সম্প্রতি কাজী সালাউদ্দীন আহমেদের একক চিত্রপ্রদর্শনী অলিয়ঁস ফ্রঁসেজে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সালাউদ্দীন আহমেদ কাজ করেন শহরের ভূচিত্র নিয়ে। ফলে তাঁর ছবিতে উঠে আসে দালানকোঠার অবভাস ও স্থাপত্যশিল্পের ইমেজ। দালানকোঠার কম্পোজিশনে চলে আসে ব্যক্তিমানুষের অস্থিরতা এবং আধুনিক জীবনের নানাপ্রকার অসামঞ্জস্য। তবে আধুনিকতার এই সমস্যাগুলোকে তিনি গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চান তাঁর নয়নাভিরাম রং এবং কোমল মনোভাবের মাধ্যমে। ফলে তাঁর ছবি একটি সামাজিক ইতিবাচকতার কথা বলে, যে-সমাজ শহরের এবং যে-দালানকোঠা পারসোনিফায়েড। এখন যে-বিষয়টি সালাউদ্দীনকে স্বাতন্ত্র্য দেয়, তা হচ্ছে তাঁর বিষয়-নির্বাচন। ল্যান্ডস্কেপ-চিত্রীর স্বল্পতা বা অস্তিত্বহীনতা আমাদের চিত্রকলার একটি অভাব, সালাউদ্দীন সেটি পূরণে সাহায্য করছেন, যে-কারণে শহরের ল্যান্ডস্কেপ তাঁকে উদ্দীপনা দান করেছে। শহর হচ্ছে পুঁজিবাদী সভ্যতার প্রাথমিক শর্ত। পুঁজিবাদ সমগ্র পৃথিবীকেই শহর হিসেবে দেখতে চায়। এই দেখতে চাওয়ার পেছনে কাজ করে পুঁজির মালিকদের অর্থনৈতিক উৎসাহ। শহর মানেই বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির (মূলত প্রযুক্তির) জট পাকানো সমাহার। আধুনিক সভ্যতায় গ্রাম হচ্ছে শহরকে টিকিয়ে রাখার নিমিত্ত মাত্র। তাই দেখা যায়, গ্রামীণ অর্থনীতির সকল রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয় শহরের সুপার স্ট্রাকচার থেকে। যে-কারণে পৃথিবীতে খুব সহজেই দুপ্রকার সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছে। গ্রাম ও শহর সম্প্রদায়, যাদের সংস্কৃতি ও স্বপ্ন সম্পূর্ণ আলাদা। এমনকি শহরের মুসলিম, খ্রিষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ আর গ্রামের মুসলিম, খ্রিষ্টান হিন্দু, বৌদ্ধের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য। এই পার্থক্য দুটি ভিন্ন সভ্যতার। যখন কোনো চিত্রশিল্পী এ-দুই সভ্যতার কোনো একটিকে বেছে নেন, সেই বেছে নেওয়ার মধ্যেই নিহিত থাকে শিল্পীর জ্ঞান, কাঠামো ও অভিজ্ঞতার রসায়ন। সালাউদ্দীন ঢাকা শহরবাসী। ফলে তিনি যখন শহরচিত্র রচনা করেন সেখানে অবশ্যম্ভাবীভাবে সেটি তাঁর ব্যক্তিশহর অপেক্ষা সমষ্টিক শহর হয়ে ওঠে। চিত্রকলা-সাহিত্যের আগ্রহব্যাঞ্জক দিকটি হচ্ছে চিত্রকর বা লেখক ঠিক কোন মুহূর্তে তাঁর অধিকারের বিশেষ অংশ হারাতে শুরু করেন বলা কঠিন। অধিকারবিচ্যুতির বিষয়টি হচ্ছে ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে প্রবেশের অদ্ভুত মুহূর্তের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের ব্যক্তি-অনুভূতির সবচেয়ে সফল রূপকার শিল্পী সফিউদ্দিনকে বলা যায়, যাঁর শিল্প-সমষ্টি গণ-আবেগ-অনুভূতি নিয়ে কাজ করেনি। তবে ব্যক্তি ও সমষ্টির গুণ-বিচারে না গিয়ে বিষয়টির বৈশিষ্ট্যই অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ব্যক্তি ও সমষ্টি পরস্পরের মুখাপেক্ষী বা পরিপূরক। ইউরোপিয় অস্তিত্ববাদ যে-ইন্ডিভিজুয়ালিজমের বিভ্রম তৈরি করে সমষ্টি থেকে ব্যক্তিকে কেটে ফেলতে চায়, তার বিরুদ্ধেই এখনকার শিল্পী-লেখকদের অবস্থান হওয়া উচিত। এক অর্থে ব্যক্তি ও সমষ্টির পার্থক্য নিছকই সভ্যতা বা পুঁজিবাদের স্বার্থে রচিত। কৃষিভিত্তিক সমাজে ব্যক্তি ও সমষ্টি একই বিষয়। এর কারণ তাদের উৎপাদন-ভূমিতেই বসবাস করতে হয়, অর্থাৎ যে-ভূমিতে চাষ হয় সেখানেই তাদের বাসস্থান। আমরা, শহরবাসীরা, কখনো অফিসে বা ফ্যাক্টরিতে বা চাষজমিতে বাস করি না। শিল্পী সালাউদ্দীন শহরবাসীদের এই বসবাসের ইতিহাসকে এবং প্রক্রিয়াকে চিহ্নিত করতে চান। ফলে তাঁর শহরচিত্রগুলো হয়ে ওঠে শহরবাসীদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পরিচয় এবং যে-সমষ্টি সেখানে চিহ্নিত হয় তা মূলত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সামগ্রিক সমাহার।শিল্পী সালাউদ্দীনের এবারের প্রদর্শনী তাঁর আগের কাজের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। ধীরে ধীরে তাঁর কাজ না-স্বকীয়তার দিকে যাচ্ছিল, অর্থাৎ পারস্পেকটিভ ও রঙের উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। পারস্পেকটিভের এই নানা পরিবর্তনের ও বিবর্তনের ফলাফলেই তিনি ঊর্ধ্বাকাশ থেকে শহর অবলোকনের পরিণতিতে পৌঁছেছেন। বার্ডস আইভিউ থেকে শহরের চিত্রকে তিনি অনেকটা ম্যাপের মতো করে প্রকাশ করেছেন এবং এক্ষেত্রে বেছে নিয়েছেন কোলাজ পদ্ধতিকে। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে খবরের কাগজসহ বিভিন্ন পণ্যদ্রব্যের প্যাকেট বা মোড়ক, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি কেটে বসিয়ে মৃদু সাজেশনপূর্বক ড্রইং করে ঘনবসতিসম্পন্ন কম্পোজিশনগুলো তৈরি করেছেন। পেপার-কোলাজের মজার বিষয়টি হচ্ছে, কোলাজে ব্যবহৃত উপাদানগুলোর প্রতিস্থাপন ও কাটার আকৃতি লক্ষ করলে শিল্পীর মনঃপ্রক্রিয়া আন্দাজ করা যায়। তিনি কতটা আবেগমুখর বা নিয়ন্ত্রিত, সেটি তাঁর এই কর্মকাণ্ডের প্রকৃতিই বলে দেয়। সালাউদ্দীনের কাজে এক্ষেত্রে দেখা যায় অনেক ঘনবসতিপূর্ণ ফর্মের মধ্যেও একটি সাজানো গোছানো ব্যাপার আছে, যা তাঁর আগের ছবিতেও ছিল। অর্থাৎ বিশৃঙ্খলা তৈরি করলেও তাকে শাসন করে এক প্রকার সুশৃঙ্খলা। বাংলাদেশের চিত্রমানসে প্রকৃত বিশৃঙ্খল মনঃবৃত্তির শিল্পী অনুপস্থিত। বিশৃঙ্খলের একটি অপরিমেয় বৈপ্লবিক শক্তি আছে। কেউ সেটি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। ছোট ছোট পেপার কাটিং, মোড়ক এসব দিয়ে তিনি শহরের উপরিতল তৈরি করে কৃষ্ণশূন্যতায় রাস্তাঘাটের আকৃতি তৈরি করেছেন। যে-শহর তিনি তৈরি করছেন সেটি অবশ্যই জনবসতিপূর্ণ, এ-অনুভূতি যে-কারও হবে। যে-সংবাদপত্র এবং মোড়ক ব্যবহার করেছেন, সেগুলোও ঢাকাবাসীর কাছে পরিচিত, যেমন – প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, নিউ এজ ইত্যাদি। এছাড়া বেনসন, গোল্ডলিফ, ক্লোজআপ – এ-সবের মোড়ক সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে তাঁর কাজে। এসব সংবাদপত্র ও করপোরেট-সংস্কৃতি ঢাকাবাসীর জীবনযাত্রার অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে তাঁর ছবির বক্তব্য সে-সূত্রে আরো বেশি শক্তি-কাঠামোকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে এবং মিডিয়া ও করপোরেট-সংস্কৃতির শহুরে আখ্যানও আমরা পেয়ে যাই। যেহেতু আধুনিক শহরের অবশ্যম্ভাবী মডেল হচ্ছে মিডিয়া ও করপোরেট-কালচার, সেক্ষেত্রে সালাউদ্দীনের সচেতনতা প্রশংসাযোগ্য। তবে কোলাজের ক্ষেত্রে তিনি আরো বৈচিত্র্য আনতে পারতেন। কখনো মনে হয়েছে, একইরকম বিন্যাসে তিনি আসক্ত হয়ে পড়েছেন, বিন্যাসে বৈচিত্র্য আনলে ছবিগুলোর আবেদন ও বৈচিত্র্য আরো বৃদ্ধি পাবে। কোলাজ ছবিগুলো একটু দূরত্ব থেকে একপ্রকার ডিজাইনের মতো মনে হবে। মনে হবে, ভাঙাচোরা অনেক কর্মের সুরেলা সমাহার। মনে হতে পারে গুস্তাভ ক্লেম্টের আঁকা কোনো ছবির একাংশ বা আফ্রিকান বর্ণবিন্যাসের ডিজাইনিক প্রতিরূপ। তবে শিল্পী সালাউদ্দীনের এই কোলাজকর্ম তাঁর শিল্পবিকাশেরই স্বতন্ত্র রূপ এবং এক অর্থে বহুমাত্রার সম্ভাবনা ধারণ করেছে।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.