একজন কবি ছিলেন। তাঁর রচনায় ব্যবহৃত চিত্রকল্পের সৌন্দর্য ও সততা এবং ভাষার সুরেলা মাধুর্য একজন লেখকের জন্য শ্রেষ্ঠতম অনুভূতির পরিচয় বহন করে। তিনি তাঁর লেখায় মহাকাব্যধর্মী, নাটকীয় অথবা গীতিকাব্যের মতো চেহারার গঠনপ্রণালি মোটেই গ্রহণ করেননি। বাঁধাধরা চেহারা ও গতিপ্রকৃতির বাইরে চিন্তার একটি ঐকতান তিনি গড়তে চেয়েছিলেন। কোনো ধরাবাঁধা ছন্দের মধ্যে তিনি তার বক্তব্যকে আবদ্ধ করেননি কারণ তেমন করতে গেলে তাঁকে মাঝে মাঝেই প্রকাশের নিজস্ব ধরন থেকে সরে আসতে হতো। প্লেটোর গদ্যের মধ্যে এই অলিখিত ছন্দ এবং স্বরপ্রবাহকে সিসেরো অনুরণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সফল হননি। আবার একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে লর্ড বেকনও একজন কবি ছিলেন। তাঁর রচনা ‘ফিলাম ল্যাবিরিন্থি’ (ঋরষঁস খধনরৎরহঃযর) এবং ‘এসে অন ডেথ’ (ঊংংধু ড়হ উবধঃয) তাঁর কবিত্বের অন্যতম উদাহরণ। তাঁর ভাষার মধ্যে একটা নান্দনিক এবং রাজকীয় ছন্দ আছে, যা অনুভূতির জন্য সুখকর। অপরপক্ষে, তাঁর রচনার মধ্যে নিহিত দর্শন ও জ্ঞান আলোকিত করে আমাদের মেধা এবং বুদ্ধিকে। পাঠকের মনের সীমাকে প্রথমে বিস্তৃত করে এইসব অনুভব এবং তারপরে বিলীন হয়ে যায় সেই সীমারেখা। সীমাবদ্ধ মন মুক্তি পেয়ে মিলে যায় বিশ্বের অন্তহীন মূলধারায় যেখানে তার প্রকৃত ঠিকানা।
চিন্তার জগতে যারা বিপ্লব আনেন তাদের কথার মধ্যে অনেক সুন্দর উপমা থাকে যা সত্যের চিরকালীন রূপকে আমাদের চোখের সামনে এনে দেয়। তারা একই সাথে কবি এবং আবিষ্কারক এবং তাদের লেখা ও বলার মধ্যে কোনো এক সুষম ছন্দকে আমরা অবশ্য দেখতে পাই। আনন্দসংগীতের প্রতিধ্বনি শোনা যায় সেখানে। আবার এটাও মনে রাখতে হবে, যে-সব মহান কবি কবিতার প্রথাবদ্ধ ছন্দ এবং বহির্গঠন অক্ষুণ্ন রেখে কাজ করেছেন, তাঁরা – যাঁরা সেটা করেননি তাঁদের মতোই, সত্যকে অনুভব করতে এবং প্রকাশ করতে সমর্থ ছিলেন। যদি আমরা আধুনিককালের (১৮২১) রচনাকারদের মধ্যেও নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখি, তাহলেও বলতে হবে শেক্সপিয়র, দান্তে এবং মিলটন দার্শনিক হিসেবে উচ্চতম শ্রেণিতে স্থান পাওয়ার যোগ্য।
সার্থক কবিতা অনন্ত সত্যের আলোকে আলোকিত জীবনের বিশ্বস্ত ছবি। কবিতা ও কাহিনীর মধ্যে এই একটা প্রভেদ আছে। কাহিনী হচ্ছে এক হিসেবে ঘটনার একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ তালিকা। দেশ, কাল, ঘটনাক্রম এবং কার্যকারণের বাইরে সে আর কোথাও সম্পর্কযুক্ত নয়। পক্ষান্তরে কবিতার জন্ম হয় মানবপ্রকৃতির চিরকালীন রূপ এবং তার গতি-প্রকৃতি থেকে। মানুষের মনোলোক স্রষ্টার মানসেরই প্রতিচ্ছবি। তাই কবিতার আবেদন চিরন্তন। কাহিনীর পরিচয় ভগ্নাংশ-হিসেবে, কারণ সে শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়কে এবং আর কখনোই ঘটবে না এমন কিছু ঘটনাকে বর্ণনা করে। অপরপক্ষে কবিতার আবেদন বিশ্বজনীন। মানবপ্রকৃতির সকল উন্মেষের সঙ্গে সম্পর্কের একটা বীজ তার মধ্যে সর্বদাই নিহিত। যে-কাহিনী শুধুই ঘটনার বর্ণনা, সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় তার আবেদন আর সৌন্দর্য। আর কবিতার আবেদন যেন বেড়ে ওঠে সময়ের সঙ্গে। তার মধ্যে চিরন্তন সত্য যেন আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে দিনে দিনে। বিস্তারেই তার প্রাণ। সেই জন্যই পরিচয়জ্ঞাপক সংক্ষিপ্তসারকে বলা হয় সত্যিকারের ইতিহাসের ওপরে বসে থাকা কোনো পোকা, যেটা তার মধ্যকার কবিতাকে খেয়ে ফেলে।
শুধু পরপর ঘটনাকে সাজিয়ে বর্ণনা করে যে-গল্প, তার প্রকৃতি একটি অসমান আয়নার মতো। সৌন্দর্যকে ঝাপসা ও বিকৃত করে ফেলতে পারে সে। কিন্তু কবিতা হচ্ছে সেই আয়না যা প্রকাশ করে অপ্রকাশিত ও ম্লান হয়ে যাওয়া সৌন্দর্যকেও। এমন অনেক সময় হয় যে, কোনো রচনার পুরোটা হয়ত কবিতা নয়, কিন্তু তার খানিকটা কবিত্বময়, কখনো আবার একটামাত্র বাক্য পূর্ণতায় অদ্বিতীয়, কখনো শুধু একটা শব্দ হতে পারে ঝলক দেওয়া আলো বা এমন কোনো দীপশিখা, যা কখনো নিভে যাবে না। তাই হেরোডেটাস, প্লুটার্ক, লিভি – এইসব বিখ্যাত ঐতিহাসিকও কবি ছিলেন, এবং যদিও তাঁদের, বিশেষ করে আবার লিভির, লেখার বিষয়-পরিকল্পনা কবিত্বের শ্রেষ্ঠ উন্মেষের জন্য উপযুক্ত ছিল না, তাঁরা তাঁদের এই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করারও চেষ্টা করেছেন। তাঁদের রচনা-স্থাপত্যের মাঝে মাঝে রয়ে গেছে অনেক উজ্জ্বল প্রতিবিম্ব, যা প্রাণবন্ত এবং কবিত্বময়।
কবিতা কাকে বলে এবং কারা আসলে কবি – এটা স্থির করার পর আসুন সমাজের ওপরে কবিতার প্রভাব কী হতে পারে বা হয়েছে তা নিয়ে আমরা একটু ভেবে দেখি। কবিতা সবসময়ের জন্য উপভোগ্য অনুভূতির সঙ্গী। তার স্পর্শে ঐশ্বর্যবান হয় সত্তা। জ্ঞান সেখানে আপ্লুত আনন্দের আহ্বায়ক। পৃথিবী যখন তার শৈশবে তখন কবি অথবা তার শ্রোতা, কেউই কবিতার বিশেষত্ব সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সজাগ ছিল না। কবিতার আবির্ভাব হয় অনেকাংশে ঐশী প্রেরণার মতো, যেন চেতনারও অগোচরে, আরো গভীর অস্তিত্বের মহত্তম স্তরে। তারপরে চিরকালের মতো ভবিষ্যতের মানুষের কাছে রয়ে যায় সে। তীব্রতম অনুভূতির সঙ্গে তার মিলনের শক্তি ও সৌন্দর্য, কারণ ও ফল এসব কিছুই রয়ে যায় মনন ও চিন্তনের বিষয় হয়ে। এমনকি আধুনিক যুগেও কোনো কবি তাঁর নিজের জীবনকালে খ্যাতির চরমসীমায় পৌঁছতে পারেননি। কবি সবসময়ের জন্য সমকালীন এবং তাঁর বিচার করবেন যে-বিচারকমণ্ডলী তার সদস্য হবেন মহাকাল দ্বারা নির্বাচিত বহু প্রজন্মের শ্রেষ্ঠতম মনীষা। একজন কবি তো নাইটেঙ্গেলের মতো, যে-নিরালোকে আপন নির্জনতা সুরেলা শব্দময় সংগীতে আনন্দময় করে তুলতে চায়। তার শ্রোতারা দৃষ্টির আড়ালে থাকা গায়কের কণ্ঠের জাদুতে আচ্ছন্ন হয়, নিজেদের অজান্তেই নিষিক্ত এবং দ্রবীভূত হয় তাদের হৃদয়। গ্রিসের শৈশব হোমার এবং তাঁর সমকালীন কবিদের কবিতায় আনন্দময় হয়েছিল।
যে-সামাজিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে পরবর্তী সভ্যতা গড়ে ওঠে – তাঁদের কবিতা সেই কাঠামোর স্তম্ভস্বরূপ ছিল। হোমার তাঁর যুগের মানুষের জন্য আদর্শ চরিত্রগুলোর ছবি এঁকেছিলেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তাঁর কাব্য তরুণদের একিলিস, হেক্টর বা ইউলিসিসের মতো হয়ে ওঠার প্রেরণা যুগিয়েছে। এইসব অমর সৃষ্টির মধ্যে বন্ধুত্বের সত্য এবং সৌন্দর্য, দেশাত্মবোধ এবং নিবেদিতপ্রাণ একনিষ্ঠতাকে গভীরতম রূপে দেখিয়েছিলেন তিনি। মানুষের এইসব নন্দিত রূপের প্রতি সহানুভূতি পাঠকের অনুভবকে বিশুদ্ধ ও বিস্তৃত করে এবং সেসব রূপকল্পনার প্রশংসা করতে করতে মানুষ একদিন তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে চায়। এই চরিত্ররা হয়তো-বা নৈতিকতার আধুনিক বিচারে সর্বোত্তম নয়। সবার অনুকরণের জন্য আদর্শ বলেও হয়তো তাদের আজ কেউ মেনে নেবে না, তবে তাতে কিছু যায় আসে না। প্রত্যেক যুগই তাদের নিজস্ব কোনো ভুলকে আপাতভাবে সত্য বলে মনে হয় এমন কোনো নাম দিয়ে দেবতার আসনে বসিয়েছে। যেমন সুতীব্র প্রতিশোধের স্পৃহা বর্বর যুগের প্রতিনিধি নগ্ন উপাস্য টোটেমগুলোর একটি। আর আত্মপ্রবঞ্চনা কোনো অজানা অকল্যাণের আচ্ছাদিত মূর্তি যার সামনে বিলাস ও বাহুল্য সর্বদাই আভূমিপ্রণত হয়ে থাকে।
কিন্তু একজন কবির কাছে তার সমকালীন মানুষের দোষগুলো হচ্ছে সেই স্বল্পস্থায়ী পোশাক যা দিয়ে তাকে তার সৃষ্ট মূর্তিগুলোকে সাজাতেই হয়। সেই পোশাক হয়তো তাদের শারীরিক সামঞ্জস্য ও সৌন্দর্যের ওপরে আবরণ দেয়, কিন্তু তাকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে ফেলতে পারে না। মহাকাব্যের বা নাটকের চরিত্ররা তাদের আত্মিক অস্তিত্বকে এই পোশাক দিয়ে সাজান, অনেকটা প্রাচীনকালের সেনানায়কদের পরিহিত বর্মচর্ম অথবা আধুনিক সেনাদের নিজস্ব পোশাকের মতো। যদিও এ-দুই ধরনের পোশাক থেকেই অনেক মর্যাদাপূর্ণ সুন্দর পোশাক খুব সহজেই ভেবে বের করা যায়। তাদের সৌন্দর্য এই খাপছাড়া পোশাকে খুব একটা ঢাকা পড়ে না, কারণ পোশাকও ঢেকে রাখা শরীরেরই আকার গ্রহণ করে। কোনো রাজকীয় অবয়ব এবং তার অনুপম শারীরিক ছন্দ পৃথিবীর সবচেয়ে বর্বর ও রুচিহীন পোশাকের আড়াল থেকেও নিজেদের পরিচয় ঠিকই দেবে। যাঁরা কবিশ্রেষ্ঠ তাঁদের মধ্যেও খুব কমই তাদের নিজস্ব কল্পনার রূপকে অনাবৃত সৌন্দর্যে হাজির করেছেন। যে-মহাজাগতিক সংগীত তাঁরা রচনা করতে সক্ষম সাধারণ মানুষের শ্রুতির জন্য তাকে উপযুক্ত করতে খানিকটা অভ্যস্ত ও পরিচিত পরিচ্ছদের আবরণে মাটির পৃথিবীতে নিয়ে আসার বোধহয় প্রয়োজন আছে, এই রকম একটা সন্দেহ তাই থেকেই যায়।
কবিতার বিরুদ্ধে অনৈতিকতার যে-অভিযোগ আছে তার মূলে আছে কবিতা যেভাবে মানুষের নৈতিক উন্নতিকে সাহায্য করে সে-সম্বন্ধে সঠিক ধারণার অভাব। নৈতিকতার বিজ্ঞান সামাজিক এবং পারিবারিক জীবনের যেসব উদাহরণ ও পরিকল্পনাকে উপস্থিত করে তার মূলও কবিতারই সৃষ্টি। আর তারও আগে বলতে হয় যে, শুধু উপযুক্ত মতবাদের অভাবেই যে-মানুষ পরস্পরকে ঘৃণা, অবজ্ঞা ও নিন্দা করে এবং একে অন্যকে নিজের পদানত করার চেষ্টা করে তা নয়। কবিতা কাজ করে সম্পূর্ণ অন্যভাবে, অনুচ্চারিত দেবত্বের মতো। সহস্র অভাবিত ভাবনার আহ্বানে মনকে বিস্তীর্ণ এবং উদার করে সে। কবিতা সরিয়ে দেয় অন্তরালে থাকা সৌন্দর্যের ওড়না। যা কিছু পরিচিত তাদেরও কোনো অপরিচিত রূপ যেন আমাদের সামনে তুলে ধরে সে। নতুন করে সৃষ্টি করে তাদেরই, যাদের সে প্রতিনিধিত্ব করে। স্বর্গীয় আলোয় আলোকিত সেইসব মূর্তি তখন সকল চিন্তা ও কর্মে ছেয়ে থাকা কোমল এবং আনন্দময় এক অনুভূতির স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে থাকে।
নীতিকথাও কবিতা, কারণ তার গোপন সূত্র হচ্ছে ভালোবাসা। আমাদের যা ব্যক্তিগত নয় এমন চিন্তায় ও কর্মে প্রতীয়মান সুন্দরের সঙ্গে একাত্ম হওয়া, নিজের ভেতর থেকে বাইরে গিয়ে দাঁড়ানো, এ-সবই ভালোবাসার রূপ। মহত্ত্ব অর্জন করতে হলে মানুষকে অবশ্যই কল্পনাপ্রবণ হতে হবে, যে-কল্পনা তীব্র এবং সার্বিক। তাকে অবশ্যই তার নিজের প্রজাতির আর একজনের সঙ্গে, আরো অনেকজনের সঙ্গে একাত্ম হতে হবে। সমস্ত মানুষের দুঃখ এবং আনন্দের অংশীদার হতে হবে তাকে। কল্পনা মানুষের অন্তরে শুভবোধকে জাগিয়ে তুলতে পারে। কবিতা নন্দিত সেই শুভবোধ এবং আনন্দের আহ্বায়ক এবং পথপ্রদর্শক। কবিতা কল্পনার সীমাকে প্রসারিত করে আর নতুন নতুন আনন্দের ভাবনায় সিঞ্চিত করে মনকে। তখন সর্বদা নতুনতর নির্মাণের জন্ম হয় মনে, তাদের মধ্যের শূন্যস্থান পূর্ণ হতে থাকে নতুনতর উপলব্ধিতে। ব্যায়াম যেমন মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে শক্তি এনে দেয়, কবিতা তেমনই শক্তিশালী করে তোলে মানুষের নৈতিক প্রকৃতির অঙ্গ মানসিক বৃত্তিকে। ন্যায় আর অন্যায় সম্বন্ধে কবির যা ব্যক্তিগত ধারণা তা তার নিজের স্থান এবং কালের সীমায় বন্দি, তাদের তার কবিতায় এনে ফেলা কবিতার প্রতি সুবিচার হবে না। কবিতা স্থান-কাল-পাত্রে আবদ্ধ নয় – আবদ্ধ নয় সংকীর্ণ বিচারের গণ্ডিতে।
ফলাফলকে ব্যাখা করার নিুতর দায়িত্ব গ্রহণ করলে পরে এই দায়িত্ব থেকে সহজে ছাড়া পাওয়া যাবে না। কবিতার মূল প্রাণধারায় অংশগ্রহণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার সমান হবে তা। হোমার বা অন্য অমর কবিদের পক্ষে মহান রাজত্বের রাজসিংহাসন ত্যাগ করার সম্ভাবনা খুব কমই ছিল। যেসব কবির মধ্যে মহত্ত্ব থাকা সত্ত্বেও কবিস্বভাব তত তীব্র ছিল না, যেমন ইউরিপিডিস, লুকান, টাসো, স্পেন্সার – এঁরা অনেক সময়ই কোনো নীতিগত বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য লিখেছেন এবং তাঁরা যতখানি এই রকম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লেখা লিখেছেন ততখানিই কাব্যগুণ খর্ব হয়েছে তাঁদের কবিতায়।
হোমার এবং তাঁর সমসাময়িক কবিদের পরের যুগে এথেন্সের কবিরা অনেক গীতিকাব্য ও ঐতিহাসিক কাব্য রচনা করেছিলেন। শিল্পবোধ-প্রকাশের ব্যাপারে কবিতার সঙ্গে তুলনা করা যায় এমন সবকিছুরই উন্নতি হয়েছিল সেই যুগে – স্থাপত্য, চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য, ভাস্কর্য, দর্শন এবং আমরা বলতে পারি, সভ্য সমাজের গঠনের মধ্যেও। এথেন্সের সমাজজীবনে কিছু অসঙ্গতি ছিল যেগুলো ‘বীরত্ব এবং খ্রিষ্টান ভাবধারার মধ্যে বেঁচে থাকা কবিতা’ – পরে আধুনিক (১৮২১) ইউরোপের জীবনধারা থেকে দূর করেছে, কিন্তু তবুও শক্তি, সৌন্দর্য এবং নৈতিক গুণের চর্চায় এই যুগ অতুলনীয় ছিল। সক্রেটিস-পূর্ববর্তী সেই যুগে অন্ধ শক্তি এবং অনমনীয় বাস্তবরূপ যেভাবে সৌন্দর্য ও সত্যের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এসেছিল সেভাবে আগে কখনো আসেনি। মানুষের দেবত্ব-অর্জনের এমন সাক্ষ্য আর কোনো যুগ দেয় না। বলতে গেলে, রূপ এবং অরূপে, নির্মাণে ও ভাষায় – কবিতাই এই যুগকে সব যুগের থেকে বেশি স্মরণীয় করে রেখেছে, সবসময়ের জন্য উদাহরণযোগ্য করে রেখেছে তাকে। কারণ তখন শিল্পের অন্যসব রূপকল্পের সঙ্গে লিখিত কবিতাও ছিল আপন স্থানে। আরকে কাকে আলোকিত করেছিল সে-কথা আর নতুন করে না ভাবলেও চলে। পরবর্তী সকল যুগে অন্ধকারের মাঝে শিল্পের কোন ধারা সব থেকে বেশি উজ্জ্বল ছিল, তা ভেবে দেখলেই হয়। কার্যকারণ সম্বন্ধে আমাদের ধারণা একটা ঘটনা-পরম্পরার চেয়ে বেশি কিছু নয়। অন্যসব শিল্প মানুষের সুখ এবং কোনো আদর্শ-অর্জনের পথে যে-সমস্ত অবদান রাখে কবিতা সেইসব কিছুর সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। এ-বিষয়ে কারণ এবং ফল-সম্বন্ধে ইতিহাস যা প্রতিষ্ঠা করেছে আমি সেদিকেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
এই বিশেষ সময়েই নাটকের জন্ম হয়। পরবর্তী নাট্যকাররা এথেন্সের এসব কালজয়ী নাট্যরচনার তুলনায় যতই উন্নতি করে থাকুন না কেন, এটা অবিসংবাদী সত্য যে, শিল্প হিসেবে নাটককে এথেন্স যেভাবে বুঝেছিল এবং অভ্যাস করেছিল তাই ছিল নাটকের মূলগত দর্শন। অতীতে তার কোথাও কোনো জুড়ি ছিল না। এথেন্সের মানুষ ভাষা, গতি, সংগীত, চিত্রকলা, নৃত্য ও ধর্মীয় আচার-আচরণ – এইসব কিছুকে ব্যবহার করে, আবেগ, শক্তি এবং উন্নত আদর্শবাদের এক প্রতিমূর্তি গড়ে তুলতে পেরেছিল। শিল্পের সকল ধারার শিল্পীরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে চরম উৎকর্য লাভ করেছিলেন তখন।
শিল্পের প্রত্যেক ধারাকেই তার শিল্পীরা তাদের যত্নশীল দক্ষতায় পূর্ণ করে তুলেছেন। তারা নিজেরা প্রত্যেকে সুসমঞ্জস এবং সামগ্রিকভাবেও পারস্পরিক আদান-প্রদানে সংহত এখন।
আধুনিক নাটক (১৮২১) কবির মনোরাজ্য থেকে শুধু কয়েকটি ধারণার প্রতিবিম্বকেই একসঙ্গে আমাদের দেখায়। আমাদের ট্র্যাজেডিতে সংগীত ও নৃত্য থাকে না। আবার যেখানে সংগীত ও নৃত্য থাকে সেখানে তাদের পরিপূর্ণ সৌন্দর্য-পরিবেশনের জন্য এবং সঙ্গ দেবার জন্য উপযুক্ত পাত্রপাত্রী থাকেন না। আবার এই দুই ধরনের পরিবেশনই ধর্ম এবং গাম্ভীর্য থেকে দূরে থাকে। আসলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সকল প্রভাবকে নাটকের থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। (আগে যেমন অভিনেতারা মুখোশ পরে অভিনয় করতেন, এখন আর তা হয় না)। মুখোশের মধ্যে কোনো সামগ্রিক চরিত্রের উপযোগী একটা অপরিবতর্নীয়ভাব আঁকা থাকত। এখন আমরা সেই মুখোশকে বাদ দিয়েছি। কিন্তু অভিনেতার স্বাভাবিক মুখ শুধু একটা আংশিক এবং অসমঞ্জস প্রভাব আনতে পারে। শুধুমাত্র একলা নিজের মনে কথা বলার জন্যই তা উপযুক্ত। অবশ্য যখন তিনি একজন অতিশয় শক্তিমান অনুকরণকারী, তখন সেইভাবেও তিনি সব দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারতেন। কমেডি ও ট্র্যাজেডিকে, মিলনাত্মক ও বিয়োগাত্মক রচনাকে, একসঙ্গে মিলিয়ে ফেলার আধুনিক (১৮২১) প্রবণতাও এক ধরনের অনাচারই বলা যায় এবং এটাও নিঃসন্দেহে নাটকের পরিমণ্ডলেই সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কমেডির চেহারা হওয়া উচিত কিং লিয়ারে পরিবেশিত কমেডির মতো, যা বিশ্বজনীন, আদর্শ এবং উচ্চতম চিন্তার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ। শুধুমাত্র এই নীতির প্রয়োগের জন্যই হয়তো ইদিপাস টাইরেনস অথবা আগামেমনন থেকে অথবা তারা যে-ট্রিলজির অংশ তার থেকে কিং লিয়ার রচনা হিসেবে বড় হয়ে ওঠে।
অবশ্য কেউ কেউ হয়তো একথা বলবেন যে, কোরাসে গাওয়া কবিতার তীব্র ক্ষমতা, বিশেষত আগামেমননের ক্ষেত্রে, বিচার করে দেখলে এই লেখাগুলো হয়তো সমতুল্য। যদি এই তুলনাটুকু বাদ দেওয়া যায়, তাহলে আমি বলব যে, তার স্রষ্টার বর্তমান ইউরোপের নাট্যশৈলী এবং দর্শন-সম্বন্ধে অজ্ঞতার জন্য যে-সীমাবদ্ধতা ছিল তা সত্ত্বেও কিং লিয়ার শিল্পসংগত নাটক হিসেবে সারা পৃথিবীর মধ্যেই শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তাঁর নাটকের উপস্থাপনায় শেকস্পিয়র যে-উচ্চতর দিকগুলো উপেক্ষা করেছেন, যেমন নাটকের সঙ্গে ধর্মের একটা সম্পর্ক রক্ষা করা, বা সংগীত ও নৃত্যকেও নাটকে স্থান করে দেওয়া, সেগুলো আবার ক্যাল্ডেরন তাঁর কিছুটা ধার্মিক রচনা ‘অটোসে’র মধ্যে এনেছেন। কিন্তু সেখানেও সত্যিকারের মানবিক আবেগ ও অনুভূতির জীবিত প্রতিনিধিদের বদলে কিছু নির্দিষ্ট ছকে ফেলা পুনারাবৃত্ত ও বিকৃত কুসংস্কারের ধারণাকে স্থান দেওয়া হয়েছে। ফলে লাভের থেকে ক্ষতিই হয়েছে বেশি।
কিন্তু আমি বোধহয় কথাপ্রসঙ্গে আমার মূল বক্তব্যের বাইরে চলে যাচ্ছি। নাটকের দৃশ্যাবলি দেখার অভিজ্ঞতা মানুষের আচার-ব্যবহারের উন্নতি বা অবনতি আনতে পারে, এটা এখন সবাই স্বীকার করেন। একইভাবে কবিতার আদর্শ এবং বিশ্বজনীনরূপে উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতিও কোনো না কোনোভাবে মানুষের সাধারণ ব্যবহার ও অভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। নাটকের গঠনে কবিতার প্রয়োগ যেখানে শেষ হয়, তার প্রভাবের মধ্যে অবক্ষয়ের ছায়া সেখান থেকেই এসে পড়ে। মানুষের সাধারণ আচার-ব্যবহারের ইতিহাস খুঁজে দেখলে নীতির জগতের এইসব কার্যকারণের সঙ্গে কবিতা ও নাটকের উত্থান-পতনেরও একটা সংযোগ খুঁজে পাওয়া যাবে – এই আমার নিবেদন।
এথেন্স বা অন্য যে-কোনো জায়গায় নাটক যখনই সব থেকে সুন্দর ও আদর্শরূপে পৌঁছেছে তখনই সে সর্বদাই সেই যুগের মহত্তম নীতি ও বুদ্ধিগত উৎকর্ষের সঙ্গে সহাবস্থান করেছে। এথেন্সের কবিদের লেখা ট্র্যাজেডিগুলো যেন এক একটা আয়নার মতো, যার মধ্যে দর্শক ঘটনাচক্র এবং পরিবেশের একটা হালকা ছদ্মবেশের আড়ালে নিজেকেই দেখতে পায়। নিজের মুখোমুখি সেই চেহারায় যেন প্রতিটি মানুষ অন্তরে যা ভালোবাসে, প্রশংসা করে অথবা যা কিছু সে হতে চায়, এইসব কিছুর সঙ্গে ওতপ্রোত যে-আদর্শ এবং শক্তি জড়িত থাকে সেটি ছাড়া আর কোনো আবরণে আচ্ছাদিত থাকে না। যন্ত্রণা এবং আবেগের সেই সহজাত সহানুভূতি এত বড় মাপের যে সে কল্পনাকে বিস্তৃত করে – মনের যে-ক্ষমতা থেকে তার জন্ম হয় তাকেই যেন প্রসারিত করে সে। করুণা ও ক্রোধ, ভয় এবং দুঃখ তখন বরং মনের শুভ দিকগুলোকেই জাগিয়ে তোলে, এবং সকল পরিস্থিতিতে পরিচিত কলরোলের মধ্যে শুভবোধের প্রয়োগ প্রশান্তি নিয়ে আসে মনে। সেখানে অপরাধকে আমরা নিয়তির অজানা ও অপ্রতিরোধ্য কাজের ফলাফল হিসেবে দেখতে পাই বলে তার ভয়াবহতাও যেন অর্ধেক হয়ে যায়। ভুল সেখানে ইচ্ছাকৃত নয়, তাই মানুষের মন সেখানে ভুল পথ বেছে নেয়ার যন্ত্রণাময় স্মৃতি থেকে মুক্ত। নাটকের সর্বোচ্চ স্তরে ঘৃণা এবং সমালোচনার উপাদান থাকবে না, বরং সে আমাদের আত্মজ্ঞান এবং আত্মসম্মানের শিক্ষা দেবে। নিজেদেরই মতো কিছুর ওপর প্রতিবিম্বিত না হলে আমাদের মন অথবা চোখ নিজেকে দেখতে পায় না।
যতক্ষণ সে কবিতাকে প্রকাশ করে ততক্ষণ নাটক যেন একটা প্রিজমের চেহারার বহুতল আয়নায় তৈরি ক্যালিডোস্কোপ, যা মানুষের চরিত্র এবং প্রকৃতি থেকে ছড়িয়ে পড়া বহুবর্ণ আলোকরশ্মিকে সংগ্রহ করে আর তাদের সরল প্রাথমিক রূপকে প্রতিফলিত করে অপরূপ রাজকীয় সৌন্দর্যে। বারবার প্রতিফলিত সেই ছবিকে সে এনে দেয় সর্বত্র নিজেকে বিকীর্ণ করার এবং নিরন্তর পুনরাবৃত্ত হবার গতিবেগ।
কিন্তু সামাজিক অবক্ষয়ের যুগ সমকালীন নাটকেও তার ছায়া ফেলে। সেই সময় রচিত ট্র্যাজেডিগুলো হয়ে দাঁড়ায় প্রাচীন কালজয়ী রচনার অক্ষম ও শীতল অনুকরণ। সংশ্লিষ্ট শিল্পের সামঞ্জস্যপূর্ণ সাহচর্য সেখানে অনুপস্থিত।
অনেক রচনায় নাটকের সঠিক কাঠামো-সম্বন্ধেও ধারণার অভাব দেখা যায়। আবার সেই যুগের সেই কালের সাধারণ কিছু দোষ, যে-দোষে তার দর্শকের সঙ্গে রচয়িতা নিজেও দোষী, তারই নীতিহীন প্রশংসাকে ন্যায়নীতি বলে শেখানোর দুর্বল চেষ্টাও দেখা যায় এইসব নাটকে।
এ-থেকেই ক্লাসিক এবং স্থানীয় নাটকের শ্রেণিবিভাগ। অ্যাডিসনের ক্যাটো প্রথমটির উদাহরণ। দ্বিতীয় শ্রেণিগুলোর নাম উল্লেখ করা বাহুল্যমাত্র। তাদের উদ্দেশে কবিতা যেন কখনোই ব্যবহৃত না হয়।
কবিতা হচ্ছে সর্বদাই উন্মুক্ত এক বিদ্যুতের তরবারি। তার দাহকে ঢেকে রাখা আবরণ ভস্মেই বিলীন হয়ে যায়। তাই এই দ্বিতীয় শ্রেণির নাটকীয় রচনার মধ্যে আমরা কল্পনার ছায়াও দেখি না। এগুলো আবেগ ও অনুভূতির ওপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু কল্পনা ছাড়া এ-দুটির রূপ শুধু খামখেয়ালিপনা আর জাগতিক ক্ষুধা ছাড়া আর কিছু না। আমাদের ইতিহাসে নাটকের সর্বাধিক অবনতি ঘটেছিল সম্রাট দ্বিতীয় চার্লসের রাজত্বে। তখন স্বাধীনতা ও যা কিছু ভালো সবকিছুর ওপরে রাজশক্তির জয়ের গান গাইতে কবিতার সকল রূপকে ব্যবহার করা হতো। নিজের জন্য অনুপযুক্ত একটা যুগে মিলটন একা দাঁড়িয়ে ছিলেন। এই রকম সময়ে সোজাসুজি হিসাব-নিকাশই নাটকের মূল বক্তব্য হয় এবং নিজেকে প্রকাশের জন্য কবিতার তার মধ্যে কোনো স্থান থাকে না। তখন কমেডি তার বিশ্বজনীন আবেদনকে হারায় এবং সূক্ষ¥ বুদ্ধিপ্রয়োগের যে-হাসি তাকে আরো মোটা দাগের মজার কাছে জায়গা ছেড়ে দিতে হয়। তখন আনন্দ নয় আত্মসন্তুষ্টি এবং ছোটখাট জয়ই আমাদের হাসির উৎস। তখন নির্মল সহানুভূতিশীল মজার বদলে শত্রুতা, বিদ্রƒপ আর ঘৃণাকে বেছে নিই আমরা। হয়তো হাসতেই পারি না ভালোভাবে, শুধু হাসির আভাস থাকে মুখে। অশ্লীলতা, যা জীবনের স্বর্গীয় সৌন্দর্যের বিরুদ্ধে ঈশ্বরনিন্দার সমান, তখন যে-পর্দাটির আড়ালে সে লুকিয়ে থাকে সেখান থেকেই আরো কদর্য না হলেও আরো বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ এমন এক দানব, যাকে সামাজিক অবক্ষয় সর্বদাই খাদ্য যোগায় আর সবার আড়ালে উদরপূর্তি করে সে।
নাটক হচ্ছে এমন একটা মাধ্যম যেখানে কবিতার একাধিক রূপকে একসঙ্গে মেলানোর সম্ভাবনা অন্য সব মাধ্যমের থেকে বেশি। আর তাই কবিতা ও সামাজিক শুভবোধের সম্পর্ক অন্য সব মাধ্যমের চেয়ে নাটকের মধ্যে বেশি করে দেখা যায়। এ-কথাও অনস্বীকার্য যে, শ্রেষ্ঠ সামাজিক উন্নতির সময়েই আমাদের শ্রেষ্ঠ নাটকগুলো রচিত হয়েছে। এবং যে-জাতি একদিন উৎকৃষ্ট নাটক রচনা করেছে তাদের হাতেই তার অবক্ষয় অথবা বিলুপ্তি জাতি হিসেবেও তাদের অবক্ষয়ের সূচক এবং তাদের সামাজিক জীবনে প্রাণশক্তি নিঃশেষ হওয়ার পরিচায়ক। কিন্তু ম্যাকিয়াভেলি যেমন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো-সম্বন্ধে বলেছেন তেমনভাবেই আমরা বলতে পারি যে, কোনো জনগোষ্ঠী যদি তাদের নাট্যজগৎকে তাদের মূলনীতিতে ফিরিয়ে আনতে পারে তাহলে তারা তাদের নিজেদের জীবনকেও সংরক্ষণ ও নবায়ন করতে পারবে। কবিতার সর্বাধিক বিস্তৃত অর্থে এটি তার জন্যও সত্য। সমস্ত ভাষা, প্রতিষ্ঠান ও মাধ্যমকে শুধু সৃষ্টি করলে হবে না, জীবিত রাখতে হবে তাদের।
কবির উপস্থিতি এবং তার চরিত্রপ্রকৃতির স্বর্গীয় রূপের মধ্যে বিধাতার ইচ্ছার মতো অংশগ্রহণ করে। তার অস্তিত্ব সৃষ্টির সমগ্র রূপের থেকে কম কিছু নয়।
গৃহযুদ্ধ, এশিয়াতে শক্তিক্ষয়, এরপরে ম্যাসিডনিয়দের শক্তিবৃদ্ধি এবং তারও পরে রোমের অস্ত্রশক্তির উত্থান – এইসবই ধীরে ধীরে ক্ষয় করেছে এবং পরে বিলুপ্ত করেছে গ্রিসের সৃজনীশক্তিকে। সিসিলি এবং মিশরের লেখাপড়া জানা স্বৈরশাসকদের ছত্রছায়ায় প্রতিপালিত এবং গ্রামীণ পরিবেশ থেকে উঠে আসা লেখকরা ছিল তাদের উজ্জ্বল শাসনকালের শেষতম প্রতিনিধি। তাদের কবিতা ছিল অত্যন্ত বেশি সুরেলা, রজনীগন্ধার তীব্র সুবাসের মতো – যার মিষ্টত্ব সম্পূর্ণভাবে অধিকার করে মনকে – এতবেশি যে শেষে অপ্রীতিকর মনে হয় তাকে। অপরদিকে তার আগের যুগের কবিতা ছিল জুন মাসের মেঠো বাতাসের মতো, যাতে সমস্ত ফুলের সুগন্ধ মিশে থাকে। মনকে তৃপ্ত করার এবং সুসমঞ্জস এক অনুভূতি সৃষ্টি করার শক্তি ছিল সেই কবিতায়। তার সৃষ্ট আনন্দ দীর্ঘসময় ধরে অনুরণিত হতো চেতনায়। যে-যুগের কথা আমি বলেছি সেই যুগে তেমনই কবিতার মধ্যে যেমন গ্রামীণ আর শরীরমনস্ক পেলবতা সংগীত এবং অন্যান্য চারুশিল্প, এমনকি আচার-ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপারেও একটা কোমল ভাব এক ধরনের যুগলক্ষণ ছিল। সামঞ্জস্যের এই অভাব কিন্তু কবিতার নিজের গুণ বা তার কোনোরকম অপপ্রয়োগ থেকে সৃষ্টি হয়নি। ইন্দ্রিয়গত অনুভূতি ও আবেগের একই সংবেদনশীল প্রভাব আমরা হোমার এবং সফোক্লিসের রচনাতেও দেখি। বিশেষত আগেরজন তাঁর ইন্দ্রিয়পরায়ণ এবং করুণ প্রতিমূর্তিগুলোকেও অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণের আবরণে সাজিয়ে রেখেছেন। পরবর্তী লেখকদের তুলনায় তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব তাঁদের লেখায় সেইসব চিন্তার প্রকাশে, যা আমাদের অন্তরের রূপে সমৃদ্ধ, বাইরের কোনো অভাববোধের তুলনায় নয়। সমস্ত সুরের মিলিত ঐকতানেই তাদের অতুলনীয় অর্জন। ইন্দ্রিয়বোধের জয়গান গেয়েছেন যেসব কবি, তাদের যা আছে তাতেই নয়, বরং তাদের যা নেই তাতেই অসম্পূর্ণতার সৃষ্টি হয়েছে বেশি। তারা যতখানি কবি ছিলেন তা-ই দিয়ে নয়, তারা যতখানি কবি ছিলেন না তা-ই দিয়েই সেই যুগের অবক্ষয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের পরিমাপ করা যেতে পারে যদি সেই অবক্ষয় এমন হতো যে, সে তাদের মধ্যে আনন্দ, আবেগ ও প্রকৃতির রূপের প্রতি যে-সংবেদনশীলতা, যাকে আমরা দুর্বলতা বলছি তাকেও নষ্ট করে দিত সে, তখনই বরং অকল্যাণের সর্বাংশে জয় হয়েছে বলা যেত। সামাজিক সমস্ত অবিমৃষ্যকারিতার সমাপ্তি মানে সমস্ত ইন্দ্রিয়সুখেরও সমাপ্তি; তাও এক ধরনের অবক্ষয়। এই অকল্যাণ প্রথমে কল্পনা এবং বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে, তারপরে সাপের বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র, অবশ করে সকল মানসিক আগ্রহকে। সৃষ্টি হয় এক অসাড় স্থবিরতা, যেখানে কোনো অনুভূতি আর জীবিত নেই। যখন এমন কোনো সময় আসন্ন হয় তখন কবিতা মানুষের মনের সেই দিকগুলোকেই আশ্রয় করে যেগুলো ধ্বংস হয় সবার শেষে। তখন তার কণ্ঠস্বর শোনা যায় এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার সময় অ্যাস্ট্রার (অংঃৎবধ) পদধ্বনির মতো।
মানুষ যে-সমস্ত আনন্দ উপভোগ করতে সক্ষম তাদের সবই অপর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে কবিতা। সে সবসময়েই জীবনের জন্য আলোকবর্তিকা – মানুষের অসম মুছে যাবে না, কারণ তারা ব্যতিক্রমি প্রতিভার স্পর্শ পেয়েছে।
ইউরোপে হোমার প্রথম এবং দান্তে দ্বিতীয় মহাকবি, যাঁদের সৃষ্টির শৃঙ্খলা তাঁরা যে-যুগে বেঁচেছিলেন তার সঙ্গে এবং তার পরবর্তী যুগের সঙ্গেও তার জ্ঞান, অনুভব এবং ধর্মচর্চার একটা সুনির্দিষ্ট এবং বোধগম্য সম্পর্ক রেখেছে, তাদের অগ্রগতির সঙ্গে তারা নিজেরাও অগ্রসর হয়েছে। কারণ লুক্রেটিয়াস তাঁর রচনায় পাখা মেলা চেতনাকে ইন্দ্রিয়ের জগতে আবদ্ধ রেখেছিলেন। ভার্জিল, এত বিনয়ী ছিলেন যা শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রতিভার জন্য ক্ষতিকর হয়েছে এবং যদিও যা কিছু অনুসরণ করেছেন সবকিছুকেই নতুন করে সৃষ্টি করেছেন তিনি, তাঁর খ্যাতি হলো অনুকরণকারী হিসেবেই। এছাড়া বাকি যারা সমকালীন এবং পরবর্তী সময়ের লেখক ও কবি ঝাঁক বেঁধে এসেছিলেন, সেই এপোলোনিয়াস, রোডিয়াস, কুইন্টাস, ক্যালাবার, নোনাস, লুকান, স্ট্যাটিয়াস অথবা ক্লডিয়ান, যদিও তাঁদের গানের সুর ছিল মিষ্টি, তাঁরা কেউই মহাকাব্যের সত্যকে আবিষ্কার করার একটি শর্তও পূরণ করতে পারেননি। এরপরে মহাকাব্যের তৃতীয় কবি ছিলেন মিলটন। কারণ সর্বোচ্চ বিচারে যদি ইনিডকে আমরা মহাকাব্য না বলি, তাহলে অর্নান্তো ফিউরিয়োসো, জেরুসালেমে লিবারেটা, দি লুসিয়াড অথবা দি ফেয়ারি কুইন সম্বন্ধে আরো কম বলা যাবে।
দান্তে এবং মিলটন উভয়েই পশ্চিমি সভ্যজগতের প্রাচীন ধর্মগুলোকে ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। এবং ইউরোপে ধর্মসংস্কারের আগে সাধারণ মানুষের উপাসনায় তাদের যেটুকু উপস্থিতি ছিল সেইটুকুই তাঁদের লেখাতেও পাওয়া যায়। এঁদের একজনের আবির্ভাব ধর্মসংস্কারের আগে ও অপরজনের তার পরে, প্রায় সমান সময়ের ব্যবধানে। দান্তে ছিলেন প্রথম ধর্মসংস্কারক। আচরণ ও প্রকাশের কর্কশ রুক্ষতায় লুথার তাঁকে অতিক্রম করে গেলেও, পোপের অন্যায়ভাবে ক্ষমতাদখলের সমালোচনায় দান্তে অনেক বেশি সাহসী ছিলেন। মোহাচ্ছন্ন ইউরোপকে প্রথম জাগিয়ে তোলেন দান্তে। বর্বরতার বিভিন্ন বিশৃঙ্খলাময় অবশেষ থেকে তিনিই প্রথম একটি সুন্দর ভাষায় প্রকাশভঙ্গি – তার সংগীত এবং এগিয়ে চলা প্রাণধারাকে সৃষ্টি করেন। ইউরোপে জ্ঞানচর্চার নবজাগরণের যাঁরা পৌরোহিত্য করেছিলেন সেই উজ্জ্বল রত্নসভার তিনিই ছিলেন আহ্বায়ক। সেই নক্ষত্রমণ্ডলীতে তিনিই ছিলেন লুসিফার, ইটালির প্রজাতন্ত্র থেকে বিচ্ছুরিত যাঁর স্বর্গীয় আলো রাত্রিতে আচ্ছন্ন বাকি পৃথিবীতে ছড়িয়ে গিয়েছিল। তাঁর উচ্চারিত শব্দ ছিল প্রাণশক্তিতে ভরপুর। প্রতিটি উচ্চারণ ছিল এক একটা স্ফুলিঙ্গের মতো। কখনই যা নিভে যাবে না – জ্বলন্ত চিন্তার এমন একেকটি অণু-পরমাণু।
শ্রেষ্ঠতম কবিতা অনন্ত সম্ভাবনাময়। সেই প্রথম বীজ, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে সমস্ত ওক গাছ, তার একটার পর একটা পর্দা হয়তো সরিয়ে দেখা যায় তবুও তার অনাবৃত নিরাবরণ সৌন্দর্য আমরা কখনো না-ও দেখে থাকতে পারি। মহৎ কবিতা সর্বদাই দুকূল ছাপিয়ে চলা জ্ঞান এবং আনন্দের নদীর মতো। একজন মানুষ এবং একটি যুগ তাদের সময়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক তাকে যতটা সুযোগ দেয় ততখানিই অবগাহন করে সেখানে। এরপর আসে আরেক যুগ, আরেক নতুন সম্পর্ক নিয়ে। মহৎ কবিতা এইভাবে পূর্বাভাসের অতীত অনির্বচনীয় আনন্দের উৎস হয়ে থাকে।
দান্তে, পেট্রার্ক এবং বোকাশিওর পরবর্তী যুগে চিত্রাঙ্কন, ভাস্কর্য এবং স্থাপত্যের প্রভূত উন্নতি হয়েছিল এবং প্রায় নবজন্ম হয়েছিল বলা যায়। এরপরে চসার পেলেন তাঁর পবিত্র প্রেরণা আর ইংরেজি সাহিত্যের প্রাসাদের উপরতলা নির্মাণ হলো ইটালিতে আবি®কৃত মালমশলা দিয়ে। আমরা শুরু করেছিলাম কবিতার সপক্ষে কিছু বলার জন্য, সেখানে থেকে কবিতার ইতিহাস এবং সমাজের ওপর তার প্রভাব নিয়ে আলোচনায় হারিয়ে যাচ্ছি আমরা। এখানে আমরা শুধু সত্যিকারের বৃহত্তর অর্থে যারা কবি, তাদের নিজেদের সময় এবং পরবর্তী সবসময়ের ওপর তাদের প্রভাবের কথা বলতে চেয়েছিলাম, এর বেশি কিছু নয়।
কিন্তু যারা পুরোপুরি যুক্তিবাদী ও যান্ত্রিক সভ্যতার বাহক, সমাজের পথনির্দেশক হবার রাজমুকুট তাদের কাছে হস্তান্তর করার জন্য তাদের কাছ থেকে কবিদের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ দেওয়া থাকে। এটা সবাই স্বীকার করেন যে কল্পনার চর্চা সর্বাধিক আনন্দময়। কিন্তু অভিযোগ এই যে, যুক্তির চর্চা অনেক বেশি কাজের। আসুন আমরা তাদের এই প্রভেদের জায়গাটা বিচার করে দেখি কাজের জিনিস বলতে এখানে কী বোঝানো হয়েছে। সুখ এবং ভালো অনুভূতি, সাধারণভাবে এই হচ্ছে দুটি জিনিস যাকে সংবেদনশীল ও বুদ্ধিমান লোকে খুঁজে থাকে, এবং যা হাতের কাছে পেলে সে বিনা আপত্তিতে গ্রহণ করে। সুখ দুরকমের। একরকম সুখ অভঙ্গুর, সর্বজনীন এবং স্থায়ী। অপরটি স্বল্পায়ু এবং ব্যক্তিগত। প্রথমটি আমাদের মানবিক শুভবোধগুলোকে শুদ্ধ এবং জাগ্রত করে, বিস্তৃত করে কল্পনাকে এবং চেতনাকে করে উজ্জীবিত। এই সবকিছ্ইু আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় কাজের জিনিস। কিন্তু ‘প্রয়োজনীয় বা কাজের জিনিস’ বলতে আমরা আরো ক্ষুদ্রতর অর্থেরও প্রয়োগ করতে পারি যা আমাদের জান্তব প্রয়োজনের বিভিন্ন অভাববোধকে দূর করে, মানুষকে এনে দেয় নিরাপত্তা, দূর করে কুসংস্কারের স্থূল ভ্রান্তি এবং ব্যক্তিমানুষের পক্ষে সুবিধাজনক জীবনযাপনের জন্য সমষ্টিগতভাবে পরস্পরকে সহ্য করতে শেখায়।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই ‘প্রয়োজনীয়তা’র ব্যাপারটাকে যারা সমর্থন ও প্রচার করছেন একটা সীমিত অর্থে তারা সমাজে তাদের নিজস্ব স্থানের দাবিদার। তারাও কবিদেরই রেখে যাওয়া পদচিহ্ন অনুসরণ করেন এবং তাদের সৃষ্টি করা ছবি প্রতিদিনকার খাতায় এঁকে রাখেন। তারা আমাদের বিস্তারের জন্য ত্রিমাত্রিক স্থান এবং সময়কে এনে দেন। তারা যে-শ্রম স্বীকার করেন তার জন্য সর্বোচ্চ মূল্য তাদের প্রাপ্য, কিন্তু ততক্ষণই যতক্ষণ পর্যন্ত তারা আমাদের প্রকৃতিগত এই নিুতর স্তরের ব্যাপারগুলোর মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেন। যুক্তিবাদী ও সন্দেহবাদীরা স্থূল কুসংস্কারকে বিনষ্ট করুন, কিন্তু তারা যেন কতিপয় ফরাসি লেখক যেমন করেছেন তেমনভাবে মানুষের কল্পনা চিরন্তন সত্যকে অবলম্বন করে যেসব চরিত্রের সৃষ্টি করেছে, তাদের ওপর কালিমালেপন না করেন।
যন্ত্রবাদীরা (সবপযধহরংঃ) যখন তাদের সবকিছু সংক্ষিপ্তকরণের কাজটি করেন আর রাজনৈতিক অর্থনীতির পথপ্রদর্শকরা (ঢ়ড়ষরঃরপধষ বপড়হড়সরংঃ) যখন শ্রমকে সংহত করেন তখন তাদের এই কথা মনে রাখা উচিত যে আধুনিক (১৮৭১) ইংল্যান্ডে তারা যেমন ধারণা করছেন তেমনভাবে, চরম বিলাসিতা ও মানুষের আত্মিক প্রয়োজনের সবগুলোকে একসঙ্গে মেলাতে পারবেন না। তারা তাদের কাজকর্মে সেই কথাটিকেই সত্য প্রমাণ করেছেন যেখানে বলা হয়েছে, ‘যার অনেক আছে তাকে আরো বেশি দেওয়া হবে আর যার প্রায় কিছুই নেই, তার সামান্য যেটুকু আছে সেটুকুও তার থেকে নিয়ে নেওয়া হবে।’ ধনীরা আরো ধনী হয়েছে, গরিবরা আরো গরিব এবং রাষ্ট্রের নৌকা জলে বাঘ ও ডাঙায় কুমিরের মতো নৈরাজ্য ও স্বৈরতন্ত্রের মাঝখানে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে আছে। সবকিছু অঙ্কের হিসাবে চালাবার নিয়ন্ত্রণহীন প্রবণতার এটাই ফলাফল।
সর্বোচ্চ অর্থে সুখের কোনো সংজ্ঞা খুঁজে পাওয়া কঠিন। তার মধ্যে বহুরকম আপাত বিরোধিতা এসে পড়ে। কারণ মানবপ্রকৃতির গঠনের মধ্যে সাম্য ও সামঞ্জস্যের মধ্যে ব্যাখ্যার অতীত কোনো অভাব থাকার জন্য, আমাদের অস্তিত্বের নিুতর স্তরের কোনো কষ্টের সঙ্গে উচ্চতর স্তরের কোনো আনন্দ প্রায়ই সম্পর্কযুক্ত হিসেবে দেখা যায়। দুঃখ, ভয়, যন্ত্রণা, হতাশাকেও দেখা যায় আমাদের সর্বোচ্চ কল্যাণের পথবাহী। ট্র্যাজিক বা বিয়োগান্তক কাহিনীপাঠে আমাদের সহানুভূতি এই নীতিরই পরিচয়। যন্ত্রণার মধ্যে যে-সুখের ছায়া আছে ট্র্যাজেডিতে আমাদের জন্য সেই অনুভবেরই প্রাপ্তি থাকে। সব থেকে মিষ্টি সুরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী যে বিষণ্নতা তারও উৎস এখানে। দুঃখের জন্য যে-সুখ তা শুধুই সুখের জন্য সুখের থেকে বেশি। এইজন্যই একটা প্রবাদ আছে যে, ‘উৎসবমুখর কোনো বাড়ি থেকে শোকগ্রস্ত কোনো বাড়িতে যাওয়া ভালো।’ অবশ্য সর্বোচ্চ শ্রেণির সুখ যে সর্বদা যন্ত্রণার সঙ্গেই যুক্ত এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ভালোবাসা এবং বন্ধুত্বের সুখ, প্রকৃতির রূপউপভোগের স্বর্গীয় আনন্দ, কবিতা-পাঠের এবং তার থেকেও বেশি – লেখার আনন্দ, দুঃখবিহীন এবং অবিমিশ্র।
এমন অনুভূতি সুখের জন্ম দেওয়ার এবং তাকে নিশ্চিত করা আমাদের সর্বোচ্চ প্রয়োজনের সত্যিকারের সাধনা, যারা তাদের সৃষ্টি করেন এবং বাঁচিয়ে রাখেন তারা হয় কবি নতুবা দার্শনিক কবি।
লক, হিউম, গিবন, ভলতেয়ার, রুশো এবং তাঁর শিষ্যরা শোষিত ও বঞ্চিত মানবতার জন্য যত্ন ও পরিশ্রমের সঙ্গে যা কিছু লিখেছেন বা করেছেন তার জন্য তাঁরা মানবজাতির কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। কিন্তু তবুও তাঁরা যদি পৃথিবীতে না আসতেন তাহলে পৃথিবী নৈতিক এবংবুদ্ধিগতভাবে কতটা উন্নতি অর্জন করতে পারত এটা হিসাব করা কঠিন নয়, হয়তো আরো দু-এক শতাব্দী কিছু নির্বোধ কথাবার্তা শুনতে হতো আমাদের এবং আরো কিছু নর, নারী ও শিশুকে নাস্তিক শাস্ত্রদ্রোহী বলে পুড়িয়ে মারা হতো। আর হয়তো স্পেনে ‘শাস্ত্রবিরোধিতার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান’ (ওহয়ঁরংরঃরড়হ) শেষ করা গেছে বলে আমরা এই মুহূর্তে পরস্পরকে অভিনন্দন জানাতে পারতাম না। কিন্তু যদি পেট্রার্ক, বোকাশিও, চসার, শেক্সপিয়র, ক্যালডেরন, লর্ড বেকন অথবা মিলটন – এঁদের কারও অস্তিত্ব না থাকত, যদি রাফায়েল এবং মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর কখনো জন্মই না হতো, যদি হিব্রু কবিতা কখনোই না অনুবাদ করা হতো, গ্রিক সাহিত্য যদি নতুন করে পড়াশোনা ও চর্চা না করা হতো, যদি প্রাচীন স্থাপত্য ও স্মৃতিসৌধগুলোকে আজ আমরা না পেতাম, যদি প্রাচীন পৃথিবীর ধর্মসংক্রান্ত সব কবিতা সেইসব বিশ্বাসের সঙ্গে আজ বিলুপ্ত হয়ে যেত, তাহলে পৃথিবীর নৈতিক পরিস্থিতি আজ কী হতো একথা বোধহয় কল্পনা করাও সম্ভব নয়। মানুষের মন কখনোই এইসব প্রেরণা ছাড়া ভৌতবিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কার এবং সামাজিক বিভ্রান্তির ওপর যুক্তিপ্রয়োগের চর্চা, যাকে কিনা আজকে সৃষ্টি ও আবিষ্কারের সরাসরি প্রেরণার ওপরে স্থান দেওয়ার কথা হচ্ছে – সেইসব অনুসন্ধানে জাগ্রত হয়ে উঠত না।
আমরা যতটা কাজে লাগাতে জানি তার থেকে বেশি নৈতিক, রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক জ্ঞান আজ আমাদের আছে। যতটুকু পর্যন্ত ন্যায়সঙ্গত ও সুষম বণ্টন আমরা করতে পারি তার থেকে বেশি উৎপাদনের এবং তাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে তোলার বৈজ্ঞানিক এবং অর্থনৈতিক জ্ঞান অর্জন করেছি আমরা। এই সমস্ত চিন্তাপদ্ধতির ভিতরের কবিতা পুঞ্জীভূত তথ্য এবং হিসাব-নিকাশের আড়ালে চাপা পড়ে আছে। নীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনৈতিক অর্থনীতি এইসবের শ্রেষ্ঠ অর্জন কী – সে-সম্বন্ধে, অথবা মানুষ এখন যা অভ্যাস করে বা সহ্য করে তার থেকে সুবুদ্ধিজনক এবং ভালো কী – সে-বিষয়ে আমাদের জ্ঞানের কোনো অভাব নেই। আমাদের অবস্থা এখানে শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথের মতো, ‘I dare not wait upon I would, like the poor cat in Adage’ [Macbeth 1, vii448] আমরা চাই আমাদের সৃষ্টির প্রেরণা আমরা যা জানি তাকেই যেন কল্পনা করে। আমরা চাই আমাদের ঔদার্যের স্পন্দন যেন আমাদের কল্পনাকে অবলম্বন করে। আমরা জীবনের কবিতাকে চাই। আমাদের অঙ্কের হিসাব বিবেচনাকে ছাড়িয়ে গেছে। আমরা যা হজম করতে পারি তার থেকে বেশি খেয়ে বসে আছি। বিজ্ঞানের সেই সমস্ত ধারার চর্চা যা বহির্জগতে মানুষের সাম্রাজ্যের সীমাকে বিস্তৃত করেছে তাই আবার, কবিত্বের ছোঁয়া না থাকার কারণে, সমানুপাতিকভাবে এড়িয়ে গেছে অন্তরের জগৎকে। আর মানুষ প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে তার দাসত্ব স্বীকার করাবার পরও নিজে একটি ক্রীতদাসই রয়ে গেছে। শ্রমকে সংক্ষিপ্ত ও মিলিত করার বিভিন্ন আবিষ্কারের অপব্যবহার মানুষের সমাজে যে-অসাম্যের যন্ত্রণার সৃষ্টি করেছে, সৃষ্টির উচ্চতর মানবিক প্রেরণার আনুপাতিক উপস্থিতিবিহীন যান্ত্রিক সভ্যতার চর্চা ছাড়া আর কাকেই বা আমরা তার জন্য দায়ী করতে পারি? যে-সমস্ত আবিষ্কার আজ আদম সন্তানদের অভিশাপ লাঘব করতে পারত তারাই বরং আজ তার ওপরে আরো বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এইজন্য অন্য আর কোন কারণকে দায়ী করব? একদিকে কবিতা আর তার বিপরীতে আত্মকেন্দ্রিক নীতি যার অবতার হচ্ছে অর্থ – এই হচ্ছে আধুনিক পৃথিবীর ঈশ্বর এবং সম্পদের দেবতা ম্যামন।
কবিতার বৃত্তি দুভাবে কাজ করে। প্রথমটির দ্বারা সে সৃষ্টি করে জ্ঞান, শক্তি ও সুখের জন্য নতুন উপাদান। দ্বিতীয়টির দ্বারা সে মনের মধ্যে সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট ছন্দ ও শৃঙ্খলায় সাজাতে চায়, যে-ছন্দ ও শৃঙ্খলাকে আমরা কল্যাণময় সুন্দর বলে চিনি। যে-সমস্ত সময়ে সর্বদাই হিসাব করা আত্মসুখের নীতির অত্যধিক প্রয়োগে মানুষ নিজের জীবনের বহির্ভাগে এত বেশি উপাদান ¯ূ—পাকার করতে শুরু করে যে, মানুষের প্রকৃতির অন্তর্মুখী নিয়ম-অনুসারে তাদের আত্মস্থ করাই আর সম্ভব নয়, কবিতার চর্চা সেইসব সময়ে বড় বেশি প্রয়োজন। বুঝতে হবে শরীর তখন, তাকে যে-গতিশীল রাখে সেই প্রাণশক্তির পক্ষে, খুব বেশি ভারি আর বেমানান হয়ে পড়েছে।
কবিতা সত্য সত্যই স্বর্গীয় কোনো কিছু। সে একই সময়ে জ্ঞানের পরিধি ও কেন্দ্রবিন্দু। কবিতা সকল বিজ্ঞানকে ধারণায় আনে এবং সকল বিজ্ঞানকে একদিন কবিতার কাছে আসতে হয়। কবিতা একই সঙ্গে অন্য সকল চিন্তাপ্রকরণের মূল এবং তাদের ফুলও। কবিতা সেই উৎস যা থেকে এরা সবাই জন্ম নেয়, আবার কবিতাই সাজিয়ে তোলে তাদের।
কবিতাকে যদি ধ্বংস করা হয়, নষ্ট করা হয়, তাহলে সে আর ফল এবং তার বীজের সৃষ্টি করে না আর বন্ধ্যা পৃথিবী তখন পুষ্টি এবং জীবনের বৃক্ষ এবং তার নব পল্লবের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে। কবিতা সকল বস্তুজগতের চূড়ান্ত এবং নিখুঁত উপরিতল, সকল কুঁড়ির ফুল। গোলাপ যে-উপাদান দিয়ে তৈরি হয় কবিতা তার বর্ণ এবং গন্ধ।
যে-শরীরী গোপনীয়তা নৈতিকতার ভাঙনকে ডেকে আনে কবিতা তাকে অতিক্রম করেও তার গঠন ও সৌন্দর্য। এটা অনুভবের বিষয় যে, আমাদের সততা, ভালোবাসা, দেশপ্রেম এবং বন্ধুত্ব; যে-বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আমরা বাস করি তার অপার সৌন্দর্য, এইসবের কী হতো, কী হতো এইসব কিছুর ওপারে মানুষের বিরামহীন উত্তরণের আকাক্সক্ষার, যদি না প্যাঁচার মতো পক্ষবিশিষ্ট হিসাব করা বৃত্তি যেখানে পৌঁছতেই পারে না সেসব অসীমের আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে কবিতা আমাদের জন্য আলো আর আগুনকে না নিয়ে আসত?
কবিতা যুক্তি বা বুদ্ধির মতো ইচ্ছামতো প্রয়োগ করার কোনো শক্তি নয়। একজন মানুষ ইচ্ছে করলেই বলতে পারে না ‘আমি কবিতা লিখব’, এমনকি সেরা কবিরাও একথা বলতে পারেন না, কারণ সৃষ্টির কাজে নিয়োজিত মানুষের মনের ধর্ম জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো, যাকে সতত দিক-পরিবর্তনশীল হাওয়ার মতো কোনো অদৃশ্য প্রভাব স্বল্প সময়ের জন্য উজ্জ্বল করে তোলে। এর শক্তি আসে ভেতর থেকে। ফুল যখন ফুটে ওঠে তখন তার বর্ণ যেমন ধীরে ধীরে পালটে যায় তেমনই। আমাদের সচেতন মন সেই আসা-যাওয়ার খবর আগে থেকে জানতে পারে না। যদি সেই প্রভাব তার প্রথম আবির্ভাবের বিশুদ্ধতা ও শক্তি নিয়েই দীর্ঘক্ষণ বজায় থাকত তাহলে তার ফলাফল কোন উচ্চতায় পৌঁছত তা ধারণা করাও সম্ভব নয়।
কিন্তু লেখার কাজ যখন শুরু হয় প্রেরণা তখন উচ্চতম শিখর পেরিয়ে নিুগামী এবং পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতাও আসলে কবিমনের প্রথম উজ্জ্বল অনুভবটির দুর্বল ছায়া ছাড়া আর কিছু নয়। আমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিদের কাছে আমার আবেদন – আপনারাই বলুন আমি যদি একথা লিখি যে, কবিতার সেরা অংশগুলো আসলে পড়াশুনা এবং পরিশ্রমের ফল, তাহলে আমার কোনো ভুল হবে কিনা। সমালোচকরা লেখার মধ্যে যে-পরিশ্রম ও সময়ব্যয়ের কথা বলেন তার সঠিক ব্যাখ্যা বোধহয় প্রেরণাদীপ্ত মুহূর্তগুলোর পর্যবেক্ষণে এবং তার ফলে লব্ধ যা কিছু তাদের মধ্যকার ত্রিমাত্রিক শূন্যের কৃত্রিম সংযোজক সাধারণ অভিব্যক্তির মধ্যে আছে। এর প্রয়োজন কবিতারচনার বৃত্তির সীমাবদ্ধতার কারণেই। প্যারাডাইস লস্ট বিভিন্ন খণ্ডে লেখার আগে মিলটন সম্পূর্ণ কাব্যটি ধারণা করতে পেরেছিলেন। আমরা তাঁর নিজের বক্তব্যেই পাই যে লেখার সময় কাব্য ও কবিতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী নিজেই যেন তাঁকে ‘আগে কখনো না কল্পনা করা এই গানটি’ (unpremeditated song) বলে গিয়েছিলেন। যাঁরা Orlando Furioso -র প্রথম লাইনটির ছাপান্নটি বিভিন্ন পাঠ থাকার কথা বলেন এটা তাঁদের জন্য একটা উত্তর হওয়া উচিত। চিত্রশিল্পের জন্য যেমন মোজাইক, কবিতার জন্য তেমন এই বিশেষ রচনা প্রকরণ। কবিতা রচনার এই বৃত্তির সঙ্গে জড়িত সহজাত প্রবৃত্তি ও প্রেরণাকে আমরা আরো বেশি করে দেখতে পাই ভাস্কর্য এবং চিত্রশিল্পে। শিল্পীর প্রতিভার প্রয়োগে একটি সুন্দর মূর্তি বা ছবি যেন মাতৃগর্ভে শিশুর মতো ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। অথচ যে-মন সেই হাতদুটিকে নির্দেশ দেয় সে নিজে এই প্রেরণা ও পদ্ধতির উৎস, স্তর এবং মাধ্যম-সম্বন্ধে নিজের কাছেই কোনো উত্তর দিতে পারে না।
কবিতা সব থেকে সেরা এবং সুখী মুহূর্তের স্বাক্ষর। আমরা কখনো কোনো স্থান বা মানুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানো, কখনো বা আমাদের নিজেদের মনের ভিতর থেকেই উদ্ভূত, ক্ষণস্থায়ী প্রেরণার আসা-যাওয়ার কথা জানি। তাদের আগমন পূর্বাভাষবিহীন এবং প্রস্থানও তাই। তারা সর্বদাই আমাদের উত্তীর্ণ করে অনির্বচনীয় কোনো আনন্দলোকে। এমনকি যে-কামনা ও দুঃখ তারা রেখে যায় তাতেও তার মূল অবলম্বনের সঙ্গে জড়ানো সুখ মিশে থাকে। কবিতা যেন আমাদের মনের ভিতর দিয়ে অন্য কোনো স্বর্গীয় প্রকৃতির প্রকাশ। তার পদশব্দ আমরা শুনতে পাই সাগরের উপর হাওয়ার মতো যাকে কোনো এক প্রশান্তি এসে মুছে দেয়, তার পরে তার পদচিহ্ন পড়ে থাকে বেলাভূমিতে এঁকে যাওয়া ঢেউয়ের রেখায়। এইসব, এবং এর সঙ্গে জড়ানো অস্তিত্বের অন্যসব শর্ত অনুভূত হয় প্রধানত সেই মনে যে-মন সংবেদনশীলতায় সূক্ষ্ম এবং কল্পনার প্রসারে মহত্তম। মনের উপর তাদের প্রভাব সকল নিুস্তরের ইচ্ছার সঙ্গে যুধ্যমান থাকে। মানবিকতায় বিশ্বাস এবং তার পালন, ভালোবাসা, দেশাত্মবোধ এবং বন্ধুত্ব, এইসব আগ্রহ এবং উৎসাহ সবই এই রকম আবেগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, তারা যতক্ষণ মনের মধ্যে থাকে, ততক্ষণ আত্মবোধ আমাদের অস্তিত্ব আসলে যা, তাই হয়ে থাকে – বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে এক পরমাণুর মতো। কবিরা যে শুধুমাত্র সর্বাধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ এই শৃঙ্খলার সারাংশকে মনে মনে অনুভব করেন তাই নয়, তাঁরা যা কিছু সংযুক্ত করেন এই ক্ষণস্থায়ী অদৃশ্য জগতের মায়াময় বর্ণালিতে রঞ্জিত করতে পারেন তাদের। কখনো কখনো একটি শব্দ, কোনো দৃশ্য বা আবেগের উপস্থাপনায় অল্প কিছু আভাসই স্পর্শ করে যায় মনের সেই জাদু-করা তন্ত্রীটিকে। যে-মনের এমন অনুভবের অভিজ্ঞতা আছে, সেইসব মনে ভুলে যাওয়া অতীত আর তার অনেক ঘুমন্ত, শীতল ছবি যেন নতুন প্রাণের স্পর্শে আবার জেগে ওঠে। এই পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর ও শ্রেষ্ঠ কবিতা তাকে অমর করে রাখে।
জীবনের অমাবস্যার সময়ে যে-সমস্ত নিয়ত অদৃশ্য হয়ে যাওয়া ছায়াময় মায়াবিনীরা মনের মধ্যে ঘোরে-ফেরে, কবিতার কাছে ধরা দেয় তারা। তারপর রূপ অথবা ভাষার ওড়নায় তাদের সাজিয়ে কবিতা তাদের পাঠিয়ে দেয় মানুষের কাছে – সেইসব মানুষের কাছে যাদের মনের মধ্যে তাদেরই ভগিনিরা বাস করে। সেই তাদের বাসস্থান, কারণ অন্তরের সেইসব গভীর গহ্বর থেকে বস্তুময় বিশ্বে এসে পৌঁছানোর কোনো সহজ পথ নেই। কবিতার সঙ্গে মানুষ তার মনে স্বর্গীয় প্রেরণাকে পায় এবং কবিতা সেই আলোকিত অনুভবকে ক্ষয় পাওয়া থেকে রক্ষা করে।
যেখানে তার স্পর্শ লাগে সেইসব কিছুকেই প্রিয় করে তোলে কবিতা। যা সব থেকে বেশি সুন্দর তাকেও যেন আরো বেশি সুন্দর করে তোলে সে, আর যা অসুন্দর এবং বিকৃত তাকেও এনে দেয় কমনীয়তা। সে আতঙ্কের সঙ্গে আনন্দকে মিলিয়ে দিতে পারে, দুঃখের সঙ্গে সুখকে, ক্ষণস্থায়ীর সঙ্গে অনন্তকে – তার অতি হালকা জোয়ালের নিচে কখনো না মেলবার মতো জিনিসও এক হয়ে মিলে থাকে। যা কিছু স্পর্শ করে তাকেই পরিবর্তিত করে সে। তার আলোর বলয়ে যা কিছু এসে পড়ে কোন এক আশ্চর্য অনুভবে তারই চেতনায় তারা নতুন করে প্রাণ পায়। তার গোপন রসায়ন জীবনের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা মৃত্যুর স্রোতকে সুপেয় পানীয় করে তোলে। চেনা জগৎ থেকে সে সরিয়ে দেয় পরিচিতির ওড়না আর তার নিদ্রিত নগ্ন রূপ, যা সকল পরিচিত অবয়বের প্রাণস্বরূপিনী, তার নিরাবরণ সৌন্দর্য, তখন সামনে আসে।
সকল বস্তুর অস্তিত্ব আমরা তাকে যেমন ধারণা করি তেমনই, অন্তত ধারণাকারীর কাছে।
‘মন তার স্বভূমিকে গড়ে তোলে নিজের মতন।
স্বর্গকে নরক বানায়,
নরকেরে করে তোলে স্বর্গ যেমন।’
[`The mind is its own place, and in itself
Can make a heav’n hell, a hell of heav’n,- Milton]
আমাদের চারপাশের জগতের বিক্ষিপ্ত এবং অনভিপ্রেত প্রভাবের বন্ধন এবং তার অভিশাপ থেকে কবিতা মুক্ত করে আমাদের। হয় সে নিজের রচিত দৃশ্যপট সামনে আনে, নয়ত আমাদের চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দেয় অন্তরালে-ঘটে-যাওয়া দৃশ্যাবলির উপরে পরিচিত জীবনের এনে ফেলা কালো পর্দা। আমাদের অস্তিত্বের ভিতরেও আর এক অস্তিত্বের সৃষ্টি করে সে। সে আমাদের এমন এক জগতের অধিবাসী করে তোলে, যার তুলনায় আমাদের পরিচিত পৃথিবী শুধু এক বিশৃঙ্খল দৃশ্য। যে-অখণ্ড বিশ্বের আমরা সবাই অংশ এবং অংশগ্রহণকারী, তাকেই নতুন করে সৃষ্টি করে সে, আর যে-দৈনন্দিন অতি পরিচিতির পর্দা আমাদের আনন্দময় অস্তিত্বকে আমাদের চোখের আড়াল করে রাখে, তাকে সরিয়ে দেয়। আমরা যা ধারণা করি কবিতা তাকেই অনুভব করতে আমাদের বাধ্য করে, আর যা আমরা জানি তাকেই কল্পনা করতে শেখায়। বারবার পুনরাবৃত্তিতে স্থূল হয়ে পড়া অনুভূতি ধ্বংস করে আমাদের মনের জগৎ, আর কবিতা নতুন করে সৃষ্টি করে তাকে। তাসোর সেই সাহসী সত্যভাষণকে সমর্থন করে সে, যেখানে তিনি বলছেন, ‘ঈশ্বর এবং কবি, – এঁরা ছাড়া আর কাউকেই আমরা ‘স্রষ্টা’ এই নাম দিতে পারি না।’ [‘Non merita nome di creatore, se non Iddio ed il Poeta, Tasso]
কবি যেহেতু যেমন অন্যের কাছে সর্বোচ্চজ্ঞান, আনন্দ, মানবিক সমস্ত গুণ এবং গৌরবের পরিচয়দাতা তেমনই ব্যক্তিগতভাবেও মানুষের মধ্যে তারই সবার সেরা জ্ঞানী, আনন্দময়, গৌরবময় ও বর্ণময় মানুষ হওয়া উচিত। তার গৌরবের ব্যাপারে আমরা সময়কেই চ্যালেঞ্জ জানাতে পারি, সে-ই বলুক মানুষের মধ্যে আর কোনো গুণ তাকে একজন কবির মতো খ্যাতিমান করতে পারে। আর তিনি যে কবি বলেই সব থেকে জ্ঞানী, সব থেকে সুখী এবং সবার চেয়ে সেরা এতেও কোনো দ্বিমতের অবকাশ নেই। আমাদের সব থেকে বড় কবিরা নিষ্কলঙ্কভাবে মানবিক গুণের অধিকারী ছিলেন, সব থেকে বেশি প্রাঞ্জল ছিলেন তারা, আর যদি আমরা তাদের জীবনের ভিতরে খোঁজ নিই তবে দেখব সব থেকে বেশি ভাগ্যবানও। আর ব্যতিক্রম, যা সাধারণত আমরা তাদের মধ্যেই দেখি যাদের কবিত্বগুণ আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নিুস্তরের, তা এই নিয়মকে সীমাবদ্ধ করে কিন্তু মিথ্যা প্রমাণ করে না।
তবে, বিচার যদি করতেই হয় আসুন আমরা সাধারণ মানুষের স্তরে নেমে এসে তাদের বিচার করে দেখি। আসুন আমরা অভিযোগকারী, সাক্ষী, বিচারক এবং শাস্তিদানকারী – এইসব একে অন্যের সঙ্গে না মেলাবার মতো চরিত্রের গুণগুলো দখল করি এবং নিজেদের মধ্যে মেলাই। আসুন ন্যায়বিচার এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই আমরা স্থির করি, ‘যে উচ্চতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করারই আমাদের সাহস হবে না, সেইখানে যাঁরা রয়েছেন (There sitting where we do not soar) তাঁদের মধ্যে অনেকেই নানা কারণে নিন্দনীয়। আসুন আমরা ধরে নিই যে, হোমার ছিলেন মদ্যপ,ভার্জিল চাটুকার, হোরেস একজন কাপুরুষ, টাসো নেহাতই পাগল, লর্ড বেকন একজন অদ্ভুত মানুষ, রাফায়েল ইন্দ্রিয়পরায়ণ এবং স্পেন্সার শুধুই রাজসভার কবি। যেসব কবি এখনো বেঁচে আছেন তাঁদের নাম এখনোই এইসব শ্রেণিতে উল্লেখ করা উচিত হবে না। কিন্তু যেসব খ্যাতিমান নাম আমি একটু আগে উল্লেখ করলাম তাদের পরবর্তী সময় তাঁদের বিচার সম্পূর্ণ করেছে বলা যায়। তাঁদের সমস্ত ভুল এখন ওজন করে দেখা হয়ে গেছে এবং দেখা গেছে তা তুলাদণ্ডে ধুলার থেকে বেশি ভারি কিছু নয়। যদি তাদের অপরাধ একদিন রক্তলাল মনে হয়ে থাকে এখন তা তুষারের মতো শুভ্র। (If their sins Ôwere as scarlet, they are nwo white as snow’)। তাদের সেইসব তথাকথিত অপরাধ এখন সেই বিচারক আর উদ্ধারকারীর রক্তে ধৌত, যার নাম ‘সময়’। লক্ষ করে দেখুন, আমাদের সময়ে (১৮২০) কবি ও কবিতার নামে কী পরিমাণে বিশৃঙ্খলাময় ও হাস্যকর সব অপবাদ দেওয়া হয়েছে। ভেবে দেখুন, কত তুচ্ছ ব্যাপার অকারণেই আলোচনায় আনা হয়েছে। বিচার করার আগে জেনে রাখুন, এইসব বিচারেরও বিচার হতে পারে (Judge not, lest ye judged)।
আমরা যেমন আলোচনা করেছি, কবিতা মনের সচেতন ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে নেই, আর এইখানে যুক্তি-বুদ্ধির সঙ্গে তার তফাৎ। তার জন্ম এবং পুনরাবির্ভাবের খবর চেতনা এবং ইচ্ছার কাছে নাও থাকতে পারে। যখন অনুভব এই দুটির সরাসরি নির্দেশ-ব্যতিরেকেই মনের মধ্যে স্থান করে নিতে পারে, তখন সমস্ত ক্ষেত্রেই তাদের অংশগ্রহণ আছে ভাবা একটা ভুল ধারণাই হবে। কবিতার জন্ম যখন কবিমনের মধ্যে বারবার হতে থাকে তখন দৃশ্যতই সে তার নিজের প্রকৃতির মতো এক শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্যকে এনে দেয় যার প্রভাব অন্য মনের উপরও পড়ে। প্রেরণার এইসব ফিরে ফিরে আসার মাঝে যে-সময়, তা-ও দীর্ঘস্থায়ী না হলেও পুনরাবৃত্ত হয়। সেই সময়ে কবি একজন সাধারণ মানুষ এবং অন্য সকলের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মতোই বহির্জগতের সমস্ত প্রভাবের কাছে তখন সে উন্মুক্ত। কিন্তু কবিমানস সাধারণের তুলনায় অনেক সামঞ্জস্যপূর্ণ, সংহত এবং সূক্ষ্ম অনুভূতির পরিবাহী। নিজের এবং অপরের কষ্ট এবং সুখ দুইয়ের জন্যই তার মন সংবেদনশীলতায় অনেক বেশি স্পন্দনময়, যা অপরের জানা নেই। এই প্রভেদের সমানুপাতেই সে একটিকে খুঁজবে অন্যটিকে এড়িয়ে চলবে। তাই সে নিন্দা আর অপবাদকে ঘৃণা করতে শেখে আর সামাজিকভাবে বহুলচর্চিত এইসব বিষয় যখন চেনা পৃথিবীতে নানান পরিচ্ছদে আচ্ছাদিত হয়ে তার চারপাশে ঘোরেফেরে সে তখন তাদের অবহেলাভরে দেখেও না। কিন্তু এই অবহেলায় অকল্যাণ কিছু নেই। আর এইজন্যই কবিদের জীবনকে আমরা যেমনভাবে জানি সেখানে নিষ্ঠুরতা, ঘৃণা, প্রতিশোধ, লোভ আর অশুভ আবেগের কোনো অংশগ্রহণ আমরা দেখি না।
এই প্রবন্ধ লেখার সময় এই সমস্ত মন্তব্য এবং মতামত আমার মনে যেমনভাবে পরপর এসেছে আমি বিরুদ্ধ বক্তব্যের পরপর খণ্ডন না করে শুধু বিষয়টিকে তার নিজের গুণেই বিবেচনা করার চেষ্টা করেছি এবং সেইভাবেই তাদের বর্ণনা করেছি। আমি যদি আমার বক্তব্যকে ঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পেরে থাকি তাহলে তা স্বয়ং কবিতার বিরুদ্ধে যাঁরা কথা বলেন তাঁদের উপযুক্ত উত্তর হবে। কিছু পদ্যলেখকের বিরুদ্ধে কিছু বুদ্ধিমান ও পণ্ডিত লোক কেন বিরক্ত হয়ে বিবাদ শুরু করেছেন, তা আমি বুঝতে পারি। আমি নিজেও স্বীকার করি, তাঁদের মতো আমারও আজকের গলাভাঙা ‘কোডরি’১ দের (Codri) ‘থিসিড’ (Thesid) শুনে আশ্চর্য হয়ে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। বেভিয়াস (Bavius) এবং মেভিয়াস২ (Maevius) নিঃসন্দেহে অসহ্য দুজন লোক। কিন্তু সঠিক সমালোচকের কাজ সমস্ত প্রভেদ পরিষ্কার করে দেখিয়ে দেওয়া, পাঠককে হতবুদ্ধি করা নয়।
আমার বক্তব্যের এই প্রথম অংশে কবিতার অন্তর্লীন উপাদানসমূহ এবং তার নীতির কথা বলা হয়েছে। কাকে আমরা কবিতা বলব একটা সীমার মধ্যে তা-ও আমরা দেখবার চেষ্টা করেছি। আমরা দেখেছি যে, কবিতা একটি বিশেষ দৃষ্টিতে দেখলে শৃঙ্খলা আর সৌন্দর্যের অন্য সকল রূপের মতো একই উৎস থেকে জন্ম নেয়। মানুষের জীবনের সকল উপাদানকে সুসংহত করে যে-শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য, বিশ্বজনীনভাবে সেইসব কিছুই আসলে কবিতা।
আমার ইচ্ছা আছে এই রচনার দ্বিতীয় অংশে আমাদের সময়ে কবিতার চর্চায় এইসব নীতি প্রয়োগের একটি আলোচনা থাকবে।* আর থাকবে আধুনিক জীবনধারা এবং মতামতকে আদর্শ অবস্থায় নিয়ে আসার এবং কল্পনা ও সৃষ্টির বশবর্তী করার চেষ্টার সপক্ষে আমার বক্তব্য। কারণ আমাদের এই যুগে ইংল্যান্ডের সাহিত্যে এক নতুন জোয়ার এসেছে যেন নতুন প্রাণের মতো। এমন ঘটনা সর্বদা একটা জাতির জীবনে নতুন আত্মবিশ্বাস ও মুক্ত ইচ্ছাকে বিপুলভাবে প্রেরণা দেয়। আমি মনে করি যে, যদিও আমাদের উজ্জ্বল সময়ের কৃতিত্বকে কিছু ঈর্ষাপরায়ণ মানুষ ছোট করে দেখাচ্ছে, আমাদের এই যুগ বুদ্ধিবৃত্তিজাত অর্জনের জন্য ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং যেসব কবি এবং দার্শনিককে আজ আমরা আমাদের মাঝে পেয়েছি তারা এই জাতির সামাজিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা-আন্দোলনের যুগের পর থেকে যারা জন্মেছেন তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠদের সঙ্গে তুলনীয়। কোনো মহান জাতির ধারণার এবং প্রাতিষ্ঠানিক জগতের পরিবর্তন আনতে যদি কাজ করতে হয় তবে সেখানে সকল কল্যাণের বিশ্বস্ত বার্তাবহ এবং সেই জাগরণের দিনে সবার বড় সঙ্গী এবং অনুসারী হতে পারে কবিতা। এই সময় মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যে গভীর এবং আবেগপূর্ণ অনেক ধারণা আদান-প্রদানের প্রবল এবং প্রচুর শক্তির সংহত হওয়ার সময়। যে-মানুষের মধ্যে এমন ক্ষমতা আসে তারা অনেক ক্ষেত্রে, তাদের নিজের প্রকৃতির অন্যদিকগুলো বিচার করলে, যে-কল্যাণের তারা বার্তাবহ তার জন্য হয়তো মনে মনে প্রস্তুতই নয়। কিন্তু তারা অস্বীকার করতে এবং পরিত্যাগ করতে চাইলেও তাদের আত্মার গভীরে প্রবেশ করা সেই শক্তির সেবা তাদের করে যেতেই হয়। তাদের লিখিত শব্দের মধ্যে যে-বিদ্যুৎশিখা অহরহ চমক দিতে থাকে তাকে অগ্রাহ্য করে আজকের বিখ্যাত লেখকদের লেখা তো পড়াই যায় না। এক অন্তর্ভেদী অনুসন্ধিৎসা এবং আগ্রহ নিয়ে তারা মানবচরিত্রের বিস্তৃতি ও গভীরতাকে মেপে দেখার চেষ্টা করেন এবং বোধহয় নিজেরাই নিজেদের অর্জনে এবং আবিষ্কারে সব থেকে বেশি আশ্চর্য হন। কারণ তাদের যা চালনা করে তা তাদের নিজের চেতনার থেকেও বেশি বোধহয় এই যুগের চেতনা। ধারণার অতীত যে-প্রেরণা, কবিরা তার গোপনলিপির পাঠোদ্ধার করেন, তারা বর্তমানের উপরে আসা ভবিষ্যতের বিরাট প্রতিচ্ছবির আয়না। তারা সেইসব শব্দ যাদের গভীর প্রকাশ তাদের নিজেদেরই কাছেই অজ্ঞাত। তারা সেই রণতূর্য, যাদের জানা নেই তারা কীসের প্রেরণা। তারা সেই প্রভাব, যারা নিজেরা সবকিছুতে গতি আনে কিন্তু নিজেরা স্থির থাকে। কবিরা এই পৃথিবীর নৈসর্গিক সংসদে অস্বীকৃত আইনপ্রণেতা।
সূত্র :
১. ‘কোডরি’ একজন অক্ষম লেখক যাঁকে জুভেনাল (ঔাঁবহধষ) তাঁর প্রথম ব্যঙ্গরচনায় উপস্থিত করেছেন।
২. বেভিয়াস আর মেভিয়াস ভার্জিলের উপস্থাপিত এই রকমই দুই অকবি। * এই প্রবন্ধ ১৮২১ সালে রচিত, শেলি ১৮২২-এ মাত্র তিরিশ বছর বয়সে মারা যান। দ্বিতীয় অংশ তাই কখনোই লেখা হয়নি।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.