সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর অন্তহীন অন্বেষণ

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সৃজনশীল রচনার যে সম্ভাবনা ও বিকাশ দেখা যায়, মননশীল রচনার ক্ষেত্রে তা কিছুটা অনুপস্থিত। চিন্তাশীল রচনা তথা মননশীল সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় অনগ্রসর। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান বা স্প্যানিশ ভাষার সাহিত্য সৃজনশীলতা ও মননশীলতা উভয়ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ। এসব পাশ্চাত্য ভাষায় বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, সমাজতত্ত¡, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ে এমনসব বই ও প্রবন্ধ রচিত হয়েছে যা শুধু বিষয়বস্তুর গুণে নয়, রচনাশৈলীর গুণেও সাহিত্যপদবাচ্য। আমাদের প্রবন্ধসাহিত্য সেই স্তরে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এদেশে মৌলিক চিন্তাসম্পন্ন মননশীল সাহিত্যিক দুর্লভ। সেই দুর্লভ সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বহুমাত্রিক এক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর সাহিত্যচর্চার প্রধান ক্ষেত্র প্রবন্ধ। এর পাশাপাশি তিনি অনুবাদ করেছেন, গল্প-উপন্যাস রচনা করেছেন। একাধিক পত্র-পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। তাঁর সম্পাদনা-প্রতিভার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত। একজন সমাজ-সচেতন বুদ্ধিজীবী হিসেবেও তিনি সক্রিয়। বিভিন্ন অন্যায় ও অসংগতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন তিনি। একজন যথার্থ বুদ্ধিজীবীর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি সচেতন। শুধু অবগত নন, নিজে সেই বৈশিষ্ট্যের ধারকও। ‘গ্রাম্যতা, আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতা’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন –

যথার্থ বুদ্ধিজীবী সমস্ত বিষয়ের দিকে তাকাতে চাইবে, সংশয়কে তিনি জাগরূক রাখবেন মনে। কিন্তু সেই সংশয়েরও বিশেষ কোনো মূল্য নেই যা নাকি যুক্ত নয় সৃজনশীল কর্মের সঙ্গে, কর্মক্ষম বিশ্বাসের সঙ্গে। তাই বিশেষজ্ঞরা সংখ্যায় বাড়ছেন এটা কোনো সুখকর নয়; সুখবর নয় এ-খবরও যে সৃষ্টিবিমুখ বুদ্ধিজীবীরা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছেন। সকল বিষয়ে খবর রাখেন, বাইরের আলো-হাওয়াকে নিজের এলাকাতে অবাধে প্রবেশ করতে দেন এমন বিজ্ঞানী চাই, চাই কর্মনিয়োজিত সংশয়। বিশ্বাস প্রয়োজন, কিন্তু সেই সঙ্গে সমস্যা বিশ্বাসের অভ্যন্তরে সংশয়কে সজাগ রাখা। কেননা সংশয়েতেই পেয়েছে বিশ্বাসের প্রকৃত শক্তি।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাহিত্যের ছাত্র। তবে তাঁর মননচর্চার ক্ষেত্র সাহিত্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, দর্শন, সংস্কৃতি এমনকি অর্থনীতি পর্যন্ত তাঁর কৌতূহল বিস্তৃত। লেখকজীবনের শুরু থেকেই সাম্যবাদী জীবনদর্শনের প্রতি তাঁর আনুগত্য। এই দর্শন থেকেই তিনি সমাজদেহের বিভিন্ন রোগের অনুসন্ধান করেন। রোগের কারণ হিসেবে প্রায়ই তিনি শনাক্ত করেন পুঁজিবাদকে। রোগ নিরাময়ের পদ্ধতি নিয়ে নানা মত থাকতে পারে; কিন্তু রোগ নির্ণয়ে যে তিনি সফল, এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বিশ্বাস করেন আন্তর্জাতিকতায়। তিনি জানেন যে, বিশ্বায়নের নামে সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার অবসান চান তিনি। তিনি মনে করেন, মানুষের যথার্থ মুক্তির জন্য
এ-ব্যবস্থাটিকে উৎপাটিত করতে হবে। তিনি শ্রেণিসচেতন লেখক। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিনি বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া, শেক্সপিয়র, টলস্টয়, ইবসেনকে মূল্যায়ন করেন। মহাত্মা গান্ধী, নেহেরু, সুভাষচন্দ্র বসু, অরবিন্দ ঘোষ, চিত্তরঞ্জন দাস, মওলানা ভাসানীসহ বিভিন্ন রাজনীতিবিদ সম্পর্কেও তিনি আলোচনা করেছেন। তাঁদের কৃতিত্বের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। উদারনীতির সীমা সম্পর্কে তিনি সচেতন। যে-কোনো মনীষীর মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তিনি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার মানদণ্ড ব্যবহার করেছেন। এতে কখনো কখনো আলোচ্য মনীষী অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছেন বলে কেউ কেউ মনে করেছেন। ফলে মাঝে মাঝে তাঁর বক্তব্য একপেশে হয়ে উঠেছে – এমন অভিযোগও আছে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর গদ্যশৈলীর অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে যোগাযোগ নিবিড়তা। তাঁর গদ্য সহজেই পাঠককে আকর্ষণ করে। যেন লেখকের সঙ্গে পাঠক আলাপ করছেন। ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক তিনি। তাঁর লেখা বা মৌখিক ভাষায় ইংরেজি শব্দের ব্যবহার প্রায় অনুপস্থিত। প্রচলিত তৎসম শব্দ এবং সংস্কৃত প্রত্যয় বা ধাতুজাত শব্দ তিনি এড়িয়ে চলেন। সহজ, সাবলীল ও স্বচ্ছন্দ গতিতে এগিয়ে চলে তাঁর ভাষা। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় ক্ষুরধার যুক্তিনিষ্ঠা। ভাষার দ্যুতিতে, বিশ্লেষণের গভীরতায় ও যুক্তির দৃঢ়তায় তাঁর বক্তব্য সহজেই লক্ষ্য ভেদ করে। একটি স্বতন্ত্র ও উজ্জ্বল গদ্যভাষার অধিকারী তিনি। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর গদ্য সম্পর্কে হরিপদ দত্তের মূল্যায়ন যথার্থ –

কখনও গল্পের প্রতীকী ব্যঞ্জনায় কিংবা কখনও কবিতার শব্দ ও দ্বন্দ্বের অনিবার্য বিন্যাসে সমাজের স্বপ্ন ও আগামীর কল্পনার রূপকে নিজের করে নিয়ে তিনি পাঠকের সামনে তুলে ধরেন। তার রচনায় উত্তম পুরুষ রীতিতে বলা গদ্য এবং ‘সর্বজ্ঞ লেখকের দৃষ্টিকোণ’ থেকে বলা গদ্যগুলো পাঠ করলে বোঝা যায়, গদ্যরীতিটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের জন্যই উপযুক্ত। তাই মনোযোগী এবং কৌতূহলী পাঠক ভুলে যান তিনি গদ্য কবিতা নাকি গল্প অথবা প্রবন্ধ পাঠ করছেন। প্রবন্ধের গঠনরীতিটি যে মন্ময় বা তন্ময় উপবিভাগ রয়েছে, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর গদ্যের ভিতর তা মিলেমিশে একাকার হয়ে সম্পূর্ণ আলাদা রীতিতে পরিণত হয়। সেই গদ্যরীতিটিই তার নিজস্ব কণ্ঠস্বর। তার এই গদ্যশৈলীর পেছনে কাজ করে নিজস্ব গভীর শ্রেণীজ্ঞান বা শ্রেণী চেতনা। সেই জ্ঞানে ঋদ্ধ বলেই তিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে উঠে আসা পাঠক শ্রেণী এবং সাধারণ মানুষের বোধ বা অনুভবের ভাষাকে বুঝতে পারেন। ঠিক এমন জনগণের অনুভবের ভাষাকে বুঝতে পারতেন দুই বিপরীত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমান। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সে কারণেই কুমুকে বুঝতে পারতেন, তার ভাষাকেও বুঝতে পারতেন এবং নির্দেশ করতে সক্ষম হয়েছেন, কোথায় কুমুর বন্ধন। মোটকথা শ্রেণীটা যত সত্য, ঠিক ততটাই জরুরি সেই শ্রেণী বিশ্লেষণের জন্য উপযুক্ত গদ্যরীতি। তাঁর গদ্য পাঠ করলে বুঝতে কঠিন হয় না যে, কেবল বিষয় ভাবনায়ই নয়, গদ্যের শিল্পরীতির সঙ্গে ক্রমাগত দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে প্রচলিত গদ্যের রূপান্তর ঘটিয়ে নিজের কৌশলটি আত্মস্থ করেছেন লেখক শ্রমে ও মেধায়।

স্বতন্ত্র ভাষাশৈলীর কারণে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখা সহজেই চেনা যায়। গুরগম্ভীর, গুরুত্বপূর্ণ কিংবা জটিল কোনো বিষয়ের অবতারণা করেন গল্পের ভঙ্গিতে। বলার ভঙ্গি একই সঙ্গে সরল ও সরস। এমনকি শিরোনাম কখনো কখনো কাব্যিক ব্যঞ্জনামণ্ডিত। তাঁর কয়েকটি প্রবন্ধের শিরোনাম উদাহরণ হিসেবে উল্লিখিত হতে পারে – ‘নোরা তুমি যাবে কোথায়’, ‘উন্মুক্ত পথের স্বচ্ছন্দ যাত্রী’, ‘অবনতের আত্মোন্নতি’, ‘বেকনের মৌমাছিরা’, ‘দুই বাঙালীর লাহোর যাত্রা’, ‘স্বাধীনতার স্পৃহা, সাম্যের ভয়’, ‘কুমুর বন্ধন’, ‘শিরোধার্য যত, হৃদয়গ্রাহ্য ততোধিক’ প্রভৃতি।

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী জীবনদর্শনে আস্থাবান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বরাবরই সাহিত্যচর্চায় দার্শনিক গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর সমস্ত রচনার দিকে তাকালে এ-বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর সৃষ্টিশীল জীবন ও সামাজিক কর্মতৎপরতা এ-সাক্ষ্য দেয়। ‘দার্শনিক দারিদ্র্য’ প্রবন্ধ থেকে নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি তাঁর মানসপ্রবণতা বুঝতে বিশেষ সহায়ক –

দর্শন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। অত্যন্ত বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কেননা দর্শন সমাধান দেবে সমস্যার। দর্শন যেখানে নেই সেখানে সত্যকে সত্য হিসাবে দেখাও নেই। কিন্তু যে-দর্শন অবৈজ্ঞানিক ও অবাস্তব সে শুধু অস্বচ্ছ করে দৃষ্টিকে, ঢেকে রাখে সত্যকে। এবং অন্যদিকে অবজ্ঞা জন্মায় দর্শনের প্রতি। তত্তে¡ তখন অশ্রদ্ধা জাগে লোকের, পরিসংখ্যান তখন তত্তে¡র স্থান দখল করে নেয়। ফলে স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে না, প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রশ্রয় পায় ভীষণভাবে।

দর্শনের অপরিহার্যতাকে স্বীকার করেন বলেই সিরাজুল  ইসলাম চৌধুরী ‘সাহিত্যের দর্শনানুসন্ধান’ করেছেন। তিনি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন সাহিত্যকে বাদ দিয়ে দর্শন চলতে পারে, কিন্তু দর্শনকে বাদ দিয়ে সাহিত্য চলতে পারে না। বিশ্বসাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের বড় লেখকেরা তাঁদের সাহিত্যে দার্শনিক চেতনার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে দার্শনিকতা তথা মননশীলতার কোনো শক্তিশালী ঐতিহ্য গড়ে ওঠেনি। তিনি মনে করেন, আমাদের সাহিত্যের আরো একটি অপূর্ণতা হচ্ছে রাষ্ট্রবিরোধী হতে না পারা। সাহিত্য মানুষের ভেতরে সংবেদনশীল সত্তাকে জাগিয়ে রাখে। তাই সাহিত্য শ্রেণিবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী। বিশ্বসাহিত্যের তুলনায় বাংলা সাহিত্যে রাষ্ট্রবিরোধিতার পরিচয় যৎসামান্য। ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের পেছনে সাহিত্যের যেমন বড় ভূমিকা ছিল, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সাহিত্য তেমন বড় ভূমিকা পালন করেনি। রাষ্ট্রের সঙ্গে সাহিত্যের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক স্পষ্ট করতে না পারা সাহিত্যের একটি দুর্বলতা। ‘সাহিত্যে রাষ্ট্রবিরোধিতা’ প্রবন্ধে তিনি অভিযোগ করেছেন –

সাতচল্লিশের পরে আমাদের সাহিত্য ছিল কবিতা প্রধান। আমাদের প্রধান কবিরা রাষ্ট্রের মহিমাকীর্তন করে অনেক কবিতা ও গান লিখেছেন। সে ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে কোনো গøানি দেখা যায়নি। ফরাসি কিংবা রুশ বিপ্লবের পিছনে যেমন সাহিত্যের একটা ভূমিকা ছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পশ্চাৎভূমিতে তেমন কোনও সাহিত্যিক ঘটনা ঘটেনি। রাষ্ট্রের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের ব্যাপারটিকে গভীর ও প্রবল করতে না পারাটা সাহিত্যের জন্য অবশ্যই একটা দুর্বলতা। সে দুর্বলতা সেদিন ছিল; আজও রয়েছে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সাহিত্যকে সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় মনে করেন না। তাঁর সাহিত্যবিষয়ক সব প্রবন্ধে সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রের প্রসঙ্গ এসেছে অনিবার্যভাবে। সাহিত্য শুধু নন্দনতাত্ত্বিক বিষয় নয়, মানবিক বিষয়ও। সাহিত্যের সৌন্দর্যে সমাজতত্ত্বের উপস্থিতি সহজাত। উপন্যাসের জন্ম সাম্রাজ্যবাদের বিপর্যয় ও পুঁজিবাদের উত্থানের অংশ হিসেবে। উপন্যাস একইসঙ্গে বুর্জোয়া রূপকল্প এবং পুঁজিবাদবিরোধী। ‘উপন্যাসের উদ্ভব ও প্রকৃতি’ প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন –

উপন্যাস একটি বুর্জোয়া রূপকল্প, কিন্তু তার আকাক্সক্ষাটা সমাজতান্ত্রিক। সে ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাস করে ঠিকই, কিন্তু সেখানে থেমে থাকে না, ব্যক্তিকে নিয়ে যেতে চায় সে ব্যক্তির কাছে, মুনাফা ও মুদ্রার বাধা ভেঙে ফেলে। তার ডাক মিলনের ডাক। ডাক সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির। সে-জন্যই সে জরুরি।

পুঁজিবাদ তথা রাষ্ট্রবিরোধিতার অবস্থান থেকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর অধিকাংশ প্রবন্ধ লিখিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধগুলো সংকলিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি বইয়ে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে রাষ্ট্র নয়, সমাজই প্রধান – একথা রবীন্দ্রনাথ একাধিকবার বলেছেন। স্বৈরতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর বিভিন্ন সৃষ্টি যেমন উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধে তিনি সারগর্ভ মতামত উপস্থাপন করেছেন। ‘কুমুর বন্ধন’ প্রবন্ধটি সম্ভবত
এ-উপন্যাসটি সম্পর্কে আমাদের সাহিত্যে দীর্ঘতম আলোচনা। সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন, শিক্ষা, রুচি ও সাংস্কৃতিক মানদণ্ড কুমু যোগ্য হলেও সে পরাভূত হয় ভ্রাতা বিপ্রদাস ও স্বামী মধুসূদনের প্রবলতার কাছে। রবীন্দ্রনাথের এ-নায়িকাকে সমাজ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বন্দি করেছে। সামনাসামনি শুধু বন্দিনী নয়, সামাজিক সংস্কারের হাতেও বন্দিনী। প্রবলের কাছে দুর্বলের নিপীড়িত হওয়ার প্রতীক কুমু। গোরা উপন্যাস সম্পর্কে লেখকের ভাবনা চিন্তা-উদ্দীপক। রবীন্দ্রনাথের নাটকে মুক্তির আকাক্সক্ষা ও বন্ধনের সত্য অসাধারণ নৈপুণ্যে বিশ্লেষণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সামগ্রিক মূল্যায়ন পাওয়া যায় ‘রাষ্ট্র ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধ থেকে –

একটি নয়, রবীন্দ্রনাথ দু-দুটি রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত লিখে দিয়েছেন। অথচ গভীরতর অর্থে রবীন্দ্রনাথ রাষ্ট্রদ্রোহী ছিলেন। প্রকাশ্যে বিদ্রোহী ছিলেন না, যেমন ছিলেন নজরুল; কিন্তু গভীরে অবশ্যই বিদ্রোহী ছিলেন। সেই রাষ্ট্রকে তিনি মানেন নি, যে-রাষ্ট্র স্বৈরাচারী। বিশেষভাবে সাক্ষী তাঁর নাটকগুলো; ‘তাসের দেশ’ ও ‘রক্তকরবী’, ‘অচলায়তন’ ও ‘মুক্তধারা’। শুধু রাষ্ট্রে নয়, স্বৈরাচার সমাজেও ছিল, তার বিরুদ্ধেও ধিক্কার ছিল রবীন্দ্রনাথের। যেমন তাঁর ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে, যেখানে রজনীগন্ধার সেই ঝাড়টিকে, কুমু’কে করতলগত করেছে ব্যবসায়ী পুঁজির সফলসাধক, নতুন কালের নতুন রাক্ষস, রোমশ শ্রী মধুসূদন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত রাক্ষসদের মধ্যে মানুষের সন্ধান পেয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ রাক্ষসদের মধ্যে মনুষ্যত্ব যে দেখেন নি তা নয়, কিন্তু তারা যে অপরের স্বাধীনতা নাশের ক্ষেত্রে ভয়াবহ রকমের রাক্ষস হতে পারে এই সত্যটিকে না দেখে পারেন নি।

শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, অন্যান্য বাঙালি মনীষীর অবদান পর্যালোচনার সময়ও রাষ্ট্রবিরোধিতার মানদণ্ড ব্যবহার করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ‘বিদ্যাসাগরের কাজ’ প্রবন্ধে বিদ্যাসাগরের বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। বিদ্যাসাগর যে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেছেন অনেক সময় বিস্মৃত হই  আমরা। বাংলা গদ্য, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি। ‘দয়ার সাগর’ হিসেবে তিনি সমগ্র বাঙালি সমাজে দেদীপ্যমান। স্বাধীনচেতা চারিত্রিক দূঢ়তা তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লেখক মনে করেন, বাংলা লিখে ও বাংলা গদ্যকে আধুনিক করে বিদ্যাসাগর রাষ্ট্রদ্রোহিতার অবস্থানে দাঁড় করিয়েছিলেন নিজেকে। একটি অগ্রসর বাংলা সাহিত্য তৈরির জন্য তিনি আমৃত্যু লড়াই করেছেন। ইংরেজদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রত্যাখ্যান করে তিনি বিকল্প সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরি করতে চেয়েছেন। লেখকের ভাষায় –

রাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের বিরোধ ছিল এবং ছিল বলেই তিনি বিদ্যাসাগর হয়েছিলেন। আত্মসমর্পণ করলে হতেন না। আত্মসমর্পণকারীরা এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পর্যন্ত হয়েছেন, কিন্তু কেউই বিদ্যাসাগর হন নি। ওই সময়েই, ওই কলকাতা শহরেই, সংস্কৃত কলেজের একেবারে সংলগ্ন হিন্দু কলেজ থেকে একদল বিদ্রোহী বের হয়ে এসেছিলেন এটা সত্য। এঁরা সামন্তবাদকে মানেননি।

প্রথার বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিপক্ষে এঁরা দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু এই বিদ্রোহীরা, ইতিহাসের সেই ‘ইয়ং বেঙ্গলরা’ রাষ্ট্রদ্রোহী ছিলেন না। সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তাঁদের কোনো বিরোধ ছিল না। বিরোধ যা ছিল সামন্তবাদের সঙ্গেই। মাইকেল মধুসূদন দত্ত খৃষ্টান ও প্রায় ইংরেজ হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি অসামান্য শিল্পী ছিলেন একজন, যে জন্য ফিরে এসেছেন দেশে, নিজের সংস্কৃতিতে তাঁর ভেতরকার মধুসূদনই সত্য হয়ে উঠেছে মাইকেলটিকে জব্দ করে। বিদ্যাসাগর ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ, তিনি পুরোপুরি ঈশ্বরচন্দ্র, সামন্তবাদের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্বটা ছিল স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ, কিন্তু দ্বন্দ্ব ছিল ইংরেজ শাসনের সঙ্গেও, যদিও সে-দ্বন্দ্বকে আমরা গুরুত্ব দিই না।

সাহিত্যের চরিত্র-আলোচনায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বরাবরই প্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনেন সমাজ ও রাজনীতিকে। শুধু বাংলা সাহিত্যের নয়, বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এ-উদাহরণ দেওয়া যায়। এক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ পক্ষপাত রয়েছে নারী চরিত্রের প্রতি। ‘শেকস্‌পিয়রের মেয়েরা’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ। সাহিত্যের নায়িকা চরিত্র নিয়ে এ-ধরনের বিশ্লেষণ নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। ‘নোরা, তুমি  যাবে কোথায়’ প্রবন্ধে ইবসেনের নোরার সঙ্গে তিনি তুলনা করেন বঙ্কিমচন্দ্রের সূর্য্যমুখী, রবীন্দ্রনাথের কুমু ও মৃণালের। দুই ভিন্ন পরিবেশ ও সংস্কৃতির নারীর মধ্যে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করেন তিনি। ইউরোপীয় রেনেসাঁসের ফলে ঈশ^রের স্থানে মানুষ অধিষ্ঠিত হয় মূল্যবোধের কেন্দ্রে। বুর্জোয়া বিকাশ ঘটে ইউরোপে, ব্যক্তিস্বাধীনতা আকর্ষণ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। নোরা সেই বোধেরই প্রতিনিধি। তার জগৎ মানুষকেন্দ্রিক, ঈশ্বরকেন্দ্রিক নয়। এই ইহজাগতিক পৃথিবীতে নারী যে পুতুল হয়ে রয়েছে এ-সত্য ধরা পড়ে যায় নোরার কাছে। স্বামীর ঘর ছেড়ে সে বেরিয়ে যায় গভীর রাতে। কিন্তু গৃহত্যাগ তাকে মুক্তি দেয় না। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ভাষ্য –

নোরার মূল শত্রæ পুঁজিবাদ। নোরা যে সামাজিক উৎপাদনে সামাজিকভাবে অংশগ্রহণ করে জীবনের চরিতার্থতা খুঁজে পাবে, সে যে মানবিক প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তুলবে অন্যদের সঙ্গে সেটা হবার জো নেই। স্বামী-স্ত্রীতেই যেখানে সম্পর্ক টেকে না সেখানে অন্য সম্পর্ক টিকবে বলে ভরসা কি? নোরার সমস্যার সমাধান পুঁজিবাদে নেই, আছে অন্যত্র, আছে সমাজতন্ত্রে। একশো বছর কেটে গেছে পুঁজিবাদী সমাজের, নোরারা মুক্তি পায় নি।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর অন্বেষণের অন্যতম ক্ষেত্র সংস্কৃতি। এ-বিষয়ে নানা সময়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন। সংস্কৃতি ও স্বাধীনতাকে তিনি পরিপূরক মনে করেন। সংস্কৃতির বিকাশ ও পরাধীনতা পরস্পরবিরোধী। সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য যে মূল্যবোধ ও আত্মপ্রকাশ প্রয়োজন তা স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতা ছাড়া অর্জন সম্ভব নয়। সংস্কৃতিসেবীদের মনে স্বাধীনতার অনুপস্থিতি সংকট বৃদ্ধি করে। দারিদ্র্য নিঃসন্দেহে এদেশের বড় সমস্যা। কিন্তু দৈন্য শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, চিন্তার ক্ষেত্রেও। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি তথা আদর্শ সংস্কৃতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। ‘সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন – ‘সমস্যাটা সাংস্কৃতিক, অর্থাৎ সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির ও যথার্থ বক্তব্যের। শিক্ষার সমস্যা নয়। কেননা শিক্ষিত মানুষেরা সংস্কৃতিবান হবেন এমন কোন কথা নেই। শিক্ষিত হয়ে ভিক্ষুকের মানসিকতা অর্জন করেন এমন দৃষ্টান্তই লভ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে। প্রশ্নটা সাংস্কৃতিক মাধ্যমগুলোকে উন্নত করারও নয়, মূল প্রশ্ন সাংস্কৃতিক চেতনাকে উন্নত করার, তীক্ষ্ন করার, উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার। কোনো একটা বিশেষ শ্রেণি বা গোষ্ঠীর নয়, গোটা দেশের সাংস্কৃতিক চেতনার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন চাই। আজ বক্তব্য চাই সামাজিক, তার চেয়েও বেশিই চাই সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি।’

সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বরাবরই নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করেছে। সম্প্রতি কবি জুননু রাইনকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে (যুগান্তর, ১৫ই নভেম্বর) সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সাহিত্য মধ্যবিত্তের দ্বারা, মধ্যবিত্তকে নিয়ে এবং মধ্যবিত্তের জন্য রচিত।’ সমষ্টিগত জীবনকে যথার্থভাবে ধারণ করতে না পারা সাহিত্যের ব্যর্থতা। এর মূলে রয়েছে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকট। এ-সংকটের কারণে সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। মধ্যবিত্তের গণ্ডি থেকে সাহিত্যকে বের করে আনার গুরুত্ব সম্পর্কে ‘মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন –

সাহিত্যের মাধ্যমে যদি মধ্যবিত্তের মানসবিলাস, উগ্র নগরচেতনা, নকল আধুনিকতা, বিষয়বস্তুর চেয়ে আঙ্গিককে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার অভিরুচি – ইত্যাকার বিষয়কে দেশময় ছড়িয়ে দেওয়া হয় তাহলে সেই সংক্রামক ব্যাধিতে কোন মঙ্গল সূচিত হবে এমন বিবেচনা করা কঠিন। আসলে মধ্যবিত্ত সাহিত্যের বিস্তার মানে মধ্যবিত্ত চেতনারই বিস্তার, নব্য শিক্ষিতের অবরোধ দশাটা যাতে আরো পাকাপোক্ত হয় তারই ব্যবস্থা গ্রহণ। পাকিস্তানের আমলে দেখা গেছে সাহিত্যের ঐতিহ্য নিয়ে বিস্তর বিতণ্ডা হয়েছে এবং ঐতিহ্য দেশে খুঁজে না পাওয়া গেলে বিদেশেও তার খোঁজাখুঁজি চলছে। এ কাজটার পেছনে শুধু যে শাসকের প্ররোচনা ছিল তা নয়, সেই সঙ্গে সক্রিয় ছিল মধ্যবিত্তের অভিমান ও অহমিকা। তার অতীত থাক বা না থাক, অতীত নিয়ে গর্ব থাকা চাই। কিন্তু আপত্তি এইখানে যে, আমরা আমাদের মধ্যবিত্ত অভিমান ও অহমিকার বোঝা দেশের মানুষের দুর্বল ও নিরপরাধ কাঁধের উপর চাপিয়ে দিতে চাইছি। সাহিত্যকেও তাই মধ্যবিত্ত গণ্ডির বাইরে আনা অত্যন্ত আবশ্যক।

পুঁজিবাদের প্রতি অনাস্থা এবং সমাজতন্ত্রে গভীর আস্থাই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মূল কথা। শুধু নোরার ক্ষেত্রে নয়, মানুষ মাত্রেরই মুক্তির বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে তিনি গণ্য করেন পুঁজিবাদকে। সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কিত প্রবন্ধে এ-মতামতই বারবার ব্যক্ত করেছেন। শুধু জাতীয় জীবনে নয়, বৈশ্বিক পরিসরেও মানুষের বিকাশের পথে অন্তরায় পুঁজিবাদ। ‘বাঙালীকে কে বাঁচাবে’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন –

বাংলা ভাষা ও বাঙালীর বর্তমান দুর্দশার কারণ এক ও অভিন্ন। সে হচ্ছে পুঁজিবাদ। বাংলাদেশে পাকিস্তানী শাসকদের বন্ধন ছিন্ন করেছে ঠিকই, কিন্তু পুঁজিবাদের শাসন ছিন্ন করতে পারেনি। ওই বন্ধন দৃঢ়তর হয়েছে। পুঁজিবাদ অর্থনৈতিকভাবে আমাদের স্বাধীন হতে দিচ্ছে না। আর সেই পরাধীনতা সর্বক্ষেত্রেই প্রতিফলিত, ভাষার ব্যবহারে তার ছাপ অত্যন্ত স্পষ্ট। পুঁজিবাদই আমাদের অবাঙালী করছে। শিক্ষিতদেরকে বাংলা ভুলিয়ে ছাড়ছে, অশিক্ষিতদের বাংলা শিখতে দিচ্ছে না। বাংলাদেশে এখন ধনীরা বাংলা ব্যবহার করে না, গরিবেরা ব্যবহার করতে পারে না, বাংলা আছে শুধু উপায়হীন মধ্যবিত্তের জীবনে, যে মধ্যবিত্ত সর্বক্ষণ ধনী হবার স্বপ্ন দেখে এবং ধনী হতে না পেরে গøানিতে ভোগে। বাংলা বুঝি ব্যর্থ মানুষদের ভাষা।

জনগণের মুক্তির জন্য রাজনীতি ও সংগঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বিভিন্ন প্রবন্ধে বলেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এর পাশাপাশি বলেছেন ঐক্যের কথা। ঐক্য গড়ে ওঠার প্রবল প্রতিপক্ষ শ্রেণি ব্যবধান। ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য ও দ্ব›দ্ব বিদ্যমান – এই সত্যকে অস্বীকার করার পরিণতি ভয়ংকর হতে পারে। বাঙালি জাতিকে সতর্ক করে ‘দ্বি-জাতিতত্তে¡র সত্যমিথ্যা’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন –

হিন্দু-মুসলমান ব্যবধানকে ভারতীয় কংগ্রেস অস্বীকার করতে চেয়েছিল, তাতে ফল হয়েছে বিপরীত, সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাকে ব্যবহার করে মুসলিম লীগ দ্রুত শক্তি বৃদ্ধি করে অতি নাটকীয়ভাবে ভেঙে দিয়েছে ভারতবর্ষকে। ঠিক তেমনিভাবে বাঙালী-অবাঙালী ব্যবধানকে অস্বীকার করতে চেয়েছিল মুসলিম লীগ, পারেনি, যত বলছে বিরোধ নেই, ততই প্রবল হয়েছে বিরোধ এবং পাকিস্তান ভেঙে গেছে। আর স্বাধীন বাংলাদেশেও আমরা খুব বড় রকমের ভুল করব যদি ভান করি যে, ধনী-দরিদ্রের দ্বন্দ্ব নেই। পরিণতি ভয়ংকর হবে।

রাজনীতির মতো নিরস বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতে গিয়েও তাঁর সাবলীলতা ও সরসতা মুগ্ধ করে। ছাব্বিশ বছরের ব্যবধানে দুই নেতা লাহোরে গিয়েছিলেন। ১৯৪০ সালে এ কে ফজলুল হক পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। ফজলুল হকের প্রস্তাব সম্পর্ক তাঁর মূল্যায়ন -হক সাহেবের প্রস্তাবটি তাঁর নিজের ছিল না। ধারণা নয়, ভাষাও নয়; সবই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর; মঞ্চে ওঠার আগে প্রস্তাবটি হক সাহেব দেখেনওনি, তিনি তৈরী প্রস্তাব পড়ে দিয়েছিলেন শুধু। বলা তাই সম্ভব যে, তিনি ওটি উত্থাপন করেন নি, তাঁকে দিয়ে উত্থাপন করিয়ে নেয়া হয়েছে। কণ্ঠ তাঁর, স্বর অন্যের।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সারস্বত জীবন সাধনার অন্যতম লক্ষ্য সামাজিক পরিবর্তন। এই আকাক্সক্ষা তাঁর প্রত্যেক প্রবন্ধেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি আধুনিকতার মূল্যায়ন করেছেন। আধুনিক শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত হয়েও অনেকে চিন্তা-চেতনায় প্রতিক্রিয়াশীল থেকে যান। চিকিৎসক, প্রকৌশলী থেকে শুরু করে এমন পেশাজীবী বহু পাওয়া যায় যারা ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারের ধারক। বিজ্ঞান পড়লেই বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া যায় না। কিন্তু প্রগতির অভিমুখ বরাবরই সামনের দিকে। তিনি বিশ্বাস করেন, আধুনিকতার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রগতিশীলতা। আধুনিকতার মধ্যে প্রতিক্রিয়াশীলতার উপাদান থাকতে পারে। অন্যদিকে প্রগতিশীলতার প্রকৃত ভিত্তি ও যথার্থ লক্ষণ সামাজিক পরিবর্তন। পুরনো সামাজিক সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার ভ‚মিকাই প্রগতিশীলতার প্রধান কাজ। আধুনিকতা এই দায়িত্ব থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারে। এর ফলে আধুনিকতা ক্ষতিকর হতে পারে আমাদের পক্ষে – নিশ্চল ও স্থূল গ্রাম্যতার মতোই, হয়তো তার চেয়ে বেশিই। আধুনিকতার ছদ্মবেশে প্রতিক্রিয়াশীলতা গ্রাস করতে পারে সমাজকে। তিনি মনে করেন, গ্রাম্যতাকে গ্রাম্যতা বলে চিনে নেওয়া যত সহজ, ঠিক ততটাই কঠিন আধুনিকতাকে আলাদা করে নেওয়া প্রগতিশীলতা থেকে, অথবা চিনে নেওয়া তার অন্তর্গত প্রতিক্রিয়াশীলতাকে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাহিত্যচর্চার উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে জাতীয়তাবাদ। ‘জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন’, ‘জাতীয়তাবাদের স্বভাব-চরিত্র’ এ-বিষয়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ। রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে তাঁর আলোচিত বই বাঙালীর জাতীয়তাবাদ এবং জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি। বাঙালীর জাতীয়তাবাদ বইয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দেখিয়েছেন জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম সমার্থক নয়। তাত্ত্বিকভাবে জাতীয়তাবাদ বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। সাম্প্রদায়িকতা ও শ্রেণি বিভাজন কীভাবে বাঙালির মধ্যে অনৈক্যের জন্ম দিয়েছিল তার বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করেছেন তিনি। ভাষাই ছিল বাঙালির জন্য ঐক্যের ভিত্তি। অর্থনীতি বাঙালিকে এক করতে পারেনি, বিভক্ত করেছে পরস্পরবিরোধী শ্রেণিতে। এর পরিণতিতেই রাজনৈতিক বিভক্তি ঘটে। এই ভূখণ্ডে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে ইংরেজ আগমনের পর থেকে। এখান থেকেই বইয়ের বিষয়বস্তুর সূত্রপাত, সমাপ্তি ঘটেছে বিংশ শতাব্দীর বিশেষ লগ্নের ঘটনাপ্রবাহে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত এ-বইয়ের বিশেষ আলোচ্য বিষয় ধর্মনিরপেক্ষতা। ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। এই শব্দটিকে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকরা কখনো যথার্থ অর্থে প্রয়োগ করতে পারেননি, এমনকি বাংলাদেশের বিদ্বৎসমাজেও এই প্রসঙ্গে নির্মোহ বিশ্লেষণ হয়নি। এই বইয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মাত্র কয়েকটি বাক্যে ধর্মনিরপেক্ষতার মর্ম উদ্‌ঘাটন করেছেন –

ধর্মনিরপেক্ষতা নাস্তিকতা নয়, আবার সমান ধর্মের সমমর্যাদা কিম্বা সমন্বয়ও নয়, এমনকি অসাম্প্রদায়িকতাও নয়, যদিও অসাম্প্রদায়িকতা এর একটা বৈশিষ্ট্য বটে। ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে ধর্মের বিরাষ্ট্রীয়করণ, অর্থাৎ ব্যক্তিগতকরণ। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার, এতে রাষ্ট্রের মাথাব্যথা নেই, কৌত‚হলও নেই, এটাই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রথম কথা। ধর্মনিরপেক্ষতার দু’টি দিক, একদিকে সে অনুশীলন, অন্যদিকে দার্শনিক প্রত্যয়। দু’ভাবেই সে জরুরি যেমন অনুশীলনে তেমনি প্রত্যয়ে। তাছাড়া ওই দুই দিক পরস্পরের পরিপূরকও বটে। একদিক অসম্পূর্ণ অন্যদিককে সঙ্গে না-পেলে।

ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলেই যে গণতন্ত্র থাকবে এমন নিশ্চয়তা কেউ দেবেন না, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা ভিন্ন যে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা অসম্ভব এটা নিশ্চিত সত্য। সে হলো গিয়ে প্রথম শর্ত। গণতন্ত্র যেমন, ধর্মনিরপেক্ষতাও তেমনি, সামন্তবাদবিরোধী এবং ইহজগৎ-সচেতন। উভয়েই বিশ্বাস করে মানুষের সঙ্গে মানুষের সমতায়, এবং সেই সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চেষ্টা করে সম্প্রদায় ও শ্রেণীকে অতিক্রম করে যেতে।

জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি বইটি লেখকের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফসল। ১৯০৫-১৯৪৭ কালপর্বকে ধারণ করে লিখিত হয়েছে এ-বই। এটি কোনো প্রথাগত ইতিহাসের বই নয়, ঘটনার বিবরণ মাত্র নয়। এক নির্মোহ  অনুসন্ধানী দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন চার দশকের উত্তাল সময়কে। এ-সময়ের নায়ক, খলনায়কদের সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান তুলে ধরেছেন তাঁর সহজাত সাবলীল ভাষায়। বিংশ শতাব্দীর এই ঘটনাবহুল পর্বে সমাজ ও রাজনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক ছিল সাম্প্রদায়িকতা। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অনৈক্য ও বিদ্বেষ সাম্প্রদায়িকতার পথকে সুগম করে। সমাজদেহের এই দুষ্টক্ষতকে অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে চিহ্নিত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কালান্তর বইটি এর উজ্জ্বল প্রমাণ। রবীন্দ্রনাথের এই ভূমিকাকে স্মরণ করেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি লিখেছেন –

ধর্ম যখন বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে তখন বিপত্তি বাধে অগ্রগতির; তার চেয়েও বড় বিপদ ঘটে ধর্ম যখন রাজনীতির সঙ্গে মিশে যায়, কেননা তখন দেখা দেয় সাম্প্রদায়িকতা – এই দুই সত্যের বিবরণ রবীন্দ্রনাথের চেয়ে সুন্দরভাবে আর কেই বা দিতে পারবেন? তাঁর কল্পনাশক্তির অসাধারণত্ব তো ছিলই, সেইসঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রত্যক্ষ বাস্তব অভিজ্ঞতা। ১৯২১ সালে লেখা ‘সমস্যা’ নামের প্রবন্ধে বুদ্ধির রাজ্যে যে অবুদ্ধির উৎপাত মানুষের সঙ্গে মানুষের সত্যমিলনের পথে প্রতিবন্ধক হিসাবে কাজ করেছে তার কথা বলেছেন। এই অবুদ্ধি হচ্ছে ধর্ম।

এই বইয়ের নানা পরিচ্ছেদে জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন তিনি। জাতীয়তাবাদী নেতাদের মধ্যে স্বাধীনতার স্পৃহা ছিল, কিন্তু তাঁদের ভয় ছিল সাম্যের। জাতীয়তাবাদ বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িকতার রূপ পরিগ্রহ করেছে। জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আধিপত্যে জনগণের মুক্তির প্রশ্নটি আড়ালে চলে গেছে। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে জাতীয়তাবাদের ব্যর্থতা গণমানুষের মুক্তির সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। উপসংহারে লেখক বলেছেন –

১৯০৫ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত সময়কালটা অত্যন্ত ঘটনাবহুল; এসময়ে জাতীয়তাবাদীদের বিভিন্ন রকমের প্রবণতা ও কর্মধারা দেখা গেছে। দ্বন্দ্ব এবং স্ববিরোধিতা ছিল লক্ষণীয়। কিন্তু তাদের মূল লক্ষ্যটা ছিল ক্ষমতালাভ এবং ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ ও নিরাপদ রাখার স্বার্থে জনগণের অভ্যুত্থানের সম্ভাবনাকে প্রতিহত করা। এই রাজনৈতিক বাস্তবটাকে বিবেচনায় রাখলে জাতীয়তাবাদীদের বিরোধ, ঐক্য এবং বিবিধ তৎপরতাকে ব্যাখ্যা করতে অসুবিধা হয় না। সেই সঙ্গে এটাও বোঝা যায় যে, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, লড়াইটির পক্ষে একই সঙ্গে পুঁজিবাদবিরোধী ও সামন্তবাদবিরোধী হওয়া দরকার ছিল, হয় নি বলে সে-লড়াই জনমুক্তি নিশ্চিত করতে পারে নি। বরং মুক্তিকে বিঘ্নিত করেছে।

যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বিশেষত্ব। আমাদের বৌদ্ধিক জগতে তাঁর একটি অনালোচিত অথচ খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্মরণ করছি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে বহু বছর জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। শুধু টেলিভিশনে নয়, বিতর্ক শিল্প সংক্রান্ত বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে তিনি যতটা সময় ব্যয় করেছেন তা তাঁর সমকক্ষ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বিরল। তরুণ প্রজন্মকে মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদে দীক্ষিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ তিনি। আমার বিতার্কিক জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনাটি তাঁর সভাপতিত্বে ঘটে। ২০০৭ সালের জুন মাসে। জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতার চ‚ড়ান্ত পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল চ্যাম্পিয়ন হয়। বিজয়ী দলের নেতা ছিলাম আমি। 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রথম প্রবন্ধের বই অন্বেষণ ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৪ সাল থেকে ২০২৪ – এই ষাট বছরের বর্ণাঢ্য লেখকজীবনে তাঁর অন্বেষণ থেমে থাকেনি। তিনি অন্বেষণ করেছেন মানুষের মুক্তির, এ-পথে প্রধান বাধা হিসেবে দেখেছেন পুঁজিবাদকে। বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সামাজিক বিপ্লবের গুরুত্বের কথা। সংগঠন ও সমাজবিপ্লবই পারে পুঁজিবাদকে প্রতিহত করে শ্রেণি ব্যবধানকে ঘুচিয়ে দিতে। এভাবেই সমষ্টিগত মুক্তির পথ অবারিত হতে পারে। এ-লক্ষ্যে আজো অন্তহীন তাঁর অন্বেষণ। তাঁর একটি সাম্প্রতিক বইয়ের শিরোনাম স্বপ্ন ছিল, থাকবেও। জীবনের শেষ লগ্নে রচিত ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। এই উপলব্ধির অনুরণন দেখি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মধ্যেও। তিনি বিশ্বাস করেন, স্বপ্ন আছে বলেই আমাদের অস্তিত্ব আছে। স্বপ্ন বলে যে, মানুষের মনুষ্যত্ব অপরাজেয়। ৎ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

লেখক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক। জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৩শে জুন মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার বাড়ৈখালী গ্রামে। বাবা হাফিজ উদ্দিন চৌধুরী, মা আসিয়া খাতুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর গবেষণা করেন যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় ও লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। বর্তমানে এমেরিটাস অধ্যাপক। দীর্ঘকাল ধরে পত্রপত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। মার্কসবাদী চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ। সম্মাননা : একুশে পদক, লেখক সংঘ পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, শেলটেক পদক ইত্যাদি। উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা – প্রবন্ধ-গবেষণা : অন্বেষা, Introducing Nazrul Islam, আরণ্যক দৃশ্যাবলী, রাষ্ট্রের মালিকানা, উপনিবেশের সংস্কৃতি, পুঁজিবাদের দুঃশাসন, শ্রেণী সময় ও সাহিত্য, গণতন্ত্রের অমসৃণ পথ; গল্প : ভালো মানুষের জগৎ, দরজাটা খোলো; উপন্যাস : শেষ নেই, কণার অনিশ্চিত-যাত্রা; অনুবাদ : এ্যারিস্টটলের কাব্যতত্ত¡, হোমারের ওডেসি ইত্যাদি। সম্পাদনা : আনোয়ার পাশা রচনাবলী (তিন খণ্ড), Dhaka University Convocation Speeches (দুই খণ্ড), ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত, সাহিত্যপত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, পরিক্রমা, সচিত্র সময় ইত্যাদি।