অশরীরী

এখানে এসেই থেমে পড়ে সামিউল। প্রায় তিরিশ মিটার দূরের বাড়িটি ইথারে অদ্ভুত নিশ্চুপ কণ্ঠে ডেকে যায়। ‘আয় সামিউল, এখানে আয়। আয় রে।’ সামিউল সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে থাকে ক-মুহূর্ত। তারপর পুনরায় সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেয়। অনেক কাজ। যেতে হবে বেশ দূর। একদিন সত্যি সত্যি ওই বাড়িতে যাবে। কী আছে সেখানে? কে ডাকে তাকে? অচেনা হিম হিম বাতাসে খুব চেনা কণ্ঠ বিষাদমাখা সুরে ডেকে যায়।

 বটতলী মোড় পেরিয়ে পিচকালো চিকন রাস্তা উত্তরে চলে গেছে। পশ্চিমে জুবেরি হাই স্কুল। পুবে নূরজাহান আলিয়া মাদরাসা। এই দুইয়ের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা নিয়ে যায় পুরনো রাজবাড়ি। আজো টিকে আছে কালের সাক্ষী। সামিউল আরো উত্তরে যেতে থাকে। কোনোদিন রাজবাড়ির সদর দরজার সামনে মোড়ের মতো জায়গায় দাঁড়ায়। ডানে-বাঁয়ে, উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমে বিবিধ দোকান। সে ধীরে ধীরে হারেছের টি-স্টলে স্থির হয়। সেখানে চা খায়। পরিমিত চিনিতে ঘনীভূত দুধের চা। তৃপ্তি আসে। হারেছ বলে –

– কালেকশন কেমন ভাইজান?

– এই তো চলে যাচ্ছে। মানুষজন টাকা নেওয়ার সময় যত কথা বলে, ফেরত দেওয়ার সময় কথা রাখে না। কেউ কেউ মিটিংয়েই আসে না।

– আমার কিস্তি কিন্তু বাকি পড়ে না। পড়ে?

– না। তোমার বউ ভালো মানুষ। কোনো সমস্যা নাই।

– অনেক বড়ঘরের মেয়ে। আমার কি তাকে বিয়ে করার যোগ্যতা আছে ভাইজান? তারপরও হলো। সবই কপাল।

– তাই … তাই, তুমি সুখী মানুষ। আচ্ছা হারেছ, একটা কথা বলো তো, ওই যে গুঞ্জাবাড়ির সামনে আমবাগানের আগে আগে পশ্চিমে ক্ষেত পেরিয়ে কয়েকটা দেবদারু গাছের নিচে দুটো ঘর নিয়ে যে-বাড়ি, সেটা কার? সামনে একটি ডোবা আছে। মানুষজন তো দেখি না। পোড়োবাড়ি, না পরিত্যক্ত?

– কোন বাড়ির কথা বলছেন ভাইজান? চিনতে পারলাম না। না … এমন বাড়ি তো দেখিনি।

সামিউল কথা বাড়ায় না। সবাইকে সবকিছু জানতে হবে, চিনতে হবে এমন কথা নেই। সে চা শেষ করে খুচরো পাঁচ টাকা দিয়ে কিছু হেঁটে সাইকেলে ওঠে। বেশ কয়েকটি সমিতিতে যেতে হবে। দূরত্ব আছে। অনেক কাজ। এই এলাকায় শনি আর মঙ্গলবার অন্যূন চল্লিশ-বিয়াল্লিশ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। তিরিশ ছকের টেবিল ফরম্যাটে লিখতে হয় আদায় আর বকেয়ার হিসাব-নিকাশ।

এই রাস্তায় যেতে যেতে বেশ খানিক দূর, হাতের বাঁয়ে সাদা এক বাড়ির পুব দেয়াল সীমানা ছাড়িয়ে কলকে ফুলের গাছ বাইরে এসেছে। হলুদ ফুলগুলো দেখে মন বিমোহিত হয়। চারপাশে হালকা রঙের আলো। সামিউল আরো সামনে এগোয়। তারপর অদ্ভুত নিরিবিলি সেই বাড়ি। রাস্তা থেকে পশ্চিমে নেমে পায়ে চলা সরু পথ, তারপর প্রশস্ত আলো-অন্ধকার জায়গা, দু-পাশে বিশাল কয়েকটি দেবদারু গাছ, পরগাছা লতায় অনেকখানি আচ্ছাদন পড়েছে, পেছনে অন্যান্য গাছগাছালি, বাঁশঝাড় আর জঙ্গল; আর এর মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব রেখে মাটির নিশ্চুপ দুটো ঘর। সেসবের বারান্দা পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে। সেখানে সুনসান নীরবতা। কাউকে দেখা যায়। কোনোদিন একজন তরুণী শ্লথপায়ে এসে দাঁড়ায়, তাকে স্বচ্ছ-অস্বচ্ছ দেখায়, পরনে উজ্জ্বল সাদা শাড়ি, অচেনা বিষাদ-বিমর্ষ দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ সামনে তাকিয়ে পুনরায় ফিরে যায়। এছাড়া কাউকে আর দেখা যায় না।

ওই মুখোমুখি দুটো ঘরের বাঁ-দিকের সীমানায় নৈর্ঋত কোণে প্রাচীন কুয়ো। গোলাকৃতি ঘেরের দেয়ালে জমে থাকা কালচে-সবুজ শ্যাওলা দূর থেকে দেখা যায়। কে জানে সেখানে জল আছে কি না? আর থাকলেও ব্যবহারযোগ্য আছে কি? তার পশ্চিমে জবাগাছ। রক্তলাল ফুল ফুটে থাকে। কখনো হোঁচট খাওয়ার মতো থমকে দাঁড়ায় সামিউল। প্যাডেল থেকে পা নিচে নামিয়ে নিষ্পলক তাকায়। কে বা কারা থাকে নিশ্চুপ এই বাড়িতে? বর্তমান সময়ের কোনো স্পর্শ নেই। বিদ্যুতের আলো নেই। উনুনের ধোঁয়া নেই। শিশুদের কলরোল নেই। সেখানে বুঝিবা হিমশীতল কান্নার সুর। সেই ধ্বনি তার বুকে হাহাকার তোলে। কেউ বুঝি কিছু বলতে চায়। সামিউল জানে না। সে বুঝতে পারে না। কেন এমন হয়? এই বাড়িটি কেন ডাকে? অতীতে হারিয়ে যাওয়া কোনো ঘটনা বা স্মৃতির আবাহন? এ-রকম কিছু জিজ্ঞাসা মাথায় এসে গোলকধাঁধার রেশ তোলে। তারপর আর কিছু নেই। সে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিয়ে আরো উত্তরে চলতে থাকে। কোনোদিন পেছন ফিরে তাকায়। সেখানে কাউকে দেখা যায় না।

রাজবাড়ি থেকে গুঞ্জাবাড়ি এলাকায় ছয়টি সমিতি। প্রতিটি সমিতিতে গড়পরতা সাতজন মেম্বার। পুরুষ সমিতি দুই আর মহিলা চার। ফয়সাল আহমেদ, এরিয়া ম্যানেজার, তাগাদা দেন।

– এই যে সামিউল ভাই। সদস্য সংখ্যা বাড়ান। আপনি সিনিয়র মানুষ। সবই বোঝেন। সাত-আটজন নিয়ে সমিতি চলে না। হেড অফিসের চাপ। সমিতি থাকতে হবে পনেরোটা। অবশিষ্ট আট-নয়টি সমিতি কবে করবেন?

– চেষ্টা করছি ভাই। অন্যান্য সংস্থারও কার্যক্রম আছে। আশা-গ্রামীণ-ব্র্যাক বাদে লোকাল এনজিও। শেষে আপনি বলবেন, ডুপ্লিকেশন কেন করেছেন?

– সে আমি জানি না মনে করছেন! মানুষ এখন ঘাউল প্রকৃতির। ডানে-বাঁয়ে সবদিকে খায়। এক জায়গার ঋণ নিয়ে অন্য সংস্থার পরিশোধ করে। আমাদের টার্গেট পূরণ করতে হবে। প্রত্যেক মাঠকর্মীর হাতে দশ লক্ষ টাকা আউটস্ট্যান্ডিং থাকতে হবে। ফান্ড আইডল ফেলে রাখা যাবে না। কে কোন সংস্থায় আছে দেখার দরকার নেই, না দেখবেন, কিন্তু কিছু জানেন না। অ্যাম আই ক্লিয়ার?

– জি ভাই। ক্লিয়ার। ঘাউল কী ভাই? নতুন শব্দ জানা গেল।

– নতুন নয়। এটা হলো হরর মুভির নাম। Peter Cushing-এর নাম শোনেননি? উনিশশো পঁচাত্তর সালের বিখ্যাত ব্রিটিশ ছবি। একজন ব্যক্তি মৃতদেহের মাংস খায়। তাজা পচা সব এইসব আরকি! এখনকার মানুষজন এমনই। সব খায়।

– আশ্চর্য!

সামিউল এক শুক্রবার সন্ধ্যারাতে দ্য ঘাউল দেখে। আফসার, এরিয়া অফিসের কম্পিউটার অপারেটর, মুভি দেখার পাগল; এনসাইক্লোপিডিয়া অফ মুভি বলা যায়। সে বেশ উৎসাহে ইউটিউবে দ্য ঘাউল খোঁজে। সেই মুভি দেখতে দেখতে অনেক রাত। অজানা ভয় শিরশির করে রাখে চারিদিক। একেই বলে ঘাউল? কালী দেবীর পদতলে নরবলি। তারপর ফেরার পথ। অফিস থেকে প্রায় পৌনে এক কিলো রাস্তা ধরে গুড়গোলা। সেখানের এক মেসে অবস্থান। সেই রাতে ওই সামান্য রাস্তা সাইকেলে আসতে বুক কেমন কেমন করে। অনেক আগে সংবাদপত্রে খবর পড়েছিল। একজন লোক মর্গে কাজ করে। সে লাশ কাটত। কখনো ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যেত মর্গে। ছেলেটি লাশকাটা ঘরের পাশে সিমেন্টের বেঞ্চে বসে থাকে। একদিন পোষ্য কোটায় মর্গে চাকরি পাবে এমন প্রত্যাশা। লোকটি ছেলেকে কাজ শেখায়। ছেলে লাশ পাহারা দেয়। মানবশরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ হলে সেগুলো বয়ামে তুলে রাখতে সহায়তা করে। এভাবে কাজ শিখতে শিখতে একদিন হাতে ছুরি-চাকু তুলে নেয়। তখন সে যুবক। তার নাম খলিলুল্লাহ। সে মৃতদেহের মাংস খেতে অভ্যস্ত হয়। কলিজা আর ঊরুর মাংস খুব পছন্দ করে।
এখানে-ওখানে হাতের কাছে মাছি বিরক্ত করলে টপ করে ধরে মুখে তুলে নেয়। ইত্যাদি। এই খবর উনিশশো পঁচাত্তর সালের তিন এপ্রিল দৈনিক বাংলায় প্রকাশ পেলে দেশের মানুষ শিউরে ওঠে। জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন বিচিত্রা প্রচ্ছদকাহিনি করে। খলিলুল্লাহ কি তবে তেমনই কোনো ঘাউল? সামিউল জানে না। তার অদ্ভুত অনুভূতি হতে থাকে। সাইকেলের প্যাডেল মারতে মারতে আশপাশের অন্ধকার ছায়ায় কখনো মুভির ঘাউল, কখনো পত্রিকায় প্রকাশিত খলিলুল্লাহর চেহারা ভেসে ওঠে। খলিলুল্লাহর চিকিৎসা হয় পাবনা মানসিক হাসপাতালে। সে সুস্থ হয় বলে শোনা যায়। স্বাভাবিক জীবনের অনন্ত জিগীষা নিয়েও কোথাও কোনো কাজ পায় না। জীবনের বাকি দিনগুলো আজিমপুর গোরস্তানের আশপাশে কাটিয়ে দেয়। খলিলুল্লাহ দুই হাজার পাঁচ সালে মারা যায়। মানুষের জীবন কত অদ্ভুত! পৃথিবীও বড় আজব জায়গা। কোন চেহারার আড়ালে কে বসে আছে বাইরে থেকে দেখে বোঝা মুশকিল। মানুষ সবসময় কচ্ছপের খোলসে নিজের স্বরূপ ঢেকে রাখে। সামিউল এসব ছবি আর দেখবে না। তেমন খবর পড়বে না। এগুলো মাথা নষ্ট করে দেয়। সেই রাতে মেসে ভালো তরকারি রান্না হয়েছিল। ভাত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে আর সেই তরকারি গরম করে খাওয়ার ইচ্ছেও মরে যায়।

সেদিন মঙ্গলবার। সামিউল সব ভুলে গিয়েছিল। কাজের প্রচণ্ড চাপ। গত জুলাই মাসে তিনদিন মেয়াদি কর্মশালা হয়েছে। সাত শাখার ম্যানেজার, ক্রেডিট কার্যক্রমের মিড-লেভেল আর তৃণমূল কর্মীদের সমন্বয়ে কাজের টার্গেট নির্ধারণ, ইভালুয়েশন, আলোচনা এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ। সকাল সাড়ে আটটা থেকে রাত দশটা, এমনকি
এগারোটা-সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত হাজারও কথার কচকচি চলেছে। আগামী অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে টার্গেট পূরণ করার অঙ্গীকার অডিটোরিয়ামের দেয়ালে-দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়। গালাগাল মান-অপমান বোনাস। সামিউলকে সমিতি আর সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির টার্গেট অর্জন করতে বলা হয়। অক্টোবর মাসে বাংলা কার্তিক এসে দাঁড়ায়। হাতি ঠেলা যায় তো কার্তিক ঠেলা যায় না। গরিব মানুষের ঘরে ঘরে নানা টানাপড়েন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারেও বিবিধ কাটছাঁট শুরু হয়েছে। মানুষজন ঋণের জন্য উতলা অস্থির। সামিউল এই অবসরে সদস্য বৃদ্ধি করতে চায়। এরপর নভেম্বর পেরিয়ে ডিসেম্বর মাস। চাকরি নবায়নের তেলেসমাতি খেলা আছে। অ্যানুয়াল কনফিডেন্সিয়াল
রিপোর্ট-এসিআর বা পারসোনাল ফাইল রিভিউ হবে। অফিস উপস্থিতির সময়ানুবর্তিতা, অফিসিয়াল প্রাইভেসি রক্ষা, মাসে কতদিন ছুটি ভোগ, অঘোষিত অনুপস্থিতির তালিকা ইত্যাদি পর্যালোচনা। টার্গেট-অ্যাচিভমেন্ট আর সংস্থার আচরণবিধি অনুসরণের খতিয়ান মূল্যায়ন। একে বলা হয় পারফরম্যান্স অ্যানালিসিস। কেউ থাকবে আর কেউ ‘ধন্যবাদ’ লেটার হাতে নিয়ে পুনরায় বেকার হয়ে যাবে। সামিউল জানে না চাকরি থাকবে কি না। তারপরও মনে বিশ্বাস আর প্রত্যাশা আছে। এই সংস্থায় দুই বছর নয় মাস চলমান। পরিচালক বা ম্যানেজমেন্ট নবায়ন করবে তার। আজকাল অনেক সংস্থা পুরনো কর্মী ছাঁটাই করে। ইনক্রিমেন্ট দিয়ে বেতনের পরিমাণ যা দাঁড়ায়, সেই টাকায় দুজন নতুন কর্মী রাখা যায়। তাই সবসময় চাকরি চলে যাওয়ার ভয় বা আশংকা থাকে। সামিউল চাকরি গেলে কোথায় যাবে? সাঁইত্রিশ বছর বয়সে নতুন করে কাজ খুঁজতে বিবিধ সমস্যা। নিজেকে বুড়ো বুড়ো লাগে। মাথার চুল আর গোঁফে সাদা রং উঁকি দেয়। কেউ কাজ দিতে চায় না। সামিউলের নিশ্চুপ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। পরিবারে বাবা-মা আর ছোট একটি বোন আছে। বিপাশা ভালোই ছিল। নিজের পছন্দে বিয়ে, অথচ বছর দুয়েক শেষে ফিরে এলো এক বিকেলে; পৃথিবীতে মানুষ চেনা বড় কঠিন। মা কাঁদে। বাবা নিশ্চুপ অস্থির এদিক-ওদিক হেঁটে বেড়ায়। কী করার আছে? মা বলে –

– ওখানে আর যাওয়ার দরকার নাই তোর। পিশাচ।

সামিউল সায় দেয়। জোর গলায় শুনিয়ে দেয় দু-চার কথা। সেসব অভিমান নাকি শাসন কে জানে। বিপাশার মুখে কোনো কথা নেই। অন্ধকার চেহারা। তখনো মুখ-হাত আর পিঠের ক্ষত জ্বলজ্বল করছে তার। গরম খুন্তির ছ্যাঁকা অত সহজে সারে? এসব লুকোছাপা কষ্ট নিয়েই যত কাজ সামিউলের। প্রচণ্ড পরিশ্রম আর মান-অপমান মুখ বুজে হজম করা। এই তো জীবন। এই হলো বেঁচে থাকা। তার চেহারার উজ্জ্বলতাও ম্লান হয়ে যায়।

ফয়সাল আহমেদ মাসিক সমন্বয় সভায় ধমক দেয়। একজন বয়সে জুনিয়র কারো কাছে এমনভাবে কথা শুনে মন আরো খারাপ হয়। সামিউল আজো কেন সদস্য সংখ্যার টার্গেট পূরণ করতে পারছে না? কালেকশন রেট ভালো নয়। সদস্যদের ঋণ দিতে নয়-ছয় করে নাকি? সামিউল তেমন কথা বলে না। কথা বলা দোষ। আচরণবিধির লঙ্ঘন। সে কাজের গতি বাড়ায়। পারফরম্যান্স ঠিক রাখতে নিজের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় নেই। জীবনযাপন এমনই চলে যায়। অনেকদিন বাড়ি যাওয়া হয় না। মা-বাবা, বিপাশা আর পরির মতো ছোট্ট ভাগ্নিকে দেখতে ইচ্ছে করে। সামিউলের আর আছে কে? তার একান্ত নিজের কিছু নেই, কেউ নেই। কোনোদিন কি হবে যার সঙ্গে জীবনযাপন শেয়ার করে নিতে পারে? বয়স চলে যায়। কবে হবে? সে তেমন সাধের টুঁটি চেপে রাখে। এখন সংস্থার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য দিনরাত কাজ। এটিই জীবনের মূল লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য। এসবের মধ্যে কোনোদিন শেষ সকালে যাওয়ার পথে আর বিকেল বা সন্ধ্যা-রাতে ফেরার সময় রাস্তার পশ্চিমে তাকায়। সেই মাটির বাড়ির উত্তর-দক্ষিণ মুখোমুখি দুটো ঘর বুঝি নিজেদের দেখতে-দেখতে কোনো কথোপকথন করতে করতে অচেনা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। সেই বিষাদ-শব্দ দেবদারু শাখায় পাতাগুলো বয়ে নিয়ে যায় দূর থেকে দূরে। অনেক দূরে। আশ্চর্য একদিনও কাউকে দেখা যায় না। সামিউল বুঝে নেয়, এই বাড়ি পরিত্যক্ত। কেউ থাকে না। তারপরও কেন জানি মনে হয়, বাড়িটি খুব মিহি কণ্ঠে ডাকে। ‘আয় … আয় রে সামিউল … একবার আয়।’ সামিউল শিউরে ওঠে।

গুঞ্জাবাড়ির পেরিয়ে আরো অনেক উত্তরে দুটো মহিলা সমিতি। ইস্যু মিটিং আয়োজন তেমন হয় না। সঞ্চয় আর ঋণের কিস্তি কালেকশন করতে করতে সন্ধ্যারাত। তারপর ফেরার পথে রাত গভীর হতে হতে রাস্তার দু-পাশে বাড়িঘর আর গাছগাছালি ছায়া ছায়া কাঠামো দেখায়। একসময় ফাঁকা জায়গায় এসে পড়ে সামিউল। আকাশে বেশ বড় চাঁদ। অক্টোবরের শেষে বাতাসে হিমের স্পর্শ। মিহি কুয়াশা নেমে আসছে। তখনই আকস্মিক হিসাব-নিকাশ এসে পড়ে। সমিতির যে অবস্থা, নতুন গঠন করা তো দূরের কথা, এগুলোও বুঝি টিকে থাকে না। সে কী করবে? চাকরি থাকবে কি না কে জানে। এইসব বিবিধ ভাবনার মধ্যে হাতের ডানদিকে পশ্চিমে সেই নিশ্চুপ বাড়ি দেখা যায়। সেখানে আলো জ্বলে। আলোর বিচ্ছুরণ জানালার মধ্য দিয়ে বাইরে এসে মরে গেছে প্রায়। বাড়িটি যেন পুনরায় ডাকে : ‘আয় রে আয় … কাছে আয়।’ সামিউল সহসা সাইকেল থেকে নেমে অনেকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু খোঁজে। তার মনে এমন বোধ আসে কেন? কেন এমন হয়? এই বাড়ির সঙ্গে কি কোনো যোগাযোগ আছে তার? কোনো অতিপ্রাকৃত স্মৃতি? অতীতের কোথাও হারিয়ে যাওয়া জীবনের সাদৃশ্য? সামিউল এখানে কাজ করছে প্রায় তিন মাস। প্রথমদিনেই এই রাস্তা পেরিয়ে যেতে যেতে আকস্মিক শরীর ভারী ভারী লাগতে শুরু করে। কেউ যেন সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে আলগোছে বসে পড়েছে। তখন দুপুরবেলা। আকাশে শেষ জুলাইয়ের উজ্জ্বল ঝকঝকে দিন। রোদের প্রচণ্ড তাপ অথচ মাথার ওপর মেঘের ছায়া নেমে এলো। সেই বাড়ির একেবারে সামনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার সাদা শাড়ি বাতাসে তরঙ্গ তোলে। তারপর সেই ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে মন্দিরের দিকে জবাগাছের ওখানে মিশে গেল। সামিউল চমকে ওঠে। রাতে মাথাব্যথা হয়, জ্বর আসে।

পরদিন সকালে মোড়ের ফার্মেসিতে গিয়ে প্রেশার চেক করে নেয়। তেমন সমস্যা নেই। রাতে ঘুমের মধ্যে মাথাব্যথা হয় তার। সে ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু সঠিক ঘুম নয়, তন্দ্রাঘোর কিংবা নিদ্রার গভীরতায় মাথার ভেতরে, পেছনে-সামনে-মধ্যখানে সূক্ষ্ম ব্যথা। সেইসঙ্গে হাজারও উদ্ভট স্বপ্ন। কোনো জটিল সমস্যা বা সম্পর্কের টানাপড়েন, অপরিচিত মানুষজন, অচেনা পথঘাট আর এলাকায় ঘুরে বেড়ানো, অথচ মনে হয় সবই তার চেনাজানা, নতুন কিছু নয়; কারো সঙ্গে কথোপকথন ইত্যাদি আর এইসব খেইহীন স্বপ্নের দৃশ্য। ভোর-সকালে যার অনেক কিছু মনে থাকে না। কেউ একজন স্বপ্নে বারবার ঘুরেফিরে কাছে এসে দাঁড়ায়। একজন তরুণী। সে কথা বলে। তার কণ্ঠস্বর ভারি সুন্দর!  সামিউল ভেসে যায়। ভেসে যায়। সে তাকে দেখতে পায় না। তার চোখে ভাসে শুধু ফিনফিনে সাদা শাড়ি। মায়াময় সুরেলা কণ্ঠ। কে সে?

সামিউল সাইকেল থামিয়ে সম্মোহিতের মতো তাকায়। দেবদারু গাছের ছায়ায় কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি পুবের দিগন্তে অনেক অনেক দূর। তারপর আর কিছু নেই। সবকিছু হারিয়ে গেছে। সামিউল কি ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশনে পড়েছে? একদিন বিকেলে সংস্থার ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। প্রায় সমবয়সী রেবেকা হোসেন, কিংবা কমও হতে পারে, চোখে সোনালি চিকন ফ্রেমের চশমায় বড় মায়াবী দেখায়। মা-শিশু স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা প্রকল্পের মিড-লেভেল মেডিক্যাল অফিসার। সামিউলের ঘুমের ব্যাঘাত আর মাথাব্যথা শুনে বলেন, ‘টেনশন করেন কেন? উপরঅলার উপর ভরসা রাখেন। তিনি সব ঠিক করে দেবেন।’

– টেনশন তো এমনিই হয় ম্যাম। সারাদিনের কাজ শেষে ক্লান্তিতে ঘুমও আসে। কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ি। তারপর আজগুবি স্বপ্ন ধরে। ঘুমের মধ্যে মাথার পেছনে চিনচিন ব্যথা। সকালে চা-নাশতার পর প্রায়শ সেই ব্যথা আর থাকে না।

– কেমন স্বপ্ন দেখেন?

রেবেকা হোসেন উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। সামিউল কী বলে? অনেক কথা বলা যায় না। অদ্ভুত অনুভূতি হয়। সে আকাশে ওড়ে। কখনো রাস্তায় দিগম্বর হেঁটে যায়। পরীক্ষার প্রশ্ন হাতে নিয়ে ঘামে। উত্তর লিখতে পারে না। আর সেই দৃশ্য? সেলুলয়েড ফিল্মে সংগ্রথিত ভয়ংকর সব ছবি। তার দম বন্ধ হয়ে আসে। সে ঘুম থেকে জেগে উঠতে পারে না। কেউ বুঝি বুকের ওপর চেপে বসে থাকে। সে কে?

– কেউ আমাকে বলি দিচ্ছে। নরবলি। কেউ তাড়া করছে। আমার স্লিপ অ্যাপনিয়া হয়। ইত্যাদি।

– এই টেস্টগুলো করে নিন। আর হরর মুভি দেখবেন না। খবরের কাগজে পৈশাচিক বা মর্মান্তিক এসব নিউজ পড়বেন না। টিভিও সাবধানে দেখবেন।

– এটা কি ইমোশনাল ব্রেকডাউন ম্যাম?

– যা মনকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা অশান্ত করে সেসব এড়িয়ে যাওয়া ভালো। আচ্ছা টেস্টগুলো করে আসেন। তারপর দেখা যাবে।

সামিউল চোখে দেখা সকল কাহিনি বলতে পারে না। ভুলে যায়। ভোলে না নরবলির দৃশ্য। কি ভয়ংকর! মানুষের সভ্যতা এমন কেন? মানুষ কি সত্যি শ্রেষ্ঠ প্রাণী? কে এই প্রত্যয়ন দিলো তাকে? কোথায় যেন পড়েছিল, কালিকা পুরাণের ৭৬ অধ্যায়। ‘নরেণ বলিনা দেবী সহস্রং পরিবৎসরান বিধিদত্তেন চাপ্নোতি তৃপ্তিং লক্ষং ত্রিভির্নরৈঃ।’ একটি নরবলিতে দেবী সহস্র বছর, আর তিনটি নরবলিতে দেবী লক্ষ বছর তৃপ্তি লাভ করেন। কবে থেকে পৃথিবীতে নরবলি (Human sacrifice) সূচিত হয়েছিল? অস্পষ্ট ইতিহাস। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০-১১০০ সালব্যাপী ক্যানানাইটিসে নরবলি হতো। মায়া বা অ্যাজটেক সভ্যতায় নরবলির ব্যাপক প্রচলন ছিল।

২০১৫ ও ২০১৮ সালে মেক্সিকো সিটির টেমপ্লো মেয়র মন্দির এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে বেরিয়ে আসে শত শত

মাথার খুলি। স্প্যানিশ ইতিহাসবিদ দিয়েগো দুরান দাবি করেন, এই মন্দির উদ্বোধনের সময় ৮০ হাজার ৪০০ নারী, পুরুষ, শিশুকে বলি দেওয়া হয়েছিল। মানুষের ‘টোটেম’ (totem) বিশ্বাস ও পরবর্তীকালে ক্ষেতে শস্য ফলন ও উৎকর্ষতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সেই সমাজে প্রথমদিকে নারীর যৌনাঙ্গ-শোণিত এবং নারীবলি দেওয়া হতো। পরবর্তীকালে পুরুষবলি সূচিত হয়।

সামিউল বইটি শেষ করতে পারেনি। মানুষের এই জীবনযাপনে অনেক কিছু শেষ করা যায় না। সেসব নিয়ে অতৃপ্তি আর আফসোস রাখতে নেই। সে ডাক্তারের পরামর্শমতো টেস্ট করে। হাজারও কাজের মধ্যে সেসব সারতে সপ্তাহ পেরিয়ে যায়। কোনো সমস্যা শনাক্ত হয় না। ডাক্তার রেবেকা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শেষে কিছু ভিটামিন আর কী কী লিখে দেন মাত্র। তারপর তিন-চারদিন ভালো ঘুম হয়। কোনো স্বপ্ন নেই। বুকের মধ্যে শূন্য খাঁ-খাঁ অনুভূতি নেই। সব বুঝি সেরে গেছে। এই অক্টোবরে আবার শুরু হয়েছে অদ্ভুত অস্থিরতা। কখনো কখনো আনমনা হয়ে যায়। কোন কাজে ব্যস্ত ছিল, কী করছিল – মনে থাকে না। সে এখানে আছে অথবা নেই, কোথাও কোন অতীতে ভেসে গেছে; অনুভূতি বা সচেতন উপলব্ধি নেই। সেখানের আকাশ, বাতাস, আশপাশের দৃশ্যাবলি সবকিছু অন্যরকম লাগে। সেটি ভালোভাবে দেখে নিতে নিতে কিংবা বুঝতে বুঝতে দেখে অফিসের বারান্দায় কিংবা বেঞ্চে বসে কালেকশন শিটে কাজ করছে। কীভাবে হারিয়ে গেছে দীর্ঘ সময় বা একটি মুহূর্ত? তারপর আর মনে নেই। কোনো বোধ নেই। সামিউল কিছু বুঝতে পারে না।

সেই সন্ধ্যারাতে ফিরতে ফিরতে ঘনীভূত অন্ধকার। আজকাল বিকেল শেষ হতে হতে বাতাসে শীতের স্পর্শ লাগে। পরশুদিন বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ক্রমশ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে। গতকাল থেকে মাঝে মধ্যে ঝিরঝির বৃষ্টি। বাতাসে যেন পৌষালি হিমস্পর্শ। সামিউলের হালকা শার্ট সেই শীত উপেক্ষা করতে পারে না। সে সাইকেলে জোর প্যাডেল মারতে থাকে। অফিসে সারা দিনের কালেকশন জমা দিয়ে মেসে ফিরে বিশ্রামের ইচ্ছে। সেই ভাবনায় বুঝি আনমনা ছিল। আকস্মিক সেই বাড়ির কাছাকাছি হতে হতে বেখেয়ালে দৃষ্টি ডানদিকে চলে যায়। আশ্চর্য! দুটো ঘরে আলো। সেই ম্লান আলো ঘুলঘুলি জানালা দিয়ে বাইরে এসে বুঝিয়ে দেয় মানুষ আছে। ইলেকট্রিক আলো নয়। প্রদীপ বা হারিকেনের হতে পারে। কে জানে আকাশে বিশাল চাঁদ চারিদিক উজ্জ্বল করে রেখেছে। দিন শেষে বৃষ্টির অবসানে পরিষ্কার দিগন্তে মিটমিট করছে কতগুলো তারা। সামিউলের যে কী হয়, আস্তে করে নেমে যায় পশ্চিমের পায়ে চলা পথের দিশায়। ধূপের চমৎকার মনমাতাল সুবাস ভেসে আসছে। তারপর দক্ষিণ ঘরের বারান্দার কাছে সাইকেল স্ট্যান্ড করে মৃদুকণ্ঠে ডেকে ওঠে –

– কেউ আছেন? এই যে … কেউ শুনছেন?

কোনো জবাব নেই। দেবদারু গাছের পাতায় শিরশির শব্দ। কোথাও বাঁশবাগানের মগডালে বকের বাচ্চা ডেকে ওঠে। সেদিকে অসংখ্য জোনাকি আলো ছড়িয়ে পথ দেখিয়ে দেয়। সামিউল স্থির-নিষ্কম্প দাঁড়িয়ে থাকে। কতক্ষণ? মুহূর্ত কিংবা অনন্তকাল। একসময় বারান্দায় উঠে পড়ে। মানুষের ঘরদোর। কেউ ভিন্ন অর্থ করে বসবে না তো? সে পুনরায় কথা বলে –

– কেউ আছেন? হ্যালো … কেউ আছেন? একটু বেরোবেন?

এবারো কোনো উত্তর নেই। আকস্মিক খুব শীত অনুভূত হতে থাকে। দমকা বাতাস। জোনাকিগুলো চঞ্চল হয়ে এলোমেলো গোলকধাঁধা তৈরি করে দিতে থাকে। সামিউল কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। জনমানুষের কোনো চিহ্ন নেই। সামিউল কোন রাস্তা দিয়ে এসেছিল? সে আসলে কোথায়? কোনো বোধ নেই। সে কী করছে অথবা বের হয়ে যাচ্ছে কি না বুঝতে পারে না। একসময় জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি দেয়। কেউ নেই। একটি প্রদীপ একাকী নিষ্কম্প জ্বলছে মাত্র। এবার সামিউল অন্য ঘরের দিকে এগিয়ে জানালা দিয়ে ভেতরে তাকায়। কেউ একজন শুয়ে আছে। একজন নারী। পরনের সাদা শাড়ি বিস্রস্ত। সামিউল স্তম্ভিত দৃষ্টিতে পেছনটুকু শুধু দেখতে পায়। সে এখন কী কথা বলতে পারে? একটি বাড়ি, মাটির দুটো মুখোমুখি ঘর, তারই উত্তর দিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সে। এসব কি ঠিক হচ্ছে? মানুষজন এগিয়ে এসে চোর বা অন্য কোনো মতলবে এসেছে মনে করে মারধর করতে পারে। সামিউল এইসব চিন্তার মধ্যে এও ভেবে নেয়, এত বড় নির্জন নিরিবিলি জায়গায় একজন নারী একাকী শুয়ে আছে। আশ্চর্য! তার শুয়ে থাকার ভঙ্গিও কেমন অদ্ভুত। ফরসা দুটো পা অদম্য আকর্ষণে দৃষ্টি বিভ্রম করে দেয়। মেয়েটি জীবিত নাকি মৃত, কিছু অনুমান করা যায় না। সামিউল জানালা ছেড়ে আলো-অন্ধকারে দরজা হাতড়াতে শুরু করে আর আশ্চর্য পেয়েও যায়।

 – এই যে শুনছেন? একটু বাইরে আসবেন?

কোনো সাড়া নেই। সামিউলের মনে পড়ে, কেন জানি এই বাড়ির রাস্তা পেরিয়ে যেতে যেতে শ্রুতিতে অদ্ভুত উপলব্ধি আসে; কেউ বুঝি ডাকছে তাকে। বড় করুণ আর অপ্রতিরোধ্য সেই আহ্বান। ‘আয় রে আয়, একবার কাছে আয়।’ সে আজ এসেছে। এখন বেশ রাত। সে এলো কেন? কেন এলো? অচেনা কুহকি ডাক যে তেপান্তরের অজানা দিশায় হারিয়ে দেয়। সে হলো গোলকধাঁধা। সামিউলের শিরদাড়া বেয়ে হিমস্রোত নেমে যায়। সে নিশ্চুপ পদক্ষেপে বারান্দা থেকে নেমে যেতে থাকে। সাইকেলের হ্যান্ডেলে আলগোছে হাত রাখে। এমন সময় দরজা খুলে যায়। সেখানে একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই কি সে যে ওই ঘরে শুয়ে ছিল? আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। সামিউল কি তাকে চেনে? তার অচেনা নয়। হাজার বছরের চেনা এক চেহারা। সে তাকে স্বপ্নে দেখে। তার পানপাতা মুখছবিতে মায়াবী বিষাদ। প্রদীপের শিখায় পতঙ্গ যেমন হাসতে হাসতে নিজেকে উৎসর্গ করে সেই প্রাগৈতিহাসিক আবাহন। তার দুই ভুরুর মধ্যখানে আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে সিঁদুররাঙা ছোট্ট টিপ। সামিউল অনেকবার সেই আগুন আকাশের দিগন্তে স্পর্শ করেছে। মেয়েটি চারিদিক আলোকিত করে খুব মোলায়েম স্বরে বলে ওঠে –

 – অবশেষে তুমি এলে। কেন চলে গিয়েছিলে দেবু? কেন?

– আমি যাইনি পূজা। তোমাকে ছেড়ে যেতে পারি? কোথায় যাব?

– তুমি জানো না? তোমার মনে নেই দেবু। দেবু … তোমার কিছু মনে নেই? আমাকে ফেলে চলে গিয়েছিলে। সে যাক, তুমি ফিরে এসেছো। আর যেতে দেবো না।

– পূজা আমার পূজা।

– দেবু।

তখন পৃথিবী অন্যরকম হয়ে গেছে। সেই দেবদারু গাছের ছায়া নেই। অনন্য বনবীথিকায় নিরিবিলি চারপাশ। তার মধ্যে একটুকরো শূন্য তেপান্তর। সেই নির্জন পরিসীমায় দুজন মানুষ পরস্পরের দিকে অপলক বিস্ময় অথবা অব্যক্ত কান্না নিয়ে তাকিয়ে আছে। নিজেদের খুঁজে পেতে দৃষ্টির গভীরে নেমে যায় তারা। পরস্পরকে জড়িয়ে কি নির্মল সুঘ্রাণ মেখে নেয়!

পৃথিবীতে যুগের পর যুগ বয়ে চলা বাতাসের মতো অদৃশ্য সংযোগ। তার ভাঁজে ভাঁজে গভীরতায় মিশে আছে নিশ্চুপ দীর্ঘশ্বাস।

তৃপ্তি-অতৃপ্তির দোলাচলে শুধুই অপ্রাপ্তির শূন্যতা। সামিউল নিজের বুকের গভীরে সেই অচেনা দীর্ঘশ্বাস খুঁজে নেয়। কোথায় এর যোগসূত্র? কারো কারো জীবন সময়কে অতিক্রম করে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক যোগসূত্র রেখে যায়। সেখানের আলো-বাতাস, সময়ক্ষণ, চেনা মানুষ আর প্রিয়জন সময়ের মাত্রা এড়িয়ে বুকের মধ্যিখানে নিশ্বাসের শব্দে শব্দে ছন্দে ছন্দে আহ্বান করে … করতে থাকে। ‘ফিরে আয় … ফিরে আয়।’ সামিউল কি তবে সেই সংযোগরেখা ধরে ফেলে আসা কোনো কালের প্রান্তসীমায় এসে দাঁড়িয়েছে? অতিক্রান্ত সময়ের আবাহন? সে জানে না। সে ঘোরের মধ্যে ডুবে গেছে। এই সময়, এই অস্তিত্বহীন অস্তিত্ব মনোচেতনায় কোনো স্বপ্ন অথবা কোনেকিছু নয়, একেবারে শূন্য মায়াজাল, তার কোনো অস্তিত্ব নেই, তবু আছে, অনুভব করা যায়; সে আছে। আশপাশে কিছু নেই, সব মিথ্যে; তারপরও সবকিছু উপস্থিত। মানুষ অতীত থেকে পালাতে পারে না। কেউ এড়িয়ে যেতে পারে না। পূজা তাকে ছেড়ে হাত টেনে মৃদুস্বরে বলে, – এসো।

সামিউলের ঘোর কাটে না। সে তার পেছন-পেছন হেঁটে যায়। কয়েকটি পদক্ষেপ। সেই জবাগাছ। দেয়াল ঘেঁষে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। একটি-দুটি ফুল মাটিতে লুটিয়ে যেন কাঁদে। রুপালি জোছনায় শাখায় শাখায় অন্য কয়েকটি আরো রক্তিম রহস্যময়। ইট-চুনে নির্মিত মন্দিরের দেয়ালে ছোপ ছোপ শ্যাওলা। শ্বেতচন্দনের মতো সাদা রঙে আঁকিবুঁকি। কোথাও পলেস্তরা খসে পড়েছে। বেরিয়ে পড়েছে পুরনো ইটের দুর্ভেদ্য দেয়াল। মন্দিরের এককোণে কুলঙ্গিতে প্রদীপ নিষ্কম্প জ্বলছে। একেবারে উত্তরে মহাদেবের বুকে পা রেখে জিহ্বা কেটে দাঁড়িয়ে আছে জগদ্ধাত্রী। কালীর প্রমাণ মূর্তি। বিগ্রহের সামনে চকচক করছে লোহার খাঁড়া। সামিউল  চমকে ওঠে। সে কোথায় এলো? কোন জাদুমায়ার ঘোর? সে ডানে-বাঁয়ে অস্থির ঘুরে ঘুরে পূজাকে খোঁজে। সেখানে কেউ নেই। সামিউল নিজেও কি আছে? কোথায় সে? কোথায় তার অস্তিত্ব? প্রাণ অথবা জীবন? সে কী? কে? তার পরিচয়? তার সময়? তার কিছু মনে পড়ে না। সে স্বপ্নের ঘোরে ডুবে আছে। সবকিছু স্বপ্নখেলার জাদুমায়া। অন্ধকারের বলয়ে পরিক্রমণরত কোনো গ্রহের অস্তিত্ব। আকাশের নক্ষত্র। মানুষ মরে গেলে নাকি তারা হয়ে যায়। সামিউল তারা হয়ে যাচ্ছে। সে ছিল সে নেই। সে নেই সে আছে। সব মিথ্যে মায়াজাল।

সামিউলকে পরদিন সেখানে মাঠে পাওয়া যায়। পরিত্যক্ত ডোবার পশ্চিম পাড়ে। সাইকেল পড়ে আছে একপাশে। এলাকার কয়েকজন ভোর-সকালে পড়ে থাকতে দেখে। তখনো আকাশে দু-একটি তারা জেগে আছে। সামিউলের শরীরে প্রচণ্ড তাপ। উদ্ভ্রান্ত জ্বর। তাকে ভ্যানে তুলে দেওয়া হয়। এরিয়া অফিসে নিয়ে যেতে তেমন অসুবিধা হয় না। সে তখনো অফিসের বারান্দায় বেঞ্চে ঘুমায়। বেঘোর নিদ্রা। বিড়বিড় করে। মৃদুস্বরে গোঙায়। সে কি স্বপ্ন দেখে? বীভৎস ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন? কালী মন্দিরের খাঁড়া। সেখানে একজন মেয়ে পড়ে আছে। উন্মুক্ত ফরসা শরীর। কালচে-লাল রক্তের শুকনো দাগ। ধূপপোড়া গন্ধের সঙ্গে গুমোট ভ্যাপসা বাতাস ভেসে যায় চারিদিক। একটি মাথা। এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা কুন্তলের ফাঁকে ছোট্ট কপাল। শ্বেত-রক্তিম নকশি আঁকা। অর্ধনিমীলিত চোখে কত যে বিষাদ! ভুরুর মধ্যখানে ছোট্ট লাল টিপ। সামিউল বিকারগ্রস্তের মতো বিড়বিড় করে। গোঙাতে গোঙাতে কাঁদে। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হবে। হেড অফিসে খবর গেছে।

সামিউল যখন দিন কয়েক পর পুনরায় রাস্তায় নেমে সাইকেলে যেতে থাকে, রাস্তার পাশে কলকে ফুলের গাছ আর হলুদ রঙে আলোকিত সীমানা পেরিয়ে সেই জায়গা; আশ্চর্য সেখানে দেবদারু গাছের ছায়া আর মাটির কোনো বাড়িঘর নেই। পশ্চিমে কতগুলো বাঁশগাছ নিয়ে একটি ডোবা। আশপাশে ঝোপঝাড় আর গুল্মলতার ভিড়ে স্থির কাজল-কালো জল। সামিউল আরো একবার থমকে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর সাইকেলে উঠতে উঠতে মনে হয়, কেউ একজন পেছনের ক্যারিয়ারে আলগোছে উঠে বসল। সব কি মনের ভুল? তার শক্ত কঠিন মন কি হারিয়ে যেতে বসেছে? সে জানে, অথবা জানে না; কেউ একজন তার কোমরে হাত রেখে জড়িয়ে পিঠের ওপর মাথা ছেড়ে দেয় আর অচেনা কোমল কোনো সুবাস বাতাসে ভেসে যায়। সে কি সেই মেয়েটি? তার নাম পূজা। সামিউল জন্মজন্মান্তর থেকে চেনে। সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এ কোন জীবনের অংশ? সামিউল রাস্তা থেকে ডোবার দিকে দৃষ্টি দেয়। আশ্চর্য জলের ছায়ায় সেই দেবদারু গাছ আর মাটির দুটো ঘর। নিশ্চুপ সুনসান। সেখানে লুকোছাপা কোনো কান্না ভেসে বেড়ায়। সে আর অবাক হয় না। ভয় পায় না। সে কারো সঙ্গে কথা বলে। আলগোছে শোনে। কথার জবাব দেয়। তাদের নিজেদের কথা ফুরোয় না।

সামিউল আজকাল একা একা বিড়বিড় করে। অস্পষ্ট অচেনা ভাষায় কথোপকথন। কী কথা … কার সঙ্গে কেউ জানে না। তখন কি তার পাশে অন্য একজন থাকে? অদৃশ্য অশরীরী ছায়ামূর্তি? তাকে কেউ দেখতে পায় না। সামিউল জানে কে সে? একজন যে সময়কে অতিক্রম করে কাছে এসেছে। তাকে সে চেনে। অনেক জানে। অনেক বোঝে। একদিন সেও তার মতো সময়কে ছাড়িয়ে যাবে। এখন সময়ের অপেক্ষা শুধু সময়ের জন্য।

সময় নদীর মতো বয়ে যায়।