চূড়ান্ত মুহূর্তে ঠিক জিনিসটির ওপর ক্যামেরা ধরতে পারাটাই আসল কাজ, আর ওই বিশেষ ক্ষণ থেকেই ভূমিষ্ঠ হতে পারে কালজয়ী ছবি – এই বিশ্বাস লালন করতেন তিনি। শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রীদের একজন অঁরি কার্তিয়ে ব্রেসঁ। সংস্কৃতি ও ঐশ্বর্যের বনেদি পরিবেশে জন্মেছিলেন ১৯০৮ সালে ফ্রান্সে সন্তেল-পরিবারে। দাদা, বাবা, চাচা সবাই কম-বেশি চিত্রচর্চা করতেন। তবে বাবার ছোটভাই লুই কার্তিয়ে ছিলেন বিখ্যাত, ‘প্রি দ্য রোম’ (১৯১০) জয়ী শিল্পী।
১৯১৩ সালে বড়দিনের রাতে শিশু ব্রেসঁ জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহারটি পেয়েছিলেন। চিত্রশিল্পী চাচা ভাইপোকে অনুমতি দিলেন তাঁর স্টুডিওতে প্রবেশের। পাঁচ বছরের শিশুর সামনে উন্মোচিত হলো রঙিন কিংখাবে মোড়া সৃজনের ভুবন। চোখে গুপ্তধন-আবিষ্কারের বিস্ময়। ঘটনার আশি বছর পরও রং, তুলির গন্ধে তাঁর দ্বিতীয় জন্মলাভের স্মৃতিতে আলোড়িত হয়েছেন কীর্তিমান চিত্রী ব্রেসঁ। চাচার স্টুডিও দেখার প্রথম পরিচিতিটি নিয়তির মতো হয়েছিল তাঁর জীবনে; মলের গোপন সুড়ঙ্গে জমা শিল্পসৃজনের রাগ-রাগিণী। ফলে শৈল্পিক জীবন শুরু করেছিলেন চিত্রশিল্পী হিসেবেই। সাদা-কালো আলোকচিত্রের ভুবনে মোহাবিষ্ট হয়েছেন পরে।
শৈশবে মুকুলিত শিল্পে অনুরাগ, মুগ্ধতা ছিল জীবনভর। কৈশোরের অনপনেয় স্মৃতিচারণ, “চিত্রকলা ছিল আমার আবেশ, বাবার ভাই যিনি বড়দিনের রাতে স্টুডিও দেখিয়েছিলেন আমার সেই ‘মিথিকাল ফাদার’… আমি চিত্রকলার ছায়ায় বাস করেছি; আমি নিশ্বাসে টেনেছি ক্যানভাসের গন্ধ।”
পরে ১২ বছরের নওল কিশোরের চিত্রচর্চায় অভিষেক হয়েছিল চাচার দেখা তেলরং দিয়েই। তিনি মারা যান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। মনের শিষ্য এবং প্রুস্তের বন্ধু জ্যাক এমিল ব্লশ ১৬ বছর বয়সের ব্রেসঁকে আমন্ত্রণ জানান তাঁর স্টুডিওতে গিয়ে ছবি আঁকার। লিসেতে পড়ার সময়েই ক্লাসের বইয়ের চাইতে আনন্দ পেতেন দস্তয়ভস্কি, শোপেনহার, প্রুস্ত, মালার্মে, জয়েস, মার্কস পড়ায়। আর বয়ঃসন্ধিতে লক্ষ্যস্থির তখন চিত্রকর হবার। ফলে একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় ব্রেসঁর ধ্যানের দেবতা র্যাঁবো। মূলত দাদা, সুররিয়ালিজম, জয়েস প্রায় অঁভ-গার্দদের সবাই – অ্যাপোলিন্যার থেকে জঁলুক গদার – শুরুটা র্যাঁবোকে দিয়েই। দান্তের ডিভাইন কমেডিতে রদ্যাঁ-সৃষ্টির ব্যাকুলতম প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিলেন আর ব্রেসঁ প্রেরণা খুঁটে নিয়েছিলেন র্যাঁবো থেকে। সেই ষোলো বছরেই পরিচয় হয়েছিল ম্যাক্স জ্যাকব এবং রেনে ক্রেভাল, আর উনিশে অঁদ্রে ব্রেতঁ, ম্যাক্স অ্যারনস্ত, এলি ফোরের সঙ্গে। লিসের গণ্ডিবাঁধা জীবন ছেড়ে উনিশ বছর বয়সে তিনি ছবি আঁকা শিখতে যান শিল্পী অঁদ্রে লোৎয়ের কাছে। লোৎ ছিলেন কিউবিস্ট ঘরানার। ছাত্রকে শিল্পগুরুদের চিত্রকর্ম দেখানো এবং অধ্যয়নের জন্য ল্যুভ্রসহ অন্যান্য গ্যালারিতে নিয়ে যেতেন সমসাময়িক শিল্পকলা সম্পর্কে ধারণা দিতে।
আধুনিক শিল্পকলা সম্পর্কে ব্রেসঁর আকর্ষণের পেছনে ছিল রেঁনেসার চিত্রকর্মসমূহ – পাওলো উচ্চেলো, পিয়েরো দেল্লা, ফ্র্যান্সেসকা, মাসাচ্চিও এবং জানভান এইকের প্রতি সশ্রদ্ধ মুগ্ধতা। শিক্ষক লোৎ সম্পর্কে বহু পরে বলেছেন, ‘তিনি আমাকে পড়তে এবং লিখতে শিখিয়েছিলেন। তার ভূ-চিত্র এবং পিগারের উপর বইগুলো ছিল গবেষণাধর্মী… তাঁর মৃত্যুর কদিন আগে আমার দেখা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে ১৯৬২তে। আমার আলোকচিত্র সম্পর্কে বলেছিলেন – চিত্রশিল্পী হিসেবে তোমার চর্চা থেকেই সবকিছু এসেছে।
অঁদ্রে লোৎয়ের কাছে কাজ শিখবার এক পর্যায়ে মনে হতে থাকে তাঁর ছবি প্রায় শিক্ষকের কাজের অনুকরণ হয়ে পড়ছে। কিন্তু লোৎয়ের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা চিত্রকলায় না হলেও পরবর্তীকালে ফটোগ্রাফির কম্পোজিশন ও ফর্মের সমস্যা-সমাধানে সাহায্য করেছে। ইতোমধ্যেই ইউরোপের সর্বত্র ফটোগ্রাফিক রিয়েলিজম বা আলোকচিত্রের বাস্তবতার স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উদ্দেশ্য, কীভাবে আলোকচিত্রের উন্নতি করা যায় – এ-সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা, মতবাদ। তুমুল আলোচনা, হল্লা চলছে – Crush tradition! Photograph things as they are! বলাই বাহুল্য এই বিদ্রোহের কেন্দ্রে ছিল সুররিয়ালিস্ট আন্দোলনের ঝাপটা, সময়টা ১৯২৪।
১৯২৫, তখনো ব্রেসঁ কাজ করছেন লোৎয়ের স্টুডিওতে। এর মাঝেই যাওয়া-আসা বিখ্যাত কাফে লা প্লাস ব্লশের আড্ডায়; সঙ্গী প্রিয়বন্ধু তরুণ কবি রনে ক্রেভাল, পরে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। পরাবাস্তবতাবাদীদের সান্নিধ্যে, প্রতর্কে তরুণ ব্রেসঁর চেতনার চাঁদ নড়ে উঠেছে। তর্কে যেতেন না, শুনতেন এবং তাঁদের ধারণা আঁজলা ভরে মননে ছড়িয়ে দিয়েছেন, যা তাঁর প্রথম জীবনের শিল্পসৃষ্টিতে উর্বরতা দিয়েছে। ‘পরাবাস্তব চিত্রকর্ম নয়, তাঁর ভাবনায় তরঙ্গ তুলেছিল অঁদ্রে ব্রেতঁর ধারণা – স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি ও স্বজ্ঞার ভূমিকা এবং সর্বোপরি দ্রোহের মনোভাব… শিল্পে এবং জীবনেও।’
এই বিশেষ সময়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উত্তাল পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন ব্রেসঁ। স্বর্গ খোঁজার অনুভবে রং ও রেখায় দিওয়ানা হয়েছিলেন। কিন্তু চিত্রকলার মানচিত্রে প্রার্থিত স্বপ্ন-কল্পনা-প্রকাশের সাঁকোটি ধরতে পারছিলেন না। পরীক্ষা-নিরীক্ষাশেষে অতৃপ্তির বৃত্ত তাঁকে ঘিরে ফেলেছে। হতাশায়, বিমর্ষতার খোলসে ডুবে প্রাথমিক পর্বের অনেক কাজই তিনি নষ্ট করে ফেলেন। কিছু কাজ রক্ষা পেলেও তা শিল্পী ব্রেসঁর শৈল্পিক ভাষাকে আলাদা করে চিহ্নিত করে না।
১৯৩০ সালে জীবনে বড় বাঁক এলো ভিন্নধারায়। লোৎয়ের স্টুডিওর প্রচল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছিল তাঁর ব্যাকুলসত্তা। ‘আমি আমার মতো হতে চাই’- বোধে আকুল হয় সৃজনস্পৃহা। পাড়ি জমান আফ্রিকায়, জীবনের গভীর মন্থনে ঢুকে ক্রমশ তৈরি করেছেন নিজস্ব-ভাবনার অখণ্ড পরিমণ্ডল। তাই পরে লিখেছিলেন, ‘ছবি আঁকা এবং পৃথিবীটাকে বদলে দেওয়া আমার জীবনের সবকিছুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
আফ্রিকাতে জীবনধারণ করেছেন জীবজন্তু শিকার করে এবং তা স্থানীয় গ্রামবাসীর কাছে বিক্রি করে। ব্রেসঁর সময় কেটেছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ভার আদান-প্রদানের তরজমায় এবং নিরূপণের ভাবনায়। স্বচক্ষে দেখা ফরাসি ঔপনিবেশিক দেশের বঞ্চনার, শোষণের ইতিহাস তাঁর স্নায়ুকে দলিত করে শৈল্পিক চেতনার মর্মমূলে গিয়ে বিঁধেছে। মানুষের তৈরি পৃথিবীর এই বিপর্যয় ও বিকলতার চিত্র তুলির চাইতে আরো দ্রুত আঁচড়ে মূর্ত করার বাসনায় তাঁর আয়ুধ হয় ক্যামেরা। সাময়িকভাবে নিরীক্ষামূলক কিছু ছবি তুলেছিলেন, কিন্তু সে-সময়ের মাত্র সাতটি আলোকচিত্র রক্ষা পেয়েছে। ছবি আঁকা ও ছবি তোলা – সৃষ্টি ও আবিষ্কারে নিরন্তর অন্বেষু তরুণকে ফ্রান্সে ফিরে আসতে হয় ‘ব্ল্যাক ওয়াটার’ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে।
ফিরে এসে এবার যোগাযোগটা আরো নিবিড় হলো সুররিয়ালিস্টদের সঙ্গে। তাঁদের তত্ত্ব কপচানো, ধুন্ধুমার আড্ডার মাঝেই ব্রেসঁর তৃষ্ণার্ত মন ছটফট করে বিষয়ের খোঁজে, সৃষ্টির ক্ষুধায়। অবশেষে খুঁজে পেলেন সৃষ্টির দুর্লভ খিদের জ্বালায় আত্মহত্যা করে, তার মধ্যেই দেহ-ব্যবসা বেড়ে চলে।
রিপোর্টে বলেছে, সারা ভারত জুড়ে যত নারী-পাচার চক্র আছে, তাদের একটা বড় অংশই নাকি কলকাতায়। ঠিক যেন বিশ্বাস হতে চায় না। এখানে সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে কত হৈ-চৈ, কত গান-বাজনার আসর, ফিল্ম-আন্দোলন, আবার ক্রিকেট-ফুটবল নিয়ে এত মাতামাতি, আবার নারী-ব্যবসার একটা চোরা স্রোতও বাড়ছে?
রিপোর্টে তো মিথ্যে কথা লিখবে না।
এখানে বলা হয়েছে, মেয়েদের ধরে আনে কিংবা ভুলিয়ে ভালিয়ে আনে বিভিন্ন জেলা থেকে।
কিছু মেয়ে আসে নেপাল থেকে, আর দার্জিলিং-জলপাইগুড়ি জেলার। দিনাজপুর, ইসলামপুর, রায়গঞ্জ, ইংলিশ বাজার – এইসব জায়গাতেও পাচারকারীরা খুব সক্রিয়।
আর বাংলাদেশ থেকে এরা আনে সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, রাজশাহী আর হিলির মেয়েদেরই বেশি। অন্য জেলারও আছে। এরা সব আসে সীমান্ত পার হয়ে, স্থলপথে। আর যারা আকাশপথে আসে তাদের হিসাব নেই।
রিপোর্টে একটা ব্যাপার দেখে বেশ খটকা লাগলো।
সাধারণত এইসব মেয়েদের দু’ ভাগে ভাগ করা হয়। ট্রানজিট আর ডেস্টিনেশান। অর্থাৎ এক ঝাঁক মেয়েকে পশ্চিম বাংলায় প্রথমে এনে তারপর পাঠিয়ে দেওয়া হয় ভারতের অন্যান্য রাজ্যের পতিতালয়ে। কিংবা বিদেশে। তারা ট্রানজিট। আর যাদের কলকাতায় কিংবা পশ্চিম বাংলারই বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া হবে, তারা ডেস্টিনেশান।
বেশ! কিন্তু ট্রানজিটের মেয়েদের ঠিক কলকাতায় না রেখে প্রথমে জমা করে রাখা হয় মেমারিতে। বাইরে থেকে ট্রাকে করে মালপত্র এনে কোনো গুদামে জমা করে রাখার মতন।
কিন্তু মেমারিতে কেন? সেখানকার বিশেষত্ব কী?
বর্ধমান শহরের কাছেই মেমারি একটি অপেক্ষাকৃত ছোট শহর। একবার বইমেলার উদ্বোধন-উপলক্ষে গিয়েছিলাম সেখানে। মোটামুটি সুন্দর, ছিমছাম জায়গা। লোকজনের খুব উৎসাহ। নারী-পাচারকারীরা সেই জায়গাটাই বেছে নিল কোন কারণে?
রশিদ এখন বর্ধমান রেঞ্জের ডি আই জি। চারখানা জেলার দায়িত্ব ওর। হেড কোয়ার্টার চুঁচড়োয়। এর মধ্যে আমরা দলবেঁধে ঘুরে এসেছি ওর চুঁচড়োর কোয়ার্টার থেকে। সে কী বাড়ি! প্রায় তিনশো বছরের, মোটা মোটা দেওয়াল আর থাম। একটা জাল দিয়ে ঢাকা বারান্দায় দুটো ব্যাডমিন্টন কোর্ট হতে পারে। সে-বাড়িতে মোট বারো-চোদ্দখানা ঘর, অথচ রশিদের পরিবারের সদস্য মাত্র চার-পাঁচজন। জোব চার্নক নাকি একসময় থাকতেন ওই বাড়িতে। পাশেই গঙ্গা। সে-বাড়ির মাটির তলা দিয়ে একটা সুড়ঙ্গ আছে, যা দিয়ে চলে যাওয়া যায় গঙ্গার ঘাটে। সেকালে এরকম পালাবার রাস্তা থাকতো।
রশিদকে বললে নিশ্চয়ই একদিন যাওয়া যেতে পারে মেমারি শহরে।
সাধারণত আমরা দেশের রাজনীতি কিংবা আন্তর্জাতিক সংবাদ নিয়ে যত মাথা ঘামাই সে-তুলনায় অপরাধ-জগৎটাকে গুরুত্ব দিই না। দেহ-ব্যবসা কিংবা নারী-পাচারের মতন বিষয় আমরা কোনো সভ্য আলোচনায় সামনে আসতে দিই না। ওসব গোপন জগতের ব্যাপার, গোপন থাকাই ভালো। নারী পাচার-টাচার চলছে নিয়মিত, তা তো আমরা জানিই, কিন্তু ও-বিষয়ে তো আমাদের কিছু করার নেই।
যদি না আমাদের নিজেদের কোনো বোন বা মেয়ে বা অতি পরিচিত কেউ এতে হঠাৎ জড়িয়ে পড়ে। তখনই চোখের সামনে খুলে যায় নরকের দরজা।
আনোয়ারার ব্যাপারটা কয়েক মাস চাপা পড়ে গিয়েছিল। আবার নতুন করে আমাদের অস্থির করে তুলেছে।
ঢাকায় ওর বড়বোনকে টাকা পাঠাবার খবরটা গুজব বলেই প্রতিপন্ন হয়েছে। শুধু ওবায়দুল্লার কথার ওপর নির্ভর না করে আমি বেলালকে দিয়েও যাচাই করে নিয়েছি। স্মাগলাররাই এরকম গুজব রটাচ্ছে।
আনোয়ারার গয়নাগুলোর জন্যই স্বাতী বেশি ব্যতিব্যস্ত।
সে-গয়নার কথা কেউ জানে না। শামীমকে কিছু জানাতে নিষেধ করে গেছে আনোয়ারা। ওদের কোনো ছেলেমেয়েও নেই। আনোয়ারা যদি আর কোনোদিন আর না ফিরে আসে? কারুর কাছে ঋণ থাকলে যেমন সবসময় মনটা খচখচ করে, এও সেই অবস্থা।
এক-এক সময় মনে হয়, বাংলাদেশের অন্তত দু-একজনকে জানিয়ে রাখি। তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিই। কিন্তু আনোয়ারা যে আর কারুকেই জানাতে বারণ করেছে।
বীথি আর গাজী শাহাবুদ্দিন কলকাতায় আসে মাঝে মাঝে। ওরা বোধহয় মেয়েটির কথা ভুলে গেছে, ও-প্রসঙ্গ ওঠেই না। আরও কত নতুন নতুন প্রসঙ্গ এসেছে। এখন সব আলোচনাতেই ঘুরে-ফিরে আসে তসলিমা নাসরিনের কথা। তার লেখা ও তার জীবন।
তসলিমাকে প্রথম যখন দেখি, তখন মনে হয়েছিল খুবই লাজুক ধরনের মেয়েটি, আস্তে আস্তে নরমভাবে কথা বলে। কিন্তু তার কলম খুব ধারালো, গদ্য ঋজু। মেয়েদের ওপর নানান অনাচার ও বঞ্চনার বিষয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখে। সেটাই স্বাভাবিক। সে বেশ কয়েকবছর আগেকার কথা। এখন অবশ্য সে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়ে খুব বিতর্কিত হয়ে পড়েছে।
মিউজিয়ামের পাশের রাস্তায় একটা হোটেলে গাজিরা প্রত্যেকবার এসে ওঠে। হোটেলটা আগে ছোট ছিল, এখন ধনী বাংলাদেশিদের দাক্ষিণ্যে সেটা ফুলে ফেঁপে উঠেছে, সাজিয়েছেও অন্যভাবে।
ওদের কটেজের সামনের লনে গাজী আর আমি বিয়ার নিয়ে বসেছিলাম একদিন। বীথি স্বাতীকে নিয়ে বেরিয়েছে শপিং করতে। গাজীর সঙ্গে আড্ডাটা বেশ মজার, যদি আর কেউ না থাকে, তা বলে বিশেষ কথাবার্তাই হয় না। গাজী এমনিতেই খুব কম কথা হলে আর অনবরত সিগারেট খায়। সিগারেট আমিও বেশি খাই, সে-জন্য প্রায়ই কাশি হয়, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হাঁপিয়ে যাই, গাজি আমার তুলনায় আরও বেশি চেইন স্মোকার।
একটা সিগারেট শেষ হতে না হতেই আর-একটা ধরাচ্ছে দেখে আমি বলে ফেললাম, তুমি এত বেশি সিগারেট খাও কেন, গাজী? দিনে তোমার ক’প্যাকেট লাগে?
গাজী হেসে বললো, বাঃ, আপনিও তো কম যান না! আপনার সিগারেটগুলো আরো বেশি কড়া!
তা ঠিক! কেন যে খাই! সবাই জানে, এতে কত ক্ষতি হয়। ছেড়ে দেওয়াই উচিত।
ছাড়েন না! আপনি ছাড়লেই আমিও ছাড়বো!
তুমি পারবে?
দেখেন না পারি কিনা। প্রতিজ্ঞা করে ছাড়তে হবে।
দু’জনের হাতেই জ্বলন্ত সিগারেট।
আমি বললাম, এসো, দু’জনে একসঙ্গে প্রতিজ্ঞা করি, আজ থেকে আর কিছুতেই সিগারেট খাবো না!
গাজী বললো, এই আমার সিগারেটটা ফেলে দিলাম। আর এক টানও দেবো না!
প্রায় ভর্তি দামি সিগারেটের প্যাকেটটাও সে ফেলে দিল টেবিলের নিচে। আমার প্যাকেটটাও গেল সেখানে।
সেই মুহূর্তে যেন শরীরটা ঝরঝরে হয়ে গেল।
একটু পরে অন্য একটা টেবিল থেকে একটি যুবক উঠে এসে বললো, সুনীলদা, যদি কিছু মনে না করেন, আপনার কাছ থেকে একটা সিগারেট ধার নিতে পারি?
আমি আমার প্যাকেটটা তুলে বললাম, এই নাও। পুরো প্যাকেটটাই নিয়ে যাও!
গাজীও তার প্যাকেটটা তুলে বললো, এটাও আপনি নিতে পারেন।
ছেলেটি হকচকিয়ে গেল।
একটু আগেই যে আমরা দু’জনে একটা দারুণ বীরত্বের কাজ করে ফেলেছি, তা ও বুঝবে কী করে!
আমি তখনই ঠিক করে ফেললাম, শক্তি আর রশিদকেও ছাড়াতে হবে। যে-সব ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে প্রায়ই দেখা হয়, তারা পাশে বসে সিগারেট টানলে সংযম রক্ষা করা শক্ত।
এটা মাস ছয়েক আগেকার কথা।
শক্তি আর রশিদ আমার অনুরোধে পাত্তাই দেয়নি। হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। আমিও টেনে টুনে প্রায় মাস দেড়েক প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পেরেছিলাম। দম-টমের বেশ উন্নতি হচ্ছিল, কাশিও কমে গিয়েছিল, কিন্তু লেখার টেবিলে বসলেই ছটফট করতাম। বহুদিনের অভ্যেস, গাঁজায় দম দেবার মতন হাতে সিগারেট না থাকলে মাথা থেকে কলমের ডগায় কোনো ভাষা আসে না।
প্রথম প্রথম মাত্র দুটি সিগারেট কিনে আনিয়ে লেখার সময় আবার খাওয়া শুরু হলো। লুকিয়ে-চুরিয়ে বাড়িতে খাই, বাইরে বেরিয়ে খাই না। তারপর আস্তে আস্তে লজ্জা-টজ্জা চলে গেল, হয়ে গেলাম পুনর্মূষিক! পকেটে প্যাকেট।
শক্তি ঠাট্টা করে বললো, সিগারেট ছাড়া তো খুব সোজা। রোজ রাত্তিরে ছেড়ে দেবে।
আমি ভেবেছিলাম, গাজীও নিশ্চয়ই প্রতিজ্ঞা রাখতে পারবে না। ড্রিংক-ফ্রিংকের চেয়েও সিগারেটেই ওর বেশি নেশা।
আশ্চর্য ব্যাপার, এবারে দেখা হতেই গাজী বললো, আপনি খাচ্ছেন, সুনীলদা, আমি কিন্তু আর ছুঁইনি।
বীথিও সাক্ষী দিল, সত্যি কথা। সেই যে আপনার কথায় ছেড়েছে, তারপর থেকে আর একটাও ধরেনি।
লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হবার মতন অবস্থা। গাজীর কাছে আমি হেরে গেলাম! গাজীর রোগা পাতলা চেহারা, আমার তুলনায় ওর ব্যক্তিত্বও যে খুব বেশি তা বলা যায় না, তবু ও এত মনের জোর পেল কোথা থেকে?
গাজী বললো, আমার পাশে বসে অন্যরা খেলেও এখন আমার কোনো অসুবিধা হয় না। আর জানেন, যখন খেতাম, দিনে দুই-তিন প্যাকেট, তখন কোনোদিন হিসাব করিনি, এখন হিসাব করে দেখি, উরে বাবা, কত টাকা বেঁচে যায়! অনেক লোকের একমাসের বেতন হয়ে যায়।
মুখরক্ষা করার জন্যে আমি বললাম, কোনো ব্যাপারে মানুষ হেরে গিয়েও আনন্দ পায়। যেমন তোমার কাছে হেরেছি বটে, কিন্তু তোমাকে যে ছাড়াতে পেরেছি, তাতেই আমার গর্ব হচ্ছে।
এবারে গাজীরা এসেছে ওদের মেয়ের বিয়ের নেমন্তন্ন করতে। কত ছোট দেখেছি মেয়েটিকে, এখন সে বিবাহযোগ্যা! তখন ঢাকায় যেতেই হবে।
রশিদের কথা মনে মনে ভাবছি, সন্ধেবেলা রশিদ নিজেই ফোন করলো, ও চুঁচড়ো থেকে কলকাতায় এসেছে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মিটিং করতে, আজ রাত্তিরটা থেকে চলে যাবে কাল ভোরে। সুতরাং আজকের রাত বৃথা যায় কেন?
রশিদের গোলপার্কের ফ্ল্যাটটা খালি পড়ে আছে। এখন বিশিষ্ট সিনেমা পরিচালক গৌতম ঘোষ তার প্রতিবেশী। সুতরাং আড্ডাটা সেখানেই জমবে।
শক্তি আগে থেকেই সেখানে হাজির। রশিদ কলকাতায় এলে শক্তি ঠিক কীভাবে যেন খবর পায়, হয়তো বাতাসে গন্ধ পায়।
রশিদের নিজস্ব সিনেমা তোলার শখ অনেকটা ঘুচে গেছে। ও বুঝেছে, এখনই চাকরি ছেড়ে অনিশ্চিত ফিল্ম লাইনে ঢুকে পড়া খুবই ঝুঁকির ব্যাপার হবে। তবে, আমার গল্পের চিত্রনাট্যটা ও অন্য কারুকেও দিতে চায় না। নাসিরউদ্দিন শাহ অনেক করে নিতে চেয়েছিল, গোভিন্দ নেহালনিকে দেবে বলে, রশিদ রাজি হয়নি।
তার বদলে রশিদ গৌতম ঘোষের ছবির জন্যে কিছু কাজ করছে। এই মুহূর্তে গৌতম বিশ্ববিখ্যাত সানাইবাদক বিসমিল্লাহ্র ওপর একটা দীর্ঘ ডকুমেন্টারি বানাচ্ছে, ইংরিজি ও উর্দু মিলিয়ে, তাতে রশিদের ভূমিকা অনেকখানি।
আড্ডায় আরও দু’চারজনের মধ্যে রয়েছে একটি যুবতী, তার নাম প্রীতি সিং। সে বাংলা বলছে স্বাভাবিক ঝরনার মতন।
আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবার পর প্রথমেই জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এমন বাংলা শিখলে কী করে?
সে বললো, শিখিনি তো। জন্মের পর থেকেই বাংলা বলি। বাবা পাঞ্জাবি, মা বাঙালি। কলকাতায় চোদ্দবছর বয়েস পর্যন্ত মডার্ন স্কুলে পড়েছি। বাংলা জানবো না?
মেয়েটি সিনেমা-সাংবাদিক। প্রধানত মুম্বাইয়েই থাকে, বহু জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। এখানে এসেছে গৌতম ঘোষের ইন্টারভিউ নিতে। এর মধ্যেই রশিদের সঙ্গে তার ভাব জমে গেছে বেশি।
– তুমি উঠেছো কোথায়?
– নিউ কেনিলওয়ার্থ হোটেলে। আপনারও ইন্টারভিউ চাই। সত্যজিৎ রায় আপনার দুটি গল্পের ফিল্ম করেছেন।
– সত্যজিৎ রায় আমার গল্পের ফিল্ম করেছেন, সে তো অনেক বছর আগের কথা। তা নিয়ে এখন আর নতুন কথা বলার কী আছে! তুমি বরং এদের দু’জনের নাও।
এইরকম মেয়ে কিছু কিছু দেখি মুম্বাইয়ে, দিল্লিতে। সম্পূর্ণ স্বাধীন। একা কোথাও গিয়ে হোটেলে থাকে। সকলের সঙ্গে মেশে, নিরিবিলিতে দুর্দান্ত স্বভাবের পুরুষদের ইন্টারভিউ নেয়।
আমাদের সঙ্গে সে বসে আছে, হাতে হুইস্কির গেলাস, এবং সিগারেট, যোগ দিচ্ছে সব কথায়। যেন পুরোপুরি একজন পুরুষ সঙ্গীরই মতন, অথচ সে রীতিমতন স্বাস্থ্যবতী এবং আকর্ষণীয় চেহারার তরুণী।
আমাদের বাঙালি মেয়েরা এমন সহজ সাবলীল হতে পারে না কেন? একটা পুরোনো নীতিবোধ এবং যৌনভয় তাদের মধ্যে বোধহয় কাজ করে। সতীত্ব কথাটা কেউ আর এখন উচ্চারণ করে না, কিন্তু কিছু একটা হারানোর ভয় অনেক মেয়ের মধ্যে থেকেই যায়।
এই যে মেয়েটিকে রশিদ দু’তিনবার বললো, আর-একটু বসো, আর-একটু বসো, তোমাকে আমি হোটেল পর্যন্ত পৌঁছে দেবো, তাতে ওর কোনো আপত্তি নেই।
আড্ডার এক ফাঁকে আমি রশিদকে বললাম, তোমার সঙ্গে শিগগির আমি একবার মেমারি যাবো।
রশিদ ভুরু কুঁচকে বললো, মেমারি? সেখানে কী আছে? কোনো মিটিং?
– না, এমনিই জায়গাটা দেখতে যাবো ভালো করে।
শক্তিও অবাক হয়ে তাকালো। মেমারিতে বিখ্যাত দ্রষ্টব্য তো কিছু নেই। তবু আমাকে যেতে হবে শুনে সেও বললো, তাহলে আমিও যাবো।
ঠিক হলো, যাওয়া হবে পরের উইকএন্ডে।
বাড়ি ফিরলাম রাত প্রায় বারোটায়।
স্বাতী শান্তিনিকেতনে, বাড়ি ফাঁকা থাকার কথা, দরজা খোলার পর দেখি ভেতরে বসে আছে কামাল।
এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। সে তো এরকমই যখন-তখন আসে, পৃথিবীর যে-কেনো প্রান্ত থেকে। কামালের মতন এমন আন্তর্জাতিক মানুষ আমি আর দ্বিতীয় দেখিনি।
আমাদের বাড়িতে স্বাতী আর আমি দু’জনেই না থাকলেও তার জন্য অবারিত দ্বার। ধনঞ্জয়, উৎপলও তাকে অতি আপনজন মনে করে।
এখন আসছে মালয়েশিয়া থেকে।
একটুক্ষণ কথা হবার পর বললাম, কামাল, এখন শুতে যাবে তো?
কামাল বললো, হ্যাঁ, তার আগে টেলিফোন করতে পারি?
কামাল টেলিফোন করবে, তার জন্যে কি অনুমতি লাগে নাকি?
কামালকে সবাই বলে টেলিফোন-বাবু। কাছাকাছি কোনো টেলিফোন দেখলেই তার হাত নিশপিশ করে। কাজে-অকাজে, চেনা-অচেনা মানুষদের সে অনবরত ফোন করে। কখনো চোদ্দ হাজার মাইল দূরেও। নিজের বাড়ি থেকে যেমন সে টেলিফোনের জন্য প্রচুর খরচ করে, তেমনি অন্যদের বাড়ির ফোন ব্যবহার করতেও সে দ্বিধা করে না।
এতক্ষণ কি সে চুপ করে বসেছিল?
তবে একটা ব্যাপার ইদানীং লক্ষ করেছি, লোকাল ফোন সে যত খুশি করে, কিন্তু বিদেশের জন্য অনুমতি নেয়।
কামালকে বললাম, এত রাতে কাকে ফোন করবে? যাই হোক করো, আমি জামা-কাপড় ছেড়ে নিচ্ছি।
কামাল বললো, একটু দাঁড়াও।
নম্বর ঘুরিয়ে কার সঙ্গে যেন দু’একটা কথা বলার পর মাউথপিসটা চেপে ধরে কামাল বললো, তুমি একটু কথা বলবে?
কে?
মিস্টার অনুপ দত্ত।
সে আবার কে? চিনি না। তার সঙ্গে আমি কথা বলবো কেন?
সৌদি আরবে ইন্ডিয়ান দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি। বাঙালি, নিশ্চয়ই তোমাকে চিনবে!
আরে কী মুশকিল! হঠাৎ এভাবে এত রাতে কোনো অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলা যায়? এটা আমার স্বভাব নয়।
বলো না। আনোয়ারার খোঁজ নিতে পারে।
ইন্ডিয়ান এমব্যাসির লোক কেন খোঁজ নেবে?
যাই হোক, লোকটির সঙ্গে কথা বলতেই হলো। সে নাকি আবার কবি! বাঙালি কবি পৃথিবীর কোথায় নেই!
সে বললো, তার পাশেই বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারিও বসে আছে, সেও কবি। এবং আমার অনেক লেখা পড়েছে।
তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝলাম, ওদেশে নিষিদ্ধ হলেও দু’জনেই লুকিয়ে কিছুটা মদ্যপান করেছে, বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে।
দ্বিতীয়জনের নাম আনোয়ারুল ইসলাম। তাকে আমি সংক্ষেপে আনোয়ারার বৃত্তান্তটা জানিয়ে বললাম, যদি তার কোনো খোঁজ-খবর বের করতে পারেন, খুব উপকার হয়।
সে জী, নিশ্চয়, সার্টেনলি বললেও কণ্ঠস্বরে তেমন গুরুত্ব নেই। বরং বারবার সে বলতে লাগলো, আপনি এখানে চলে আসেন না, আমরা এখানে কবিতা পাঠের আসর করবো।
ওখানে কবিতা পাঠের আসর? কে শুনবে?
আছে। অনেক বাঙালি আছে। আপনি চলে আসেন, আমরা সব ব্যবস্থা করে দিব, আপনার থাকার কোনো অসুবিধা হবে না। ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম।
বুঝলাম, এসব কথার কথা। কাল সকালে ভুলে যাবে।
বললাম, ঠিক আছে। আপনারা একটা চিঠি পাঠান। তারপর চিন্তা করে দেখবো। ওই মেয়েটির কথা ভুলে যাবেন না।সৌদি আরবে গিয়ে কবিতা পাঠ করার আগ্রহ আমার নেই। বরং মেমারিতে গিয়ে দেখে আসতে হবে ব্যাপারটা। (ক্রমশ)

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.