জীবনানন্দ দাশের দীর্ঘ কবিতা

১৯৩৮-এ অনেকগুলো খাতায় কবিতা লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ; তখন বসবাস করছিলেন বরিশালে। এসব খাতার বেশ কয়েকটি কলকাতায় ভারতের জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে ‘রেয়ার কালেকশন’ সেকশনে সংরক্ষিত রয়েছে। সেখানে সংরক্ষিত জীবনানন্দ দাশের খাতাগুলোয় নম্বর দেওয়া আছে ১ থেকে ৪৭। ৩৫ নম্বরে ক এবং খ দুটি। এর মধ্যে ১৮-সংখ্যক খাতায় মে-জুন মাসে কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন জীবনানন্দ। খাতাটির প্রথম পাতায় ইংরেজিতে সেরকমই লিখে রেখেছিলেন কবি নিজ হাতে। পাণ্ডুলিপির এ-খাতাটিতে মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ৮৮, কবিতার সংখ্যা মাত্র ১৬ যদিও। কবিতাগুলোর প্রথম পঙ্ক্তি এরকম :

ক. রায়’দের অত বড়ো পরিবার – বাতি দিতে কেউ আর নাই

খ. মনে হয় নগরীর একটেরে সেই এক দুর্গের কথা

গ. বিকেলের সাদা আলো যখন নামিল চারু ঘোষাল’এর জীবনের ’পরে –

ঘ. গভীর শীতের রাতে বিছানার স্বপ্ন থেকে উঠে

ঙ. ভগ্নজানু শিবমন্দিরের ফাঁকে – বট’এর কোটরে

চ. আমি এই পৃথিবীতে এসে দেখি ঢের স্ফীত নদী

ছ. সেই ছোটবেলাকার কথা মনে পড়ে – হেমন্তের বিকালবেলায়

জ. মেঘ ক’রে আসে দ্যাখো – এই বার সব বই রুদ্ধ ক’রে

ঝ. হাতি’র হাওদায় চ’ড়ে হতে পারি না কি আমি মৃগয়ার পরিকল্পে কুমারের মত

ঞ. জীবনের অদ্ভুত অর্ধেক দিন কেটে গেছে

ট. আজ এই পৃথিবীতে কোনো মায়াবীর দীর্ঘ দুর্গ নাই

ঠ. দীর্ঘ এক দেবদারুগাছের নিকটে

ড. সহসা হয়তো কোনো দ্বার খুলে যাবে

ঢ. এ পৃথিবী তার তরে আর উপযুক্ত নয় জেনে

ণ. আরও গাঢ় বিতর্কের পাতা নেড়ে চেড়ে

ত. বহুদিন হংসেশ্বর চৌধুরি’র কোনো কথা শুনি না তো

৮৮ পৃষ্ঠার খাতাটির তৃতীয় পৃষ্ঠা থেকে লেখা শুরু করে ৮৬তম পৃষ্ঠা পর্যন্ত ১৬টি কবিতা লিখেছেন জীবনানন্দ। কাটাকুটির পরিমাণ কম। পাণ্ডুলিপির এ-খাতাটিতে রয়েছে দুটি দীর্ঘ কবিতা। প্রথম দীর্ঘ কবিতাটি ৩০২ পঙ্ক্তিতে বিন্যস্ত। খাতার সপ্তম পৃষ্ঠায় শুরু করে টানা ২৪ পৃষ্ঠা অবধি লিখেছেন – এ-দীর্ঘ কবিতাটির শুরু এইভাবে :

মনে হয় নগরীর এক টেরে সেই দুর্গের কথা

অনেক বছর আগে সেইখানে মানুষেরা তরবার ব্যবহার

                                                   করেছিল

সেই সব স্মৃতি তবু আজ আর আরশোলা’দের নীড়ে দীর্ঘ

                                      শ্বাস ফেলে না ক’ …

জীবনানন্দ দাশ তাঁর দীর্ঘতম কবিতাটি এ-খাতারই ৩১ পৃষ্ঠায় শুরু করে ৫২ পৃষ্ঠা অবধি লিখেছেন। টানা লিখে গেছেন ৩৯২ পঙ্ক্তি। কবিতাটির প্রথম চরণ : ‘সেই ছোটবেলাকার কথা মনে পড়ে – হেমন্তের বিকেলবেলায়’। ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে দৈনিক সমকাল পত্রিকার ঈদসংখ্যায় ‘সোমেশ্বর মুস্তফীর গল্প’ নামে এ-কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল। কবিতাটি কোনো গ্রন্থভুক্ত নয় বলে পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। অথচ এই দীর্ঘ কবিতাটি একটি অসামান্য রচনা। অসামান্য কেবল জীবনানন্দের রচনাবলির নিরিখে নয়, বিশ্বসাহিত্যের দীর্ঘ কবিতাবলির বিবেচনায়ও এটি একটি অনন্যসাধারণ কাব্য। আশা করি গ্রন্থাকারে প্রকাশের মাধ্যমে ‘সোমেশ^র মুস্তফীর পৃথিবী’ আগ্রহী পাঠকদের হাতে সহজেই পৌঁছাবে।

বিভিন্ন পাণ্ডুলিপির খাতা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসময়, ১৯৩৮-এ, যখন তিনি অধ্যাপনা করছেন বি.এম. কলেজে – থাকছেন সপরিবারে বরিশালের পিতৃগৃহে – দীর্ঘকাল বেকার থাকার পর জীবনে এসেছে কিছু স্থিরতা ও নিশ্চিন্ত কিছু অবকাশ – বেশ কয়েকটি দীর্ঘ কবিতা লিখেছিলেন জীবনানন্দ; – তবে সেগুলোর একটিও জীবদ্দশায় প্রকাশ করে যাননি।

কেউ ভাবতে পারেন, সংগত কারণেই, দীর্ঘ কবিতা মুদ্রণে আগ্রহী সাহিত্যপত্রিকার অভাব ছিল কি না। কিন্তু  আমরা স্মরণ করতে পারি সেই ১৯২৮-এ, বুদ্ধদেব বসু তাঁর সম্পাদিত প্রগতি পত্রিকার ভাদ্র ১৩৩৫ সংখ্যায় জীবনানন্দের ‘পরস্পর’ কবিতাটি মুদ্রণ করেছিলেন। ১৮২ পঙ্ক্তির ‘পরস্পর’ জীবনানন্দের প্রথম প্রকাশিত দীর্ঘ কবিতা। প্রায় একই সময়ে ধূপছায়া পত্রিকার আশ্বিন ১৩৩৫ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল আরেকটি দীর্ঘ কবিতা : ‘মাঠের গল্প’। আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয় : যে কঠিন পরিমার্জনা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে জীবনানন্দ তাঁর কবিতাগুলোকে ‘প্রকাশযোগ্য’ করে তুলতেন, ৩৯২ পঙ্ক্তির আলোচ্য কবিতাটি সেভাবে পরিশ্রæত ও পরিমার্জিত করার উপযুক্ত অবসর তিনি লাভ করেননি। তাই জীবদ্দশায় এ-দীর্ঘ কবিতাটি প্রকাশ করেননি।

জীবনানন্দ তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধূসর পাণ্ডুলিপিতে যে কুড়িটি কবিতা অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন – বিস্ময়ে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো – সেগুলোর অনেকগুলোই – যেমন ‘মাঠের গল্প’ (পঙ্ক্তি সংখ্যা ১২৭), ‘পরস্পর’ (পঙ্ক্তি সংখ্যা ১৮২), ‘কয়েকটি লাইন’ (পঙ্ক্তি সংখ্যা ১৭৮), ‘অনেক আকাশ’ (পঙ্ক্তি সংখ্যা ১৯৮), ‘বোধ’ (পঙ্ক্তি সংখ্যা ১০৮), ‘ক্যাম্পে’ (পঙ্ক্তি সংখ্যা ৯৫), ‘জীবন’ (পঙ্ক্তি সংখ্যা ৩০৬), ‘অবসরের গান’ (পঙ্ক্তি সংখ্যা ১৩৯), ‘প্রেম’ (পঙ্ক্তি সংখ্যা ১২৯), ‘পিপাসার গান’ (পঙ্ক্তি সংখ্যা ১৩৯) – দীর্ঘ কবিতা। এগুলোর মধ্যে ‘জীবন’ চৌত্রিশটি স্তবকে বিন্যস্ত দীর্ঘতম কবিতা।

দীর্ঘ কবিতা প্রসঙ্গে এমতো উদাহরণ অনর্থক, এবং বস্তুত অপ্রাসঙ্গিক, যে ‘মহাভারত’ পৃথিবীর দীর্ঘতম কবিতা; অথবা উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘প্রিলিউড’। ডেরিক ওয়ালকটের ‘ওমেরস’ও দীর্ঘ কবিতার সমীচীন কোনো উদাহরণ নয়। বরং টিএস এলিয়টের ‘দ্য ওয়েইস্ট ল্যান্ড’ বা ‘দ্য লাভ সং অফ জে. আলফ্রেড প্রুফক’ দীর্ঘ কবিতার মান্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে; ওয়াল্ট হুইটমানের ‘দ্য সং অফ মাইসেলফ’কেও। ইংরেজি সাহিত্যে দীর্ঘ কবিতার শ্রেণিতে এ-তিনটিকে বিন্যস্ত করা হয় তর্কাতীতভাবেই। ‘দ্য ওয়েইস্ট ল্যান্ড’ ৪৩৪ পঙ্ক্তির কবিতা – প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২২-এ। ১৯৫৬-৫৭তে লেখা অক্তাভিও পাসের ‘সান স্টোন’ (Sun Stone – Piedra de Sol)-এর পঙ্ক্তিসংখ্যা ৫৮৪। জীবনানন্দের ‘সোমেশ্বর মুস্তফীর পৃথিবী’, যার প্রথম চরণ ‘সেই ছোটবেলাকার কথা মনে পড়ে’, দৈর্ঘ্যে ৩৯২ পঙ্ক্তি।

জীবনানন্দের সুপরিচিত দীর্ঘাঙ্গ কয়েকটি কবিতা হলো ‘আট বছর আগের একদিন’ যার পঙ্ক্তি সংখ্যা ৮৫, ‘বোধ’ পঙ্ক্তি সংখ্যা ১০৮ এবং ‘১৯৪৬-৪৭’ যার পঙ্ক্তি সংখ্যা ১৩৫। শত পঙ্ক্তির অধিক যে-কবিতাগুলো জীবনানন্দ লিখেছিলেন পরিণত বয়সে না তারা স্থান পেয়েছে কোনো গ্রন্থে, না তিনি সেসব প্রকাশ করে পাঠককে পড়ার সুযোগ করে দিয়ে গেছেন জীবদ্দশায়। এরকম বারোটি কবিতার প্রথম চরণ ও পঙ্ক্তি সংখ্যা আগ্রহী পাঠকের কাছে জরুরি মনে হতে পারে :

ক. কোনও স্বর্গ – কোনও এক নরকের থেকে : – পঙ্ক্তিসংখ্যা ১৫৩

খ. হে মনীষীর ভিড় : – পঙ্ক্তি সংখ্যা ১২৮

গ. বেলুনের মত আমি এক দিন উড়ে যাব : – পঙ্ক্তিসংখ্যা ১২৩

ঘ. গভীর শীতের রাতে যেন থার্ডক্লাস : – পঙ্ক্তিসংখ্যা ১০১

ঙ. শতাব্দী নদীর পারে শুনেছি অনেক পেলিকান : – পঙ্ক্তিসংখ্যা ১০৪

চ. মনে হয় নগরীর এক টেরে সেই এক দুর্গের কথা : – পঙ্ক্তি সংখ্যা ৩০২

ছ. সেই ছোটবেলার কথা মনে পড়ে : – পঙ্ক্তিসংখ্যা ৩৯২

জ. পুরানো বইয়ের দোকানে আমি এক আধটা বই চাই : – পঙ্ক্তি সংখ্যা ১১৩

ঝ. হৃদয় বিস্ময় এক অনুভব ক’রে যেতে : – পঙ্ক্তিসংখ্যা ১৪৪

ঞ. শায়িত ঘাসের ভিড়ে : পঙ্ক্তিসংখ্যা ১১৯

ট. ভিড়ের ভিতর সহসা একজন নারীকে : – পঙ্ক্তিসংখ্যা ১০৪

ঠ. কী এক দায়িত্ব আছে : – পঙ্ক্তি সংখ্যা ১১৩।

জীবনানন্দের দীর্ঘ কবিতার বিষয় ও স্থাপত্য লক্ষ করার মতো। যে উদ্যম ও শক্তিমত্তার প্রশ্রয়ে তিনি এ-কবিতাগুলো রচনা করেছিলেন তার কথা ভেবে বিস্মিত হতে হয়। যে অবিরল চিন্তাস্রোত এই কবিতাগুলোতে স্থান করে নিয়েছে তার পর্যায়ক্রমিক বিষয়বস্তুর ও বৈচিত্র্যের কথা ভেবে অবিশ্বাসে স্থির হয়ে যেতে হয়। বিশ্বসাহিত্যে এরকম আর একজন কবির সাক্ষাৎ মেলে না যিনি এতগুলো সার্থক দীর্ঘ কবিতা রচনা করে গেছেন। দৈর্ঘ্য সত্ত্বেও পূর্বাপর স্বরসংগতি প্রতিটি কবিতাকে দান করেছে নিখুঁত স্থাপত্য। দূরসমুদ্রের অবিরাম ঢেউয়ের শীর্ষে চড়ে ভেসে যাওয়ার মতো উদ্ভিন্নমান চিত্রাবলি, ছন্দের অলঙ্ঘ্য বিন্যাস ও শব্দের মূর্ছনায় প্রতিটি দীর্ঘ কবিতা অনবদ্য হয়ে উঠেছে। 

দুই   

দীর্ঘ কবিতা কখনো অনন্ত মন্ত্রের মতো মোহনীয় মনে হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্রপুট-এর প্রথম তিনটি কবিতা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। তৃতীয় কবিতাটি ‘পৃথিবী’; – কখনো মনে হয় শ্রেষ্ঠতার মাপকাঠিতে ফেলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কেবল একটি কবিতাই যদি নির্বাচন করতে বলা হয় তবে – নির্দ্বিধায় – ‘পৃথিবী’র কথা উল্লেখ করা চলে। এই অপরূপ দীর্ঘ কবিতাটির পঙ্ক্তিসংখ্যা ৯৯। মানবসভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাস যে নিখুঁত ও ছন্দ ও অনিন্দ্যসুন্দর ধ্বনিময়তায় রবীন্দ্রনাথ চিত্রায়িত করেছেন তার সংগীত মর্মস্পর্শ করে যায় প্রতিটি পাঠেই। অন্যদিকে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় দীর্ঘ কবিতা কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ – যার পঙ্ক্তি সংখ্যা ১৪৮। শব্দ ও ছন্দের জাদুতে কবিতাটি আমাদের বিস্মিত করে যায় প্রতিবার পাঠে। স্মরণযোগ্য যে সোনার তরীর ‘পুরস্কার’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দীর্ঘতম কবিতা – পঙ্ক্তিসংখ্যা ৬৬২; এবং নজরুলের দোলন-চাঁপা গ্রন্থভুক্ত ‘পূজারিণী’ কবিতার পঙ্ক্তি সংখ্যা ৪৪২। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর দুটি কবিতা অসামান্য জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল যার একটি ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ – পঙ্ক্তি সংখ্যা ২৫৬; এবং অপরটি ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ – যার পঙ্ক্তিসংখ্যা ১৬১।

একই কালপরিসরে আরো কয়েকটি দীর্ঘাঙ্গ কবিতা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এর মধ্যে দুটি আহমদ ছফা বিরচিত ‘একটি প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা’ – পঙ্ক্তিসংখ্যা ৬৫২; এবং ‘বস্তি উজাড়’ – ১৭৭ পঙ্ক্তি। উল্লেখ করার মতো ঘটনা তো এই যে, আহমদ ছফা ১৭৭ পঙ্ক্তির ‘বস্তি উজাড়’ নাগাড়ে পাঠ করতেন – স্মৃতি থেকে – দৃঢ় ও স্বচ্ছ উচ্চারণে, মোহনীয় সুরের জাল বিস্তার করে। 

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’ সুপাঠ্য একটি কবিতা। কিন্তু সচেতন পাঠক জানেন যে, যে-কৌশল অবলম্বনে এ-কবিতার দৈর্ঘ্যস্ফীতি ঘটেছে তা পুনরুক্তিমূলক বয়ানের একটি কৌশল মাত্র। এ-কবিতাটি শুরু হয়েছে এরকম একটি স্তবক দিয়ে :

আমি কিংবদন্তির কথা বলছি

আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।

তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল

তাঁর পিঠে রক্তজবার মত ক্ষত ছিল।

তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন

অরণ্য এবং শ্বাপদের কথা বলতেন

পতিত জমি আবাদের কথা বলতেন

তিনি কবি এবং কবিতার কথা বলতেন।

পাঠক জানেন, কবিতার মূল অবয়বে অনুরূপ সর্বমোট নয়টি স্তবক রয়েছে। এ-কবিতাটির পুনরাবৃত্তিমূলক আরো একটি স্তবকের কথা স্মরণ করা যেতে পারে :

… যে কবিতা শুনতে জানে না

সে নদীতে ভাসতে পারে না।

যে কবিতা শুনতে জানে না

সে মাছের সঙ্গে খেলা করতে পারে না।

যে কবিতা শুনতে জানে না

সে মা’য়ের কোলে শুয়ে গল্প শুনতে পারে না …

শ্রবণসুভোগ আলোচ্য কবিতাটির অবয়বে উপরোদ্ধৃত তালিকাসদৃশ স্তবকের মতো আরো আটটি স্তবক রয়েছে। পুনরাবৃত্তিমূলক গঠনস্থাপত্য মসৃণভাবে কবিতার আকার বৃদ্ধি করে। তালিকা গঠনও কবিতার অবয়ব স্ফীত করে। কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ বা ওয়াল্ট হুইটম্যানের ‘দ্য সং অফ মাইসেলফ’ও অবলম্বন করেছে অভিন্ন রচনাশৈলী। পক্ষান্তরে আহমদ ছফার কবিতা দীর্ঘ হয়েছে এরকম কোনো কৌশল অবলম্বন না করেই। কবিতাটি কাহিনিমূলক; কাহিনির দাবিতেই কবিতার অবয়বের বিস্তার ঘটেছে কোনোরূপ পুনরুক্তি অবলম্বন ব্যতিরেকে। কবিতাটি পরিণত হয়েছে কবির রাজনৈতিক স্বপ্নকল্পনা আভাসিত করে। ‘বস্তি উজাড়’-এর শেষ স্তবকটি উদ্ধার করা যেতে পারে:

… বাসাভাঙা পাখি প্রায় তাড়াখাওয়া গ্রামীণ মানুষ

কুয়াশার পথ বেয়ে কোন্দিকে যায়?

কম্পিত চরণ পাতে কোন্ কথা লিখে রাখে পাথুরে রাস্তায়?

জাগ্রত হৃদপিণ্ডতলে বিদ্যুৎ চমকে

সর্বহারা হৃদয়ের অগ্নিগর্ভ বাণী

হাড়ে হাড়ে বহ্নিমান কথার ফোয়ারা

সমাচ্ছন্ন অন্ধকারে কি আবেগে ফেটে পড়ে।

মমতার লেশহীন গর্বময়ী নিষ্ঠুর শহর

ক্ষমতার ক্রীড়াক্ষেত্রে অবশ্য তোমাকে দেব

দরিদ্রকে ছলনার বর, আমরা যাব না গ্রামে

শিশু কি কখনো যায় মাতৃজরায়ণে?

দলিত মথিত হব হাড়ে হাড়ে পিষ্ট হব

বিষাক্ত ভীমরুল প্রায় গুপ্তঘরে

সারারাত ক’রে রবো চুপ।

রজনী প্রভাতকালে বহির্গত হব সব

যেন ঝাঁক ঝাঁক বোমারু বিমান।

হে শহর, গর্বোদ্ধত নিষ্ঠুর শহর

তোমার সঙ্কীর্ণ বক্ষে সবান্ধবে একদিন

ঢেলে দেব মারাত্মক আজব কহর

গ্রাম খারিজের শোধ দেব, সোনালি শস্যের

নামে লাগাব তাণ্ডব, বইয়ে দেব রক্তনদী

লালে লাল হবে রাজপথ, ক্ষেপাতরঙ্গের মত সহিংস

                                                   আঘাতে

খুলে নেব সভ্যতার ফ্যাকাশে বল্কল।

যথাযোগ্য শব্দের একধরনের অনর্গল প্রবহমনতা আহমদ ছফার কবিত্বশক্তিকে প্রতিষ্ঠা করে নিঃসংশয়ে – ‘ফাউস্ট’-এর অনুবাদকের পক্ষে তা সম্ভবও বটে। গ্যেটের ‘ফাউস্ট’ যিনি অনুবাদ করতে পারেন, তাঁর পক্ষে অসাধ্যসাধন সম্ভব। আহমদ ছফা বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধেও একজন তুলনারহিত মানুষ যিনি তাঁর চিন্তাশীলতা দিয়ে বাংলার ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি ও সাহিত্য সম্পর্কে এমন সব মন্তব্য করেছেন যেগুলো দৃষ্টি উন্মোচনকারী। উপন্যাসগুলোতেও তার উল্লেখযোগ্য মননশীলতার অসামান্য প্রতিফলন ঘটেছে। অথচ তাঁর কাব্যপ্রতিভা, দুঃখজনক হলেও মেনে নিতে হয় যে, কমবেশি অনালোচিত রয়ে গেছে। কবিতায় তিনি ইয়োরোপীয় ধাঁচ অবলম্বন করেননি। কাঠামোর বিচারে তাঁকে কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঘরানায় অন্তর্ভুক্ত করলে অন্যায্য কাজ হবে না। তাঁর ছন্দপ্রয়োগ ও শব্দচয়ন বিস্ময়কর। কবিতার সংখ্যা বেশি না হলেও বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের বাঙালি কবিদের মধ্যে অনন্যসাধারণতার জন্য আহমদ ছফা বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।

দীর্ঘ কবিতার কবিকে সতর্ক থাকতে হয় যেন দীর্ঘায়নের মোহ তাঁর রচনাকে কৃত্রিম করে না-তোলে। সৈয়দ শামসুল হকের ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’ কোনো কোনো আবৃত্তিকার চমৎকার করে শ্রবণসুভোগ করে তুলতে পারেন। কিন্তু শ্রæতিযোগ্যতা কবিতার মৌলিক শর্ত কোনো নয়। অবিস্মরণীয় দু-চারটি পঙ্ক্তির উদ্ভাস বাদ দিলে ৭৯২ পঙ্ক্তির ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’ পড়তে পড়তে ক্লান্তি অনিবার্য হয়ে ওঠে। লিখতে লিখতে সৈয়দ শামসুল হক প্রায়শ বিস্মৃত হয়েছেন তিনি কবি, শিল্পই তাঁর পরম গন্তব্য : ‘বাংলা ভাষার দীর্ঘতম কবিতাটি আমিই লিখবো’ – এরকম কোনো প্রত্যয় তাঁর জন্য সমীচীন নয়। ফলে প্রায় অন্তঃহীনভাবে তিনি রচনা করেছেন ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’, বিসর্জন দিয়েছেন কাব্যের যাকে বলা যায় ‘ইনটিগ্রিটি’। যতই কবিতার পরিসর দীর্ঘায়িত হয়েছে, ততই হ্রাস পেয়েছে ‘পোয়েটিক ইনটেনসিটি’; – কাব্যিক গাঢ়তা ক্রমশ অবসিত হয়ে গেছে :

কিন্তু আমি ভ‚তগ্রস্ত লিখে যাই আজো

বাতিল খামের পিঠে, কিংবা মনে মনে,

ঘরে ফিরে বাঁধানো খাতায়, রেস্তোরাঁয়

হঠাৎ আউরে উঠে পঙ্ক্তি সদ্যোজাত

উন্মাদ সাব্যস্ত হই, অবিরাম লিখি।

আর দেখি, কিছুতেই আসে না যায় না

কিছু, যেমন সমস্ত ছিল, অবিকল

তাই আছে। ফিরে আসে বাংলায় বিদ্রোহ

নিয়মিত বছরে বছরে। যায় লোক

সস্ত্রীক শ্বশুরবাড়ি ঈদের ছুটিতে।

সিনেমায় জুটি ভাঙ্গে গড়ে। কারো কারো

বাড়ি গাড়ি হয়। আমেরিকা ইয়োরোপে

ছোটে ছাত্র, অধ্যাপক; ছাপা হয় ছবি :

ইলিশের গন্ধে আজো ডুবে যায় কত

ঝাঁঝালো বিক্ষোভ, অশ্রু দুঃখ, পরাজয়।

মানুষেরা বেঁচে থাকে, বংশে বংশে যায়

বাঁচার বরাত দিয়ে কাফনে লোবানে।

সুরাপাত্রে শয়তান ভাসে। বই লেখে

রমণীমোহন। অবিকল, অবিকল

সব। তবু লিখি, লিখে যাই, সম্ভবত

এই কি কারণ – আঠারো বছর ধরে

যা শিখেছি তা সহজে ভোলা তো যায় না

অথবা চল্লিশ আর বেশি দূরে নয়,

বস্তুত সম্ভব নয় এখন নতুন

কোনো বিদ্যার সাধন।

পৃথিবীর সমস্ত আবেগ ও অভিজ্ঞতা সমবেত করে কবিতাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে-উপলব্ধির প্রেরণায় সৈয়দ শামসুল হক কবিতাটি লিখেছেন, সেই একই উপলব্ধির সংযত ও সংহত প্রকাশ সম্ভবপর ছিল; তৈরি করা সম্ভব ছিল উপমা, উৎপ্রেক্ষা, প্রতীকতার নিরেট শব্দচিত্র। ভালো কবিতার একটি শর্ত হলো, অবিনাশী শব্দ, বাক্য ও বক্তব্যের সমাহার। এ-কারণেই সম্ভবত এজরা পাউন্ড টিএস এলিয়টের ‘দ্য ওয়েইস্ট ল্যান্ড’ থেকে ২০৯ পঙ্ক্তি ছেঁটে ফেলে দিয়েছিলেন।

তিন

দীর্ঘ কবিতার অনেক দায় থাকে। দীর্ঘ কবিতা ‘এপিক’ নয়, তাকে ছন্দিত উপন্যাস হলে চলে না, সে হতে পারে না কেবল অনেকগুলো ক্ষুদ্রাবয়ব গীতিকবিতার শৃঙ্খলিত সংগ্রন্থন, কথামালার ভারে তাকে ঝুলে পড়লে হবে না। জীবনানন্দ দাশের দীর্ঘতম কবিতা ‘সোমেশ্বর মুস্তফীর পৃথিবী’ এই সব দায়-দেনা পরিশোধ করে অনন্যসাধারণ মহত্ত্ব অর্জন করেছে। কবিতাটি শুরু হয়েছে কথকের মৃদুস্বরে – স্মৃতিচারণের ভঙ্গিতে। খানিকটা অগ্রসর হয়ে পাঠক অবহিত হতে পারেন কথকের নাম ‘অভিরাম’, আর যার সঙ্গে কথোপকথন কবিতাটির মূলাংশ গঠন করেছে তার নাম ‘সোমেশ্বর মুস্তফী’। ‘ঘড়িব্যবসায়ী’ আর ‘বিকল ঘড়ির’ মিস্ত্রি সোমেশ্বর মুস্তফী অনেকের কাছে ‘খিড়কির জীব’। ঘড়ির মিস্ত্রির বর্ণনা পাওয়া যায় এইভাবে :

সেই জীর্ণ দীর্ঘ দেহ – যেন এক ভূতুড়ে পাড়ার

হিজলগাছের সব শেষ কাণ্ডখানা কেটে নিয়ে

   বানায়েছে কোনো এক বিদূষক-কারিগর

      সমস্ত স্বর্গীয় ব্যাস তার ছেঁচে ছেঁচে

        খোঁচা দিয়ে – শাবলের বাড়ি মেরে – কালি ঢেলে

    তবু তার খিরগিজ ডাকাতের মত দেহের সীমানা ঘিরে

        কোনো এক নাক্ষত্রিক আভা রেখে গেছে

তার উঁচু নাক যেন মধ্যবাতাসের থেকে এক বেকার কাকের

                                                           মত

  বালকের হাতে একখণ্ড রুটি দেখে সহসা আসিত নেমে

        আধো প্রীত – ঢের সমাকুল – শঠ – অন্তরঙ্গ –

খানিকটা সন্দিহান – কাঁচাপাকা ভুশির রাশির মত

                                                  গোঁফজোড়া

অন্যত্রও রয়েছে সোমেশ্বর মুস্তফীর আরো কিছু বর্ণনা : তার দেহ যেন ভারতীয় মায়াবীর দড়ির মতন দীর্ঘ; সে যেন বৃহৎ এক লোকালয়-ভীরু বনতিতিরের মত; আপনার হৃদয়-স্পন্দন ঘনিয়ে ব’সে থাকে। কথা বলতে বলতে কখনো সে-প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। তারপর :

… তার দুই পাটি দাঁতের পিছনে 

সরীসৃপ-জিভটাকে নিয়ে ডাইনোসর পৃথিবীর মত

ব্যায়াম চালাত একা বহুক্ষণ অন্ধকার মুখের বিবরে

তারপর জিভটাকে একেবারে শীর্ণ গালে আটকায়ে

   আলুর মতন এক ছোট আব ফুলাত সে

       যক্ষ্মারুগিনীর মত যেন সমুজ্জ্বল, তীক্ষ্ন চোখে

আমার চোখের দিকে তাকায়ে রহিত একা

     বায়বী, নির্জ্জন।

একদিন বৈশাখের রাতের দুপুরে ঘর ছেড়ে পোড়ো ইদারার পাশে একটি ধূসর ভূতের মতো বসে থাকে সোমেশ্বর মুস্তফী, গায়ে জীর্ণ খদ্দরের ধোসা। অভিরাম উপস্থিত হলে সে বলে,

এত রাতে তুমিও এখানে …

  বহুদিন থেকে যেন জুজুবুড়ী হয়ে আছে প্রাণ

          লোকালয় থেকে ঢের দূরে সরে 

          পুরোনো ঘড়ির নাড়ী টিপে – ছানি কেটে –

                                              চশমা পরায়ে

            আমি যেন আজো মধ্যযুগে পড়ে আছি মনে হ’ল

কথা বলতে বলতে কখনও নিরেট হাড়গিলা-হাসি হাসে সোমেশ্বর মুস্তফী; তখন মনে হয় :

…সমস্ত পাঁজর তার যেন ডিম ডাইনোসুর যুগে

আভাময়ী নিসর্গের সাথে ল’ড়ে প্রাঞ্জল আঁধার মমী হয়ে

                                                   গেছে …

চার

জীবনানন্দের বহু কবিতার মতো এ-কবিতাটিরও সারসংক্ষেপণ প্রয়াসাতীত : এ যেন ইতোমধ্যেই মহাজীবনের এক নিরেট নির্যাস। খুবই অন্যায্য হবে যদি বলা হয়, এটি সংলাপ-কবিতা। জীবনানন্দ সংলাপ-কবিতা লিখেছেন যদিও – ইতোমধ্যে তাঁর সংলাপ-কবিতার স্বাদ পেয়েছেন কোনো কোনো পাঠক – কিন্তু ‘সোমেশ্বর মুস্তফীর পৃথিবী’ সংলাপধর্মী কবিতা নয় আদৌ – সংলাপের আবহ সত্ত্বেও – বস্তুত সংলাপের আবহে সোমেশ্বর মুস্তফীর আত্মকথন। একদিকে কবিতার কথক অভিরাম, অন্যদিকে বিকল ঘড়ির মিস্ত্রি সোমেশ্বর মুস্তফী। অনেকটা জুড়ে জীবনানন্দ দাশ অভিরামের বয়ানে সোমেশ্বর মুস্তফীর বর্ণনা দিয়েছেন; তারচেয়েও জুড়েছেন বেশি সোমেশ্বর মুস্তফীর পর্যবেক্ষণ ও দার্শনিকোক্তির দুর্বোধ্য পসার। কার্যত এ-কবিতা অবারিত করেছে জনৈক সোমেশ্বর মুস্তফীর পৃথিবী কেন্দ্র থেকে ভ‚ভাগ অবধি। সংলাপের আবহ একধরনের আর্দ্র অন্তরঙ্গতায় কবিতাটিকে সপ্রাণ করে তুলেছে।

জীবনানন্দ কোনোরূপ কাহিনিমূলকতা ব্যতিরেকেই শত শত পঙ্ক্তি চিত্রায়িত করেছেন। এ-দীর্ঘ কবিতাটি অনেকগুলো স্বতন্ত্র ক্ষুদ্র কবিতার ধারাবাহিক বিন্যাস মাত্র নয়, বরং এ-কবিতার বৈশিষ্ট্য হলো এর এককত্ব – যার শুরু প্রথম পঙ্ক্তিতে এবং সমাপ্তি শেষ পঙ্ক্তিতে। এই দুই পঙ্ক্তির চরাচরে পুনরুক্তি নেই : এই বিস্তৃত পরিসর জীবনানন্দ পূর্ণ করেছেন নিসর্গের মতো বৈচিত্র্যময় দৃশ্য, উপমা ও চিত্রকল্প দিয়ে। দীর্ঘ এই কবিতার পাঠ মন্থরগতি গুণটানা নৌকার মতো – উপকূলবর্তী – উপকূলস্পর্শী যদিও নয়। অপরূপ শব্দ ও বাক্যবন্ধ সৃষ্টি করেছে শব্দচিত্র, যার শিল্পনাম কবিতা – যার অর্থ কখনো অনবগুণ্ঠিত, কখনো অর্ধবগুণ্ঠিত; কখনো বোধগম্য, কখনো বোধের অতীত। শেষাবধি অবোধগম্যতার নির্মোক ছিন্ন করে তা প্রবেশ করে যায় বোধির মর্মমূলে।

কবিতাটি আমাদের স্তবক থেকে স্তবকে, পৃষ্ঠা থেকে পৃষ্ঠান্তরে টেনে নিয়ে যায়। এক অস্পষ্ট অর্থপ্রত্যাশার চাপে আমাদের মনোযোগ ক্রমশ একাগ্র হয়ে ওঠে। অর্থ স্পষ্ট হয় না যদিও শেষ পর্যন্ত – তবুও আমাদের স্নায়ু অর্থময়তার প্রত্যাশায় আদ্যোপান্ত টান টান থাকে; পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তিতে সৃষ্টি হয় জান্তব এক অস্তিত্ব, যার নাম কবিতা – দ্যুতিময় শব্দের এক তুলনাহীন বিন্যাস। কীভাবে এ-কবিতা লেখার খাতায় ২২ পাতা দখল করে নিয়েছে? কোনো পরিকল্পনার ইংগিত প্রতিভাত হয় না। একটি প্রাকৃত গতিময়তা কবিতাটিকে প্রায় চারশো পঙ্ক্তিতে নিয়ে গেছে। দীর্ঘ কবিতাতে একজন কবির সৃজনদক্ষতার যে অলঙ্ঘ্য পরীক্ষা হতে পারে এ-কবিতাটি তার প্রমাণ।

প্রায়শ আমরা প্রত্যক্ষ করি – যেমন জসীম উদ্দীনের ‘কবর’ কবিতায় – গল্পের যৌক্তিক বুনন, – যেমন কিনা মহাকাব্যে – জীবনানন্দের কবিতায় আমরা তার বিপরীত প্রত্যক্ষ করি। এই দীর্ঘ কবিতা – এই ৩৯২ সংখ্যক ক্রমান্বয়ী পঙ্ক্তিও ক্ষুদ্রাকৃতি সনেটের মতো নিরেট ও তীব্র – কেবলই বাকপ্রতিমা, অসংখ্য শব্দচিত্রের অলঙ্ঘ্য পারম্পর্য, নানা উপলব্ধি ও পর্যবেক্ষণের নিশ্ছিদ্র বিন্যাস। জীবনানন্দ অন্যান্য কবিতার মতোই আদি-মধ্য-অন্তের বৃত্তাকার স্থাপত্য বর্জন করে একমুখী প্রবহমানতা সৃষ্টি করেছেন – স্পষ্ট অর্থ ও আক্ষরিক তাৎপর্যময়তার দাবি অগ্রাহ্য করেছেন।  

ছয়

জীবনানন্দ বেঁচে ছিলেন কবিতার জন্যে। নিজের অস্তিত্বকে তিনি যাচাই করে নিয়েছিলেন কবিতা রচনার আবছায়ায়। কবি-জীবন এক অভিযাত্রার মতো যার লক্ষ্য সুস্থির নয়। জীবনের সব অভিজ্ঞতা ও প্রশ্নকে তিনি অবমুক্ত করেছেন কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে। কিন্তু তিনি অনুচ্চকিত কণ্ঠের আশ্রয় নিয়েছেন। কবিতার ছন্দে তিনি আশ্রয় দিয়েছেন হৃদয়ের অনুভূতিকে। তাঁর রচনায় ভাষা পরিণত হয়েছে জাদুতে। শব্দের মধ্য দিয়ে তিনি পৌঁছুতে চেয়েছেন মানব অস্তিত্বের মূলে। একই সঙ্গে কবিতার মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছে তার আত্মপরিচয়। 

অনেক কবিতা লিখেছে মানুষ পৃথিবীতে; অনেক কবিতা লেখা হয়েছে। বিস্তর কবিতা লিখে যাচ্ছে তারা প্রতিদিন, কার্যত যদিও সেসব নিজের বা অন্যের কবিতার পুনর্গঠন এবং অধিকাংশই হয়তো কাব্যগুণের কষ্টিপাথরে উতরে যেতে অক্ষম। তাদের বৃহদাংশ পুনরুৎপাদনে ক্লান্তিহীন পারদর্শিতা প্রদর্শন করে পরিতৃপ্ত। পুনর্জন্মের মধ্য দিয়ে অভিনব কবিতার সৃষ্টি হতে পারে। এ রকম আমরা হতে দেখেছি অনেক; কিন্তু সকলের হাতে তা সম্ভবপর হয় না। তবুও পুনর্জন্মই কবিতার নিয়তি – অভিন্ন বিষয়, অভিন্ন হৃদয়ানুভব, অভিন্ন কাঠামো – এরকম কবিতার মধ্য দিয়ে বাংলাভাষার – হতে পারে সকল ভাষাতেই – কবিতার স্থিতিস্থাপক ভুবন পরীকীর্ণ হয়ে উঠছে ক্রমান্বয়ে। ফলত নতুনত্ব নেই কোনো; চমৎকারিত্ব নেই আঙ্গিকে, চিন্তায়, দর্শনে, উপস্থাপনায়। অন্যদিকে জীবনানন্দের ‘সোমেশ্বর মুস্তফীর পৃথিবী’ এমন একটি কবিতা যার বোধ ও শৈলীর অভিনবত্ব আমাদের চমৎকৃত করে; পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দশটি দীর্ঘ কবিতার সঙ্গে এক পঙ্ক্তিতে সাজিয়ে রাখা যায়। এমতো মন্তব্য কারো কারো কাছে, বিশেষ করে কবিযশঃপ্রার্থীদের কাছে অতিশয়োক্তি গণ্য হতে পারে; বিশেষ করে তাঁদের কাছে যাঁরা পৃথিবীর ভালো কবিতাগুলো পড়ে ওঠার সময় করে উঠতে পারেননি, অথবা পারলেও একটি ভালো কবিতার কলকব্জা ঠাহর করে উঠতে পারেননি – ঠাহর করে ওঠা সহজ কর্ম নয় স্বীকার্য বটে। বিশেষ করে এলিয়ট, ইয়েটস, পাউন্ড বা জীবনানন্দ – যাঁদের কবিতায় অর্থনির্মলতার অভাব রয়েছে, আমাদের প্রবলভাবে আকৃষ্ট ও মুগ্ধ করেন – অথচ উপর্যুপরি পাঠেও তাঁদের কাব্যকৌশল সুনির্দিষ্টভাবে নিরূপণ করা সুসাধ্য নয়। 

জীবনানন্দের দীর্ঘ কবিতাসমূহের একটি সংকলনগ্রন্থ হতে পারে। তাতে থাকতে পারে ‘বোধ’, ‘সেই ছোটবেলাকার কথা মনে পড়ে’, ‘পুরোনো বই’এর দোকানে আমি’, ‘মনে হল শিশুরা আমার গল্প শুনেছে অনেক দিন’, ‘আট বছর আগের এক দিন’, ‘রুটি-বিক্রেতার ঘরে জন্মেছে যে’, ‘আজ’, ‘মাঝরাতে উঠিল সে বিছানার থেকে’, ‘পৃথিবী সহসা যেন উঠিল চকিত হয়ে’, ‘অনেক গম্ভীর মেঘে যখন আকাশ গেছে ভ’রে’, ‘যেইখানে সহসা প্রথম এক দিন’, ‘গোধূলির সীমানায়’, ‘এইখানে রয়ে গেছি’, ‘আমাদেরও প্রাণে কোনও দিকদর্শনের যন্ত্র রয়ে গেছে’, ‘এই ঘর অবিকল পারম্পর্য বুকে লয়ে’, ‘কোনও স্বর্গ – কোনও এক নরকের থেকে’, ‘মাঠের গল্প’, ‘পরস্পর’, ‘অবসরের গান’, ‘১৯৪৬-৪৭’ এবং ‘নিরীহ, ক্লান্ত ও মর্মান্বেষীদের গান’। হয়তো আরো  কয়েকটি।

দীর্ঘ কবিতাগুলোতে জীবনানন্দ তাঁর কব্জির জোর প্রমাণ করে ছেড়েছেন। তাঁর অনেক দীর্ঘ কবিতার মধ্যে আমরা প্রত্যক্ষ করি ছবির পর ছবি যেন কবির কাজ প্রত্যক্ষ করা এবং সেই দর্শনের বিবৃতি প্রস্তুত করা। জীবনানন্দ যা দেখেছেন তা পুনঃসৃজন করেছেন কবিতার অবয়বে। এই চিত্রসারি একটি অর্থবোধক পরিণতি লাভ করেছে। সেই পরিণতি স্বতঃস্পষ্ট নয় কখনো কখনো কেননা জীবনানন্দের চিন্তার মধ্যে রয়েছে উল্লম্ফন, যার পরিণতিতে যৌক্তিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়ে পাঠকের জন্য সৃষ্টি করে ধোঁয়াশা।

একটি দীর্ঘ কবিতার প্রথম স্তবক এরকম :

মনে হল শিশুরা আমার গল্প শুনেছে অনেক দিন

   তার পর বড় হয়ে এইবার তাহাদের আর কোনও ঋণ

                 আমার নিকটে আর নাই

কিংবা যদি থেকে থাকে আমি তাতে সবচেয়ে বেশি অবসাদ

                                                    বোধ করি

   অনেক সময় রেখে বিশেষ ফাজিল যেন হয়ে গেছে

                                                 মণিবন্ধে ঘড়ি

                              এবার নতুন মডেল কিছু চাই

কবিতার উপান্তে এসে আমরা পড়ি :

   ইহাদের বুকে যেই ব্যথা, নিষ্ফলতা, নিঃসঙ্গতা

খানিকটা হাতুড়ির ঘায়ে চেতনার তাড়নায় জানায়ে গিয়েছে

                                                     নিজ প্রথা

         এ দিকের সে দিকের পেরেকে পেরেকে

         যেন এসে ধোপানির বিছানায় শুয়ে থাকে বৃশ্চিক-

                                                  জননীর মত

পাশে শিশু – হে বীজ, অনাদি বীজ – কোটি বছরের

                                        বুড়ো হয়ে গিয়েছ তো

       বর্ষাক্ষান্ত বৈকালে এই বার পাখি দু’টো উড়ে গেল

                                           বিপরীত দিকে …

এরকম উল্লম্ফন সত্ত্বেও ভাবনার গাঁথুনিতে যে নিবিড় সংহতি রয়েছে তা পাঠককে খুঁজে বের করে নিতে হয়। এই সংহতি শূন্যতার সঙ্গে শূন্যতার সংহতি নয়। এই সংহতি উপমা উৎপেক্ষা বাক্-প্রতিমায় আচ্ছাদিত উপলব্ধির সঙ্গে উপলব্ধির সংহতি। কাফকার গদ্যে যেমন স্ট্রিম অফ কনশাসনেন্স প্রত্যক্ষ হয়, বলা চলে, জীবনানন্দের কবিতায় প্রত্যক্ষ হয় স্ট্রিম অফ পিকচারস। অধারাবাহিক দৃশ্যময়তার মধ্য থেকে ছন্দ, শব্দ এবং অসংখ্য উল্লেখের (রেফারেন্স) সমীকরণ মিলিয়ে নিয়ে অর্থের ঐক্যতান আবিষ্কার দুরূহ; কিন্তু একই সঙ্গে তীব্র সুখময় এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।